ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ১৭

🟢

"তিসান ভাই,এত গুলো বাস চলে গেল একটাতেও তো উঠলেনা।এভাবে রোদের মধ্যে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো আমরা?"

তিসান মৃদু গম্ভীর কন্ঠে বলল,

"আগেই বলেছিলাম আমার সাথে এসো না।জেদ করার কি দরকার ছিল।"

"আমাকে ফেলে রেখে তুমি তো চলেই গিয়েছিলে আবার আসতে গেলে কেন?"

তিসান অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হালকা হেসে বলল,

"শেষ তুমি যেখানে দেখেছিলে আমায় আমি আজও ঠায় দাঁড়িয়ে আছি সেখানে।কাউকে কখনো ফেলে রেখে পালাই নি আমি।চাইনি যেতে,পারিনি থাকতে।ফিরতে চেয়েছি,পারিনি ফিরতে।এ যাত্রায় সামান্য টুকু পথই চলার সুযোগ পেলাম।আমি আজও ফিরিনি, ফিরেছো তুমি।নিজেকে হারালাম আমি,হাসছো তুমি।দিনশেষে আবারো কাঁদবো আমি।"

প্রেয়না প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

"কিছু বললে তিসান ভাই?"

তিসান বিড়বিড় করে ধীর কন্ঠে কথাগুলো বলায় ওর কানে একটা কথাও গেল না।তিসান আনমনে আবারো হাসলো।এত নিকটে দাঁড়িয়ে তবুও হৃদয়ের কথাগুলো প্রেয়নার কান অব্দি পৌঁছালো না।একেই বুঝি বলে দুরত্ব।কাছে থেকেও একে অপরের থেকে বহু দুরে।

তিসান গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তুলল নিজের চোখে মুখে।প্রেয়নার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

"বাসে বসার জায়গা তো দূর দাঁড়ানোর জায়গাও নেই।এর মাঝে তোমাকে নিয়ে উঠবো কি করে আমি?আমার অভ্যাস আছে তোমার তো নেই।"

প্রেয়না একটু ভেবে বলল,

"চলো সিএনজি তে যাই।"

"টাকা নেই আমার কাছে।জানো না তুমি আমি বেকার।"

"তোমার কাছে নেই তো কি হয়েছে আমার কাছে আছে তো।চলো আমি তোমাকে নিয়ে যাব আজ।"

"প্রয়োজন নেই।তোমার কাছে টাকা আছে না তুমি সিএনজিতে যাও আমি বাসে করে চলে যাচ্ছি।"

প্রেয়না মৃদু রাগী কন্ঠে বলল,

"আবার ত্যাড়ামো করছো তুমি।আমার কথা শোনো না কেন?চলো সিএনজি তে যাবো।তোমার বাসে যাওয়ার এতই ইচ্ছে যখন অন্য কোনো দিন যেও।আমি তো আর রোজ রোজ থাকবো না তোমার সাথে।"

তিসান শীতল দৃষ্টিতে প্রেয়নার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,

"জানি থাকবে না।বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে না।"

"তাহলে চলো সিএনজি তে যাব।"

তিসান আর না বলতে পারলো না।মানিব্যাগ বের করে দেখলো পঞ্চাশ টাকার দুটো নোট আছে।

"দেড়শো টাকা ভাড়া লাগবে।আমি একশো দেব তুমি পঞ্চাশ।"

একটা হতাশার শ্বাস ফেলল প্রেয়না।এই ছেলেকে বোঝানো অসম্ভব।তাই ওর কথাতেই রাজি হলো।

______________

"আরে এতদিন পর ননদীনি যে!"

প্রেয়না ভেতরে এসে বিঁথী কে সালাম দিলো।হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

"কেমন আছেন ভাবী?ভাইয়া কই?"

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।তোমার ভাইয়া তো কাজে গেছে।তা তুমি কেমন আছো সেটা আগে বল?"

"আমিও ভালো আছি।বড় আব্বু বড় আম্মু কোথায় দেখছি না যে?"

"ওনারাতো ওনাদের রুমে আছে।তুমি যাও আমি বরং তোমার জন্য একটু চা নাস্তার ব্যবস্থা করি।"

কথাটা বলে বিঁথী রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালে পিছন থেকে তিসান ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে বলে উঠলো,

"আরে ভাবি তুমি আবার কষ্ট করে নাস্তা তৈরি করতে যাবে কেন?প্রিয়ু কিন্তু আসার সময় কিছু নিয়ে আসেনি।অযথা নিজের লস করোনা।"

তিসানের কথা শুনে প্রেয়না ঠোঁট টিপে হাসলো।বিঁথী কড়া কিছু কথা শোনানোর জন্য মনস্থির করে পিছন ফিরে তাকলে তিসানকে পেল না।সে কথাটা বলে গটগট পায়ে হেঁটে নিজের রুমে চলে গেছে।প্রেয়না আর সেখানে দাঁড়ালো না।

"বড় আব্বু আসবো?"

তোফায়েল শিকদার মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ছেন আর তার স্ত্রী সুমি বেগম বিছানায় বসে কাঁথা সেলাই করছেন।দরজায় দাঁড়িনো প্রেয়নাকে দেখতেই দুজনে চমকে উঠলেন।মুখে ফুটে উঠল বিস্তর হাসি।সুমি বেগম কাঁথা সরিয়ে রেখে এগিয়ে এলেন।প্রেয়নাও ততক্ষণে ভিতরে চলে এসেছে।গালে মুখে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

"কেমন আছো মা?"

"আমি ভালো আছি তুমি কেমন আছো বড় আম্মু?"

"ভালো আছি।কতদিন পর তোমাকে দেখলাম।কত বড় হয়ে গেছ।তুমি এসেছ খুব ভালো করেছো।আর কেউ আসেনি?"

উত্তরটা শোনার জন্য মুখিয়ে আছেন তোফায়েল শিকদার।খুব করে চাইছেন প্রেয়না যেন বলে সবাই এসেছে।কিন্তু না প্রেয়না তা বলল না।

"আমি একাই এসেছি বড় আম্মু তিসান ভাইয়ের সাথে।"

সুমি বেগমের মনটা খারাপ হয়ে গেল।তোফায়েল শিকদার মৃদু গম্ভীর কন্ঠে ওনাকে বললেন,

"বাদ দাও সুমি।আমার বড় মা ছাড়া আর কারোরই আমাদের কথা মনে নেই।বাকিদের তো কারো সময়ই হয় না আমাদের খোঁজ নেওয়ার।বড় মা এদিকে আয় তো!"

প্রেয়না এগিয়ে গেলো তোফায়েল শিকদারের কাছে।প্রেয়না কে পাশের চেয়ারে বসতে ইশারা করলেন তিনি।কিছুক্ষণ মন ভরে প্রেয়নার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।একটা মেয়ের তার খুব শখ ছিল।কিন্তু আল্লাহ তাকে দুটো ছেলে দিয়েছেন।তাতে অবশ্য তিনি কোনকালে অসন্তুষ্ট ছিলেন না।কিন্তু একটা মেয়ে হলে যেন তার হৃদয়টা আরো একটু শান্তি পেত।তার সেই অভাব প্রেয়নার মাধ্যমে পূরণ হয়েছিল।ভাইয়ের এই মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো আদর করেছে।একটা সময় ছিল যখন দুই পরিবারে মাঝে এত মনোমালিন্য ছিল না,এত পার্থক্য ছিল না,ছিল না এত দূরত্ব।কিন্তু যখনই সম্পর্কের মাঝখানে টাকা নামক বস্তুটা চলে এলো তখনই দূরত্ব বেড়ে গেল।একসময় যখন দু ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা এক ছিল তখন সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল।কিন্তু ধীরে ধীরে তোফায়েল শিকদারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে লাগলো আর এদিকে ব্যবসায় একের পর এক সফলতা পেতে থাকলেন প্রবীর শিকদার।কয়েক মাসের ব্যবধানে বিরাট বড় ব্যবসা দাঁড় করালেন।নিজের বাড়ি গাড়ি সব হলো।আলাদা হয়ে গেল দুটো পরিবার।তিনি নিজের পরিবারকে নিয়ে চলে গেলেন আলিশান দশ তলা ভবনে থাকতে আর তোফায়েল শিকদার থেকে গেলেন তার সেই সাদামাটা রং চটে যাওয়া একতলা বাড়িতে।তারপর থেকে তাদের আর এই বাড়িতে আসা যাওয়া ভালো লাগতো না। একসময় সম্পর্ক গুলোর প্রতিও বিতৃষ্ণা এসে গেল।তোফায়েল শিকদার কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রেয়না প্রশ্ন করলো,

"এভাবে কি দেখছো?"

তিনি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চশমাটা খুলে পাঞ্জাবির হাতায় চোখ দুটো মুছে নিলেন।চোখ মুছে পুনরায় চশমা পড়ে প্রেয়নার দিকে তাকিয়ে বললেন,

"আমার বড় মাকে দেখছিলাম।কত বড় হয়ে গেছে আমার বড় মা।"

"তার আগে বলো তুমি কাঁদছো কেন?"

"অনেকদিন পর তোকে দেখলাম তো খুশি তে কাঁদছি মা।বাড়ির সবাই কেমন আছে?"

"সবাই ভালো আছে।জানো বড় আব্বু খুব তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়িতে একটা নতুন অতিথি আসবে।ভাবি প্রেগন্যান্ট।"

"আলহামদুলিল্লাহ।তা বড় মা আজ থাকবি না?আজকের দিনটা থেকে যা না আমার কাছে!"

প্রেয়না উদাস বলায় বলল,

"না বড় আব্বু আজ থাকতে পারবো না।আসলে বাসায় তো কাউকে বলে আসেনি।অন্য একদিন এসে থেকে যাব কেমন।"

তোফায়েল শিকদারের খুব খারাপ লাগলো।ইচ্ছে করছিল মেয়েটাকে একটু কয়েকটা দিন নিজের কাছে রাখতে।চেয়েছিলেন তো সারাটা জীবন মেয়েটাকে নিজের ঘরে রাখবেন কিন্তু পারলেন না।শুধু হালকা হাসলেন কিছু বললেন না।জোর করতে চান না।কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন মেয়েটার থাকার ইচ্ছে থাকলেও বাবা মায়ের আপত্তির কারণে হয়তো থাকতে পারবে না।ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।ছোটবেলা থেকেই বাবা-মার বাধ্য।শান্ত শিষ্ট।যে যা বলে এসেছে চুপচাপ তাই করে এসেছে।কখনো নিজের মতামত জানায়নি।যার গোটা জীবনটাই অন্যের ইশারায় চলে তাকে আলাদা করে দোষ দেওয়া যায় না।

_____________

বাড়ির কোনার দিকটায় একদম শেষের ঘরে থাকে তিসান।নিজেই এই ঘরটা বেছে নিয়েছে।

একদম শেষের দিকে হওয়ায় বাড়িতে চলমান কোন হইচই এর আওয়াজ তার ঘরে খুব একটা আসতে পারে না।ঘরে একটা ছোট্ট জানালা আছে।সেই জানালা দিয়ে তেমন একটা আলো ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না।দিনের বেলাতেই কেমন একটা অন্ধকার বিদ্যমান থাকে সেই ঘরে।রাত হলে তো আলো আসার কোনো পথই নেই।তিসানও আর আলাদা করে আলো জ্বা/লায় না।অন্ধকারের মাঝেই চুপচাপ শুয়ে থাকে।ঘর তার ভীষণ অগোছালো।সে গোছাতে পছন্দ করে না।এই লোক দেখানো জিনিসগুলো তার একদম পছন্দ না।সে মানুষটাই বড্ড অগোছালো তাই সে অগোছালোভাবেই থাকতে পছন্দ করে।যেখানে গোটা জীবনটাই এলোমেলো সেখানে তার রুম গুছিয়ে রেখে লাভটাই বা কি হবে।ঘরে এসে ছোট্ট জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে তিসান।দৃষ্টি তার বাইরের দিকে থাকলেও মনোযোগ অন্য কোথাও।জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে রাস্তা দেখতে পাওয়া যায়।দুপুর সময় হওয়ায় রাস্তাটা এখন ফাঁকা আছে।দরজায় করাঘাতের শব্দে তিসানের ভাবনায় ছেদ ঘটলো।পিছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজন হলো না।তার নাকে ভেসে এলো একটা মিষ্টি সুঘ্রাণ।আর সুঘ্রানটার মাধ্যমেই প্রেয়নার উপস্থিতি সে টের পেয়েছে।

"এসো।"

অনুমতি পেয়ে প্রেয়না ভিতরে এলো।

"আমি চলে যাচ্ছি তাই তোমায় বলতে এলাম।"

"চলে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক।অতিথি পাখিরা তো আর সারা বছর এক জায়গায় থাকে না।তুমি হলে সেই অতিথি পাখির মতন।"

"আমি তো তোমাদেরকে আমার পরিবার ভাবি আর আমি তোমার কাছে অতিথি?"

তিসান কিঞ্চিৎ হেসে বলল,

"প্রবীর শিকদারের মেয়ে আর প্রয়াস শিকদারের বোনের আত্মীয় হতে পারি এতটা যোগ্যতা আমাদের নেই।তোমাকে যে অতিথি করতে পেরেছি এতেই আমরা ধন্য।"

প্রেয়না একটু কষ্ট পেল।ব্যথাতুর গলায় বলল,

"তুমি সব সময় আমাকে বাবা আর ভাইয়ার কথা বলে কষ্ট কেন দাও?আমি তো মানুষটা আলাদা।তোমরা কেউ আমায় কিছু বলো না।কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছে সেটাও বলো না অথচ তুমি দোষারোপটা সব সময় আমাকেই করে যাও।কষ্ট তুমি আমাকে দাও অথচ আজ অব্দি আমি ঝামেলার কারণটাও জানিনা।"

বিজ্ঞাপন

"বিদেশ যাওয়ার আগে তোমার ভাই আমায় কল করেছিল।"

প্রেয়না বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"সত্যিই?তারমানে তোমাদের মাঝে সব ঠিক হয়ে গেছে?"

তিসান শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

"বেইমানরা কেবল ফিরে আসে পুরনো আঘাতগুলোকে তাজা করতে।বারবার হৃদয়ে র/ক্তক্ষ/রণ করাতে।তাজা ঘা এর উপর আবারো আ/ঘাত করতে ফিরে আসে।"

"মানে?"

"মানে হল তোমার ভাই বড্ড ভীতু।নিজের দোষ স্বীকার করতে সে বড্ড ভয় পায় সেজন্যই তো চাপার জোরেই নিজের ভুলগুলো কে ঠিক প্রমাণ করতে চায়।আমাকে তার সফলতার গল্প শোনাতে এসেছিল তার সাথে আমাকে আমার ব্যর্থতার গল্প মনে করিয়ে দিতে।সে এসেছিলো আমাকে এটা বোঝাতে যে সে আমার থেকে ঠিক কতটা উচু পর্যায়ে আছে আর আমি তার পায়ের নিচে আছি সেটাও আমাকে বেশ ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।"

"ভাইয়া এমন না বিশ্বাস কর।আমার ভাইয়া খুব ভালো।"

প্রেয়নার দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তিসান। স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করল,

"ভুলটা কি তবে আমার?"

"কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল সেটা আমায় বলো?"

"না থাক।তুমি যাও।"

"বলো না কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল?আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলে সব ঠিক করে দেবো।"

"বোকা!তুমি বড্ড বোকা!কি ঠিক করতে চাইছো তুমি? তুমি পারবে না ঠিক করতে।টাকার কাছে সব হেরে গেছে।টাকার কাছে আমি হেরে গেছি,টাকার কাছে আমার স্বপ্নরা হেরে গেছে,টাকার কাছে আমার বন্ধুত্ব হেরে গেছে,আর হেরে গেছে আমার..........."

"আর কি?"

তিসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"কিছু অব্যক্ত কথা।আমার কবিতা গুলো ছন্দহীন হয়ে পড়েছে,হারিয়েছি আমি সুর,থমকে গেছে আমার দুনিয়াটা,মরুভূমির ন্যয় শুকিয়ে গেছে আমার হৃদয়টা।বসন্তের আগমন ঘটেনা বহু বছর ধরে সেথায়।কোকিল ডাকে না,গাছের পুরনো পাতা ঝরে পড়ে না।কালো মেঘ গুলো সরে গিয়ে বহুদিন হলো সেই সূর্যটা উঁকি দেয় না। আমার সবকিছু এক জায়গায় থমকে আছে।নতুন করে আর কোন কিছুই শুরু হয় না আমার জীবনে।আমি মানুষটা সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।আর আমায় ঘিরে আছে বেকারত্ব,হতাশা আর কিছু নিদারুন আফসোস।"

_____________

মেঘলা আকাশ।সময়টা তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়।একটু আগেও সূর্যের তাপে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিলো জনজীবন।অথচ এখন প্রকৃতি বেশ অনেকটাই শীতল।প্রতিদিনকার নিয়ম ভেঙ্গে দুটো মানব মানবি ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছে।আজ আর তারা কোন টিউশনে যায়নি।প্রতিদিনের সেই একঘেয়েমি জীবন থেকে বেরিয়ে আজ একটু নিজেদের জন্য সময় বের করেছে।যেকোনো সময় ধরণীতে বৃষ্টি নামবে।সেই বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য অনেকেই তাড়াহুড়ো করে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছে,অনেকে এখনও ফিরছে।প্রভা আর নির্ভীক দুজনেই চুপচাপ হাঁটছে।সচরাচর এই রাস্তাতে খুব কমই যানবাহন চলাচল করে আর মেঘাচ্ছন্ন দিনে বলতে গেলে একদম ফাঁকা।অনেকক্ষণ পর পর দুই একটা মোটরসাইকেল কিংবা রিক্সার দেখা পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তার পাশ দিয়ে সারি সারি অসংখ্য গাছ।এমন মেঘলা আকাশ সাথে প্রকৃতির শীতল বাতাস আর পাশে একজন বিশ্বস্ত মানুষ,মনটা দুজনেরই বেশ খুশি।বেশ ভালো লাগছে হাঁটতে,এই নিরবতাও যেন অনেক কথা বলছে।

"বাড়ি ফিরবেন না?"

নির্ভীক এর প্রশ্নের উত্তরে প্রভা হালকা হেসে বলল,

"বাড়ি তো ফিরতেই হবে।ফিরব একটু পর।আপনার কি যাওয়ার তাড়া আছে নাকি?"

"কেউ আমার অপেক্ষায় নেই না কেউ কখনো আমায় তার জন্য অপেক্ষা করতে বলেছে।তাহলে কোথায় যাওয়ার তাড়া থাকবে?"

"না থাকাই ভালো।বৃষ্টি এলে কিন্তু আজ বৃষ্টিতে ভিজবো আমি সাথে আপনাকেও ভিজতে হবে।"

"বেশ ভিজবো।কিন্তু তারপর যদি আমার শরীর খারাপ করে তার দায়িত্ব নেবে কে?"

"সে তো আমার শরীর খারাপ করলেও দায়িত্ব নেওয়ার কেউ নেই তাই বলে কি আমি বৃষ্টিতে ভেজে ছেড়ে দেবো?"

"সৌমি আছে তো আপনার জীবনে।ও খুব ভালোবাসে আপনাকে।ও ঠিক খেয়াল রাখবে আপনার।"

"সেদিক দিয়ে বলতে গেলে তো আপনার জীবনে আরও বেশি মানুষ আছে।তারপরেও যদি বলেন যে ভালোবাসার কেউ নেই তাহলে বলবো নিজেকে বরং নিজেই ভালোবাসুন।"

"নিজেকে নিজে আর কতটুকু ভালোবাসা যায়?কখনো তো ইচ্ছে করে নিজেকে নিজে বাদে অন্য কেউ একটু ভালোবাসুক।ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পর সযত্নে ঘামটুকু মুছে দেক,আমার শরীর খারাপ নিয়ে আমার থেকেও বেশি চিন্তা করুক কেউ একজন,এক কাপ চা বানিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দেক।"

"আমারও খুব ইচ্ছে করে জানেন তো আমার ব্যক্তিগত একটা মানুষ হোক।যে একান্তই কেবল আমার হবে।আমি যার জন্য বাড়িতে বসে অপেক্ষা করব।সারা দিন নিজের কাজটুকু শেষ করে সে কখন আমার জন্য বরাদ্দ সময়টুকু আমায় দেবে সেই অপেক্ষায় থাকবো।নিজের থেকেও বেশি তার যত্ন নেব আমি।নতুন নতুন পদ রান্না করে তাকে যত্নে আমার পাশে বসিয়ে খাওয়াবো।"

নির্ভীক আলতো হেসে বলল,

"দুজনের স্বপ্নগুলো কিন্তু প্রায় অনেকটাই মিলে গেল।"

প্রভা চট করে নির্দ্বিধায় বলে উঠলো,

"তো চলুন না সেগুলো জুড়ে নেই।"

নির্ভীক বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে প্রভার দিকে তাকালো। নির্ভীকের সেই দৃষ্টিতে থতমত খেল প্রভা।হুট করে এমন একটা কথা বলে ফেলেছে যার জন্য এখন নিজেরই আফসোস হচ্ছে।এভাবে বলে দেওয়াটা হয়তো ঠিক হয়নি তাও আবার এত তাড়াতাড়ি।এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,

"না মানে আসলে বলতে চাইছিলাম যে দুজনেই চেষ্টা করবো দুজনের স্বপ্নগুলো পূরণ করার।মানে সাহায্য করবো আরকি।"

নির্ভীক কিছু বলল না শুধু হাসলো।নির্ভীকের সেই হাসি দেখে প্রভার আরও বেশি অস্বস্তি হলো।

"হাসছেন কেন?"

"এমনিতেই হাসছি।"

"এমনি এমনি কারা হাসে জানেন?যারা পা/গল তারা এমনি এমনি হাসে।"

নির্ভীক এবারেও ঠোঁট টিপে হাসলো।প্রভা বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"অদ্ভুত আবার হাসছেন?ধুর কথাই বলব না আপনার সাথে।"

কথাটা বলে প্রভা দ্রুত পায়ে নির্ভীকের থেকে একটু এগিয়ে গেল।নির্ভীকের সাথে কথা বলতে কিংবা চোখে চোখ মেলাতে তার এখন বেশ অস্বস্তি আছে তার জন্যই এই কাজটা করলো।পিছন থেকে নির্ভীক এর গাওয়া কয়েকটা লাইন তার কানে ভেসে এলো,

❝আকাশ এতো মেঘলা,

যেও নাকো একলা,

এখনি নামবে অন্ধকার!

ঝড়ের জল-তরঙ্গে,

নাচবে নদী রঙ্গে,

ভয় আছে পথ হারাবার!❞

প্রভার পা থেমে গেল।পিছন ফিরে তাকিয়ে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"আপনার মতন রস কসহীন মানুষ গানও গাইতে পারে তাও আবার একটা মেয়ের জন্য!"

"অবাক না হয়ে দুই লাইন গাইলেও তো পারতেন।"

প্রভা সামনে তাকিয়ে আবারো হাঁটা শুরু করলো।সেই সাথে গুনগুনিয়ে গাইলো,

❝ আঁধারো ছায়াতে

চেয়েছি হারাতে

দু’বাহু বাড়াতে

তোমারি কাছে❞

নির্ভীক হাসলো।মেয়েটা আসলেও বোকা।এত সরল স্বীকারোক্তি কেউ দেয়!প্রভা দুলাইন গাইতেই বৃষ্টি নামলো।যে প্রভাই একটু আগে বলছিলো বৃষ্টি তে ভিজবে এখন সেই তাড়া দিয়ে নির্ভীক কে বলল,

"তাড়াতাড়ি হাঁটুন।বেশি ভিজলে জ্বর আসবে।"

প্রভার কথায় নির্ভীকের মাঝে বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা গেল না।সে বৃষ্টি উপভোগ করছে আর ধীর পায়ে হাঁটছে।প্রভা বুঝলো এই ছেলে ওর কথা শুনবে না।পিছিয়ে এসে নির্ভীকের হাত ধরে বলল,

"নিজের প্রতি বড্ড অবহেলা আপনার।চলুন তাড়াতাড়ি।"

প্রভার থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে নির্ভীক নিজেই ওর হাতটা ধরলো।বৃষ্টির বেগ আরোও বাড়লো।ধীর পায়ে সে হাঁটা শুরু করলো সাথে প্রভাও হাঁটা ধরলো।দুজনে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে।বেশ ঠান্ডাও লাগছে এখন।প্রভা ধীর গলায় বলল,

"বাড়ি ফিরবেন না।শরীর খারাপ করবে।"

প্রভার দিকে তাকিয়ে নির্ভীক আবারো দু লাইন গেয়ে উঠলো,

❝যাক না এমন এইতো বেশ

হয় যদি হোক গল্প শেষ❞

চলবে........

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প