ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ১০

🟢

কলেজ ক্যাম্পাসের পিছনের দিকে পুরোনো শিমুল গাছটার নিচে বসে আছে বকুল।শুধু বসে আছে বললে ভুল হবে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।ফর্সা চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে।তার আশেপাশে আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না আপাতত।

এদিকে সৌমি কে খুঁজতে খুঁজতে প্রভাও সেদিকেই এলো।বকুলকে এভাবে বসে কাঁদতে দেখে প্রভা দ্রুত সেদিকে এগিয়ে এলো।হাঁটু গেড়ে ঘাসের উপর বসে পড়লো।চিন্তিত কন্ঠে বকুল কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"কি হয়েছে বকুল ফুল কাঁদছো কেন?"

প্রভার কন্ঠ পেয়ে বকুল সেদিকে একবার তাকালো।কিছু না বলে চুপচাপ আবার নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।এরই মাঝে হন্তদন্ত পায়ে ছুটতে ছুটতে সেখানে নির্ভীকও এলো।নির্ভীকও বকুলের পাশে এসে বসলো।উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,

"কি হয়েছে বকুল?ফোন করে ডাকলে কেন আমায়?আর কাঁদছো কেন?"

এবারে বকুল একটু শব্দ করেই কেঁদে উঠলো।নির্ভীক আর প্রভা দুজনে দুজনের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো।কেউ কিছু বুঝতে পারছে না।প্রভা শান্ত কন্ঠে বলল,

"বলবেনা আমাদের?"

বকুল দুই হাতে চোখের জল মুছে নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে কান্না জড়ানো কন্ঠে বলল,

"আমি কি সত্যি মেয়েদের মতন?"

বকুলের এমন প্রশ্নে দুজনে একটু ভরকালো।ওদেরকে চুপ থাকতে দেখে বকুল পুনরায় বলে উঠলো,

"বলো না আমি সত্যি মেয়েদের মতন তাই না?আমাকে দেখে একটুও ছেলেদের মত লাগে না?"

"হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করছো?কেউ কিছু বলেছে তোমায় এই নিয়ে?"

নির্ভীক সন্দেহী কণ্ঠে প্রশ্নটা করতেই বকুল মৃদু রাগী কণ্ঠে বলল,

"বলবেই তো।জানো ওরা আমাকে হি/জ/রা বলেছে।ওরা আমাকে বলেছে আমাকে দেখলেই নাকি ওদের ওসব মানুষদের কথা মনে হয়।তুমি বলো আমি কি এতটা মেয়েদের মতন আচরণ করি?হ্যাঁ আমি জানি আমার কথাবার্তা,চালচলনের মাঝে একটু মেয়েলি ভাব আছে।কিন্তু আমি কি করবো?আমি তো ইচ্ছে করে এমনটা করি না।আগে থেকেই আমার কথাবার্তা এমন। তার জন্য আমাকে এসব বলতে হবে?"

এবারে পুরো ব্যাপারটা নির্ভীক আর প্রভার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠলো।এই অপমানটা করার জন্যই ইশরাকের সাথে প্রভার একবার ঝামেলা হয়েছিল।কলেজে অনেকেই বকুলকে এই কথাটা বলে অপমান করে।এই কারণেই বেশির ভাগ সময়টা বকুলকে নিজের সাথে রাখতে চায়।সেম ইয়ার আর সেম ডিপার্টমেন্ট হওয়ায় তাতে সুবিধাই হয়।বাকি সময়টা অবশ্য নির্ভীকদের সাথে থাকে।ওকে একা পেলে যে কেউ এসে অপমান করে,খোঁচা মে*রে কথা বলে চলে যায়।ছেলেটা নিজের হয়ে একটু প্রতিবাদও করতে পারে না।প্রভা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে বকুলের দিকে এগিয়ে দিল।চোখের পানিটা মোছার জন্য রুমালটাও এগিয়ে দিল।

"এই সামান্য একটা কারণে কেউ কাঁদে বকুল ফুল?দেখো মানুষের কাজই কথা বলা।সব সময় সবাই আমাদেরকে অপমান করার সুযোগ খোঁজে।কিন্তু আমরা তো জানি আমরা কেমন তাই না?তাহলে আমরা যার তার কথায় কেন অপমানিত হবো?তুমি আজ থেকে এটা ভাববে যে যারা তোমায় এসব কথা বলে তারা তোমায় কখনো বোঝেনি তাই তাদের কথা শোনারও কোন দ্বায় তোমার নেই।"

"জানো এই কারণে আমার বাড়িতেও আমাকে অনেক অপমান করে সবাই।আমার বাবা আমায় একটুও পছন্দ করেনা।এই জন্য আমার সব ভাই বোনেরাও আমাকে নিয়ে মজা করে।আমার না তখন খুব কান্না পায়।আর আমাকে কাঁদতে দেখে বাবা আরো বেশি বকা দেয়।"

বকুলকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতন কোন কথা এবার আর প্রভা খুঁজে পেল না।যদি নিজের পরিবারই দুর্বলতা গুলো নিয়ে মজা করে তাহলে বাইরের লোকজন তো সুযোগ পাবেই।বকুলের হাত থেকে নির্ভীক রুমালটা নিয়ে চোখ দুটো মুছে দিল।মাথায় স্নেহের হাত রেখে শান্ত কন্ঠে বলল,

"আমাদের সমাজে যারা হি/জ/ড়া হিসেবে পরিচিত তারা কি মানুষ না?তারাও তো আমাদের মতনই র*ক্তে মাংসে গড়া আমাদের সৃষ্টিকর্তার তৈরি করা মানুষ।তাদের জন্মও কোন মায়ের গর্ভেই হয়েছে।তারা কিন্তু নিজেরা ইচ্ছে করে এমনটা হয়নি।শারীরিক কিছু ত্রুটির কারণে তারা আমাদের থেকে একটু আলাদা।তার মানে তো এমনটা না যে তারা অমানুষ তাই না?"

বকুল মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।নির্ভীক আলতো হেসে পুনরায় বলল,

"এই যে আমাদের সমাজে এত ভেদাভেদ বিদ্যমান সেসবই আমাদের মানুষদের তৈরি।তুমি কিন্তু তাদের মতন না।তোমার আচরণে মেয়েদের মতন কোমলতা আছে,তোমার কন্ঠ মেয়েদের মত ধীরস্থির,তোমার চালচলন হাঁটাচলা সবকিছুতেই মেয়েদের মতন কোমলতা বিরাজমান।তাই বলে না তুমি মেয়ে আর না তুমি হি/জ/ড়া।মানলাম আচরণের ধরন একটু মেয়েলি।তুমি এমনই।আর তুমি যেমন তেমনভাবেই খুশি থাকো।তোমার মনে এত প্যাঁচ নেই বকুল,তুমি মানুষটা খুব ভালো।তুমি সবাইকে আগলে নিতে জানো,সবাইকে আপন করতে জানো,তুমি যেমন অন্যের খুশিতে হাসতে পারো তেমনি অন্যের দুঃখে কাঁদতেও পারো।যে গুনটা সবার মাঝে থাকে না।"

"তারমানে তুমি বলতে চাইছো আমি যেমন আছি তেমনটাই বেস্ট?"

"একদমই তাই।আচ্ছা আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো এই মানুষগুলো যদি তোমাকে এভাবে খোঁচা না দিত তাহলে কি তুমি কখনো নিজেকে নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলে?"

বকুল দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো।

"তার মানে কি দাঁড়ালো তুমি অন্যের জন্য নিজের পছন্দ বদলাতে চাইছো যেটা কখনো করবে না।তোমাকে ঘৃণা করবে এমন অসংখ্য মানুষ তুমি পাবে কিন্তু তোমাকে ভালোবাসতে পারে এমন মানুষের খুব অভাব।তাই তুমি নিজেই নিজেকে ভালোবাসতে শেখো।আর ওরা তোমার তুলনা কোন মানুষের সাথে করেছে।তুমি তো জানো তুমি তেমন না তাহলে কেন কাঁদছো?তুমি কেন অপমানিত হচ্ছো?বরং ওরা নিজেরা নিজেদেরকে নিচু করেছে যারা তোমাকে কোন এক শ্রেণীর মানুষের সাথে তুলনা করে অপমান করতে চেয়েছে।"

নির্ভীকের বলা কথাগুলো বেশ ভালোভাবেই মস্তিষ্কে ধারণ করতে সক্ষম হলো বকুল।কান্নার বদলে তার মুখে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি।এদিকে প্রভা মুগ্ধ নয়নে নির্ভীকের তাকিয়ে আছে।প্রথম দিন থেকে এই মানুষটার কথার মাঝে একটা বিশেষ কিছু অনুভব করতে পারে প্রভা।নিজের কথার দ্বারা মুহূর্তের মাঝে মানুষের ভাবনাকে বদলে দিতে পারে।যে হিসাবটা খুব কঠিন লাগছিলো একটা সময় নির্ভীক খুব সহজ-সাবলীল ভাষায় সেই হিসাবটা করে দিল।দূর থেকে দেখলে মনে হয় মানুষটা খুব গম্ভীর,সব সময় নিজেকে নিয়ে ভাবতে ব্যস্ত থাকে,আশেপাশের কার কি হয়ে গেল তাতে তার কিছু যায় আসে না।কিন্তু কেউ যদি মানুষটাকে একটু কাছ থেকে দেখে তাহলে বুঝতে পারবে যে তার আশেপাশের মানুষগুলোর সামান্য একটু কষ্টতে সে কতটা উদগ্রীব হয়ে ওঠে।হ্যাঁ মানুষটা হয়তো খুব গম্ভীর ঠিকই কিন্তু প্রয়োজন অনুসারে কথা ঠিকই বলতে পারে।নিজেকে নিয়ে ভাবনায় ব্যস্ত থাকে ঠিকই তবে প্রয়োজনে নিজের ভাবনা ছেড়ে অন্যদেরকে নিয়েও ভাবতে পারে।হুট করে প্রভার এই মানুষটাকে ভীষণ ভালো লাগল।একটা চমৎকার ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ।যার মাঝে সব ধরনের দোষ গুণ খুঁজে পাওয়া যাবে।ভীষণ আকর্ষণীয় তার চরিত্র।যার সাথে আজকাল প্রভার কথা বলতে ভীষণ ভালো লাগে,যার সাথে সময় কাটাতে প্রভার ভীষণ ভালো লাগে,যার ঠোঁটের মুচকি হাসিটা দেখার অপেক্ষায় থাকে প্রভা।প্রভা আনমনেই হাসলো।কোন এক নতুন অনুভূতির আভাস পাচ্ছে যেন সে।হয়তো একটু তাড়াতাড়িই হচ্ছে সবটা।তবে সেটা প্রভার কাছে মন্দ লাগছে না।

প্রভার এসব ভাবনার মাঝে বকুল কৃতজ্ঞতা ভরা কন্ঠে নির্ভীককে বলল,

"আমি জানতাম তুমি আমাকে বোঝালে আমি বুঝে যাবো।তুমি ছাড়া আর কেউ আমাকে বোঝাতে পারবে না।এজন্য আমার তোমায় এত ভালো লাগে।ভাগ্যিস হরি আমায় তোমায় পাইয়ে দিয়েছিল।আমি হরির কাছে প্রার্থনা করবো যেন তোমায় রাধার মতন একটা প্রেমময়,কোমল,আনন্দময়ী জীবনসঙ্গী দেয়।"

"আরে এত কষ্ট করে তোমার হরিকে আমার জন্য জীবনসঙ্গী খুঁজতে হবে না।নজরে একজন আছে তাকে জীবনসঙ্গী বানিয়ে দিলেই হবে।"

নির্ভীক আড় চোখে প্রভার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল যা প্রভা খেয়াল করলো না।প্রভা প্রশ্নাত্মক গলায় নির্ভীক কে জিজ্ঞেস করলো,

"আপনার প্রেমিকা আছে?"

"সেটা আবার আমি কখন বললাম?"

"এইতো একটু আগে বললেন আপনার নজরে নাকি একজন আছে?"

"সে তো কল্পনায়,বাস্তবে কেউ নেই।এই বেকার মানুষের হাত ধরার সাহস আর কেই বা দেখাবে বলুন?"

"দেখাতেই পারে।সবাই টাকার পেছনে ছোটে না।বেকার মানুষের হাত ধরে তাকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাহস যোগানোর মতো সাহসও অনেকের মাঝে থাকে।"

নির্ভীক মুচকি হেসে বলল,

"আমি তো এমন কাউকে দেখিনি।যাদেরকে দেখেছি তারা কেউই ভালোবাসার খোঁজ করেনি,সবাই করেছে একটা বিলাসবহুল জীবনের খোঁজ।"

"হয়তো তেমন কেউ কখনো আপনার জীবনে আসেইনি।চোখ কান খোলা রাখবেন সব সময়।বলা তো যায় না হয়তো কখনো তেমন কারো আগমন ঘটলো।"

নির্ভীক আবারও হাসলো।প্রভার কথার মানে নির্ভীক বুঝলেও নির্ভীক এর কথা বোঝার মতন সাধ্য প্রভার নেই।সেজন্যই তো ইশারা পেয়েও বুঝলো না।

______________

বেশ অনেকদিন পর আবারও গিটার নিয়ে বসলো উৎসব।বাইরের আকাশটা আজ বড্ড বেশি সুন্দর।প্রতিদিনের মতন তেমন একটা ভ্যাপসা গরম নেই।আবহাওয়াটাকে মোটামুটি শীতল বলা চলে।গিটারটা নিয়ে বসে মন খুলে গান গাইলো।অনেকদিন পর তার মনটা যেন আবারও ভালো লাগছে।নিজের ওপরে রাগ অভিমানে গান আর গাওয়া হয় না তার আজকাল তেমন একটা।নির্ভীকদের জোড়াজুড়িতে মাঝে মাঝে গায় কিন্তু বাড়িতে আর তেমন একটা গাওয়াই হয় না। না এই গিটারটাকে ছুঁয়ে দেখা হয়।অযত্নে অবহেলায় ঘরের এক কোনায় পড়ে থাকে।অথচ একটা সময় ঘুমোলেও গিটারটাকে নিয়ে ঘুমোতো উৎসব।এখনো মনে পড়ে সেই দিনটার কথা যেদিন কত কান্নাকাটি করে এই গিটারটা কিনে নিয়েছিল সে।নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলে গিটারটা কিনে নেওয়ার জন্য। অবশেষে সফল হয়েও ছিলো।ভেবেছিল এই গিটারটাকেই সারা জীবন নিজের সঙ্গী বানাবে।কিন্তু সেসব আর হয়ে উঠল না।নিজের পরিবার থেকে একটু সমর্থন পায়নি এই বিষয়ে।অবহেলায় অবজ্ঞায় ধীরে ধীরে নিজের শখটার উপর মরিচা পড়ে গেছে।কথাগুলো ভাবতেই উৎসব হাসলো।গিটারে সুর তুলে পুনরায় একটা গান ধরলো।কিন্তু এবারে আর গানটা সম্পূর্ণ করতে পারল না।তার আগে রুমে আগমন ঘটলো রুবাইদার।পড়নে তার ক্রিম কালার ক্রেপ শার্ট।তার ওপর মেরুন ব্লজার আর ম্যাচিং স্ট্রেইট প্যান্ট।হাতে গোল্ডেন ওয়াচ,কানে ছোট্ট স্টাড এয়ারিং।মুখে ন্যাচারাল টোনের ফাউন্ডেশন,মাসকারা,আর ডার্ক মেরুন লিপস্টিক।ব্রাউন সিল্কি চুলগুলো কার্ল করা।হাতে কালো রঙের লেদার হ্যান্ডব্যাগ যাতে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের সাথে ল্যাপটপও বহন করছেন।ফর্সা গায়ের রঙের সাথে অত্যন্ত সুন্দর মুখোশ্রী।এই সাজ পোশাকে তার রুপ যেন আরোও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।বয়স যে চল্লিশ পেরিয়ে গিয়েছে সেটা তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই।চেহারায় তার অপূর্ব লাবন্যতা ফুটে উঠেছে।নিজ যোগ্যতায় নিজের আলাদা একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন।তৈরি করেছেন নিজের আলাদা একটা পরিচয়।ব্যবসায়ীক জীবনে তিনি একজন সফল নারী।তার তুলনা হয়তো তিনি নিজেই।শুধু সফল হতে পারেননি নিজের পরিবারের কাছে।না তিনি স্ত্রী হিসেবে সফল হতে পেরেছেন না মা হিসেবে।

দরজা খোলার শব্দ পেতে উৎসবের গানের গলা থেমে গেল।সেদিকে তাকিয়ে একদম ফরমাল লুকে রুবাইদা কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু চমকালো।বরাবরের মতন মুখে তার গম্ভীর ভাব।মানুষটা দেখতে অপূর্ব সুন্দর।যদি মুখে তার একটু হাসি থাকতো তাহলে হয়তো তার সৌন্দর্যটা আরো বাড়তো।কিন্তু তিনি হাসতে বড্ড বেশি কৃপণতা করেন।তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি অফিসে যাচ্ছেন।উৎসব মৃদু ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

"কাজ করতে করতে মাথার সমস্যা হওয়ার জন্য রুমের রাস্তা ভুলে গিয়ে কি ভুল করে আমার রুমে চলে এসেছেন নাকি?এছাড়া তো আর আমার রুমে আসার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না আপনার।"

রুবাইদা রাগী কন্ঠে বলল,

"প্রয়োজন ছিল না আসার কিন্তু বাধ্য হয়ে আসতে হলো আমাকে।তুমি জানো তোমার রুমের পাশের রুমটাই আমার।আমি একটা ইম্পোর্টেন্ট মিটিংয়ে ছিলাম।তার মাঝে তোমার এই গিটারের গানের আওয়াজে আমার প্রচন্ড ডিস্টার্ব হচ্ছিলো।অবশেষে না পেরে আমার মিটিংটা মাঝপথে থামাতে হয়েছে যার কারণে আমাকে এখন আবার অফিসে যেতে হচ্ছে।"

"কানের মধ্যে তুলা দিয়ে রাখতে পারতেন তো?এত টাকা ইনকাম করেন আর সামান্য তুলা কেনার টাকা আপনার কাছে নেই?"

"লিসেন উৎসব আমার কাছে এতটা সময় নেই যে আমি তোমার সাথে মশকরা করব।তোমাকে কতবার বলেছি বাড়ির ভেতরে এভাবে চিল্লাবে না।আমার ভালো লাগেনা এতো নয়েস।এই কারণে আমি নিজের রুমটা সেপারেট করেছি।তার কারণ আমার এত চেঁচামেচি পছন্দ না।"

"আমি গান গাইছিলাম,চেঁচাচ্ছিলাম না।এটা কোন খেলার মাঠ না যে আমি বসে থেকে চেঁচাবো।"

বিজ্ঞাপন

"তোমার গান আমার কাছে চেঁচানোর মতোনই।হোয়াট এভার তোমাকে বোঝানোর মতন অ্যাবিলিটি আমার নেই না আমার কাছে এত টাইম আছে যে তোমার পেছনে ওয়েস্ট করব।আজ তোমার এই গিটার আর তোমার ভয়েস এর জন্য আমার মিটিং এ প্রচন্ড ডিস্টার্ব হয়েছে।ফারদার যেন এমনটা আর না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখবে।যদি গান গাইতে হয় তাহলে টেরিস এ গিয়ে গাইবে আর না হলে তোমার ওই ইউজলেস ফ্রেন্ড সার্কেল তো আছে।ওদের সাথে গিয়ে গলা ফাটিয়ে গান দাও তোমাকে কেউ মানা করবে না।বাট আমার কাজে যেন আর কোন ডিস্টার্ব না হয়।"

কথাটা বলে রুবাইদা সেখান থেকে চলে গেল।উৎসব গিটারটা বিছানার উপর একপ্রকার ছু*ড়ে মা*রলো।ইচ্ছে করছে ঘরের সব কিছু ভেঙে তছনছ করতে।

"শা/লা যত বা/লের নিয়ম সব এই বাড়িতে।সারাদিন যদি মা মা বলে চিল্লায়ে ম/রেও যাই তখন ওনার কানে যায় না।যেই না একটু গান গেয়েছি অমনি ওনার মিটিং ফিটিং এর বারোটা বাজছে।"

"ভাইয়া!"

ডাকটা কানে যেতেই উৎসব বুঝল যে ঊষা এসেছে।কিন্তু এই মুহূর্তে একটুও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বিরক্তি ভরা কন্ঠে ঊষা কে কিছু বলতে চাইলো তার আগে ঊষার পেছনে আরো একটা মুখ দেখতে পেলে। অনেক কষ্টে নিজের রাগটা সংবরণ করে ঊষাকে বলল,

"বল।"

"আসলে ভাইয়া তুমি তো গান গাইছিলে।ম্যাম জিজ্ঞাসা করছিলো যে কে গান গাইছে।তো আমি বললাম যে আমার ভাইয়া।"

"তো?"

"তো মানে আসলে তুমি পরে যেই গানটা গাইতে ধরে থেমে গেলে না ওটা একটু গাইবে আবার?মানে আমরা দুজনেই তোমার ভক্ত তাই আবদার করছিলাম আরকি।"

উৎসব অবাক কন্ঠে বলল,

"গান তো গাই না,চেঁচাই।এই চেঁচানোর জন্য আবার দু দুটো ভক্ত হয়ে গেল!না রে ঊষা এত সম্মানে আমার অ্যালার্জি আছে।গান গাইতে পারবো না এখন।"

"ভাইয়া সত্যি বলছি তোমার গান আমাদের ভিষণ পছন্দ হয়েছে।অন্যদিন আম্মু বাড়িতে থাকলে ম্যাম আর শুনতে পাবেনা।আমি ওনাকে বলেছি যে আমার ভাইয়াকে আমি কিছু বললে আমার কথা ফেলে না।আব্বু-আম্মুও আমার কথা শোনে না তুমিও শুনবে না?"

উৎসব কিছু বলল না চুপ করে থাকলো।তা দেখে ঊষা আশাহত হলো।ওর পাশে দাঁড়ানো প্রভা বলে উঠলো,

"থাক বাদ দাও ঊষা।জোর করে গান শোনার দরকার নেই।আমার আবদার করাটাই উচিৎ হয়নি।যিনি সত্যিকারের শিল্পী,ভালোবেসে গান গায় তাকে তার ভালোবাসার জিনিসটা করতে এত অনুরোধ করতে হয় না।উনি মনে হয় শুধু শখের বসেই গানটা গায়,ভালোবেসে নয়।"

কথাটা বলে প্রভা চলে যেতে নিলে পেছন থেকে উৎসব বলে উঠলো,

"ও মাস্টান্নি,আপনার এসব জ্ঞান আপনার ছাত্রী কে দেবেন।ইমোশনে তো বেশ ভালোভাবেই একটা লাথি দিলেন।এখন আমার ইমোশনটা জাগিয়ে দিয়ে কই যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছে?"

প্রভা বুঝলো কাজ হয়েছে।কিন্তু হাসলো না মুখে গম্ভীর ভাব বজায় রেখে বলল,

"আপনিই তো বললেন যে গান শোনাবেন না তাহলে থেকে কি করবো?"

"মত বদলে ফেলেছি।আসুন।"

প্রভা আর কিছু না বলে ভেতরে এলো।উৎসব ঊষা কে বলল,

"আমি ততক্ষণ তোর মাস্টান্নি কে গান শোনাই তুই গিয়ে কিছু নাস্তা নিয়ে আয়।মাস্টান্নি কে কিছু না খাওয়ালে আবার কলেজে গিয়ে বদনাম বের করবে।"

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঊষা কে যেতে হলো।উৎসব গিটারটা হাতে নিয়ে প্রভা কে বলল,

"তা মাস্টান্নি যেই গান মাঝ পথেই ইন্তেকাল করিয়ে দিয়েছিলাম ওইটাই শুনবেন নাকি নতুন করে কোনো গানের জন্ম দেব?"

"যেটা ইন্তেকাল করেছিল ওটাই শুরু করুন।"

"ওক্কে।"

একটা লম্বা শ্বাস টেনে উৎসব গিটারে সুর তুলে গাইলো,

❝তোমার জন্য নীলচে তারার একটু খানি আলো

ভোরের রঙ রাতে মিশে কালো!

কাঠগোলাপের সাদার মায়া মিশিয়ে দিয়ে ভাবি

আবছা নীল তোমার লাগে ভালো!

ভাবনা আমার শিমুল ডালে লালচে আগুন জ্বালে

মহুয়ার বনে মাতাল হাওয়া খেলে!

এক মুঠো রোদ আকাশ ভরা তারা

ভিজে মাটিতে জলের নকশা করা

মনকে শুধু পাগল করে ফেলে!❞

"এত সুন্দর গাইতে পারেন তারপরেও শোনাতে এত আলসেমি কেন?"

প্রভার প্রশ্ন শুনে উৎসব স্মিত হেসে বলল,

"আলসেমি না।আপনারা আসার আগে একজন মা/রা দিয়ে গেল এই গান গাওয়ার জন্য।ইচ্ছেটা তাই ম*রে গেছিলো।"

"ইচ্ছেদের কখনো ম*রতে দিতে নেই।কিছু ইচ্ছেদের আঁকড়ে ধরেই তো আমরা বেঁচে থাকি।"

"যখন বেঁচে থাকার ইচ্ছেই ম/রে যায় তখন আর অন্য সব ইচ্ছেদের বাঁচিয়ে রেখে কি লাভ বলুন?"

"জীবনটাকে এতটা তুচ্ছ ভাববেন না।কিছু হারালে কিছু পেয়েও যাবেন।জীবনটাকে একবার ভালোবেসে দেখুন বাঁচার জন্য অনেক কিছু পাবেন।এমনটা না যে আপনি বাঁচতে চান না।বাঁচার জন্য যে কারণ গুলো দরকার হয় সেগুলো ঠিক ভাবে বুঝে উঠতে পারেননি আপনি।গান টাকে তো ভালোবাসেন।গলায় সুরও আছে।নিজের স্বপ্নটাকে বেঁচে থাকার কারণ বানিয়ে নিন।"

উৎসব মৃদু হেসে প্রভা কে বলল,

"আপনি যে মাস্টান্নি সেটা আপনার কথা শুনলেই বোঝা যায়।আপনি দেখি আজ আমাকেও পড়ালেন।জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা পাঠ পড়ালেন।"

"আপনি সবটা জানতেন শুধু আপনাকে উপলব্ধি করানোর দরকার ছিল সেটাই করলাম।আচ্ছা এখন আসছি।গান শোনানোর জন্য ধন্যবাদ।"

কথাটা বলে প্রভা চলে যেতে নিলে উৎসব ওকে বাঁধা দিয়ে বলল,

"আরে যাচ্ছেন কেন?ঊষাকে তো নাস্তা আনতে বললাম।খেয়ে যান।"

"অন্য দিন।এখন না উঠলে দেরি হয়ে যাবে।"

"বেশ তবে যান।আবার গান শুনতে আসবেন কেমন!আমার বন্ধুরা ছাড়া কেউ আমার গান শুনতে চায় না।একা একা গান গাইতেও ভালো লাগে না তেমন।"

"সময় পেলে নিশ্চয়ই আসবো।ভালো থাকবেন।"

প্রভা চলে যেতে নিলে উৎসব ফের বলে উঠলো,

"এমন ভাবে বিদায় নিলেন মনে হচ্ছে আর দেখাই হবে না।কাল চায়ের দোকানে আসবেন কেমন।আপনার জ্ঞান শুনতে ভালোই লাগে।"

প্রভা হালকা হেসে সম্মতি জানিয়ে চলে গেল।উৎসব কিছু একটা ভেবে আনমনে হাসলো।বিড়বিড় করে বলল,

"মাস্টান্নির জ্ঞান শুনতে ভালোই লাগে।"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প