"মা খেতে দাও।"
সময় তখন রাত ৯ টা নাগাদ।হাতমুখ ধুঁয়ে এসে খাবার টেবিলে বসে মাকে খাবার বেরে দিতে বলল তিসান।বাড়ির সবার খাওয়া শেষ শুধু বাকি আছে তিসান।মিনা বেগম ছেলেকে বসতে বলে রান্না ঘর থেকে ভাত তরকারির বাটি আনতে গেলেন।তিসানের প্লেটে ভাত বেড়ে দিয়ে তিনি মাছের তরকারির বাটিটার খোঁজ করলেন কিন্তু পেলেন না।শুধু মাত্র ডাল আর সবজির বাটিটা পেলেন।তিসান সবজি দিয়ে খাওয়া শুরু করলো।মিনা বেগম গলা উঁচিয়ে নিজের বড় ছেলের বউকে ডাকলেন।শ্বাশুড়ি মায়ের গলার আওয়াজ শুনে বিঁথি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।বিঁথি কে দেখতে পেয়ে মিনা বেগম প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"মাছের তরকারিটা কোথায় রেখেছো?"
"তরকারি তো নেই মা।"
বিঁথির মুখ থেকে কথাটা শুনতেই তিসানের খাবার হাত থেমে গেল।মিনা বেগম প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
"নেই মানে?আমিতো নিজে তরকারির বাটিটা রান্না ঘরে রেখে এলাম।"
"আসলে মা আপনার বড় ছেলের তরকারিটা খুব ভালো লেগেছিল।ও তো সবজি ডাল কিছু নেয়নি।শুধু মাছের তরকারি দিয়েই ভাত খেয়েছে।মাছ তো ছিল না একটু ঝোল ছিল ওটা আমি ফেলে দিয়েছি।মাছ ছাড়া শুধু ঝোল আর কে খাবে বলুন?"
"তরকারিটা তো ওদের দুই ভাইয়ের জন্যই রাখা ছিল।"
বিঁথি হালকা অপরাধী কন্ঠে বলল,
"আসলে মা আমি তিসানের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।মনে থাকলে তো আর আপনার বড় ছেলেকে দু টুকরো মাছই দিয়ে দিতাম না।"
মিনা বেগম আরো কিছু বলতে নেবেন তার আগেই তিসান বলে উঠলো,
"থাক মা মাছ লাগবে না।তুমি বরং আমায় একটা ডিম ভেজে দাও।"
মিনা বেগম মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে রান্নাঘরে যেতে নিলে পিছন থেকে বিঁথি উদ্বিগ্ন কন্ঠে ডেকে উঠলো।মিনা বেগম পেছন ফিরে তাকাতেই বিঁথি বলে উঠলো,
"ফ্রিজে একটাই ডিম আছে মা।ওটা কাল সকালে আপনার নাতিকে স্কুলের টিফিনের জন্য দেব।রোজ একটা করে ডিম না খাওয়ালে ওকে হয় না।তিসান তুমি বরং আজ একটু ডাল আর সবজি দিয়েই কষ্ট করে খেয়ে নাও না ভাই।তুমি তো খেতে পারো এসব দিয়ে।কিন্তু আমার ছেলেটা আবার ডিম ছাড়া খেতে পারেনা।"
বিঁথির কথা শুনে তিসান তাচ্ছিল্য হাসলো।প্লেটের ভাতটুকু আর গলা দিয়ে নামবে না।তিসান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই মিনা বেগম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠলেন,
"খাওয়া ছেড়ে উঠলি কেন বাবা?তুই বস আমি আলু ভেজে এনে দিচ্ছি।"
"না মা লাগবে না।তুমি গিয়ে ঘুমোও অনেক রাত হয়েছে।আমার খিদে ম*রে গেছে।"
"একটু খেয়ে নে বাবা।সারারাত না খেয়ে থাকতে নেই শরীর খারাপ করবে।"
"দোয়া করো মা যেন না খেয়ে থেকে ম*রে যাই।অনেকের বোঝা কমবে।"
তিসানের কথার প্রেক্ষিতে মিনা বেগম আর কিছু বলতে পারলেন না।দূরে দাঁড়ানো বিঁথি বলে উঠলো,
"একটা দিন একটু কষ্ট করে ডাল সবজি দিয়ে ভাত খেয়ে নিলে কি এমন হয়?মানুষটা সারাদিন খেটে-খুঁটে রোজগার করে সংসার চালায়।একদিন একটু তাকে দু পিছ মাছ দিয়েছি জন্য এত গরম দেখাতে হবে তোমার?"
"এক ভাইয়ের জন্য আরেক ভাই নিজের জীবনটা অবধি দিয়ে দিতে পারে ভাবি সেখানে এক পিছ মাছ কোন ব্যাপার না,কিন্তু বড় ব্যাপারটা হচ্ছে তোমার আচরণ।শুধুমাত্র তোমার মতন কিছু মহিলার কারণে আজ সংসার গুলোতে ভাইয়ে ভাইয়ে এত অশান্তি।"
"খবরদার তিসান একদম আমার সাথে আজেবাজে আচরণ করবে না।আমার স্বামীর টাকায় খেয়ে আমাকে গরম দেখাবে সেসব আমি সহ্য করব না।যদি এতই মাছ ডিম খাওয়ার ইচ্ছে থাকে তাহলে নিজের টাকা দিয়ে কিনে এনে খাও।আর মা আপনাকেও বলছি এক বেলা মাছ না খেলে তেমন কোন ক্ষতি হবে না।এই ব্যাপারটাকে এত জটিল না বানালেও পারতেন।"
তিসান পুনরায় তাচ্ছিল্য হেসে বিঁথিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"এই এক সবজি ডাল ভর্তা দিয়ে খেতে খেতে আমার মুখের স্বাদ ম*রে গেছে ভাবি।একবার মনে করে দেখো মাসে কয়দিন তুমি আমাকে মাছ মাংস খেতে দাও।কোনদিন আমার কথা মনে থাকে না,তো কোনদিন ভাইয়ার বেশি পছন্দ হয় জন্য ভাইয়াকে সব দিয়ে দাও নয়তো সাজিদ কে পরের দিন টিফিনে দেওয়ার জন্য রেখে দাও।সবার জন্য মাছ মাংস ঠিকই থাকে কিন্তু আমার বেলায় গিয়ে টানাটানি পরে যায়।"
"এবার বুঝলে তো নিজে উপার্জন না করলে কি হয়?আজ যদি আমার কথা শুনে চলতে তাহলে এই এতটা অপমান সহ্য করতে হতো না।কিন্তু আমার কথা তো তুমি শুনলে না।রাজনীতিতে জড়িয়ে নিজের জীবনটা শেষ করলে।"
তোফায়েল শিকদারের গম্ভীর কথার প্রেক্ষিতে তিসান পুনরায় হাসলো।যারা বলে টাকা কখনো সুখ কিনতে পারে না তারা সম্পূর্ণ ভুল বলে।টাকা সব পারে।বর্তমান পৃথিবীর নিয়মই এটা যার টাকা আছে তার সম্মান আছে আর যার টাকা নেই তার সম্মান নেই।
"আমিতো উপার্জন করতে চেয়েছিলাম তোমরা তো দিলে না আমায় উপার্জন করতে।তোমাদের নাকি সম্মানে আঘাত লাগে।আমি যে সে কাজ করলে তো তোমাদের আমাকে নিজের ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা করবে।আমি যে কাজ করতে পারি সেটা আমাকে তোমরা করতে দেবে না আর যেটা আমার পক্ষে সম্ভব না সেটা নিয়েই সমানে তোমরা আমাকে খোঁচাতেই থাকবে।আবার দিনরাত খোঁটা দাও তোমাদের টাকায় খাই জন্য।আসলে আমি করবোটা কি বলোতো?"
"নিজের জীবন শেষ করে এখন আমার থেকে পরামর্শ চাইছো কি করবে?আগে হুশ ছিল না তোমার?পড়াশোনাটা তো ঠিকভাবে শেষ করতে পারলেই না, একটা চাকরি করারও মুরোদ নেই।কতবার করে বললাম প্রবীরের কাছে গিয়ে অনুরোধ করে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে।কিন্তু না,তা তো তুমি করবেনা।যখন আমার কথা শুনবে না তাহলে আমার থেকে পরামর্শ চাইছো কেন?যা ইচ্ছে তাই করো।বিশ্বাস কর তুমি বাঁচো-মরো তাতে আবার কিছু যায় আসে না এখন।তোমাকে দেখলেই আমার বিরক্ত লাগে।"
তিসান নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
"যদি কখনো খবর পাও মা যে রাস্তায় কোন গাড়ির সাথে এক্সিডেন্ট করে আমি ম*রে গেছি তবে সেদিনও তুমি কেঁদোনা।আজ যেমন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছো সেদিনও তুমি নীরবই থেকো।কেননা সেদিন তোমার বড়লোক চাকরি করা ছেলে ম*র*বে*না,ম*র*বে তোমার এক বেকার ছেলে।আর বেকারদের মৃত্যুতেও কাঁদতে নেই,সেটাও লস।তোমার কাছে একটা অনুরোধ করছি,তুমি যেমন প্রায়ই আমাকে বলো না ম*রিস না কেন।এবারে এই কথাটা তোমার মোনাজাতে চেয়ো।মায়ের দোয়া আল্লাহ কবুল করে নেবেন।"
কথাটা বলে তিসান বাইরে বেরিয়ে গেল।বিঁথিও চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল।মিনা বেগম আঁচলে মুখে গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
"না খেয়ে ছেলেটা বেরিয়ে গেল।এখন এভাবে না বললেও পারতে।"
তোফায়েল শিকদার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
"যেতে দাও। ওকে বুঝতে হবে যে এই পৃথিবীতে নিজের আর বাবার টাকা ছাড়া কারো টাকা আপন হয় না।একমাত্র বাবাই বসিয়ে খাওয়াবে,ভাই-ভাবি কখনো বসিয়ে খাওয়াবে না।"
____________
অন্ধকার রাস্তায় দুই বান্ধবী গল্প করছে আর হাঁটছে।বাড়ি ফেরার তাদের কোন তাড়া নেই।না কেউ তাদেরকে বাড়ি ফেরার জন্য তাড়া দিয়েছে।অবশ্য দেবেই বা কে?ওদের তো কোন পরিবারই নেই।এটা অবশ্য ওদের দুজনের রোজকার যাতায়াতের পথ।কিন্তু এত রাত কখনও হয়নি।রাস্তার ধারে কোন ল্যাম্প পোস্টও নেই।অন্ধকারের মধ্যে রাস্তার দু ধারের গাছ গুলোকে ভয়ংকর লাগছে দেখতে,মনে হচ্ছে কোন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।বেশ গা ছমছমে একটা পরিবেশ।এত রাতে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে স্বাভাবিক ভাবে যে কারোরই ভয় করার কথা।ভূত-প্রেতের ভয় না থাকলেও ছিনতাইকারীর ভয় থাকবেই।কিন্তু প্রভা কিংবা সৌমির সেসবের কোন ভয় নেই।ম*রার ভয় ওদের দুজনেরই নেই।কিন্তু তাই বলে এমন না যে ওরা বাঁচতে চায় না।ওরা বাঁচতে চায়,নিজেদের মতন করে নিজেদের জীবনটা কাটাতে চায়,এই সুন্দর পৃথিবীতে সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকতে চায়।কিন্তু ওই যে কোন পিছুটান নেই সেজন্য জীবনটা হারানোর ভয়ও নেই।সন্ধ্যেবেলা অনাথ আশ্রমে গিয়েছিল দুজন।সপ্তাহে অন্তত একদিন দুজনে সময় বের করে অনাথ আশ্রমে যায়।ছোটবেলা থেকে যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছে সেই পরিবেশটা দুজনের কাছে খুব প্রিয়।সেখানকার মানুষগুলোও ওদের কাছে ভীষণ প্রিয়।টিউশন পড়িয়ে অনেকদিন থেকে দুজন একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছিল একদিন অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের বিরিয়ানি খাওয়াবে জন্য।অবশেষে পর্যাপ্ত টাকা দুজনে মিলে জমা করতে পেরেছে।বলে এসেছে যে কাল দুপুরে সব বাচ্চাদের ওরা বিরিয়ানি খাওয়াবে।সেই বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাতে কাটাতে গল্প করতে করতে কখন রাত হয়ে গিয়েছে সেই খবর তাদের কারোরই ছিল না। সেজন্যে ফিরতে দেরি হয়ে গেল।গল্পের মাঝে সৌমি প্রভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"এই প্রভা চল না আজকে আমরাও বাইরে থেকে কিছু খাই?টাকা তো আছে।"
"খাবি?কিন্তু কাল যদি আবার টাকা কম পরে তখন কি করব?"
"আরে চিন্তা করিস না কাল সকালে একটা টিউশনের টাকা পাব।কম হলে সেখান থেকে দিয়ে দেব।"
সৌমির কথা শুনে প্রভার মুখেও হাসি ফুটে উঠলো।উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
"তাহলে চল।হোটেল থেকে খাবার প্যাক করে বাড়ি নিয়ে গিয়ে আজ আমরা পার্টি করবো।"
প্রভা কথাটা বলতেই দুই বান্ধবী উল্লাসে মেতে পড়লো।ওদের আনন্দ উল্লাস এর মাঝেই হুট করে প্রভার কাঁধ থেকে কেউ একটা টান দিয়ে ব্যাগ নিয়ে দৌড় দিল।দুজনে একযোগে সাহায্যের জন্য চিল্লিয়ে উঠলো।কিন্তু এমন নির্জন পরিবেশে এই রাতের সময় সাহায্য পাওয়া অসম্ভব প্রায়।দুজনেই চোরের পেছনে দৌড় লাগালো।বেশি দূর দৌড়াতে হলো না ওদের।কেননা তার আগেই দেখল ছিনতাইকারী কে কেউ একজন ধরেছে।দুজনে তড়িঘড়ি করে লোকটার কাছে এগিয়ে গেল।
"ভাইয়া চো*রটা আমার ব্যাগ দিয়ে পালাচ্ছিল।ওকে ছাড়বেন না।"
প্রভা কথাটা বলতেই তিসান বেশ কয়েকটা কিল-ঘুষি মা*রলো চোরকে।সাথে গালাগালিও করল।মা*রতে মা*রতে হিংস্র কন্ঠে চোরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"অন্যের কষ্টের টাকা নিয়ে পালাচ্ছিলিস?নিজে এত বড় দা*মরা হয়ে কি করিস?লজ্জা করে না অন্যের জিনিস নিয়ে পালাতে?ওরা দিন রাত এক করে খেটে টাকা জমা করবে আর তোরা সেটা নিয়ে আয়েশ করবি। কেন রে আল্লাহ তোর হাত পা দেয়নি?"
এদিকে তিসানের মা*রের গতি বাড়তে দেখে প্রভা আর সৌমি দুজনেই ভয় পেল।তিসান কে থামার জন্য অনুরোধ করলো কিন্তু তিসান যেন নিজের মধ্যে নেই।মনে হচ্ছে অন্যের রাগ ছিনতাইকারীর উপর ঝারছে।সৌমি ভীষণ ভয় পেল।গুটিসুটি হয়ে প্রভার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো।প্রভা বেশ অনেকটা সময় অনুরোধ করার পর অবশেষে তিসান থামলো।তিসান ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে প্রভার হতে দিল।একটু ছাড়া পেতেই চোরটা দিল দৌড়।ব্যাগটা হাতে পেয়ে যেন প্রভা আর সৌমি দুজনেই নিজেদের প্রাণ ফিরে পেল।কত কষ্ট করে নিজেরা না খেয়ে একটু একটু করে এতগুলো টাকা জমা করেছে।আজকে দুজনের টিউশন থেকে পাওয়া টাকাও ছিল ব্যাগে।সৌমি তো খুশিতে কেঁদেই ফেলল ব্যাগটা ফেরত পেয়ে।একদম ব্যাগটাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতন করে কাঁদলো।
হুট করে তিসান ধমক দিয়ে দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"এত রাতে এই রাস্তায় দুটো মেয়ে একা একা কি করছো?ও একা জন্য ব্যাগ নিয়ে দৌড় দিয়েছিল,যদি দলবল নিয়ে আসতো তাহলে অন্য কিছু করার উদ্দেশ্য হতো।এত বড় হয়েছো সামান্য এই বুদ্ধিটুকু মাথায় নেই?"
তিসানের ধমকের প্রেক্ষিতে সৌমি কিছু বলার সাহসই পেল না।প্রভা আমতা আমতা করে ধীর গলায় বলল,
"আসলে ভাইয়া এই রাস্তা দিয়ে আমরা প্রতিদিনই যাতায়াত করি কিন্তু আজকে কিছু কাজের জন্য একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল ফিরতে।"
"প্রতিদিনই যখন যাতায়াত করো তাহলে তো আরো ভালো করে জানার কথা যে রাতের বেলায় এই রাস্তাটা কতটা খারাপ।বাড়িতে কাউকে ফোন করে একটু এগিয়ে আসতে বলতে পারোনি?ব্যাগটা তো এমন ভাবে ধরে আছো যেন সোনার খনি লুকিয়ে রেখেছো আর মাঝে।এতই যখন মূল্যবান সম্পদ তাহলে সেটা একটু সাবধানে রাখার ব্যবস্থাও তো করতে হয়।"
তিসানের কথার প্রেক্ষিতে প্রভা হালকা হেসে বলল,
"বাড়িতে তো কেউ নেই ভাইয়া কাকে ডাকবো?"
প্রভার কথার প্রেক্ষিতে তিসান ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,
"হোস্টেলে থাকো এখানে?"
"না ভাইয়া বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকি।"
"বাসা কোথায়?"
"জানিনা ভাইয়া।"
তিসান মৃদু বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,
"নিজের বাড়ির ঠিকানা জানোনা এটা কোন কথা?ছোট বাচ্চা তো নও তোমরা।"
"নিজের বাড়িই নেই,বাড়ির ঠিকানা জানবো কি করে।"
প্রভার কথায় তিসানের মাথাটা ঘুরে উঠল।একেই তো ক্ষিদেতে পেটটা চো চো করছে তার ওপর আবার প্রভার হেঁয়ালি করা কথাবার্তা।সব মিলিয়ে তিসানের মাথাটা একটু গরম হলো।
"খোলসা করে একটু আমায় বলোতো তোমাদের সমস্যা কি?আকাশ থেকে তো টপকাওনি?একেই তো ক্ষিদেতে ম*রছি তার ওপর আবার তোমার এসব গা জ্বা*লানো কথাবার্তা।"
"আসলে ভাইয়া আমরা দুজনেই অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি।এখন একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে দুজনে থাকি।সেটাও নিজের বাড়ি না।আমাদের বাবা-মা কোথায় থাকেন আদৌ এখন বেঁচে আছেন কিনা সেসব আমরা কিছু জানিনা।সেজন্যই নিজের বাড়ির ঠিকানাটাও আপনাকে বলতে পারলাম না।আর ঠিক এই কারণেই ফোন করে কাউকে এগিয়ে আসতে বলতে পারিনি।আমাদের দুজনের আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।"
প্রভার কথায় তিসানের খুব খারাপ লাগলো।না জেনে শুনে হয়তো একটু বেশিই রেগে কথা বলে ফেলেছে ওদের সাথে।অপরাধী কন্ঠে বলল,
"সরি।তোমাদের সম্পর্কে না জেনে আমার এভাবে কথা বলা উচিত হয়নি।"
"আরে না না ভাইয়া ক্ষমা কেন চাইছেন?আপনি ক্ষমা চাওয়ার মতন কিছুই বলেননি।আমরা তো আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।বিশ্বাস করুন ভাইয়া আজ যদি ব্যাগটা চুরি হয়ে যেত তাহলে সব থেকে বেশি কষ্ট পেতাম নিষ্পাপ বাচ্চা গুলোর মুখে একটু খাবার তুলে দিতে না পারার আফসোসে।আপনার এই উপকারের কথা সারা জীবন আমাদের মনে থাকবে।"
তিসান হালকা হাসলো।এই প্রথম সৌমি সাহস করে তিসান কে বলল,
"হ্যাঁ ভাইয়া আপনি আমাদের অনেক উপকার করেছেন।এবার একটা রিকুয়েস্ট রাখবেন?"
হুট করে সৌমি কথাটা বলায় প্রভা নিজেও একটু ভরকালো।তিসান ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,
"কি?"
"আসলে ভাইয়া আপনি আমাদের এত উপকার করলেন তাই আমরা আপনাকে একটা ট্রিট দিতে চাই।আর আপনি তো বললেনও যে আপনার ক্ষুধা লেগেছে।"
সৌমির কথায় সায় জানিয়ে প্রভাও বলে উঠল,
"হ্যাঁ ভাইয়া চলুন না।আমাদের খুব ভালো লাগবে।"
তিসান সন্দেহী গলায় বলল,
"দুজন আবার আমাকে অপহরণ করবে না তো?এত জোর করছো কেন?"
তিসানের এবারের প্রশ্নের উত্তরটা সৌমি দিল।
"অপহরণের উদ্দেশ্য তো থাকে টাকা চাওয়ার।আর আমরা এত টাকা দিয়ে কি করবো বলুন?মানুষ ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমায়।আর আমাদের দুজনের তো ভবিষ্যতেরই কোনো ঠিক নেই।যেখানে জীবনের প্রতিই মায়া নেই সেখানে টাকা দিয়ে কি করবো।"
সৌমির বলা কথাটা তিসানের বেশ ভালো লাগলো।সত্যিই তো জীবনের প্রতি যদি মায়া না থাকে তাহলে টাকার প্রতি আর কিসের নেশা!
"এমনিতেও আমাকে অপহরণ করলেও কিছু পাবে না।নিজের পকেটে আছে ১০ টাকা।বাড়িতে ফোন করলে বলবে ওকে মে*রেই ফেলো।এমনিতেও আমাদের কোন কাজে আসে না,টাকা দিতে পারব না।"
কথাটা বলে তিসান নিজেই শব্দ করে হেসে উঠলো।এই নির্মম সত্যগুলো কি সুন্দর হাসতে হাসতে বলে ফেলল সে।জীবনটা তার দুঃখে ভরা তবুও সে হাসতে চায়! প্রাণ খুলে হাসতে চায়!কিন্তু তিসানের সেই হাসি কারো যেন ঠিক সহ্য হয় না।বেকারদের বুঝি প্রাণ খুলে হাসার অধিকারও নেই?
______________
"আর কি খাবেন ভাইয়া বলুন?"
প্রভার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তিসান কৌতুক পূর্ণ কণ্ঠে বলল,
"আরো খাওয়াবে?তোমরা দুজন তো দেখছি ভালোই বড়লোক।"
"খেলেন তো একটা রোল।এত বড় একটা মানুষ একটা রোল খেয়ে কি হয়।"
"বেশ তবে এক প্যাকেট সি*গা*রে*ট কিনে দাও।"
"কিইইইই?"
তিসান সিগারেট চাওয়ার সাথে সাথে প্রভা আর সৌমি দুজনে একযোগে চিৎকার করে উঠল।দুজনের অভিব্যক্তি দেখে মনে হল যে তিসান খুব বড়সড় কোনো অন্যায় আবদার করেছে।তিসান নিজেও চমকে উঠে বলল,
"কিইইইই?"
"আপনি সিগা*রেট খান?"
"শুধু খাই না,এটা না খেলে আমার পেটের ভাত হজম হয় না।"
"অসম্ভব ভাইয়া।আমরা কখনোই জেনে শুনে আপনাকে সিগারেট কিনে দিতে পারব না।আপনি অন্য যা ইচ্ছে খেতে চাইবেন আমরা তাই খাওয়াবো ভাইয়া কিন্তু তাও প্লিজ আপনি সিগারেট খাবেন না।"
প্রভার কথার প্রেক্ষিতে তিসান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
"আজ না হয় আটকালে কিন্তু প্রতিদিন তো আর তোমাদের সাথে দেখা হবে না।কাল সকালে উঠে আমি আবার সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে বসবো তখন কি করবে?"
সৌমি অনুরোধ করে বলল,
"এমনটা করবেন না ভাইয়া।আপনি জানেন সিগারেট আপনার শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর?এটা ধীরে ধীরে আপনাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?আপনি সিগারেট খেয়ে যে ধোঁয়া ছাড়েন সেটার জন্য আরো অনেকের ক্ষতি হচ্ছে।তার ওপর তো এটা হারাম।জেনেশুনে কেন এসব করবেন?"
সৌমির কথায় তাল মিলিয়ে প্রভাও বলল,
"সৌমি একদম ঠিক বলেছে ভাইয়া।আপনার পুরো জীবন এখনো পড়ে আছে।আপনি দেখতে এত সুন্দর,অনেক সুন্দর একটা বউও পাবেন।কিন্তু যদি ভাবি শোনে যে আপনি সিগারেট খান তাহলে বিয়ে নাও করতে পারে।তাই বলছি সুন্দরী বউ বিয়ে করার জন্য হলেও আপনাকে সিগারেট ছাড়তে হবে।"
তিসান শুধু বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওদের দুজনের কথা গুলো শুনলো।দুজনে থামতেই তিসান বলে উঠলো,
"এতদিন জীবনের প্রতি যে মায়া ছিল না বিশ্বাস করো তোমাদের দুজনের কথা শুনে এখন সেই মায়া জন্মালো।এত গভীর ভাবে আমি কখনো ভেবে দেখিনি।আর এই যে কোঁকড়া চুল তোমার কথা শুনে মনে হলো যে এই দেশের অর্ধেক মানুষের অসুস্থতার কারণ আমি।"
তিসানের থেকে এমন সম্মোধন শুনে অবাক হলেও দাঁত বের করে হাসলো সৌমি।ওদের দুজন কে একটু অপেক্ষা করতে বলে পাশের দোকান থেকে কয়েকটা ললিপপ কিনে এনে তিসানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
"এই নিন ভাইয়া।আজ থেকে বরং ললিপপ খাওয়ার অভ্যাস করুন।যখন সিগারেট খেতে মন চাইবে ললিপপ মুখে দিয়ে রাখবেন।এটার দামও কম সিগারেটের থেকে আবার বেশিক্ষণ খেতেও পারবেন।"
কথাটা বলে সৌমি পুনরায় দাঁত বের করে হাসলো।তিসান নিজের হাতে থাকা ললিপপ গুলোর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
"মনটা ভালো করার জন্যই মনে হয় এই কার্টুন গুলোর সাথে দেখা হলো আজ।"
_______________
"কেমন আছেন পাপা কি পারী ?"
পরিচিত কোন কণ্ঠস্বর পেয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই প্রেয়না নির্ভয়ের হাস্যজ্জ্বল মুখটা দেখতে পেল।সঙ্গে সঙ্গে ওর নিজের মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।
"ভালো আছি।আপনি কেমন আছেন?"
"আমার চলছে।তা এত রাতে আপনি ছাদে এলেন কি করে?আপনার বাবা,ভাই আসতে দিল?"
"জানলে তো আসতে দিতো না এত রাতে।কিন্তু বাবা আর ভাইয়ার কেউই জানে না।ভাবিকে বলে লুকিয়ে এসেছি।"
প্রেয়নার কথা শুনে নির্ভয় বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,
"আপনি আবার মিথ্যেও বলতে পারেন?আপনি এত সাহসী কবে থেকে হলেন যে নিজের বাবা ভাইকে লুকিয়ে ছাদে এসেছেন?আমি কি ভুল শুনলাম?"
নির্ভয়ের এমন কথা শুনে প্রেয়নার একটু অস্বস্তি হলো।হ্যাঁ ও হয়তো নিজের বাবা-মায়ের কথার অমান্য কখনো করে না।আজকেও তো করেনি।শুধু না জানিয়ে ছাদে চলে এসেছে।তাই বলে এমন ভাবে বলতে হবে নাকি?
"এখানে সাহসী হওয়ার কি আছে?আর ভুলই বা শুনতে যাবেন কেন?"
প্রেয়নার কথার ভাব ভঙ্গি দেখে নির্ভয় হেসে ফেলল।নির্ভয়ের সেই হাসি দেখে প্রেয়নার আরো বেশি অস্বস্তি হচ্ছে।নির্ভয় সেটা বুঝতে পেরে অন্য প্রসঙ্গে কথা তুলল।
"তা বলুন দেখি দিনকাল কেমন কাটছে আপনার?আজকাল তো আর দেখাই যায় না।সারাদিন আপনি বাড়ির ভিতর কি করে থাকেন বলুন তো?"
"সারাদিন কই আমি বাড়িতে থাকি?আমি তো ভার্সিটিতে যাই।সময় পেলে ছাদেও আসি।আমি তো মাঝে মাঝে আপনাদের ফ্ল্যাটেও যাই নাবিলার সাথে গল্প করতে।কিন্তু আপনারই তো খোঁজ থাকে না।সারাদিন আপনি কোথায় থাকেন বলুন তো?"
"আমি ওই আমার বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা দেই।ওদের সাথে আড্ডা দিতে দারুন লাগে।আপাতত এ ছাড়া আর কিছু ভালো লাগে না।অবশ্য আপনাকেই বা কেন বলছি?আপনার তো এসব বন্ধু-টন্ধু নেই আপনি এখন বুঝবেনও না।আপনার জীবনটা কিন্তু বড্ড নিরামিষ।"
নির্ভয়ের কথা শুনে প্রেয়না উদাস কণ্ঠে বলল,
"একদম ঠিক বলেছেন সত্যি আমি এসব আনন্দের মানে বুঝি না।আমার তো তেমন ভালো কোন বন্ধু নেই।ভার্সিটিতে দু-একজন আছে ওদেরকে নামমাত্র বন্ধুই বলা চলে।জানেন আমার খুব ইচ্ছে আমার একটা অনেক বড় ফ্রেন্ড সার্কেল হবে।আমরা একসাথে ঘুরতে যাব,সারাদিন আনন্দ করবো।কিন্তু সেসব হয় না।"
"আপনি চাইলেই সব সম্ভব।"
প্রেয়না প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
"কিভাবে?"
"আপনি চাইলেই তো আপনার বন্ধু হবে তাই না?"
"বন্ধু হয় ঠিকই কিন্তু বেশিদিন থাকে না।"
"আমার ফ্রেন্ড সার্কেলে যোগ দিতে পারেন।ওরা ম*রবে তবু নিজের বন্ধুকে ছাড়বে না।"
"কিন্তু ভাইয়া?ভাইয়াকে কে বোঝাবে?ভাইয়া যদি শোনে না তাহলে আমাকে প্রচুর বকবে।ভাইয়া এসব একদম পছন্দ করে না।আসলে আমাকে যে একদমই নিষেধ করে তেমন টাও না।ভাইয়া বলে বন্ধুদের নিয়ে যা আনন্দ করার বাড়িতে করতে।কিন্তু আমার বন্ধু গুলো এমন হয় বাড়িতে কিছু করতেই চায় না।সবসময় শুধু এই জায়গা ওই জায়গায় ঘোরাঘুরি সেজন্য আর আমার বন্ধু থাকে না।"
"আমার গ্যাংয়ের সাথে একদিন আপনার আলাপ করিয়ে দেব।দেখবেন ভালো লাগবে।"
"আচ্ছা ঠিক আছে।আমি এখন আসি কেমন?এই সময় করে বাবা আমার ঘরে আসে প্রতিদিন।আমায় না পেলে চিন্তা করবেন।"
কথাটা বলে প্রেয়না চলে যেতে নিলে নির্ভয় পিছন থেকে বলে উঠলো,
"আপনি আপনার বাবাকে খুব ভালোবাসেন তাই না?ওনার কোন কথা অমান্য করেন না?"
প্রেয়না পিছন ফিরে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
"হ্যাঁ আমি আমার বাবাকে খুব ভালোবাসি।আমি সবার থেকে বেশি আমার বাবাকে ভালোবেসি কারণ আমার বাবা আমাকে সব থেকে বেশি ভালোবাসে।আর আমি জেনে শুনে কখনো আমার বাবার কথার অমান্য করবো না।আমি নিজ থেকে আমার বাবাকে কখনোই কষ্ট দিতে পারব না।"
"যদি উনি অন্যায় কিছু করতে বলেন তাও ওনার কথা শুনবেন?"
প্রেয়না আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
"আমি জানি আমার বাবা কখনো কোন অন্যায় করতেই পারে না।আমার বাবা ওয়ার্ল্ড এর বেস্ট বাবা।তাই আমি চোখ বন্ধ করে আমার বাবার সব কথা মেনে নিতে পারি।আমার জীবনে আমার বাবার কথার গুরুত্ব সব থেকে বেশি।আসছি।"
কথাটা বলে প্রেয়না চলে গেলল।নির্ভয় পকেট থেকে একটা সিগারেট বের কর লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালালো।নিমিষের মাঝে সিগারেটটা শেষ করে ফেলল।পুড়ে যাওয়া সিগারেটটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
"এই সিগারেটটা ঠিক যত তাড়াতাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেল তার থেকেও অনেক বেশি তাড়াতাড়ি আপনাকে ভালোবেসে আমার হৃদয়টা পুড়ে গেছে।ছাইটুকু কি আপনি যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দেবেন নাকি আমার চোখের জলে সেগুলো ভেসে যাবে অপ্সরা?"