হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ২

🟢

কিন্তু ইফরাহার চিন্তা ধারা কে ভুল প্রমাণিত করে ইহসান রায়েদ সিকান্দার ইফরাহার দিকে প্রফেশনাল দৃষ্টি দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,,,,,

--"মিস আনায়াহ ইফরাহ।আমি আপনার ফাইল চেক করলাম সবই ঠিক আছে। কিন্তু আপনার তো কোনো কাজের অভিজ্ঞতা নেই।"

রায়েদ থামল।তার কথার ভঙ্গিতে প্রফেশনাল স্বর ছিল।মনে হচ্ছে সে ইফরাহার কে চেনেই না।ইফরাহার কিছুটা শান্ত অনুভব করল।সে খুব ভয় পেয়েছিল।

রায়েদ আবার বলতে শুরু করল,,

--“So… tell me about yourself. Not just your degrees, but who is Anayah Ifrah?”

ইফরাহা হকচকিয়ে গেল। এতদিনের রেডি করা উত্তরগুলো যেন মাথা থেকে উধাও হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসছিল, তবু জোর করে বলল,,,,

--“I… I am hardworking, I like challenges… আর নতুন কিছু শিখতে ভালোবাসি।”

রায়েদ এক চিলতে হাসল, হয়তো কোনো পুরনো কিছু মনে পড়েছে। তারপর প্রফেশনাল স্বরে বলল,,,

--"Interesting. But why do you want to join here? এই কোম্পানির জন্য এত ইচ্ছা কেন?”

ইফরাহা স্বাভাবিক স্বরে বলল,,,,

--“Because I believe this place will value my skills, Sir.”

চোখ নামিয়ে নিল রায়েদ।আর মনে মনে আউরালো Sir!!!

তার কণ্ঠ আরো ঠাণ্ডা হল। তারপর বলল,,,

-- “In this field, loyalty is more important than talent. How loyal can you be?”

ইফরাহার মনে হলো শব্দটা কানে বাজছে—loyalty!

একদিন তো সে-ই রায়েদের সব ভালোবাসাকে অস্বীকার করেছিল।বুক ভারী হয়ে গেল। তবু মুখ শক্ত করে উত্তর দিল,

— “As much as needed, Sir. I don’t give up easily anymore.”

রায়েদ থমকে গেল। ভেতরে এক অদ্ভুত ঝড়।যা হয়তো সে নিজেই জানে। তারপর শেষ প্রশ্ন করল সে,

--“Where do you see yourself in the next five years?”

ইফরাহার বুক কেঁপে উঠল। কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।এক অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথা বুকে। কিন্তু সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,,,

--“In a place… where my work will speak louder than my past.”

ঘরটা নীরব হয়ে গেল। রায়েদ ফাইল বন্ধ করে বলল,

— “That’s all, Ms. Ifrah. You may leave.”আমরা আপনাকে পরবর্তীতে কনফার্ম করব।"

ইফরাহা সায় দিল মাথা নাড়িয়ে। তারপর তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ধন্যবাদ জানায়ে স্থান ত্যাগ করল।

ইফরাহা যেতে না যেতেই রায়েদ চোখ বন্ধ করে নিল।ভারী ভারী নিঃশ্বাস নিতে লাগলো।সেই আগের অনুভূতি,সেই আগের স্মৃতি।রায়েদের বুক ভারি হয়ে উঠেছে। চোখে পানি জমে গেছে।৮ বছর পর সে তার ভালোবাসার মানুষটিকে দেখেছে। তার সাথে কথা বলেছে।তার কন্ঠ শুনতে পেরেছে।তার চোখে চোখ রাখতে পেরেছে।রায়েদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো তারপর একা একা বিরবির করে বলল,,,,

--"তুমি নিজ থেকে আমার কাছে হেঁটে এসেছো Little Rosebud. এখন আর তোমাকে দূরে যেতে দেব না। আমার ভালোবাসা শুনেছ। কিন্তু অনুভব করনি। আমার ভালোবাসার পসেসিভনেছ দেখনি।আমি তোমাকে পেতে কত দূর পর্যন্ত যেতে পারি তার সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তোমার Rosebud. তুমি নিজ থেকে আমাকে প্রোপজ করবে।নিজ মুখে বলবে তুমি আমাকে ভালোবেসো।আর সেইদিন আমি নিজেকে সবথেকে ভাগ্যবান ব্যাক্তি মনে করব এই পৃথিবীর। সেইদিন আমি নিজেকে সার্থক মনে করব।সব কিছু উজার করে তোমার হয়ে যাব। জাহান্নামে যাক আমার Male Ego. I'm Only Your Little Rosebud. I'm Only belong To You."

রায়েদ তার ফোন বের করে তার মেনেজার কে কল করে তার ডাস্কে আস্তে বলল।

বিজ্ঞাপন

রবিন আসলো রায়েদের কেবিনে তারপর বলল,,,

--"জি স্যার বলুন।"

রায়েদ আদেশের স্বরে বলল,,,

--"কিছুক্ষণ আগে যে মেয়েটি ইন্টারভিউ দিয়ে গিয়েছে আনায়াহ ইফরাহ তাকে আমার পার্সোনাল পিএ বানিয়ে দাও এবং তার জব পার্মানেন্ট করে দাও। এবং তাকে কনফার্ম করে দাও যাতে কাল থেকেই জয়েন করে।আর যদি বলে যে মাসের শুরু হলে জয়েন করবে তাহলে তাকে জানিয়ে দাও যদি চাকরি করতে চায় তাহলে যাতে এখন থেকেই জয়েন করে। আমি লেট কর্মচারী পছন্দ করি না। আর হ্যাঁ তার ডাস্ক একদম আমার কেবিনের সামনাসামনি রাখবে যাতে আমি তাকে ভালো করে দেখতে পারি। মানে সে কাজ ঠিকমতো করছে কিনা সেটাই আর কি।"

রবিন শুধু মাথা নাড়ল তারপর স্যারের অনুমতি নিয়ে রুম ত্যাগ করল।সে মনে মনে বলল,,,

--"আগেও তো অনেক কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে কিন্তু স্যার কখনো কারোর জন্য এতটা ভাবে নি তাহলে এই মেয়ের জন্য কেন? অবশ্যই এই মেয়ে খুব স্পেশাল।"

_________________

অন্যদিকে ইফরাহ বাড়িতে ফিরল।পুরোটা রাস্তা সে এতক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ভাবছিল।সে বাড়িতে প্রবেশ করে সোজা তার রুমে চলে গেল। রুমে গিয়ে হিজাব খুলে বিছানায় বসে পড়ল। চলে গেল অতীতের ভাবনায়।

অতীত________

ইফরাহ যেদিন রায়াদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেদিন সে ইউনিভার্সিটি থেকে সোজা তার বাড়িতে এসে পরেছিল।তার রুমে ঢুকে বিছানায় উপর হয়ে শুয়ে পড়লো।তার শরীর ঘেমে আছে। বুকে কেমন জানি এক অদ্ভুত কষ্ট। কিন্তু তার কেন খারাপ লাগছে?তার তো কোনো অনুভূতি নেই।তার শুধু খারাপ লাগছে রায়েদ কে সবার সামনে প্রত্যাখ্যান করার জন্য। কিন্তু এই অনুভূতি ভালোবাসা নয় বরং দয়া, সহানুভূতি। কিন্তু এইসব দিয়ে যে ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসা এক অনুভুতি। সেই অনুভূতি হতে ইফরাহ অজানা তাই সে ভালোবাসার সংজ্ঞা দিতে পারছে না।সে তো এইটাও যানে না ভালোবাসার কোন সংজ্ঞা আদৌ আছে কিনা। তাহলে কি করে সে অন্য একজনের জীবনে প্রবেশ করবে।তার যে কোন অধিকার নেই কারোর সত্যি কারের ভালবাসা, অনুভূতি নিয়ে খেলা। কারোর সত্যি কারের ভালবাসা পেয়ে তাকে বদলে দয়া সহানুভূতি দেওয়া।যখন অপর পাশের মানুষটি জানতে পারবে সে যাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে এসেছে সেই মানুষটি শুধু তাকে দয়া করেছে তখন সে মানুষটি খুব কষ্ট পাবে। তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবে। তার থেকে ভালো তাকে সেই অন্ধকারে নিয়ে ছেড়ে না যাওয়ার চেয়ে সে অন্ধকারের পথের দিকে এগনোর আগে তাকে বাধা দেওয়া। এখন হয়তো সে একটু কষ্ট পাবে কিন্তু তারপর নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু অন্ধকারের দিকে চলে গেলে সেখানে গিয়ে যদি সে কষ্ট পায় তখন সে সেখান থেকে বের হতে পারবে না।তাই ইফরাহ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।তার যে অনেক স্বপ্ন।আর সে নিজের স্বপ্নের জন্যে কাউকে মিথ্যা আশা দিতে পারবে না কাউকে অপশন হিসেবে বেছে রাখতে পারবে না।আর সে জন্যই ইফরাহ রায়েদর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এবং এতে তার কোন আক্ষেপ নেই।যদি সে রায়েদ কে মিথ্যে আশ্বাস দিতো এবং তারপর সে কষ্ট পেত তাহলে তার আক্ষেপ থাকতো।

ইফরাহ অতিতের ভাবনার ছেদ‌ ঘটে তার মায়ের কন্ঠ শুনে। আয়েশা বেগম ইফরাহার মা।পেশায় একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। এবং তার বাবা জহিরুল হক। একজন কলেজের সিনিয়র প্রফেসর।ইফরাহ একমাত্র মেয়ে। তার যে অনেক দায়িত্ব মা বাবার প্রতি।তার যে কোনো ভাই নেই। সেই তার পরিবারের একমাত্র আশা। সে চাকরি না করলেও চলে তার মা বাবার সরকারি চাকরি কিন্তু ইফরাহ নিজ দায়িত্বে তার মা-বাবার জন্য কিছু করতে চাই। তাই তো আজ পর্যন্ত কোন ভালোবাসা নামক জিনিসে জড়াইনি।

আয়েশা বেগম ইফরাহার রুমে এসে বলল,,,

--"মা ইফরাহ এইযে পিয়ন এসে দিয়ে গেল। মনে হয় তোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। আচ্ছা চাকরি করা কি খুব জরুরী রে মা?আমি তোর বাবা দুজনেই তো কামাই। আমি বলছি না যে তুই কখনোই চাকরি করিস না শুধু এইটুকু বলছি যে এখন পড়ালেখা শেষ করে দেয় তারপর চাকরি করিস।"

ইফরাহ মুচকি হেসে তার মার হাত থেকে লেটার নিয়ে খুলতে খুলতে বলল,,,

--"তুমি চিন্তা করো না মা। তোমার মেয়ে তোমার মতোন সব সামলাবে। তুমি যেরকম সংসার এবং চাকরি দুটো একসাথে সামলাও ঠিক তেমনি আমি চাকরি এবং পড়ালেখা একসাথে সামলাবো।"

আয়েশা বেগম মুচকি হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে রুম ত্যাগ করলেন।

ইফরাহ অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার খুলে দেখলো,,,

--"Appointment Letter

To: Ms. Anayah Ifrah

We are pleased to offer you the opportunity to join ERSC as the Personal Assistant (PA) to Mr. Ehsan Rayed Sikandar (CEO).

You are requested to report and formally join your duties tomorrow.

We look forward to working with you and wish you success in your role.

Sincerely,

Human Resources Department

ERSC.

(নিয়োগপত্র প্রাপক: মিস আনায়াহ ইফরাহ

আমরা আনন্দের সঙ্গে আপনাকে জানাচ্ছি যে, আপনাকে ERSC–তে মিস্টার ইহসান রায়েদ সিকান্দার (সিইও)-এর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (PA) পদে যোগদানের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে।আপনাকে আগামীকাল অফিসে উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে।আমরা আপনার সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছি এবং আপনার নতুন পদে সর্বোচ্চ সাফল্য কামনা করছি।বিনীত,

মানবসম্পদ বিভাগ ERSC)

ইফরাহর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প