রায়েদ মুচকি হেসে ইফরাহার দিকে তাকিয়ে বলল,,
"আরে এইটা হলো আমার ফুফাতো বোন।ওর নাম ঈশিতা। একদম আমার নিজের বোনের মত।"
ইফরাহ মুচকি হেসে ঈশিতা কে সালাম দিল। ঈশিতা নিজেকে যথাযথ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে সালামের জবাব দিল।
রায়েদ ইশিতার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল __
"কিরে কোই ছিল তোরা। তোদের ফোন বন্ধ ছিল। আমার বিয়ে আর তুই থাকবি না এটা কি সম্ভব? অথচ দেখ তুই ছিলি না আমার বিয়ে শেষ হয়ে গেল। আর ফুপি এবং ফুপা এসেছে?"
ইশিতা রায়েদের দিকে তাকালো না।তার আর এখন রায়েদ কে একদম ভালো লাগে না। আগে তার চোখে রায়েদ কে সব থেকে হ্যান্ডসাম পুরুষ লাগতো। কপালে একটি ছোট্ট কাটা দাগ থাকলেও সেটিতে ছিল এক মাধুর্য। কিন্তু এখন গাল থেকে নাকে সেই সেলাই করা দাগ দেখে তার বিরক্ত লাগে। এবং সব বিরক্ত গিয়ে বেড়ে যায় ইফরাহ কে দেখলে।সে না তাকিয়েই বলল__
আমরা কক্সবাজার গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে নতুন সিম কিনেছিলাম এবং সেটি চালিয়েছিলাম আমরা। কিছুদিন সবাই মিলে রেস্ট নিতে চেয়েছিলাম তাই নেটওয়ার্কের বাইরে ছিলাম। জানতাম না এত কিছু হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ মম এবং ডেড নিচে বসে আছে।
রায়েদের কেন জানি অদ্ভুত লাগলো।ঈশিতার কথা বিশ্বাস করতে তার মন সায় জানালো না।তার জানামতে তার ফুপি কোন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার তিন মাস আগে থেকে সেটি ঢাকঢোল পিটিয়ে মানুষকে জানায়। সেখানে গিয়ে কি করবে এখান থেকে তারা সেখানে কি নিয়ে যাবে যতটুকু না সত্য তার থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে বলে। অথচ কক্সবাজার গিয়ে একদম সিম চেঞ্জ করে ফেলল এই বিষয়টা কারোর কানে খবর এলো না। আর তাছাড়াও ঈশিতা সব সময় তার সাথে ঢলাঢলি করত তার দিকে তাকিয়ে কথা বলতো আর আজকে একদল মাথা নিচু করে আছে। কিন্তু সে বিষয়টি বেশি ঘাটল না।
সে ইফরাহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল_
চলো নিচে যাই আমরা।
ইফরাহ যেই না পা বাড়ায় ওমনি ঈশিতা বাঁধা দিয়ে বলে__
ও থাক। আমি ওর সাথে কথা বলি। একটু পরিচয় হই।
রায়েদের মন সায় দিল না ইফরাহ কে ঈশিতার সাথে রেখে যেতে তারপরও ইফরাহার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ দিয়ে ভরসা দিল এবং তাদেরকে তাড়াতাড়ি নিচে আসতে বলে সে রুম থেকে বের হয়ে গেল। বের হবার সময় ঘুমের দরজা ভিজিয়ে দিল।
ঈশিত নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের দুই বাহু ধরে ইফরাহার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
ইফরাহও এতক্ষণ শান্ত থাকলেও এখন ঈশিতার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে সে নিজেও ঈশিতার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ। ঈশিতা অবাক হলো।
___________________
রবিন ইশা কে সব খুলে বলল। ইশা তো শুনে একদম অবাক।সে রবিনের দিকে তাকিয়ে বলল__
তাই তো সেদিন দেখা সে মেয়েটির চোখ জোড়া আমার কাছে এত চেনা লাগছিল। আমি ভাবতেও পারছি না যে সেই মেয়েটার কেউ না বরং,,ইশা থামলো। কিন্তু মনে মনে বলল অন্য কথা।যা কেবল সে এবং আর একজন ব্যাক্তি জানে।
তারপর আবার বলতে শুরু করল__
আমাদের উচিত এক্ষুনি বসকে জানানো। জানিনা বস শুনলে কিভাবে রিয়েক্ট করবে।
রবিন সায় দিল এবং বলল_
তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠো।এক সাথে যাই বসের বাড়ি।
ইশা আর দ্বিমত করলো না। চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসলো।
মূলত সকাল সকালই রবিন ইশার বাড়ির সামনে এসে তাকে কল দেয় এবং ইশা বাড়ি থেকে বের হতেই তাকে সব জানায়। এবং এখন তারা যাচ্ছে রায়েদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
___________________
রায়েদ রুম থেকে বের হয় ঠিকই নিচে যাবার উদ্দেশ্যে কিন্তু তার মন এবং মস্তিষ্ক বারবার তাকে জানান দিচ্ছে যে ইশিতা তার Little Rosebud এর জন্য শুভাকাঙ্ক্ষী না।তাই সে নিচে না গিয়ে দরজার সাথে কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকে।
ঈশিতা ইফরাহার দিকে আগের দৃষ্টিতেই তাকিয়ে থেকে বলে__
কি দেখলে এমন রায়েদের মধ্যে?আগে বিয়ে করলে মানতাম না হয় সে খুব হ্যান্ডসাম। কিন্তু এখন তো তার চেহারাও নেই। দেখতে কুৎসিত।এখন কেন বিয়ে করলে?টাকার জন্য?
ঈশিতার কথা শুনে রায়েদের হৃদয় ভেঙে গেল।সে তো ঈশিতা কে নিজের বোনের মতোন ভালোবাসত।আর সেকি সত্যি এতটা কুৎসিত হয়ে গেছে? বিয়ের সময়ও অনেকে এই বিষয় নিয়ে কথা বলেছে। এখন তার নিজের বোন বলছে। ইফরাহ ভবিষ্যতে পস্তাবে না তো বিয়ের জন্য? রায়েদের হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঈশিতার কথা শুনে ইফরাহার মাথা গরম হয়ে গেল। তাকে লোভী অপবাদ দিয়েছে এই জন্য নয় বরং তার রায়েদের চেহারা নিয়ে বাজে কথা বলেছে তার জন্য। ইফরাহ গর্জন করে বলে উঠলো___
মুখ সামলিয়ে কথা বলুন। আপনি আমার স্বামীর সম্পর্কে কথা বলছেন। আপনি আমার থেকে বড় এবং আমার স্বামী বোন বলে আমি আপনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলছি। কিন্তু কিন্তু যদি আর একটাও বাজে কথা আপনার মুখ থেকে বের হয়ে আমার স্বামীকে নিয়ে তাহলে আপনার জিভ টেনে আমি ছিঁড়ে ফেলবো। এবং এই কাজটি করতে আমার দ্বিতীয়বারও ভাবতে হবে না।
ঈশিতা অবাক হলো।তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অবাকের দৃষ্টিতে রূপান্তরিত হলো। তার সাথে এমন ভাবে কথা বলার কারোর কখনো সাহস হয়নি।
রায়েদ দরজার বাহির থেকে সব শুনে অনেক বেশি খুশি হলো।তার Little Rosebud যে তার জন্য স্টেন্ড নিল এবং কথায় কথায় তাকে নিজের স্বামী বলল।
ইফরাহ আবার বলতে শুরু করল ____
আর রইল বাকি টাকার জন্য? আচ্ছা আপনার বলা কথা মতোন মানলাম আমি টাকার জন্য বিয়ে করেছি।কি করবেন এখন?মেরে ফেলবেন আমায়?
হঠাৎ ইফরাহ ঈশিতার কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল_"
ঠিক যেমন একবার চেষ্টা করেছিলেন?
এই বলে আবার সোজা হয়ে দাড়ায় এবং ঈশিতা কে চোখ টিপ দেয়।
ঈশিতা ভয়ে রিতিমত কাঁপতে থাকে।এসি রুমেও তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে। ইফরাহার মুখে পৈশাচিক হাসির ঝলক ফুটে ওঠে।
ঈশিতা আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইফরাহ বলল__
আনায়াহ ইফরাহার স্বামী ইহসান রায়েদ সিকান্দার জীবিত থাকা কালীন কেউ তার Little Rosebud মানে আমার ক্ষতি করতে পারবে না।আর আমার স্বামী কে জালানোর অধিকার শুধু আমার এবং কথা শোনানোর, ভালোবাসার, উনার টাকার প্রতি লোভ রাখার,সবকিছু অধিকার শুধু আমার এবং আমি আমার অধিকারে হস্তক্ষে পছন্দ করি না।
রায়েদ দরজার বাইরে থেকে সব শুনছিল এবং তার Little Rosebud এর উপর গর্ব বোধ করছিল। তারপর নিচে থেকে রবিনে শব্দ শুনে আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। চলে গেল সে নিচে।
ইফরাহ দরজার সামনে থেকে ছায়া সরে যেতে দেখে সে বুঝলো রায়েদ চলে গিয়েছে। সে আবার ঈশিতার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের গলার দিক থেকে চুল সরিয়ে ঈশিতা কে তার গলায় থাকা লালছে দাগ দেখিয়ে দেখিয়ে বলতে শুরু করল___
এগুলো দেখছো? আমার স্বামীর দেওয়া ভালোবাসা। এগুলো পেলে টাকা পয়সা দিয়ে আর কি করবো। স্বামীর দেওয়া সোহাগ ভালোবাসা আদর ব্যথা এই সব কিছু নিয়েই আমার জীবন চলে যাবে। টাকা পয়সা হাতের ময়লা আমি আবার খুব পরিষ্কার। আমি নিজের হাতে ময়লার দাগ লাগাতে চাই না। কিন্তু যদি সেই ডাগটি থাকে স্বামীর দেওয়া ভালোবাসা তাহলে কোন সমস্যা নেই পুরো শরীরে নিয়ে ঘুরতে রাজি।
এই বলে ইফরাহ ফ্লায়িং কিস দিল ঈশিতা কে।
ঈশিতা রাগে গজগজ করতে লাগলো।সে নিজের ঠোঁট কামড়ে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল__
এসব ফালতু কথা আমি শুনতে চাই না। আগে এইটা বল ,,
মেরে ফেলবেন আমায়?ঠিক যেমন একবার চেষ্টা করেছিলেন।এইসব বলে তুমি কি বোঝাতে চেয়েছো?
ইফরাহ বাঁকা হেসে বলতে শুরু করল__
আমি সব জানি। সেদিন যখন তুমি আমাকে ধাক্কা দাও এবং রায়েদ এসে আমাকে বাঁচায়।তখন তো তুমি আমার খুব কাছেই ছিলে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে তুমি হাত দিয়ে চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিলে তোমার হাত থেকে চাদর পিছলে যায়। এবং আমি তোমার চেহারা দেখে ফেলি। কিন্তু তখন আমি ঠিক ছিলাম বিধায় নয়তো তখনি আমি তোমার হাত টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতাম এমন নিকৃষ্ট কাজের জন্য। যখন রায়েদ কে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং যখন তার জ্ঞান ফিরেছিল তখন আমি হোটেলে ফিরে সকল হিসাব মেলাতে শুরু করলাম। তুমি একদিন অফিসে এসেছিলে এবং আমার উপর রাগ দেখিয়ে ছিলে আর রায়েদ আমার পক্ষে কথায় বলায় তুমি রেগে গিয়েছিলে। তোমার চোখে স্পষ্ট ঘৃণা দেখেছি আমি সুইটহার্ট। এবং আমার এইটা বুঝতে সময় লাগল না যে তুমি রায়েদ কে পছন্দ করো। এইসব হিসেব করার পর দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে গেল। তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়ে যখন হসপিটালে আসলাম তখন রায়েদ আমাকে নিজের চেহারা দেখাতে চায়নি। আমিও বেশি জোর না করে যখন চলে আসছিলাম তখন দেখলাম তোমাকে ঢুকতে। তোমাকে দেখা সত্বেও না দেখার ভাব নিলাম।রবিন এবং ইশা কে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে ফোন রেখে গিয়েছি এই অজুহাত দিয়ে আবার এসেছিলাম রায়েদের কেবিনের সামনে।এসে দেখি তুমি দরজার কাচ দিয়ে রায়েদ কে দেখে নাক মুখ কুঁচকাচ্ছিলে। ভীষণ ঘৃণা হলো তোমার উপর আমার।এই তোমার ভালোবাসা? তোমার জন্য তার এই অবস্থা।চেহারার রূপ টাকা পয়সা দিয়ে কি কখনো ভালোবাসা হয়? হয় না। তাই ভাবলাম ভিন্নভাবে প্রতিশোধ নিলো। সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট না করে চলে এলাম। রাজশাহী ফিরে ভাবতে লাগলাম কি করে তোমাকে শাস্তি দেওয়া যায়।পরে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলাম তুমি রাজশাহীতে নেই এখন। তাই কিছুদিন শান্ত থাকলাম। আমি জানতাম আমাদের বিয়ের কথা শুনে তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসবে। আর এই দেখো তুমি নিজে নিজে এসে পড়লে আমার ফাঁদে।
ঈশিতা ভয়ে কাঁপতে লাগলো কিন্তু তবুও হার মানলো না।সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল___
"" কককী প্রমাণ আছে তোমার কাছে যে আমিই এই কাজ করেছি? আর রায়েদ আমাকে অনেক বিশ্বাস করে।তাই ওকে এইসব বললে সে কখনোই বিশ্বাস করবে না।"
ইফরাহ শব্দ করে হাসল। তারপর বলল__
আর ইউ শিউর সুইটহার্ট? আমার কাছে যদি বিন্দুমাত্র প্রমাণ না থাকে এবং আমি যদি অযথাও তোমার নাম বলি তারপরও রায়েদ চোখ বন্ধ করে আমাকে বিশ্বাস করবে।আর সেই জায়গায় তো আমার কাছে প্রমাণ আছে।
ঈশিতার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল।সে কাঁপতে কাঁপতে বলল__
কি,, কি,, কিসের প্র,,প,, প্রমাণ?
ঠিক তখনই হুরহুরিয়ে ঘরের দরজা ঠেলে কেউ প্রবেশ করল। ইফরাহ মুচকি হেসে সামনে থাকা ব্যক্তিগত দিকে তাকিয়ে বলল__
ওই যে এসে গেছে তোমার প্রমাণ।
নতুন রহস্য।