ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ২০

🟢

ঊষাকে প্রাইভেট পড়ানো শেষে বাড়ি থেকে বের হতেই প্রভার ফোনে নির্ভীক এর নাম্বার থেকে একটা কল এলো।রাগে অভিমানে প্রথম ভাবলো কলটা রিসিভ করবে না।প্রথমবার কলটা কেটে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয় বার কল এলো।এবারে আর থাকতে পারছে না।তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে রিসিভ করে কানে ধরল কিন্তু কিছু বলল না।ওপাশ থেকে নির্ভীক সমানে হ্যালো হ্যালো বলছে।প্রভার থেকে কোন উত্তর না পেয়ে বুঝল হয়তো মনে অভিমান জমেছে।

"আপনার বাড়ির সামনের গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি।তাড়াতাড়ি আসলে ভালো হয়।বাকি কথা না হয় আসার পরেই বলবো।"

কথাটা বলে নির্ভীক ফোনটা রেখে দিলো।প্রভার বুঝে ওঠার আগেই পুরো ব্যাপারটা ঘটে গেল।মস্তিষ্ক যখন পুরোটা ধারণ করতে পারলো হাঁটার গতি বাড়ালো।প্রায় আধঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হলো সেই একই জায়গায় নির্ভীক কে।অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রভাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে মুখে হাসি ফুটল।নির্ভীকের মুখে হাসি বিদ্যমান থাকলেও প্রভার মুখটা বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছে।রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে এলো।মুখ দিয়ে তার একটাও কথা বের হচ্ছে না,নির্ভীকের দিকে চোখ তুলে একবার তাকায়নি অবধি।

"দুঃখিত।আপনি হয়তো ভেবেছেন যে আপনার উপর রাগ করে ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম গতকাল তারপরে সুইচ অফ করে রেখেছি কিন্তু আসলে তেমনটা না।"

"থাক আর অজুহাত দিতে হবে না।নিজের বন্ধুর সাথে দেখাও করেছেন কথাও বলেছেন আর আমার কথা সারা দিন পর মনে পড়লো।"

নির্ভীকের কেন যেন বেশ হাসি পেল।কি অদ্ভুত ব্যাপার! একটা মেয়ে নির্ভীকের ওপর অভিমান করেছে আর নির্ভীক সেই মেয়ের অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করছে।প্রেম ভালোবাসায় আসলেও মানুষের পরিবর্তন ঘটে।

"উৎসব আমার বাড়িতে গিয়েছিল আমার সাথে দেখা করতে।তখনই কথা হয়েছে,আলাদা করে ওর সাথে আমি দেখা করিনি।রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনার সাথে কথা বলছিলাম।হুট করে ফোনটা হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।ফোনটা ঠিক করে তারপর আপনাকে কল দিয়েছি এটাই কারণ।আপনার উপর রাগ করিনি।"

প্রভা তাও কিছু বলল না।নির্ভীক ভাবল প্রভা ওর কথা বিশ্বাস করেনি।পকেট থেকে ভাঙা গ্লাসের ফোনটা বের করে প্রভা কে দেখালো।

"বিশ্বাস করেছি তো আপনার কথা,দেখাতে হবে না।"

"বিশ্বাস যখন করেছেন তার পরেও মন খারাপটা কেন?আমি কি আরো কোন অপরাধ করে ফেলেছি?"

"আজ আসেননি কেন কলেজে?"

"কিছু কাজে একটু ব্যস্ত ছিলাম,ফোনটাও সারতে দিয়েছিলাম।সবকিছু মিলিয়ে ব্যস্ততার কারণে আসতে পারিনি।"

"দিনশেষে আমার সাথে দেখা করতে এলেন কেন?কোন বিশেষ কারণ?"

নির্ভীক মৃদু হেসে বলল,

"মানুষটা যখন বিশেষ হয় তখন তার সাথে দেখা করার জন্য আলাদা করে কারণটা বিশেষ হওয়ার দরকার পড়ে না।"

"এত ব্যস্ততার মাঝে না আসলেও পারতেন।এমনিতেও আমি এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেউ না যে আমার কাছে এত ব্যাখ্যা দিতে হবে।আপনার মূল্যবান সময় থেকে যেটুকু সময় আমি পাই অতটুকুই যথেষ্ট।আপনাকে এত কষ্ট করে আমার জন্য আলাদা করে সময় বের করতে হবে না।"

নির্ভীক ঠিক বুঝতে পারছে না যে তখন কথা বলা বন্ধ হওয়ার জন্য কি মন খারাপ নাকি এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে।কিন্তু কোন একটা বিষয় নিয়ে যে প্রভার ওর উপর অভিমান জমেছে সেটা ওর কথার দ্বারাই বুঝতে পারছে।এই মেয়ের অভিমান না ভেঙে তো নির্ভীক এখান থেকে যেতেও পারবে না।

"সত্যি করে বলুন তো কিছু হয়েছে?আমার অজান্তে কি আমি কোন ভুল করে ফেলেছি?"

"আপনার বন্ধুর কোন কথা আপনি ফেলেন না তাই না?"

"কোন বন্ধু?"

"উৎসব।"

"হঠাৎ উৎসবের কথা বলছেন কেন?কিছু হয়েছে?"

প্রভা মৃদু বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"কিছু হলে কি শুধু জিজ্ঞেস করা যায় এমনিতে কি জিজ্ঞেস করা যায় না?পাল্টা প্রশ্ন না করে উত্তরটা দিলেই তো পারেন।"

"হ্যাঁ শুনি।"

"উনি আপনাকে যা করতে বলবেন তাই করবেন?"

"হ্যাঁ।না করার কোন কারণ নেই।"

"যদি অন্যায় কিছু করতে বলে তাহলেও?"

নির্ভীক আত্মবিশ্বাসের সাথে দৃঢ় কন্ঠে বলল,

"আমি জানি আমার ভাই কখনো আমায় অন্যায় কোন কিছু করতে বলবে না।নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস আর ভালোবাসি ওকে।আমার থেকে ও আমার ভালোটা বেশি ভাবে।আমি নিজেকে যতটা বুঝি ও আমাকে তার থেকেও বেশি বোঝে।আমি জানি কখনো ও আমায় অন্যায় কিছু করতে বলবে না।আর না কখনো আমায় এমন কিছু করতে বলবে যেটা আমি চাইনা।"

নির্ভীকের আত্মবিশ্বাস দেখে প্রভা অবাক হলো।এতদিনে বুঝেছিল যে উৎসব আর নির্ভীকের বন্ধুত্বের গভীরতা অনেক।কিন্তু সেখানে যে বিশ্বাস এতটা মজবুত সেটা হয়তো পরিপূর্ণভাবে বুঝে উঠতে পারেনি।

"মানুষ মাত্রই তো ভুল হয় তাই না?ধরুন কখনো আবেগের বসে আপনার থেকে এমন কিছু চাইলো যেটা আপনি ওনাকে দিতে পারবেন না।তখন কি করবেন?"

নির্ভীক পুনরায় মৃদু হেসে বলল,

"সামনে মোড়ে একটা ছোট চায়ের দোকান আছে।চলুন ওখানে বসে কথা বলি।"

প্রভা আর পাল্টা কোন প্রশ্ন করল না।নির্ভীকের কথা অনুযায়ী চুপচাপ হাঁটা ধরল।হাঁটতে হাঁটতে নির্ভীক বলে উঠলো,

"উৎসবের সাথে আমার বন্ধুত্ব একদম স্কুলের প্রথম দিন থাকে।ছোটবেলা থেকে আমি শান্ত স্বভাবের ছিলাম আর উৎসব ছিল প্রচন্ড চঞ্চল।প্রথম দিন থেকেই আমার শান্ত স্বভাবটা ও ঠিক মেনে নিতে পারেনি।এক প্রকার জোর করেই আমার সাথে বন্ধুত্বটা করেছিল ও।সেই যে শুরু হলো আমাদের বন্ধুত্ব আজ কতগুলো বছর যে হয়ে গেল তার হিসাব নেই।"

প্রভা বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"ঠিক বলেছেন।আমি নিজে হিসাব করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি।"

"হুম।ক্লাস সিক্স অব্দি আমার জীবনটা খুব ভালো কাটছিলো।আমাদের বংশটা বেশ নাম করা ছিল, চৌধুরী বংশ।সমাজের উঁচু স্তরের মানুষদের মাঝে আমাদের গণ্য করা হতো।হঠাৎ করে বাবার ব্যবসায় ধ্বস নামলো।তার কারণ ছিল কুসঙ্গ।"

"মানে?"

"মানেটা হল সারা জীবন নিজের বুদ্ধি দিয়ে ব্যবসা চালানো আমার বাবা হুট করে অন্যের বুদ্ধিতে ব্যবসাটা চালাতে শুরু করল।একের পর এক লস হতে শুরু করলো।ছয় মাসের মধ্যে আমরা ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে গেলাম।এই ছয় মাসের মাঝে বংশ গৌরব অনেকটাই হারিয়ে গেছে।সেই গৌরবের প্রদীপটা তখন নিভু নিভ জ্বলছিলো,যে কোন সময় নিভে যেতে পারে।পাওনাদাররা বাড়িতে এসে ঝামেলা করা শুরু করলো, হুমকি দিতে লাগলো।মা অসুস্থ হয়ে গেল অতিরিক্ত চিন্তায়।তারপর একদিন........"

নির্ভীক থেমে গেল।প্রভা বুঝতে পারলো যে এই কথাগুলো বলতে ওর খুব কষ্ট হচ্ছে।নিজ থেকে ওকে থামতে বলল।

"আমি বুঝতে পারছি আপনার কষ্ট হচ্ছে এগুলো বলতে।থাক বলতে হবেনা।"

"কষ্ট!কষ্ট আর হয় না।এই বুকে কষ্ট সয়ে গেছে।ও জানে যে ওকে কষ্ট পেতেই হবে তাই আর নতুন করে মন খারাপ করে না।"

"আন্টি কি কোন অসুস্থতার কারণে মা/রা গিয়েছিলেন নাকি এসব চিন্তা থেকেই?"

"অতিরিক্ত চিন্তা করতে করতে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল আমার মা।আমার মা বাবার সংসারে কোন অশান্তি ছিল না।কিন্তু একটা সময় এমন পর্যায়ে চলে গেল যে রোজ রাতে বাবা মায়ের মাঝে ঝামেলা হতো।দু একদিন বাবাকে মায়ের গায়ে হাত ও তুলতে দেখেছি।"

"আপনি কিছু বলেননি আঙ্কেলকে?"

"ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া একটা বাচ্চার কথা কি শোনা সম্ভব বলুন?নিজের চোখে নিজের বাবাকে বদলে যেতে দেখেছি।চোখের মণি ছিলাম আমার বাবার।আমার মায়ের সাথে একটু জোরে কথা বলত না অথচ সেই বাবা আমার মায়ের গায়ে হাত তুলতে শুরু করল।আমি আটকাতে গেলে আমার গায়েও হাত তুলতে আসতো।সেজন্য ঝামেলার সময় আমায় একটা ঘরে রেখে মা বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দিত।"

"হুট করে আঙ্কেলের পরিবর্তনের কারণ কি ছিল সেটা জানতে পেরেছেন?"

"ছেলে হয়ে বাবার নোংরামির কথাগুলো কি করে মুখে আনি?কি করে বলবো যে আমার বাবা অন্য মেয়ের সংস্পর্শে চলে এসেছিল?সেই নারীর জন্য আমাদের ব্যবসা,আমাদের পরিবার সবকিছু চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেল।আমাদের বিশাল বড় সাম্রাজ্য ধুলোয় পরিণত হল।একদিন সকালে দেখলাম মা ঘুম থেকে ডেকে তুললো না।ঘড়িতে সময় তখন সকাল দশটা বাজে।আমি নিজেই ঘুম থেকে উঠে মায়ের ঘরে গেলাম।"

"আঙ্কেল ছিলেন না বাসায়?"

"না,সেদিন ছিল না বাবা।হুট করে দু একদিন রাতে বাড়ি ফেরাও বন্ধ করে দিলেন।আমি মায়ের ঘরে গিয়ে দেখলাম মা তখনও ঘুমোচ্ছে।আমি ভাবলাম হয়তো বেশি রাত করে ঘুমিয়ে ছিল সেজন্য এখনো জাগা পায়নি।ডাকতে গেলাম।আম্মুর হাতটা ধরতেই দেখলাম দুটো হাত বরফের মতন ঠান্ডা।আমি ডাকলাম আম্মুকে কিন্তু আম্মু উঠলো না।"

বিজ্ঞাপন

প্রভার নিজেরই কেন যেন কান্না পাচ্ছে।নির্ভীকের দিকে তাকাতেই খেয়াল করল ওর চোখ দুটো টলমল করছে।যে কোন সময় বাঁধ ভেঙে অশ্রু গড়িয়ে পড়বে।প্রভা শক্ত করে নির্ভীকের হাতটা ধরল।ভরসা দিল যে ও আছে।

"তারপর?"

"তারপর আমায় ভালোবাসার মানুষটা চলে গেল।আমার মা আমায় একা করে দিয়ে চলে গেল।আমার দাদু তখনও বেঁচে ছিলেন।উনি আমার মাকে খুব ভালোবাসতেন।ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছিলেন কিন্তু আমার বাবা বোঝেনি।তিনি তখন পুরনো কে ভুলে নতুনে মত্ত হয়েছেন।মা মা/রা যাওয়ার চার মাসের মাথায় আবার দ্বিতীয় বিয়ে করে।এতগুলো দিন অপেক্ষা করারও একটা কারণ আছে।আর সেই কারণটা শুনলে আপনার ভীষণ হাসি পাবে।"

"কি কারণ?"

"ব্যবসা শেষ।যা জমি জমা আর টাকা পয়সা ছিল তার নব্বই শতাংশ ধার শোধ করতে চলে গেছে।হাতে তখন সম্পত্তি বলতে আমাদের বাড়িটাই ছিল দাদুর নামে।ওই বাড়িটাকে বাবা নিজের নামে করে নিতে চেয়েছিল। সেই জন্য একটু দাদুর কাছে ভালো সাজার চেষ্টা করছিলেন।বাবার দ্বিতীয় বিয়ে দাদু মেনে নিতে পারত না সেটা বাবা ভালো করেই জানতো।কিন্তু এত কিছু করেও কোনো লাভ হয়নি।দাদু মা/রা যাওয়ার আগে বাড়িটা আমার নামে লিখে দিয়ে যায়।মা মা/রা যাওয়ার তিন মাস তেইশ দিনের মাথায় দাদু মা/রা যায় আর তার ঠিক এক সপ্তাহ পরে আমার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসে।"

প্রভা ঘৃণা ভরা কন্ঠে বলল,

"যার সাথে আপনার বাবার সম্পর্ক ছিল ওই মহিলা কি জানতেন না যে আপনার বাবা বিবাহিত?"

"জানতেন।সাথে এটাও জানতেন যে তার একটা ছেলে আছে।ওনার ভাইয়ের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে গিয়েই আমাদের ব্যবসাটা ডুবে ছিল।"

"জানা সত্ত্বেও একটা বিবাহিত পুরুষের পেছনে পড়েছিলেন?নির্লজ্জ মেয়ে।"

"ওনাকে দোষ দিচ্ছেন কেন?দোষ ছিল আমার বাবার।উনি ডিভোর্সি ছিলেন।সাথে একটা ছেলে।উনি তো নিজের জন্য একটা শক্ত খুঁটি জোগাড় করতে চাইবেনই।কিন্তু আমার বাবার তো বোঝা উচিত ছিল যে তিনি অনেক আগে থেকে দুটো মানুষের বাঁচার অবলম্বন।বাবাই যখন আমার আর মার কথা ভাবেনি তখন সেই অপরিচিত মহিলা কেন ভাববে?আমার বাবা না চাইলে তো উনি তার জীবনে প্রবেশ করতে পারতেন না।জায়গাটা দিয়েছিলেন জন্য উনি আসতে পেরেছেন।"

প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।সত্যিই তো নিজের মানুষই যদি না বোঝে তাহলে পরের থেকে কি আশা করা যায়।

"আপনাকে এত কিছু বলার কারণ হলো উৎসব।আমরা দুজনে কিন্তু সমবয়সী।মা আর দাদুকে হারানোর পর যখন আমি একদম একা তখন আমার পাশে কেবলমাত্র উৎসব ছিল।ঐ হাসি খুশি চঞ্চল ছেলেটা আমার দুঃখে পাগলের মতন কাঁদতো।ওর কান্না দেখে আমি থমকে যেতাম।আমি বাড়ি থেকে না খেয়ে আসতাম,টিফিন আনতে পারতাম না জন্য ও না খেয়ে আসতো।নিজের টিফিনটা আমার সাথে ভাগ করে খেত।নিজে খেতই না।বলতো ও বাড়ি গিয়ে খেতে পারবে কিন্তু আমি পারবো না।সমস্ত খাবার আমায় খাইয়ে দিত।অসুস্থ শরীর নিয়ে আমি স্কুলে আসতাম।উৎসব ওর ড্রাইভারকে বলে আমার জন্য ওষুধ আনার ব্যবস্থা করত।এমন ভাবে আমার যত্ন নিত যেন ও খুব বড় আর আমি একটা বাচ্চা।"

প্রভা বেশ অবাক হল উৎসবের সম্পর্কে এই কথাগুলো শুনে।উৎসবের মতো মানুষও কাউকে এতটা যত্ন করতে পারে সেটা তার ধারণা ছিল না।

"যখন একটু একটু করে বড় হলাম নিজেকে ধীরে ধীরে সব জায়গা থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলাম কিন্তু ওর থেকে আলাদা হতে পারলাম না।যদি আমার মন খারাপ দেখত কিংবা শুনতো যে বাড়িতে আমায় কেউ কিছু বলেছে তাহলে নিজে বাড়িতে এসে ঝামেলা করে যেত। এমনভাবে আমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভয় দেখাতে যেন ও খুব বড় গুন্ডা।"

"এই কথাটা খুব একটা ভুল বলেননি।ওনার আবভাব অনেকটা গুন্ডাদের মতন।"

"যে যেমন তার কাছে ঠিক তেমন।বাকিদের কাছে ও বদমেজাজি,খিটখিটে হতে পারে কিন্তু আমার জন্য আমার জীবন।আমার ভাই।এই পৃথিবীতে আমার মা, বাবা,বোন নেই কিন্তু আমার একটা ভাই আছে।নিজের জীবন দিয়ে দিতে পারে ও আমার জন্য।আমার থেকে কিছু চাওয়ার আগে ও হাজার বার সবদিক ভাবে যে তাতে আমার কোন অসুবিধা হবে কিনা।যে আমার জন্য জীবন দিতে পারে সে কখনো আমার থেকে অন্যায় কিছু করিয়ে নিতে পারেনা।প্রতিটা বিষয়ে হয়তো ও গা ছাড়া ভাব দেখায় কিন্তু বাস্তবতা সম্পর্কে ওরও জ্ঞান আছে।ও সব বোঝে।কিন্তু সবার সামনে নিজেকে খারাপ হিসেবে প্রেজেন্ট করাটা ওর স্বভাব।"

"আচ্ছা ধরুন না উনি কখনো অন্যায় আবদার করলেন।হয়তো বাধ্য হয়েই করলেন।মানে ধরুন ওনার কাছে আর দ্বিতীয় কোন উপায় নেই তখন কি করবেন?"

"মেনে নেব।"

প্রভা চমকে উঠে বলল,

"সত্যি মেনে নেবেন?"

নির্ভীক মৃদু হেসে বলল,

"হ্যাঁ মেনে নেব।ও আমার জন্য যা যা করেছে আমি তার কিঞ্চিত আপনাকে বলতে পেরেছি।ওর জন্য আমি সব করতে পারি।আমি জানি ও কতটা নিরুপায় হলে আমার কাছে কোন অন্যায় আবদার করতে পারে।আর আমি আমার ভাইকে কষ্ট পেতে দেখতে পারবো না।ওর খুশির জন্য হলেও হাসিমুখে ওর অন্যায় আবদারটা মেনে নেব।"

প্রভার কেন যেন এখন ভীষণ কান্না পাচ্ছে।তারমানে নির্ভীক কে আর ওর পাওয়া হলো না।উৎসব নিশ্চয়ই নিজের বোনের কান্না সহ্য করতে পারবে না।শেষে বাধ্য হয়ে নির্ভীক কে অনুরোধ করবে আর নির্ভীকও ওর কথা মেনে নেবে।

"আসছি আমি।ভালো থাকবেন।"

কথাটা বলে প্রভা চলে যেতে নিলে নির্ভীক পিছন থেকে ওর হাত টেনে ধরল।মৃদু গম্ভীর কন্ঠে বলল,

"সত্যি করে বলুন তো আপনার হয়েছেটা কি?না বললে কোন মতেই যেতে দেব না।উৎসবের সাথে থাকতে থাকতে আমারও কিন্তু প্রচুর জেদ বেড়েছে।"

প্রভা বহু কষ্টে নিজের চোখের জল আটকে রেখে বলল,

"কিছু হয় নি।"

"বেশ তাহলে আজ আর বাড়ি ফিরতে হবে না।এখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন।"

প্রভা হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,

"বলছি তো কিছু না।"

নির্ভীকের কন্ঠস্বর নরম হলো।শান্ত গলায় বলল,

"আমায় কি বলা যায় না?"

প্রভার এবারে বলে দিতে ইচ্ছে করলো।

"ঊষা আপনাকে ভালোবাসে সেটা আমায় বলেন নি কেন?"

নির্ভীক একটুও অবাক হলো না,না তাকে বিচলিত হতে দেখা গেল।স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

"ঊষা ভালোবাসে আমা,আমি না।আমার কাছে ও আমার বোনের সমান।এর থেকে বেশি আর কিচ্ছু না।"

"আপনার বন্ধু যদি আপনাকে ওকে বিয়ে করতে বলে তাহলে তো করবেনই।তাহলে ভালো না বাসলেই বা কি?"

নির্ভীক ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

"কে বলল আপনাকে যে আমি ওকে বিয়ে করবো?আর এসব কথা আপনি জানলেন কি করে?"

"কি করে জেনেছি সেটা বড় কথা নয়।ভুল তো আর কিছু শুনিনি।"

"উৎসব কখনো আমার কাছে এই আবদার টা করবে না আমি জানি।করার হলে ও অনেক দিন আগেই করে নিত।"

প্রভা কিছু বলল না।নির্ভীক পকেট থেকে ফোনটা বের করে উৎসবের নাম্বারে ডায়াল করল।সাথে সাথে উৎসব ফোনটা ধরলো।

"হ্যাঁ ভাই বল।"

প্রভা আড়চোখে নির্ভীকের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে যে আসলে ও কাকে কল করেছে।নির্ভীক প্রভার দিকে তাকিয়ে ফোনের অপর পাশে থাকা উৎসবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"একটু দেখা করতে পারবি?"

"কোথায় যাব?"

"আমাদের আড্ডাখানাতে আয়।"

"আচ্ছা আসছি।"

ফোনটা রেখে দিয়ে নির্ভীক প্রভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"চলুন।"

"কোথায় যাব?"

নির্ভীক আলতো হেসে বলল,

"আমি যেখানে নিয়ে যাব সেখানে।"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প