রায়াদের পাগলামি দেখে কেউ হাসছে তো কেউ মুগ্ধ হচ্ছে। একটা পুরুষ কতটা উম্মাত হলে তার শখের নারীর জন্য এমন পাগলামী করে। কয়জন মানুষ এতটা ভাগ্যবান হয়? যে তারা যাকে ভালোবাসে তাদের থেকে ভালোবাসা ফিরত পায়।এই ভালোবাসা ফিরত পেতে যে ভাগ্য নিয়ে জন্মাতে হয় এবং সবার সেই সু-কপাল যে থাকে না। পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষই কাউকে না কাউকে ভালোবাসে। নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে কিন্তু ভালোবাসলেই তো আর ভালোবাসার মানুষটিকে পাওয়া যায় না। এবং এই আফসোস নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হয়।রায়েদ তো ভেবেছিল তাকেও নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে না পাবার আফসোস নিয়ে বাকিটা জীবন পার করতে হবে। কিন্তু আল্লাহর কি মেহেরবানী আজ তার প্রিয় মানুষ নিজ থেকে এসে তাকে প্রস্তাব দিচ্ছে।আজ থেকে প্রায় ৮ বছর আগে ২০১৬ সালের ১২ই জুন তার জন্মদিনের দিন তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় রায়েদ নিজেকে অভাগা ভাবতে থাকে।অথচ ৮ বছর পর ঠিক একই দিনে একই সময়ে একই জায়গায় নিজ থেকে এসে প্রস্তাব দিয়ে রাদেয়ের ধারণা কে ভুল প্রমাণিত করল ইফরাহ।আজ আর রায়েদেথ মনে কোনো আক্ষেপ নেই।
ইফরাহ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রায়েদ কে দেখছে। নিজের চোখ যেন সরাতে পারছে না ইফরাহ। ঘামে চুপচুপে হয়ে গেছে রায়েদের সাদা পাঞ্জাবি। শরীরের সাথে একদম মিশে আছে। চোখে সবসময়ের মতোন পড়ে থাকা সাদা ফ্রেমের চশমা। কপালের সে কাঁটা দাগ।এখন তো গাল থেকে নাক পর্যন্ত সেলাইয়ের দাগ।কোই ইফরাহার কাছে তো এই ব্যক্তিটিকে একদম কুৎসিত লাগছে না। বরং তার দেখা সব থেকে শ্রেষ্ঠ এবং সুন্দর পুরুষ লাগছে।আজ যেন রায়েদের সৌন্দর্য আগের থেকে দ্বিগুণ, তিনগুণ, না না হাজার গুণ বেড়ে গেছে তার চোখে।সে যে রায়েদের মনের সৌন্দর্যের মায়ায় পড়েছে।যে ব্যক্তি নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনের চিন্তা ছেড়ে দেয় সেই ব্যক্তিকে চেহারা দিয়ে বিবেচনা করলে যে তা নিতান্তই বেমানান।মন সুন্দর না হলে চেহারা সুন্দর হলে লাভ কি।
রায়েদ পাগলের মতো লাফালাফি করে, বন্ধুদের সাথে নাচানাচি করে হাসি মুখে ইফরাহার কাছে এলো।সে ঠিক ইফরাহার সোজাসুজি দাঁড়ায়।তার চোখ ইফরাহার চোখে আটকে আছে।সে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে লাফালাফিতে সে বড্ড ক্লান্ত। ইফরাহ তা দেখে হাসলো তারপর আদেশের স্বরে বলল,,,,
--"মাথা নিচু করুন।"
তার কন্ঠে ছিল অধিকার যেন সে সম্পূর্ণ রায়েদ কে কিনে নিয়েছে।এখন সে যা বলবে রায়েদ কে তা করতে হবে। অবশ্য রায়েদই তাকে এই অধিকার দিয়েছে সে না চাইতেই।
রায়েদ মুচকি হেসে একটু ঝুঁকে গেল।রায়েদ মাথা টা নিচু করতেই তাদের মধ্যের দূরত্ব কিছুটা কমে গেল। ইফরাহ এখন চাইলে হাত বাড়িয়ে রায়েদের চেহারা স্পর্শ করতে পারবে।
ইফরাহ নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে খুব যত্ন সহকারে রায়েদের মুখের ঘাম মুছতে লাগলো। এবং তার এই যত্নে যেন রায়েদ গলে গেল।এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার Little Rosebud এর দিকে।চোখ তার ছল ছল করে উঠলো।যেন মনে হচ্ছে সে তার স্বপ্নের দুনিয়াতে আছে। এবং এইটা যদি স্বপ্ন হয় তাহলে সে কখনোই ঘুম থেকে উঠে এই স্বপ্ন ভাঙ্গতে চায় না।রায়েদ আমৃত্যু ঘুমতে চায় এমন স্বপ্ন দেখার জন্য যেই স্বপ্নে তার Little Rosebud এর অস্তিত্ব আছে।
ইফরাহ সযত্নে রায়েদের ঘাম নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিল। ঘাম মুছা শেষ হতেই তার দৃষ্টি গেল রায়েদের চেহারার সেলাইয়ের দিকে।তার খুব ইচ্ছে হলো ছুঁয়ে দিতে কিন্তু নিজের ইচ্ছে কে দমন করে কিছুটা পিছিয়ে এলো।রায়েদ ও স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়াল আবার। দুজনের ভেতর নীরবতা নিঃশ্বাস যেন কথা বলছে। আজ কতগুলো দিন পর দুজন দুজনকে দেখছে।এই কয়দিনে যে কেউই ভালো ছিল না। দুজনই দুজনের জন্য যন্ত্রণা সহ্য করেছে, পুড়েছে, রাতের ঘুম হারাম করেছে। আসলেই ভালোবাসা হতে হয় ৫০/৫০। দুপাশ থেকে সমান এফোর্ড না থাকলে সেই ভালোবাসা টিকে না। কিন্তু যদি পুরুষ মানুষ বেশি ভালোবাসে কিংবা নারী বেশি ভালোবাসে এবং পুরুষ সেই ভালোবাসা কে মুল্য দিতে জানে তাহলে সেই ভালোবাসা পূর্ণতা লাভ করেই।আর তাদের ক্ষেত্রে তো একেই তো রায়েদ বেশি ভালোবাসে তার উপর যখন ইফরাহও বেশি ভালোবাসতে শুরু করল তখন সে সেই ভালোবাসার মুল্য দিতে পেরেছে।
রাজশাহী হলো বাংলাদেশের সবথেকে পরিষ্কার শহর। এবং সেই পরিষ্কার শহরের সুন্দর রোড দিয়ে দুজন মানুষ হাঁটছে। তাদের মাঝে নিরবতা কিন্তু এই নিরবতাই যেন একে অপরের মনের কথা পড়ে ফেলছে।রায়েদ কোনো কথা বলছে না কারণ সে ঘোরে আছে। নিজের ভালোবাসা পূর্ণতা লাভের ঘোরে।আর ইফরাহ কথা বলতে পারছে না লজ্জায়। এতদিন স্বাভাবিক ভাবে থাকতে পারলেও আজ তার ভিষন লজ্জা লাগছে।নিজ থেকে প্রোপজ করেছে তাও শত শত মানুষের সামনে এইটা তো আর মুখের কথা না। এখন রায়েদের চোখে চোখ রাখতেও সাহস পাচ্ছে না।রায়েদের প্রেমময় দৃষ্টি যেন তাকে পাগল করে তুলে।
নিরবতা ভেঙ্গে রায়েদ বলল,,,,,
--"Little Rosebud কাল রেডি থেকো।কাল আসছি তোমাকে নিজের করার জন্য তোমার পরিবারের প্রস্তাব দিতে।আর যে দূরত্ব সহ্য হচ্ছে না।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাকে বিয়ে করে নিজের করব পিচ্চি।আর ভালো লাগে না এই ছাতার সিঙ্গেল জীবন এখন তো বউ, বাচ্চার প্রয়োজন।"
রায়েদের এমন কথায় ইফরাহার মুখ লাল হয়ে গেল।কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে।সে আর রায়েদের দিকে তাকালো না বরং নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগলো। রায়েদ তা দেখে মুচকি হাসলো।রায়েদের এক হাতে ইফরাহার দেওয়া গোলাপ ফুলের তোড়া এবং অন্য হাত দিয়ে ইফরাহার শাড়ির আঁচলের কোণা ধরে রেখেছে কোনো ছোট বাচ্চার মতোন। দুজন হাঁটতে হাঁটতে ইফরাহ দের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। দুজনেই থেমে গেল। ইফরাহ রায়েদের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,
--"ভেতরে আসুন।"
রায়েধ মুচকি হেসে বলল,,,,,
--" আজ না পিচ্চি। একেবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়েই আসব।আজ গেলে মন বলবে আজ কি তোমাকে বিয়ে করে ঘর জামাই হয়ে থেকে যাই।"
ইফরাহ শব্দ করে হেসে উঠলো।রায়েদ মুচকি হেসে মাথা চুলকলো। তারপর ইফরাহ রায়েদের দিকে তাকিয়ে বলল,,,
--"তাহলে আমি আসছি। অপেক্ষায় থাকবো আপনার মি আক্করা।"
এই বলে ইফরাহ এক দৌড়ে বাড়িতে চলে গেল।আর রায়েদ এভাবেই দাঁড়িয়ে রইল।তার যেন পুরো পৃথিবী এখানেই থমকে আছে।সে তো এইটাই বুঝতে পারছে না আজ রাতটা কাটবে কি করে। আজকের রাত কাটলে পরের দিন তার এবং ইফতারের বিয়ের জন্য সম্বন্ধ আনবে তারপরে বিয়ে হতে হতে তো দেরি আছে। রায়েদ যে আর অপেক্ষা করতে পারছে না।সে পারলে আজই বিয়ে করে ফেলে ইফরাহ কে।না সে আর বেশি কিছু না ভেবে বাড়ির দিকে হাটা ধরল। যদি পারে আজকে পরিবারকে ইফ্রাদের বাড়ি নিয়ে আসবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য। কিন্তু সে তো জানেই না বাড়িতে তার জন্য কি অপেক্ষা করছে।