ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৪

🟢

ঘড়িতে সময় দেখছে আর হাঁটার গতি বাড়াচ্ছে প্রভা।এক সপ্তাহ হলো নতুন একটা টিউশন পেয়েছে সে।সপ্তাহে তিনদিন পড়ানোর কথা।এই তিনটে দিনই সে কমপক্ষে দশ মিনিট করে দেরিতে পৌঁছেছে।পরবর্তীতে আরও একটা টিউশন থাকার জন্য সেই দশ মিনিট পরে পুষিয়েও দিতে পারেনি।কিন্তু আজকে ভীষণ চিন্তা হচ্ছে।যদি প্রতিদিনই এমন দেরি হতে থাকে তাহলে টিউশনটা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।যেটা প্রভা একদমই চায় না।এই টিউশনটা তে টাকা একটু বেশি।আর এই সময় হাতের অবস্থা খুবই খারাপ।নিজের ভাবনা চিন্তা বাদ দিয়ে প্রভা হাঁটার গতি আরো বাড়ালো।প্রতিদিনই জ্যামে আটকে গিয়ে তার এই দেরি হয়।অবশেষে নিজের গন্তব্যে এসে পৌঁছাতে পারলো।তাড়াহুড়ো করে কলিং বেল বাজাতে প্রভার ছাত্রীই দরজাটা খুললো।প্রভা অপরাধী কণ্ঠে বলল,

"সরি ঊষা।আসলে খুব জ্যাম ছিল সেজন্য আজকেও আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।"

ঊষা এক গাল হেসে বলল,

"ইটস ওকে ম্যাম।বেশি দেরি হয়নি।ভিতরে আসুন আপনি।"

ড্রয়িং রুমে আসতেই প্রভার কানে এক মেয়েলী গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এলো।ডাকটা অবশ্য ঊষার জন্য ছিল। রুবাইদা গম্ভীর কন্ঠে ঊষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"তোমাকে তো বলেছিলাম ঊষা যে আজ আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।এখনো তৈরি হওনি কেন?"

"আমি যাব না মা।সামনে আমার পরীক্ষা এখন আমার পড়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"

"একদিন না পড়লে তেমন কিছু হবে না।ভাই পড়তেই চায় না বোন আবার পড়া পাগল।আমার ছেলেমেয়ে হয়ে একজনও আমার গুণ পাওনি।ঠিক এই কারনেই তোমাদের আগে-পিছে আমি থাকতে চাই না কখনো।তোমাদের দুই ভাই বোনের আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারি না।"

"বুঝতে চেয়েছেন কখনো যে বুঝবেন?এই পরিবারে যে ঝামেলা আছে সেটা বাইরের মানুষের সামনে ঢোল পিটিয়ে না জানালে আপনার হয় না তাই না?দেখছেন একজন বাইরের মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তার সামনেও আপনাকে এসব কথাই বলতে হবে?"

একেই তো প্রভার অশ্বস্তি হচ্ছিল তার উপর উৎসবের কথাতে এখন তা আরোও দ্বিগুণ হয়ে গেল।প্রভা ইতস্তত কন্ঠে উষাকে বলল,

"ঊষা তুমি কথা বলে এসো আমি তোমার ঘরে যাচ্ছি।"

কথাটা বলে প্রভা চলে যেতে নিলে রুবাইদা ওকে থামতে বলল।প্রভা থামতেই তিনি একবার ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে বলল,

"তোমার আসার কথা আরো বিশ মিনিট আগে ছিল।তিন দিন ধরে দেখছি তুমি প্রতিদিনই লেট।পরবর্তীতে সেই টাইমটা আর কভারও করে দাও না।এত কম সময়ের মধ্যে কি পড়া হয়?"

প্রভা অপরাধী কণ্ঠে বলল,

"আসলে আন্টি..."

"কল মি ম্যাম।"

প্রভা এবারে একটু অপমানিত বোধ করলো।নিজের অস্বস্তিটুকু যথা সম্ভব আড়াল করার চেষ্টা করে পুনরায় বলল,

"আসলে ম্যাম কলেজ থেকে সোজা অন্য একটা জায়গায় যাই।সেখান থেকে এই জায়গাটার দূরত্বটা বেশ অনেকটাই সেজন্য আসতে একটু দেরি হয়ে যায়। তার মাঝে আবার রাস্তায় প্রতিদিনই জ্যাম থাকে।আর এরপর আরেকটা টিউশন থাকে আমার সেই জন্য আলাদা করে সময় দিতে পারি না।"

"এসব এক্সকিউজ বাদ দিয়ে তোমার প্রবলেমের সলিউশন বলো।আদারওয়াইজ তোমাকে পড়াতে আসতে হবে না।"

প্রভা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

"না না ম্যাম আমি কথা দিচ্ছি কাল থেকে আর দেরি হবে না।আমি ঠিক সময়ে চলে আসবো।আর দেরি হলে পরে সেই সময়টা কভার করে দিয়ে যাব।"

"মাইন্ড ইট।এমনটা করতে পারলে ভালো নাহলে আসার প্রয়োজন নেই।আর এখন যেতে পারো।ঊষা আজ পড়বে না।"

প্রভার এবার একটু বিরক্ত লাগলো।যদি নাই পড়ার থাকে তাহলে সেটা তো ফোন করে জানিয়ে দিতে পারতো।অযথা এখানে এসে ভাড়াটাও নষ্ট হলো সময়টাও নষ্ট হলো।প্রভা ঊষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"ঊষা এর পর থেকে যেদিন না পড়বে প্লিজ আমাকে একটু কষ্ট করে ফোন করে জানিয়ে দিও।তাহলে আর আমায় এত দূর টাকা নষ্ট করে আসতে হবে না।"

ঊষা ইতস্তত করে বলল,

"আসলে ম্যাম আমি পড়তে চেয়েছিলাম আজ কিন্তু এমনটা যে হবে ভাবিনি।আ'ম রিয়েলি সরি।"

রুবাইদা বেগম রাগী কন্ঠে ঊষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"হুয়াই আর ইউ অ্যাপলজাইজিং টু হার ঊষা?এন্ড ইউ এতই যখন সমস্যা তাহলে তোমাকে আসতে কে বলেছে এখানে?দরজা খোলা আছে জাস্ট গেট আউট।সামান্য কটা টাকার জন্য আর তোমার টাইম ওয়েস্ট এর জন্য তুমি আমার সামনে আমার মেয়ের সাথে এভাবে কথা বলছো এই সাহস তোমায় কে দিয়েছে?"

প্রভা এখানে নিজের অপরাধটাই বুঝতে পারল না।খুব সাধারন ভাবে নিজের সময় আর টাকা নষ্ট হওয়ার কথাটা ঊষাকে বলেছিল যেন পরবর্তীতে আর এমন না করে।কিন্তু ইনি ব্যাপারটাকে অন্যভাবে ধরে নিয়েছেন।

এদিকে বেশ অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ সবকিছু দেখছিল উৎসব।এসবের মাঝে তার কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে না থাকলেও কেন যেন আর মুখটাকে বন্ধ রাখতে পারছে না।ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে রুবাইদা কে বলল,

"সবাই আপনার মতন আম্বানির বংশধর হয় না।যেটাকে আপনি কটা টাকা বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছেন না সেই টাকাটা উপার্জন করতে ওদের মতন মানুষদের ঘাম ছুটে যায়।নিজে তো সারাদিন বসে থাকেন অফিসে এসি কেবিনে,যারা এই সারাদিন রোদের মধ্যে ছোটাছুটি করে কষ্ট করে উপার্জন করে তাদের কষ্ট বুঝবেন কি করে?আর এই যে মাস্টান্নি!"

হঠাৎ এমন সম্মোধনে প্রভা একটু ভরকালো।প্রশ্নাত্মক গলায় উৎসব কে বলল,

"আমায় বললেন?"

"এখানে তো জ্ঞানের বাত্তি আপনিই জ্বালাতে এসেছিলেন তাহলে মাস্টান্নিও নিশ্চয়ই আপনি হবেন।তা অন্যের জ্ঞানের বাত্তি জ্বালাতে গিয়ে তো নিজের সম্মানের বাত্তি নিভে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল আছে?এই এক প্রাইভেট পড়িয়ে নিশ্চয়ই আপনি আম্বানির বংশধর হয়ে যাবেন না।তাই বলছি সম্মানের সাথে এই টিউশন ছেড়ে দিন।নাহলে একদিন দেখবেন তেল শেষ হয়ে আপনার জীবনের বাত্তিই নিভে যাবে।"

উৎসবের কথায় প্রভা হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।উৎসবের এতগুলো কথার প্রেক্ষিতে তার ঠিক উত্তরটা কি হওয়া উচিত সেটা নিয়ে এখন সে ভাবছে।প্রভা কে চুপ করে থাকতে দেখে উৎসব পুনরায় বলে উঠলো,

"এত কিছু বলার পরেও যদি আমার কথা বুঝতে না পারেন তাহলে সত্যি বলতে হচ্ছে আপনি একটা ব্যাক্কল।ধুর আপনাকে কিছু বোঝানাই বৃথা।আপনার বুদ্ধির বাত্তি বহু আগেই যে নিভে গেছে সেটা আমি বুঝতে পারছি।"

কথাটা বলে উৎসব আর সেখানে দাঁড়ালো না।প্রভার সামনে রুবাইদাও আর কিছু বলতে চাইলো না উৎসবকে ফলে সেও চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল।ঊষা অনুরোধ ভরা কন্ঠে প্রভাকে বলল,

"ম্যাম আপনি মায়ের কথায় প্লিজ কিছু মনে করবেন না।আমি ওনার হয়ে ক্ষমা চাইছি আপনার কাছে।কিন্তু প্লিজ আপনি আমাকে পড়াতে আসবেন।"

প্রভা মৃদু হেসে ঊষাকে আশ্বস্ত করে বলল,

"চিন্তা করোনা আমি আসবো।তোমার যেমন আমাকে প্রয়োজন ঠিক তেমনি আমারও এই টিউশনটা খুব প্রয়োজন।কিছু কিছু প্রয়োজনের জন্য মাঝে মাঝে নিজের অপমান গুলো কেও ভুলে যেতে হয়।আমাকেও এখন ঠিক তাই করতে হবে।"

___________

"আন্টি কথা দিচ্ছি কাল থেকে আর দেরি হবে না।আজকের জন্য প্লিজ আর বকা দেবেন না।বকা খেয়েই আপনার কাছে আসছি।"

প্রভার কথায় ভদ্রমহিলা হালকা হাসলেন।দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে প্রভাকে ভেতরে আসতে বললেন।ছেলের ঘরে আগে না পাঠিয়ে প্রভাকে সোফায় বসতে বলে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত দিলেন খাওয়ার জন্য।ভদ্র মহিলার এমন আচরণে প্রভা বেশ অবাক হলো।এক মিনিট একটু দেরি করে আসলে যে মহিলা হাজারটা কথা শোনান আজকে সেখানে প্রায় আধঘণ্টার মতো দেরি করে এসেছে তারপরও কিছু বলল না।হাসিমুখে ভেতরে আসতে দিল আবার ঠান্ডা শরবতও খাওয়াচ্ছে। ব্যাপারটা প্রভার কাছে বেশ সন্দেহজনক লাগলো।প্রভাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে ভদ্রমহিলা তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,

"আরে শরবতটা খাও।"

"আন্টি কথা দিচ্ছি কাল থেকে আর দেরি হবেনা।আপনি মনে হয় খুব রেগে আছেন তাই না?"

ভদ্রমহিলা হাস্যজ্জল কণ্ঠেই বলল,

"না না রেগে থাকবো কেন?আর কাল থেকে তোমার আর আসার দরকার নেই।আমার ছেলের জন্য আমি নতুন টিচার খুঁজে নিয়েছি।"

"কিন্তু কেন আন্টি?আর আমাকে এভাবে না জানিয়ে মাসের মাঝ পথে এভাবে হুট করে ছেড়ে দিলে কিভাবে হবে?আর আমি তো আপনাকে বললাম যে আর দেরি হবে না।"

"বিগত এক মাস ধরে তোমার এই একই কথা শুনে আসছি।আর কোন টিচারের তো এত দেরি হয়না তোমারি শুধু এত দেরি হয় কেন?আর দেরি হওয়ার থেকে বড় কথা হচ্ছে তোমার পড়া আমার ছেলের পছন্দ না।কোন দুঃখে যে তোমাকে আমার ছেলেকে পড়ানোর জন্য ঠিক করেছিলাম কে জানে।তুমি নিজে ঠিকঠাক পড়া পারো তো?ও ইংরেজিতে ফেল করেছে। কি এমন পড়াও যে ও পাস করতে পারল না?"

"আন্টি আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি যে ওর পড়াশোনায় একদম মনোযোগ নেই।পড়াশোনায় মনোযোগ না থাকলে ফেল করবে এটাই তো স্বাভাবিক তাই না?"

"একদম আমার ছেলের দোষ দেবে না।অন্য সব সাবজেক্টে তো পাস করেছে শুধু ইংরেজিতেই ফেল করেছে।শুধু এটাতে ওর মনোযোগ নেই?"

"দেখুন আমি জানিনা ও অন্য সাবজেক্টগুলোতে কি করে পাস করে গেল।কিন্তু আমি পড়ানোর মাঝে কোন গাফিলতি করিনা।ওকে আমি প্রতিদিন যে পড়া গুলো দিয়ে যাই সেগুলো একটাও ঠিকঠাক ভাবে পড়েনা। আপনাকে বলেছি আপনিও গুরুত্ব দেননি তাহলে দোষটা কি আমার?"

"আসতে পারি!"

ওদের কথার মাঝে কারো কন্ঠে দুজনের মনোযোগ দরজার দিকে গেল।ভদ্র মহিলা হাস্যজ্জ্বল মুখে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে আগন্তুক কে ভেতরে আসতে বললেন।

ভদ্র মহিলার পিছু পিছু নির্ভীক ভেতরে এলো।ভদ্রমহিলা নির্ভীক কে দেখিয়ে প্রভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"এই দেখ ইনি আমার ছেলের নতুন টিচার।সময়ের আগে চলে এসেছেন।আমার ছেলের বন্ধুর কাছে ওনার অনেক প্রশংসা শুনেছি।উনি যে ছেলেকে পড়াতেন ও এবার ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে।আর তুমি আমার ছেলেটাকে এমন ভাবে পড়ালে যে ও ফেল করলো।স্যার আপনাকে বলেছিলাম না যার কথা এই সেই মেয়ে।আমার তো মনে হয় নিজেই টেনেটুনে পাস করে সেজন্যই আমার ছেলেটাকেও ঠিক ভাবে পড়াতে পারেনি।আসলে আজকাল যে সে পড়াতে চলে আসে।আমারই ভুল হয়েছে কোনো খোঁজ না নিয়েই ওর কাছে ছেলেকে পড়াতে দিয়ে।"

অপমানে প্রভার দু চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।নির্ভীক ঠিক কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।তার নিজেরই এখন অস্বস্তি হচ্ছে।প্রভা আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না।চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেল।প্রভা বেরিয়ে যেতেই ভদ্রমহিলা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন,

"যাক বাবা বাঁচলাম।আপদ বিদায় হলো।আমিতো যা ভয়ে ছিলাম।"

নির্ভীক প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"কিসের ভয়?"

"আর বলবেন না স্যার ওকে তো মাসের মাঝপথ থেকে বাদ দিয়ে দিলাম।এই মাসের টাকাটা যেন দিতে না হয় সেজন্য তো এভাবে হুট করে ছাড়িয়ে দিয়েছি অপমান করে।মানে বাদ দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু ছেলেটা আমার ফেল করায় ভাবলাম মাঝপথে বাদ দিয়ে দেই।আমি তো ভাবছিলাম যে এই কয়দিনের টাকাও নিশ্চয়ই চাইবে।অবশ্য চাইলেও আমি ওকে দিতাম না।আমার ছেলেকে ফেল করিয়ে আবার টাকা চাইবে আর আমি ওকে দিয়ে দেব নাকি।"

"কিন্তু উনি যে এই কয়দিন কষ্ট করে পড়িয়েছেন সেই টাকাটা তো ওনার প্রাপ্য তাই না?"

বিজ্ঞাপন

"না স্যার দিতে পারবো না।ছেলে ভালো রেজাল্ট করলে তাও দিতাম এখন আর দিতে পারবো না।"

"দুঃখিত আমি আপনার ছেলেকে পড়াতে পারবো না।"

নির্ভীকের কথায় ভদ্রমহিলা চমকে উঠে বললেন,

"কিন্তু কেন স্যার?আপনার টাকাটা আমি পুরোপুরি দিয়ে দেব।"

"টাকাটা বড় কথা না,আমার জন্য সম্মানটা বড়।আমি নিজে একজন শিক্ষক সেখানে আপনি আমার সামনে অন্য একজন শিক্ষককে ঠিক যেভাবে অপমান করলেন তারপরও যদি আমি আপনার ছেলেকে পড়াই তাহলে শিক্ষকতা পেশাটাকে অপমান করা হবে।আসলে আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল যে দোষটা ওনার পড়ানোর মাঝে না দোষটা আপনার ছেলের আর আপনার মাঝে।উনি তো এক সাবজেক্ট পড়াতেন আপনার ছেলেকে তাহলে বাকি সাবজেক্টগুলো তে ফেল করলো কি করে?সেগুলো কি ওনার দোষ ছিল?একবার আপনার ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখুন ও ফোনে গেম খেলতে ব্যস্ত।আমি যে ওর শিক্ষক ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছি একবার উঠে আমাকে সালাম অব্দি দেয়নি।ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও ফোনে কতটা আসক্ত।আর আপনাকেও দেখে বোঝা যাচ্ছে যে আপনি আপনার ছেলেকে ঠিক কতটা আস্কারা দেন।শিক্ষকদের ভুল না ধরে আগে ছেলেকে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করে তুলুন।আর হ্যাঁ ওনার থেকে কিন্তু আপনার ছেলে কিছু হলেও শিখেছে।কিন্তু ব্যর্থতা আপনার ছেলের যে সেটা কাজে লাগাতে পারেনি।যদি শুধু এক সাবজেক্টে ফেল করতো তাহলে আমি হয়তোবা মেনে নিতাম যে ওই মেয়েটার দোষ ছিল কিন্তু না এখানে আপনার ছেলে সব সাবজেক্টে ফেল করেছে।আর আপনার সব থেকে বড় ভুলটা কি জানেন?আপনি আপনার ছেলের ব্যর্থতার কথা না বলে ওর সামনে ওর শিক্ষককে অপমান করলেন।একজন শিক্ষক সব সময় সম্মানীয় ব্যক্তি।তাকে তার স্টুডেন্টের সামনে এভাবে অপমান না করলেও পারতেন।আসছি।আশা করছি আপনি নিজের ভুল বুঝতে পারবেন এবং পরবর্তীতে শিক্ষকদের দোষ না দিয়ে নিজের ছেলেকে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করে তুলবেন।"

___________

বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনে একটু হাঁটতেই নির্ভীক একটা ছোট্ট চায়ের দোকান দেখতে পেল।সেই চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে প্রভা কাঁদছে।মেয়েটার কান্না দেখে নির্ভীকের কেন যেন খুব মায়া হলো।এদিকে প্রভার যেমন কান্না পাচ্ছে ঠিক তেমনই মনে মনে নির্ভীকের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে।এই মাসে একসাথে দুটো টিউশন চলে গেল।তার ওপর আবার অপমানের ওপর অপমান।

নির্ভীক এগিয়ে এসে প্রভার মুখোমুখি বেঞ্চে বসলো।প্রভা তখনও নির্ভীককে খেয়াল করেনি।সে নিজ মনে কেঁদেই যাচ্ছে।

"যদি ভুলটা নিজের না হয় তাহলে কেউ দোষী বললে সেটা গায়ে মাখতে নেই।বরং তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া উচিত যে আমি দোষী না।তা না করে চুপচাপ কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করে সেখান থেকে চলে এলেন?"

হুট করে অপরিচিত কারো কন্ঠস্বর পেয়ে প্রভার কান্নায় বাধা পরলো।চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে নির্ভীককে দেখে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"আপনি সেই লোকটা না যে আমার টিউশনটা কেড়ে নিলেন?"

প্রভার কথায় নির্ভীক হেসে ফেলল।নির্ভীকের সেই হাসি দেখে প্রভার ভীষণ রাগ হলো।

"কেড়ে নেইনি আমি।আমি নিজেই এই টিউশনটা নেইনি।ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি।"

প্রভা ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করলো,

"আপনি কোন দুঃখে ছাড়লেন?ওনার কথা শুনে তো মনে হলো আপনি ওনার খুব প্রিয়।নাকি আবার এত তাড়াতাড়ি আপনিও ওনার প্রিয় থেকে অপ্রিয়র তালিকায় চলে এলেন?"

"এইটা কারণ না।"

"তাহলে?"

"আসলে ওনার ছেলেকে দেখে বুঝতে পেরেছিলাম যে কেন পরীক্ষায় ফেল করেছে।পড়াশোনা না করে যদি সারাদিন মোবাইলের মাঝে ডুবে থাকে তাহলে ফেল করাটাই স্বাভাবিক।আমি জানি একজন শিক্ষক তার ছাত্র-ছাত্রীকে পড়ানোর জন্য ঠিক কতটা কষ্ট করে।খুব কম শিক্ষকই গাফিলতি করে নিজের কাজে।আপনার কান্নাটা দেখে মনে হয়েছিল যে আপনি তেমন না।যদি আপনি কাজের মাঝে গাফিলতি করতেন তাহলে ওনার সাথে তর্ক করতেন।কিন্তু আপনি সৎ জন্যই চুপচাপ ওখান থেকে নিজের সম্মান বাঁচিয়ে চলে এসেছেন।আমি নিজে একজন শিক্ষক হয়ে যেখানে আমার সামনে অন্য একজন শিক্ষককে অপমান করা হলো সেখানে থাকতে পারিনা।"

প্রভা বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"আপনি আমার জন্য ছেড়ে দিলেন?"

"হ্যাঁ আবার না দুটোই।"

"মানে?"

"মানেটা হলো যদি আপনার জায়গায় অন্য কাউকে অপমান করতো তাহলেও আমি একই কাজটা করতাম সেই হিসেবে উত্তরটা না।আবার যেহেতু ওই জায়গাটা আপনি ছিলেন সেই হিসেবে উত্তরটা হ্যাঁ।"

প্রভা হালকা হাসলো।একটু আগে নির্ভীকের উপর যে রাগটা হচ্ছিল এখন আর সেটা হচ্ছে না।বরং মনে হলো যে নির্ভীক বেশ ভালো একজন মানুষ।প্রভার ভাবনার মাঝেই নির্ভীক প্রশ্ন করে উঠল,

"উনি কি প্রায়ই এভাবে অপমান করেন আপনাকে নাকি আজই প্রথম?'

প্রভা উদাস কন্ঠে বলল,

"প্রায় প্রতিদিনই ওনার অপমান সহ্য করেছি।এক মিনিটও দেরি হলে উনি কথা শোনাতে ছাড়তেন না।মাঝে মাঝেই আমায় বলতেন যে আমি কি পড়াই ওনার ছেলেকে যে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে পারে না।"

"আপনি যে পেশায় আছেন সে পেশাটা খুব সম্মানের।এতটা অসম্মান সহ্য করা আপনার উচিত হয়নি এতদিন।"

"উপায় ছিল না।এই নিয়ে দুটো টিউশন চলে গেল একটা মাসে।এর আগেরটা অবশ্য এসব ঝামেলার জন্য আমি নিজেই ছেড়ে দিয়েছি।এখন খুব চিন্তায় আছি।এই মাসে আর একটা টিউশন না পেলে খুব সমস্যার মাঝে পরবো।"

নির্ভীক একটু ভেবে বলল,

"আমি একটা টিউশনের খোঁজ দিতে পারি আপনাকে পড়াবেন?"

"সত্যি বলছেন?"

"আপনাকে মিথ্যে বলে আমার কোন লাভ নেই।বলুন পড়াতে পারবেন?"

"জায়গাটা কোথায়?"

নির্ভীক ঠিকানা আর সময়টা বলতেই প্রভা রাজি হয়ে গেল।প্রভা কৃতজ্ঞতার কন্ঠে নির্ভীককে বলল,

"আপনাকে আমি যতই ধন্যবাদ দেব ততই কম হবে। আপনি ভাবতেও পারবেন না আপনি আমার কত বড় উপকার করলেন।সত্যি বলতে প্রথমে আপনার উপরেও আমার ভীষণ রাগ হয়েছিল।কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আপনার সম্পর্কে যা ভেবেছিলাম তা ভুল ছিল।আপনি খুব ভালো একজন মানুষ।"

নির্ভীক স্মিত হেসে বলল,

"এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভালো মানুষ বলে দিলেন! এখনো তো ঠিকঠাকভাবে চিনলেনই না আমাকে?"

"হালকা পাতলা মানুষ চিনতে পারি আমি।সেই হিসেবেই বললাম যে আপনি ভালো মানুষ।"

"ভুল বললেন।এটা কখনোই ভাববেন না যে আপনি মানুষ চিনতে শিখে গেছেন।আপনি যতই ভাববেন যে আপনি মানুষ চিনতে শিখে গেছেন ততই দেখবেন মানুষ নতুন নতুন রূপ নিয়ে আপনার সামনে হাজির হবে। আপনি আমার সম্বন্ধে ঠিক ততটুকুই জানতে পারবেন, ততটুকুই বুঝতে পারবেন যতটুকু আমি আপনাকে বুঝতে দেব।তার বাইরে একটা শব্দ আপনার বোঝার সাধ্য নেই।"

নির্ভীকের বলা কথাটা প্রভার বেশ পছন্দ হলো।ছেলেটার কথাবার্তার ধরন অন্যরকম।যে কাউকে আকৃষ্ট করতে পারে।

"আপনাকে আবার খুঁজে পাবো কি করে আমি?"

প্রভার প্রশ্নে নির্ভীক একটু ভেবে বলল,

"আমার ঠিকানায় চিঠি পাঠাতে পারেন।সেই চিঠির উত্তরে আমি না হয় নিজের খোঁজ দিয়ে দেবো।"

প্রভা ভ্রঁ কুঁচকে বলল,

"সেই চিঠিটা পাঠানোর জন্য তো ঠিকানা জানতে হবে নাকি?"

নির্ভীক পুনরায় হালকা হেসে বলল,

"ঘরবাড়ি ছাড়া পথে পথে ঘুরে বেড়ানো এক সর্বহারা পথিক আমি।এই সমগ্র পৃথিবীটাই আমার ঠিকানা।যেখানেই চিঠি পাঠাবেন আমার কাছে পৌঁছে যাবে।লিখে পাঠাতে না পারলে বরং হাওয়ায় ভাসিয়ে দেবেন নিজের বার্তাটুকু।সেই বার্তাটুকু ঠিক আমার কাছে ধরা দেবে।"

প্রভা প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"আপনি কি কবি?"

"না তো।"

"তাহলে হুট করে এমন কবিদের মতন কথা বলছেন যে?"

"আমি ক্ষুদ্র এক পাঠক।কবি টবি হওয়ার সাধ্য নেই।একটু আগে যা বললাম তা নিতান্তই সাধারণ একটা কথা।তবে হ্যাঁ সম্মুখে যদি বর্ণনা করার মতন কোন বস্তু থাকে তাহলে মাঝে মাঝে আমিও একটু আকটু কবি হয়ে উঠতে পারি।"

"আপনি কিন্তু বড্ড হেঁয়ালি করে কথাবার্তা বলেন।"

"আর আপনি বড্ড সহজ সরল যে কিনা কবির সামান্য কবিতার মানেও বোঝেনা।আমার ফোন নাম্বার রাখুন।আর অসুবিধা না থাকলে আপনারটাও দিন যোগাযোগ করতে সুবিধা হবে।"

‌প্রভা নির্ভীক এর ফোন নাম্বারটা নিয়ে তারপর নিজের নাম্বারটা দিল।মনের মাঝে তার এখনো গুটি কয়েক প্রশ্ন নাড়াচাড়া করছে।শেষমেষ প্রশ্নটা করেই ফেলল,

"আপনি যে কবিদের মতন করে বললেন যেখানে চিঠি পাঠাবো সেখানেই নাকি আপনি পেয়ে যাবেন এর মানে কি?"

নির্ভীক পুনরায় হাসলো।বরাবরই সে মুচকি হাসতে পছন্দ করে এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটলো না।

"সে তো হুট করে আমার মাঝের কবি সত্তাটা জেগে উঠেছিল জন্য একটু কাব্যিক ভাষায় আপনার সাথে কথা বললাম।ওই যে বললাম না যদি সামনে বর্ণনা করার মতন কোনো বস্তু উপস্থিত থাকে তাহলে মাঝে মাঝে আমিও একটু কবি হয়ে উঠতে পারি।কিন্তু এখন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সেই বস্তুটার কাব্যিক ভাষায় বর্ণনা করতে না পারায় এই সাধারণ কথাটা আপনার সাথে একটু কাব্যিক ভাষায় বলে মজা করলাম।"

প্রভা ফের প্রশ্ন করলো।

"কিন্তু কিসের বর্ণনা করতে পারলেন না?"

নির্ভীক উঠে দাঁড়িয়ে হালকা হেসে বলল,

"কবি ঠিকই বলেছেন,সুন্দরী মেয়েরা বড্ড বোকা হয়।আজ হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম।আসছি।"

কথাটা বলে নির্ভীক সেখান থেকে চলে গেল।প্রভা পিছন থেকে ডাকতে চেয়েও ডাকতে পারল না।বেশ কিছুটা সময় নির্ভীকের বলা কথাটা গভীরভাবে ভাবলো।নিজেকে করা প্রশ্নের একটাই উত্তর পেল সে।বিড়বিড় করে বলল,

"আমার কথা বলছিলেন কি উনি?"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প