"কিরে ব/ল/দা গ্রীষ্মকালেও তোর মনে নাকি বসন্তের ফুল ফুটেছে?কাউয়ার বদলে কোকিল কা কা করছে?ওহ্ সরি।কোকিল তো কা কা করে না।"
উৎসবের এমন ঠেস মা/রা কথা শুনেও ইশরাক একটুও রাগলো না।সব সময় কি আর মাথা গরম করলে চলে নাকি।হাতে যেহেতু ক্ষমতা নেই তাই বিপরীত পাশের মানুষটার ক্ষমতা বুঝে তো একটু চলতে হয়।
"আমার কথা বাদ দাও।তুমি বরং তোমাদের খবর বলো।তা সবাইকি এখনো চায়ের দোকানেই আড্ডা দাও নাকি কাজের কাজ কিছু করো?"
ইশরাকের কথা শুনে পাশ থেকে নির্ভীক বলে উঠলো,
"আড্ডা দেই বা যাই করি অন্তত তোর মত অন্যদের বাঁচাতো মুশকিল করে তুলি না।সমস্যা কি তোর?"
"আমি তোমাদেরকে সম্মান দিয়ে তুমি বলে সম্মোধন করছি আর তোমরা দেখি সিনিয়রকে তুই বলে অপমান করছো।"
"সিনিয়র জন্যই যে সম্মানের যোগ্য হবে সে তা তো নয়। আর আমরা তাকেই সম্মান করি যে সম্মানের যোগ্য।"
"তাহলে আমিও তোমাদের সম্মান করতে পারলাম না।তো এখন বল আমার জীবনে বসন্ত এলো না বর্ষা এলো,কোকিল ডাকলো না কাক ডাকলো তাতে তোদের এত চু*ল*কা*চ্ছে কেন?বেশি চু*ল*কা*নি হলে ডাক্তার দেখা আর মলম কিনে সেখানে লাগা।অবশ্য ডাক্তার দেখানোর জন্য আর মলম লাগানোর টাকা তো মনে হয় না তোদের পকেটে আছে।ফাঁকা পকেট তো।"
"একদম ঠিক বলেছিস ব/ল/দা।আসলে কি বলতো গরম তো তাই একটু চুলকানি বেশি হচ্ছে।তা বলছি মানুষের আগে পিছে বাঁশ দিয়ে তো ভালোই টাকা কামিয়েছিস।একটু মলম কিনে দিবি আমাদের?"
উৎসবের বলা প্রত্যেকটা কথাতেই ইশরাক ভরকাচ্ছে।এই ছেলেটাকে ইশরাক কোনোমতেই সহ্য করতে পারে না।নির্ভীক তাও সোজাসুজি কথা বলে,অপমানটাও সোজাসুজি সহজ-সাবলীল ভাষাতেই করে।কিন্তু এই ছেলের আচরণ বরাবরই অন্য ধাঁচের।সেও ঠিকই অপমান করে তবে একটু ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে যেটা ইশরাকের সহ্য হয় না।
দাঁত কিড়মিড় করে উৎসব কে বলল,
"আমার ধৈর্যের সীমা ছাড়াস না।হাতে এখন ক্ষমতা নেই জন্য ভাবিস না যে কখনোই ক্ষমতা আসবে না।তখন কিন্তু তোদের সবকটাকে কেঁ/টে রেখে দেব।এমন অবস্থা করবো না তোদের লা*শ রাস্তার কুকুর ছি/ড়ে ছি/ড়ে খাবে।"
উৎসব ভয়ার্ত কন্ঠে নির্ভীক কে বলল,
"এ ভাই শুনেছিস কি বলছে ইশরাক?আমাদেরকে মে*রে ফেলার হুমকি দিচ্ছে নির্ভীক।আমার কিন্তু ভীষণ ভয় করছে!দেখ আমার হাত পা কাঁপছে,আমি এখন মাথা ঘুরে পড়ে যাব।না না ব/ল/দা/র সাথে আর লাগা যাবে না।"
কথাটা বলে দুজনে একযোগে হেসে উঠলো।উৎসব যদিও শব্দ করে হাসলো কিন্তু নির্ভীক নিঃশব্দে হাসলো।নির্ভীক মুচকি হাসতেই বেশি ভালোবাসে।এদিকে ওদের দুজনকে এভাবে হাসতে দেখে ইশরাক ভ্রুঁ কোঁচকালো।এদিকে এক পর্যায়ে গিয়ে উৎসব নিজের হাসি থামিয়ে ইশরাককে ঝা/ড়ি মে/রে বলল,
"এই থাম তো।তুমি যে কত বা/ল ছিঁ/ড়/তে পারবা সেটা আমাদের জানা আছে।তোমার যদি এতই ক্ষমতা থাকতো তাহলে তোমার বাপের ক্ষমতায় আসার অপেক্ষা করা লাগতো না।কবে তোমার বাবা আসবে ক্ষমতায় কবে তুমি আমাদেরকে ছিঁড়বা সে ভয়ে আমরা এখনই মুখে কষ্টেপ লাগাইয়া থাকবো নাকি?আর তুই ভাবিস কিরে তুই আমাদেরকে ছিঁ/ড়/বি আর আমরা চুপচাপ তোকে আমাদেরকে ছিঁ/ড়/তে দেবো?বিশ্বাস কর যদি কোনদিন সুযোগ পাই তোরে এমনভাবে ছিঁ/র/বো যে তুই এমনিতেই ম/র/তে চাইবি।"
ইশরাক শীতল দৃষ্টিতে উৎসবের দিকে তাকিয়ে আছে।কিন্তু ওর সেই শীতল দৃষ্টির মাঝেও যেন সীমাহীন ক্রোধ ঝরছে।গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"কে কখন কার কাছে নিজের মৃত্যু ভিক্ষে চাইবে সেটা কে জানে বল?কার কখন কিভাবে মৃত্যু আসে সেটাও তো আমরা বলতে পারি না।এই যে তোরা আমার সামনে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে কথা বলছিস এমনটাও তো হতে পারে যে কাল সকালের খবরে হয়তো দেখা গেল তোদের দুজনের সেই গলাটাই আর থাকলো না!হতেও তো পারে এমনটা তাই না?"
ইশরাকের হুমকির প্রেক্ষিতে নির্ভীক ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,
"যাদের মৃ/ত্যু/তে ভয় নেই তাদেরকে মা/রা/র হুমকি দিয়ে লাভ নেই।মৃ/ত্যুতে কাদের ভয় থাকে জানিস?যাদের কাছে বেঁচে থাকার হাজারটা কারণ থাকে,যাদের এই দুনিয়ায়,দুনিয়ার মানুষজনের উপর মায়া জমে থাকে।কিন্তু আমাদের সেসব কিছুই নেই। আমাদের কারোর কোন পিছুটান নেই।এই দুনিয়ায় না থাকলেও কেউ কাঁদবে না আমাদের জন্য।তাই আমাদেরকে মা/রা/র ভয় দেখাস না।তোর অনেক পিছুটান আছে তুই বরং নিজের চিন্তা কর।"
"তাহলে বরং যাদেরকে মা/র/লে তোরা কষ্ট পাবি তাদেরকে মা/র/বো।না চাইতেও কিন্তু আজকে নিজেদের দুর্বলতার কথাটা আমার সামনে স্বীকার করে ফেললি তুই নির্ভীক।যাক সেসব কথা থাক।এখন বলতো এই সকাল সকাল কালো বিড়ালের মতন আমার রাস্তা কা/ট/লি কেন?"
"অনুপ্রভা কে বিরক্ত করছিস কেন?"
নির্ভীক এর মুখ থেকে এই নামটা শুনতেই ইশরাক চমকে উঠল।নির্ভীকরা যে প্রভাকে নিয়ে ওর সাথে কথা বলতে এসেছে সেটা এতক্ষনে আন্দাজ করতে পারেনি।
"তোরা ওকে চিনলি কি করে?"
উৎসব বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,
"তুই যদি এখন বান্দরের মতন লাফাস তাহলে তোকে আটকানোর জন্য তো চিড়িয়াখানা থেকে লোকজনকে ডাকতেই হবে তাই না?এখন এই চ্যা/টে/র আজগুবি কথাবার্তা বলে আমাদের সময় নষ্ট করিস না যা প্রশ্ন করছি উত্তর দিয়ে দে।"
"ও তোদেরকে বলেছে এই কথা?"
ইশরাকের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নির্ভীক মৃদু রাগী কন্ঠে বলল,
"কে বলেছে সেটা তোর না জানলেও চলবে।তুই আগে বল ওর পেছনে পড়ে আছিস কেন?বাংলা কথা কি তোর মাথায় যায় না?যখন বলছে যে ওর জীবনে তোর জায়গা নেই,তোকে পছন্দ করেনা তারপরও কেন কুকুরের মতন ঘুরছিস ওর পেছনে?"
"সেই কৈফিয়ত তোদের মতন চুনোপুটি কে দিতে হবে নাকি?চোখের সামনে থেকে সর।মাথা এখন গরম হয়ে আছে।"
"ঠান্ডা করার ব্যবস্থাও আমাদের কাছে আছে।ওকে বিরক্ত করা ছেড়ে দিবি।না হলে কিন্তু এর ফল ভালো হবে না?"
"কি করবি?শা*লা তোদের ক্ষমতা কি রে?তোরা দুটো কিন্তু আমাকে এখনো ভালো করে চিনিস না।তিসান শিকদারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করিস ও বলে দিতে পারবে যে ইশরাক খান ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে।আমি জানি আমি জা*নো*য়া*র।তাই বলছি আমার সাথে খেলতে আসিস না।আমার শিকার আমার মুখ থেকে কেউ কেড়ে নিয়ে যাবি সেটা কিন্তু আমি হতে দেব না।যে কেড়ে নিতে আসবে সেও আমার শিকার হয়ে যাবে।"
_______________
ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই নির্ভয় প্রেয়নার মুখোমুখি হলো। দুজনকে দেখে দুজনেরই মুখ ফুটে উঠলা এক চিলতে হাসি।
"আপনি হঠাৎ আমার ফ্ল্যাটে যে?"
"আসলে বাড়িতে একা একা ভালো লাগছিলো না তাই নাবিলার সাথে একটু গল্প করতে এসেছিলাম।আমি অনেকক্ষণ এসেছি প্রায় দুই ঘণ্টার মতন হতে চললো।"
"আরেকটু থাকুন।"
প্রেয়না স্মিত হেসে বলল,
"আর থাকতে পারবো না।অনেকক্ষণ এসেছি।এখন ভাইয়া,বাবা চলে আসবে।আমাকে বাড়িতে না পেলে দুশ্চিন্তা করবে।"
নির্ভয় ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
"দুশ্চিন্তা করার কি আছে?আপনি কি ছোট বাচ্চা নাকি যে হারিয়ে যাবেন?"
"না আসলে তেমনটা না।কিন্তু আমাকে না তাও যেতেই হবে।"
নির্ভয় একটা হতাশার শ্বাস ফেললো।বুঝলো যে পরিবারের বাধ্য মেয়েকে দিয়ে সে নিজের ইচ্ছেতে কিছু করাতে পারবেনা।যে মেয়েটা ভার্সিটিতে পড়ে অথচ আজ অব্দি নিজের বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না তাকে এসব কথা বলাই হয়তো বৃথা।অবশ্য প্রেয়না চাইলেও কেউ নিতে দেয় না।কেননা ওর পুরো জীবনটা নিয়ন্ত্রণ করে ওর বাবা আর ভাই।কখন কোথায় যাবে, কি খাবে,কি পড়বে,কার সাথে বন্ধুত্ব রাখবে কি রাখবে না সবটাই ওনারা দুজনে দেখেন।
"বেশ তবে যান।সময় করে অন্য কোনো দিন আসবেন।"
"আমি তো প্রায়ই আসি।আজকেও দু'ঘণ্টার মতো থাকার কারণ আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।নাহলে আরো একটু আগে বাড়ি ফিরে যেতাম কিন্তু আপনার তো বাড়ি ফেরার সময় হচ্ছিলো না সেজন্য বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছিলাম।"
প্রেয়না ওর জন্য অপেক্ষা করছিল এই কথাটা যেন নির্ভয়ের ঠিক বিশ্বাস হলো না।বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বললো,
"আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন সত্যি?"
"হ্যাঁ।আমি যেদিনই আপনাদের ফ্ল্যাটে আসি সেদিনই আপনার জন্য অপেক্ষা করি।কিন্তু একদিন ও আপনি সময় মত আসেন না।"
"তো আমাকে একটা ফোন করবেন।ফোন করে আসতে বলবেন।নাকি আবার আমাকে ফোন করার জন্য আপনার বাবা আর ভাইয়ের থেকে অনুমতি নিতে হবে?"
"না তেমনটা না।আমারই ফোন করে আপনাকে ডাকতে একটু অস্বস্তি হয়।আপনি নিশ্চয়ই জরুরী কোন কাজেই থাকেন সেখানে আমি ফোন দিলে যদি বিরক্ত হন সেই ভয়ে আর দিতে পারি না।"
"আরে রাখুন তো আপনার জরুরী কাজ।বেকার মানুষের আবার কিসের জরুরী কাজ?আপনার যখন ইচ্ছে করবে তখনই আমায় ফোন দেবেন।বিশ্বাস করে একবার আসতে বলে দেখবেন আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখি কিনা।যত গুরুত্বপূর্ণ কাজই থাকুক না কেন আপনার এক ডাকে আমি সাড়া দেব।"
"আর যদি তখন আপনার বন্ধুদের সাথে থাকেন?যদি ওরা আপনাকে আসতে না দেয় তাহলে কার কথা রাখবেন?"
নির্ভয় ভ্রুঁ উঁচিয়ে সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করলো,
"আমার জীবনে গুরুত্বের তালিকায় সবার উপরে থাকতে চাইছেন নাকি?তা বেশ ভালো কথা।আপনার এই ইচ্ছেটা মন্দ না।"
নির্ভয়ের এমন প্রশ্নে প্রেয়না থতমত খেয়ে গেল।এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
"আমি সেটা কখন বললাম?আমি তো বলতে চাইছিলাম যে....."
"এখানে কি করছিস?"
হুট করে প্রয়াসের কন্ঠটা কানে যেতেই কেঁপে উঠল প্রেয়না।সিঁড়ির দিকে তাকাতেই দেখল প্রয়াস রাগী চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।মৃদু কাঁপা কন্ঠে বলল,
"আসলে ভাইয়া বাড়িতে একা একা ভালো লাগছিলো না তাই নাবিলার সাথে গল্প করতে এসেছিলাম একটু।"
প্রয়াস ওদের দিকে এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে প্রেয়নাকে বলল,
"নাবিলার সাথে গল্প করতে এসেছিলি তো ও কোথায়?ওকে তো আমি দেখতে পাচ্ছি না কোথাও।আমি তো অন্য কারো সাথে গল্প করতে দেখছি তোকে।"
শেষের কথাটা প্রয়াস নির্ভয়ের দিকে তাকিয়ে বলল।নির্ভয় প্রয়াসের খোঁচানো কথাটা বেশ ভালোই ধরতে পারলো।হালকা হেসে প্রয়াস কে বলল,
"নাবিলার সাথে গল্প করতে এসেছিল জন্য যে আর কারো সাথে কথা বলতে পারবে না এমন তো কোনো বিষয় নেই তাই না?অবশ্য যদি আপনি নতুন করে কোনো নিয়ম বানিয়ে থাকেন তাহলে সেটা আমার জানা নেই।"
প্রয়াস মৃদু রাগী কন্ঠে নির্ভয় কে বলল,
"নিয়ম সম্পর্কে জেনেও তুমি কিইবা করবে?নিজের পুরো জীবনটাই তো বেনিয়মে চালাও।"
প্রেয়না বুঝতে পারল যে একটা ঝামেলা তৈরি হতে চলেছে।তাই সে আগেভাগে সাবধান হয়ে গেল।প্রয়াসকে বুঝিয়ে বলল,
"আসলে ভাইয়া নাবিলার সাথে গল্প করে যাওয়ার সময় দরজায় নির্ভয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল তাই ওনার সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলছিলাম।এ ছাড়া আর কিছু না। না হলে আমি নাবিলার সাথে গল্প করতেই এসেছিলাম।উনি তো এইমাত্র বাড়ি ফিরলেন।"
"সবার সাথে মিশতে তোকে আমি বারণ করেছি না?আর বাড়িতে কি তোর ভাবি নেই?তাহমিনার সাথে গল্প করবি।অন্য জায়গায় আসা লাগে কেন?"
শেষের কথাটা প্রয়াস বেশ ধমক দিয়েই বলে উঠলো প্রেয়না কে।প্রেয়না মেঝের দিকে দৃষ্টি তাক করলো।অপরাধী কন্ঠে বলল,
"আ'ম সরি ভাইয়া।আসলে ভাবি ঘুমোচ্ছিলো।"
"তো?তোর ফোন নেই?বাড়িতে টিভি নেই?আর পড়াশোনা কে করবে?সামনে পরীক্ষা এখন পড়াশোনা বাদ দিয়ে গল্প করতে অন্যদের বাড়ি ঘুরে বেরাচ্ছিস।তোকে আমি বলেছি না পরীক্ষার আগে কারো সাথে বেশি মেলামেশা করবি না,বেশি বিষয় নিয়ে ভাববি না তাহলে সেগুলো মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারবি না?তুইতো যার তার সাথে গল্প করা শুরু করে দিয়েছিস?কাকে নিজের কতটুকু সময় দেওয়া যায় সেটা বুঝিস না তুই?"
"ভাইয়া আমিতো এমনি কথা বলছিলাম তুমি এতোটা রেগে যাচ্ছো কেন?আর আমিই উনার সাথে কথা বলেছিলাম আগে।আমি বলতে চেয়েছিলাম জন্য উনিও বলেছিলেন।"
"এবার থেকে আর বলবি না।"
গমগমে কন্ঠে প্রয়াস প্রেয়নাকে কথাটা বলল।নির্ভয় ব্যাঙ্গাত্মক গলায় প্রয়াস কে বলল,
"পানিকে একটা বাটিতে কিংবা বোতলে ভরে দেখবেন সেই পানিটা ঠিকঠাক তার ভেতরে থাকবে।কিন্তু যখনই আপনি সেটাকে নিজের হাতে নিয়ে মুঠো বন্দি করতে চাইবেন আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে পুরো পানিটা বেরিয়ে যাবে।আমার কথাটার আসল উদ্দেশ্য কি ছিল জানেন? যতক্ষণ আপনি পানিটাকে মুক্তভাবে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ওকে ওর মতন থাকতে দিয়েছিলেন ততক্ষণ কিন্তু ঠিকই ছিল।তখনও কিন্তু ওই পানির উপর আপনারই মালিকানা ছিল।কিন্তু যেই না আপনি বেশি অধিকারবোধ ফলাতে চেয়ে একদম নিজের মুঠোর মাঝে বন্দী করতে গেলেন অমনি হারিয়ে ফেললেন।আমি কিন্তু আপনাকে অন্য কিছু বোঝাতে চাইনি একটা সাধারণ কথা বললাম।আর আপনি তো আবার অতিরিক্ত বুদ্ধিমান।এত বড় চাকরি করেন,পড়াশোনায় ভালো ছিলেন নিশ্চয়ই আমার কথাটা বুঝেই গেছেন।"
কথাটা বলে নির্ভয় বাড়ির ভেতর চলে গেল।প্রয়াস প্রেয়নার হাত ধরে নিজেদের ফ্ল্যাটে চলে গেল।
প্রবীর শিকদার প্রতিদিনের তুলনায় আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছিলেন।আসার পর থেকে মেয়েকে দেখতে না পেয়ে তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।তার স্ত্রী কোন মতে আটকে রেখেছেন তাকে।এমন সময় দরজা দিয়ে ছেলেকে নিজের প্রাণপ্রিয় মেয়েকে এভাবে হাত ধরে টেনে আনতে দেখে তার ভ্রুঁ জোড়া আপনা আপনি কুঁচকে এলো।তার উপর যখন দেখলেন তার মেয়ের চোখে জল তার বুকটা যেন মোচর দিয়ে উঠলো।তড়িঘড়ি করে তিনি এগিয়ে গেলেন।প্রয়াসের হাত থেকে দ্রুত প্রেয়নার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে একটা ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
"এসব কোন ধরনের আচরণ প্রয়াস?ওর হাতটা এত জোরে ধরেছো কেন লাগছে তো ওর?"
"আমার তো আজকাল তোমার আদরের মেয়ের আচরণ ঠিক লাগছে না বাবা।ওর হাতটা ঠিক এভাবেই শক্ত করে ধরতে হবে না হলে বেরিয়ে যাবে।"
"কি বলতে চাইছো তুমি?কি করেছে আমার মামনি?"
"সেটা তুমি ওকে জিজ্ঞেস করো।"
প্রবীর শিকদার মেয়ের দিকে তাকালেন।দু হাতের আজলায় মেয়ের কান্নারত মুখটা নিয়ে আদুরে গলায় বললেন,
"কি হয়েছে মামনি আমায় বলোতো?তোমার ভাইয়া এত রাগ করেছে কেন?"
বাবার এমন আদুরে কণ্ঠ পেয়ে প্রেয়নার কান্নার তোপ আরোও বাড়লো।শব্দ করে কেঁদে উঠে অভিযোগের কন্ঠে বলল,
"আমি কিছু করিনি।আমি তো গিয়েছিলাম নাবিলার সাথে গল্প করতে।আসার সময় ওদের বাড়ির সামনে নির্ভয়ের সাথে দেখা হয়েছিলো তাই ওনার সাথে একটু টুকটাক কথাবার্তা বলছিলাম।এর মাঝে ভাইয়া এসে ওনার সাথে কথা বলতে দেখে রাগারাগি করে।বিশ্বাস করো বাবা আমি আর কিছু করিনি।"
প্রবীর শিকদার মেয়ের চোখের জল মুছে দিলেন।এক হাতে মেয়েকে নিজের বুকের সাথে আগলে ধরে গম্ভীর কন্ঠে প্রয়াস কে বললেন,
"এখানে তো আমি অন্যায়ের কিছু দেখছি না।একজন মানুষের সাথে দেখা হয়েছে আর যেহেতু সে পূর্ব পরিচিত তার সাথে কথা বলতেই পারে।তুমি এখানে অন্যায়ের কি দেখলে?"
"অন্যায় হয়তো এখনো শুরু হয়নি বাবা কিন্তু হতে পারে ভবিষ্যতে সেই কারণেই সবকিছু শুরু হওয়ার আগে আমি থামিয়ে দিতে চাইছি।আমি তোমাকে আগেই বলেছি ওই ছেলেকে আমার পছন্দ না।যার নিজের জীবন নিয়ে কোন সিরিয়াসনেস নেই,পড়াশোনায় ভালো না,ক্যারিয়ার নিয়ে কোন চিন্তা ভাবনা নেই তেমন ছেলেকে আমি আমার বোনের আশেপাশেও দেখতে চাই না।"
"আমার দোকানে কিন্তু অসংখ্য কর্মচারী আছে।প্রতিদিন বিভিন্ন প্রয়োজনে আমায় সব সময় তাদের সাথে কথা বলতেই হয়।তাদের সবার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক।কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে তাদের গুরুত্বটা আমার জীবনে অত্যাধিক বেশি কিংবা তারা আমার পরিবারের একটা অংশ হয়ে উঠেছে।হ্যাঁ ওরা আমার পরিবার কিন্তু সেটা আমার কাজের সূত্রে যে পরিবার গঠিত হয়েছে সেই পরিবারের সদস্য।তুমি জানো নির্ভয়ের বাবা আমার বন্ধু এবং আমার অত্যন্ত বিশ্বস্ত একজন কর্মচারী।আমার বন্ধুর ছেলে মেয়ের সাথে আমার ছেলে মেয়ের কথা হবে এটা স্বাভাবিক। আমি আমার মেয়েকে বিশ্বাস করি।আমি জানি আমার অপছন্দ এমন কোন কাজ আমার মেয়ে করবে না।কি মামনি আমি ঠিক বলেছি না?"
"বিশ্বাস কর বাবা আমরা দুজন শুধু টুকটাক কথা বলছিলাম।সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে আমার ভালো লাগেনা।তোমরা তো কেউ থাকো না,ভাবি সারাদিন কাজ করে।আমি তাই একটু নাবিলার সাথে গল্প করতে যাই।"
"বুঝতে পেরেছি মামনি।আর কান্না করতে হবে না।তোমার যখন ইচ্ছে তুমি ওদের বাড়ি গিয়ে নাবিলার সাথে গল্প করে আসবে।আর যদি তোমার ইচ্ছে হয় তুমি নির্ভয়ের সাথেও কথা বলবে।"
প্রবীর শিকদারের কথায় অসম্মতি জানিয়ে প্রয়াস বলে উঠলো,
"আমি কিন্তু তোমাকে বলছি বাবা তোমার এই সিদ্ধান্তটা ঠিক না।বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে কিন্তু সবাই চায়।"
"কিন্তু চাঁদ যদি তার নিজের জায়গাটা বোঝে তাহলে আর বামনের সাহস হবে না ওকে ছোঁয়ার।আর আমি জানি আমার ঘরের চাঁদ নিজের জায়গাটা খুব ভালো করে জানে।তার পরেও যদি কেউ সাহস দেখায় তাহলে তখন না হয় তার ব্যবস্থা করা যাবে।কিন্তু ভবিষ্যতের কিছু অনিশ্চিত কথা ভেবে আমি আমার মেয়েকে কাঁদাতে পারব না।এই নিয়ে আর কোন কথা হোক আমি চাইনা।যাও ঘরে যাও।"
প্রয়াস আর কিছু বলল না।প্রেয়নার চোখের জল মুছে দিয়ে প্রবীর শিকদারও নিজের ঘরে চলে গেলেন ফ্রেশ হতে।তাহমিনা এগিয়ে এসে প্রেয়না কে বলল,
"তুমি আর নির্ভয়ের সাথে কথা বলোনা।ওই ছেলেটা খুব ভালো।আর তুমি তো তোমার ভাইকে চেনো বলো। অযথা অপমান করবে সবার সামনে।"
"এই ভয়েই আমি অনেকবার ওনাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে ভাবি।কিন্তু একটা মানুষ যদি বারবার আমার উপেক্ষা করা সত্ত্বেও নিজ থেকে এগিয়ে আসে কথা বলার জন্য তাহলে আমি কি করবো বলো?"
তাহমিনা একটা হতাশার শ্বাস ফেললো।নির্ভয় যে কেন বারবার এগিয়ে আসে প্রেয়নার সাথে কথা বলার জন্য সেটা হয়তো একটু হলেও আন্দাজ করতে পারে তাহমিনা।কিন্তু এই কথাটা মুখ দিয়ে বের করার সাহস নেই তার।না হলে যে সমস্যা গুলো আরো বাড়বে বই কমবে না।
________________
"কি দরকার ছিল বাড়ি ফেরার?সারাদিন যাদের সাথে কাঁটাও তাদের সাথে রাতটুকুও তো থেকে গেলেই পারো।"
মিরাজুল সাহেবের কথা শুনে নির্ভয়ের পা জোড়া থেমে গেল।ঘড়িতে একবার সময় দেখে নিয়ে বলল,
"রাত আটটা বাজে মাত্র।আর যদি তুমি বলো তাহলে কাল থেকে আর বাড়ি ফিরব না।"
"কাজের কাজ তো কিছু করো না সারাদিন,তাহলে এত রাত অব্দি বাইরে কি করো?"
"তোমাদের এই রোজকার কটুক্তিগুলো থেকে বাঁচার চেষ্টা করি।বাড়িতে এলেই তো প্রতিদিন তোমাদের সে একই কথা।এগুলো থেকে একটু সময় দূরে থাকার চেষ্টা করি।"
"কথা শোনার মতন কাজ করলে তো কথা তোমাকে শুনতেই হবে।জীবনের তো এমনি বারোটা বাজিয়ে রেখেছো তারপর আবার জুটিয়েছো কতগুলো লো/ফা/র বন্ধু।কে জানে সারাদিন কি করে বেড়াও ওদের সাথে মিলে!"
নির্ভয় তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
"যেখানে নিজের বাবা ছেলের উপর ভরসা রাখতে পারে না সেখানে অন্যদেরকে আর কি বলব?তুমি তো সুযোগ তৈরি করে দাও সবাইকে আমায় অপমান করার।এতগুলো বছরেও তোমার ছেলেকে চিনলে না?"
মিরাজুল সাহেব কিছু বললেন না।নির্ভয় শান্ত কন্ঠে বলল,
"আর কয়েকটা দিন আছে তারপরেই অনার্স শেষ হবে।এরপরে একটা কাজ খোঁজার চেষ্টা করবো।যদি না পাই তাহলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবো চিন্তা করোনা।আমি বড় হওয়ার পরেও আমার বাবাকে এখনো কাজ করতে হয় এটা আমার জন্যই লজ্জাজনক বাবা।বিশ্বাস করো এই লজ্জাটা প্রতিনিয়ত আমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।কিন্তু কোনো কাজ না পেলে আমি কি করবো বলো?জানি সব সময় তোমাদের হতাশ করেছি।কোনো পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পাইনি,চাকরি পাইনি,পড়াশোনাতেও ভালো না।কিন্তু না পেলে আমি কি করবো?ভাগ্যেও তো থাকতে হয় তাই না?"
"চেষ্টা করলে তবে তো পাবে?"
"চেষ্টা দিয়েই সব হয় না বাবা ভাগ্যেও থাকতে হয়।আমি চেষ্টা করেছি কিনা সেটা আমি জানি,আমার বই জানে,আমার টেবিল,আমার বদ্ধ ঘর জানে।ওরা ছাড়া আর কেউ আমার আর্তনাদ দেখেনি,আমার কান্নার আওয়াজ শোনেনি।যদি তুমি শুনতে তাহলে আমার থেকে বেশি তুমি কাঁদতে।কিন্তু আমি তো আর তোমাকে নিজের কান্নাটা দেখাতে পারিনি তাই তুমি বোঝোনা।"
"কাঁদার সময়টুকু যদি পড়তে তাহলে হয়ত একটা পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে যেতে।"
নিজের বাবার কথা শুনে নির্ভয় হাসলো।এতক্ষন ধরে যে কথাটা ওনাকে বোঝাতে চাইলো সেটা উনি বোঝোননি।
"আর কটা দিন সহ্য করো বাবা।যদি কিছু করতে না পারি তাহলে গলায় দ/ড়ি দিয়ে হলেও তোমার বোঝা আমি এবারে কমাবো।"