হৃদয়ের অগোচরে

পর্ব - ২৭

🟢

সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে ঈশিতার দিকে।রায়েদ যেন বাকরুদ্ধ।সে আস্তে আস্তে ঈশিতার দিকে এগিয়ে গেল। সবাই রায়েদের দিকে তাকিয়ে আছে।রায়েদ ইশিতার নিকটে গিয়ে আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল___

কেন এমন করলি তুই? তোকে তো কম ভালোবাসি নি রে আমি ঈশিতা‌। সবসময় নিজের বোনের মতোন দেখেছি।আর তুই আমার সবথেকে প্রিয় জিনিস কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলি? ইফরাহ কি করেছে তোর বল?

শেষের কথা রায়েদ জোরে চিৎকার করে বলল। সবার চোখেই পানি।

ঈশিতা ইফরাহার দিকে ঘৃণা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে শুরু করল____

হ্যাঁ হ্যাঁ আমি করেছি এই জঘন্য কাজ।আর সব দোষ শুধু এই মেয়েটার। ইফরাহার জন্য সব কিছু ঘটেছে। ওকে কে বলেছিল আমাদের মাঝে আসতে? যখন থেকে বুঝতে শুরু করেছিলাম তখন থেকে তোমাকে ভালবাসতাম। তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু ও আমার জায়গা নিয়ে নিল। তাই ওকে আমি শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং আমার মনে হয় না যে আমি কোন দোষ করেছি। আর আমি তোমাকে তো পাহাড় থেকে ফেলতে চাইনি।আমি ওকে ফেলে দিতে চেয়েছিলাম। তোমার জীবন থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলাম ।আমার কথার কাটা সে যা সরিয়ে ফেলে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি এসে ওকে বাঁচিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দিলে। ওর প্রতি তোমার এই ভালোবাসা আমি ঘৃণা করি।

রায়েদ ঈশিতার বলা কথাগুলো শুনে ভারসাম্য হারিয়ে দু কদম পিছিয়ে গেল। ইফরাহ দৌড়ে এসে রায়েদের হাতের বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো।রায়েদ অশ্রুসিক্ত নয়নে ইফরাহার দিকে তাকালো। ইফরাহ তাকে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করে শান্তনা দিল।

এইসব যেন ঈশিতার ভেতর জ্বলতে থাকা আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতন।সে আবার অস্থির হয়ে বলতে শুরু করল__

এই এই এই মেয়ে সব নষ্টের মূল নয়ত নয়তো আমি আমি সত্যি তোমাকে অনেক ভালোবাসতাম রায়েদ।এই মেয়ের জন্য এইসব হয়েছে। ওকে ওকে তো আমি আমি শেষ করে দিব।

এই বলে যেই না ঈশিতা ইফরাহার দিকে এক পা এগোল উমনি এক শক্ত হাতের চড় এসে লাগলো তার গালে। সঙ্গে সঙ্গে ঈশিতা অনেকটা পিছিয়ে গেল।গাল তার জ্বলছে। ফর্সা গাল লাল হয়ে গেছে। ঈশিতা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে থাপ্পড় দেওয়া ব্যক্তিকে দেখে কম্পিত কন্ঠে আউড়াল__

ডেড।

থাপ্পড় টি ঈশিতার বাবা দিয়েছে।সবাই অবাক যেই মানুষ কখনো নিজের মেয়ের ওপর হাত তোলা তো দূরের কথা চোখ গরম করে পর্যন্ত কথা বলেনি সেই মানুষটি নাকি আজ নিজের মেয়েকে থাপ্পর দিয়েছে তাও ঘর ভর্তি মানুষের সামনে। ঈশিতার মাও আজ বাঁধা দিল না নিজের স্বামী কে। তার শিক্ষা দানের ত্রুটি ছিল বলেই আজ তার মেয়ে এত বড় অপরাধ করেছে।তিনি শুধু নিঃশব্দে কেঁদে গেলেন।

ঈশিতা যেই না কিছু বলতে যাবে এহেন মূহুর্তে তার বাবা আরেকটি থাপ্পড় দিল। ঈশিতা তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল। কেউ তাকে ধরলো না পর্যন্ত।

ঈশিতার বাবার চোখে পানি। কিন্তু তিনি নিজেকে ধাতস্থ করে বলতে লাগলেন__

ছোট থেকে যখন তুই জেদ ধরতি তখন তোর জেদ কে প্রশ্রয় না দিয়ে যদি এই থাপ্পড় দিতাম তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না আমার। এতটা নিচে নামতে পারলি তুই? শেষমেষ কিনা কাউকে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজ করতে চেয়েছিল? তোর হাত কাঁপল না? বিন্দু মাত্র লজ্জা, অনুশোচনা নেই ? আমার ঘৃণা হচ্ছে তোকে নিজের মেয়ে বলতে।

ঈশিতা যেন আর নিজে কে ধরে রাখতে পারলো না।সে চিৎকার করে কান্না করতে লাগলো।সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঈশিতা কান্না করতে করতে বলল___

এই অসভ্য মেয়ের জন্য সবকিছু হয়েছে। নয়তো সব ঠিক ছিল। প্রথমে আমার কাছ থেকে আমার রায়েদ কে কেড়ে নিয়েছে এবং এখন আবার নিজের পরিবারকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে এই মেয়েকে আমি শেষ করে দিব। আমি তো ভালবাসতাম রায়েদ কে। তাহলে সে কেন এলো আমাদের মাঝে।

ঈশিতার বলা কথাটুকু শেষ হতে না হতেই রায়েদ হুংকার দিয়ে বলল___

এই মেয়ে আমার স্ত্রী। বারবার আমাদের মাঝে আমাদের মাঝে কি করছিস? আমাদের মাঝে এমন কোন সম্পর্ক ছিল না যার মাঝে আমার ইফরাহ এসেছে। আমি তো তোর সব সময় নিজের ছোট বোনের মত যত্ন নিয়েছি। এর থেকে বেশি আমার তরফ থেকে কিছু ছিল না। আর এতোই যদি আমাকে ভালবাসতি তাহলে পাহাড়ে কেন আমাকে রেখে চলে এসেছিলি? কোই ইফরাহ তো আসেনি। হসপিটালে গিয়েও কেন চলে এসেছিলি? জবাব দে।

ইশিতা কেঁপে উঠল রায়েদের হুংকারে।সে কান্না জড়িত কন্ঠে বলতে শুরু___

পাহাড় থেকে পালিয়ে এসেছিলাম কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। আর হসপিটালে গিয়ে যখন তোমার চেহারা দেখলাম তখন আর তোমাকে ভালো লাগেনি আমার। তুমি আগে যেরকম হ্যান্ডসাম ছিলে তোমার গাল থেকে নাকে সেলাই করার কারণে এখন একই রকম লাগলো না দেখতে। তো আমি কি করতাম তখন? তাই সেখান থেকে পালিয়ে আসি এবং রাজশাহী এসে পড়ি এবং পরিবারসহ কক্সবাজারে চলে যাই। ভেবেছিলাম কক্সবাজার থেকে এসেই আবার ফিডল্যান্ড চলে যাব। কিন্তু যখন শুনলাম তুমি বিয়ে করেছ তাও আবার এই মেয়েটিকে তখন আর সহ্য করতে পারলাম না। এই মেয়েটির জন্য তোমাকে চেহারার এই অবস্থা নয়তো আমি ঠিকই তোমাকে বিয়ে করতাম তোমাকে নিয়ে সংসার করতাম। যেখানে আমি পারলাম না তোমাকে বিয়ে করে সংসার করতে সেখানে এই মেয়েকে কি করে দিব তোমার সাথে সংসার করতে? তাই এখানে এসেছিলাম ঝামেলা বাজাতে কিন্তু এই মেয়ে সব নষ্ট করে দিল প্রথমে তোমাকে কেড়ে নিল এখন আবার আমার কাছ থেকে আমার পরিবার কেড়ে নিল।

বিজ্ঞাপন

রায়েদ যেন বাক্য হীন হয়ে গেল। তার চেহারায় সামান্য সেলাই করার দাগ থাকবে বলে ঈশিতা চলে এসেছিল। আর এইটাকে নাকি ঈশিতা নিজের ভালোবাসা বলছে? অথচ ইফরাহ কে সে এখান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল যাতে ইফরাহ তাকে ঘৃণা করে তার সামনে আর কখনো না যায়। অথচ ইফরাহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষ ভর্তি ভরা মাঠে তাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিল।

ইফরাহ যেন এতক্ষণ যাবৎ চুপ করে থাকলেও এখন রায়েদের চেহারা নিয়ে কথা বলায় সে আরা চুপ করে থাকতে পারলো না। সে কঠিন কন্ঠে ঈশিতাকে বলল___

আমার স্বামীর চেহারা নিয়ে আরেকটি কথাও বলবে না তুমি। তোমার কারনে আজ ওর এই অবস্থা হয়েছে। আর যেটাকে তুমি ভালোবাসা বলছো সেটা কখনো ভালোবাসা না। তাই দয়া করে নিজের কুৎসিত মনে আমার স্বামীর জন্য যেই অনুভূতি তৈরি হয়েছিল সেই বিষাক্ত অনুভূতিকে ভালোবাসা বলে ভালোবাসা নামক পবিত্র জিনিসকে অপবিত্র করোনা প্লিজ। ভালোবাসা কখনো কারোর চেহারা দেখে হয় না। এই যে দেখছো এই মানুষ আমার স্বামী আমি যখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়তাম তখন আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু নিজের পড়ালেখা এবং পরিবারের কথা ভেবে আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আটটি বছর আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। ৮ বছর পর যখন আমাদের দেখা হয়েছে আমাকে একটু অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে চাপের মুখে ফেলেনি। আর আমাকে প্রপোজ করার আরো দুই বছর আগ থেকে সে আমাকে ভালোবাসতো তারমানে মোট ১০ বছর এই লোকটি আমাকে ভালোবেসে গেছে। এমন মানুষটিকে কিনা তুমি চেহারা দিয়ে বিবেচনা করছো? এই তোমার ভালোবাসা? তুমি যদি সত্যি কারে ভালোবাসতে কখনোই এমন কাজ করতে না।

সবাইর চোখেই পানি।রায়েদের মা বাবা এবং দাদি বুঝতে পারছে তারা কতো ভালো কাজ করেছে নিজের বাড়ির ছেলের জন্য ইফরাহ কে এনে।

রায়েদ ইফরাহার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ইফরাহ বুঝল রায়েদ অনেক আঘাত পেয়েছে।

হঠাৎ ইশিতার বাবা বলে উঠলো___

আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিবেন। আমরা যদি ওকে ছোটবেলা থেকে ঠিক মতন শাসন করতাম তাহলে কখনোই এমন দিন আজ দেখতে হতো না। ভাববেন না আমাদের আদরের মেয়ে বলে ওকে শাস্তি দেবো না। আমি পুলিশকে কল দিয়ে ফেলেছি। কিছুক্ষণের ভেতরে ওকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে।

সবাই অবাক। ইশিতা কান্না করতে করতে বলল___

ডেড তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না। আমি তো তোমার প্রিন্সেস তাই না। মম তুমি ডেড কে কিছু বলছো না কেন? দেখছো না ডেড এই ফালতু মেয়ের জন্য আমাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিচ্ছে। মম প্লীজ হেল্প মি‌।

ঈশিতার মা নিজের স্বামীর কাছে গিয়ে বলল__

চলুন আমরা ফিরে যাই।এই মেয়ের মুখ আমি আর দেখতে চাই না। কিন্তু মা তো যদি ওকে পুলিশ আ্যরেস্ট করে নিয়ে যাওয়ার সময় মনে মমতা তৈরি হয় তখন হয়তো আমিও তার মত কোন অপরাধ করে ফেলব। তার থেকে ভালো আমরা চলে যাই।

ঈশিতার বাবা নিজের স্ত্রীর কথাই সাহেব সানাই এবং সবার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে চলে যায়। কিছুক্ষণের ভেতর পুলিশ এসে পড়ে। রবিন আর রায়েদ সকল ফর্মালিটি পূরণ করে। ঈশিতা এখনো ফ্লরে পরে আছে। হয়তো বুঝতে পেরেছে সে কত বড় ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু সময় যে চলে গিয়েছে। কথায় আছে না সময় আর স্রোত কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তার বেলাতেও ঠিক এটি ঘটেছে।

লেডি পুলিশ এসে তাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে গেল। রবিন আর ইশা ইফরাহার সাথে কথা বলে চলে গেল।রায়েদের মা বাবাও নিজেদের রুমে চলে গেলেন। ইফরাহ দাদি কে তার রুমে রেখে এসে দেখল রায়েদ নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে। সকালে কারোর কিছুই খাওয়া হলো না। ইফরাহ মনে করল রায়েদ কে কিছুটা সময় দেয়া উচিত তাই সে রুমে না গিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে।

মোটামুটি আগে থেকেই সে রান্না পারে। তাই সকালে সবার জন্য সাধারণ কিছু রান্না করে নিল। তার হাবভাব এমন যেন সে এই বাড়ির নতুন বউ না বরং মেয়ে। অবশ্য বাড়ির প্রত্যেকটি সদস্য যদি তাকে এমন অনুভব করায় তখন এতে তার কোন দোষ থাকে না। সে সকলের জন্য শুকনা রুটি আলু ভাজা এবং ডিম পোচ করে খাবার প্লেটে সাজিয়ে প্রথম চলে গেল নিজের শশুর শাশুড়ির ঘরে। তাদেরকে খাবার দিয়ে, কিছুক্ষণ সান্তনা দিয়ে তারপর খাবার নিয়ে চলে গেল দাদির ঘরে।দাদি কে খাবার খাইয়ে সকালের ওষুধ খাইয়ে তারপর নিজের এবং রায়েদের খাবার নিয়ে চলে এলো নিজের ঘরে।

দেখল রায়েদ সোফায় নিজের দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে। ইফরাহ হাতে থাকা ট্রে টি টেবিলের উপর রেখে সোফার দিকে অগ্রসর হলো।রায়েদ ইফরাহার উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলে তাকালো। ইফরাহ রায়েদের পাশে এসে বসতে রায়েদ ইফরাহার পায়ের রানে মাথা রেখে নিজের পা জোড়া সোজা করে সোফায় শুয়ে পড়ল। ইফরাহ নিঃশব্দে রায়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। দুজনের মধ্যেই পিন পতন নীরবতা।

হঠাৎ নিরবতা ভেঙ্গে ইফরাহ বলল___

আমার দেখা শ্রেষ্ঠ সুন্দর পুরুষ হলেন আপনি রায়েদ। আপনার মতোন সুন্দর মনের পুরুষকে আমি আমার জীবনে কখনো দেখিনি। আপনাকে পেয়ে আমি পূর্ণ হলাম। আপনি আমার জীবনের না আসলে আমি জানতামই না যে ভালোবাসা কাকে বলে। আমার হৃদয়ের অগোচরে যে ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল তা কখনোই প্রকাশিত হতো না। আপনি বিহীন আমি কিছুই না। আপনাতে আটকে আছে আমার সর্বস্ব। তাই নিজেকে নিয়ে অথবা নিজের চেহারা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার Little Rosebud তো আছে তাই না?

এই বলে ইফরাহ রায়েদের দিকে নিজের মাথা ঝুঁকিয়ে কপালে চুমু খেল।রায়েদ চোখ বন্ধ করে রাখল।চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল‌। ইফরাহ তা নিজের ঠোঁট শুষে নিল।

রায়েদ ইফরাহার চোখে চোখ রেখে আদুরে গলায় বলল __

অনেক ভালোবাসি তোমায় Little Rosebud.

বিজ্ঞাপন
হৃদয়ের অগোচরে গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প