ইশা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। ঈশিতার ইশা কে চিনতে সময় লাগলো না।ইশা ইফরাহার কাছে দৌড়ে গিয়ে বলল__ নিচে চলো রবিনের কাছে প্রমাণ আছে।
ইফরাহ ঈশিতার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল__
চলো আপু নিচে আস।সবার সামনে বলি।
ঈশিতা ভয়ে পেলেও প্রকাশ করল না। কারণ ইফরাহার কথা রায়েদ বিশ্বাস করলেও পরিবারের বাকিরা করবে না।আর তার যতটুকু ধারণা তাকে যেহেতু কেউ দেখেনি তাহলে হয়তো তেমন কোনো প্রমাণ নেই। এই সব ভেবে ঈশিতা কঠোর কন্ঠে বলে উঠলো__
হ্যাঁ হ্যাঁ চলো। আমি কি ভয় পাই নাকি? আমিও দেখি তুমি কি করে আমার নামে এমন অপবাদ দেও। তোমার মতন একদিনের মেয়েকে কেউই বিশ্বাস করবে না।
ইফরাহ হাসলো সাথে ইশাও হাসলো।তাদের হাসি দেখে ঈশিতা কিছুটা দমে গেলেও প্রকাশ করল না। ইফরাহ ইশা কে ইশারা করতেই ইশা চোখ দিয়ে বোঝাল সব রেডি। ইফরাহ মুচকি হেসে বলল__
বড় আপু চলো আমরা এখন নিচে যাই সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
ঈশিতা ঘেমে যাচ্ছে। হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে তারপর ইফরাহার আগে যাওয়া শুরু করল। ইফরাহ আর ইশা পিছন পিছন আসলো।
________________
রায়েদ তার পুরো পরিবারে সাথে নিচে বসেছিল।রায়েদের মা মিসেস রুবিনা ।রায়েদের বাবা রিফাত সিকান্দার। এবং রায়েদের দাদি সুবানা আক্তার। সেখানে ঈশিতার মা-বাবাও ছিল। বাকি অতিথিদের মধ্যে কেউ রাতেই চলে গিয়েছিল এবং যারা ছিল তারা সকালে চলে গিয়েছে। কারণ হঠাৎ করে বিয়ে হবার কারণে কেউই তেমন সময় নিয়ে আসেনি।রায়েদ রবিনের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রবিনের চেহারা দেখে সে বুঝতে পারছে কিছু একটা ঘটেছে। এইতো কিছুক্ষণ আগেই রবিন আর ইশা হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি প্রবেশ করল আর ইশা সোজা চলে গেল উপরে।
রায়েদ রবিন কে কিছু জিজ্ঞেস করলেই রবিন বলে_
ইফরাহ মেডাম এসে বলবে।
রায়েদ মনে মনে বলছে__
রাঙামাটি থেকে আসার পর থেকে আমার কর্মচারী, আমার বন্ধুরা, এমনকি আমার পারিবার দেখছি আমার থেকে আমার বউয়ের কথা শুনে। বাহ্ বাহ্ বেশ ভালো।
রায়েদ দেখল সিঁড়ি দিয়ে ইফরাহ নামছে। ইফরাহার সাথে আরো দুজন নামছিল কিন্তু তার নজর কেবল ইফরাহতেই আটকে আছে।পরনে লাল শাড়ি, মাথায় সুন্দর করে ঘোমটা দেওয়া।রায়েদের কানে এখনো ঈশিতাকে বলা ইফরাহার কথা গুলো কানে বাজছে।কতোটা সৌভাগ্য হলে এমন বউ পাওয়া যায়।
ইফরাহ নিচে এসে রায়েদের দাদি কে সালাম দিল।সুবানা আক্তার ইফরাহার কপালে চুমু খেয়ে বলল__
মাশাআল্লাহ আমাগোর ঘরের নূর তুই।এখন ঘর কে আলোকিত কোইরে দিবি।
ইফরাহ লজ্জা পেয়ে হাসলো। তারপর সে তার শশুর শাশুড়ি কে সালাম দিল। দুজনেই ইফরাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।সুবানা আক্তার ইফরাহ কে উদ্দেশ্য করে বললেন__
এই হইলো আমার মাইয়া আর তার জামাই। মানে ঈশিতার মা বাপ আর তোর ফুফা শশুর, শাশুড়ি। ইফরাহ সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করল।তারাও সুন্দর মতোন জবাব দিলেন।
ইফরাহ গিয়ে রায়েদের পাশে দাঁড়াল। ঈশিতা এখনো মনে মনে ভয় পাচ্ছে কিন্তু যথা সম্ভব তা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকছে।
হঠাৎ ঈশিতার বাবা বলে উঠলো__
এত বড় ঘটনা ঘটে গেল অথচ আমরা কিছুই জানতাম না। সব থেকে বড় কথা রায়েদ সুস্থ আছে এটাই অনেক। কিন্তু কাজটা কি করেছে এ বিষয়ে আপনারা খোঁজখবর নেননি? তাকে তো জেলে দেওয়া উচিত।
ইফরাহ বাঁকা হাসলো ঈশিতার দিকে তাকিয়ে।
ঈশিতা তার বাবার কথা শুনে আমতা আমতা করে বলে উঠলো___
থাক না ডেড যা হয়ে গেছে তা তো হয়েই গেছে। এখন এইসব নিয়ে পড়ে থাকলে লাভ নেই।
তার মা বলল__
লাভ নেই বললে কি চলে নাকি? যে এত বড় কাজ করেছে তাকে তো খুঁজে বের করা উচিত। আমাদের উচিত পুলিশের কাছে কমপ্লেন করার। অবশ্যই পুলিশরা খুঁজে বের করতে পারবে।
ইফরাহ ইশিতার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল__
ফুপি মনি তো ঠিকই বলেছেন। পুলিশের কাছে গেলেই তো আমরা এই কাজটা যে করেছে বা করার চেষ্টা করেছে তাকে ধরতে পারবো। কি বলো ঈশিতা আপু?
ঈশিতার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।সে আমতা আমতা করে ইফরাহ কে ধমক দিয়ে বলল__
ছোট তুমি ছোটর মতই থাকো। আমাদের পারিবারিক বিষয়ে তোমার কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই। আর আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলবে।
নিজের কথা শেষ করতে না করতেই রায়েদের হুংকার শোনা গেল।
রায়েদ হুংকার দিয়ে বলল__
ঈশিতা! নিজের লিমিট ক্রস করছিস তুই ঈশিতা।তোকে আমি আরো একবার ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম। ইফরাহ আমার স্ত্রী, আমার অর্ধাঙ্গিনী।তোর থেকে কোটি গুণ বেশি অধিকার তার আছে পারিবারিক বিষয়ে কথা বলার। এক্ষুনি সরি বল তুই আমার ইফরাহ কে।আর কখনোই আমার Little Rosebud এর দিকে চোখ গরম দেখিয়ে কথা বলবিনা।তোর সেই অধিকার নেই।
রায়েদ আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইফরাহ তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।রায়েদ ইফরাহার হাতের কমল স্পর্শ পেয়ে যেন গলে গেল।
বাড়ির সবাই অবাক।রায়েদের সহজে রাগ উঠেনা এবং উঠলেও রাগ কমানো কারোর পক্ষে অসম্ভব।সেই যায়গা ইফরাহ তা সম্ভব করে দেখালো।
রায়েদের বাবা রিফাত সিকান্দার।নিজের স্ত্রীর কানে কানে বলল__
বউমা পেয়েছ একখান। এখন তোমার ছেলেকে আর ভয় পেতে হবে না আমাদের।
মিসেস রুবিনা স্বামীর দিকে চোখ পাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল__
বউমা না সে আমার মেয়ে।
রিফাত সিকান্দার মুচকি হাসলো।
ঈশিতা রায়েদ আর ইফরাহার আলগা পিরিত সহ্য করতে না পেরে তেড়ে ইফরাহার সামনে গেল। কিন্তু ইফরাহ কে পিছন করে তার সামনে ঢাল হয়ে রায়েদ দাঁড়াল।যা দেখে ঈশিতা আরো উত্তেজিত হয়ে গেল।
সে দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে বলতে শুরু করল __
না না বিশ্বাস করো রায়েদ আমি কিছু করেনি।এই মেয়ে এই মেয়ে মিথ্যা বলছে।আমি আমি আমি কিছু করি নি।
ঈশিতার এমন আচরণ সবাই বসা থেকে উঠে গেল। কেউই কিছু বুঝতে পারছে না। এমনকি রায়েদ নিজেও কিছু বুঝতে পারছে না। ইশিতা কি বলছে,কেন এমন করছে।
ঈশিতা আবার ইফরাহার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল__
তুই তুই মিথ্যে বলেছিস রায়েদের কাছে আমার নামে তাই না? তোকে তো আমি শেষ করে দিব।
এই কথা বলার সাথে সাথে রায়েদ চিৎকার করে বলে উঠলো
ঈশিতা।
রায়েদের চিৎকার শুনে ঈশিতা কেঁপে উঠল। তারপর কম্পিত কন্ঠে বলল__
রায়েদ বিশ্বাস করো।আমি ওইদিন তোমাকে রাঙামাটির পাহাড় থেকে ধাক্কা দেই নি।আর না হসপিটালে গিয়ে তোমার চেহারা দেখে ভয় পেয়ে রাজশাহী এসে পরিবারসহ কক্সবাজারে পালিয়েছে। আমি তো জানতামই না যে তুমি রাঙ্গামাটি ছিলে। এই এই মেয়ে তোমাকে যা বলেছে সব মিথ্যে বলেছে। আমি কেমন কাজ করতে পারি তুমি বলো?
সবাই অবাক হলো।যেন কেউ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ইফরাহ বাঁকা হাসছে কারণ সে এটাই চাইত যে ঈশিতা নিজের দোষ নিজের মুখে স্বীকার করুক।সে একটি বইতে পড়েছে ডার্ক সাইকোলজি" (Dark Psychology) বা "অন্ধকার মনোবিজ্ঞান"-এর ভাষায়, কাউকে উত্তেজিত করে তার দোষ স্বীকার করিয়ে নেওয়াকে এক ধরনের কৌশল বা কারসাজি বলা হয়।তাই করেছে ইফরাহ। প্রথমে ঈশিতা কে রুমে উত্তেজিত এবং নার্ভাস করে এসেছে আর এখন নিচে।
ঈশিতার খেয়ালই নেই সে কি বলছে।রায়েদ যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।সে তো ঈশিতা কে নিজের বোন ভাবতো। ঈশিতার মা ঈশিতার কাছে গিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলছে__
প্রিন্সেস কি বলছো তুমি এসব? শান্ত হোও মা।
রায়েদ ঈশিতার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল__
তার মানে আমার সন্দেহ ঠিক।এই নিকৃষ্ট কাজ তুই করেছিস। সেইদিন যখন তুই ইফরাহ কে ধাক্কা দিতে নিয়েছিল এবং আমি গিয়ে তাকে বাঁচিয়ে ছিলাম তখন তোর ব্যবহার করা পারফিউমের ঘ্রাণ পেয়েছিলাম। কিন্তু এমন এক সময় সেসব ভাবার অবস্থায় ছিলাম না। এবং পরবর্তীতে ভাবলেও মনকে বোঝাতাম যে তুই এমন কাজ করতে পারবি না। অথচ আজ তুই নিজের মুখে স্বীকার করছিস? ছিঃ তোর লজ্জা করল না এত নোংরা কাজ করতে?
ঈশিতার চোখে ভয় স্পষ্ট। ঈশিতার বাবা বলল__
কি বলছো কি তুমি এইসব? কোন প্রমাণ আছে যে আমার মেয়ে এরকম কোন জঘন্য কাজ করেছে? আমার মেয়ে এমন কাজ করতে পারে না। তোমার বউকে সামলাও। বিয়ে করে আসার পরেই পরিবারের ভেতর ঝামেলা লাগিয়ে দিয়েছে।
ইফরাহ আর চুপ করল না।সে জবাব দিল__
আমার কাছে যথেষ্ট পরিমাণের প্রমাণ আছে যে আপনার মেয়ে এই জঘন্য কাজ করেছে। আমার মুখের কথায় হয়তো আপনারা বিশ্বাস করবেন না তাই আপনাদেরকে আমি ভিডিও দেখাতে পারবো।
ইফরাহ রবিনের দিকে ইশারা করতেই রবিন ড্রয়িং রুমে থাকা স্মার্ট টিভিতে Miracast ব্যবহার করে নিজের ফোনের সাথে কানেক্ট করল।
সেখানে ভিডিও প্লে হলো। যেখানে দেখা যাচ্ছে ইফরাহ পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে একা একা এবং তার পিছনে রায়েদ হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছে। সবার নজর টিভির স্ক্রিনে। ঈশিতা ভয়ে কাঁপছে। হঠাৎ ভেসে ওঠল সে ভয়ানক দৃশ্য যেখানে কোন চাদর দিয়ে মুখ ডাকা ব্যক্তি ইফরাহার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার জন্য এবং যা দেখে রায়েদ দৌড়ে ইফরাহ কে বাঁচায় এবং ইফরাহার বদলে ধাক্কা খেয়ে সে পাহাড় থেকে পড়ে যায়।
এমন দৃশ্য দেখে রায়েদের মা এবং দাদির চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করে। এমন দৃশ্য যেকোন মার জন্য ভীতি কারক। পড়ে যা দেখা গেল তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। সেই চাদর মোড়ে রাখা ব্যক্তিটি যখন পিছনে ফিরে তখন তার মুখ থেকে চাদর পড়ে যায়। এবং চাদর আস্তে আস্তে মাটিতে পড়ে যায় এবং তার মুখ স্পষ্ট হয়ে যায়। এবং সেই ব্যক্তিটি আর কেউই না বরং স্বয়ং ঈশিতা নিজে ছিল। সবার চক্ষু চড়কগাছ। কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না নিজ চোখে দেখা দৃশ্যকে।
তারপর আরেকটা ভিডিও প্লে হতে শুরু করল। সেটা হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজ। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ঈশিতা রায়েদের কেবিনের সামনে থেকে কিছু একটা দেখা চোখ মুখ কুঁচকে সেখান থেকে তড়িঘড়ি করে চলে আসছে। এমনকি যে হোটেলে ছিল সে সেই হোটেলের ফুটেজ আছে এখানে।
সবার কাছে বিষয়ে ক্লিয়ার হলো এই কাজটি ঈশিতা করেছে।রুবিনা নিজেকে আর সামলাতে পারল না। ঈশিতার কাছে গিয়ে সজোরে থাপ্পড় লাগালো ঈশিতার গালে। থাপ্পড়ের জোর এতটাই বেশি ছিল যে ঈশিতা কিছুটা পিছিয়ে গেছে।