হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ১৭

🟢

ইফরাহ ফ্রেশ হয়ে হসপিটালে ফিরেছে।যেইনা রায়েদের কেবিনে যেতে নিবে তার আগেই রবিন কেবিনে থেকে বের হয়ে ইফরাহার পথ আটকায়। ইফরাহ অবাক হয়ে রবিনের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে নিবে তার আগেই রবিন ইফরাহ কে রায়েদের করা পাগলামির কথা খুলে বলে। ইফরাহ যেন নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।ইশা তাকে এসে ধরে চেয়ারে বসায়।

ইফরাহার চোখে পানি।সে মনে মনে বলছে,,,,,,

--"কেন বার বার বাঁধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।আমি কি আপনার চেহারা অথবা স্ট্যাটাস দেখে আপনার প্রেমে পড়েছি নাকি যে আপনার চেহারাতে সামান্য দাগ থাকবে বলে আপনাকে ভুলে যাব, আপনাকে ছেড়ে দিব।যদি আপনি এমন কিছু ভেবে থাকেন তো আপনার ধারণা ভুল। একজন নারী সত্যিকার অর্থে ভালোবাসলে কখনো সেই পুরুষের চেহারা অথবা টাকা পয়সা নিয়ে বিবেচনা করে না বরং কিভাবে সেই পুরুষের সাথে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত জীবন কাটাবে সেটি নিয়ে ভাবে। নিজের ভুল ধারণা দিয়ে আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছেন আপনি মি. ইহসান রায়েদ সিকান্দার। আপনাকে তো আমি হারে হারে টের পাওয়াব। খুব শিঘ্রই বুঝতে পারবেন আমার ভালোবাসা ফেলনা না, এত সস্তা না। শুধু একবার বিয়ে করি আপনাকে তারপর এই কাজের জন্য আপনাকে এমন শাস্তি দিব যে কখনোই এই চিন্তা মাথায় আনার সাহস পাবে না।"

ইফরাহ মনে মনে কথা গুলো বলে নিজের চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ালো। তারপর রায়েদের কেবিনে সামনে গিয়ে জোরে জোরে বলতে লাগলো,,,,,

--"ঠিক আছে রবিন স্যার। আমি চলে যাচ্ছি এইখান থেকে। আমার কারণে যেহেতু স্যারের এই অবস্থা সেহেতু আমার এইখানে থাকার কোনো‌ মানেই নেই। পারলে আপনার স্যার কে বলবেন আমাকে ক্ষমা করে দিতে। আমি কখনোই উনাকে নিজের মুখ দেখাবো না। যদি উনাকে নিজের মুখ দেখাই তাহলে আমার নাম মিস. আনায়াহ ইফরাহ না। বরং মিসেস আনায়াহ_ইফরাহ।রায়েদের মিসেস।"

ইফরাহ কথা গুলো বলে থামলো কিন্তু শেষের বলা কথাগুলো সে মনে মনে বলল যাতে কেউই শুনতে না পারে।তার মনে কি চলচে শুধু মাত্র সেই জানে।

রায়েদ কেবিনের ভেতর থেকে ইফরাহার বলা কথাগুলো শুনছিল। প্রত্যেকটি কথা যেন তার কলিজার এসে বিধলো।সে তা তার Little Rosebud কে অপবাদ দিতে চাইনি। কিন্তু সে বাধ্য হয়েছে। নয়তো তার পিচ্চি তার কাছে থেকে নিজেকে সরিয়ে নিবে না।রায়েদ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজে নিজে বলতে লাগলো,,,,,

--"আইম সরি Little Rosebud কিন্তু আমার যে আর কিছুই করার ছিল না। তুমি যে পবিত্র ফুল।আমি কি করে তোমার পথে কাঁটা হবো? আচ্ছা মানলাম এখন না হয় আমি তোমার জীবনে আসলাম তোমাকে নিজের স্ত্রী বানালাম কিন্তু কয়েক বছর পার হতেই তো আমি বৃদ্ধ হতে লাগবো।তার উপর আবার চেহারার থাকবে দাগ।তখন যদি তোমার আফসোস হয় আমাকে বেছে নেওয়ার জন্য? তখন যে আমি তা মেনে নিতে পারব না। না পারবো তোমার থেকে দূরে সরে যেতে আর না পারবো তোমাকে আফসোস করতে দেখতে। তার থেকে ভালো তোমার জীবনের সাথে নিজেকে জড়াবোই না। তুমি হাসি খুশি থেকো সুখে থেকো এবং তোমার সুখ দেখে আমি বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিব।"

______________________

আজ তিন দিন হলো রায়েদের সাথে ইফরাহার কোনো দেখা সাক্ষাৎ নেই।রায়েদ কে একদিন হসপিটালে রেখে তারপর রিলিজ করে দেওয়া হয়েছিল। রবিন এবং ইশা মিলে রায়েদ কে রাজশাহী তার বাড়িতে নিয়ে আসে।রায়েদের এই অবস্থা দেখে তো তার পরিবার অনেক ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু রবিন মিথ্যা বলে যে এটি এক্সিডেন্ট এর কারণে ঘটেছে। মূলত রায়েদ তাদেরকে মিথ্যা বলতে বলেছিল। নয়তো তার পরিবার বেশি চিন্তিত হবে।

রায়েদ নিজের বিছানায় পা সোজা করে বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। হাতে তার গিটার। চোখের সামনে ভাসছে ইফরাহার চেহারা।রায়েদ কি আদৌও ভুলতে পারবে ইফরাহ কে? ইফরাহ তো মনে হয় রায়েদ কে ভুলে গিয়েছে।তাই তো রায়েদ একবার বলাতেই আর রায়েদের কোনো খোঁজ খবর নিতে আসেনি। একবার হলেও তো দেখতে আসতে পারতো।রায়েদের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। সে মনে মনে বলে,,,,,

--"যেই সম্পর্কের কোন ভবিষ্যৎ নেই সেই সম্পর্ক নিয়ে মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। আসেনি তাতে ভালই হয়েছে। আর আসলেই তো আর আমি তার সামনে যেতাম না। নিজের এই কুৎসিত চেহারা তাকে দেখাতাম না। তার থেকে ভালো সেই আসেনি। কিছু কিছু ভালোবাসার পরিণতি অপূর্ণতা লেখা থাকে।"

রায়েদের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়বার আগেই সে মুছে ফেলে। তখনি Momo এসে তার কোলে লাফ দেয়।রায়েদ মুচকি হেসে Momo এর শরীরে হাত বুলিয়ে দেয়।Momo রায়েদের আদর পেয়ে চুপচাপ রায়েদের কোলে বসে থাকে। রায়েদ গিটার নিয়ে টুংটাং শব্দ করে গানের লাইন ধরে,,,

--"Milke bhi hum na mile

tum se na jaane kyun

Meelon ke hai faasle

Tum se na jaane kyun

Anjaane yeh silsale

Tum se na jaane kyun

Sapne hai Palkon thale

বিজ্ঞাপন

tum se na jaane kyun...

Kaise batayein kyun tujhko

chahe yaara bathaa na paaye

Baatein dilo ki dekho jo

baaki aankhein tujhe samjhaye

Tu jaane na... tu jaane na...

tu jaane na... tu jaane na."

_____________________

ইফরাহ নিজের রুমে বসে ফন্দি আঁটছে কি করে রায়েদ কে নিজের করবে। রায়েদ কে তো সে নিজের করেই ছাড়বে। এবং এইবার যদি রায়েদ মেয়েদের মতন ন্যাকামি করে বলে আমি কুৎসিত তাহলে ইফরাহ বড় ছোট কিছু না মেনে রায়েদ কে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ভেঙ্গে ফেলবে।

ইফরাহ অনেক কষ্টে রায়েদের পুরোনো ফ্রেন্ডদের নাম্বার সন্ধান করেছে। এবং কিছুক্ষণ আগে তাদের সাথে কথা বলে নিজের প্লেন বলেছে।তারা শুনে তো খুব খুশি।আর তাদের সাহায্য ছাড়া ইফরাহ একা কিছুই করতে পারবে না।এই তিনদিনে যে ইফরাহ খুব ভালো ছিল বিষয় টা মোটেও তা নয়। ইফরাহার ও কম কষ্ট হয় নি রায়েদ কে একবার চোখের দেখা না দেখায়।সে তো সেইদিন হসপিটালে থেকে সোজা বাসে করে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে রাজশাহী চলে এসেছিল। সারাটা রাস্তা কান্না করতে করতে কাটিয়েছে। বাড়িতে আসলে তার মা বাবা তার চোখ লাল দেখে যখন জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে ইফরাহ সব খুলে বলে। এমনকি রায়েদ কে ক্লাস নাইন থেকে চিনে, রায়েদ তাকে ৮ বছর আগে প্রোপজ করেছিল, সে কি কারণে প্রত্যাখ্যান করেছিল সব বলে। এবং এখন তাকে বাঁচানোর জন্যই রায়েদের এই অবস্থা এইটাও বলে।তার বাবা মা তো অবাক। একটি ছেলে তাদের মেয়েকে এতটা ভালোবাসে অথচ তাদের মেয়ে শুধুমাত্র তাদের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালনের জন্য নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আসলেই এমন মেয়ে পেলে কোনো বাবা মায়ের ছেলের প্রয়োজন হয় না। তারপর আরকি তারা তো ইফরাহ কে বলে বিয়ে করলে এই ছেলেকেই করতে আর ইফরাহ তার বাবা মা কে অপেক্ষা করতে বলে সে সময়মতন সব ঠিক করে দিবে।

ইফরাহ সেই পুতুলটি হাতে নিয়ে বলে উঠে,,,,,,

--"এইতো আজ ১০ই জুন আর ১২ই জুন আপনার জন্মদিন। আর কিছুদিনের অপেক্ষা মি. আক্করা তারপর আপনি শুধু আমার। আট বছর আগে আপনার জন্মদিনের দিন আপনার প্রপোজাল প্রত্যাখ্যান করেছিলাম এবং আট বছর পর আপনাকে নিজ থেকে প্রপোজ করবো আমি। অনেক জ্বালিয়েছি আপনাকে তাই না?তাই তো এখন নিজের মুখ পর্যন্ত দেখান না আমাকে।তাই তো এখন আপনাকে এক নজর দেখার জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। জ্বালান,পোড়ান যা ইচ্ছা করুন। আমাকেও তো নিজের কর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।তাই তো আপনার বাড়িতে গিয়েও আপনার সাথে দেখা করার ভাগ্য হয়না।"

ইফরাহ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। এইতো যেদিন রায়েদ কে রাজশাহী আনা হয়েছিল সেইদিনই ইফরাহ রায়েদ দের বাড়ি চলে গিয়েছিল।রায়েদের দাদি তো ইফরাহ কে দেখেই চিনে ফেলেছিল।রায়েদর মা বাবারও ইফরাহ কে অনেক পছন্দ হয়।তারা যখন ইফরাহ কে বলে রায়েদের রুমে গিয়ে দেখা করে আসত তখন ইফরাহ প্রতি উত্তরে বলেছিল,,,,,

--" আপনাদের ছেলে আমার উপর অভিমান করেছে।সে ভাবছে তার চেহারায় দাগ হয়েছে বলে এখন সে আমার যোগ্য না।তাই এখন আর আমি তার সামনে যাব না। সময়মতো আসবো। আপনারা শুধু আমাকে সাহায্য করুন এবং উনাকে বলবেন না যে আমি এসেছিলাম।"

রায়েদের পরিবারে ইফরাহার কথা শুনে রাজি হয়ে যায়।আর রায়েদর মা তো ইফরাহ কে নিজের গলা থেকে সোনার চেইন খুলে পড়িয়ে দিয়েছিল এবং বলেছিল,,,,,

--"এই চেইন আমার শাশুড়ি কে তার শাশুড়ি দিয়েছিল এবং আমাকে আমার শাশুড়ি দিয়েছিল।আর আজ আমি তোমাকে দিলাম।আশা করি তুমি এইটার মর্ম রাখতে পারবে আর ছেলে কে ভালো রাখবে।"

ইফরাহ চেইনটা কে চুমু খেয়ে বলেছিল,,,,,,

--"আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। শুধু আপনি দোয়া করবেন।"

সেইদিন ইফরাহ সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিল।রায়েদের সাথে দেখা করেনি আর না জানতে দিয়েছে সে এসেছিল।অথচ অন্যদিকে রায়েদ ভাবছে তার Little Rosebud তার তার কথা ভাবে না। তাকে না কখনো ভালোবেসে ছিলে না বাসে আর না কখনো বাসবে। আর ইফরাহ তাকে প্রকাশ করা ছাড়া ভালোবেসে যাচ্ছে। ইফরাহ আনস্পোকেন লাভ।না বলা ভালোবাসা।যা আছে শুধু #হৃদয়ের_অগোচরে

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প