হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ২৮

🟢

ইফরাহর মন তেমন ভালো না। একেই তো বাড়িতে এত কিছু ঘটে গেল তার উপর নিজের মা বাবার কথা তার খুব মনে পড়ছে। মানিয়ে নিতে যত যাই হোক সময় লাগবে তার।আর আজকে বলতেও পারছে না বাড়িতে যাওয়ার কথা। ইফরাহ তার পায়ের রানের উপর ঘুরিয়ে থাকা রায়েদের দিকে একবার তাকালো। ঘুমালে একদম নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতোন লাগে। ইফরাহ রায়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো একা একা বলতে লাগলো__

আসলে আমি ভাগ্যবতী যে আপনার মতোন একজন স্বামী পেয়েছি।এই লোকটাই তো আমাকে পাগলের মতোন ভালোবাসে। অথচ আমাকে ভালোবাসেও আমার থেকে দূরে থেকে কতগুলো বছর পার করে দিল।জোর করবার কথা মনেও আনল না।আর না আমাকে ভুলে যাওয়া কথা মাথায় এনেছে। আসলে পুরুষ মানুষের ভালবাসা ভীষণ সুন্দর এবং ভয়ংকর। পুরুষ মানুষ নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য সবকিছু করতে পারে।যে কোনো পর্যায়ে যেতে। আমাকে বাঁচানোর একবার অন্তত নিজের কথা ভাবতে পারত। কিন্তু না উনি তা করেন নি বরং আমাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দিয়যেছিলেন। একবারও ভাবেন নি উনার কিছু হয়ে গেলে আমার বাঁচা মুস্কিল হয়ে যেত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই বোঝ নিয়ে বাঁচতে হতো যে আমার জন্য আপনি আমার থেকে দূরে চলে গেলেন। অথচ আমি আপনাকে আপনার প্রাপ্য ভালোবাসাটা পর্যন্ত দিতে পারিনি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আপনি সুস্থ আছেন এবং আমার হয়ে আছেন। বিশ্বাস করেন রায়েদ আমি যে আপনাকে কতটা ভালবাসি তা আমি কখনো বলে বোঝাতে পারবো না।আজ থেকে নয় বরং যখন আপনাকে প্রথমবার দেখেছিলাম তখন আপনাকে আমার চোখে ধরেছিল।২০১৪ সালের ১২ই জুন যখন ফুসকা খাওয়ার জন্য ফুসকা স্টোরে দেখলাম তখন সেখানেই পা থকমে গিয়েছিল আপনাকে দেখে।ঝালে আপনার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছিল।মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল।কি নাজেহাল অবস্থাই না ছিল আপনার। দেখে ভীষণ হাসি পেয়েছিল।তাই তাড়াহুড়ো করে আপনাকে পানি দিলাম। দিনটা কখনোই ভুলব না আমি রায়েদ।তখন অবশ্য আপনাকে ভালোবাসিনি আমি, শুধু আপনাকে ভালো লেগেছিল। সেইদিনে পর মাঝে মাঝেই আপনার চেহারা প্রায় চোখের সামনে ভেসে উঠত। কিন্তু বয়স কম থাকায় এইসবে যদি জড়িয়ে পরি সেই ভয়ে সব চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন আমার জন্য আপনি দাদিমা সেজেছিলেন উফ্ফফ কি বলব তখন আপনার সেই লুকে আমি ফিদা হয়ে গিয়েছিলাম।আমার জন্যও কেউ এমনটা করতে পারে তা আমার জানা ছিল না।আর যখন আপনি আমাকে প্রপোজ করেছিলেন তখন না চাইতেও খুব ইচ্ছে করছিল আপনার প্রস্তাবে সাড়া দিতে রায়েদ। কিন্তু আমি আমার পরিবারের একমাত্র মেয়ে।মা বাবার প্রতি সব থেকে বড় দায়িত্ব আমার। আমি অন্য কোনো মেয়ের মতন কোনো পুরুষের উপর ডিপেন্ড হতে চাই না। বরং পুরুষের পায়ে পা মিলিয়ে চলতে চেয়েছিলাম।মা বাবার খেয়াল রাখতে চেয়েছিলাম যাতে তাদের কখনো কোনো ছেলের অভাব না হয়‌।তাই তো আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো আপনি সময়ের সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিবেন। এতগুলো বছরে আপনার কথা মনে পড়েনি আমার। উহু, একবারও মনে পড়েনি। পড়বেই বা কি করে? আপনাকে তো আমি কখনো ভুলতেই পারিনি। কিন্তু এইটাও ভাবতে পারিনি যে আপনি আমায় মনে রাখবেন।আমাদের আবার সাক্ষাৎ হাওয়া যেন ছিল স্বপ্নের মতোন। কিন্তু নিয়তির কাছে এসে ধরা পড়েই গেলাম।আর এইযে আপনার Little Rosebud আপনার হয়ে গেল।আর আমার মি. আক্করা আমার হয়ে গেল।

কথাগুলো বলে ইফরাহ রায়েদের মুখের উপর ঝুঁকে কপালে চুমু খেল। ইফরাহার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল‌ রায়েদের চেহারার উপর। হয়তো খুশির অশ্রু ছিল।রায়েদের চোখে পানি পড়াতে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।সে আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখল তার Little Rosebud একদম তার নিকটে।চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।রায়েদ তা দেখে হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসলো।সে উঠার সময় ইফরাহও উঠে সঙ্গে সঙ্গে চোখের পানি মুছে ফেলল।রায়েদ ইফরাহার দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইফরাহার বাহু জোড়া নরম ভাবে ধরে শান্ত কন্ঠে শুধালো_________

Little Rosebud কি হয়ে সোনা আমার?মা বাবার কথা মনে পড়ছে?

ইফরাহ যেন গলে গেল এবং রায়েদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।রায়েদও তার পিচ্চি কে আগলে নিল। ইফরাহ রায়েদের বুকে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদছে।রায়েদও তাকে কাঁদতে দিচ্ছে। এভাবেই কিছুক্ষণ সময় পার হয়ে গেল।রায়েদ ইফরাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত কন্ঠে বলল____

Little Rosebud কান্না থামাও এখন জান। পাগলী এত কান্না করার কি আছে হুম? তোমার মা বাবা তো আজ আসছে।

ইফরাহ যেন অবাক হলো।রায়েদের বুক থেকে মাথা তুলে কান্না জড়িত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল____

মা বাবা আসছে মানে?

বিজ্ঞাপন

রায়েদ মুচকি হেসে ইফরাহার চোখের পানি খুব যত্ন সহকারে মুছে দিয়ে বলল____

আমি তখন ঘরে এসে আগে তোমার বাবা কে কল দিয়েছিলাম এইটা জানাতে যে আজ আমরা আসব। কারণ আর যাই হোক আমার জন্য তো আর আমার পিচ্চি কে আমি কষ্ট পেতে দিতে পারি না আমি। কিন্তু তোমার বাবা বলল আজ তাদের তোমার নানু বাড়ি যেতে হবে। তোমার নানু নাকি অসুস্থ আর তোমার মারও মন খারাপ তুমি নেই বলে তাই উনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ তোমার নানু বাড়ি যাবে।তাই আমি বললাম সকালে আমাদের বাড়ি এসে পড়তে তারপর না হয় দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে তোমার নানু বাড়ির উদ্দেশ্যে যাবে।

রায়েদের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে যেন ইফরাহার মুখে হাসি ফুটে উঠল।সে খুশিতে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উত্তেজিত হয়ে বলল___

উফ্ আপনি যে কত ভালো।আই লাভ ইউর।

বলেই রায়েদের দিকে ঝুঁকে তার মুখশ্রীতে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিল।রায়েদ ইফরাহার বাচ্চামোতে হেসে উঠলো।সে তো এইটাই চায় যে তার Little Rosebud সবসময় এমনই থাকুক।

ইফরাহ আবার দাঁড়িয়ে বলল___

ধ্যাত আপনি আসলেই অনেক খারাপ। আমাকে আগে বললেই পারতে। রান্নাবান্নাও তো করতে হবে।মা, বাবা এবং দাদি কেউ তো জানাতে হবে নাকি?তা না নিজে ষাঁড়ের মতন পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিলেন। আসলেই আপনি বিরক্তিকর ব্যক্তি এরজন্যই আপনাকে আমার একটুও ভালো লাগে না। যতসব।

এই সব বলছ ইফরাহ হনহনিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল।রায়েদ বেকুব হয়ে বসে রইল। একটু আগেই তাকে আই লাভ ইউ বলল আবার এখন তাকে যতসব বলে চলে গেল।রায়েদ কি আদৌও তার পিচ্চি কে সামলাতে পারবে?এই সব ভেবে রায়েদ একা একাই শব্দ করে হেসে উঠলো।

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প