সবে মাত্র জুম্মার নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরল রায়েদ। নিচে থেকে একেবারে খাবার খেয়ে তারপর নিজের রুমে আসলো।
আজ শুক্রবার তাই অফিস বন্ধ,আর অফিস বন্ধ মানে ইফরাহ কেও দেখা বন্ধ। এখন আর এই দূরত্ব সহ্য হয় না তার।গত ৮ বছর তো দিব্যি ইফরাহ কে না দেখে ছিল। বিষয়টি এমন না যে তখন কষ্ট হতো না। খুব কষ্ট হতো। কিন্তু তখন নিজের ফোন থেকে ইফরাহার ছবি বের করে সেটি দেখতো।আর এখন ইফরাহার সাথে দেখা হয়েছে গতকাল কিন্তু তারপরও তার মন ভরছে না।
কথায় আছে না খেতে পেলে শুতে চায়।রায়েদের দশা এখন অনেকটা তাই। এতদিন ইফরাহ দূরে ছিল, সে জানতো সে চাইলেই ইফরাহ কে দেখতে পারবে না। তাই তখন দূরত্ব মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে। কিন্তু এখন সে এই দূরত্ব সহ্য করতে পারছে না।
রায়েদ নিজেকে প্রশ্ন করল,,,,
--"এটা কি বেশি বেশি? নাকি লোক দেখানো।"
তারপর নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিল।,,,,
--"না এইটা মোটেও বেশি বেশি না। আর লোক দেখানোর তো প্রশ্নই আসছে না। আসলে যখন মানুষ জানে যে তার ভালোবাসায় নিশ্চয়তা আছে, ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর ভয় থাকে না তখন তাকে এক নজর দেখার জন্য এত ছটফট করতে হয় না। কিন্তু যাদের ভালবাসায় কোন নিশ্চয়তা নেই, আর না নেই ভালবাসার মানুষটিকে নিজের করে পাবার তারা শুধু কষ্ট পায় এবং অপেক্ষার প্রহর গুনে।আর সেই অপেক্ষার প্রহরে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে আমি।"
রায়েদ নিজের চিন্তা ভাবনা এতটাই মশগুল ছিল যে কেউ তার রুমের দরজা নক করে তারপর রুমে ঢুকেছে সে টের পাইনি।
রায়েদের দাদি সুবানা আক্তার এসে রায়েদের পাশে বসল তারপর রায়েদের চিন্তা ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে বলল,,,,
--"দাদু ভাই!কি এমন চিন্তা করতাছো হুনি?"
দাদির কন্ঠে রায়েদর হুঁশ ফিরল। সে তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,,,
--"তেমন কিছু না দাদীমা, হইত অফিসের এক কাজের ব্যাপারে ভাবছিলাম।"
সুবানা আক্তার বিরক্তিকর ভঙ্গিমা নিয়ে বললেন,,,
--"আর থোও তো তোমার এইসব কাম কাইজের কথা। আমি যেইটা তোমার লগে কইবার আইছি হেইডা মন দিয়ে হুনো।"
রায়েদ দাদির কথায় দাঁত বের করে হাসলো তারপর দাদি কে বলল,,,,
--"ওকে বেবি গার্ল তুমি যা বলবে আমি তাই শুনবো।"
সুবানা আক্তার বলতে শুরু করলেন,,,,
--"বয়স তো আর কম হলো না তোর। এইবার বিয়া সাদি কোইরালা।আর কত দিন এমন একা থাকবি।আর তোর মা বাপেরো তো ইচ্ছা করে নিজের সন্তানের সংসার দেখবার। যদি তোর পছন্দের কোন মাইয়া থাইকা থাকে তাহলে আমারে কো। আর না থাকলে আমি নিজ থেকে পছন্দ কইরা লামু "
রায়েদ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো তারপর সিদ্ধান্ত নিল এখন সবটা বলার সময় হয়ে গেছে। রায়েদ তার দাদির দিকে তাকিয়ে বলা শুরু করলো,,,,
--"আমি একজন কে ভালোবাসি দাদিমা। খুব খুব খুব ভালোবাসি। এবং আমি তাকেই আমার অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে চাই।এনে দিবে আমায় আমার ভালোবাসার মানুষটিকে?"
সুবানা আক্তার অবাক হলেন এমন আবদার শুনে।সে যে রায়েদ কে বড্ড ভালোবাসে।রায়েদের ইচ্ছা তার কাছে আগে।সে মূলত এখানে এসেছিল তার নাতির সাথে রায়েদের বিয়ের কথা বলতে। অর্থাৎ রায়েদের ফুফাতো বোন ঈশিতার সাথে।
ঈশিতা মা-বাবার একমাত্র কন্যা। তাকে তার মা বাবা রাজকন্যার মতো বড় করেছে। কখনো কোন কিছু কমতি রাখেনি। যখন যা চেয়েছে তখন তাই দিয়েছে। এবং মূলত এই কারণেই নিজেদের মেয়েকে দেরি করে তুলেছে। আর ঈশিতার ধারণা সে যাই চাইবে তাই পাবে। ছোট বেলা থেকেই সে রায়েদ কে পছন্দ করতো। কিন্তু রায়েদ তাকে নিজের বোনের মতোন মনে করতো।রায়েদের নিজের কোন বোন নেই তাই ঈশিতাকেই সে নিজের বোন মনে করে অনেক বেশি কেয়ার করতো। এবং এই কেয়ার কেই ঈশিতা ভালোবাসা ধরে নেয়। ঈশিতা রায়েদের থেকে পাঁচ বছরের ছোট।সবে মাস্টার্স শেষ করেছে।সে ফেশন ডিজাইন নিয়ে পড়া শোনা করছে।
রুপে,গুণে ভরা। কিন্তু বড়ো সম্মান কি করে করতে হয় তা সে জানে না বললেই চলে।আর চিন্তা ধারা অনেকটাই আধুনিক।সে ফিনল্যান্ড থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিরেছে। তার চিন্তাভাবনা আধুনিক থাকাটাই স্বাভাবিক।
ঈশিতা কে অবশ্য রায়েদের দাদি এবং রায়েদের মা একদমই পছন্দ করে না। কিন্তু আজ ঈশিতার মা রুমা সিকান্দার এসে নিজের মা এবং ভাবির কাছে অনেক বিনতি করে। কিন্তু সুবানা আক্তার তার মেয়েকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যদি রায়েদ রাজি হয় তাহলে তারা এই বিষয় নিয়ে ভাববে আর যদি রাজি না হয় তাহলে এই বিষয়ে এখানেই বন্ধ। রুমা ভেবেছিল তার মেয়ে দেখতে যথেষ্ট সুন্দরী, গুনে একদম পার্ফেক্ট, চিন্তাভাবনা একদম আধুনিক, আবার রায়েদের থেকে পাঁচ বছরের ছোট তার মানে ম্যাচিউর অবশ্যই রায়েদ তার মেয়েকে পছন্দ করবে।তাই সে তার মায়ের কথায় রাজি হয়ে যায়।
সুবানা আক্তার তাই আগে রায়েদ কে তার মনের কথা বলার সুযোগ দিল। কারণ সে চায় না রায়েদ তার পরিবারের কথা ভেবে নিজের সুখ ভালোবাসাকে বিসর্জন দেক।এখন যদি সে সরাসরি ঈশিতাকে বিয়ে করার কথা বলতো হয়তো রায়েদ তার দাদির কথা রাখার জন্য বিয়েতে রাজি হতো। কিন্তু ভবিষ্যতে না ঈশিতা সুখি হতো আর না রায়েদ।সুবানা আক্তার নিজের উপর খুশি হলেন কারণ এখন সেই সবটা জানতে পেরেছে। কারণ পরে জানতে পারলে তাকে অনেক পস্তাতে হবে।
সুবানা আক্তার নিজের চিন্তা ভাবনা থেকে বের হয়ে এসে রায়েদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,
--"দেখি তো আমার হবু সতিনের ছবি।"
রায়েদ হাসলো তারপর নিজের ফোন বের করে ইফরাহার একটি ছবি দেখালো।লাল সাদা গ্ৰাউন সাথে লাল রঙের হিজাব। সুবানা আক্তারের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি হেসে বললেন,,,,
--"করেছো কি দাদু ভাই।এত দেখে আসমানের চাঁদ। এই আসমানের চাঁদকে তুমি পৃথিবীতে কেমনে খুঁজে পাইলা।কোইতে হোইবো বেটা তোর চোখ আছে।"
রায়েদ লাজুক হাসলো তারপর বলল,,,
--"ওর নাম আনায়াহ ইফরাহ।আমি ওকে ২০১৪ সাল থেকে চিনি।(আগের পর্বে এডিট করে সাল চেঞ্জ করে দিয়েছি। তাই এই সাল নিয়ে কেউ আর ভাববেন না। এটাই সঠিক সাল।)
একবার এসে বলেছিলাম না যে বন্ধুদের সাথে বেইট লেগগ গিয়ে ঝাল ফুচকা খেয়েছিলাম এবং এক পিচ্চি মেয়ে এসে আমাকে পানি দিয়েছিল। এই সেই মেয়ে।"
সুবানা আক্তারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।সে অবাক হলো যে রায়েদ এই মেয়েকে ১১ বছর যাবৎ ভালোবেসে আসছে।আর সে কিনা রায়েদের অন্য কারো সাথে বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল। এই ভেবে সুবানা আক্তারের অনেক আফসোস হতে লাগলো। কত বড় ভুলই না করতে নিয়েছিল।
সে রায়েদের দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখ দিয়ে বলল,,,,
--"এত বছর যাবৎ ভালোবেসে আইসিছ এই মাইয়াডারে।কত কষ্টই না সহ্য করতে হোইছে আমার দাদু ভাইরে।তোর লোগে আমি এই মাইয়ারই বিয়া দিমু।তুই চিন্তা করিস না। যদি তুই কস তাহলে এক্ষুনি তোর বাপ মা রে লইয়া এই মাইয়ার বাড়ি যাইয়া বিয়ার কথা কমু।"
রায়েদ খুশি হয়ে বলল,,,,
--"তুমি রাজি হয়েছ এটাই অনেক। সময়মতো আমি তোমাদেরকে সব বলবো। আমাকে শুধু আর কিছুদিন সময় দাও।"
সুবানা আক্তার সায় জানায় এবং রায়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে রুম ত্যাগ করে।
ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন।