"আরে কতদিন পর এলি তুই বাবা।ইশ শুকিয়ে গেছিস! খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করিস না তাই না?এজন্য তোকে বলি আমার মেয়েটাকে বিয়ে করে নে,তোকে ঘর জামাই করে রাখবো আমি।তারপর দেখিস তোর কত আদর যত্ন করি আমি।"
শেফালী বেগমের কথা শুনে উৎসব মুচকি হাসলো।এই মানুষটা যে উৎসবকে কেন এত ভালোবাসে উৎসব সেটা বুঝতে পারে না।নিজের মা-বাবার থেকেও বেশি ভালোবাসে।নিজের মা-বাবা উৎসবের যে যত্ন নেয়নি উৎসবের ফুপি ঠিক সেই যত্নটা উৎসবের নিয়েছে।হয়তো কাশফিয়ার থেকেও বেশি ভালোবাসে উৎসবকে।
"আমি একদম ঠিক আছি।একটুও শুকিয়ে যাইনি।বরং তোমার চশমার পাওয়ার বেড়ে গেছে।"
শেফালী বেগম কপোট রাগ দেখিয়ে বললেন,
"একদম আজেবাজে কথা বলবি না।চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি ছেলেটা আমার শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।হ্যাঁ রে বাবা তোকে বলি তুই আমার কাছে থাক কথা শুনিস না কেন আমার?"
"আমি এখানে থাকলে না তোমার মেয়ে আমাকে কোনদিন খাবারের মধ্যে বি*ষ মিশিয়ে খু*ন করে ফেলবে ফুপি।ওর ভয়েই তো আমি থাকি না।"
"ওর কথা বাদ দে তো।ওকে আমি দেখে নেব।তোকে কতবার করে বলেছি যে আমার মেয়েটার সাথে বিয়ে দিয়ে দেই।বলনা করবি?ভাই ভাবির সাথে আমি কথা বলি?"
শেফালী বেগমের হাতটা উৎসব নিজের মুঠোয় নিয়ে স্মিত হেসে বলল,
"কাশফিয়া আর আমার মাঝে তো ভাই বোনের সম্পর্কটাও ঠিক নেই ফুপি সেখানে সারা জীবন ওর সাথে থাকার কথা আমি কখনো ভাবতেও পারিনা।না আমি ওকে এই হিসেবে কখনো দেখেছি না ও আমাকে দেখেছে।আমাদের দুজনের মাঝে কিচ্ছু মিল নেই।"
"বিয়ের পর দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা।তোরা দুজন সারা জীবন আমার চোখের সামনে থাকবি। আমি একটু শান্তিতে থাকতে পারবো।"
"এ হয় না ফুপি।আমি যেমন জীবন সঙ্গী আশা করি কাশফিয়া তেমন না আর না কাশফিয়া যেই মিস্টার পারফেক্ট কে খুঁজে বেড়ায় সেটা আমি।ও যেমন জীবনসঙ্গী চায় তার একটা গুণও আমার মাঝে নেই ঠিক তেমনি আমার কল্পনার সাথেও কাশফিয়া মেলে না।এটা হয় না ফুপি।আমি তোমাকে আগেও বলেছি যে কাশফিয়াকে আমি কখনো সেই হিসেবে দেখিনি।এই বিয়েটা কখনোই সম্ভব না।আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না বিশ্বাস কর?তুমি তো জানো আমি তোমাকে আমার মার থেকেও বেশি ভালোবাসি।আমি তোমার কোন কথা ফেলতে পারি না এটাও তুমি খুব ভালো করে জানো।কিন্তু আমি তোমার এই কথাটা রাখতে পারব না।আমি জানি তুমি হয়তো ভাবছো এতে আমরা দুজনে সুখী হব।কিন্তু না,এমনটা করলে আমাদের দুজনের জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে।বিয়েটা তো আর কোন ছেলে খেলা না তাই না?দুটো মানুষের মনের মিলই যদি না থাকে তাহলে সারাটা জীবন একসাথে সংসার করবো কি করে?"
শেফালী বেগম উৎসবের কথাটা বুঝলেন।সত্যি তো উনি নিজেই দেখেন কাশফিয়া উৎসবকে বিন্দুমাত্র পছন্দ করেন আর না উৎসবের কখনো কাশফিয়ার প্রতি তিনি তেমন কোন দুর্বলতা লক্ষ্য করেছেন।দুজনের মাঝে সামান্য ভাই বোনের সম্পর্কটাও ঠিক নেই সেখানে সারাটা জীবন একসাথে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাটা ভাবা হয়তো ওনারই ভুল।শেফালী বেগম আর এই নিয়ে কোন কথা বাড়ালেন না।তিনি খাবার বাড়তে চলে গেলেন।শেফালী বেগম চলে যেতেই তিনটে মানুষ একপ্রকার হামলে পড়লো উৎসবের ওপর।নির্ভয় বিস্ময় ভরা কন্ঠ বলল,
"এই তুই যদি ওকে পছন্দই না করে থাকিস তাহলে তখন বউ বউ বলে ডাকলি কেন?আমি তো ভেবেছিলাম সত্যি তুই ওর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস!"
নির্ভয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বকুলও বলে উঠলো,
"একদম ঠিক বলেছো।যখন পছন্দই করো না তাহলে তখন এমন ভাবে কাশফুল কাশফুল বলে ঢং করছিলে কেন?হায়রে হরি এদের ঢং দেখে জান বাঁচে না!"
ওদের দুজনের কথা শুনে উৎসব শব্দ করে হেসে উঠলো।বকুলের দিকে একটু ঝুঁকে ওর গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল,
"হায়রে হরি তোমায় যে কি দিয়ে বানানো হয়েছে এটাই আমি ভেবে পাই না।তোমার হরি তোমার এই ডাক শুনতে পেলে এতদিনে একটা প্রেম করিয়ে দিত গো বকুল ফুল।"
বকুল ভেঙচি কেটে বলল
,
"ও হরি এত হেসো না।হাসতে হাসতেই না হলে কিন্তু তোমার হরিবোল হয়ে যাবে।"
বকুলের কথা শুনে উৎসবের হাসি আরো বাড়লো।নির্ভয় বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে উঠে গেল।তিসান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল উৎসব কে,
"সত্যি করে বলোতো ভায়া ব্যাপারটা কি?বাইরে বললে বউ অথচ ঘরে এসে বোন বলে স্বীকার করতেও তোমার অসুবিধা হচ্ছে।"
"আরে ভাই তুমিও এদের মতন বোকা হলে?সে তো আমি এমনি মজা করি।দেখো না আমি ওকে কাশফুল বলে ডাকলে ও কেমন তেলে বেগুনে জ্ব*লে ওঠে।আর ওকে জ্বা*লাতে আমার বেশ ভালোই লাগে এর বাইরে কিছু না।"
তিসান সন্দেহী কন্ঠে প্রশ্ন করল,
"সত্যি কিছু নেই?"
"না ভাই সত্যিই কিছু নেই।উৎসব মির্জা নিজের অনুভূতি নিয়ে কখনো মিথ্যে বলে না।যদি কাউকে ভালোবাসি তাহলে সেটা স্বীকার করার সৎ সাহস আমার মাঝে আছে।"
"এই অভ্যাসটা চিরকাল রেখো হে ভায়া।কেননা নিজের ভালোবাসার কথা স্বীকার না করতে পারলে সব থেকে বেশি কষ্টটা নিজেরই হয়।এই যে বুকটা দেখছো না ভীষণ ব্যথা হয় এখানে।যে প্রেমের আগুনটা শুরুতে জ্বলেছিল ধীরে ধীরে সেটা একটু একটু করে পুড়িয়ে ছেড়েছে আমার পুরো বুকটা।একবার আমার বুকের দিকে তাকিয়ে দেখো না,আমার স্বীকার করার সৎ সাহস হয়নি তাই পুরো বুকটা আমার পুড়ে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।"
"এই ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বুকে কি এখনো সেই নামটা লেখা আছে?নাকি বুকের সাথে সাথে অনুভূতি আর নাম গুলোও পু*ড়ে ছাই হয়ে গেছে?"
উৎসবের প্রশ্ন শুনে তিসান হাসলো।এই ছেলে বলে কি?এ তো আর এক দুই দিনের তৈরি হওয়া অনুভূতি না যে এত তাড়াতাড়ি মুছে যাবে।এই অনুভূতি তো অনেকগুলো বছর ধরে তিসানের মাঝে তৈরি হয়েছে।তিসান খুব যত্নে সেগুলোকে বাড়তে দিয়েছে,নিজের মাঝে লুকিয়ে রেখেছে।এই অনুভূতিগুলো পুড়ে যাওয়া, সেই নামটা পু*ড়ে যাওয়া কি এতই সহজ!তিসান তো কখনোই সেটা পু*ড়তে দেবেনা।নিজের সমস্তটা পু*ড়ে গেলেও সেই অনুভূতি আর সেই নামটা যত্ন করে এক জায়গায় রেখে দেবে।তার পু*ড়ে যাওয়া হৃদয়ের অংশের একটু ছাইও লাগতে দেবে না সেখানে।
"আছে ভায়া আছে আর চিরকাল থাকবে।সেখানে আমি আজও একটুও দাগ লাগতে দেইনি।শুধু লুকিয়ে রেখেছি।প্রকাশ করলে যে সেই নামটা কলঙ্কিত হবে।আর আমি তো সেটা হতে দিতে পারিনা।সে যে খুব পবিত্র।আর তার মতন আমার ভালোবাসাটাও খুব পবিত্র।আর পবিত্র জিনিস গুলো লুকিয়ে রাখতে হয় যেন সেগুলোর ওপর কোন দাগ না আসে।"
_____________
"নির্ভীক ভাইয়া!"
ফোনে কথা বলার মাঝে কোন মেয়েলি কন্ঠের ডাক শুনে নির্ভীক পিছন ফিরে তাকালো।ঊষাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু চমকালো।এরই মাঝে ফোনে কথা বলা শেষ হওয়াতে ফোনটা রেখে দিল।প্রশ্নাত্মক গলায় ঊষাকে বলল,
"কিছু বলবে?"
"হ্যাঁ বলতাম।না না কিছু বলতাম না।"
নির্ভীক ভ্রুঁ কুচকালো।ঊষার এমন উত্তর শুনে সে নিজেই দ্বিধায় পড়ে গেল।
"ঠিক করে বলো যে কিছু বলবে নাকি বলবে না?"
ঊষা বিড়বিড় করে বলল,
"বলতে তো চাই কিন্তু বলে উঠতে পারি না আপনার ভয়ে।"
"শুনতে পাইনি জোরে বলো?"
নির্ভীকের স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শুনেও ঊষা চমকে উঠলো।কোন কারণ ছাড়াই ভয় হলো।তোতলানো কন্ঠে বলল,
"দুঃখিত ভাইয়া আপনাকে বিরক্ত করার জন্য।আমি আসছি।"
কথাটা বলে ঊষা তড়িঘড়ি করে করে চলে যেতে নিলে নির্ভীক পিছন থেকে গম্ভীর কন্ঠে ওকে ডেকে উঠলো।ডাক শুনে ঊষার পা জোড়া আপনা আপনি থেমে গেল।
"এদিকে ফিরে দাঁড়াও।"
ঊষা বাধ্য মেয়ের মতন ঘুরে দাঁড়ালো।নির্ভীক শান্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
"কি বলতে এসেছিলে বলো।আর আমি মানুষ।আমাকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"
"আআসলে ভাইয়াদের সবাইকে দেখলাম কাশফিয়ার ঘরে বসে গল্প করছে কিন্তু আপনি নেই।আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে পেলাম।মানে আসলে জিজ্ঞেস করতে চাইছিলাম যে আপনার কিছু লাগবে কিনা বা কোন সমস্যা হয়েছে কিনা।না মানে আসলে বলছিলাম যে রাত তো অনেক হয়েছে আপনার ক্ষিদে পেলো কিনা তাহলে ফুপিকে বলব খাবার দিতে।"
ঊষা যে কি বলতে কি বলছে সেটা সে নিজেও জানে না।তার কথার কোন যুক্তি সে নিজেই খুঁজে পেল না।নির্ভীক একটা হতাশার শ্বাস ফেললো।মেয়েটার যে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে এখন অস্বস্তি হচ্ছে সেটা নির্ভীক বেশ ভালোই বুঝতে পারছে।হুট করে নির্ভীকের খেয়াল হলো যে ঊষার পরনে শাড়ি।অথচ আসার পরেও ঊষাকে জামা পড়ে থাকতে দেখেছিলো।মেয়েটা আবার একটু হালকা করে সেজেছেও।তাহলে কি ঊষার এখানে আসার উদ্দেশ্য নির্ভীককে নিজের এই সাজ দেখানো?নির্ভীক পুনরায় একটা হতাশার শ্বাস ফেললো।ঊষা অপরাধী কন্ঠে বলল,
"ক্ষমা করবেন।আসলে আমি কি বলতে কি বলে ফেলছি।"
"তোমাকে কয়েকটা কথা বলার আছে ঊষা। সময় হবে শোনার?"
ঊষা চমকে প্রশ্ন করলো,
"আমাকে বলবেন?"
"হ্যাঁ।"
"বলুন না।আমার যাওয়ার কোনো তাড়া নেই।"
নির্ভীক মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
"জানো তো ঊষা তোমার এই বয়সটা এক সময় আমিও পেরিয়ে এসেছি।এই বয়সটাতে না আমাদের মাঝে আকর্ষণ জিনিসটা খুব বেশি কাজ করে।আমরা সব থেকে বড় ভুল করি এই বয়সটাতে নিজেদের অনুভূতির আসল মানেটা বুঝতে।যেমন ধরো যে জিনিসটাকে আমাদের ভালো লাগে আমরা সেটাকে অনেক সময় ভালোবাসা ভেবে নেই।কিন্তু আমরা এটা বুঝি না যে দুটো অনুভূতির মানে সম্পূর্ণ আলাদা।জানো তো আমারও এমন হতো।এটা সবার ক্ষেত্রেই হয়।এখন আমার বয়স বেড়েছে।আমি ওই সময়টা পার করে এসেছি।আমার এখন সেই সময়ের কিছু কথা মনে হলে খুব হাসি পায়।আমি আমার ভুলগুলো উপলব্ধি করতে পারি এখন।যে জিনিসগুলো এখন আমার কাছে হাসির বস্তু সেই সময় কিন্তু সেই জিনিসগুলো আমার কাছে বড্ড প্রিয় ছিল।আমি তখন ভাবতাম সেই জিনিসগুলোকে আমি ভীষণ ভালোবাসি,ওগুলো ছাড়া আমার চলবেই না।কিন্তু এখন আমি দিব্যি সেই জিনিসগুলো ছাড়া বেঁচে আছি।এমন অনেক কিছু আছে যেগুলোর অস্তিত্ব আমার জীবনে নেই আবার কিছু কিছু বিষয় এমন আছে যেগুলো খুব সাধারণভাবে আমার জীবনে রয়ে গেছে।আমার কথার মানেটা কি তুমি বুঝতে পেরেছো?"
নির্ভীক ঠিক কি বোঝাতে চাইল ঊষা সেটা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে।কিন্তু নির্ভীককে যে ঊষার শুধু ভালো লাগে না সেটা ওকে কি করে বোঝাবে?নির্ভীক যে ওর যৌবনের ভুল না,ভবিষ্যতে গিয়ে এই ভালোবাসার কথা মনে হলে যে ঊষার হাসি আসবে না সেটা নির্ভীক কে কি করে বোঝাবে?নিজের মাঝে অনেক সাহস সঞ্চয় করে ঊষা ধীর কন্ঠে বলল,
"আমি আপনাকে ভালোবাসি নির্ভীক ভাইয়া।"
"এইতো ভুল বললে।আমি তোমাকে ঠিক এই ভুলটার কথাই বলছিলাম।তুমি এখন যেটাকে ভালোবাসা বলছো সেটা ভালোবাসা না সেটা শুধুই তোমার ভালোলাগা।একটা মানুষ সম্পর্কে গভীরভাবে জানার পর,তার দোষ গুণগুলো সবকিছু জানার পর তার প্রতি তোমার ভালোবাসা জন্মায়।যখন সেই মানুষটির কোন বিশেষ কিছু,কোন বিশেষ গুণ তোমাকে আকর্ষণ করে তখন তোমার তার প্রতি ভালোবাসা জন্মায়।তুমি কিন্তু আমার সম্পর্কে কিছু জানো না।তোমার কাছে আমার পরিচয় এতোটুকুই যে আমি তোমার ভাইয়ের বন্ধু।এর বাইরে কিন্তু তুমি আমার সম্পর্কে একটা কথাও জানো না।আর একটা মানুষের বিষয়ে কিছু না জেনে তার প্রতি ভালোবাসা আসতে পারে না।"
"আপনি বললেন না কোন বিশেষ গুণ আকর্ষণ করে?আপনার গম্ভীরতা,আপনার নীরবতা,আপনার আত্মসম্মানবোধ,আপনার জীবনের লড়াই আমাকে আকর্ষণ করেছে।কতগুলো কারণ বলে দিলাম আপনাকে ভালোবাসার এরপরও আপনি শুধু এটাকে ভালো লাগাই বলবেন?"
"তুমি যেটা ভাবছো সেটা কখনোই সম্ভব না।আর তাছাড়া তুমি তোমার বাবা-মার কথা ভুলে গেলে?ওরা যদি কখনো এই কথাটা জানতে পারে তাহলে কতটা রেগে যাবেন সেটা তুমি আন্দাজ করতে পারছো?"
নির্ভীক ভাবলো হয়তো বাবা-মার ভয় দেখালে ঊষার অনুভূতিটাকে চাপিয়ে রাখতে পারবে।ঠিক সেই কারণে এই কথাটা বললো।কিন্তু নির্ভীকের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে তড়িৎগতিতে ঊষা বলে উঠলো,
"ভাইয়া আছে তো।আপনি তো জানেন যে আপনি ভাইয়াকে যদি কিছু বলেন তাহলে ভাইয়া সেটা করবেই।ভাইয়া সব ঠিক করে দেবে।"
"কিন্তু আমি তো ওকে কখনো এই বিষয়ে কিছু বলতেই পারব না।দেখো ঊষা প্রথমত তোমার প্রতি আমার কোন অনুভূতি নেই।আমার ভাবনাতে কখনো তুমি আসোই না।আর দ্বিতীয়ত যদিও কখনো বা তোমার প্রতি কোন রকমের কোন অনুভূতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখি তাহলে আমি অতি দ্রুত নিজের মনকে থামিয়ে দেব।আমি নিজের সীমা আর ক্ষমতা দুটোই খুব ভালো করে জানি।আমার কাছে আমার আত্মসম্মানবোধটা খুব বড় ঊষা।এই কারণে আমি নিজের বাড়িতে আমার থাকা খাওয়ার টাকা আমার বাবাকে দেই।আমি মাটিতে থেকে আকাশের চাঁদ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখিনা।আমার স্বপ্ন গুলো খুব সাধারন।ওই যে বললাম না আমি মাটিতে থেকে চাঁদ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখি না।আমি শুধু শান্তিতে দু'দণ্ড বসে ওই চাঁদটাকে দুশ্চিন্তা ছাড়া,কোন রকম অশান্তি ছাড়া দুচোখ ভরে দেখতে চাই।এতোটুকুই আমার স্বপ্ন।আমি অত বড় বড় স্বপ্ন দেখতে চাই না যেগুলো আমি পূরণ করতে না পেরে কষ্ট পাবো।আমি অল্পে খুশি থাকতে চেষ্টা করি।আশা করছি বুঝতে পেরেছো তুমি।"
"না বুঝলেও ওকে বুঝতে হবে।"
হুট করে উৎসবের কণ্ঠস্বরে ঊষা কেঁপে উঠলো।ভয়ার্ত দৃষ্টিতে উৎসবের দিকে তাকালো।উৎসব গম্ভীর কন্ঠে ঊষাকে বলল,
"ফুপি ডাকছে তোকে যা এখান থেকে।"
ঊষা আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না।চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল।ঊষা চলে যেতেই উৎসব স্বাভাবিক কণ্ঠে নির্ভীক কে বলল,
"চল ফুপি খেতে ডাকছে।"
"তুই আমার কথায় কষ্ট পেলি উৎসব তাই না?"
উৎসব প্রশ্নাত্নক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
"কোন কথা?"
"আমি ঊষার ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলছি।"
"না তো এখানে কষ্ট পাওয়ার কি আছে?"
নির্ভীক অপরাধী কন্ঠে বলল,
"দেখ উৎসব তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে পারিনা।আমি ঊষাকে কখনো সেই নজরে দেখিনি।আমি ওকে কষ্ট দিতে চাইনি কিন্তু এভাবে সরাসরি না বললে ও বুঝতও না।"
উৎসব হালকা হেসে নির্ভীকের কাঁধে হাত রেখে বলল,
"তুই কি করেছিস,কেন করেছিস এই বিষয়গুলো নিয়ে আমায় এত বিশদ বর্ণনা করতে হবে না।আমি জানি ভাই তুই কখনো ভুল কিছু করতে পারিস না।তুই জানিস না আমি তোকে কতটা ভরসা করি?তাহলে এভাবে বলছিস কেন?তোর ভেতরটা পরিষ্কার জন্য তুই এভাবে সরাসরি ঊষা কে এই কথাগুলো বলতে পেরেছিস।কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন,বাই এনি চান্স তুই আমার মা-বাবার ভয়ে আবার এই কাজটা করছিস না তো?দেখ তুই তো জানিস যদি তোরা দুজনে রাজি থাকিস তাহলে তোদের বিয়েটা আমি দিয়েই ছাড়বো।কারো আব্বা-আম্মা আমায় আটকাতে পারবেনা।"
"না এমন কোন ব্যাপার না।যদি নিজের মনকেই না রাজি করাতে পারি তাহলে এত কিছু ভেবে কি লাভ?আমি সত্যি বলছি কে কি ভাববে কে কি বাধা দেবে সেই জন্য আমি এসব করছি না।আমি সত্যি ঊষাকে পছন্দ করি না সেভাবে।"
"তাহলে তো হয়েই গেল।এই নিয়ে তোকে কিছু বলতে হবে না।আমি যা বোঝার বুঝে গেছি।"
"ওকে বকা দিস না যেন।ছোট মানুষ ভুল করে ফেলেছে।"
"দেব না চিন্তা করিস না।কিন্তু জানিস তো নির্ভীক ওর এই অনুভূতিটা শুধু ভালো লাগা না।ও তো আমার বোন,আমি ওকে খুব ভালো করে চিনি।ঊষা সত্যি তোকে ভালোবাসে।তাই বলে আমি এটা বলছি না যে তোকেও ওকে ভালোবাসতে হবে।আমি কিন্তু তোর উপর রেগে নেই,তোকে দোষও দিচ্ছি না।"
নির্ভীক কিছু বলল না।ওকে চুপ থাকতে দেখে উৎসব পুনরায় বলে উঠলো,
"ঊষা যদি আমার বোন হয় তাহলে তুইও আমার ভাই।আমাদের মাঝে র*ক্তের সম্পর্ক না থাকলেও আমি কখনোই তোকে নিজের ভাইয়ের থেকে কম ভাবিনি নির্ভীক।আমার কাছে যদি ঊষার অনুভূতির মূল্য থেকে থাকে তাহলে তোর অনুভূতির মূল্যও আছে।তাই বলছি এরকম ভং ধরে থাকিস না।যদি তোকে এই অবস্থায় বকুল ফুল দেখে না নাহলে হাত নেড়ে নেড়ে কোমর দুলিয়ে বলবে,ঢং দেখে জান বাঁচে না।"
কথাটা বলে দুজনেই শব্দ করে হেসে উঠলো।কি দারুণ বন্ধুত্ব!কি দারুণ বোঝাপড়া দুজনের মাঝে!পরিস্থিতির কবলে পড়ে এই ভালোবাসাটা দমে না গেলেই হয়!