এয়ারপোর্টে উপস্থিত শিকদার পরিবারের সদস্যরা।প্রয়াসের রাতে ফ্লাইট আছে।ওকে ছাড়তেই সকলের এই অব্দি আসা।পেশায় সে একজন নিউরো সার্জন।বিদেশেই নিজের পড়াশোনা শেষ করেছে সে।পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরেছিল।বিদেশে সে যে মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছে সেখান থেকেই সে চাকরির অফার পেয়েছে।আর সেই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায়নি প্রয়াস।পরিবার থেকেও এই বিষয়েই সমর্থন পেয়েছে।বাবা-মার থেকে বিদায় নেওয়ার পর প্রয়াস তাহমিনার কাছে এলো।মেয়েটা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ওদের বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু দুজনের মাঝে ভালোবাসাটা অনেক।প্রয়াস যদিও তা প্রকাশ করেনা।বরাবরই সে গম্ভীর স্বভাবের।কাউকে যতই ভালোবাসুক না কেন সে সেটা প্রকাশ করতে চায় না।কেননা ওর মতে ভালোবাসা প্রকাশ করলে অপর পাশের মানুষটা আস্কারা পেয়ে যায়।আর এই আস্কারা বিষয়টাই প্রয়াসের পছন্দ না।এখন যেমন তাহমিনা ওকে দেখে ভয়ে ভয়ে থাকে,ওর কথামতো চলাফেরা করে,উঠতে বললে ওঠে বসতে বললে বসে একবার আস্কারা পেয়ে গেলে আর এমনটা করবে না।আর ওর কথার অবাধ্য হওয়া প্রয়াসের অপছন্দ।কিন্তু এই মূহুর্তে এসে আর কঠোরতা দেখাতে ইচ্ছে করলো না।অনেক গুলো দিনের জন্য দূরে চলে যাচ্ছে।এখন একটু কোমল হওয়াই যায়।
প্রয়াস এগিয়ে এসে তাহমিনার চোখের জল মুছে দিয়ে গালে হাত রেখে শান্ত কন্ঠে বলল,
"কাঁদছো কেন?আমি কি একেবারের জন্য যাচ্ছি নাকি?একবার ওখানে আমি সেটেল হয়ে নেই তারপর তোমাদের সবাই কে আমার কাছে নিয়ে যাব।"
এই পর্যায়ে তাহমিনা শব্দ করে কেঁদে উঠলো।প্রয়াস দু হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে চুলের মাঝে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো।
"তুমি ওখানে গিয়ে আমায় ভুলে যাবে না তো?আমার থেকেও সুন্দর সুন্দর মেয়েদের দেখে আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা কমে যাবো না তো?আমি কিন্তু তাহলে ম*রে যাব প্রয়াস।"
প্রয়াস হালকা হাসলো।মেয়েটা ভয়ে আছে।প্রয়াসকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে।এর জন্যও হয়ত প্রয়াসের আচরণই দায়ি।যদি নিজের ভালোবাসাটুকু তাহমিনা কে দেখাতো তাহলে হয়ত এই ভয়টা পেত না।তাহমিনা তো আর জানে না যে প্রয়াস নামের এই কাঠখোট্টা লোকটা ওর মতন কোমল একটা নারীর মায়ায় খুব বাজে ভাবে ফেঁসে গেছে।নিজের স্ত্রী ছাড়া আর কোনো নারীর দিকে তাকাতে পারেনা প্রয়াস।নিজের বুক থেকে তাহমিনার মাথাটা উঠিয়ে দু হাতের আঁজলায় ওর মুখটা নিল।কপালে গাঢ় করে নিজের ঠোঁট ছোয়ালো।ভরসা দিয়ে বলল,
"আমার মনটা তোমার কাছে রেখে গেলাম।এই জীবনে আর দ্বিতীয় কোনো নারীর প্রতি আমার মায়া জন্মাবে না।বিদেশে গিয়ে সব সময় আমার মনে পড়বে যে দেশে আমার স্ত্রী আমার অপেক্ষায় আছে।দিন রাত সে আমার জন্য প্রার্থনা করছে।"
"সত্যি?"
"আমি মিথ্যে বলিনা তুমি জানো।"
তাহমিনার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটলো।প্রয়াস এবার হাত বাড়িয়ে প্রেয়না কে কাছে ডাকলো।এই মেয়েটাও কাঁদছে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
"নিজের খেয়াল রাখবি।কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে আমাকে জানাবি।আমি দেশে নেই জন্য এটা ভাববি না যে তুই একা।আমার বোনের যেকোনো প্রয়োজনে আমি সব সময় ওর পাশে থাকবো।"
"না গেলে হয় না ভাইয়া?তুমি তো এখানেও অনেক ভালো চাকরি করতে।"
"চিন্তা করিস না খুব তাড়াতাড়ি তোদের সবাই কে নিয়ে যাব।নিজের খেয়াল রাখবি।পড়াশোনায় মনোযোগ দিবি।আজেবাজে কারো সাথে মিশবি না।এতদিন তোর দায়িত্ব আমার ছিল।এবার নিজের দায়িত্ব তোর নিজেকেই নিতে হবে।"
প্রেয়না মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।প্রয়াস স্মিত হেসে বলল,
"বিশ্বাস করে কিন্তু তোকে দায়িত্বটা দিলাম।আমার ভরসা রাখিস।তোর ভাইয়া কিন্তু তোকে খুব ভালোবাসে।তোকে কলিজা বলে ডাকি।বকা দেই কিন্তু সেটা তোর ভালোর জন্য।কিন্তু তোকে খুব ভালোবাসি আমি।"
প্রেয়না হালকা হাসলো।ও জানে ওর ভাই ওকে ঠিক কতটা ভালোবাসে।
সবার থেকে বিদায় নিয়ে প্রয়াস চলে গেল।ভেতরে চলে যেতেই বাকিরা সবাই বাড়ি ফিরে এলো।
বাড়ি ফিরে যে যার ঘরে চলে গেল।প্রেয়না সোজা নিজের রুমের বারান্দায় গেল।আবহাওয়াটা অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ একটু ঠান্ডা।মুক্ত বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নিল।হঠাৎ প্রেয়নার নজর গেল রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো এক ব্যক্তির ওপর।মুখটা দেখা গেল না লোকটার।কিন্তু প্রেয়না বুঝতে পারলো যে এতক্ষণ লোকটা ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল।প্রেয়না কে নিজের দিকে তাকাতে দেখেই দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল।প্রেয়না বেশ ভয় পেল।যদিও ভিতরে আসার সুযোগ নেই।দশতলা ফ্লাট।প্রতি ফ্লোরে তিনটে করে ইউনিট।ওরা থাকে পাঁচ তলায়।পাঁচ তলা পুরোটাই নিজেদের জন্য বরাদ্দ রেখেছে।নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বেশ রাজকীয় ভাবে পুরো ফ্লাটের ডেকোরেশন করা।সবার রুমের ডেকোরেশন নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী করা হয়েছে।সিকিউরিটির ব্যবস্থাও ভালো।বাইরের কেউ আসতে পারে না।প্রেয়না তাড়াতাড়ি করে ভেতরে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিল।রুমের জানালাও বন্ধ করে দিয়ে এসি চালু করলো।প্রয়াস বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে ওর কাছে ছুটে যেত।কিন্তু ও বাড়িতে নেই।আর এই ব্যাপারটা তেমন একটা গুরুতরও না।মনের ভয়টাকে দূর করে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়লো।এই নিয়ে বেশি ভাবলো না।
______________
পার্কে একটা বেঞ্চের উপর বসে আছে প্রভা।নির্ভীকের জন্য অপেক্ষা করছে।মনটা তার আজ ভীষণ খারাপ।কেন যেন মন খারাপের এই কথাগুলো হুট করে নির্ভীক কে বলতে মন চাইলো।সৌমি কে বলতে পারবে না।নাহলে মেয়েটা ভয় পেতে পারে।প্রভার জীবনে এই সমস্যাটা বহু পুরনো।মন খুলে সব কথা বলার মতন একটা মানুষ পায়নি সে কখনো।সৌমি ওকে নিজের সব কথা বললেও প্রভা বলতে পারেনা।কেননা সৌমিকেই ওর সামলাতে হয়।মেয়েটা তো ওর নিজের জীবনের সমস্যা গুলোই সহ্য করতে পারেনা।প্রভার ওপর নির্ভর করে থাকে।সেখানে প্রভা আর সাহস পায় না ওকে নিজের সমস্যার কথাগুলো বলার।হয়ত দেখা গেল এত চাপ নিতে পারলো না।আর মেয়েটা যা ভীতু।ভয়ের চোটে হয়ত পরে ঘর থেকেই বের হতে চাইবে না।সেজন্য নিজের মনের কথাগুলো সব সময় প্রভাকে নিজের মনের মাঝেই লুকিয়ে রাখতে হয়।কিন্তু আজ কেন যেন নির্ভীক কে বলতে মন চাইলো।তবে চিন্তায় ছিল যে নির্ভীক আদৌও ওর ডাকে আসবে কিনা।ভয়ে ভয়ে ফোন করে একবার আসতে বলাতেই নির্ভীক রাজি হয়ে গেল।পাল্টা কোনো প্রশ্নও করেনি।
প্রভার এসব ভাবনার মাঝেই নির্ভীকের কন্ঠ স্বর ওর কানে গেল।
"কি ব্যাপার ম্যাডামের মন খারাপ মনে হচ্ছে!"
নির্ভীকের কন্ঠ স্বর পেয়ে প্রভা সেদিকে তাকালো।কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দেখতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
"আপনি এসেছেন!"
নির্ভীক ওর পাশে বসে বলল,
"কথা যখন দিয়েছিলাম তখন সেই কথার খেলাফ আমি করতাম না।"
"আমার এক কথাতে চলে এলেন আপনি?"
"কিছু না বললেও চলে আসতাম।"
প্রভা ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
"না বললেও আসতেন মানে?"
"ফোন করে কিছু না বললে বুঝতাম কোনো সমস্যায় আছেন।কেননা কারো নিরবতাও আমার কাছে অনেক কথা বলে।তখন আমি নিজ থেকেই দেখা করতে চাইতাম।"
"আপনি মানুষকে এত ভালো করে বোঝেন কিভাবে?"
প্রভার প্রশ্নে নির্ভীক আলতো হেসে বলল,
"যারা বুঝতে দেয় তাদের কে বুঝতে পারি,যেমন আপনি।আর যারা নিজেদের ভেতরের সত্তাটাকে লুকিয়ে রাখে তাদের কে বুঝিও না,বোঝার চেষ্টাও করিনা।"
"আপনি মানুষটা এমন অদ্ভুত কেন?"
"অদ্ভুত না শুধু নিজেকে প্রকাশ করি কম।কেউ আমায় বুঝতে চায় না তাই সবার কাছেই আমাকে অদ্ভুত মনে হয়।আপনি একটু বোঝার চেষ্টা করে দেখুন বুঝতে পারবেন।এবার বলুন তো কি হয়েছে?আজ কিন্তু আপনাকে দেখে সেই বর্ষাকালের মেঘলা আকাশের কথা মনে পড়ছে।"
প্রভা উদাস গলায় বলল,
"মানুষ এমন কেন?"
"কেমন?"
"খুব খারাপ।"
"কার কথা বলছেন?"
"অনেকেই আছে।তবে ক্ষেত্র বিশেষে সবাই খারাপ হয়।"
নির্ভীক স্মিত হেসে বলল,
"আজ বুঝলেন?"
প্রভা কোনো উত্তর দিল না।নির্ভীক পুনরায় বলল,
"কি হয়েছে এখন সেটা বলুন?"
"রাত আটটা থেকে নয়টা আমার দিনের শেষ টিউশন থাকে।এর আগে ছয়টা থেকে সাতটা একটা পড়াই।এই সময় ক্লাস নাইনের একটা মেয়েকে পড়াই।ওই সময় প্রায় প্রতিদিনই বাড়িতে ওর বাবা নাহলে মা থাকেই।কিন্তু আজ ছিল না।ওর একটা ভাই আছে।মাস্টার্সে পড়ছে।কলিংবেল বাজানোর পরে উনিই দরজা খুলে দেন।আমি ভিতরে গিয়ে আমার ছাত্রী কে দেখতে না পেয়ে ওনাকে জিজ্ঞেস করলে বললো কোচিং থেকে নাকি এখনো ফেরেনি।আমি তো তখনও জানতাম না যে বাড়িতে কেউ নেই।"
"তারপর?"
"আমাকে উনি সোফায় বসতে বললেন।এর আগে কখনো ওনার সাথে আমার কথা হয়নি।কিন্তু আজ বুঝলাম আমি ওনার দিকে না তাকালেও ওনার আমার প্রতি একটা খারাপ দৃষ্টি ছিল।আমাকে এক গ্লাস পানি এনে দিলেন।গ্লাসটা নেওয়ার সময় আমার হাতে ওনার স্পর্শ লেগেছিল কিন্তু আমি ভেবেছিলাম হয়ত ভুল ক্রমে লেগে গেছে।তারপর দেখি উনি আমার পাশে এসে বসলেন।আমি যতই সরে বসি উনি ততই আমার দিকে এগিয়ে আসেন।"
"তারপর?"
"তারপর আমি আন্টি কে কয়েকবার ডাকলে উনি বললেন বাড়িতে কেউ নেই।তখন আমার ভীষণ ভয় লাগে।আমি তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়িয়ে চলে আসতে নিলে উনি আমার হাত ধরে টান দেয়।আমি যখন ওনার থেকে নিজেকে অনেক ছাড়াতে চেষ্টা করছিলাম তখন বাইরে কেউ একজন কলিং বেল বাজায়।তারপর উনি আর আমার সাথে কিছু করেননি।কিন্তু আমাকে হুমকি দিয়েছেন।যে এই কথা যদি বাইরে বের হয় তাহলে আজ উনি যেটা করতে পারেনি সেটা সত্যি করে দেখাবেন।"
রাগে নির্ভীকের র*ক্ত টগবগ করে ফুটছে যেন।তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে তার মনের মাঝে এখন কাউকে খু*ন করতে চাওয়ার মতন রাগ উঠেছে।কিছু বলতে নেবে তার আগেই প্রভা পুনরায় বলে উঠলো,
"এতোটুকু যদি থাকতো তাও হয়তো মেনে নিতাম।কিন্তু এর পরে আরো জঘন্য একটা ঘটনা ঘটেছে আমার সাথে।"
নির্ভীক দুই ভ্রুঁ কুঁচকে উৎসুক কণ্ঠে বলল,
"কি?"
"ওই ঘটনার পর খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।তাড়াহুড়ো করে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক প্রকার দৌড়ে রাস্তায় এসে একটা বাসে উঠেছিলাম।আগে ওই সময়টাতে সৌমিরও একটা টিউশন থাকতো।কিন্তু এখন আর ওটা নেই ফলে আমাকে রাতে একাই বাড়ি ফিরতে হয়।একটু পরে প্রচন্ড ভিড় হয় বাসে।অবশ্য আমি নিজেও বসার জায়গা পাইনি।একটু পর খেয়াল করলাম কেউ একজন ইচ্ছে করে ঠেলে আসছে সামনের দিকে।আর তার একটাই উদ্দেশ্য কোনমতে আমাকে স্পর্শ করা।আমি ব্যাগটা দিয়ে কোনমতে তার স্পর্শ থেকে বাঁচতে চাইছিলাম কিন্তু পারিনি।শেষে আর কোন উপায় না পেয়ে আমি মাঝ রাস্তাতেই বাস থেকে নেমে পড়ি।কিন্তু নামার আগে লোকটা খুব বাজে ভাবে আমার কোমরে...."
নিজের কথাটা আর শেষ করতে পারল না প্রভা।চোখ দিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।নির্ভীক নাক মুখ খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে আছে।তার ভাবতেও লজ্জা লাগছে।এই সমাজে যেমন তার মতন কিছু মানুষ আছে যারা মেয়েদেরকে সম্মান করতে জানে ঠিক তেমনি তার বিপরীতে এমন অনেক মানুষও আছে যারা মেয়েদেরকে শুধু একটা ভোগ্য বস্তুর নজরেই দেখে।প্রতিটা জায়গায় সুযোগ খুঁজে বেড়ায় নিজেদের ক্ষিদে মেটানোর।বেশ কিছুক্ষণের প্রচেষ্টার পর অবশেষে নির্ভীক নিজের রাগটা একটু নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলো।শান্ত কন্ঠে প্রভাকে বলল,
"এই অল্প পরিচয়ে কি আমাকে একটু হলেও ভরসা করা যায়?"
নির্ভীকের হঠাৎ এমন প্রশ্নে প্রভা একটু চমকালো। নিজের দিকে প্রভার বোকা বোকা চাহনি নিক্ষেপ করা দেখে নির্ভীক পুনরায় বলে উঠলো,
"ভরসা করা যায় কি আমায়?"
"করি তো।"
"আপনি যে সময়টার কথা বললেন ঐ সময়টা তে আমারও একটা টিউশন থাকে।আমাদের বাড়িও একই রাস্তায় পড়ে।রোজ আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটা নিতে পারি আমি?"
প্রভা বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
"আপনি কেন আমার জন্য কষ্ট করতে যাবেন?আর এসব ঘটনা নতুন না।অনেকবারই এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি।"
"আর যেন কখনো না হন সেটাই চাইছি।"
প্রভা হালকা হেসে বলল,
"কতদিন বাঁচাবেন?সারা জীবন তো আর এই দায়িত্বটা পালন করতে পারবেন না।"
"আর যদি বলি পারবো?"
প্রভা কিছু বলল না শুধু হালকা হাসলো।কিছুক্ষণ দুজনে নীরব থাকলো।বেশ অনেকটা সময় নীরবতা পালন করার পর প্রভা বলে উঠলো,
"জানেন আমার না কেউ নেই।ধরুন যদি আজ আমার বাবা থাকতো তাহলে হয়তো আমায় এত কষ্ট করে, নিজের সম্মানকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে কাজগুলো করতে হতো না।যদি আমার একটা ভাই থাকতো তাহলে যারা আমার সম্মানে হাত দিয়েছে নিশ্চয় তাদেরকে শাস্তি দিত।যদি আমার মা থাকতো মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিত।কিন্তু আমার কেউ নেই। আমি যদি এখন কাঁদতে কাঁদতে মরেও যাই তাও কেউ আমায় সান্ত্বনা দেবে না।আমি এতটা একা কেন?"
নির্ভীক খুব সাহস করে প্রভার মাথায় হাত রাখল।আদুরে গলায় বলল,
"আমি থাকতে চাই।আমি আপনাকে সান্ত্বনা দিতে চাই।কে বলল আপনি একা?দেখুন আপনার পাশে এখন আমি আছি।"
প্রভা ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।কতগুলো দিন পর কেউ এভাবে মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিল।আশ্রমে থাকাকালীন একজন সান্ত্বনা দিত কিন্তু অনেকগুলো দিন হলো তার ভালোবাসাও সেভাবে পাওয়া হয় না।প্রভার কান্নার মাঝে নির্ভীক কোন বাঁধা দিল না।একটু হালকা হতে দিল।অনেকটা সময় কাঁদতে দেওয়ার পর পকেট থেকে রুমালটা বের করে প্রভার দিকে এগিয়ে দিল।
"অনেক কেঁদেছেন এবারে চোখের পানিটা মুছে নিন।"
"আপনার সাথে তো আমার আলাপ খুব অল্প দিনের তবুও আমি এই কথাগুলো বলতে আপনাকে কেন ডাকলাম?"
"সেটা তো আপনি ভালো বলতে পারবেন।"
"কাউকে খুব করে বলতে ইচ্ছে করছিলো এই কথাগুলো।আমার তো তেমন কেউ নেই।বারবার শুধু আপনার নামটাই মাথায় আসছিল।"
নির্ভীক হালকা হেসে বলল,
"মস্তিষ্ক বলছিলো না মন ভেবে বলুন?"
"মস্তিষ্ক বললে কি হবে আর মন বললে কি হবে?"
"মস্তিষ্ক বললে ঠিক আছে কিন্তু যদি মন বলে তাহলে এ কোন ভালো লক্ষণ না।"
"ধরুন আমার মনই বলেছে তাহলে কি হবে?"
নির্ভীক তির্যক হেসে বলল,
"হতে পারে তা কোন ধ্বংসের শুরু কিংবা কোনো ধ্বংসস্তূপের ওপর বেড়ে উঠতে থাকা এক সদ্য জন্মানো ফুলের গাছ।সেই গাছে ফুল ফুটতেও পারে আবার অকালে গাছটা ম*রেও যেতে পারে।"
প্রভা বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল,
"একটু সহজ ভাষায় বোঝাতে পারেন না?এর মানে আমি কি বুঝবো?"
নির্ভীক মুচকি হেসে বলল,
"জটিল বিষয় গুলো সহজ ভাষায় বোঝাতে নেই।জটিল ভাবে বুঝতে শিখুন।মনের কথা বাদ দিয়ে মস্তিষ্কের কথা শুনুন।সব বিষয়ের স্বীকারোক্তি দিতে নেই।অনুভূতিদের লুকিয়ে রাখতে শিখুন।আর সম্ভব হলে আমার না বলা কথাগুলো বুঝতে শিখুন।"