ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৭

🟢

"আরে মাস্টান্নি আপনি এখনো পড়ান ঊষাকে?"

ঊষা কে পড়ানো শেষে প্রভা চলেই যাচ্ছিল।দরজার কাছে দাঁড়িয়ে স্যান্ডেল পড়ছিল ঠিক এমন সময় পিছন থেকে কারো বিস্ময় ভরা কন্ঠের প্রশ্ন ভেসে এলো তার কানে।পিছন ফিরে তাকাতেই সেদিনের সেই অল্প পরিচিত মুখটা দেখতে পেলো।বেশ ভালো লেগেছিল সেদিন এই মানুষটাকে প্রভার।ঊষার থেকে পরে শুনেছিলো যে উৎসব ওর ভাই।সেদিন নিজের মায়ের বিরুদ্ধেই প্রভার হয়ে বেশ অনেকগুলো কথাই বলেছিল।আর সবগুলো কথাই প্রভার ভালোর জন্যই ছিল।কিন্তু প্রভা নিরুপায় তাই উৎসবের সেই কথাগুলো শুনতে পারেনি।

এদিকে প্রভাকে কোন কথা বলতে না দেখে উৎসব পুনরায় বলে উঠলো,

"বুঝতে পেরেছি।গালি খেতে খেতে আপনার কথার বাত্তি নিভে গেছে।এটাই হওয়ার ছিল।আমার কথা শুনলে অন্তত ঠিকঠাক কথা বলতে পারতেন।"

উৎসবের কথায় প্রভা সম্বিত ফিরে পেল।মৃদু হেসে বলল,

"না নিভে যায়নি।"

"ও তাহলে কথা বলতে পারেন আপনি।তা সেদিন যে এত করে বোঝালাম তারপরও আবার পড়াতে এসেছেন!মানে আপনি যে ব্যাক্কল সেটা প্রমাণ করা কি খুব দরকার?"

"না সেটা প্রমাণ করা খুব দরকার না কিন্তু খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাটা খুব দরকার তাই না?"

উৎসব ভ্রুঁ কুচকে প্রশ্ন করলো,

"মানে?"

"মানেটা হলো জীবনের তাগিদে কিছু কিছু সময় কয়েকটা অপমান ভুলে গিয়েও নিজের কাজটা চালিয়ে যেতে হয়।আমি জানিনা আপনি জীবনের এত স্ট্রাগলের মানে বুঝবেন কিনা তবে এতোটুকু বলতে পারে এই টিউশনটা ছাড়লে হয়তো কয়েকটা দিন আমাকে না খেয়ে থাকতে হতে পারতো।খুব দরকার আমার এই কাজটা।সেজন্য ছাড়তে পারিনি।"

"অন্য কোথাও ব্যবস্থা করলেই তো পারতেন?"

"এত সহজ মনে হয় আপনার কাছে?অবশ্য আপনার কাছে সহজ মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক না।আপনি না কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন আর না হয়তো কখনো পড়বেন।কখনো আপনাকে এত কষ্ট করে কাজ খুঁজতে হবে না কিন্তু আমাকে খুঁজতে হবে।আর এখনকার সময় একটা কাজ পাওয়া যে কতটা কষ্টকর সেটা যাদের কাছে কাজ নেই তারা খুব ভালো করে বোঝে।"

"বাব্বাহ মাস্টান্নি তো দেখি বেশ ভালোই কথাবার্তা বলে।তা আজকে আবার কিছু খেলেন নাকি?"

উৎসবের কথাটা প্রভা ঠিক বুঝতে পারল না।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

"কি খাব?"

প্রভার এমন প্রশ্নে উৎসব শব্দ করে হেসে উঠলো।হাসতে হাসতে বলল,

"আমার আম্মাজানের কাছে স্পেশাল ডোজ খাওয়ার কথা বললাম।মানে ওই বকা গালি এসব আর কি।তা খেয়েছেন নাকি পেট ফাঁকা আছে?"

উৎসবের কথা শুনে প্রভাও হালকা হেসে বলল,

"না আপাতত আজকে পেটটা ফাঁকাই আছে।কিন্তু যদি আবার দেরি করে আসি আর ওনার কাছে ধরা পড়ে যাই তাহলে সেদিন আর পেট ফাঁকা থাকবেনা।একদম তিন-চার দিনের খাবার খাইয়েই ছাড়বেন বলে আমার মনে হয়।"

দুজনে এবার একযোগে হেসে উঠলো।কথাবার্তার মাঝে প্রভা একবার ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে উৎসব কে তাড়া দিয়ে বলল,

"এখন তাহলে আসছি।আরো একটা জায়গায় যেতে হবে।দেরি করে গেলে ওখানে গিয়ে পেট ভরে যাবে কথা শুনতে শুনতে।"

"সারাদিন অনেক কষ্ট করতে হয় তাই না?"

"সে তো একটু করতেই হয়।ওটা কোন ব্যাপার না।কষ্ট না করলে জীবনে কিছু পাওয়া যায় না।জানেন নিজে সারাদিন এত পরিশ্রম করে যখন সেই ফলটা হাতে পাই খুব আনন্দ হয়।মনে হয় যে আমার কষ্ট করা স্বার্থক।আল্লাহ তো আমায় আমার কষ্টের ফল দেয়।এমনটাতো না যে শুধু কষ্টই করে যাই কিন্তু তার প্রতিদানে কিছু পাই না।যেমন কষ্ট করি ঠিক তেমনি ফলও পাই।আসছি।"

কথাটা বলে প্রভা চলে গেল।উৎসব ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলো।প্রভার ভাবনার সাথে উৎসব যেন কারো একটা ভাবনার ভীষণ মিল পেল।সে মানুষটা আর তার ভাবনা দুটোই উৎসবের ভীষণ প্রিয়।ঠিক তেমনি আজ প্রভার ভাবনাটাও উৎসবের কাছে ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠলো।তবে হ্যাঁ মানুষটা এখনো তেমন প্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি।এখন অব্দি শুধু পরিচিত।কিন্তু প্রিয়র তালিকায় আসা এতটাও সহজ নয় আবার হয়তোবা খুব সহজ!সবটাই অবশ্য নির্ভর করে সেই মানুষটার উপর,তার ভাবনা,চলাফেরা,চালচলন সবকিছুর উপর।যদি সেই মানুষের গুণগুলো বিশ্বাস হয় তাহলে হয়তো প্রিয়র তালিকায় চলে আসত খুব বেশি একটা সময় লাগবে না।

________________

পশ্চিম আকাশে সূর্য প্রায় ঢলে পড়েছে।কিন্তু গরমের তীব্রতা এখনো কমেনি।জনজীবন যেন একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।একফোঁটা বৃষ্টির জন্য সবাই হা হুতাশ করছে।একটু স্বস্তি চায় তারা।বাসস্ট্যান্ডের কাছে রাস্তার একপাশে একটা ছোট্ট মুদিখানার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নির্ভীক।একেই তো গরম বেশি তার ওপর এই জায়গাতে লোক সমাগমটাও একটু বেশি।ফলস্বরুপ গরমটাও যেন একটু বেশিই লাগছে। পকেট থেকে রুমালটা বের করে কপালের ঘামটুকু মুছে নিল সে।এই গরমের মাঝে একটু ইচ্ছে করছে ঠান্ডা কিছু কিনে খেতে কিন্তু পকেটের অবস্থার কথা ভেবে আর সাহস হচ্ছে না।যা টাকা আছে এই দিয়ে সারা মাস চালাতে হবে।প্রয়োজনীয় খরচ পাতি করতেই টানাটানি পড়ে যাব,সেখানে অতিরিক্ত খরচের কথা মাথাতে আনাও ভুল।

এই সময় এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ নির্ভীক নিজের সৎ ভাইকে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছে।তার আশার অবশ্য ইচ্ছে ছিল না কিন্তু নতুন করে কোন অশান্তি তৈরি করতে চায়নি তাই আসতে হয়েছে।বরাবর সে সব রকমের ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চায়।একটা সাধারণ স্বাভাবিক জীবন তার ভীষণ পছন্দ।ঠিক সেই কারণে যতটা পারে নিজের রাগ ইচ্ছে গুলোকে নিজের মাঝে দমিয়ে রাখে।কিন্তু এতক্ষণেও সে ছেলের আসার নাম নেই।ফোন করছে ফোনও তুলছে না।প্রায় এক ঘন্টারও বেশি সময় হয়ে গেছে নির্ভীক এখানে দাঁড়িয়ে আছে।

এভাবেই আরো প্রায় বিশ মিনিটের মত সময় কেটে গেল।নির্ভীক সমানে সেই ছেলেকে ফোন করে যাচ্ছে অথচ তার ফোন রিসিভ করার কোন নামই নেই।ববিতা বেগম কেও অনেকবার কল করেছে কিন্তু তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।সামিউল চৌধুরীর মোবাইল এই সময় বন্ধ থাকে।কাজের সময় মোবাইল ব্যবহার করতে দেয় না।বাকি রইল সামিয়া,ওর নাম্বার নির্ভীকের কাছে নেই।নির্ভীক এর এখন প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে।সাব্বিরকে না নিয়েও বাড়ি ফিরতে পারছে না তাহলে আবার অশান্তি হবে।নির্ভীকের এসব ভাবনার মাঝে ওর ফোনটা বেজে উঠলো।নির্ভীক ভাবলো নিশ্চয়ই সাব্বির কিংবা বাড়ির অন্য কেউ কল করেছে।তার ভাবনা সঠিক প্রমাণিত হলো।সাব্বিরই কল করেছে।নির্ভীক চটজলদি ফোনটা ধরে মৃদু রাগী কন্ঠে বলল,

"কোথায় আছো তুমি এখন?আর ফোন কেন রিসিভ করো না?"

অপর পাশ থেকে সাব্বির মিন মিন করে বলল,

"আসলে ভাইয়া ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল তাই খেয়াল করিনি।"

"কোথায় এখন তুমি?আরো কতক্ষণ লাগবে আসতে?"

"আমি তো বাড়ি এসে গেছি।আমি তো তোমাকে খুঁজছি,তুমি কোথায়?"

নির্ভীক ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্নাত্মক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

"তুমি বাড়ি ফিরে গেছো?কিন্তু আমি তো তোমার জন্য বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছি।তুমি জানতে না আমি তোমাকে নিতে আসবো?"

"না আমি তো জানতাম না।আর আমি তো ট্রেনে এসেছি,তুমি বাসস্ট্যান্ডে কি করছো?আর আমাকে নিতে যেতে কে বলেছে?আমি তো মা কে বারণ করে দিয়েছিলাম যেন বাড়ি থেকে কেউ না যায়।"

নির্ভীক আর কোন কথা না বলে চুপচাপ ফোনটা কেটে দিল।সে সব সময় সবকিছু চুপচাপ মেনে নিতে চায় তার মানে তো এটা না যে জেনে বুঝে ওকে কষ্ট দিতে হবে।নির্ভীকও তো একটা মানুষ!গরমের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে তো ওরও কষ্ট হয়!নিজের সৎ ছেলে বলে ববিতা বেগম ওকে পছন্দ করেনা এই কথাটা নির্ভীক খুব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে।কিন্তু তাই বলে একটা মানুষ হিসেবেও তো ওকে বিবেচনা করা যায়!একটু তো ভালো ব্যবহার ওরও প্রাপ্য!ফোনটা পকেটে রেখে নির্ভীক ফুটপাত ধরে হাঁটা দিল।হাঁটতে হাটঁতে পেছন থেকে কোন মেয়েলী গলার স্বর ভেসে এলো ওর কানে।কেউ একজন শুধু মিষ্টি কন্ঠে ওকে বলল"শুনুন"।কন্ঠটা বেশ পরিচিত লাগল নির্ভীকের।পিছন ফিরে তাকাতেই সেই মিষ্টি মুখটা দেখতে পেল যার ঠোঁট জুড়ে লেপ্টে আছে বিস্তৃত হাসি।কিন্তু প্রভা কে এই সময় এখানে দেখে নির্ভীক বেশ অবাক হয়েছে।

"আরে আপনি এখন এখানে?"

"আমি তো টিউশন থেকে বাড়ি ফিরছিলাম।হুট করে আপনাকে দেখলাম তাই ডাক দিলাম।"

নির্ভীক মৃদু হেসে বলল,

"তা বেশ ভালো করেছেন।তা এখান থেকে বাড়ি কতদূর?"

"হেঁটে যেতে বিশ মিনিটের মতন সময় লাগবে।আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন?"

"আমিও বাড়িই ফিরছিলাম।কিন্তু আমার বাড়ি হেঁটে যেতে অবশ্য বিশ মিনিটে হবে না।এখান থেকে তাও প্রায় এক ঘন্টার মতন সময় লাগবে হেঁটে যেতে।"

"তাহলে হাঁটছিলেন কেন?"

"এমনি।চলুন একসাথে হাঁটি।"

দুজনের টুকটাক কথাবার্তার সাথে হাঁটার মাঝে প্রভার ফোনটা বেজে উঠলো।হাত ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে দেখলো সৌমি কল করেছে।কোনরকম কোন সময় ব্যয় না করে ফোনটা রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে সৌমি যা বলল তা শুনে প্রভার ভীষণ রাগ উঠলো।রাগী কন্ঠে সৌমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"ওটা ওর মুখে ছুড়ে মা*র?তারপরও যদি কাজ না হয় তাহলে বাড়িতে স্যান্ডেল আছে না?ওই স্যান্ডেল মে*রে ওকে বাড়ি থেকে বের করে দে।তারপরও যদি কাজ না হয় তাহলে আমি আসছি।আর ওই ডেলিভারি ম্যানকে বলে দে যদি আমি আজকে আসি তাহলে ওর লা**শ বের হবে আমার ফ্ল্যাট থেকে।"

বিজ্ঞাপন

প্রভার মুখ থেকে হঠাৎ এমন কথা শুনে নির্ভীক ভীষণ চমকালো।এমন শান্ত আর মিষ্টি মেয়েটার হঠাৎ এমন রণচন্ডী রূপের কারণ ঠিক ঠাহর করতে পারল না।অপর পাশের মানুষটা কি বলছে সেটাও শুনতে পারছে না।আরো টুকটাক দুই একটা কথা বলে প্রভা ফোনটা রেখে দিল।শেষের দিকে অবশ্য তার মেজাজটা একটু ঠান্ডা হয়েছিল।

ফোনটা রাখতেইই নির্ভীক প্রশ্ন করলো,

"আপনি ক্রিমিনাল নাকি?"

নির্ভীকের এমন প্রশ্নে প্রভা ভরকালো।বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"ক্রিমিনাল হতে যাব কেন?আমাকে দেখে আপনার ক্রিমিনাল মনে হয়?"

"না তেমনটা মনে হতো না কিন্তু আপনার শেষের কয়েকটা কথা শুনে মনে হলো আর কি।না মানে আসলে একজনকে খু*ন করার কথা বললেন তো তাই বললাম আর কি।"

"ওহ্ ওই ব্যাপারে বলছেন আগে বলবেন না?আসলে কি বলুন তো যে কেউ ওকে খু**ন করতে চাইবে।মানে আমার জীবনটা একদম অতিষ্ট করে তুলেছে।বিশ্বাস করুন যদি আমি একটু বেশি সাহসী হতাম না তাহলে সত্যি আমি খু**ন করতাম।"

"তা খু*নে*র কারণটা কি জানতে পারি?"

"জানেন তো খুব জটিল একটা কারণ।আমি না খুব সমস্যার মাঝে আছি।"

প্রভার কথার ধরন দেখে নির্ভীক বুঝতে পারলো যে সমস্যাটা বেশ জটিল।গুরুতর ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো,

"কি হয়েছে বলুন তো?"

"আসলে আমার কলেজে একটা ছেলে আমায় খুব বিরক্ত করে।বারবার বিয়ের প্রস্তাব দেয় কিন্তু একটুও ভালো ছেলে না।একে তো রাজনীতি করে যেটা আমার একদম অপছন্দের।তার ওপর আবার চরিত্রহীন,নেশা করে মানে ওকে দেখলে আমার গা ঘিন ঘিন করে।প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু উপহার আমার বাড়িতে পাঠায়।আর প্রত্যেকবার একটাই ডেলিভারিম্যান আসে।আমি সত্যিই জানিনা ওটা কোনো দোকানের ডেলিভারিম্যান নাকি ওরই লোক।ওকে এত বার করে মানা করেছি যে আমার বাড়িতে কোন পার্সেল দিতে আসবে না কিংবা যেখান থেকে অর্ডার করেছে সেই জায়গার আমায় এড্রেস টা দাও আমি ওদেরকে বলে দিচ্ছি যেন আমার ঠিকানায় কোন পার্সেল না পাঠায় কিন্তু না ওর একটাই কথা আপনার ঠিকানায় পার্সেল যখন এসেছে আপনাকে নিতে হবে।"

"আপনি সরাসরি ওকে বলেছেন যে আপনি ওকে পছন্দ করেন না?"

"হাজার বার করে বলেছি।অস*ভ্যতামি করার জন্য একদিন চড় অব্দি মে*রে*ছি*লা*ম কলেজে সবার সামনে।তারপর থেকে ও বলে আমার হাতে চড় খেয়ে নাকি ও আমার প্রেমে পড়েছে।মানে ভাবতে পারছেন যে কতটা নির্লজ্জ হলে একটা মানুষ এমন কথা বলতে পারে?আমি জাস্ট হাঁপিয়ে উঠেছি।আমি অনেক ওর থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু সফল হতে পারিনি।"

"তো কেউ হেল্প করার মত নেই আপনাকে?বাড়িতে জানিয়েছেন?"

"বাড়ির ব্যাপারটা পরে বলছি আপনাকে।কলেজে আমায় সাহায্য করতে পারে এমন কয়েকটা মানুষ আছে কিন্তু আমি ওদের সাথে যোগাযোগই করতে পারছি না।আমার একটা ফ্রেন্ড আছে ও আমাকে কয়েকজনের নাম বলেছে।আমি যে ওদের সাথে গিয়ে কথা বলব ওদেরকে চিনিও না খুঁজেও পাচ্ছিনা।দুই দিন খোঁজ করেছি কিন্তু তখন পাইনি।আমি এ বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ কেও জানিয়েছি কিন্তু ওনারা তেমন কোন ব্যবস্থাই নেননি।আসলে ওই ইশরাকের বাবাও নেতা।মানে ওনাদের ভয়েই আসলে কেউ আমায় সাহায্য করছে না।"

ইশরাকের নামটা শুনতেই নির্ভীক চোখ দুটো বড় বড় করে প্রভার দিকে তাকালো।সন্দেহী কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

"ইশরাক নাম বললেন?"

"হ্যাঁ।"

"পুরো নাম কি ইশরাক খান?"

"হ্যাঁ কেন আপনি চেনেন?"

"আপনি কোন কলেজে পড়েন?"

প্রভা নিজের কলেজের নামটা বলতেই বিস্ময়ে নির্ভীকের মুখটা হা হয়ে গেলো।প্রভা ওদের কলেজেই পড়ে অথচ নির্ভীক সেটা জানেই না।এতগুলো বছরে একটাবারের জন্য কখনো না প্রভার নাম শুনেছে না প্রভাকে দেখেছে।কি অদ্ভুত ব্যাপার!

কিন্তু নির্ভীকের মনে একটা প্রশ্ন এখনো থেকেই গেল।কে এমন আছে যে ইশরাকের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রভাকে সাহায্য করতে চেয়েছে?নিজের জীবনের ভয়ে তো কেউ ইশরাকের সাথে লাগতে চায় না।কলেজে বর্তমানে ইশরাকের যে শত্রুরা আছে যদি প্রভা ওদের সাহায্য নিতে চায় তাহলে সেটাও প্রভার জন্য একদমই ঠিক হবে না কেননা ওরাও যে খুব একটা সুবিধার না সেটা নির্ভীক খুব ভালো করেই জানে।এদিকে নির্ভীককে ভাবনার জগতে ডুবে থাকতে দেখে প্রভা বলে উঠলো,

"আপনি আবার কোন জগতে চলে গেলেন?"

"যাদের থেকে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন তাদের নাম জানেন?"

"হ্যাঁ জানি তো।ওরা অনেক জন বন্ধু।আমার বন্ধু বকুল বলেছে ওরা সবাই নাকি খুব ভালো।সবাইকে অনেক সাহায্য করে।"

বকুলের নামটা শুনে নির্ভীক বুঝতে পারল যে তার মানে দুদিন আগে বকুল প্রভার কথাই ওদেরকে বলেছিল। প্রভাকে সাহায্য করার জন্য এসেছিল ওদের কাছে।

"নামগুলো একটু বলুন তো শুনি।"

"তিসান,নির্ভীক,উৎসব আরেকটা যেন কি ছিল মনে পড়ছে না।ন দিয়েই নামটা।আমি পরে মনে পড়লে আপনাকে বলব কেমন।"

"নির্ভয়।"

"হ্যাঁ নির্ভয়,একদম ঠিক বলেছেন।কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?আপনি কি চেনেন নাকি ওনাদেরকে?"

প্রভার এমন প্রশ্নে নির্ভীক হালকা হেসে বলল,

"আপনি আমার নাম জানেন?কখনো তো জিজ্ঞেস করেন নি আর না আমি কখনো বলেছি।"

"সত্যি তো আমি তো কখনো আপনার নামই জিজ্ঞেস করিনি।অবশ্য জিজ্ঞেস করবোই বা কখন এই নিয়ে তো দেখাই হলো দুইবার।আপনার নাম কি কবি মশাই?"

"নির্ভীক।যাদের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন তাদের মাঝে একজন।"

প্রথম দফায় নির্ভীক এর কথাটা প্রভার ঠিক বিশ্বাস হলো না।সন্দেহী কন্ঠে বলল,

"আপনি কি মজা করছেন আমার সাথে?"

"আমার একটা খারাপ অভ্যাস আছে জানেন তো আমি আবার মজা করতে পারি না।জীবনে এত বেশি সিরিয়াস মুহূর্তগুলোর সামনাসামনি হতে হয়েছে যে মজা কি জিনিস সেটা আর কখনো বুঝে উঠতে পারিনি।"

"আপনি সত্যি ওদের মাঝে একজন?"

"বিশ্বাস না হলে কাল বরং কলেজে আসবেন দেখা করাবো সবার সাথে।আমাদের কলেজের বাইরে যে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান আছে না।একজন বয়স্ক মহিলা থাকে চায়ের দোকানে ওখানে আসবেন কেমন।ওখানে আমরা সবাই আড্ডা দেই।"

প্রভা এবারে নিশ্চিত হল।কেননা বকুলের থেকে ও নির্ভীকদের এই ঠিকানাটাই শুনেছিল।প্রভা অবাক হয়েছে ঠিকই কিন্তু তার সাথে সাথে ভীষণ খুশি হয়েছে।যার কাছে সাহায্যে চাইতে যাবে সেই মানুষটা অন্তত ওর পরিচিত এতেই শান্তি।প্রভা উচ্ছসিত কন্ঠে বলল,

"এবার আমার বিশ্বাস হয়েছে।আপনি না সত্যিই খুব ভালো।বারবার অপ্রত্যাশিতভাবে আমাকে সাহায্য করছেন।অনেক ঋণ জমা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।"

"শোধ করার পরিকল্পনা আছে নাকি?"

"চাইলে করতে পারি।"

"না থাক।আপনি বরং সারাজীবন আমার কাছে ঋণী হয়ে থাকুন।তাহলে আমার কথা আপনার মনে থাকবে। না হলে এই ঋণটা শোধ হয়ে গেলেই আবর্জনার মতন আবার আমার স্মৃতিটুকু মস্তিষ্ক থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে।"

"আমার মস্তিষ্কে স্মৃতি হয়ে থাকার এত ইচ্ছে?"

নির্ভীক মুচকি হেসে বলল,

"সুন্দরী মেয়েদের মস্তিষ্কে স্মৃতি হয়ে থাকাটাও একটা সৌভাগ্য ম্যাডাম।"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প