ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ১১

🟢

বেশ অনেকক্ষণ ধরে নির্ভীক নিজের একটা দরকারি নোট খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছে না।এই বাড়িতে সব সময়ই তার দরকারি জিনিসগুলো হাওয়া হয়ে যায়।এত গুছিয়ে রাখার পরও যে কি করে জিনিস গুলো উধাও হয়ে যায় সেটা অবশ্য নির্ভীক এর জানতে বাকি নেই।সারা ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজে যখন পেল না তখন বাইরের ডাস্টবিনের কাছে গেল খুঁজতে।অনেক সময় নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এই জায়গাটায় পেয়েছে।কেননা নির্ভীকের জন্য যেগুলো খুবই প্রয়োজনীয় বাকিদের কাছে সেগুলো নিতান্ত তুচ্ছ ময়লা আবর্জনা।

কিন্তু না আজকে এখানেও পেল না।অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিসটা না পেলেও অপ্রত্যাশিতভাবে অন্য একটা জিনিস হাতে পড়ে গেল।একটা বাসের টিকেট।যেদিন সাব্বির এসেছিল সেদিনেরই টিকিট।টিকিটটা হাতে পেয়ে নির্ভীক বেশ অবাক হলো।কেননা সাব্বির ওকে বলেছিল যে ও ট্রেনে এসেছে।কিন্তু হাতের টিকিটটাও তো মিথ্যে না।

তারমানে সাব্বির বাসে ঠিকই এসেছিল হয়তো নির্ভীক কে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখেছিল।কিন্তু ওকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই আর দেখা করেনি এবং প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর ফোন করে জানায় যে ও বাড়ি চলে এসেছে।নির্ভীক হাসলো।আহা জীবন!এক জীবনে মানুষ কত শিক্ষায় না পায় তাও নিজের আপন মানুষদের থেকে।অবশ্য ভুল মানুষকে আপন ভাবলে হয়তো এমন কষ্টই পেতে হয়।যারা বরাবরই নির্ভীক কে দূরের কেউ ভেবে এসেছে নির্ভীক তাদেরকে সবসময় ভালোবেসে আগলে নিতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি।এটা নির্ভীক এর ব্যর্থতা নাকি ওদের ব্যর্থতা সেটা জানা নেই।তার সেই কষ্টের মাঝে লুকিয়ে রাখা একরাশ দুঃখ কেউ দেখল না।সবার অগোচরে সে হাসে আবার সবার অগোচরেই সেই হাসির আড়ালে নিজের লুকিয়ে রাখা দুঃখটা লুকিয়ে ফেলে।নিজের আবেগ অনুভূতি সম্পর্কে কাউকে কিছু বুঝতেই দেয় না।কষ্ট পেতে পেতে একটা সময় যখন মানুষ পাথরে পরিণত হয়,যখন বুঝতে পারে যে কাউকে এই কষ্টগুলো দেখিয়েও লাভ নেই তখন সে সবার থেকে নিজের দুঃখ কষ্ট গুলো আড়াল করা শুরু করে।

নির্ভীক আবার নিজের রুমে চলে এলো।টেবিলের উপর থেকে বইটা নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো।একটু পরেই সাব্বির এলো ওর রুমে।নির্ভীক কে পড়ার মাঝে ব্যস্ত থাকতে দেখে হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,

"এত রাতেও পড়ছো ভাইয়া?ঘুমোও কখন তুমি?"

সাব্বিরের কন্ঠ পেয়ে নির্ভীকের দৃষ্টি দরজার দিকে গেল।নির্ভীক কে তাকাতে দেখে সাব্বির রুমের ভিতরে এসে বিছানার ওপর বসলো।নির্ভীক যথারীতি স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,

"বেশি ঘুমোনোর দরকার পড়ে না আমার।কিছু বলবে তুমি?"

সাব্বির ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,

"আসলে ভাইয়া অনেকদিন পর ঢাকা আসলাম তো বন্ধুবান্ধবরা দেখা করতে চাইছিলো।তো ভাবছিলাম কালকে ওদের সাথে দেখা করতে যাব।"

"ভালো কথা।যাও দেখা করে এসো।"

"হ্যাঁ যাবো কিন্তু আমার হাতে আসলে অত টাকা নেই এখন।মানে বুঝতেই পারছো অনেকদিন পর ওদের সাথে দেখা করছি একটু কিছু না খাওয়ালে চলে? বলছিলাম তুমি একটু আমায় দু তিন হাজার টাকা ধার দিতে পারবে?আমি বাবাকে বলবো পরে তোমায় দিয়ে দিতে।বাবার কাছে চেয়েছিলাম কিন্তু ওনার কাছে নাকি নেই।সেজন্য তোমার কাছে এলাম।"

"এই মাসে আমার কাছে টাকা নেই।আর এই বিষয়টা বাবাও খুব ভালো করে জানে।উনিও আমার থেকে চেয়েছিলেন কিন্তু আমি দিতে পারিনি।"

সাব্বির যেন একটু অপমানিত হলো।কিন্তু যেহেতু তার এখন দরকার টাকাটা তাই সেটা প্রকাশ করলো না।পুনরায় বলল,

"দেখো না ভাইয়া যদি একটু কোথাও থেকে ম্যানেজ করে দিতে পারো।আমি বাবাকে বলবো তোমায় যেন পরে দিয়ে দেয়।তুমি চিন্তা করো না আমি বললে বাবা দিয়ে দেবে।"

সাব্বিরের কথা শুনে নির্ভীক তাচ্ছিল্য হাসলো।সামিউল চৌধুরীর সাথে র*ক্তের সম্পর্ক নির্ভীক এর অথচ দেখে মনে হচ্ছে সাব্বিরই যেন ওনার নিজের ছেলে।

"সরি আমি ম্যানেজ করতে পারবো না।আর একটা কথা তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি যদি টাকা দেই তোমাদেরকে তাহলে সেটা আর ফেরত নেই না।তাই বারবার এই কথাটা বলো না যে তুমি বাবাকে বললে বাবা দিয়ে দেবে।তোমার বাবা মাসে মাসে তোমাকে খরচ পাঠানোর টাকাটাই আমার কাছ থেকে চান সেখানে উনি যে আমাকে কি ফেরত দেবেন সেটা আমার খুব ভালো করে জানা আছে।"

"খোঁটা দিচ্ছ নাকি?তুমি তো এমন ভাবে কথা বলছো যেন আমরা তোমার জন্য কিছুই করি না।থাক লাগবে না তোমার টাকা।আমার চাওয়াটাই ভুল হয়েছে।আমারই বোঝা উচিত ছিল যে আমি তোমাকে নিজের ভাই ভাবলেও তুমি আমাকে সেই সৎ ভাইই ভাবো।"

কথাটা বলে সাব্বির চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো।বেশ রাগী কন্ঠেই কথাগুলো বলল।মুহূর্তের মাঝে তার আচরণ কেমন বদলে গেল।নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসটা যে সে পায়নি তাহলে এখন তো আর অযথা নির্ভীক কে তেল মে*রে কোন লাভ নেই।সাব্বির যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে নির্ভীক বলে উঠলো,

"নিজের ভাই ভাবো জন্যই বুঝি দেড় ঘন্টা রোদের মাঝে অযথা কোনো কারণ ছাড়া দাঁড় করিয়ে রেখেছিলে বাসস্ট্যান্ডে?"

কথাটা কানে যেতেই সাব্বিরের পা জোড়া থেমে গেল।বুঝতে পারলো না যে নির্ভীক সত্যিটা জেনে গেছে নাকি আন্দাজে ঢিল ছুঁড়লো।পিছন ফিরে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কন্ঠে বলল,

"তোমাকে তো বলেছিলাম যে এই বিষয়ে আমি কিছু জানতাম না।একটা ভুল বোঝাবুঝির জের ধরে তুমি এখনো এত কথা বলে যাচ্ছো কেন?"

"আবার মিথ্যে।আমার কাছে তো তোমাদের এতটা গুরুত্ব নেই তাহলে অযথা মিথ্যে বলো কেন?"

"কি মিথ্যে বলেছি আমি?"

"সবটাই যদি ভুল বোঝাবুঝি হয়,তুমি যদি কিছু না জেনেই থাকো তাহলে তুমি যে বাসে করে এসেছো ট্রেনে না এই কথাটা আমায় মিথ্যে বললে কেন?যদি তুমি ট্রেনেই এসে থাকো তাহলে বাসের টিকিট কি করে এলো?নাকি আজকাল বাসের টিকিটেই ট্রেনে ওঠা যাচ্ছে?"

সাব্বিরের চোখ মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠলো।বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"তুমি কি করে জানলে?তুমি আন্দাজে বলছো তাই না?"

"আন্দাজে কাউকে কোন দোষারোপ আমি করি না তুমি সেটা খুব ভালো করেই জানো।বাইরের ডাস্টবিনে তোমার বাসের টিকিট খুঁজে পেয়েছি।আমি জানি সাব্বির তোমার মা আর সামিয়ার মত তুমিও আমায় খুব একটা পছন্দ করো না।কিন্তু পার্থক্য এতোটুকুই তুমি সামিয়ার মতন বোকা না।সামিয়া আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েও আমার থেকে টাকা পাওয়ার আশা রাখে কিন্তু তুমি আমার সাথে ভালো ব্যবহার করে আমার মন জয় করে নিজের কাজটা খুব সহজভাবে করে নাও।"

সাব্বির নিজের দৃষ্টি অবনত রেখে ধীর কণ্ঠে বলল,

"এমনটা না ভাইয়া।"

"এমনটাই।আমি সবই বুঝি কিন্তু তারপরেও কেন কিছু বলি না তোমায় জানো?তার কারণ নিজের স্বার্থের জন্য হলেও তবুও তুমি আমার সাথে একটু ভালো ব্যবহার করো,ভাইয়া বলে অন্তত ডাকো।লোক দেখানোর জন্য হলেও সম্মানটুকু করো।যেন কোন অশান্তি না হয় সেজন্য চুপ করে থাকি।"

সাব্বির বলার মতন কোন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।এভাবে যে ধরা পড়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।তার রাগ হচ্ছে এখনো সামিয়ার ওপর।ওকে বলেছিলে টিকিটটা বাইরে ফেলে দিতে কিন্তু ওই গাধা যে বাড়ির ডাস্টবিনে ফেলেছে সেটা ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি সাব্বির।যদি জানত তাহলে এভাবে নির্ভীকের কাছে ধরাটা খেতে হতো না।কিন্তু এখন যেহেতু ধরা পড়েই গেছে যে করে হোক তাকে পরিস্থিতিটা সামাল দিতে হবে।

"আসলে ভাইয়া আমি মায়ের কথায় এসব করতে বাধ্য হয়েছি।বিশ্বাস কর আমি চাইনি এমন কিছু করতে।আসলে মা এমন ভাবে জোর করলো যে আমি কোন মতে মাকে থামাতে পারিনি।"

নির্ভীক হালকা হেসে সাব্বিরকে বলল,

"আর মিথ্যে বলো না।আমি এমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ না যার কাছে নিজের দোষটা ঢাকার জন্য মিথ্যে বলতে হবে।আরো একটা কথা আজ অব্দি আমি তোমাদের জন্য যা করেছি তার জন্য কখনোই তোমাদেরকে খোঁটা দেইনি।আর সত্যিই তোমরা আমার জন্য কিছু করোনি।কি করার কথা বলছো বাড়িতে থাকতে দেওয়ার কথা? ভুলে যেওনা বাড়িটা আমার নামে আছে।খাওয়ানোর কথা বলছো?মাসে আমি নিজে যতটুকু খাই তার থেকেও বেশি টাকা দেই এই সংসারে।আমি আরো কি কি করি এই সংসারের জন্য সেটা যদি জানার ইচ্ছে থাকে তাহলে তোমার মা কিংবা বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো।"

সাব্বির অপরাধী কন্ঠে বলল,

"সরি ভাইয়া আমি আসলে ওভাবে বলতে চাইনি।"

"তোমার মুখ থেকে এই কথাগুলো মানায়ও না।ফাঁকি বাজি বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দাও।তোমার মায়ের তোমায় নিয়ে অনেক স্বপ্ন এমনকি আমার বাবারো।আমার পিছনে এক টাকাও নষ্ট না করে তোমায় পড়াচ্ছেন এটা ভেবে যে আমি স্বার্থপর।নিজে বড় কিছু হয়ে গেলে তোমাদের ভুলে যাব।তাই বলছি ওনাদের ভরসাটা রাখো।আসতে পারো।"

সাব্বির আর সেখানে দাঁড়ালো না।চলে গেল।হাতের বইটা পাশে রেখে দিয়ে ঘরের লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে শুয়ে পড়লো নির্ভীক।আলো বলতে জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোটুকুই।নির্ভীকের কেন যেন আজ ভীষণ কান্না পাচ্ছে।চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে।খুব আপন একজন মানুষকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা হাহাকার গুলো জানাতে ইচ্ছে করছে।নিজের মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে।যতদিন ওই মানুষটা বেঁচে ছিল নির্ভীকের জীবনে কোন কষ্ট ছিলনা,না তার বাবা তার পর ছিল।

কি অসহ্য যন্ত্রণা বুকের মাঝে নিয়ে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়।এত বড় একটা পৃথিবী,সেখানে এত মানুষ,কত মানুষ পরিচিত,কত মানুষ আবার ভীষণ আপন।কিন্তু এই যে এখন নির্ভীকের কারো একটা সঙ্গ খুব দরকার কিন্তু ওর পাশে কেউ নেই।নির্ভীক একলা।চারিদিকে শুধু শূণ্যতা আর এই বদ্ধ ঘরে বিষণ্ণতায় ঘেরা এক মানবের হৃদয়ের আর্তনাদ।দুটোই শব্দহীন।

____________

"সৌমি!এই সৌমি!"

তীব্র মাথাব্যাথায় কাতরাচ্ছে প্রভা।বেশ কিছু দিন হলেই এই সমস্যাটা হচ্ছে।আগেও হতো কিন্তু সেই ব্যাথাটা এতটা তীব্র আর যন্ত্রণাদায়ক হতো না।কিন্তু আজকাল একটু বেশিই তীব্র হয়।শোয়া অবস্থাতেই সৌমি কে ডাকলো কয়েকবার।কোনো সাড়া না পেয়ে ভ্রুঁ কোঁচকালো।বালিশ থেকে মাথাটা উঠিয়ে আবার ডাকতে যাবে তার পূর্বেই মনে পড়লো যে সৌমির তো বাড়িতে থাকার কথাই না।কোনো এক জরুরি কাজে অনাথ আশ্রমে যাওয়ার কথা ছিল।প্রভা কে ঘুমোতে দেখে হয়ত আর বিরক্ত করেনি।

বিরক্তি তে নাক মুখ কোঁচকালো প্রভা।উঠে বসে ওড়নাটা শক্ত করে কপালে বাঁধলো।ব্যথ্যা তো কমলোই না উল্টো মনে হলো যেন আরোও বাড়ছে।এদিকে সময় আপন গতিতে ছুটে চলেছে।শরীর না কুলোলেও প্রভা কে উঠতে হলো।সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল করে বের হলো।ব্যথ্যা যে খুব একটা কমেছে তেমনটা না কিন্তু তবুও যেন একটু আরাম লাগছে।বারান্দার গ্রিলের সাথে গামছাটা মেলে দিয়ে রান্না ঘরে গেল দেখতে যে সৌমি রান্না করে রেখে গেছে কিনা।ভাত,ডাল,আলু ভর্তা আর ডিম ভেজে রেখে গেছে সৌমি।সেসব দেখে প্রভার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।এই খাবার গুলো প্রভার ভীষণ প্রিয়।আজ যদি সৌমি রান্না করে না যেত তাহলে আর খাওয়াই হতো না প্রভার।এখনো যদিও খেতে ইচ্ছে করছে না প্রভার কিন্তু তবুও খেতে হবে।প্লেটে একটু ভাত তরকারি নিয়ে বিছানার ওপর গিয়ে বসলো।কিন্তু খেতে আর পারলো না।এক লোকমা ভাত মুখে দিতেই পেটের নাড়িভুড়ি সব উল্টে এলো।কোনো মতে মুখে হাত দিয়ে সোজা বেসিনের দিকে দৌড় দিল।গড়গড় করে বমি করে দিল।না এবারে আর কোনো মতেই দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না প্রভা।মনে হচ্ছে ওখানেই মাথা ঘুরে পরে যাবে।কোনো মতে দেয়াল ধরে ধরে ঘরে এলো।বিছানায় গা টা এলিয়ে দিল।চোখ দুটোও খুলে রাখার শক্তি যেন নেই।এভাবেই নিজের অজান্তে ঘুমিয়ে গেল।প্রায় চল্লিশ মিনিট পর প্রভার ঘুম ভাঙলো।যখন বুঝতে পারলো যে ঘুমোনোর জন্য অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে চট করে উঠে বসলো।ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো ইতোমধ্যে তার বেশ অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।শরীরটা এখন একটু ভালো লাগছে,মাথাব্যথাটাও একটু কমেছে।সেসবের প্রতি প্রভা আর কোনো খেয়াল দিল না।তাড়াতাড়ি করে চুল টুল ঠিকঠাক করে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো।

দুটো ক্লাস করে প্রভা হাঁপিয়ে গেলো।তার মধ্যে ক্ষিদেতে পেটটা চো চো করছে।বসার জন্য একটু শীতল জায়গা খুঁজছে আপাতত।নাহলে এই রোদে শরীরটা আরোও বেশি খারাপ করবে।আশেপাশে চোখ বোলাতেই একটা গাছের নিচে নির্ভীক কে বসে থাকতে দেখলো।একাই বসে আছে।আর তার গভীর মনোযোগ হাতের বইয়ের ওপর নিবদ্ধ।প্রভা সেদিকেই এগিয়ে গেলো।

"বসতে পারি এখানে?"

পড়ার মাঝে বিঘ্ন ঘটায় নির্ভীক একটু বিরক্ত হলো বটে কিন্তু উপরে তাকিয়ে সেই মিষ্টি মুখটা দেখতেই সব বিরক্তি ভাব নিমিষের মাঝে কেটে গেল।মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

"বরাবরের জন্য অনুমতি দিয়ে দিলাম।"

"এই অধমের প্রতি এতোটা সহৃদয়তা দেখানোর কারণ?"

নির্ভীক মুচকি হেসে বলল,

"রূপে যার মাধুর্য ছড়ায়,গুণে যে অনন্য,

কণ্ঠে যার মিষ্টি সুর,চোখে তে লাবণ্য।

সে কি করে অধম হয় বলুন?

আর যদি বা হয়, তার পাশে বসেই ধন্য আমি।"

নির্ভীক এর কথায় প্রভা শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

"আপনি মুখে বলেন যে আপনি কবি নন কিন্তু আসলে কিন্তু আপনি কবি।আর সেটা আপনার কথার মাঝে খুব ভালোভাবে প্রকাশ পায়।"

"বলেছিলাম তো আপনাকে মাঝে মাঝে একটু কবি হই।বর্ণনা করার মতন কোন বিষয় সামনে থাকলে একটু বর্ণনা করতে ইচ্ছে করে।"

"বুঝলাম।তা আপনার বাকি বন্ধুবান্ধবরা কই?কাউকে দেখছি না যে আজ?"

"দুজন আসবেনা আর একজন মনে হয় এখনো ঘুমোচ্ছে?"

"তা কে কে আসবে না আর কে ঘুমোচ্ছে?"

"নির্ভয় আর তিসান ভাই আজকে আসবে না আর উৎসব মনে হয় এখনো ঘুমোচ্ছে।আপনার বান্ধবীকেও তো দেখছি না।"

"আসলে সৌমি আশ্রমে গিয়েছে।"

"ওহ্।আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?"

"নিশ্চয়ই।বলুন কি জানতে চান।"

নির্ভীক একটু ইতস্তত করে বলল,

"আসলে সেদিন যে শুধু আপনার বান্ধবীর কথা বললেন আপনার বিষয়ে তো তেমন কিছুই বললেন না।"

প্রভা উদাস গলায় বলল,

"বলার মতন তো কিছু নেই কি বলবো বলুন?"

"আপনি তো বলেছিলেন যে হাসপাতাল থেকে সোজা অনাথ আশ্রমে গিয়েছিলেন।তাহলে যারা আপনাকে নিয়ে গিয়েছিল তারা তো নিশ্চয়ই আপনার পরিবারের লোক জন সম্পর্কে জানবে তাই না?"

প্রভা কিছু একটা ভেবে আনমনে বলল,

"আশ্রমে একজন আছে যিনি আমায় নিয়ে এসেছিলো হাসপাতাল থেকে।আমায় খুব আদর যত্নে বড় করে তুলেছেন।ওনার থেকে শুনেছিলাম আমি হওয়ার পরেই নাকি আমার মা মা/রা যায়।"

"আর বাবা?"

"সে তো আমায় ফেলে রেখে চলে গেছে।বাবা নাকি এসেছিল।মা মারা যাওয়ার পরে হাসপাতালে বলে গিয়েছিল যে ওনার কাছে টাকা নেই টাকা আনতে যাচ্ছেন।কিন্তু আর আসেননি।শুধু আমার জন্য মায়ের একটা ছবি দিয়ে গিয়েছিলেন।কেন দিয়েছিলেন জানিনা।"

পুরো কথাটা প্রভা হাসি মুখেই বলল।কিন্তু তার সেই হাসিটা বড্ড মলিন।জোর করে হাসছে যেন।নির্ভীক কে বোঝাতে চাইছে যে এই কথা গুলো বলতে ওর কষ্ট হচ্ছে না কিন্তু সত্যিটা আলাদা।প্রভার খুব কষ্ট হচ্ছে।নির্ভীক বোধহয় বুঝলো।সেই প্রসঙ্গে আর কোনো কথা বলল না।সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গে কথা তুলল।

"চোখ-মুখ এত শুকনো লাগছে কেন আপনার?সকালে খেয়ে আসেননি?"

"না আসলে শরীরটা একটু খারাপ লাগছিলো তাই খেতে পারিনি।চোখ-মুখ তো আপনারও শুকনো লাগছে।আপনি খেয়ে এসেছেন?"

"না আমিও খেয়ে আসিনি।"

"আপনারও কি শরীর খারাপ লাগছিলো নাকি?"

"না।আসলে আমাকে খেতে বলার কিংবা খাবার দেওয়ার মানুষ নেই।আমি না খেলেই বরং অনেক মানুষ খুশি হয়।"

প্রভা ভ্রুঁ কুচকে বলল,

"এটা আবার কেমন কথা?আপনার বাবা-মা নেই?"

"মা নেই।বাবা আর সৎ মা আছেন।আর সৎ ভাই-বোন আছে।"

প্রভা ধীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

"আপনার বাবাও গুরুত্ব দেয় না?"

নির্ভীক মলিন হেসে বলল,

"তার কি আর আমার প্রতি নজর দেওয়ার সময় আছে?যতদিন মা বেঁচে ছিল অনেক ভালোবেসেছে।মা মারা যাওয়ার চার মাসের মাথায় দ্বিতীয় বিয়ে করলো।তারপর ধীরে ধীরে বাবার ভালোবাসাও হারিয়ে গেল।এখন এমন পর্যায়ে আছে যে আমার থেকে অনেক বেশি বাবা আমার সৎ মায়ের প্রথম পক্ষের ছেলে কে ভালোবাসে।"

নির্ভীকের কথা শুনে প্রভার ভীষণ খারাপ লাগলো।মা বাবা না থাকলেই যে কষ্ট পেতে হয় এমনটা না।অনেকের থাকার পরেও কষ্ট কমেনা।বরং থেকেও না থাকার কষ্টটাই হয়ত বেশি।চোখের সামনে নিজের প্রিয় মানুষ গুলোর থেকে অবহেলা সহ্য করা ভীষণ কঠিন।নির্ভীকের কষ্ট হবে ভেবে প্রভা আর এই নিয়ে কোনো কথা বললো না।ব্যাগ থেকে একটা পাউরুটি আর কলা বের করে নির্ভীকের দিয়ে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

"এই নিন এটা খেয়ে নিন।"

প্রভার হাতের খাবারের দিকে তাকিয়ে নির্ভীক হালকা হেসে বলল,

"লাগবে না।না খেয়ে থাকার অভ্যাস আমার আছে।আপনি রেখে দিন।ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নেবেন।"

"বিস্কুট আছে ব্যাগে ওটা খেয়ে নেব।ধরুন তো আপনি।"

প্রভা জোর করেই নির্ভীকের হাতে খাবারটা ধরিয়ে দিলো।নির্ভীক নিজে পাউরুটি আর কলার অর্ধেক নিয়ে বাকিটা প্রভার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,

"কোনো কথা ছাড়া চুপচাপ খেয়ে নেবেন নাহলে আমিও খাবো না।"

আপত্তি করার মতন প্রভার কাছে আর কোনো রাস্তা রইলো না।আর এমনিতেও ভাগ করে খেতে প্রভার মন্দ লাগলো না।শুরু থেকেই দূরে দাঁড়িয়ে ওদের দুজন কে লক্ষ্য করছিলো ইশরাক।দৃষ্টি তার অত্যন্ত শীতল এবং স্বাভাবিক কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পড়ছে।শেষ অব্দি আর অপেক্ষা করলো না।যেতে যেতে ওদের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে বলল,

"পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে!"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প