"আরে সুন্দরী তুমি আমার দেওয়া উপহার ফিরিয়ে দিচ্ছ কেন বারবার?বারবার এভাবে আমাকে অপমান করা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না।"
প্রায় দিনই এমন পথের মাঝখানে হুট করে এসে উদয় ঘটে ইশরাকের।প্রভা বুঝে উঠতে পারে না ইশরাকের কি কোন কাজ নেই যে সারাদিন এভাবে ওর পিছনে পড়ে থাকে নাকি প্রভাকে বোঝাতে চায় যে ওর জীবনে প্রভার গুরুত্ব অনেক বেশি?কারণ যেটাই হোক প্রভার তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা।সব থেকে বড় কথা হলো কোন অবস্থাতেই ওর ইশরাক কে সহ্য হয় না।ইশরাকের উপর শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
"আমি যার তার থেকে উপহার নেই না।আর আপনার যদি সত্যিই অপমান বোধ থাকত তাহলে আমি প্রথমবার ফিরিয়ে দেওয়ার পরেই আপনি আর কখনো পাঠাতেন না।"
ইশরাক বক্র হেসে বলল,
"প্রেম ভালোবাসায় মাঝে মাঝে একটু নির্লজ্জ হতে হয়।তুমি একবার একটু আমায় ভালোবেসে দেখো তুমিও নির্লজ্জ হবে।"
"ভালোবাসায় নির্লজ্জ হতে আমার সমস্যা নেই কিন্তু কি বলুন তো যে নির্লজ্জ তাকে আমি ঠিক ভালোবাসতে পারিনা।আর এমনটাও না যে আপনি ভালোবাসায় পড়ে তারপরে নির্লজ্জ হয়েছেন।আমি যেদিন থেকে আপনাকে দেখছি ঠিক সেদিন থেকেই আপনাকে নির্লজ্জ হিসেবে আমি জানি।"
কথাটা বলে প্রভা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ইশরাক ওর হাত টেনে ধরলো।ইশরাকের হাত থেকে প্রভা নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু ব্যর্থ হলো।বলিষ্ঠ পুরুষালি দেহের শক্তির সাথে পেরে উঠল না।অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
"প্রমাণ করে দিলেন তো আপনি নির্লজ্জ!হাত ছাড়ুন না হলে কিন্তু আবার আমার হাতে চ*ড় খাবেন আপনি।"
প্রভার হুমকি শুনে ইশরাক হাসলো।ইশরাকের সেই হাসি দেখে প্রভার গা ঘিনঘিন করে উঠলো।ইশরাক প্রভার দিকে দু কদম এগিয়ে এসে শান্ত কন্ঠে বলল,
"হ্যাঁ আমি নির্লজ্জ।কিন্তু আমি ঠিক কতটা নির্লজ্জ তার আন্দাজ তোমার নেই।এই যে তুমি আমায় এত তেজ দেখাও না এগুলো ভাঙতে আমার যাস্ট দুই সেকেন্ড সময় লাগবে।আমি যদি তোমাকে তুলে নিয়ে গিয়েও বিয়ে করি না আমাকে আটকানোর ক্ষমতা কারো নেই।কিন্তু আমি তোমাকে আমার খারাপ রূপটা দেখাতে চাই না।তাই বলছি আমাকে নিজের খারাপ রূপটা দেখাতে বাধ্য করো না সুন্দরী।"
সৌমি বোতলে পানি আনতে গিয়েছিল।এতক্ষণ সে এখানে উপস্থিত ছিল না।দূর থেকে ইশরাক কে দেখেই ভয়ে ওর হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো।তার ওপর যখন দেখলো প্রভার হাতটা ইশরাকের হাতে ভয়টা তখন আরো বাড়লো।ছুটে এলো প্রভা কে সাহায্য করার জন্য।
"হাত ধরেছেন কেন ওর?ছেড়ে দিন ওকে।"
তৃতীয় কারো কণ্ঠস্বর পেয়ে দুজনে সে দিক ফিরে তাকালো।সৌমি কে দেখতে পেয়ে প্রভা একটু সাহস পেল সাথে স্বস্তিও।ইশরাক প্রভার হাত ছেড়ে দিল।সৌমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"ছেড়ে দিলাম।কিন্তু একটা কথা মনে রেখো আজ ছেড়ে দিলাম তার মানে কিন্তু এটা না যে আর কখনো ধরবো না।আমার সুন্দরী শুধু আমার।"
সৌমি অনেক সাহস করে কম্পিত কণ্ঠে বলল,
"ওওকে তো ভালোবাসেন না আপনি ততাহলে বিয়েএ করতে চান কেন?"
"কে বলল ভালোবাসি না?ভালোবাসি তো,ভীষণ ভালোবাসি।কিন্তু কথা সেটা না।আমি যখন ওকে চেয়েছি তখন ওকে নিজের করেই ছাড়বো।একবার যখন ওকে আমার মনে ধরেছে তখন ওকে আমারই হতে হবে।"
কথাটা বলে ইশরাক সেখান থেকে চলে গেল।ইশরাক চলে যেতেই সৌমি উৎকণ্ঠিত গলায় প্রভাকে বলল,
"তুই ঠিক আছিস তো প্রভা?"
প্রভা জড়ানো কন্ঠে বলল,
"কেউ তো ঠিক থাকতে দেয় না।দেখ সৌমি,আমরা দুজন যত নিজের জীবনে ভালো থাকতে চাই আমাদের জীবনে ঠিক ততই ঝামেলার সৃষ্টি হয়।ইশরাক প্রায় রোজই আমার সাথে এমন অসভ্যতামো করে,দিন দুপুরে হুমকি দেয়।অথচ একটা মানুষও আমাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে না।আমি কারো কাছে অভিযোগ করে বলতেও পারি না যে অমুক আমার সাথে এমন আচরণ করেছে তোমরা কিছু একটা কর।আমার জন্য কেউ ওকে হুমকিও দেয় না।ঠিক কতটা একা আমরা জীবনে একবার ভাবতে পারছিস?"
"জানি তো রে কিন্তু কি আর করার বল।যেখানে আমাদের বাবা-মাই আমাদেরকে একা ফেলে রেখে চলে গেছে সেখানে অপরিচিত মানুষগুলোর থেকে আর কি বা সাহায্যের আশা করবো।তোর তো তাও শুধু বাবা ছেড়ে চলে গেছে।তোর মা যদি বেঁচে থাকতো তাহলে আজ তুই তার সাথে থাকতি।কিন্তু আমার কপালটার কথা একবার ভেবে দেখ জন্মের পর কয়েকটা বছর মা-বাবার সাথে থেকেছি।কিন্তু তারা নিজের সাথে সারাজীবন আমাকে না রেখে একটা জায়গায় ছেড়ে গেল।একটুও বুক কাঁপলো না ওদের।"
"থাক বাদ দে সেসব কথা।আমাদের কেউ নেই।আমরা নিজেরাই ভাঙবো আবার নিজেরাই নিজেদেরকে গড়ে তুলবো।আর ঠিক এই কারণেই দেখ আমরা প্রতি নিয়ত আরো বেশি মজবুত হতে পাচ্ছি।"
প্রভার কথায় সৌমি হাসলো।প্রভা ওর কপালে হাত দিয়ে জ্বর আছে কিনা সেটা দেখলো।
"না জ্বর এখন নেই।আচ্ছা সেদিন যারা তোকে ভয় দেখিয়েছিল তাদেরকে দেখেছিস?"
সৌমি আশেপাশে তাকিয়ে বলল,
"না দেখিনি।ওই গন্ডারটাকে দেখতে পাচ্ছি না।"
সৌমির মুখ থেকে এমন সম্বোধন শুনে প্রভা মৃদু বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
"তোকে আমি বারণ করেছি না যে এই নামে ডাকবি না।তুই যদি অন্যদেরকে অপমান করিস তাহলে কি ওরাও তোকে অপমান করবে না?"
"শুরুটা তো ওই করেছিলো।"
"মানলাম শুরুটা উনি করেছিলেন তাই বলে কি তোকে সেটা চালিয়ে যেতে হবে?উনি বলতে থাকুক তুই তোর দিক থেকে থেমে যা।একসময় দেখবি বলতে বলতে উনি নিজেও থেমে যাবেন।"
সৌমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।কিন্তু আদৌ কতক্ষণ মানবে সেটাই দেখার বিষয়।
________________
❝এই ইটের শহর পোড়ায় খালি,
জোড়াতালি জীবন আমার ভাল্লাগেনা রে!
কে কার রাখে খবর
দম ফুরালেও একলা একা নিথর দেহ কাইন্দা মরে রে!
কে পাইলো কার কি গেলো,কার কি বা আসে যায়
মন ঝিরির পথে হাঁটার লোভে কেমন করে হায়!
চলো দোতং পাহাড় জুম ঘরে পূর্ণিমা রাত বর্ষা জুড়ে
জীবন জুয়া আসর বসাবো!❞
বেশ অনেকদিন পরে বন্ধুরা সবাই মিলে একসাথে বসে গান গাইলো।এক সময় প্রায় রোজই এই চায়ের দোকানটায় ওদের গানের আসর বসত।কিন্তু বিগত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত আর তেমনটা হয় না।মাঝে মাঝে গানের আসর বসে তবে বেশিরভাগটাই এখন হয় আড্ডার আসর।গান গাওয়া শুরু করে উৎসব তারপর ওর সাথে বাকি সবাই গলা মেলায়।
"তুমি কিন্তু অযথা এই গণিতের প্যাঁচে পড়ে জীবনটা নষ্ট করছো ভায়া।যে বিষয়টাতে কখনো তুমি মনস্থির করতে পারো না তা দিয়ে জীবনে উন্নতি সম্ভব না।এর থেকে যদি গানটান গাইতে তাহলে এতদিনে বাংলাদেশের অরিজিৎ সিং হয়ে যাওয়ার কিন্তু সম্ভাবনা ছিল তোমার।"
তিসানের কথা শুনে উৎসব তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে বলল,
"স্বপ্ন তো আমার নিজেরও সেটাই ছিল ভাই।কিন্তু নিজের বাবা-মাই যখন স্বপ্ন ভাঙ্গার পেছনের কারিগর হয়ে ওঠে না তখন একসময় নিজের স্বপ্নটা নিজেকেই ভাঙতে হয়।"
নির্ভীক মৃদু গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"হাজারবার করে তোকে বলেছিলাম নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করিস না।এখন কি তুই শুনিস তোর বাবা-মার কথা?তাহলে নিজের স্বপ্ন ভাঙ্গার এই কথাটাই কেন শুনতে গেলি?"
"খুব কষ্টে রে ভাই।এই কথাটা মনে হলেই খুব কষ্ট লাগে যে আমার বাবা মা আমায় বোঝেনা।আমায় ভালোবাসে না ওরা।ওরা দুজন সব সময় নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকে।আমার ভালো লাগা,খারাপ লাগা এগুলোর কোনো মূল্যই নেই ওদের কাছে।"
"সেজন্যই তো তোকে নিজেকে মূল্য দিতে হবে।যখন বুঝবি যে জীবনের যত্ন নেওয়ার মতন কেউ নেই তখন নিজেকে নিজের যত্ন নিতে হয়।জীবনে ঠেকেই শিখতে হয় উৎসব।আমার জীবনে দেখ কেউ নেই।তিসান ভাইকে দেখ ওনার পরিবার আছে কিন্তু তাও কোথাও গিয়ে কেউ ওনার যত্ন নেয় না।নির্ভয় কে দেখ ওরও কিন্তু খুব সুন্দর একটা পরিবার আছে কিন্তু তাও সেখানে ওর মূল্যের খুব অভাব।আমরা তিনজনে কিন্তু আর কারো কাছ থেকে কোন কিছু আশা রাখি না কারণ আমরা বুঝতে পেরেছি যে আমাদের ভালো থাকার দায়িত্ব আমাদের নিজেরই নিতে হবে।তোকেও ঠিক এটাই করতে হবে বুঝতে পেরেছিস।"
"হ হ বুঝছি।বা*ল ভালো লাগে না আমার।তোকে কিছু একটা বললেই তুই শুরু করে দিস আধাঘন্টা ধরে জ্ঞান দেওয়া।তুই জানিস আমার মাথার মধ্যে এত কিছু যায় না।"
"নির্ভীক!"
কারো কণ্ঠ শুনে সবার মনোযোগ সেদিকে গেল যদিও তাকিয়েছে শুধু নির্ভীকই।কেননা প্রভা নির্ভীকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।আর প্রভার ঠিক সামনে পিছন দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে বাকিরা সবাই।ফলস্বরূপ প্রভা নির্ভীক কে দেখতে পেল কিন্তু এখানে বাকি আরো যে কয়েকটা মুখ ওর পরিচিত সেটা খেয়াল করলো না।কিন্তু প্রভার সেই কন্ঠটা উৎসব আর তিসানের বেশ পরিচিত লাগলো।প্রভাকে দেখতে পেয়ে নির্ভীক বেঞ্চ থেকে উঠে ওদের দিকে এগিয়ে গেল।
"সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি আপনার জন্য।ইনি কে?"
প্রভা মৃদু হেসে বলল,
"আসলে আপনাদের কাছেই আসছিলাম কিন্তু একটু ঝামেলার কারণে দেরি হয়ে গেল।আর ও সৌমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।আমরা দুজনে একসাথেই থাকি।"
"ও আচ্ছা।তা এখন একদম পরিপূর্ণ ভাবে বিশ্বাস হয়েছে তো যে আমি ওই নির্ভীক?বিশ্বাস না হলেও সমস্যা নেই।আমার সাথে বাকিরা সবাই আছে।আসুন পরিচয় করিয়ে দেই।"
প্রভা বাকিদের দিকে তাকাতেই দেখলে দু-জোড়া বিস্ময় ভরা দৃষ্টি ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।এবং দুজনকেই প্রভা চেনে।সৌমি যদিও বা শুধুমাত্র তিসান কে চেনে।উৎসবের সাথে ওর কোন পরিচয় নেই।এদিকে ওদেরকে একে অপরের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নির্ভীক আর নির্ভয় দুজনেই একটু অবাক হলো।এভাবে তাকিয়ে থাকার কারণটা ঠিক বুঝতে পারলো না।বকুল প্রভা আর সৌমিকে আগে থেকেই চেনে তাই সে অবাক হলো না।কেননা নির্ভীকদের পরিচয়টা বকুলই ওদেরকে দিয়েছিল।কিন্তু এখন এভাবে একে অপরের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকার মানেটা তারও ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।নাক মুখ কুঁচকে একটু মেয়েলি ভাব নিয়ে বলল,
"ও হর,এমন ভাবে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছে যেন মনে হচ্ছে শুভ দৃষ্টি হচ্ছে।শুধু মন্ত্র পড়া বাকি।"
উৎসব বকুলের পিঠে হালকা করে একটা চাপড় দিয়ে বলল,
"হরি তুমি থামো।আরে মাস্টান্নি আপনি এখানে কি করছেন?আমাদেরকে পড়াতে এসেছেন নাকি?"
প্রভা বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
"তার আগে বলুন আপনি এখানে কি করছেন?"
"এটাতো আমার বাপের সম্পত্তি।না মানে আসলে সরকারি সম্পত্তি কিন্তু আমরা ব্যবহার করি এমন ভাবে যেন নিজের বাপের সম্পত্তি।দিনের বেশিরভাগটা সময় নিজের এই বাপের সম্পত্তির দেখাশোনা করেই কাঁটাই।"
এদিকে সৌমি বেশ অনেকক্ষণ থেকে তিসান কে মনে করার চেষ্টা করছে কিন্তু ঠিক মনে করে উঠতে পারছে না।তার স্মৃতি শক্তির একটু সমস্যা আছে।খুব তাড়াতাড়ি পুরনো কথা ভুলে যায়।অনেক চেষ্টার পর যখন মনে পড়লো তখন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিসান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"আরে আপনি সেই ছিনতাইকারীটা না?হ্যাঁ আপনি তো সেই ছিনতাইকারীটা।"
সৌমির এমন কথা শুনে সবাই একযোগে ওর দিকে তাকালো।কেউ ঠিক বুঝতে পারল না যে তিসান কবে থেকে ছিনতাই করা শুরু করলো।তিসান কপালে হাত ঠেকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল,
"আমি ছিনতাইকারী না রে কোঁকরা চুল আমি ছিনতাইকারীকে ধরেছিলাম।জনসম্মুখে এমন কথা বলো না নাহলে গণপিটুনি খাওয়ার থেকে আমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।"
নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে সৌমি অপরাধী কন্ঠে বলল,
"সরি।আসলে এক্সাইটমেন্টে বলে ফেলেছি।কিন্তু আপনি এখানে কি করছেন?"
"ওই যে একটু আগে উৎসব বলল না এটা আমাদের বাপের সম্পত্তি।বাকিদের মতন আমিও এই বাপের সম্পত্তি দেখাশোনা করে দিনের বেশিরভাগ সময়টা কাঁটাই।তার আগে বলো তোমরা দুই আজব জিনিস এখানে কি করছো?"
সৌমি কিছু উত্তর দেবে তার আগেই নির্ভীক বলে উঠলো,
"এখানে তো দেখছি তোমরা সবাই সবাইকে আগে থেকেই চেন।শুধু আমরা যে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত এটা কেউ জানতে না।"
নির্ভীক এর কথার প্রেক্ষিতে প্রভা ইশারায় নির্ভয় কে দেখিয়ে বলে উঠলো,
"সবাইকে চিনলেও ওনাকে চিনি না।শুধু ওনার সাথেই পরিচয় হওয়াটা বাকি আছে।"
প্রভার কথা শুনে উৎসব নির্ভয়ের কাঁধের উপর হাত রেখে হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
"মাস্টান্নি,এ হচ্ছে আমাদের টুনির বাপ।যদিও এখনো আমরা টুনির মা আর টুনিকে খুঁজে পাইনি।আর ওই যে তোমার পাশে একটা বনি দাঁড়িয়ে আছে না ওর ভাষায় গন্ডার শাহরিয়ার মানে নির্ভয় শাহরিয়ার।"
তিসান কে দেখার আনন্দে এতক্ষণে সৌমি উৎসবকে খেয়ালই করেনি,না নির্ভয়কে।কিন্তু উৎসবের কথা শুনে এতক্ষণে তার সবটা মনে পড়লো।উৎসবের সেদিনের বলা পাচারের কথা গুলো মনে হতেই ভয়ে গুটিসুটি হয়ে গেল।বরাবর সে ভয় পেলে যা করে এখনো ঠিক তাই করলো।চুপচাপ প্রভার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো।এদিকে নির্ভয় নামটা শুনতে প্রভা চিনতে পেরেছে যে এদের কথাই সৌমি ওকে বলেছিল।তার মানে পাচার করে দেওয়ার ভয়টা যে দেখিয়ছিল সেও নিশ্চয় এদের মধ্যে থেকেই কেউ একটা হবে।
প্রভা প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,
"ওকে পাচার করে দেওয়ার ভয় কে দেখিয়েছেন?"
উৎসব গর্বের সাথেই বলে উঠলো,
"আমি দেখিয়েছি।নিশ্চয়ই খুব ভয় পেয়েছে তাই না?এই যে পিপীলিকা আর এমন করলে কিন্তু সত্যি পাচার করে দেব।"
"প্লিজ চুপ করুন।কেন দেখিয়েছেন ওকে ভয়টা?"
"আরে মাস্টান্নি,আপনি সত্যি ভেবে নিয়েছেন নাকি?আমি তো মজা করেছিলাম।"
প্রভার আগে নির্ভীক বলে উঠল,
"আসলে ওরা মজা করেছিলো।নির্ভয়ের সাথে একটু ঝামেলা হয়েছিলো তো তাই আরকি।আপনি রাগ করবেন না।আমি ক্ষমা চাইছি ওদের হয়ে।"
"আমি রাগ করিনি।আসলে আপনাদের কে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতেও পারছি না।"
প্রভা সৌমি কে বলল,
"তোর না একটা টিউশনে যাওয়ার কথা ছিল সৌমি? তুই যা দেরি হয়ে যাবে।"
"সে তো এখনো এক ঘন্টার মতন সময় হাতে আছে।তুই একা একা কি করবি?"
"ওনাদের সাথে ইশরাকের ব্যাপারে কথা বলবো।তুই যা, যেতে যেতেই সময় হয়ে যাবে।একটু তাড়াতাড়ি গেলে বরং ভালো তাই না?"
সৌমিকে বুঝিয়ে প্রভা ওকে পাঠিয়ে দিল।সৌমি চলে যেতেই বকুল উৎসবকে উদ্দেশ্য করে মৃদু রাগী কণ্ঠে বললো,
"তোমার কি বুদ্ধিশুদ্ধি কখনো হবে না হরি?"
"ও মা আমি আবার কি করলাম বকুল ফুল?"
"এই যে এত পাচার করে দেব পাচার করে দেবে বলে চিল্লাচ্ছো তা পাচার করবে টা কোথায় শুনি?শুধু শুধু ঐ মেয়েটাকে ভয় দেখাও কেন?"
"আরে বকুল ফুল পাচার করার জন্য অনেক জায়গা আছে।তুমি একবার বলো না তুমি কি পাচার হতে চাও? তোমাকে সহ পার্সেল পাঠিয়ে দেবো।"
"ধুর বাবা তোমার সাথে কথা বলে শান্তি নেই।তোমার থেকে নির্ভীক অনেক ভালো।ও আমাকে একটুও বিরক্ত করো না।সবাই থাকো আমি উঠছি।"
বকুল সেখান থেকে চলে যেতে নির্ভীক প্রভা কে বলল,
"এখন বলুন কি বলতে চাইছিলেন?"
"আসলে আপনাদের এই মজাটা সৌমির উপর খুব খারাপ প্রভাব ফেলেছিল।ওর জন্য এটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল।ভীষণ ভয় পেয়েছিল।সেদিন রাতে গিয়ে প্রচন্ড জ্বর এসেছিল।আজ সকালেও ছিল,একটু আগে কমেছে।এই কথা মনে করে ওর একবার প্যানিক অ্যাটাকও হয়েছিলো।"
প্রভার কথাগুলো উৎসবের ঠিক বিশ্বাস হলো না।উৎসবের ওই কথাগুলো যে ফাঁকা হুমকি ছিল সেটা যে কারোরই বোঝার কথা।সেখানে সৌমির উপরে এতটাই বেশি প্রভাব পড়ে গেল এটা ভাবতে উৎসব নারাজ।
"এই যে মাস্টান্নি,বোকা অন্য কাউকে গিয়ে বানাবেন।আমার সাথে এসব চালাকি চলবে না।এই কথায় অ্যাটাক-ফ্যাটাক এত কিছু হয়ে গেল?অল্পের জন্য তো আমার উপর মা*র্ডারের কেস দিলেন না আপনি।নাকি আবার আমার মায়ের প্রতিশোধ নিতে এসেছেন?"
উৎসবের কথায় প্রভা একটু বিরক্তই হলো।মানুষটার কথাবার্তা যে একটু খাপ ছাড়া টাইপের সেটা আগেই বুঝতে পেরেছিল।কিন্তু তাই বলে কারো অসুস্থতার কথা নিয়েও মিথ্যা বলবে?প্রভা শান্ত কন্ঠে বলল,
"আমাদের জীবন সম্পর্কে আপনি কিচ্ছু জানেন না।আমাদের বর্তমান কেমন,অতীত কেমন ছিল সেসব সম্পর্কেও আপনি কিচ্ছু জানেন না।জানলে বুঝতেন সৌমির অসুস্থতার কারণ।"
নির্ভয় কৌতুহলী কন্ঠে বলে উঠল,
"কি কারণ বলা যাবে কি আমাদের?"
সবাই একই প্রশ্ন করলো প্রভা কে।বলতে চাইছিলো না প্রভা কিন্তু কারণ না বললে হয়ত ওনারা বিশ্বাস করবেন না।আর পরবর্তী তে হয়ত আবারো সৌমি কে এই নিয়ে ভয় দেখাবে।একটা লম্বা শ্বাস টেনে প্রভা বলা শুরু করলো,
"আমরা দুজনেই ছোটবেলা থেকে অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি।"
প্রভা কথাটা বলার সাথে সাথে তিন জোড়া বিস্ফোরিত দৃষ্টি ওর ওপর পড়লো।তিসান অবাক হলো না কেননা সে আগেই জানতো এই বিষয়টা।
"আমি যদিও বা একদম ছোট থেকেই মানে আমার জন্মের পরেই আমার মা মারা যায়।হাসপাতাল থেকেই আমি সোজা অনাথ আশ্রমে আসি।কিন্তু সৌমি এসেছিল অনেক পরে যখন ওর বয়স পাঁচ কি ছয় বছর তখন।ওর বাবা-মা ওকে একটা জায়গায় ছেড়ে গিয়েছিল।আর্থিক সংকটের কারণে ওনারা হয়ত এই কাজটা করেছিলেন।সেখান থেকে ও একটা পাচারচক্রের কবলে পড়ে যায়।ওই চক্রটি নাকি ছোট বাচ্চাদের পাচার করতো।তারপর সেখান থেকে পুলিশ ওদের কে উদ্ধার করে।তারপর সৌমি সহ আরো বেশ কয়েক জনকে আমার ওই আশ্রমে নিয়ে আসা হয়।ওর বাবা মার খোঁজ আর পাওয়া যায়নি।ওই ঘটনার পর থেকেই সৌমির একটা ভয়।আপনারা এই মজাটা করার পর ওর মাঝে একটা আতঙ্ক কাজ করছিলো।আশা করছি এবার ওর অসুস্থতার কারণটা বুঝতে পেরেছেন?"
প্রভার থেকে কথাগুলো শুনে সবার মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেল।মনে হচ্ছে যেন কোনো গল্প শুনলো তারা।এবার তো তিসানও অবাক হয়েছে।কিন্তু বিস্ময় থেকেও বেশি সবার অপরাধবোধ কাজ করছে।না জেনে মেয়েটাকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে।উৎসব অপরাধী কণ্ঠে বলল,
"সরি মাস্টান্নি।আসলে আমরা কেউই জানতাম না।"
"ইটস ওকে।আপনারা যে নিজেদের ভুলটা বুঝতে পেরেছেন এটাই অনেক।আর অনুরোধ রইলো পরবর্তীতে ওকে ভয় দেখাবেন না।ওর মনটা খুব নরম। ও খুব ভীতু একটা মেয়ে।"
পাশ থেকে নির্ভয় বলে উঠলো,
"প্রমিস করছি আর কখনো ভয় দেখাবো না।"
নির্ভীক প্রভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"ওনার কথা তো বললেন ভিতু আপনি কি তবে খুব সাহসী?সব তো ওনার জীবনের কষ্টের কথাই বললেন আপনার কষ্টের কথা তো বললেন না।"
প্রভা স্মিত হেসে বলল,
"সাহসী কিনা জানি না তবে হ্যাঁ ওকে আগলে রাখার জন্য আমাকে সাহস দেখাতে হয়।আমরা তো আর কারো কাছে গিয়ে অভিযোগ করতে পারিনা।আমাদের হয়ে কেউ লড়াই করেনা।"
প্রভার কথার প্রেক্ষিতে নির্ভীক কিছু বলল না,কেউই কিছু বলতে পারল না।হুট করে নির্ভীকের কেন যেন মনে হলো মেয়েটার কষ্টটা সে কমাতে চায়।এই যে প্রভা আফসোস করে বলল ওর তো অভিযোগ করার মতন কেউ নেই নির্ভীকের কেন যেন খুব করে ইচ্ছে করছে প্রভার জীবনে নিজের জন্য এমন একটা জায়গা তৈরি করতে যেন ওই মেয়েটা ওর কাছে অভিযোগ করতে পারে।নির্ভীক ওর হয়ে লড়াই করতে চায় বাকি সবার সাথে।কেমন যেন এক মায়া চলে এল মেয়েটার উপর।হ্যাঁ শুধুই মায়া।