--"শোন রায়েদ আর কতদিন এমন ভাবে ঘরে বসে থাকবি? কাল আমাদের ইউনিভার্সিটিতে পর্ণ মিলন অনুষ্ঠান হবে।সবাই মিলে আবার এক হবো।তোকে কিন্তু যেতেই হবে আমাদের সাথে। আমরা আর কোনো বাহান শুনবো না রায়েদ।"
একনাগাড়ে সালমান রায়েদ কে কথা গুলো বলল।তার সাথে বাকি বন্ধুরাও তাল মেলায়।
আসলে এইসব কিছু ইফরাহার প্লেন। অবশ্য তার এই প্লেনে রবিন অনেক সাহায্য করে। সে রবিন কে জিজ্ঞেস করেছিল যে রায়েদের কোনো পুরনো বন্ধু কি তার সাথে দেখা করতে আসতো। এবং রবিন কি সব পুরাতন বন্ধুর মধ্যে কারো নাম জানে। যখন রবিন বলল সে তিন চার জন আসতো তাদের নাম জানে। এবং যখন তাদের নাম ইফরাহ কে বলে ইফরাহ তাদের নাম শুনেই চিনে ফেলে। তারপর রবিনের কাছ থেকে তাদের ফোন নাম্বার নেয় এবং তাদের সাথে যোগাযোগ করে প্ল্যান করে। তাদের কাজ হল রায়েদ কে যেভাবেই হোক ইউনিভার্সিটি পূর্ণমিলন অনুষ্ঠান আনতে হবে। বাকিটা ইফরাহ সামলে নিবে।
এখন মূলত এই কারণেই রায়েদের সামনে তার চার পুরোনো বন্ধু বসে আছে।রায়েদ যখন ইফরাহার পিছন পিছন ঘুরতো তখনও তারা রায়েদের সাথে ছিল। এবং এখন ইফরাহার রায়েদের পিছন পিছন ঘুরে এখনো তারা রায়েদের পাশেই আছে।
তাদের নাম হলো শ্রাবণ,আরিফ, রকি, এবং সালমান।
তারা কিছুক্ষণ আগেই রায়দের সাথে দেখা করতে এসেছিল। আসার পর থেকেই রায়েদ কে এইটা সেটা বলে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রায়েদ তো নাছোড়বান্দা সে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। তার উপরে কালকের তারিখে কখনোই ভুলতে পারবে না। ২০১৪ সালের ১২ই জুন প্রথমবার সে তার Little Rosebud দেখেছিল এবং তখনই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল এবং ২০১৬ সালের ১২ই জুন সে নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছিল কিন্তু সে ব্যর্থ হয়েছিল।তাই সে এই দিনটি একা কাটাতে চায়। কিন্তু তার বন্ধুরা যেন হাত ধুয়ে তার পিছনে লেগেছে।
রায়েদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তারপর চিল্লিয়ে বলে উঠলো,,,,,
--"আমি তো বলে দিয়েছি একবার যে আমি কোথাও যাবো না। তোরা আমাকে আর বিরক্ত না করে আমাকে এখন একা থাকতে দে।"
শ্রাবণ,আরিফ, রকি, এবং সালমান তারা রায়েদের চিৎকার শুনে সবাই একসাথে বলে উঠল,,,,,
--" ভাই তুই চিৎকার করিস না এমনিতেই তুই অসুস্থ। আমরা চলে যাচ্ছি।"
এই বলে সবাই দরজা পর্যন্ত গেল তারপর আরিফ তার বাকি বন্ধুদেরকে চোখ টিপ দিয়ে বলতে শুরু করলো,,,,
--" ক্লাস সিক্স থেকে আমরা একসাথে পড়েছি। বিপদে আপদে সবসময় একে অপরের পাশে থেকেছি। এখন যদি কারোর আর আমাদের প্রয়োজন না হয় তাহলে আর তাকে বিরক্ত করে লাভ নেই। বরং তার থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলাই ভালো।"
শ্রাবণ, রকি, এবং সালমান ও সাথে তাল মিলাচ্ছে। কিন্তু তাদের কথা শুনে রায়েদের খারাপ লাগলো। আসলেই তো তারা কত বাজে দিন একসাথে কাটিয়েছে। একজন আরেকজনের জন্য জান দিয়ে দিতে প্রস্তুত। অথচ এখন রায়েদ তাদেরকে নিজের কথা দ্বারা কষ্ট দিলো।
যেই না তার বন্ধুরা দরজা খুলে বাইরে চলে যেতে নেবে তার আগেই রায়েদ বলে উঠলো,,,,
--"আমি আসবো কাল। কিন্তু হ্যাঁ আমি আগেই বলে দিচ্ছি বেশিক্ষণ থাকবো না।"
রায়েদের এই কথা বলতে দেরি কিন্তু তার বন্ধুদের এক মূহুর্ত দেরি হলো না তাকে এসে জড়িয়ে ধরবার জন্য।রায়েদ হেসে উঠলো। তার বন্ধুরা তাকে চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরে আছে।
______________
ইফরাহ কে তার মা টুকটুকে লাল রঙের শাড়ি পড়িয়ে দিচ্ছে। একটু আগে তার বাবা গোলাপ ফুলের বাগান থেকে টকটকে লাল গোলাপ ফুলের তোড়া কিনে নিয়ে এসেছে।তার মেয়ে নিজের ভালোবাসার মানুষকে নিজের মনের কথা বলবে এটা কি কম বড় কথা নাকি? ইফরাহ শাড়ি পড়ে তার সাথে মেচিং করে লাল হিজাব পরল। হাতে লাল চুড়ি। একদম রায়েদের পছন্দ মতো সাজলো।বাবার হাত থেকে গোলাপ ফুলের তোড়া নিয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। অবশ্য তার বাবা তাকে পৌঁছে দিবে ইউনিভার্সিটিতে।
গাড়িতে উঠতেই ইফরাহার বাবা তাকে ফোন ধরিয়ে দিল। ইফরাহ তার বাবার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে তার বাবা ইশারায় বলল কথা বলতে। ইফরাহ ফোন কানে নিতেই ফোনের অপর পাশ থেকে রায়েদের মার কন্ঠ ভেসে আসলো।তিনি বললেন,,,,,
--"কি গো হবু বউমা পারবে তো আমার ছেলেকে পটাতে?"
ইফরাহ মুচকি হেসে বলল,,,,,
--"ইন শা আল্লাহ আমি পারব হবু শাশুড়ি আম্মু। আপনি শুধু মন ভরে দোয়া দিন।"
ইফরাহ আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন কেটে দিল। তার মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা যা সে বহিঃপ্রকাশ করতে পারবে না।আজ কত দিন পর সে তার প্রিয় মানুষটিকে দেখতে পাবে।
___________________
রায়েদ তার বন্ধুদের জোরাজুরিতে সাদা রংয়ের পাঞ্জাবি পরেনিল।তার সাথে মেচিং পায়জামা এবং পাঞ্জাবির উপর কোর্ট। হাতে ঘরি। সে অবশ্য মুখে মাস্ক এবং চোখে কালো সানগ্লাস পরতে চেয়েছিল তার চেহারার দাগ দেখা না যায়। কিন্তু তার বন্ধুরা তাকে পরতে দেয়নি।
রায়েদ তার বন্ধুদের সাথে ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশ করলে। তার বুক যেন ভারি হয়ে আছে। কত পুরোনো স্মৃতি চোখের সামনে ভাসছে। কিছু মধুর তো কিছু যন্ত্রনা দায়ক। এখানে অনেক ভিড়। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে যাওয়া বিগত অনেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের ভির। কিন্তু হাজারো ভিরের মাঝে আজ একজনের অনুপস্থিতি যেন তাকে খুব পুড়াচ্ছে। সে মুখ ফুটে না বললেও তার মন,তার চোখ কাঙ্ক্ষিত একজন কে চাচ্ছে।আর সেই কাঙ্ক্ষিত একজন হচ্ছে ইফরাহ।রায়েদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে যেই না পিছনে ফিরল ওমনি দেখল লাল শাড়ি পরিহিত এক রমণী তার সামনে একগুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সবার দৃষ্টি তাদের দিকে। এই রমণী কে যে রায়েদ চিনে না এমন নয়, এই রমণী হলো তার Little Rosebud যে আজ আবার তার সামনে গোলাপ ফুলের কুঁড়ি সেজে বসে আছে।রায়েদের দৃষ্টি ইফরাহার দিকে এবং তার দৃষ্টি অবাকতর অন্যদিকে ইফরাহার দৃষ্টি রায়েদের দিকে যা হলো ভালোবাসাময়।
ইফরাহ রায়েদের চোখে চোখ রেখে বলতে লাগলো,,,,,
--"আজ থেকে প্রায় ৮ বছর ধরে আগে ২০১৬ সালের ১২ জুন আপনি আমাকে ঠিক এই সময়ে এই স্থানে নিজের মনে জমে থাকা এক আকাশ পরিমাণ ভালবাসার কথা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু আমি স্বার্থপরের মত আপনার ভালোবাসাকে দাম দিতে পারিনি।তার মানে এই না যে আপনার স্থান আমার মনে কখনোই ছিল না।মনের কোনো না কোনো কোণায় আপনার স্থান সবার উপরে ছিল। বলতে পারেন আমার #হৃদয়ের_অগোচরে যা আমার অজানা ছিল। অথবা আমি জেনে জানতে চাইনি। কিন্তু যখন আপনি আমার থেকে দূরে চলে গিয়েছিলেন তখন আপনার অনুপস্থিতি আমাকে অনেক পুড়িয়েছে, যন্ত্রণা দিয়েছে, আজও আমার কাছে আপনার দেওয়া সেই পুতুলটি আছে। এবং সেই পুতুল দআমার জীবনের সবথেকে দামি উপহার। কিন্তু আমি যে আমার জীবনের অমূল্য উপহার হারিয়ে ফেলেছি তা আমি আপনার অনুপস্থিতিতে বুঝতে পেরেছি। আপনি হলেন আমার জীবনের সেই অমূল্য সম্পদ যা কোন মূল্য দিয়ে কেনা যায় না। এবং আমার সেই যোগ্যতা নেই। আর আপনি কিনা নিজের চেহারায় এই সামান্য কাঁটা সেলাইয়ের দাগের কারণে নিজেকে অযোগ্য মনে করছেন? আমাকে এত ভালবাসতে পারলেন অথচ আমার উপর এতটুকু ভরসা নেই যে এই সব তুচ্ছ জিনিসে আমি পরোয়া করিনা। ভালোবাসা হয় মন থেকে রূপ থেকে নয়। আমি আপনাকে ভালোবাসি। অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি। নিজেকে বারবার আমার জীবনের কাঁটা বলছিলেন তো আপনি? আমি যদি গোলাপ হই তাহলে অবশ্যই আপনি আমার কাটা। আপনি ছাড়া যে আমি অসম্পূর্ণ। গোলাপ ফুলে কাটা না থাকলে যে কেউই গোলাপ ফুল ছিরবার আগে ১০০ বার ভাবতো না। কিন্তু গোলাপ ফুলের কাটা আছে বলেই মানুষ গোলাপ ফুলকে ছেড়ার আগে অনেকবার ভাবে। আমাকেও কেউ কষ্ট দেওয়ার আগে এবং আমার দিকে বাজে নজরে তাকানোর আগেই আপনার ভয় কেউ এই সাহস দেখাবে না। তো আমাকে কি আপনার অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার সুযোগ দিবেন? সুখে দুঃখে আপনার পাশে থাকার সুযোগ দিবেন? বিয়ের পর আপনার সাথে ঝগড়া করার সুযোগ দিবেন? এই যে এতদিন যে আমার থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন তার জন্য আপনাকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ দিবেন? আপনাকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসা দেওয়ার সুযোগ দিবেন? নারীরা কখনো চেহারা দেখে ভালোবাসে না, আমিও আপনাকে আপনার চেহারা দেখে ভালবাসিনি বরং আপনার ব্যবহার আপনার যত্ন আপনার ভালোবাসার মোহে পড়ে ভালোবেসেছি এই কথাটি প্রমাণ করার সুযোগ দিবেন? প্লিজ দিন না আমাকে একটা সুযোগ? আমি যে নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত আপনার Little Rosebud হয়ে থাকতে চাই।"
ইফরাহ নিজের মনের কথাগুলো বহিঃপ্রকাশ করে থামলো।তার চোখ একরাশ আশা।আর রায়েদ?সে এখনো থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে।তার হাত পা কাঁপছে। এইমাত্র তার শ্রবণে আসা কথাগুলোকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে সে কোন স্বপ্নের দুনিয়াতে আছে। এমন স্বপ্নের দুনিয়া যে স্বপ্ন সেই সব সময় চাইতে পূরণ হয়। কিন্তু তার ধারনার ছেদ ঘটে যখন তার বন্ধুরা এবং ক্যাম্পাসে উপস্থিতি সবাই জোরে জোরে বলল,,,,
--"Say Yes, Say Yes."
রায়েদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শেখ ইফরাহার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লে। কম্পিত হাত ইফরাহার হাত থেকে গোলাপ ফুলের তোড়া নিল। চোখে তার পানি।এই মুহূর্তে যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো তাকে যে যে সে কি চায় তাহলে সে বলতো সে নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে ভাগ্যবান ব্যাক্তি হিসেবে ঘোষিত করতে চায় যে কিনা নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়ে গিয়েছে।
রায়েদ ফুল গুলো নিয়ে ইচ্ছে মতন চুমু খেল।যদি ইফরাহার সাথে তার কোন পবিত্র সম্পর্ক থাকত তাহলে সে এই গোলাপ ফুলকে চুমু না খেয়ে ইফরাহ কে চুমু খেত।
রায়েদ ইফরাহার দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলল,,,,
--"বিয়ে করবে আমার Little Rosebud ?"
ব্যাস এটুকুই ছিল তার প্রশ্ন। ইফরাহ কান্না করতে করতে নিজের মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল। আশেপাশে সবাই চিৎকার করে উঠলো।
রায়েদ খুশিতে দিশেহারা। অবশেষে তার Little Rosebud তার প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।সে ইচ্ছে মতন লাফাতে লাগলো এবং চিৎকার করে বলতে লাগলো,,,,,,
--"ইফরাহ শুধু আমার। সি ইজ অনলি মাইন। এন্ড আইএম অনলি হার। উই বোথ বিলং টু ইছ আদার।"