ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ১

🟢

গাছপালা আর জঙ্গলে ঘেরা একটা পরিত্যক্ত বাড়ি।দেখেই বোঝা যাচ্ছে বহু কাল হলো এই বাড়িতে কারো যাতায়াত নেই।বাড়ির রং চটে গেছে।জায়গায় জায়গায় দেয়াল থেকে ইট গুলো খসে পড়েছে।বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ভয়ংকর জন্তু-জা*নো*য়া*র*রা এই বাড়িটাকে নিজেদের আস্তানা বানিয়েছে।দেওয়াল গুলোতে শ্যাওলা জমেছে।গাছপালার ডাল এর বিভিন্ন অংশ বাড়ির জানালা ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করেছে।

বাইরে থেকে দেখে কারো বোঝার সাধ্য নেই যে এই বাড়ির ভিতরে কোন মানুষজন থাকতে পারে।শহর থেকে বেশ অনেকটা দূরে লোকালয়হীন জনমানব শূন্য একটা জায়গায় বাড়িটা হওয়ায় অনেকে হয়তো খোঁজও জানেনা।কিন্তু এই বাড়িটা যাদের কাজে আসে এখানে তাদের নিয়মিতই যাতায়াত রয়েছে।

ভাঙাচোরা এক রুমের শ্যাওলা জমানো দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মাটিতে দু পা বিছিয়ে বসে আছে ইশরাক। রুমের অন্যান্য কোণে আরো তিন চারজন ছেলে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। অবশ্য অচেতন বলা চলে না। নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে আছে, কোন হুশ নেই।চারিদিকে সি*গা*রে*টে*র উটকো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।সেই সি*গা*রে*টে*র ধোঁয়া এখনো ঘরে বিদ্যমান।কেননা ইশরাক এখনো ঢুলছে আর সি*গা*রেট টানছে।তার আশেপাশে কয়েকটা ম*দের বোতলও পড়ে আছে। পাশের ঘরগুলো তেও আরো ছেলেরা মা*তাল অবস্থায় পড়ে আছে।

হাতের সিগারেটটা যে কখন শেষের পথে এসে ঠেকেছে সেটা ইশরাকের খেয়াল নেই। ফলস্বরূপ হাতে ছ্যাঁকা খেল। কিন্তু সেই ব্যথা খুব একটা অনুভব করতে পারল না। আপাতত সে তার ভাবনা নিয়ে ব্যস্ত। চোখ দুটো বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে এক ভয়ংকর সুন্দর নারীর চেহারা। চোখে মুখে তার কি তেজ,চেহারায় তার কি অপূর্ব লাবণ্য,ঝলমলে লম্বা চুল, আর তার কন্ঠ?

সেই অপরূপ রমনীর কণ্ঠটা ইশরাকের জন্য কোন নেশার থেকে কম কিছু না। শুনলেই কেমন একটা ঘোর লেগে যায়। মনের মাঝে বিভিন্ন নিষিদ্ধ ইচ্ছেরা উঁকি দিচ্ছে ইশরাকের। কিন্তু ইশরাকের তো ওকে এক রাতের জন্য চাই না। ইশরাকের তো এই নেশাটা সারা জীবনের জন্য দরকার। আনমনে হেসে ফেলে ইশরাক।নেশালো কন্ঠে একা একাই বিড়বিড় করে বলল,

"সুন্দরী, আমার তো তোমাকে সারা জীবনের জন্য দরকার। তোমার তেজ কমাতে হবে না! আমাকে যে চ*ড়টা মে*রে*ছি*লে তার প্রতিশোধ নিতে হবে না।অবশ্য ওই চ*ড়টা না মা*রলে তো আমি তোমার প্রেমে পড়তাম না। তাহলে বরং এর জন্য তোমায় ক্ষমা করে দেই।"

ইশরাকের কথার মাঝে একটা ছেলে এসে ওর কাঁধ ধরে ঝাকালো। নিজের কথা আর ভাবনার মাঝে ব্যাঘাত ঘটায় ইশরাক প্রচন্ড বিরক্ত হলো।হিংস্র কন্ঠে আগত ছেলেটার উদ্দেশ্যে বলল,

"বিরক্ত করছিস কেন?"

ইশরাকের এমন কণ্ঠস্বরে ছেলেটা একটু ভয় পেল।হালকা তুঁতলিয়ে বলল,

"আসলে ভাই সকাল হয়ে গিয়েছে বাড়ি ফিরবেন না?আপনার বাবার কল এসেছিল তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বললেন আপনাকে।"

"ওনাকে বলে দে আগে বাগান বাড়ি যাবো। সেখান থেকে আমার সুন্দরী কে দেখতে যাব তারপর বাড়ি ফিরব।"

"কিন্তু স্যার আপনার বাবা বললেন খুব দরকারী..."

ছেলেটা নিজের কথা শেষ করতে পারলোনা,তার আগেই ইশরাকের দৃষ্টি দেখে থেমে গেল।ইশরাক র*ক্ত চক্ষু নিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,

"যা করতে বলেছি তাই কর।"

ছেলেটা আর কোন কিছু না বলে চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সেখান থেকে চলে গেল। ছেলেটা চলে যেতেই ইশরাক ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

"কেউ বোঝে না সুন্দরী যে তোমার আগে কোন কাজই দরকারই না। আমি তো সোজা তোমার জন্য কলেজে চলে যেতাম। কিন্তু আমায় এই অবস্থায় দেখলে তো তুমি আরো অপছন্দ করবে আমায়। তাই একটু হিরো সেজে যাবো। আমাদের বিয়ের আগে আমি তোমার জন্য হিরো হবো আর বিয়ের পরে হবো ভিলেন।"

___________________

"আমায় কি পা*গ*লা কু*ত্তা*য় কা*ম*ড়া*ই*ছে যে আমার বন্ধুকে অপমান করার জন্য আপনাদের বাড়িতে নিয়ে আসব? ওর যদি এতই টাকার সমস্যা হয় দরকার পড়লে নিজের কিডনি বিক্রি করে ওকে টাকা দেবো তাও আপনাদের কাছে ওকে মা*রা খাওয়াইতে নিয়ে আসবো না।"

ছেলের মুখ থেকে এমন ত্যাড়া-বাঁকা কথা শুনে উৎসবের বাবা সাইফুল মির্জা আর মা রুবাইদা তেলে বেগুনে জ্ব*লে উঠলেন। বরাবরই তাদের ছেলে এমন খাপছাড়া কথাবার্তা বলে। তার প্রতিটা কথার দ্বারা যেন সে সবাইকে এটা বুঝিয়েই ছাড়বে যে সে চূড়ান্ত রকমের অসভ্য।

সাইফুল মির্জা গর্জে উঠে ধমকের সুরে উৎসবকে বললেন,

"মা-বাবার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা তুমি শেখোনি বে*য়া*দ*ব ছেলে? এটা কোন সভ্য মানুষের কথাবার্তার ধরন হতে পারে?"

উৎসব তখন সোফায় আয়েশি ভঙ্গিতে বসে টিভি দেখছে। হাতে থাকা আপেলটায় এক কামড় দিয়ে গা ছাড়া ভাব নিয়ে সাইফুল মির্জা কে বলল,

"আপনারা দুজন তো আমায় শেখাননি যে মা-বাবার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তাহলে শিখব কি করে?আর আমি কি কখনো একবারের জন্যও বলেছি যে আমি সভ্য মানুষ? আমি তো জানি আমি অসভ্য। এজন্য অসভ্যদের মতন করেই কথা বলি।"

ছেলের সাথে কথায় পেরে না উঠে সাইফুল মির্জা এবার নিজের স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে কর্কশ কণ্ঠে বললেন,

"নিজের ছেলেকে কেমন শিক্ষা দিয়েছো একবার দেখেছো রুবাইদা?সারাদিন আরো বেশি করে অফিসের কাজে পড়ে থাকো।"

রুবাইদা গম্ভীর কণ্ঠে সাইফুল মির্জা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"ছেলেকে শিক্ষা দেওয়া তো আর আমার একার দায়িত্ব না। সন্তান যেহেতু দুজনের তাহলে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্বটাও নিশ্চই দুজনেরই হবে। শুধুমাত্র আমার শিক্ষার উপর আঙুল না তুলে নিজের ব্যর্থতার দিকেও আঙুল তুলতে শেখো।"

"ছেলে মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার কর্তব্যটা মায়েরই বেশি থাকে। হাজার বার করে বলেছিলাম এসব অফিস টফিস ছেড়ে দিয়ে ছেলেমেয়েদেরকে ভালো করে মানুষ করো। আমার কথাটা শুনলে আজকে অন্তত এই ছেলেকে মানুষ করতে পারতে।"

"তুমি তোমার ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করতে নিজের পরিবারের জন্য? তাহলে আমায় কেন করতে বলছো?শুধুমাত্র আমি মেয়ে জন্য সবসময় আমাকেই সবকিছু ত্যাগ করতে হবে?তোমার কোন দায়িত্ব নেই নিজের পরিবারের প্রতি?"

দুজনের ঝগড়ার মাঝে উৎসব হো হো করে হেসে উঠল।সোফা থেকে উঠে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে দুজনকে উদ্দেশ্য করে ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

"দারুন। ঝগড়ার টপিকটা ছিলাম আমি কিন্তু এখন দুজন দুজনের ওপর দোষারোপ করতে শুরু করলেন।নিজের ছেলে মেয়ের জন্য তো সময় আপনাদের দুজনের কারোই ছিল না। অযথা একজনকে দোষারোপ করে লাভ নেই। একটা সন্তানকে বড় করে তুলতে যেমন মায়ের ভালোবাসার দরকার ঠিক তেমনি বাবার শাসনেরও দরকার হয়। কিন্তু শা*লা আপনারা দুজন তো শুধু পারেনি শাসন মা*রা*তে। ভালো তো বাসতে পারেন না।এখন আবার লেগে গেলেন দুজন ঝগড়া করতে। বা*ল এই জন্য বাড়িতে থাকতে আমার ভালো লাগেনা। সারাদিন খালি অশান্তি আর অশান্তি।"

উৎসবের কথায় দুজনেই চুপ করে গেলেন। একদম শুরু থেকে চুপচাপ পুরো ঘটনাটা নীরব দর্শকের মতন দেখে যাচ্ছে ঊষা আর কাশফিয়া। ঊষার জন্য এই ঝগড়া ঝামেলা নিত্যদিনের ব্যাপার হলেও কাশফিয়ার জন্য এটা একদমই নতুন। এতদিন শুনে এসেছিল কিন্তু আজ প্রথম নিজ চোখে দেখলো। ফলে কাশফিয়া বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সবার ঝগড়া দেখছে আর ঊষা নিজ মনে খেয়ে যাচ্ছে। খাওয়ার মাঝেই কাশফিয়া ঊষার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"এই ঊষা,তোর ভাইকে আটকা।এই ছেলেকে তো আমি যতটা অসভ্য ভেবেছিলাম তার থেকেও বেশি অসভ্য।এভাবে কেউ মা-বাবার সাথে কথা বলে?"

ঊষা নির্বিকার ভঙ্গিতে কাশফিয়া কে বলল,

"চুপ কর তো তুই।তুই কিছু জানিস না জন্য এমন মনে হচ্ছে।যা হচ্ছে হতে দে।তুই চুপচাপ খেয়ে নে।"

"তুই ওদেরকে আটকাবি না?তোর কিছু বলার নেই এসবের মাঝে?সূত্রপাত তো হলো তোর বিষয় নিয়েই।"

ঊষা তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বলল,

"কাকে আটকাবো?এই বাড়িতে কেউ কারো কথা শোনে নাকি?যে যার মতন চলে।ভাইয়াকে থামতে বললে থামলেও থামতে পারে।কিন্তু শুধুমাত্র ভাইয়া কে কেন বলব?ও তো ভুল কিছু বলেনি।"

কাশফিয়া আর এই নিয়ে কোন কথা বাড়ালো না।এমনিতেও উৎসবের ব্যাপারে কোন কিছু জানার তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।এই পৃথিবীতে যদি সব থেকে বিরক্তিকর কোন মানুষ থেকে থাকে কাশফিয়ার জন্য তাহলে সেটা উৎসব।যার নামটা অব্দি শুনলে কাশফিয়ার মাথায় আ*গু*ন জ্ব*লে।

রুবাইদার ফোন বেজে উঠতেই সে খাবার মাঝপথে রেখে বেরিয়ে পড়ল কাজের জন্য।ওনার ঠিক পাশেই উৎসব দাঁড়িয়ে থাকার জন্য স্ক্রিনে কল করা ব্যক্তিটির নাম উৎসব খুব ভালোভাবে দেখতে পেল।তিনি উঠে চলে যেতেই উৎসব সাইফুল মির্জা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"কাকে আমাদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলছিলেন যে নিজের বন্ধুর কল পেয়ে পুরো পরিবারকে ডাইনিং টেবিলে ফেলে রেখে হনহন করে বেরিয়ে পড়ল তাকে?আচ্ছা আপনারা একটু ভালো বাবা-মা হতে পারলেন না?জন্ম যখন দিয়েই ছিলেন তাহলে একটু আদর যত্নও তো দিতে পারতেন!উনি ওনার বন্ধুর কল পেয়ে বেরিয়ে পড়লেন আপনি কিছুক্ষণ পর আপনার বান্ধবীর কল পেয়ে বেরিয়ে পড়বেন।আর শা*লা আপনাদের যত সমস্যা আমার বন্ধুকে নিয়ে।ও তাও আমাকে অমানুষ বানায়নি।যতটুকু মানুষ হয়েছি ওর আর ফুপির জন্যই হয়েছি।আপনাদের আশায় থাকলে এতদিনে ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যেত।"

কথাটা বলে টেবিলের উপর থেকে বাইকের চাবিটা নিয়ে উৎসব বেরিয়ে পড়লো।উৎসবের এতগুলো কথার প্রেক্ষিতে সাইফুল মির্জা একটা বাক্যও উচ্চারণ করতে পারলেন না।উৎসবের বলা একটা কথাও তো ভুল নয়।সত্যিই তো ওনারা দুজন নিজেদের ক্যারিয়ারের জন্য ছেলেমেয়েদের কথা ভুলেই গিয়েছেন।সারাদিন কি করে নিজেদের ব্যবসার উন্নতি করা যায়,নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি,টাকা-পয়সা বাড়ানো যায়,কি করে আরো ভালো থাকা যায় সেসব নিয়ে ভাবেন অথচ বাড়িতে যে দুটো ছেলে মেয়ে আছে সেই বিষয়ে তাদের খেয়ালও থাকে না।দিনশেষে একটা বার ফোন করে খোঁজও নেন না যে ওরা দুজনে সারাদিন কিছু খেয়েছে কিনা।

অবশিষ্ট খাবারটুকু তিনি নিজেও আর খেতে পারলেন না।উঠে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে ঊষা বলে উঠলো,

"বাবা আমার টিউশন নিয়ে আর ভাবতে হবে না।আমার একটা ফ্রেন্ড একজনের কথা আমায় বলেছে উনি নাকি খুব ভালো পড়ান।আমি ওনার কাছেই পড়বো।"

"যেমনটা ভালো বোঝো।"

কথাটা বলে সাইফুল মির্জা উঠে চলে গেলেন।নিজের প্লেটের খাবারটুকু শেষ করে ঊষা একবার ফাঁকা ডাইনিং টেবিলটার দিকে তাকালো।তাচ্ছিল্য হেসে কাশফিয়া কে বলল,

"দেখ কাশফিয়া এটাই আমার পরিবার।কেউ নেই।সবাই যে যার মতন রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে গেল।"

"এভাবে কেন বলছিস ঊষা?আমি আছি না!একটু পর মাও চলে আসবে।"

"তোরা তো আর রোজ রোজ থাকিস না।কিন্তু এই এত বড় বাড়িটাতে প্রতিদিন আমায় একা থাকতে হয়।আর এই একাকিত্বটা ভিষণ ভয়ংকর।"

___________________

"উৎসব দয়া করে একটু চুপচাপ বসবি তুই!বাচ্চাদের মতন ছোটাছুটি করছিস কেন?"

নির্ভীকের রাগী গলার কন্ঠে বলা কথায় উৎসব বিরক্তিকর কন্ঠে মুখ বাঁকিয়ে বলল,

"তুই আগে এই বা*লে*র পড়াশোনা থামা।দেখবি তাহলে আমিও থেমে যাবো।এমন ভাবে পড়ছিস যেন দেশের উন্নতির দায়িত্ব একা তোর কাঁধেই পড়েছে।"

নির্ভীক কোনো উত্তর দিল না।নির্ভীকের থেকে গুরুত্ব না পেয়ে উৎসব প্রচন্ড বিরক্ত হলো।নির্ভীক উৎসবকে গুরুত্ব দিলো না এই কথাটা উৎসব মানতে পারলো না।কিন্তু এই নিয়ে নির্ভীক কে কিছু বললোও না।পাশে বসা নির্ভয় কে বলল,

"ওই টুনির বাপ আমি চলে যাচ্ছি।যেইখানে উৎসব মির্জার কোনো গুরুত্ব নাই সেইখানে মেরা(আমার) বা*লে*রও ঠ্যা*কা পড়েনি থাকার।ওই ভং ধরা বিদ্যাসাগরের বংশধররে বলে দেস ওই যেন আর আমার সাথে আ*ল*গা পী*ড়ি*ত দেখাইতে না আসে।শা*লা হা*রা*মি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝবে না তো।"

বিজ্ঞাপন

নির্ভীক এবারেও কিছু বলল না।নির্ভয় শুধু ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে দুজনকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।কেননা ওদের এসব কাহিনী আজ নতুন না।

উৎসব এবার সরাসরি নির্ভীকের সামনে থেকে ওর বইটা কেড়ে নিয়ে নির্ভীকের মুখোমুখি বসে একপ্রকার চেঁচিয়েই বলল,

"কি সমস্যা রে তোর?জ্যান্ত মানুষ চিল্লাচ্ছে তোর সামনে তোর কি কানের মধ্যে ঢুকতেছে না?বা*ল কি এমন পড়ো তুমি যার গুরুত্ব আমার থেকেও বেশি?"

নির্ভীক স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"আজেবাজে শব্দ ছাড়া কথা বলতে পারিস না?"

"না পারিনা।আমার র*ক্ত তোর মতন অত পবিত্র না।কথার মাঝে দু-চারটে গালি না দিলে আমার হয়না সেইটা তুই জানিস না?"

নির্ভীক একটা হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,

"তোকে মানুষ বানাতে পারলাম না আমি।"

"চব্বিশ বছরে আমার আব্বা-আম্মাই আমারে মানুষ বানাইতে পারেনি তুই কি বা*ল বানাবি?শোন শা*লা মাথা আমার ভিষণ গরম আছে কথা কইস না তুই।"

"সকালে বাড়ি থেকে কিছু খেয়ে আসিনি আমি ক্ষুধা লেগেছে।পকেটে টাকা নেই।একটা পাউরুটি আর কলা খাওয়াবি?"

উৎসবের রাগ আরো বাড়লো।ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,

"শা*লা তুই আসলেও হা*রা*মি।কিছু গি*লি*স নি সকাল থেকে সেইটা আমায় আগে বললে কি হতো?আমি ভরা পেট নিয়ে গরম দেখাচ্ছি আর উনি খালি পেট নিয়া হজম করতেছে।আগে বললেই হতো যে আমার কথা শুনেই পেট ভরানোর ইচ্ছে আছে।গলার মাঝে একেবারে ঢুকায়ে দিতাম।"

"কি ব্যাপার, বড় লোকের বাচ্চা এত ক্ষেপেছে কেন আজ?গার্লফ্রেন্ড কি ধোকা দিয়ে পালালো নাকি?"

একেতো উৎসবের মেজাজ অত্যন্ত গরম হয়ে আছে তার ওপর আবার তিসানের এমন কৌতুক পূর্ণ কথা তার ঠিক সহ্য হলো না।

তিসান বেঞ্চের ওপর বসে পুনরায় কৌতুক করে উৎসবকে বলল,

"আমার কথাই তার মানে সত্যি নাকি বড়লোকের বাচ্চা?"

"দেখো মা*রা খাওয়া প্রাণী,মাথা আমার আ*গ্নে*য়*গি*রি*র মতন ট*গ*ব*গ করে শুধু ফু*টছে।এর মাঝে প্লিজ তুমি আরো জ্ব*লার মতন কথা বলো না।"

উৎসবের কথা শুনে তিসান হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,

"কি ব্যাপার বলোতো ভায়া আজ তোমায় দেখে মনে হচ্ছে তুমি কোথাও থেকে বেশ বড়সড় একটা মা**রা খেয়ে এসেছো।পুরো ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলোতো শুনি।"

উৎসব কিছু বলতে নেবে তার আগেই পাশ থেকে নির্ভীক বলে উঠলো,

"নিশ্চয়ই বাড়িতে আবার ঝামেলা করে এসেছে।ওকে আমি চিনি না।বাড়ির গরম এখন এখানে এসে আমাদের উপর ঝাড়ছে তিসান ভাই।"

উৎসব রাগী কন্ঠে বলল,

"তো কি করতাম?ওনারা শুধু চোখে আমার ভুল দেখেন নিজেদের কোন দোষ দেখতেই পান না।আমি হলাম কিভাবে এমন অসভ্য?"

নির্ভীক বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"তোকে কতবার বলেছি উৎসব বাবা-মা যেমনি হোক তার পরেও ওনাদের সাথে ভালো আচরণ করবি।আমার কথা শুনিস না কেন?"

"শোন ভাই তুই হয়তো মাদার তেরেসার বংশধর হয়ে শরীরে মায়া মমতা নিয়ে জন্মেছিস।আমার শরীরে আবার ওই নিষ্ঠুর চা*মা*রদের র*ক্ত বইছে।আমি তোর মতন অত ভালো মানুষ না যে বাপ-মা তিনবেলা ঠিকমতো খাবার দেয় না অথচ তাদের আগে পিছে ঘুরে সমানে ছাগলের তিন নাম্বার ছানার মতো ম্যা ম্যা করে চেঁচাবো।"

নির্ভীক একটা হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,

"ওনারা তো তোর ভালোই চায়।একবার ওনাদের কথা শুনে দেখ ওনারাও তোকে ভালোবাসবে।"

"কথা তো শুনছি না কয়েক বছর ধরে,তার আগে কি করেছে?তখন ওনাদের ভালোবাসা কই ছিল?সব থেকে বড় কথা আমাকে ভালোবাসতে হলে আমাকে বদলে কেন ভালোবাসতে হবে?আমি যেমন তেমন ভাবে আমাকে ভালোবাসা যায় না?তুই তো কখনো আমাকে বদলাতে চাস না।তুই তো আমি যেমন তেমনভাবে আমাকে ভালেবাসিস তাহলে বাকি মানুষ কেন পারে না?"

"কারণ বাকি মানুষগুলো নির্ভীক না আর না তুমি বাকি মানুষদেরকে নির্ভীকের মতন ভালোবাসো।হিসাবটা কিন্তু খুব সহজ তারপরও তুমি গরমিল করে ফেলছো।এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি অংক নিয়ে পড়ছো কি করে বলোতো?"

কথার পিঠে কথা বাড়বে।একসময় দেখা যাবে হয়তো সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে তাও এ আলোচনা চলছে।নির্ভয় সবাইকে তাদের কথার মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আজ সকালে আমিও বাড়ি থেকে খেয়ে আসতে পারিনি।প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে।আমি খাবার অর্ডার দিতে যাচ্ছি।কে কি খাবে তাড়াতাড়ি বলো।"

নির্ভয়ের কথার প্রেক্ষিতে তিসান বলে উঠলো,

"তুমি খাওয়াবে নাকি?তারমানে তুমিও দেখছি বড়লোকের বাচ্চা হয়ে গেলে।"

নির্ভয় স্মিত হেসে বলল,

"বড়লোকের বাচ্চা হয়নি ভাই।হয়তো খুব বড় কিছু খাওয়াতে পারব না আপনাদেরকে কিন্তু সামান্য পরোটা আর ডাল খাওয়ানোর সামর্থ্য আমার আছে।হ্যাঁ হয়তো বাকি দুদিন হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে সেটা বড় কথা নয়।"

তিসানও হালকা হেসে বলল,

"দেখেছো ভায়া তুমি পর হয়ে নিজে দুদিন হেঁটে বাড়ি ফিরে আমাদেরকে খাওয়াতে চাইলে হাসিমুখে।অথচ নিজের র*ক্তের কিছু মানুষ একফোঁটা পানির জন্যও দিন রাত খোঁটা দেয়।"

হুট করে পরিবেশটা কেমন গুমট হয়ে উঠলো।তিসান সত্যি কথা বললো তো সেটাই হয়তো সবার মেনে নিতে একটু কষ্ট হচ্ছে।পরিবেশটা স্বাভাবিক করতে উৎসব বলে উঠলো,

"তোদের কাউকে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে না।আমি আছি কি বা**ল ছিড়তে?কে কি খাবি বলতো?"

চারটে পরোটা আর ডাল অর্ডার দিয়ে উৎসব পুনরায় নিজের জায়গায় এসে বসলো।আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে একটা খুঁজে প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,

"বকুল ফুল কে যে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।আজ আসেনি নাকি?"

নির্ভীক বইয়ের পাতায় দৃষ্টি রেখে উৎসব কে বলল,

"গ্রামে গেছে।আজ আসবে না।"

এদিকে নির্ভীক কে পুনরায় বই পড়তে দেখে উৎসব বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"তুই আবার বই পড়া শুরু করেছিস নির্ভীক?"

"সামনে পরীক্ষা ভুলে গেছিস?"

"সে তো পড়লেও টেনেটুনে পাশ করব না পড়লেও টেনেটুনেই পাস করবো।আর এত পড়ে কি হবে?এই মা*রা খাওয়া প্রাণিকে দেখ পড়াশোনা করেও বেকার ঘুরছে।তাহলে লাভটা কি এসব কষ্ট করে?"

নির্ভীক বইয়ের পাতাটা বন্ধ করে মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

"শেষ সম্বল।এই বইগুলোই আমার জীবনের শেষ সম্বল।দেখিনা এদের কে আঁকড়ে ধরে অন্তত দু বেলা সম্মানের সাথে নিজের পেট ভরানোর ব্যবস্থা করা যায় কিনা।"

"শুধু দু বেলা পেট ভরানোর জন্য এত কষ্ট করছিস?আর কিছু চাস না?"

উৎসবের এমন প্রশ্নে তিসান শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

"অন্ন সংকটের জ্বা*লা তুমি বুঝবেনা ভায়া।তুমি হলে বড় লোকের বাচ্চা।সারাদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরলে টেবিল ভরতি হরেক রকমের খাবার পাবে।আর আমরা পাবো এক থালা শুকনো ভাত আর আলু ভর্তার বিনিময়ে হাজারো গালি।ভাত খেয়ে পেট না ভরলেও গালি খেয়ে পেট ঠিকই ভরে যায়।"

"এমন ভাব করছো যেন শুধু তোমরাই বেকার।এই উৎসব মির্জাও নিজের বাপের টাকার গরমই দেখায়।"

"গরম দেখানোর জন্য তাও তোমার বাপের টাকা আছে।কিন্তু আমাদের গরম হতে নেই।বেকার তো।বেকারদের এত গরম থাকলে চলে না।ক্ষিদের জ্বা*লা যার পেটে আছে এই পৃথিবীতে সে সবথেকে বেশি অসহায়।পকেট ভরতি টাকা আর সুন্দরী মেয়ে পাশে না থাকলেও তিনবেলা যদি এক থালা গরম ভাত পাওয়া যায় এতেই শান্তি।কি তাই না নির্ভীক?"

নির্ভীক শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।বলার মতন তার কাছে কিছুই নেই।ক্ষিদের জ্বালা যে কতটা কষ্টদায়ক সেটা তো সে নিজেও খুব ভালো করেই জানে।

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প