ইফরাহ রবিনের কথা মতোন কাজ করছে।কাজ নতুন হলেও তার জন্য সমস্যা হচ্ছে না। কারণ ফাইল গুলো ইংরেজিতে এবং কিছু আছে বাংলা তে যা তাকে ইংরেজতে ট্রান্সলেট করতে হবে।
আর অন্যদিকে রায়েদ তার কেবিনের গ্লাস দিয়ে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইফরাহ কে দেখছে।আর মনে মনে বলছে,,,,
--"মানুষ তো বলে সময়ের সাথে সাথে পছন্দ বদলে যায় কিন্তু আমি যে তোমাকে বদলাতে পারছি না Little Rosebud. আমি যে তোমাতে আসক্ত।যতই নিজেকে বলি আমি তোমাকে ভুলে গেছি কিন্তু তুমি তো আমার #হৃদয়ের_অগোচরে । যা মনের গভীরে লুকানো, প্রকাশ
পায় না—তবু হৃদয়ে রয়ে যায় চুপচাপ।
তারপর রায়েদ তার কেবিনের রেস্ট রুমে যায় এবং গিটার হাতে নিয়ে গাইতে শুরু করে,,,,
--"Sambhaal ke rakha wo phool mera tu
Meri shayari mein zaroor raha tu
Jo aankhon mein pyaari si duniya basayi
Wo duniya bhi tha tu
wo lamha bhi tha tu
Haan lagte hain mujhko
yeh qisse satane
Deta na dil mera tujhko bhulane."
এই লাইনজ সে থেমে গেল।চোখ বন্ধ ছিল, কল্পনাতে ছিল তার Little Rosebud এর সাথে আগের স্মৃতি।চোখ খুলতেই চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল।
কথায় আছে,,,যে পুরুষ তার শখের নারীর জন্য কাঁদে সেই নারী অনেক ভাগ্যবতী। এরকম ভাগ্য কয়জনই বা পায়।আজকাল যে এক নারীতে আসক্ত পুরুষ পাওয়া খুবই বিরল।
রায়েদ তার চোখের পানি মুছে ফেলল। তারপর বলল,,,,
--"অনেক হয়েছে লুকোচুরি, অনেক হয়েছে আমার থেকে দূরে থাকা। এখন তোমাকে যেভাবেই হোক নিজের করে ছাড়ব।এত দূর্বল না আমার ভালোবাসা।আমি ওসব নায়ক না যে তোমাকে যেতে দিব। তুমি আমার জীবন, তুমি আমার শ্বাস-প্রশ্বাস।আমি মরুভূমির ন্যায় শুকিয়ে আছি। আমার বৃষ্টি বানিয়ে তোমাকে আমার করব। আমার হৃদয়ে কোনো সুঘ্রাণ নেই। তুমি আমার সেই Little Rosebud যে সুঘ্রাণ ছড়াবে। তোমাকে তো আমি নিজের করবই।নয় ভালোবেসে আপন করে আর না হয় জোর করে।"
________________
ইফরাহ তার কাজ করছে। হঠাৎ ফোনে এলাম বেজে উঠলো। আসলে সে এলাম দিয়ে রেখেছিল কখন রায়াদের কেবিনে গিয়ে ফাইল বা কফি দিতে হবে। কারণ যদি সে সময় না দেখে তাহলে তার কাজ ভুল হবে।আর সে চায় না কেউ তার কাজে ভুল ধরতে পারে।সে ফোনের এলাম অফ করে টেবিলের উপর থেকে ফাইল গুলো হাতে নিল। এখন ফাইল দেওয়া সময়। ফাইলগুলো নিয়ে রায়াদের কেবিনের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। দরজা নক করতেই ভিতর থেকে আওয়াজ এল,,,,
--"Coming."
ইফরাহ ভিতরে প্রবেশ করল তারপর বলল,,,,
--"স্যার ফাইল গুলো রেডি।"
তারপর সে ফাইল গুলো টেবিলের উপর রাখল।রায়েদ একবার টেবিলের ওপরে রাখা ফাইলগুলোর দিকে তাকালো এবং আরেকবার ইফরাহর দিকে তাকালো। তারপর ফাইল গুলো একটি একটি করে হাতে নিয়ে চেক করতে লাগলো।দেখল কাজ গুলো ভালো ভাবেই করেছে।
তারপর বলল,,,,
--"Well, তুমি খুব ভালো করে কাজ সম্পন্ন করেছ।তাও আবার প্রথম দিনে। It's really impressive.যাই হোক ৫ টা ৩০ বেজে গেছে তুমি এখন আসতে পার।রাত করার প্রয়োজন নেই।আর হ্যাঁ কাল সময় মতোই আসবে আশা করছি।"
ইফরাহ মাথা নাড়ল এবং বলল,,,,
--"ওকে স্যার তাহলে আমি এখন আসছি। Good Evening."
এই বলে ইফরাহ রুম ত্যাগ করল।
আর রায়েদ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে মনে মনে বলল,,,,
--"বাহ্!আমার পিচ্চি তো সেই বড় হয়ে গেছে। এখন স্যার বলে ডাকে। আগে তো মি. আক্করা ছাড়া কিছুই বলত না। এখন আবার স্যার।আর কিছুদিন পর বলবে জামাই। এবং তারপরও বলবে বাবুর আব্বু। ইশ্ কি সুন্দর। আমার তো এইসব ভাবতেই ইচ্ছে করছে নাগিন ড্যান্স দেই।"
রায়েদ নিজের কথায় নিজেই আবার হেসে উঠলো। আসলে সে পাগল হয়ে গেছে। তার Little Rosebud এর জন্য।সে তার সিকিউরিটি কে কল করে বলল,,,,
--"এখন অফিস থেকে যে মেয়েটি বের হয়েছে তাকে ফলো করতে। এবং দেখতে এসে ঠিকমতো বাড়ি পৌঁছায় কিনা।"
রায়েদ তার Little Rosebud কে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে চায় না।
___________
অন্যদিকে ইফরাহ সন্ধ্যার মধ্যে বাড়িতে এসে পরেছে।তার মা, বাবার সাথে দেখা করে রুমে চলে আসল। রুমে এসে আগে গোসল করে তারপর বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিল।আজ তার সারাদিনে নামাজ পড়া হয়নি।আজ তো প্রথম দিন ছিল তাই সে ঠিক বুঝতে পারেনি এরকম কোন জায়গা আছে নাকি অফিসে নামাজ পড়ার। কিন্তু তার এক মেয়ে কলিগের মাধ্যমে জানতে পারিছে। তাই সে ভেবেছে কাল থেকে নামাজ পড়বে।
ইফরাহার একজনের সাথে আজ ভাব হয়েছে। আসলে ইফরাহ একদম Introvert মেয়ে। তারপরও আজ প্রথম দিনেই যে একটি মেয়ে বন্ধু বানিয়ে নেবে সেটি তার জন্য অনেক। অবশ্য যে নতুন বান্ধবী হয়েছে সে আবার extrovert. প্রচন্ড কথা বলে। তার নাম ইশা।এইতো আজই দেখা হয়েছে আর আজকেই ইফরাহ কে সব পেটের কথা বলে দিয়েছে। অফিসের কে ভালো অফিসের কে খারাপ। তার বাড়ি কোথায়, তোমার চৌদ্দগুষ্টি তে কে আছে। তার চৌদ্দগুষ্টির কে ভালো কে খারাপ সব।
ইফরাহ ভাবছে একটি মানুষ এত কথা বলে কি করে!
ইফরাহ নিজের ফোন নিল তারপর গ্যালারিতে ঢুকে একটি ছবি বের করল। সে নিজেও জানে না কেন সে এখনো এই ছবি ফোনে রেখেছে। কিন্তু বিগত ৮ বছরে সে অনেক বার এই ছবি দেখেছে যখনই তার মন খারাপ হত তখন এই ছবি দেখতে এবং এক নিমিষেই তার মন ভালো হয়ে যেত।।এই ছবিটি আর কারোর নয়, বরং রায়াদের। ইফরাহ চলে গেল অতীতের ভাবনায়।
অতীত _______________
ইফরাহ তখন ক্লাস টেনে পড়ত। তাদের স্কুলে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান ছিল। ইফরাহ নাটকে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল নাটকে যে দাদির অভিনয় করবে সে এখনো আসেনি এমনকি ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। ইফরাহার তো জান যায় যায় অবস্থা। এখন কি করবে সে বুঝতে পারছে না।সে স্কুলের পিছনের পুকুর ঘাটে বসে কান্না করছে। কারণ ঘন্টাখানেক পর তাদের নাটক শুরু হবে। কিন্তু একজন অনুপস্থিত এবং এই ক্যারেক্টার ছাড়া নাটক হবেই না।
অন্যদিকে রায়েদ তার বন্ধুদের নিয়ে ইফরাহ স্কুলে আসছিল। সে জানতে পেরেছিল আজ এই স্কুলে অনুষ্ঠান হবে। তাই এখানে এসেছে যদি তার Little Rosebud কে দেখতে পায়।
রায়েদ যখন পুকুর পাড়ে সামনে দিয়ে আসছিল তখন দেখতে পেল পুকুর পাড়ে লাল রঙের শাড়ি পরিহিত কোনো রমণী বসে কাঁদছে। রায়েদের বুক ধক করে উঠল। কারণ তার চিন্তা অসুবিধা হলো না যে এই রমণী তার Little Rosebud.
রায়েদ আর দেরি না করে ইফরাহার কাছে দৌড়ে গেল তারপর তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,,,,,
--"এই পিচ্চি,,কি হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন? কেউ কি কিছু বলেছে? শুধু একবার বলো আমাকে। দেখো আমি কিভাবে তাকে শাস্তি দেই। তারপরও প্লিজ এইভাবে কেঁদো না।আমায় বলো।আমি,আমি সব ঠিক করে দিব তো।বল না পিচ্চি।"
ইফরাহ এতক্ষণ হাটুতে হাত রেখে মুখ গুঁজে কাঁদছিল। পুরুষালি কণ্ঠ শুনে মাথা উঁচু করে রায়েদ কে দেখল।রায়েদ দেখল তার Little Rosebud কাঁজল আঁকা চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।কাজল লেপ্টে গেছে। কিন্তু এই চেহারার ও যেন এক অদ্ভুত নেশা,মায়া।
রায়েদ শান্ত স্বরে বলল,,,
--"কি হয়েছে পিচ্ছি এভাবে কাঁদছিলে কেন? আমাকে বল আমি সব ঠিক করে দিব।"
ইফরাহ রাগান্বিত কন্ঠে বলল,,,
--"আপনি কচু ঠিক করবেন। নিজে তো এক আক্করা। আপনি কি এখন আমার জন্য দাদি সাজবেন?"
রায়েদ অবাক হলো। তার মাথায় কিছুই ঢুকলো না। আশ্চর্যজনক কণ্ঠ নিয়ে বলল,,,,,
--"কি বলছো তুমি এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।"
ইফরাহ কান্না করতে করতে বলল,,,,,
--"আপনি তা বুঝতে যাবেন কেন? কম পাতে কি আপনাকে আক্করা বলি। আমার আজ স্কুলের অনুষ্ঠানে নাটকে অংশগ্রহণ করার কথা। কিন্তু নাটক করে একজন সদস্য আসেনি। যে কিনা দাদিমার অভিনয় করতো। আর এই নাটকে দাদিমার অভিনয় অনেক বেশি প্রয়োজন। কিন্তু সে এখনো আসেনি। আর ঘন্টাখানেকের ভেতর আমাদের নাটকের নাম এলাউন্সমেন্ট করবে। আমি এখন বুঝতে পারছি না আমি কি করবো।"
এই বলে আবার কাঁদতে লাগলো।
রায়েদ এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিল। সে তো ভেবেছিলে হয়তো কেউ খারাপ কিছু করছে। কিন্তু কান্নার অন্য কারো জানতে পেরে সে কিছুটা নিশ্চিন্ত হল। কিন্তু এখানে নিশ্চিন্ত হওয়ারও কোনো বিষয় নেই। আসলেই তো এখন নাটক কি করে করবে। রায়েদ কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বলল,,,
--"আমি দাদিমার অভিনয় করব।"
ইফরাহ রায়েদ কথায় তার দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। রায়েদ তা দেখে বলল,,,
--"আ করে তাকিয়ে আছো কেন? আক্করা আমার নাম।তার মানে আমি আ করে তাকিয়ে থাকবো। তুমি না।"
ইফরাহ কিছুটা লজ্জা পেল তারপর বলল,,,,,
--"কিন্তু আপনি কি করে করবেন?আর আপনি কত লম্বা। গুজো হয়ে থাকতে গেলে আপনার পেট,পিঠ ব্যথা করবে।আর আপনার কন্ঠ দাদীমার মত নয় বরং দাদার মত শোনা যাবে।"
রায়েদ হেসে উঠলো তারপর বলল,,,
--"চিন্তা করোনা আমি না হয় তোমার জন্য কিছুক্ষণ গুঁজো হয়ে থাকবো। আর রইল বাকি কণ্ঠের কথা সেটা না হয় একটু পরিবর্তন করে বলার চেষ্টা করব। এখন আর বেশি দেরি না করে আমাকে ডায়লগ গুলো বল। আমাকে তৈরি হতে হবে আবার।"
ইফরাহ দেখল আসলেই আর কোনো উপায় নেই।তাই দেরি না করে রায়েদ কে সব ডায়লগ বলে দিল।রায়েদ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।আর আগেই তার এক বন্ধুকে বলেছে প্রয়োজনীয় সকল জিনিস তাড়াতাড়ি যাতে নিয়ে আসে। তার বন্ধুরা মিলে সব জিনিস হাজির করল।সাদা শাড়ি,সাদা কালো লম্বা চুল,ভর দিয়ে হাঁটার জন্য লাঠি, চশমা,পান। আরো অনেক কিছু।
তারপর রায়েদ এইসব নিয়ে এক খালি রুমে চলে গেল।তার বন্ধুরা তো একদম অবাক। ভার্সিটির টপার এবং চুপচাপ ছেলে একটি পিচ্চি মেয়ের জন্য আজ মহিলার সাজছে। ভাবা যায়। আসলে পুরুষ মানুষ ভালবাসলে তার শখে নারীর জন্য সবকিছু করতে পারে।
রায়েদ রেডি হয়ে বাইরে বের হল। তাকে দেখে তার বন্ধুরা হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছি। কেউ কেউ তো হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলেছে। আর ইফরাহা তো শব্দ করে হেসে যাচ্ছে। যে লোককে কিছুক্ষণ আগেও অনেক হ্যান্ডসাম লাগছিল এখন তাকে মহিলা লাগছে।
রায়েদ তার বন্ধুদের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ পড়ল। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তারা এখনো পাগলের মত হাসছে। রায়েদের দৃষ্টি গেল ইফরাহ দিকে।দেখল ইফরাহ ও হাসছে।
রায়েদ বিরক্ত হয়ে বলল ,,,,
--"যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর। থুক্কু!!যার জন্য বেডি সাজি সেই হাসতে হাসতে শেষ। এই ভালোবাসার জন্য যে আর কত কি করতে হবে আল্লাহ জানে।"
ইফরাহ নিজের হাসি থামিয়ে রায়েদ কাছে এসে বলল,,,
--"দাদি মা। I'm your Big fan. One selfie please please."
এই বলে আবার হাসতে লাগলো। তারপর নিজের ফোন বের করে রায়েদের কিছু ছবি তুলে নিল। এবং রায়েদের সাথে নিজের কিছু ছবি তুলে নিল।
রায়েদ বেচারা না কিছু বলতে পারছে আর না সহ্য করতে পারছে। তারপর বলল,,,
--"হয়েছে হয়েছে আর ঢং করতে হবে না। এখন তাড়াতাড়ি চলো কিছুক্ষণের ভেতর অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে।"
ইফরাহ সায় দিল।রায়েদ যখন হাঁটতে শুরু করল তখন ইফরাহ হাসতে হাসতে বলল,,,
--"দাদীমা আপনি হয়তো ভুলে গেছেন আপনি এখন দাদীমা মিস্টার আক্করা নন।তাই নিচু হয়ে চলুন। আর দয়া করে মহিলাদের মত চলুন।"
রায়েদের বন্ধুরা তো আবার হাসতে শুরু করলো।রায়েদ বেচারা উপায় না পেয়ে ইফরাহার কথা অনুযায়ী চলল।
অবশ্য সেইদিন তারা ফার্স্ট হয়েছিল। বেচারা রায়েদ তো একদম অভিনয়ে ঢুকে গিয়েছিল।
বর্তমান ________
এইসব ভাবতে ভাবতে ইফরাহ অতীত থেকে ফিরে এলো। তারপর একা একা অনেকক্ষণ হাসলো।তার কাছে এখনো রায়েদের সেই দাদিমা মার্কা ছবি আছে। তারপর ইফরাহ মনে মনে বলল,,,
--"কি সুন্দর ছিল সেই সময় গুলো।কি না করেছিল আমার জন্য। আসলেই উনার ওয়াইফ অনেক লাকি হবে।"