ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৫

🟢

ক্লাসের ফাঁকে সৌমি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে বাইরের একটা দোকানে কিছু খাবার কিনতে এসেছে দুজনের জন্য।প্রভার সাথে আসার কথা ছিল কিন্তু প্রভা আপাতত বকুলের সাথে গল্প করতে ব্যস্ত।বেশ অনেকদিন হলো বকুলের সাথে কথা বলা হয় না।আর ঠিক এই কারণেই সৌমি একাই এসেছে।সৌমি যে দোকানটায় খাবার কিনতে এসেছে ঠিক সেই দোকানের সামনেই বেঞ্চের উপর বসে আছে নির্ভীকরা সবাই।এটাই তাদের প্রতিদিনকার আড্ডা দেওয়ার নির্দিষ্ট জায়গা।ওদের থেকে একটু দূরে সৌমিকে দেখতে পেয়েই নির্ভয় উৎসবকে তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,

"এই উৎসব দেখ দেখ এই সেই মেয়েটা।"

উৎসব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একবার সৌমির দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

"তোর বউ?"

নির্ভয় বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল,

"ধুর আমার বউ হতে যাবে কেন?আরেকদিন তোকে বলেছিলাম না একটা পিঁপড়ের কথা আমাকে যে গন্ডার বলেছিল এই সেই মেয়েটা।"

উৎসব মনে করার চেষ্টা করল।খুব তাড়াতাড়ি তার মনে পড়ে গেল।প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"তো কি করতে বলছিস?"

"ভাই তোকে কিছু একটা করতেই হবে।তোর বন্ধু কে ওই মেয়েটা অপমান করেছিল।আমাকে গন্ডার হাতি যা ইচ্ছে তাই বলেছিলো আর তুই আমার অপমানের বদলা নিবি না?"

"এটা আবার কি এমন ব্যাপার।কিন্তু বদলে নেব কিভাবে সেটা বল?"

"একটু ভয় দেখা।একা আছে একটু ভয় দেখালেই ভয় পেয়ে যাবে।তার মধ্যে একে আমার একটু গাধা গাধা মনে হয়েছিল।"

এদিকে ওদের কথাবার্তার মাঝে সৌমির কাজ শেষ হওয়ায় সে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে উৎসব ডেকে উঠলো,

"ওহে পিপীলিকা দাঁড়াও!"

ডাকটা শুনে সৌমি থামলো ঠিকই কিন্তু আদৌ তাকে ডাকা হলো কিনা সেই বিষয় নিয়ে মনের মাঝে একটা প্রশ্ন জেগে উঠলো।পিছন ফিরে তাকাতেই উৎসব আঙুলের ইশারায় ওকে কাছে আসতে বলল।সৌমি সন্দেহী কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

"আমাকে ডাকছেন?"

উৎসব মাথা দাঁড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানাতেই সৌমি এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো,

"জ্বি বলুন।"

উৎসব গলায় গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে ওর পাশে বসা নির্ভয় কে দেখিয়ে সৌমি কে প্রশ্ন করলো,

"তুমি ওর সাথে খারাপ আচরণ করেছো?"

প্রথম দফায় নির্ভয়ের মুখটা পরিচিত লাগলেও কোথায় দেখেছে মনে করে উঠতে পারল না।মস্তিষ্কে একটু চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়লো।বিরক্তি ভরা কন্ঠে উৎসবকে বলল,

"উনি আমার সাথে যেমন আচরণ করেছে আমি শুধু তার প্রেক্ষিতে ওনার সাথেও ঠিক একই আচরণ করেছি।"

উৎসব পুনরায় গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

"তুমি যে নির্ভয়ের সাথে এমন আচরণ করেছো তুমি জানো ও কে?"

সৌমি স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

"হ্যাঁ জানি তো সাইজ হাতির মতন আর চামড়া গন্ডারের মতন।আর নাম গন্ডার শাহরিয়ার।"

সৌমির এমন কথায় উৎসব হেসে ফেলল।এদিকে অপমানে নির্ভয়ের মুখটা কালো হয়ে উঠলো।তার ওপর আবার উৎসবকে হাসতে দেখে রাগ হলো।উপায় না পেয়ে এবার নির্ভীক কে উদ্দেশ্য করে অভিযোগের কন্ঠে বলল,

"এই নির্ভীক তুই অন্তত কিছু বল?দেখেছিস তোর সামনে কিভাবে আমাকে অপমান করছে।"

নির্ভীক গভীর ভাবনায় নিমগ্ন ছিল।ফলস্বরূপ এতক্ষণের কথাবার্তার কিছুই তার কানে যায়নি।প্রশ্নাত্নক কণ্ঠে বলল,

"কাকে কি বলবো?"

নির্ভয় একটা হতাশার শ্বাস ফেলল।কাকে সে অভিযোগ করছে যে দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বিশ ঘন্টাই অন্য জগতে চলে যায় তাকে?উৎসব নির্ভয় কে আশ্বস্ত করে বলল,

"আমি দেখছি।"

বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুজে দাঁড়ালো।চোখে মুখে ফুটিয়ে তুললো কাঠিন্যতা।গম্ভীর কন্ঠে সৌমি কে বলল,

"এই যে তুমি আমার বন্ধুর সাথে বেয়াদবি করলে তুমি জানো এর ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে?আমরা যদি চাই না তোমাকে কলেজ কেন এই শহর ছাড়া করতে পারি।"

উৎসবের কথায় সৌমি একটু ভয় পেল।তোতলানো কন্ঠে বলল,

"ভভয় দেখাচ্ছেন আমায় আপনি?"

"একদমই না।আমরা যেটা বলি সেটা করে দেখাই।শোনো মেয়ে এই কলেজে পড়ে আমার বন্ধুর সাথে বাড়াবাড়ি করবে সেসব কিন্তু আমরা একদম সহ্য করব না।বেশি বাড়াবাড়ি করলে না গুম করে দেব।কিডন্যাপ করে সোজা বর্ডার দিয়ে অন্য দেশে পাচার করে দেবো।"

নির্ভীক বিরক্তিকর কণ্ঠে উৎসবকে বাঁধা দিয়ে বলল,

"এসব কি হচ্ছে উৎসব?মেয়েটা মনে হয় নতুন।ওকে এভাবে ভয় দেখাচ্ছিস কেন?চুপ কর।"

"ধুর শালা তুই চুপ কর।বেশি কথা বললে না ওর সাথে তোকেও পাচার করে দেব।আর এই যে মেয়ে তোমাকে বলছি সাবধানে থেকো।তোমার সম্পর্কে কিন্তু অলরেডি সব খোঁজ-খবর নেওয়া আমাদের শেষ।তোমাকে যার কাছে পাচার করব সেই ক্লায়েন্টও ঠিক করে রেখেছি।শুধু অপেক্ষায় আছি তোমার শেষ একটা ভুলের।যেই না ভুল করবে অমনি তোমার টাটা বাই বাই হয়ে যাবে।"

সৌমি ভয়ে কেঁদে ফেলল।মেয়েটাকে সহজ সরল বলা চলে না বোকা কে জানে?কে কোন কথাটা মজা করে বলছে আর কে কোন কথাটা সিরিয়াস ভাবে বলছে সেই বোধটা তার আজ অব্দি হয়নি।এদিকে সৌমি কে কাঁদতে দেখে উৎসব ভরকালো।ব্যস্ত কন্ঠে বলল,

"আরে কাঁদছো কেন?"

সৌমি এক হাতে নিজের চোখের জল মুছে নাক টানতে টানতে বলল,

"আপনি কি ভেবেছেন আমার বন্ধু নেই?আমারও বন্ধু আছে।ওকে বললে না আপনাদেরকেও পাচার করে দেবে।আমি সবাইকে বলে দেবো যে আমাদের কলেজে পাচারকারীরা আছে।পুলিশকেও বলে দেবো।তারপর দেখবেন আপনাদেরকে জেলে নিয়ে যাবে।আমি একা একা জন্য আমাকে ভয় দেখালেন তো?আমার বন্ধু সাথে থাকলে আর এমন করতে পারতেন না।এক্ষুনি গিয়ে ওকে সব বলে দেবো।তারপর দেখবেন আপনাদের কি করে।"

কথাটা বলে সৌমি চোখ মুছতে মুছতে সেখান থেকে চলে গেল।সৌমি চলে যেতেই উৎসব অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।হাসতে হাসতে নির্ভীকের গায়ের উপর পড়লো।

"এই নির্ভয় এ তো দেখি বাংলাদেশের অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত বোকা।এ মনে হয় সত্যি বিশ্বাস করে নিয়েছে যে আমি ওকে পাচার করে দেব।"

ওদের কথার মাঝেই সেখানে বকুল আর তিসান একসাথে এলো।উৎসবকে হাসতে দেখে তিসান বলে উঠলো,

"সকাল সকাল কি তোমার হাসির রোগ হলো নাকি উৎসব?"

"আরে না ভাই,তুমি থাকলে তুমিও হাসতে।"

"ছিলাম না জন্য হাসি থেকে বঞ্চিত হবো এটা তো হতে পারে না।এখন বলো শুনি।"

উৎসব কিছু বলতে নেবে তার আগেই তিসানের পাশ থেকে বকুল বলে উঠলো,

"রাখো তো তোমাদের এসব হাসি তামাশার কথা।আগে আমার কথা শোনো।আমার একটা দরকারি কথা আছে তোমাদের সাথে।"

বকুলের কথাবার্তা অনেকটা মেয়েদের মতন।তার ওপর আবার কথার মাঝে তার হাত নাড়িয়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করা স্বভাব।ফলস্বরূপ বকুলের কথা শুনে উৎসবের হাসি আরো বেড়ে গেল।উৎসবের হাসি থামার নামই নিচ্ছে না।নির্ভীকের এখন বিরক্ত লাগছে।মৃদু রাগী কন্ঠে উৎসব কে বলল,

"হয় তুই থামবি না হলে আমি এখান থেকে চলে যাব।"

নির্ভীকের হুমকিতে মুহূর্তের মাঝেই উৎসবের হাসি থেমে গেল।ঠিকঠাক হয়ে বসে গুরুতর ভঙ্গিতে বকুলকে বলল,

"হ্যাঁ বকুল ফুল বলো।"

বকুল চোখে মুখে বিরক্তিভাব ফুটিয়ে তুলে উৎসবকে বলল,

"কতবার তোমাকে বলেছি আমার নাম বকুল।বকুল ফুল ডাকবে না আমাকে।মেয়ে মেয়ে লাগে শুনতে।"

"আমারও যে তোমাকে মেয়ে মেয়ে লাগে বকুল ফুল সেজন্যই তো তোমাকে এই নামে ডাকি।"

"ছিঃ।তুমিও না একটা যাচ্ছে তাই।আমাকে দেখে কোন দিক থেকে তোমার মেয়ে লাগে হ্যাঁ?দেখতে পাচ্ছ না তোমার সামনে একটা আস্ত ছেলে দাঁড়িয়ে আছে?"

"সমস্যা তো ওখানেই বকুল ফুল।তোমাকে তো আর সবদিক থেকে আমি দেখিনি যে বুঝবো তুমি আসলে ছেলে।আর কি বলোতো সবসময় চোখের সামনে আমরা যেটা দেখতে পাই সেটা সত্যি নাও হতে পারে।তো এখন চোখের সামনে তোমায় দেখতে পাচ্ছি ছেলে কিন্তু তুমি যে আসলেই ছেলে সেটা বিশ্বাস করব কি করে?"

"তোমার সাথে আমি আর কথাই বলব না।"

বকুলের অভিমান মাখা কন্ঠের কথা শুনে উৎসব ওর দিকে একটু ঝুকে গিয়ে গালটা টেনে দিয়ে আদুরে কন্ঠে বলল,

"রাগ করে না সোনা।তুমি তো আমার বকুল ফুল।আমার জান,প্রাণ,মান,কলিজা,ফুসফুস,কিডনি সব।আমি তো তোমায় ভালোবেসে এভাবে ডাকি।"

বকুল নিজের গাল থেকে উৎসবের হাতটা সরিয়ে নিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,

"এ্যঁহ।ঢং দেখে জান বাঁচে না।চুপ করো তো তুমি আমায় কাজের কথাটা বলতে দাও আগে।"

এবার আর কেউ হাসলো না সবাই গুরুতর ভঙ্গিতে চুপচাপ বকুলের কথায় মনেযোগ দিল।

"ওই যে ইশরাক আছে না ও আমার একটা বান্ধবীকে খুব বিরক্ত করে।তোমরা কি ওকে একটু সাহায্য করতে পারবে?"

বকুলের কথার প্রেক্ষিতে সর্বপ্রথম তিসান চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠলো,

"বিরক্ত করে মানে?কি নিয়ে বিরক্ত করে?"

"আর বলো না আমার বান্ধবী দেখতে আসলে খুব সুন্দর।একদম রসগোল্লার মতন মিষ্টি।তো ইশরাকের ওকে পছন্দ হয়ে গেছে।কলেজে বিরক্ত করে বিয়ে করতে চায়।কিন্তু ওর মত ছেলেকে কেউ বিয়ে করবে নাকি?এই নিয়ে ঝামেলা করে,রোজই বিরক্ত করে।"

নির্ভীক প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,

"বাড়িতে জানায়নি কিছু?"

"না।কি করে জানবে ওর পরিবারে কেউ নেই।ও অনাথ।"

"কবে থেকে বিরক্ত করছে?"

"এই চার পাঁচ মাস মত হবে।"

নির্ভীক সহ বাকিরা বেশ অবাক হল।যদি সত্যিই পছন্দ হয়ে থাকে তাহলে তো ইশরাকের এতটা সময় অপেক্ষা করার কথা না।হয় তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে বিয়ে করবে না হলে সম্মানে হাত দেবে।চুপ করে থাকার মানুষ তো ইশরাক নয়।নির্ভীক প্রশ্নাত্মক গলায় তিসান কে বলল,

"এই ভাই এর এতটা অপেক্ষা করার কারণ কি হতে পারে?"

"জানিনা।তবে যেহেতু ও এই ব্যাপারটাতে এত সময় দিচ্ছে তার মানে পরিকল্পনা বড় কিছু আছে।বকুল তোমার বন্ধুকে একটু সাবধানে থাকতে বলো।"

"সাবধানে আর কি থাকবে যেখানেই থাকে সেখানে হাজির হয়ে যায়।বাড়ির ঠিকানাটাও জেনে গেছে।যখন তখন বাড়িতে এটা সেটা উপহার পাঠাতেই থাকে।"

বকুলের কথা শুনে উৎসব ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

"বাবা এ আবার উপহার পাঠায়?ব*লদা প্রেমে-টেমে পড়লো নাকি?"

নির্ভয় বিরক্ততে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

বিজ্ঞাপন

"এই একটা সিরিয়াস আলোচনার মাঝে তোর মজা না করলেই হয় না উৎসব?"

"ভাই মজা করার জন্য একটা চিল ওয়ালা মুড থাকতে হয় যেটা আমার অলটাইম থাকে।কিন্তু এখন আমার কথা হলো ইশরাক মেয়েদের পেছনে লাগে ওদেরকে ডিস্টার্ব করার জন্য,সাথে আরো আকাম কুকাম কাজ কর্ম করার জন্য।কিন্তু বকুল ফুলের কথা অনুযায়ী এখানে মেয়েটাকে বিয়ে করতে চায়।আবার এত দিন হলো পিছনে ঘুরছে কিছু করেনি।তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় যে ও এবার সত্যি মেয়েটার প্রেমে পড়েছে?হয়তো ভালোবেসে ফেলেছে?"

উৎসবের কথা শুনে তিসান তাচ্ছিল্যভরা কন্ঠে বলল,

"ইশরাকের সাথে ভালোবাসা শব্দটা বড্ড বেমানান হে ভায়া।ভালোবাসতে গেলে একটা মনের দরকার হয়, একটা পবিত্র মন,যেটা ওর নেই।ভালোবাসতে গেলে আগে তোমার হৃদয়ে নম্রতা থাকতে হয় সেটাও ওর মাঝে নেই।ও শুধু মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় আছে।ও বিয়ে করতে চাইছে তার কারণ ঠিক যেমন এই দীর্ঘ সময় ধরে অপমান সহ্য করছে ঠিক তেমন একটা দীর্ঘ সময় নিয়ে ও নিজের অপমানের বদলা নেবে।"

"এতটা নিশ্চিত ভাবে কি করে বলছো ভাই?"

বেশ কৌতুহল নিয়েই প্রশ্নটা করলো নির্ভীক।তিসান স্মিত হেসে বলল,

"মেয়ে নিয়ে ওর চিন্তা ভাবনা অত্যন্ত জঘন্য।মেয়েদের দিকে ওর দৃষ্টিতে থাকে শুধু কামুকতা।মেয়ে মানে ও একটা কথাই বোঝে সেটা হলো ওর চাহিদা মেটানো।এমন নোংরা মস্তিষ্কের একটা কিটের থেকে তোমরা আর কি আশা করছ নির্ভীক?কি ভাবছো সত্যি বদলে গেছে ও?বিয়ে করে সুখে শান্তিতে সংসার করবে,মেয়েটাকে নিজের বউয়ের সম্মান দেবে?একে বলে আকাশ কুসুম চিন্তা।ইশরাক কে আমার থেকে বেশি ভালো করে আর কেউ চেনে না।ওর এই নোংরা চিন্তাভাবনার জন্যই তো আমার সাথে সেই ঝামেলাটা হয়েছিল।যার জন্য আজ আমার জীবনের এই অবস্থা।যাইহোক বকুল,তুমি তোমার বন্ধু কে সাবধানে থাকতে বলো।আর কলেজে কোনো ঝামেলা করলে আমাদের কে জানিয়ো।"

ওদের আলোচনার মাঝেই সেখানে ঊষা আর কাশফিয়া এলো।এমন অসময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে দুজনকে দেখে উৎসব বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"তোরা দুটো এখানে কিভাবে টপকালি?"

কাশফিয়া বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল,

"টপকাতে যাব কেন?বাড়ি ফিরছিলাম আপনাকে রাস্তায় বসে থাকতে দেখে ঊষা জেদ করে নামলো।"

নির্ভীজ বাদে বাকিরা ঊষাকে চিনলেও কাশফিয়াকে কেউই চেনে না।তিসান কাশফিয়াকে দেখিয়ে উৎসব কে বলল,

"ভায়া দ্বিতীয় রমণীটি কে?"

উৎসব হাস্যজ্জল কণ্ঠে বলল,

"ভাই ও হলো কাশফুল।নির্ভীকের ছাত্রী আর আমার ফুপির ঠিক করা আমার জন্য পাত্রী।"

উৎসবের কথা শুনে কাশফিয়া ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,

"আজেবাজে কথা একদম বলবেন না।কিসের আপনার পাত্রী আমি?রোদের মধ্যে বসে থেকে কি মাথার স্ক্রু গুলো সব ঢিলে হয়ে গেছে নাকি?"

"আহা কাশফুল রাগ করছো কেন?আর আমি না তোমার ভবিষ্যৎ জামাই।বিয়ের আগে এমন ব্যবহার করলে কিন্তু আমি বিয়ে করবো না তোমায়?"

"আপনি আমায় বিয়ে করতে এলে না ঝাঁটা মেরে বের করে দেব।আর খবরদার যদি আর একবার আমায় কাশফুল ডেকেছেন তো?অসভ্য একটা।"

দুজনের ঝগড়া দেখে পাশে বসা বকুল বলে উঠলো,

"ও মা মুখে বলছো পাত্রী না আবার ঝগড়া তো এমন ভাবে করছো যেন তোমার জামাই।ঢং দেখে জান বাঁচে না।"

বকুলের অঙ্গভঙ্গি দেখে কাশফিয়া কন্ঠে একরাশ বিস্ময় সমেত বলল,

"এ আবার কি?"

"আমি বকুল।তুমি যেমন তোমার অস্বীকার করা জামাইয়ের কাশফুল আমি তেমন ওর বকুল ফুল।"

কাশফিয়া বিড়বিড় করে বলল,

"নিজে তো পাগল জুটিয়েছেও সবকটা পাগলই।"

এদিকে দু জোড়া দৃষ্টি তখন সম্পূর্ণ ভাবে ঊষার ওপর নিবদ্ধ যে আসার পর থেকে এক ধ্যানে নির্ভীকের দিকে তাকিয়ে আছে।ব্যাপারটা হয়ত নির্ভীকও বুঝতে পেরেছে।ফলস্বরূপ সে তার পূর্ণ মনোযোগ নিজের হাতে থাকা মোবাইলের উপরে রেখেছে।নির্ভয় তিসানের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

"ভাই কিছু বুঝছেন কি?"

"না হে ভায়া।আপাতত আমি বোঝার চেষ্টায় আছি।তবে তুমি যদি কিছু বুঝে থাকো তাহলে আমাকে বোঝাতে পারো।"

"না ভাই থাক।আপনি আগে বোঝার চেষ্টা করুন পরে যদি কোথাও আটকে যান তখন নাহয় বুঝিয়ে দেবো।"

"একটু একটু হয়তো বুঝতে পারছি।"

"কি বুঝলেন?"

"এই বুঝলাম যে অকালে গাছের কচি পাতাগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ঝরে পড়বে।পোকায় ধরেছে তো সেজন্য।এ কিন্তু আবার যেমন তেমন পোকা না ভায়া।ভালোবাসা নামক এক বি*ষাক্ত পোকা।"

"ঊষা!"

উৎসবের ডাকে ঊষার ধ্যান ভাঙল।দ্রুত গতিতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

"হ্যাঁ ভাইয়া বলো।"

"বাড়ি ফিরবি কখন?"

"ফুপি তোমাকেও যেতে বলেছে তো।তুমি গেলে একসাথে বাড়ি ফিরব।"

"আমার সাথে তো তুই ফিরতে পারবি না।ফুপি আমার সব বন্ধুদেরকেও নিয়ে যেতে বলেছে,আমি তো ফেরার সময় ওদের সাথেই ফিরব।তুই গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিস না গাড়ি করে আবার বাড়ি ফিরে আসিস।আমার অপেক্ষায় থাকিস না কেমন।"

ঊষা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,

"তোমরা সবাই যাবে?"

"হ্যাঁ।"

"মানে তোমার যত বন্ধু আছে তারা সবাই যাবে?"

উৎসব মৃদু বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,

"শোন বনি,আমার বন্ধু বলতে এই চারখানা মালই আছে।আমার তরফ থেকে আর কেউ নেই।ও হ্যাঁ বাকি রইলো তোর ভাবি মানে আমার বউ।সে তো তোর সাথেই আছে।তার জন্মদিনেই তো যাচ্ছি।"

কাশফিয়া একটা হতাশার শ্বাস ফেলল।তিসান হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে উৎসব কে বলল,

"তুমিও না উৎসব কে কি জানতে চাচ্ছে সেটা বুঝতে পারো না।ঊষা তোমার এই চারখানা মালের কথা শুনতে চায়নি,ও একখানা মালের কথা শুনতে চেয়েছিল।"

উৎসব বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল,

"ধুর ভাই তুমি যে কি বলোনা।তুমি আপাতত চুপ থাকোতো।আমায় আগে শুনতে দাও যে আমার হবু বউ আমার থেকে কি উপহার চায়।কাশফুল বলো কি চাও তুমি?নাকি আমি হলেই হবে?"

কাশফিয়া অগ্নিদৃষ্টিতে উৎসবের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললো,

"দেখুন ভাইয়া আমি আপনাকে এর আগেও অনেকবার বলেছি আমাকে আপনার বউ বলবেন না।আমার ভালো লাগেনা এসব।আমি জানিনা মা কেন আপনার মাথায় এসব ভুত ঢুকিয়েছে কিন্তু আমি মাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি দরকার হলে এই জীবন আমি বিয়েই করবো না তবুও আপনাকে বিয়ে করবো না।"

কাশফিয়ার কথা শুনে উৎসব ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

"এতটা গ্যারান্টি দিতে নেই কাশফুল।তোমার সাথে মজা করি জন্য তুমি এটা ভেবো না যে তোমায় বিয়ে না করলে আমি ম*রে যাব।এতটা দুর্বল মনের অধিকারী উৎসব মির্জা না।কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখে তুমি মেয়ে মানুষ,আর মেয়ে মানুষের মনটা কিন্তু বেশ দুর্বল হয়।এমন যেন কখনো না হয় যে তুমি আমাকে বিয়ে করার জন্য উতলা হয়ে উঠলে কিন্তু আমি আর তোমাকে পাত্তা দিলাম না।আজ আমি তোমাকে জ্বা*লানোর জন্য যে মজা গুলো করছি এক সময় সেগুলো তোমার তরফ থেকে সত্যি হয়ে তুমি আবার না আমার প্রেমে জ্ব*লে যাও।"

কাশফিয়া তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

"স্বপ্ন দেখতে থাকুন।কিন্তু সেই স্বপ্নটাকে সত্যি ভেবে নেবেন না আবার।"

কথাটা বলে কাশফিয়া আর সেখানে দাঁড়ালো না।সবার থেকে বিদায় নিয়ে ঊষাও চলে গেল।ওরা দুজন চলে যেতেই তিসান উৎসব কে বলল,

"তুমি সব জানো তাই না?"

"আমি তো আর ব*লদ না ভাই যে বুঝবো না।ও বোন আমার।সবই বুঝি।"

"নির্ভীক বোঝেনা?"

"ও বুঝেও না বোঝার ভান ধরে বসে থাকে জন্যই তো আমিও বুঝেও বুঝে উঠতে পারিনা।ধুর ভাই আপনি বাদ দেন তো।"

তিসান মৃদু হেসে বলল,

"ভায়া জীবনে একটু তোমাদের দুজনের মতো প্রেম ঘটিত সমস্যা চাই।কি করে পাওয়া যায় বলো তো?"

উৎসব পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে তিসানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

"এইটা খাও।নিজেরও মাথা ঠান্ডা রাখো আমারটাও রাখতে দাও।"

তিসান সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল,

"বড় লোকের বাচ্চা সিগারেটও খায় দামি।কিন্তু ভায়া আমি তো তোমার থেকে অশান্তি চাইলাম তুমি এটা কেন দিলে আমায়?"

"ভাই ধরো কলকি মা***রো টান।বা**লের জীবন এমনিতেই হবে খান খান।এর থেকে বড় অশান্তি আর মানবজীবনে দুইটা নাই।"

"কিন্তু এটাতো কলকি না।"

উৎসব বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"ধরে নেও না রে ভাই।সব সময় তো সবকিছু আমাদের কাছে থাকে না মাঝে মাঝে একটু ধরেও নিতে হয়।"

"সব সময় তো আর সবকিছু ধরে নেওয়া যায় না।মাঝে মাঝে কিছু জিনিসের সত্যিকারের উপস্থিতি প্রয়োজন হয়।"

"শুরু হলো এই মা*রা খাওয়া প্রাণির মা*র্কা মা*রা কথা।আমি বুঝিনা তুমি কোন দুঃখে প্রেমে পড়তে গেছিলে।"

তিসান হালকা হেসে বলল,

"আমিতো প্রেমে পড়িনি সে আমায় তার প্রেমে ফেলেছে।তাহলে দোষটা আমার হয় কি করে?সে দোষী।সে প্রেমে ফেলল ঠিকই তবে আমার ভালোবাসাটুকু বুঝলো না।"

নির্ভীক প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

"তুমি বলেছিলে?"

তিসান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

"প্রয়োজন মনে করিনি।"

উৎসব এবার চেঁতে গেল।রাগী কন্ঠে বলল,

"তুমি করবা চো**দ**না**মি আর মানুষ না বুঝলেই দোষ?বললে কি বা**ল হতো?"

"হতো না তো।বললেও কোনো বা**ল হতো না জন্যেই বলিনি।তাকে দেখা যায়,ভালোবাসা যায় কিন্তু সবটাই দুর থেকে।কাছে যাওয়ার সাধ্য আমার নেই।"

তিসানের ভালোবাসার সাথে নির্ভয় কেন যেন নিজের ভালোবাসাটাকেও মিল পেল।তারও তো দেখার অধিকার আছে,ভালোবাসার অধিকার আছে কিন্তু সবটাই দূর থেকে,কাছে যাওয়ার সাধ্য নেই।নির্ভয় মনে মনে ভাবলো,

"তবে আমার ভালোবাসার পরিণতিও কি এতটাই ভয়াবহ হবে?"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প