হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ২০

🟢

রায়েদ তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরল।তার যেন তর সইছে না কখন বাড়ির সবাই কে ইফরাহ কথা বলে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ইফরাহ দের বাড়ি যাবে। কিন্তু বাড়ি গিয়ে যা দেখলো তা দেখার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বাড়ির দড়জা খুলে রাখা।রায়েদ বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল পুরো বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার। মনে হচ্ছে বাড়িতে যেন কেউ নেই।রায়েদ কিছুটা ভয় পেয়ে গেল হঠাৎ সবাই বাড়ির সবাই দরজা খুলে রেখে কোথায় চলে গেল। নাকি বাড়ির কারোর কোনো ক্ষতি হয়েছে।নাহ রায়েদ আর বেশি ভাবতে পারলো না। আস্তে আস্তে বাড়ির ভেতর যেতে লাগলো এবং নিজের মা, বাবা, দাদি কে ডাকতে লাগলো। যেই না নিজের ফোন বের করল ফ্ল্যাশ লাইট ধরানোর জন্য তার আগেই বাড়ির লাইট জ্বলে উঠলো। সবাই মিলে চিকিৎসা করে বলে উঠলো,,,,,

--"সারপ্রাইজ!!!!!"

(শুভ রাত্রি সকালে উঠে রিভিশন দিয়ে ঠিক করে দিব ভুলত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন

।)

রায়েদ অবাক হয়ে গেল। বাড়িতে সবাই উপস্থিত আছে। বাড়ি খুব সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে যেন কোন বিয়ের অনুষ্ঠান। তার বন্ধু,যত কাছের আত্মীয় আছে সবাই এখানে।তার বন্ধুরা পার্টি স্প্রে ছিটাচ্ছে তার উপর। পুরো বাড়ি হলুদ গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানো। বড় ড্রয়িং রুমে ছোট্ট বসার জন্য ব্যবস্থা আছে। সুন্দর করে বিভিন্ন রঙের জালি কাপড় দিয়ে বসার স্থান সাজানো। সামনে হলুদের থালা। এবং বসার সেই স্থানের উপরে লেখা আছে রায়েদের গায়ে হলুদ। খুব সুন্দরভাবে লেখাটি লাইটিং করা। রায়েদ যেন থ হয়ে গেল।কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছে না।সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।রায়েদের এমন অবস্থা দেখে তার মা, বাবা, দাদি এবং বন্ধুরা মিটি মিটি হাসছে। তারপর তার দাদি তার কাছে এসে বলল,,,,

--"কি হোইল দাদু ভাই? কিছু কি বুঝবার পারতাছোনা? আরে আজ তো তোমার গায়ে হলুদ এবং আজ রাতেই বিয়া।তাও ইফরাহার সাথে।কি হলো খুশি না?"

রায়েদ নিজের দাদির কথা যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।সে যাই চাইতো আজ সে একবারে সব পেয়ে যাচ্ছে।তার মনে হচ্ছে খুশিতে না সে আজ মরেই যায়।আর কি করে সব হচ্ছে সেটিও তার মাথায় ঢুকছে না।সে যে বড়ই কনফিউজড।

রায়েদের মা নিজের ছেলের কাছে এসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো,,,,,

--" এমন মেয়ে পাওয়া যে ভাগ্যের বিষয় রে রায়েদ বাবা। মেয়েটা যে তোকে বড্ড বেশি ভালোবাসে কিন্তু তা কখনো প্রকাশ করেনি।জানিস তোর প্রপোজাল কেন রিজেক্ট করেছিল? শুধুমাত্র নিজের পরিবারের কথা চিন্তা করে। এমন মেয়ে কি পাওয়া যায় বল? তুই তার চেহারা দেখতে চাসনি বলে বাড়িতে এসে তোর খোঁজ খবর নিয়ে গেছে কিন্তু তোর সামনে যায়নি। এমনকি নিজের বাবা-মাকে পাঠিয়েছে বিয়ের প্রস্তাবের জন্য। এবং তোর জন্মদিনের দিন তোকে স্পেশাল ফিল করার জন্য নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছে। আমরা ভাবলাম একটি অচেনা মেয়ে যদি তোর জন্য এত কিছু করতে পারে তাহলে আমরা কেন কিছু করতে পারবো না? তাই ভাবলাম তোর জন্মদিনের দিন আমরাও তোকে কিছু একটা উপহার দেই। তাই তাড়াতাড়ি করি সবাইকে বাড়িতে এনে আজ বিকালেই তোর গায়ে হলুদ দিব এবং রাতেই তোর ভালোবাসার মানুষের সাথে তোকে বিয়ে দিয়ে দিব।"

রায়েদের চোখে পানি চলে আসলো ‌ কিন্তু সে সবার সামনে নিজের চোখের জল ফিলতে চায় না। তাই তাড়াতাড়ি নিজের হাত দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে ফেলল এবং খুশি হয়ে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরল। রায়েদের মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন তারপর বললেন,,,,

--"বাবা আর দেরি করিস না তাড়াতাড়ি হলুদের জন্য তৈরি হয়ে আয়। তোর রুমে কাপড় রাখা আছে।"

রায়েদ আর দেরি না করে নিজের ঘরে চলে এলো। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচে চলে গেল। খুব সুন্দর ভাবে রায়েদের গায়ে হলুদ হলো। অন্যদিকে ইফরাহার ও তাই।সে অবশ্য এই সম্পর্কে আগে থেকেই জানতো কিন্তু রায়েদ কে বলেনি।আর তাই তো রায়েদের এমন বিয়ে পাগলা মার্কা কথাবার্তা শুনে হেসেছিল। তার তো খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে অবশেষে তার বিয়ে হচ্ছে তাও রায়েদের মতো পাগল প্রেমিকের সাথে।তার হলুদ অবশ্য ইশা এসেছে আর রবিন গিয়েছে রায়েদের বাড়ি।তারা দুজনও এই বিষয়ে সব জানে‌।কেবল এই বিষয় সম্পর্কে অজানা ছিল রায়েদ‌।

বিজ্ঞাপন

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা এবং সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হতে লাগলো।রায়েদ আয়নার সামনে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। পরনে তার গোল্ডেন কালারের শেরওয়ানি এবং সাদা রঙের পায়জামা। হাতে ঘরি। চোখে সবসময়ের মতোন সাদা ফ্রেমের চশমা। এবং মাথায় পাগড়ি যা মূলত বিয়েতে ছেলেরা পড়ে।আজ সে নিজেকে আয়নাতে দেখতে বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছে না। সেই অ্যাক্সিডেন্ট ঘটার পর থেকে সে নিজের চেহারা আর আয়নাতে দ্বিতীয়বার দেখেনি। কিন্তু আজ ইফরাহ যখন বলল সে এই রায়েদ কেই ভালোবাসে তখন থেকেই যেন রায়েদের সাহস, কনফিডেন্ট সব বেড়ে গেল। এখন আর কোনো ভয় নেই তার।আর না আছে নিজের চেহারা নিয়ে কোন অভিযোগ।সে যে বেঁচে আছে এটাই তো অনেক। যদি সেদিন তার কিছু হয়ে যেত তাহলে কি আর এত সুন্দর একটা দিন আছ পেত সে? নাহ কখনোই পেত না। তাইতো জীবনে যতই খারাপ কিছু ঘটুক না কেন আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে হয়। কারণ তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী। তিনি সবসময় সবকিছু ঠিক করে দেন।

________________

ইফরাহ কে সাজানোর জন্য পার্লার থেকে লোক আনা হয়েছিল। তাকে লাল রঙের লেহেঙ্গা পড়ানো হয়েছে।লালের মধ্যে গোল্ডেন কালারের স্টোন আছে। মুখে মেকাপ, চোখে কাজল, ঠোঁটে লাল রঙের গাঢ় রঙের লিপস্টিক।যেন রায়েদ কে আরো পাগল করে তোলার জন্য আজ তার এই সাজ।আরোতাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের বিয়ে পারিবারিকভাবেই হবে। তাদের কাছে কিছু আত্মীয় শুধু এসেছে।সে নিজের রুমে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগেই পার্লারের মেয়েরা তাকে সাজিয়ে চলে গিয়েছে। ইশা তার সাথে বসে আছে।তার মা কিছুক্ষণ আগে এসে তাকে মন ভরে দেখে গিয়েছে।যখন দেখল মেয়ে কেঁদে দিবে তখনি রুম ত্যাগ করল।

বাহির থেকে হোইচোই শোনা যাচ্ছে।সবাই বলা বলি করছে বরং এসেছে বর এসেছে। ইফরাহার যেন শরীরে কম্পন বয়ে গেল। মনে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। বুকের ধুপ্পুখানি বেড়ে গেল। মনে হচ্ছে এখনই বুক থেকে হার্টবিট বেরিয়ে পড়বে। অবশেষে সে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেতে চলছে যে এতদিন ছিল তার #হৃদয়ের_অগোচরে ।

রায়েদ কে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসানো হলো। তার সামনে কাজি বিয়ের পর কাগজপত্র নিয়ে বসে আছে। আশেপাশে অনেক মানুষ কেউ তো বলছে মেয়েটি নিশ্চিত টাকার জন্য এই ছেলেটাকে বিয়ে করছে। নয়তো চেহারা এরকম কাটা দাগ থাকা ছেলেকে বিয়ে করতে যাবে কেন? আবার কেউ বলছে নিশ্চিত দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসে তাই তো চেহারার পরোয়া করছে না।রায়েদ অবশ্য এইসবে কান দিল না। সে তো অপেক্ষা করছে কখন সে নিজের Little Rosebud কে দেখতে পারবে।

কাজি বলল মেয়েকে আনতে। ইফরাহার মা চলে গেল ইফরাহ কে নিয়ে আসতে।

রায়েদ দোতালার সিঁড়ির দিকে এক নজরে তাকিয়ে রইল নিজের Little Rosebud কে দেখার আশায়।তার মনে একরাশ তৃষ্ণা।অবশেষে তার মনের তৃষ্ণা মিটে গেল যখন তার পিচ্চি তার সামনে উপস্থিত হলো।রায়েদ যেন ভুলে গেছে আশেপাশে অনেক মানুষ আছে। এক নজরে নিজের হবু স্ত্রী মুখশ্রীয়ে তাকিয়ে আছে। যেন সে দুনিয়ার মানুষের পরোয়া করে না। অথচ ইফরাহ তার দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না।সে জানে রায়েদ তার দিকে তাকিয়ে আছে এবং মূলত এই কারণেই সে তাকাচ্ছে না। ইফরাহ কে রায়েদের সোজাসুজি বসানো হলো।

বিয়ে পাড়ানো শুরু হলো।কাজি যখন রায়েদ কে উদ্দেশ্য করে কবুল বলতে বললো রায়েদ কাজিকে তার কথার সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই নিজে জোরে জোরে তিনবার বলে উঠলো

--"কবুল।"

আশেপাশে থাকা সবাই হেসে উঠলো। ইফরাহ তো লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে মনে মনে ভাবছে একটা মানুষ এতটা নির্লজ্জ কি করে হতে পারে। অবশ্য এবার রায়েদ কিছুটা লজ্জা পেল।

কাজি এইবার ইফরাহ কে কবুল বলতে বললে তার যেন গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। এই সময়টা প্রত্যেকটা মেয়ের জন্য কঠিন। নিজের পরিবারকে ছেড়ে অন্য পরিবারের অংশ হতে হয়। ইফরাহার মা তার কাছে এসে তার হাত শক্ত করে ধরলো। তারপর আস্থা দিল। ইফরাহ মায়ের আস্থা পেয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে কবুল বলে দিল। অবশেষে বিয়ে সম্পূর্ণ হলো। দুজন আবদ্ধ হয়ে গেল এক পবিত্র বন্ধনে। এখন তারা ইসলামিক ভাবে এবং আইনত ভাবে স্বামী-স্ত্রী।

ইফরাহ কবুল বলার পর যখন সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো তখন রায়েদ আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে উঠে দাঁড়ালো এবং ইফরাহার সামনে এসে ইফরাহার মুখ নিজের দুহাতের মাঝে করে প্রথমে কপালে চুমু খেল তারপর ইচ্ছে মতো ইফরাহার দু গালে নাকে চোখে চুমু খেতে লাগলো। এখন আর তাদের মধ্যে কোন বাধা নেই, কোন অপবিত্রতা নেই। দুজন দুজনের জন্য হয়ে গেছে পবিত্র। রায়েদের এমন পাগলামিতে ইফরাহ যেন লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রায়েদ ইচ্ছে মতন ইফরাহার নাকে চোখে চুমু খেতে থাকে। চুমু দেওয়ার সময় তার চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি বেরিয়ে পড়ে যা ইফরাহার মুখে গিয়ে পড়ে। ইফরাহ ফিসফিস করে বলে,,,,

--"ভালোবাসি আপনাকে মি আক্করা‌।"

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প