ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৩

🟢

"বাবা ডাকছে তোমাকে।"

কারো কণ্ঠস্বর পেতেই নির্ভীক সেদিকে ফিরে তাকালো।নির্ভীক তখন সারা রুম জুড়ে নিজের একটা বই খুঁজতে ব্যস্ত।সামিয়া কে এক নজর দেখে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

"বয়সেও তোমার থেকে বড় আর সম্পর্কেও।ভাইয়া বলে ডাকতেই পারো।"

সামিয়া মৃদু বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"তুমি কি আমার ভাই নাকি যে তোমাকে ভাইয়া বলে ডাকতে যাব?আমার ভাই আছে,ওকে আমি ভাইয়া বলে ডাকি।"

"দুজনের জন্মদাতা যেহেতু এক তাহলে সেই সূত্র ধরে আমাদের সম্পর্কটা ভাই বোনেরই হয়।যেকোনো সম্পর্ককে সম্মান করতে শেখো।"

"এত জ্ঞানের কথা না বলে চুপচাপ বাইরে এসো তো। ভালো লাগে না তোমার এত জ্ঞানের কথা শুনতে সব সময়।বিরক্তিকর!"

কথাটা বলে সামিয়া চলে যেতে নিলে নির্ভীক ওকে থামতে বলল।বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে পিছন ফিরে তাকিয়ে সামিয়া বলল,

"আবার কি হলো?"

"তুমি কি আমার ঘর থেকে কোন বই নিয়েছো?"

"আমি নেইনি।মাকে আনতে বলেছিলাম মা দিয়ে এসেছিল।"

"কোথায় সেটা?"

"আমি পড়ার জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম।ভুল করে হাত লেগে বইয়ের উপর পানি পড়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছিল তাই ফেলে দিয়েছি।"

নির্ভীক এর অভিব্যক্তি এখনো স্বাভাবিক।সামিয়া বোঝার চেষ্টা করছে যে নির্ভীক রাগলো কিনা।কিন্তু নির্ভীকের অভিব্যক্তি দেখে ওর বোঝার ক্ষমতা হলো না।বরাবরই নির্ভীক সব পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত রাখতে পছন্দ করে।কোন বিষয় নিয়ে তার যতই রাগ লাগুক না কেন সে কখনোই সেই রাগের বহিঃপ্রকাশ সামনের মানুষটার উপর করতে পছন্দ করে না।অবশ্য মাঝে মাঝে ব্যতিক্রম হয়।যদি ব্যাপারটা ওর বন্ধু মহলের সাথে জড়িত থাকে তাহলে মাঝে মাঝে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।স্বাভাবিক কণ্ঠে সামিয়া কে বলল,

"বইটা আমার ছিল।নেওয়ার আগে আমার থেকে অনুমতি নেওয়ার কি দরকার ছিল না তোমার?আর অন্যের জিনিস নিলে সেটাকে যত্ন করে রাখতে হয় জানো না তুমি?এই নিয়ে আমার চারটে বই তুমি নষ্ট করলে।আমি কিন্তু খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারি সামিয়া যে তুমি এগুলো ইচ্ছা করে করো।বই আমার শখের জিনিস।আমি নিজে কষ্ট করে নিজের সেই শখটা পূরণ করি।অনুরোধ রইল আমার এই শখের উপরে আঘাত করো না।"

নিজের দোষ সামিয়া অস্বীকার করে বলল,

"অযথা আমার উপর দোষ দিলেই হল নাকি।আমি মোটেও ইচ্ছে করে তোমার বই নষ্ট করি না।দাঁড়াও মাকে গিয়ে এক্ষুনি বলছি তুমি আমার নামে আজে বাজে কথা বলছো।"

কথাটা বলে সামিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।নির্ভীক আর এই নিয়ে বেশি ভাবলো না।আপাতত সে পড়াশোনা ব্যতীত আর কোন কিছু নিয়েই ভাবতে চায় না।কিন্তু নির্ভীক ভাবতে না চাইলেও বাড়ির মানুষজন ওকে ভাবতে বাধ্য করবে।যার ফলস্বরূপ এখন বাইরে থেকে নির্ভীকের ডাক পড়েছে।নির্ভীক বুঝতে পারল আজ আবারও একটা অশান্তি হবে।সেই সাথে ও এটাও বুঝল যে আরো একটা দিন ওকে খালি পেটে কলেজে যেতে হবে।

"ডেকেছিলেন বাবা?"

নির্ভীকের কণ্ঠস্বর পেয়ে সামিউল চৌধুরী খাওয়া ছেড়ে ছেলের দিকে তাকালেন।গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,

"কলেজে যাচ্ছো?"

"হ্যাঁ।আপনার কিছু বলার থাকলে বলুন না হলে আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।"

"চার হাজার টাকা লাগবে।সামিয়াদের কোচিং থেকে পিকনিকে যাচ্ছে সেজন্য।"

নির্ভীক প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"পিকনিকে যাওয়ার জন্য চার হাজার টাকা লাগবে?বাংলাদেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে নাকি ঘুরতে?"

নির্ভীকের কথা শুনে পাশ থেকে সামিয়া ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল,

"পিকনিকে যাবো আমার একটা ভালো জামাও নেই। নতুন একটা জামা কিনতে হবে সেজন্য টাকা লাগবে।"

নির্ভীক সামিয়াকে কিছু না বলে সরাসরি নিজের বাবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"এত টাকা আমার কাছে এখন নেই।এত টাকা কেন আমার কাছে বর্তমানে একশ টাকাও নেই।আপাতত আপনি একটা ব্যবস্থা করুন আমি টাকা পেলে দিয়ে দেব।"

সামিউল চৌধুরী গম্ভীর কন্ঠে বললেন,

"আমার কাছে থাকলে কি আমি তোমাকে বলতাম নাকি?নেই জন্যই তো বলছি।আর টাকা নেই কেন?এত তাড়াতাড়ি সব টাকা খরচ করে ফেললে?"

"দুটো টিউশন ছেড়ে দিয়েছি।সেজন্য এই মাসে টাকা একটু কম পেয়েছি।আমি বললাম তো আপনাকে এখন ব্যবস্থা করে নিন সামনের মাসে আমি দিয়ে দেব।আমার কাছে না থাকলে এখন কি করতে বলছেন?"

"টিউশন ছেড়ে দিয়েছেন কেন জমিদার পুত্র?"

নির্ভীক নিজের সৎ মায়ের দিকে তাকালো।চোখ মুখের অবস্থা এখনো তার স্বাভাবিক।স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

"আমি একটা মানুষ,রোবট না।আমারও বিশ্রামের দরকার হয়।এত টিউশন একসাথে চালাতে পারছিলাম না।আর তাছাড়া ওদের ব্যবহারও ভালো ছিল না।সম্মানের সাথে কাজ করতে পছন্দ করি আমি।"

ববিতা বেগম ব্যাঙ্গাত্মক কণ্ঠে বলল,

"কি এমন কাজ করেন আপনি যে এত সম্মানের আশা করেন?টাকা কামাতে গেলে একটু এরকম দু একটা কথা হজম করতেই হয়।ভাব দেখে তো মনে হয় এখনো সেই জমিদারি রাজত্ব আছে।পকেটে একশ টাকা নেই তার আবার দেমাগ।"

"ছিল তো একসময় জমিদারি রাজত্ব।আসলে কি বলুন তো র*ক্তে থেকে গেছে সেসব এখনো সেজন্য ছ্যাঁচড়ামো স্বভাবটা আমার মাঝে নেই।কিন্তু কি করার কিছু মানুষের বদ নজর এর জন্য আজ এই অবস্থা।"

ববিতা বেগম তেলে বেগুনে জ্ব*লে উঠে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"তোমার ছেলে কিন্তু আমাকে আর আমার ছেলে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে এই কথাটা বলল।তুমি কিছু বলবে না?"

"উনি আজ আমায় কিছুই বলবেন না।কেননা আজ আমি ওনার কাজে আসবো।বৃথা আশায় আছেন যে আজ উনি আমায় ইচ্ছে মত গালি শোনাবেন।"

এই প্রথম নির্ভীকের অভিব্যক্তির মাঝে একটু বদল দেখা গেল।সামিউল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে কথাটা বলল।নির্ভীক এর কথার সত্যতা বুঝতে পেরে দুজনেই চুপ করে গেলেন।নির্ভীক আবারো হাসলো।নিজের বাবা কিনা যখন টাকার দরকার হয় তখন ছেলের সাথে ভালো ব্যবহার করেন।কথাটা হাস্যকর শোনালেও এটাই বাস্তব।

"আপাতত কোন ব্যবস্থা করে দিন আমি সামনের মাসে দিয়ে দেব।"

কথাটা বলে নির্ভীক চলে যেতে নিলে সামিউল চৌধুরী ফের বলে উঠলেন,

"কোথাও থেকে একটা ধার নিয়ে ব্যবস্থা করে দাও আমায়।"

"যদি কোন জিনিস সামর্থের বাইরে হয় তাহলে সেটা করতে হবে কেন?সামিয়া তুমি তোমার বাবার আর্থিক অবস্থা জানো না?এমন পরিস্থিতিতে তোমার পিকনিকের জন্য কি চার হাজার টাকা খরচ করা মানায়?আর তাছাড়া তোমার কোচিং এর জায়গাটা কিংবা ওখানকার পরিবেশ একদমই ভালো না।ওখানকার ছেলেগুলো কিন্তু একটু সুবিধার না।ওদের সাথে পিকনিকে যাওয়ার প্রয়োজনটা কিসের?স্কুল থেকে পিকনিকের আয়োজন করুক তখন যেও। কোচিং এর টাতে যেতে হবে কেন?"

সামিউল চৌধুরী কিছু বলতে নেবেন তার আগেই ববিতা বেগম ওনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"তোমার ছেলের দেমাগ দেখেছো?সামান্য কয়টা টাকা চেয়েছো জন্য আমার মেয়ের যাওয়াটাই বন্ধ করে দিতে চাইছে।আমি তোমাকে বলছি ওর কাছে টাকা ঠিকই আছে কিন্তু এই যে তুমি আগে বলে দিয়েছো যে আমার মেয়ের পিকনিকের জন্য টাকাটা চাইছো সেজন্য আর দিতে চাইছে না।চিনি না ওকে আমি শয়তান ছেলে একটা।"

নির্ভীক নিজের প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করলো।চামড়ার মানিব্যাগটাও ছিড়ে গেছে।মানিব্যাগের ভেতর থেকে তিনটে বিশ টাকার নোট একটা দশ টাকার নোট আর কয়েকটা কয়েন বের করে সেগুলো ববিতা বেগমের সামনে মেলে ধরে বলল,

"এই কয়টা টাকাই আছে আমার কাছে।এগুলো কি নেবেন?রেখে দিন।"

নির্ভীক ডাইনিং টেবিলের উপর টাকাগুলো রেখে খালি মানিব্যাগ পকেটে ঢুকিয়ে বেরিয়ে এলো।পেটে ক্ষিদে,গায়ে বল নেই,মাথার উপর সূর্যের তাপ।এক পা হাঁটার জন্য ওর শরীরটা আর সায় দিচ্ছে না।পকেটে টাকাও নেই।নির্ভীক কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।ওর ভাবনার মাঝে হুট করে পায়ের সামনে কেউ একজন বাইকের ব্রেক কষলো।নির্ভীক চমকে দু কদম পিছিয়ে গেল।মাথা তুলে আগন্তুকের দিকে তাকাতেই দুটো পরিচিত মুখ দেখতে পেল।না চাইতেও দুটো মুখ দেখে নির্ভীকের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।স্বস্তি পেল।তিসান বাইক থেকে নামলো কিন্তু উৎসব নামলো না।হেলমেটটা খুলে তীক্ষ্ণ নজরে আগাগোড়া একবার ভালোভাবে নির্ভীক কে পর্যবেক্ষণ করলো।প্রতিদিনকার মতোই একটা শার্ট প্যান্ট পড়েছে।কাঁধে সেই একই ছেঁড়া ছুড়ো ব্যাগটা ঝুলছে।চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে শরীরটা ভীষণ দুর্বল।ফর্সা মুখটা কালো হয়ে উঠেছে।উৎসব ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,

"খালাম্মা মনে হয় আজকেও সকাল সকাল তাণ্ডব শুরু করেছিলে তাই না?"

নির্ভীক স্মিত হেসে বলল,

"সে তো রোজই করে।এ আবার নতুন কি?"

"না এবার মনে হচ্ছে খালাম্মাকে ভালো মতো একটা ডোজ দিতেই হবে।আজকাল একটু বেশিই ঝামেলা পাকাচ্ছে।"

"ধুর বাদ দে তো।তার আগে বল তোরা দুজন এই রাস্তায় কি করছিস?"

পাশে দাঁড়ানো তিসান কৌতুক পূর্ণ গলায় বলে উঠলো,

"আর বলো না ভায়া,নিশ্চিন্ত মনে বসে যেই না সিগারেটে একটা টান বসালাম ওমনি এই ছেলে কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান শুরু করে বলল যে ওর নাকি ভালো লাগছেনা।মানে এক জায়গায় চুপচাপ বসে থাকতে ওর ভালো লাগছে না।কিছু নাকি উদ্ভট করতে মন চাইছে।তো আমি বললাম তবে চলো হে ভায়া কোন বিয়ের কনে কে ভাগিয়ে নিয়ে আসি।আপাতত এর থেকে উদ্ভট কোন কাজের চিন্তা আমার মাথায় আসছে না।আমরা সেই উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম কিন্তু পথিমধ্যেই তুমি আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়ালে।ফলস্বরূপ আজকের জন্য আমাদের এই উদ্ভট কাজ এখানেই সমাপ্ত করতে হলো।"

____________

তিনজনে এসে একটা টঙের দোকানে বসলো।তিসান পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটা নোট বের করে নির্ভীকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

"এই নাও ভায়া তোমার টাকা।প্রয়োজনের সময় ধার দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।"

"এই টাকা আমায় দিয়ে দিচ্ছো তুমি চলবে কি করে?রেখে দাও,আমায় পরে দিও।"

"আরে নাও তো।পকেটে আরো হাজার খানেক টাকা আছে।"

বিজ্ঞাপন

তিসানের কথা শুনে উৎসব বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

"আরে ভাই তুমিও কি বড় লোকের বাচ্চা হয়ে গেলে নাকি?রাত বিরেতের মাঝে এত টাকা কই পেলে?"

তিসান মুচকি হেসে বলল,

"আমাদের জীবনটা ভাই বড় অদ্ভুত।কখন কে আপন হয় কে পর হয় কিছুই বোঝা যায় না।রাতের বেলা এক মুঠো খাবারের জন্য বাবা অনেক কথা শোনাল,বললো আমি ম*রলেও নাকি তার কিছু যায় আসে না।অথচ সকালবেলা হাতে দুই হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বলল বাইরে যেন ভালো মন্দ কিছু খেয়ে নেই।"

তিসানের কথাটা শুনে নির্ভীকের নিজের জীবনের কথা ভেবে বড্ড আফসোস হলো।তিসানের বাবা অন্তত ভাবেন নিজের ছেলের কথা।জানেন যে বাড়িতে ছেলের খাওয়া নিয়ে সমস্যা সেজন্য বলেছে বাইরে খেয়ে নিতে। অথচ নির্ভীক যে সকালে না খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো তার বাবা একটা বার খোঁজ করলো না।খাবার সময় কখনো ডাকেও না। কখনো জিজ্ঞাসাও করে না যে খেয়েছে কিনা।অথচ একটা সময় ছিল যখন নির্ভীক নিজের বাবা-মার পাশে বসে খুব আরাম করে খাবার খেতো।খাবার টেবিলে তখন হরেক রকমের পদ থাকতো।নির্ভীকের মা ওর পছন্দ মত সব খাবার বানিয়ে দিত।যত্ন করে তুলে খাইয়েও দিত।আর পরিস্থিতি আজ ওকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যে তিন বেলা এক মুঠো খাবার জোটাও দায় হয়ে পড়েছে।নির্ভীক কে ভাবনার মাঝে ডুবে থাকতে দেখে উৎসব ওর কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে প্রশ্ন করলো,

"কি ভাবছিস?"

নির্ভীক মুখে একটা মিথ্যে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

"কিছু না।তোরা কিন্তু এখনো আমায় বললি না যে এই রাস্তায় তোরা কি করছিলি।"

"আরে ভাই তোর কথা খুব মনে পড়ছিল।কেন জানি মনে হচ্ছিলো তুই ঠিক নেই।তাই ভাবলাম তোকে নিয়ে যাই।এমনিতেও তো অর্ধেক রাস্তা হেঁটে অর্ধেক রাস্তা বাসে ঝুলে ঝুলে কলেজে যাবি।সেখানে ভাবলাম আজ একটু বাইকে করে হাওয়া খাওয়াতে খাওয়াতে নিয়ে আসি তোকে।তোকে দেখতে পেয়ে শান্তি পেয়েছি।"

নির্ভীক হাসলো।সত্যিই তো নির্ভীক ঠিক ছিল না।কেউ না বুঝলেও এই ছেলেটা সবসময় নির্ভীকের মনের কথা বুঝে যায়।কিভাবে বোঝে নির্ভীক সেটা জানে না।নিজের আপন মানুষগুলোর থেকেও সব সময় বেশি ভাবে ওকে নিয়ে।কি করে নির্ভীকের জীবনের কষ্ট দূর করা যায় সেসব ভাবে।সম্ভব হলে হয়তো নিজের সুখের বিনিময়ে হলেও নির্ভীক এর জীবনের সমস্ত দুঃখ দূর করতো,কিন্তু তা সম্ভব হয় না।কেননা উৎসবের নিজের জীবনেও সুখের বড্ড অভাব।

নির্ভীকের ভাবনার মাঝে তিসান বলে উঠলো,

"জানো তো তোমাদের দুজনের বন্ধুত্ব দেখে কিন্তু আমার খুব হিংসে হয়।আমি কিন্তু খুব চেষ্টা করি তোমাদের দুজনের মাঝে একটু ঝামেলা লাগানোর। আমি একটু দেখতে চাই ঝামেলা লাগলে তোমরা দুজন দুজনের সাথে ঠিক কি কি করতে পারো।"

তিসানের কথা শুনে উৎসব হো হো করে হেসে ওঠে বলল,

"তোমার এই আশাটা এই জীবনে পূরণ হবে না।হাশরের ময়দানে দুইজন সওয়াব দেওয়া-নেওয়া নিয়ে টানাটানি লাগলেও লাগতে পারি কিন্তু তখন দেখার জন্য তুমি সেখানে থাকবে কিনা এটা নিয়ে সন্দেহ আছে।"

"কোন কিছু নিয়েই এত গ্যারান্টি দিতে নেই ভায়া।এমন কত বন্ধুত্ত্ব নষ্ট হয়ে যেতে দেখলাম!চোখের পলকে এমন হাজার মানুষকে স্বার্থপর হয়ে উঠতে দেখেছি।আমি তো চেষ্টা করে পারছি না কিন্তু আমার বিশ্বাস তোমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে যদি কেউ ফাটল ধরাতে পারে তাহলে সেটা কোন সুন্দরী রমণীই পারবে।কেননা আমি একটা কথা বিশ্বাস করি যে পুরুষ মানুষের জীবন গড়ার পেছনে কোন নারীর হাত থাক বা না থাক কিন্তু তার জীবন ধ্বংসের পেছনে কোন নারীর হাত অবশ্যই থাকবে।আর আমার কেন যেন মনে হয় তোমাদের বন্ধুত্ব ধ্বংস হবে কোন নারীর হাতে।কেননা বাদবাকি যা কিছু দ্বারা তোমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সে সবই ঘটে গেছে।বাকি আছে শুধু কোন নারীর আগমন।"

নির্ভীক আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

"পারবেনা।একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করতে কেউ পারবেনা।আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমার আল্লাহ এতটা নিষ্ঠুর না যে আমার জীবন থেকে সামান্য খুশি টুকুও কেড়ে নেবে।জানো তো ভাই আমাদের দুজনের মাঝে ভালোবাসাটা এতটাই গভীর যে আমরা যদি একে অপরের থেকে নিজেদের জীবনটাও চাই তাও কোন প্রশ্ন ছাড়া হাসিমুখে সেটা দিয়ে দেব।"

"কিন্তু মেয়ে মানুষ যে আলাদা ভায়া।যে নারীকে দেখলে তোমার বুকের বা পাশে চিন চিনে ব্যথা অনুভব হয়,যে নারীর মুখে একটু হাসি দেখার জন্য তুমি দুনিয়াটা ওলট-পালট করে ফেলতে পারো তার সামনে এমন বন্ধুত্ব বড্ড ফিকে হয়ে যায়।ভালোবাসা জিনিসটাই যে বড্ড বেহায়া।একবার প্রেমে পড়ো না তারপর বুঝবে নারী সঙ্গ কতটা ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে।ওই একজোড়া কাজল কালো চোখের মাঝে তুমি স্বর্গ খুঁজে পাবে।"

"তা মা*রা খাওয়া প্রাণী,তুমিও কি খুঁজে পেয়েছিলে নাকি স্বর্গ?আরে আমি তো ভুলেই গিয়েছি তুমি খুঁজে পেয়েছিলে জন্যই তো আজ মা*রা খেয়ে বসে আছো।"

উৎসবের কথা শুনে নির্ভীক আর তিসান দুজনেই শব্দ করে হেসে উঠলো।তিসান হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,

"স্বর্গ খুঁজে পেয়েছিলাম কিনা জানিনা।তবে এটুকু আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি যে আমার ধ্বংসের পেছনে তার সেই কাজল কালো চোখ দুটোই দায়ী।না আমি সেই চোখের মাঝে নিজের স্বর্গ খোঁজার চেষ্টা করতাম আর না আমার জীবনের ধ্বংসলীলার সূত্রপাত ঘটতো।"

______________

"বকুল ফুল!ও বকুল ফুল!"

প্রভা নামটা ধরে ডাকতে সৌমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

"আবার ওকে কেন ডাকছিস?"

"কেন?কি সমস্যা?"

"ওকে দেখলে আমার ইয়ে লাগে।মানে কেমন কেমন যেন লাগে।"

"কেমন লাগে?"

সৌমি চটে গিয়ে বলল,

"কেমন লাগে বুঝিস না?একটা ছেলে যদি মেয়েদের মতো আচরণ করে তাহলে ওকে দেখলে কেমন লাগে। ইরিটেশন হয় আমার।"

সৌমির কথায় প্রভা হেসে ফেলল।হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,

"আমার তো ওকে খুব ভালো লাগে।খুব সহজ সরল,দেখলেই মায়া হয়।এই যুগে এত সহজ সরল মানুষ কয়টা পাওয়া যায় বলতো?হ্যাঁ জানি ওর চলাফেরার ধরন,কথাবার্তা একটু মেয়েদের মতন কিন্তু তাই বলে ওকে এভাবে দূরে ঠেলে দেবো?এই জন্য তো ওর সাথে কেউ কথা বলে না।আমরাও যদি অন্যদের মত হই তাহলে আর পার্থক্য কি থাকলো বল?"

প্রভার কথার উদ্দেশ্যটা সৌমি বুঝল ঠিকই কিন্তু তাও কেন যেন নিজের মনকে মানাতে পারেনা।কাচুমাচু করে বলল,

"আচ্ছা ঠিক আছে তুই তাহলে গিয়ে কথা বল আমি এখন যাব না।আমি একটু ওয়াশরুমে যাব মুখে পানি দিতে।"

প্রভা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই সৌমি চলে গেল।এদিকে ততক্ষণে বকুলও চলে গেছে।প্রভা এদিক ওদিক তাকিয়ে বকুলকে খুঁজলো কিন্তু পেল না।হুট করে নিজের দল বল নিয়ে ওর সামনে ইশরাক এসে দাঁড়ালো।প্রথম দফায় প্রভা একটু চমকালো ঠিকই কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল।ইশরাককে দেখে প্রভার যেমন ভয় হয় ঠিক তেমন বিরক্তও লাগে।ঠিক বুঝে উঠতে পারে না এই ইশরাক কে।প্রভার ভাবনার মাঝে ইশরাক বলে উঠল,

"তুমি হাসলে কিন্তু তোমায় দারুন লাগে দেখতে সুন্দরী।তুমি সব সময় এরকম হাসবে কেমন আর আমি অপলক দৃষ্টিতে তোমার হাসি দেখব।"

প্রভা কোন উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ইশরাক ওকে বাধা দিল।প্রভা বিরক্তিকর কন্ঠে ইশরাককে উদ্দেশ্য করে বলল,

"কি সমস্যা আপনার?বারবার করে বলি যে আমার রাস্তায় আসবেন না,আমাকে বিরক্ত করা ছেড়ে দিন।বাংলা কথা বোঝেন না আপনি?"

"আমাদের দুজনের পথ তো এক সুন্দরী তাহলে তোমার পথে না এসে কি করে থাকি বলো তো?আর আমি বাংলা কথা বুঝি তো।তোমার কি আমায় দেখে মূর্খ মনে হয় নাকি?"

"অসভ্য মনে হয়।বিশ্বাস করুন আপনাকে দেখে প্রচণ্ড পরিমাণে একটা অসভ্য মানুষ মনে হয় যার মাঝে ব্যক্তিত্ব,সভ্যতা বলতে কিছু নেই।"

ইশরাক ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,

"আমাকে সহ্য করার অভ্যাস করে নাও।বিয়ের পর সারাটা জীবন আমাকে সহ্য করে যেতে হবে তোমায়।"

প্রভা তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বলল,

"আমার এখনো এতটা খারাপ দিন আসেনি যে আপনার মতন একটা ব্যক্তিত্বহীন পুরুষকে স্বামী হিসেবে নিজের জীবনে জায়গা দেব।যার মাঝে ভদ্রতা থাকবে,ব্যক্তিত্ব থাকবে,যাকে আমি ভালোবাসতে পারব তাকেই বিয়ে করবো।আপনাকে কখনোই ভালোবাসা সম্ভব না।"

ইশরাক প্রভার দিকে দু কদম এগিয়ে এলো।ইশরাককে এগিয়ে আসতে দেখে প্রভা ভয়ে দু কদম পিছিয়ে গেল।ইশরাক বক্র হেসে বলল,

"একটা কথা তোমার মস্তিষ্কে গেঁথে রাখো সুন্দরী যদি তুমি ইশরাক খানের না হও তাহলে আর কারো হতে পারবে না।এই জীবনে যদি তুমি আমার না হও প্রয়োজনে আমি নিজ হাতে তোমার জান নিয়ে নেব তবুও অন্য কারো হতে দেবো না।"

ইশরাকের কথায় প্রভা প্রচন্ড ভয় পেল।কিন্তু সেই ভয় ইশরাককে বুঝতে দিল না।কেননা দুর্বলতা বুঝতে পারলে যে আরো বেশি করে আঘাত করবে।নিজের চোখমুখে যথাসম্ভব কাঠিন্যতা বজায় রেখে ইশরাক কে বলল,

"তাই কবুল।দরকার পড়লে নিজের জান দিয়ে দেব তবুও আপনার হবো না।"

কথাটা বলে প্রভা হনহন করে হেঁটে সেখান থেকে চলে গেল।এবারে আর ইশরাক ওকে বাধা দিল না।পিছনে দাঁড়ানো একটা ছেলে এসে ইশরাককে বলল,

"ভাই এভাবে অপমান করে গেলো আপনাকে আপনি কিছু বললেন না যে?"

ইশরাক ছেলেটার কাঁধের উপর হাত রেখে বলল,

"ও হচ্ছে আমার হবু বউ।আর ইশরাক খানের বউ এর এতোটুকু তেজ না থাকলে আমার সাথে ঠিক মানানসই হবে না।এখন ও যা করছে চুপচাপ দেখে যা।ওর করা প্রতিটা অপমান আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।সবের হিসেব নেব।"

______________

"আহহহ!কানা নাকি দেখে চলতে পারেন না?"

করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় এক মোড়ে এসে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে সৌমি আর নির্ভয় ধাক্কা খেল।ধাক্কা খেয়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে সৌমির কপাল গিয়ে দেয়ালের সাথে বারি খেল।ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠে কথাটা নির্ভয় কে বলল।এদিকে নির্ভয়ের কোন আঘাত লাগেনি।ভেবেছিল এভাবে ধাক্কা খাওয়ার জন্য সৌমির কাছে ক্ষমা চাইবে।কিন্তু সৌমির এমন কথা শুনে মনস্থির করলো যে না কোনমতেই ক্ষমা চাইবেনা।উল্টো সৌমিকেই দোষারোপ করবে।যেমন ভাবনা তেমন কাজ।মৃদু রাগী কন্ঠে নির্ভয় সৌমি কে বলল,

"চোখ তো আপনারও আছে।আপনি দেখতে পাননি? আপনি কি কানা?"

সৌমি নির্ভয়ের উপর অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,

"নিজে দোষ করে আবার আমাকে গরম দেখাচ্ছেন?এরকম হাতির মতন এত বড় একটা শরীর নিয়ে যখন রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করবেন তখন তো আপনার একটু দেখেশুনে চলাফেরা করা উচিত।"

"আমি হাতির সমান না আপনার সাইজ পিঁপড়ের মতন।আর যদি আমি হাতি হয়েও থাকি না তাহলে আমার দেখে শুনে চলাফেরা করার কথা না।আপনি যেহেতু পিঁপড়ে যে কারোরই পায়ের নিচে পড়ে যেতে পারেন সুতরাং দেখে শুনে চলাফেরার দায়িত্বটা আপনার।যান যান ক্ষমা চাইতে হবে না।আমি আবার নরম মনের মানুষ এমনিতেই মাফ করে দিয়েছি।"

"ও হ্যালো আমার ঠ্যাকা পড়েছে আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়ার।নিজেকে কি ভাবেন হ্যাঁ?আপনি ভাবলেন কি করে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইবো?ভুলটা আপনি করেছেন ক্ষমা আপনি চাইবেন।নিন সরি বলুন।"

"ঘুম কি এখনো ভাঙেনি নাকি?দিনের বেলা স্বপ্ন দেখছেন?এই নির্ভয় শাহরিয়ার আপনার মতন একটা পিঁপড়ের কাছে ক্ষমা চাইবে এই আশা কখনোই করবেন না।"

"নির্ভয় শাহরিয়ার না বলুন গন্ডার শাহরিয়ার।হাতির মতো শরীর আর চামড়া গন্ডারের মতন।না হলে কি এত জোরে ধাক্কা খাওয়ার পরেও কেউ এভাবে সটাং দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?কলেজটা দিন দিন চিড়িয়াখানা হয়ে যাচ্ছে।মানুষ ভেবে যতসব আজেবাজে প্রাণীকে ভর্তি করিয়ে নিচ্ছে।গন্ডার কোথাকার।"

কথাটা বলে সৌমি সেখান থেকে চলে গেল।এদিকে নিজের এত বড় অপমানের কোন উত্তর দিতে না পেরে নির্ভয়ের নিজের উপর নিজেরই রাগ হলো।সৌমির যাওয়ার পানে কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

"পিঁপড়ে কোথাকার।একবার শুধু হাতে পাই।এমন পিঁপড়েদের মা*রার জন্য দু ফোঁটা পানিই যথেষ্ট।এটাকে তো আমি নদীতে চু*বিয়ে মা*রবো?যত্তসব।"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প