বেশ অনেকদিন পরই সৌমি আজ কলেজে এলো।আজ আবার প্রভা ওর সাথে আসতে পারেনি।কলেজে ঢুকতেই কারো একটা সাথে ধাক্কা লাগলো।নিজেকে সামলিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল ধাক্কা লাগা ব্যক্তিটা সৌমির ভীষণ পরিচিত।আর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সৌমির তার সাথে ধাক্কা লাগলো।নির্ভয়ের মুখটা দেখার আগেও সৌমি মনে মনে ভাবছিলো যে ওই ক্ষমা চাইবে ধাক্কাটা লাগার জন্য।অপর পাশে নির্ভয়ও ঠিক একই বিষয় ভাবছিল।কিন্তু যেই না দেখল ধাক্কা খাওয়া মানুষটা সৌমি অমনি নিজের মত বদলে ফেললো।
"এই পিঁপড়ে তোমার চোখে কি আসলেই সমস্যা আছে?চোখে আদৌ দেখতে পাও নাকি কানা?সামনে এত বড় একটা মানুষ আছে চোখে দেখো না?"
সৌমিও কম না।পাল্টা রাগী কন্ঠে নির্ভয় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"অন্যের দৃষ্টিশক্তি কেমন সেটা না ভেবে নিজের চোখের ব্যবস্থা করুন।দেখছেন যে একটা মেয়ে হেঁটে আসছে। ভদ্রতার খাতিরে হলেও তো এক কোণা দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করবেন।কি ভেবেছেন বুঝি না কিছু?সুন্দরী মেয়ে দেখেছেন অমনি ইচ্ছে করে ধাক্কা দিলেন তাইতো?"
সৌমর কথা শুনে নির্ভয় শব্দ করে হেসে উঠে ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
"সুন্দরী?কে সুন্দরী?পিঁপড়ে নাকি আবার সুন্দরী!চোখের সাথে সাথে মনে হয় মাথার সমস্যাও আছে।কি ভেবেছো আমি কিছু বুঝিনা?আমার মতন একটা ভোলা ভালা হ্যান্ডসাম ছেলেকে দেখেছো ওমনি আগবাড়িয়ে ধাক্কা মে/রে লাইন লাগাতে চাইছো তো?এসব করে লাভ নেই পিঁপড়ে।দেরি করে ফেলেছো।আরেকটু আগে এলে তাও ভেবে দেখতাম।"
"অতিরিক্ত গরম পড়েছে তো সেজন্য মাথার তার গুলো সব কেটে গেছে মনে হচ্ছে।পৃথিবীতে কি ছেলের এতই অভাব পড়ে গেছে যে আপনার মতন একটা গণ্ডার কে লাইন মারতে যাব?জানতো এখান থেকে।দিনের শুরুটাই আমার খারাপ করে দিল।"
কথাটা বলে সৌমি চলে যেতে নিলে নির্ভয় আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করার উদ্দেশ্যেই বলল,
"আর আমার দিনটা তো মনে হয় খুব ভালো কাটবে এখন।সকালে যে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলাম কে জানে?ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে ভদ্রতা তো নেই একটা সরি অবধি বলে না।কোত্থেকে যে আসে এসব।"
সৌমি মনে মনে ঠিক করল যে এবার নির্ভয় কে আচ্ছা মত গালি দেবে।কিন্তু তার সে আশা পূরণ হলো না।ঝাঁঝালো কন্ঠে কড়া কিছু কথা শোনানোর আগেই নির্ভয় সেখান থেকে চলে গেল।সে নিজেও হয়তো আন্দাজ করেছিল যে এবার তাকে কয়েকটা গালি শুনতে হবে।সেই গালিগুলো থেকে বাঁচার জন্যই এই পথ অবলম্বন করল।সৌমি মনে মনে ঠিক করল যে এই কথা সে কোন মতেই ভুলবে না।খুব তাড়াতাড়ি বাকিটুকু ঝগড়া নির্ভয়ের সাথে পূরণ করবে।পিছন ফিরে তাকাতেই কারো উপস্থিতি দেখতে পেয়ে চমকে দু কদম পিছিয়ে গেল।এতোটুকুতেই তার হৃদস্পন্দনের গতি যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।ইশরাকের মুখের কুটিল হাসিটা দেখে সৌমর হৃদপিন্ডটা ছলাৎ করে উঠল।যেখানে প্রভা থাকা অবস্থায় ওর ভয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে যায় সেখানে আজ ও একা।তাও আবার ইশরাক একা না সাথে চার পাঁচ জন ছেলেপেলেও আছে।সৌমি ঘামতে শুরু করল।ওর চোখ মুখের অবস্থা দেখে ইশরাক আন্দাজ করতে পারল যে ঠিক কতটা ভয় পেয়েছে।আরেকটু ভয় দেখাতে মন চাইলে।মুখে তার কুটিল হাসিটা বজায় রেখে দু কদম এগিয়ে এলো সৌমির দিকে।
"কি খবর তোমার শ্যালিকা?আরে আমায় দেখে ভয় পাচ্ছ কেন?আমি তো তোমার দুলাভাই হই।"
সৌমি কাপা কাঁপা কন্ঠে বলল,
"কি চাই আপনার?প্রভা তো নেই আমার সাথে তাহলে কেন এসেছেন?"
"তোমার সাথে সুন্দরী নেই জন্যই তো তোমার কাছে আসতে হয়েছে।নাও এখন ঝটপট বলে ফেল তো সুন্দরী কোথায়।কাল সারাদিন সুন্দরীকে দেখিনি আজ ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে।রাতে ঘুমটা অবধি ঠিক করে হয়নি।"
সৌমি বেশ অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে বলল,
"প্রভা কোথায় আছে সেটা জেনে আপনি কি করবেন?"
"প্রশ্নের প্রেক্ষিতে পাল্টা প্রশ্ন করাটা আমি একদমই পছন্দ করি না।তোমায় আবার কিছু বলতেও পারবো না।যতই হোক আমার হবু বউয়ের প্রিয় বান্ধবী তুমি।ও কষ্ট পাবে তো তোমার সাথে কিছু করলে।আর ওকে আমি একটুও কষ্ট দিতে পারি না।যা জিজ্ঞেস করছি ভালো মেয়ের মতন উত্তর দিয়ে দাও।"
"না বলবো না।বললে আপনি আবার ওকে বিরক্ত করবেন।ওকে বিরক্ত করা ছেড়ে দিন।"
ইশরাক এবার হেসে উঠে বিস্ময় ভরা কন্ঠে সৌমিকে বলল,
"তোমার তো দেখছি অনেক সাহস বেড়েছে।এত সাহস কিন্তু ভালো না।সুন্দরী কোথায়?"
"জানি না।"
"আমার ধৈর্যের বাঁধ কিন্তু ভেঙ্গে যাচ্ছে এবার।এমনি মাথাটা প্রচন্ড বিগড়ে আছে।এই মুহূর্তে সুন্দরী কে দরকার।জলদি বলে ফেল তো শ্যালিকে সুন্দরী কোথায় তাহলে তোমাকে একটা আইসক্রিম খাওয়াবো।না হলে একটা জামাই তোমাকেও খুঁজে দিতে পারি।"
সৌমি এবারও কোন জবাব দিল না।ইশরাক আর নিজের রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারল না জোরে একটা ধমক দিয়ে বলল,
"বল সুন্দরী কোথায়?কিছু বলছি না জন্য মাথায় উঠে বসছো।আমি কিন্তু মানুষটা একদম ভালো না।আস্ত একটা জা/নো/য়া/র।যে কাউকে ছি/ড়ে খেতে পারি। আমার মনে কিন্তু মায়া দয়া নেই।ভালোয় ভালোয় বলছি বলো সুন্দরী কোথায়।"
ইশরাকের ধমকে সৌমি কেঁপে উঠলো।ওকে যতই ভয় দেখাক না কেন কিন্তু তারপরেও বলবে না প্রভা এখন কোথায় আছে।মেয়েটা একা একা গিয়েছে যদি কোন বিপদ-আপদ হয়।এই ছেলের কোন বিশ্বাস নেই।কিন্তু কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে হয় সৌমিকে প্রভা কোথায় আছে সেটা বলতে হবে না হলে ইশরাক ওর সাথে খারাপ কিছু করে দিতে পারে।কোন ভাবনা চিন্তা না করেন হুট করে দরজার দিকে দৌড় দিল।ও জানেও না যে কোথায় যাবে।সৌমিকে দরজার দিকে দৌড় লাগাতে দেখে ইশরাকসহ উপস্থিত সবাই ভর কালো।হুট করে যে এভাবে দৌড় লাগাবে সেটা কারো আন্দাজে ছিল না।আশেপাশের ছেলেগুলো ক্রোধান্বিত কন্ঠে ইশরাক কে বলল,
"ভাই আপনাকে অপমান করে চলে গেল।মুখে মুখে তর্ক করছিল।ধরে আনি মেয়েটাকে আপনার বাগান বাড়িতে?"
ইশরাক বক্র হেসে বলল,
"সব সময় কি মাথা গরম করে সিদ্ধান্ত নিলে চলে?এতদিন হলো আমার সাথে আছিস আর এতটুকু শিখলি না যে কোথায় মাথা গরম করতে হয় আর কোথায় ঠান্ডা রাখতে হয়?ওকে ধরতে কতক্ষণ সময় লাগবে আমাদের?সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট।ও ভেবেছে দূরে পালিয়ে যেতে পারবে।কিন্তু জানেও না যে ইশরাক খানের হাত ঠিক কতটা লম্বা।ও সুন্দরীর বান্ধবী।ওর সাথে এখন আজেবাঝে কিছু করা যাবে না।আর করলেও সুন্দরীকে পাওয়ার পর।"
গেট থেকে বেরিয়ে এসে সৌমি সোজা সেই ছোট চায়ের দোকানটায় গেল।ভাগ্যিস মাথায় তিসানদের কথাটা এসেছিল।ছোট চায়ের দোকানটা তখন উৎসব তিসান আর নির্ভয় আড্ডা দিচ্ছে।তিসান সবেমাত্র এসেছিল।বেঞ্চে বসতে নেবে তার আগেই সৌমি এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়লো তিসানের পিঠের উপর।পিঠের শার্টটা খামচে ধরলো।তাল সামলাতে না পেরে তিসান নিজের জায়গা থেকে সরে গেল।রাগ তখন তার তুঙ্গে উঠে গেছে।এভাবে কেউ ধাক্কা দেয়?নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই সৌমির ভয়ার্ত মুখটা দেখতেই ওর রাগটা কমে গেল।সৌমি আজও সেই একই কথা বলল,
"আমি খুব বিপদে পড়েছি আমায় একটু সাহায্য করবেন?"
তিসান চিন্তিত কন্ঠে বলল,
"কি হয়েছে তোমার?আর প্রভা কই?"
দৌড়ে আসার কারণে সৌমি হাঁপাচ্ছে।তৎক্ষণাত সে জবাব দিতে পারল না।বেঞ্চে বসে থাকা নির্ভয় বলে উঠলো,
"এখনই তো ঝগড়া করে এলাম এর মাঝে আবার তোমার কি হলো?"
ওদেরকে একের পর এক প্রশ্ন করতে দেখে উৎসব থামিয়ে দিল।চায়ের দোকান থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে সৌমির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
"ওহে পিপীলিকা এই পানিটা আগে পান করে নাও তো। তারপর এক এক করে সবার প্রশ্নের উত্তর দাও।"
সৌমি কোনরকম কথা ব্যয় না করে এক ঢোকে পুরো গ্লাসের পানিটা শেষ করে দিল।দূর থেকে সৌমিকে তিসানদের দিকে আসতে দেখে ইশরাক মনে মনে বেশ খুশি হলো।মনে হচ্ছে অনেকদিন পর ঝামেলা করার একটা কারণ খুঁজে পাবে।ওদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না সৌমি।তার আগে সেখানে ইশরাক এলো।
"বাঁচার জন্য নড়বড়ে খুঁটিগুলোকে আঁকড়ে ধরলে?একটু শক্ত কাউকে ধরলেও তো পারতে।"
ইশরাকের মুখ থেকে এমন অপমানজনক কথা শুনে রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল উৎসবের।ক্রোধান্বিত কন্ঠে বলল,
"ওই ব/ল/দা নড়বড়ে খুঁটি কাকে বলছিস রে?আমরা সবকটা সলিড মা/ল।নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ তোর খুঁটি শক্ত আছে কিনা?না থাকলে বল মাটির ভিতর গে/ড়ে দিচ্ছি।"
উৎসবের কথা শুনে নির্ভয়ের হাসি পেল।কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে হাসাটা মোটেও ঠিক হবে না।খুব কষ্টে নিজের হাসিকে সংযত করল।উৎসবের কথা শুনে ইশরাকও হাসলো।মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলেই বলল,
"শা/লা তোর ডায়লগ গুলো কিন্তু অন্য লেভেলের হয়।কোত্থেকে পাস বলতো এইসব ডায়লগ?"
"খুঁটিটা একটু শক্ত হলে ডায়লগ এমনি বের হয়।ও তোকে বলে লাভ নেই।তোর তো সবকিছুই নড়বড়ে।তাহলে বল আমার নিচ থেকে উপর পর্যন্ত জ্বা/লা/তে কেন আসলি?"
"আমি তো আসতে চাইনি।কিন্তু এই যে সুন্দরের বান্ধবী আমাকে আসতে বাধ্য করল।বিপদে পড়েছে তাই সাহায্যের জন্য তোদের কাছে ছুটে আসলো।তাই বাধ্য হয়ে আমাকেও আসতে হলো।"
সৌমি তিসানের পিছনে গিয়ে গুটি শুটি হয়ে দাঁড়ালো ঠিক যেমনটা প্রভা সাথে থাকলে করে।সৌমির এমন কান্ড দেখে ইশরাক ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
"আরে তুমি কার পিছনে গিয়ে আশ্রয় খুঁজছো যে নিজেই আমার পায়ের নিচে থাকে।তা বন্ধু কি খবর?আজকাল দেখাই যায় না!"
তিসান বরাবরই ইশরাক কে এড়িয়ে চলতে চায়।ও চায় না যে ইশরাকের সাথে আবার নতুন করে ঝামেলা হোক যার জন্য পুরনো কিছু সমস্যা কে টেনে নিয়ে এসে ইশরাক নতুন করে ওকে আবার হুমকি দিতে পারে।কিন্তু সব সময় চুপ করে থাকাও যায় না।কিছু সময় উত্তর না দিলে অপরপক্ষ বড্ড দুর্বল ভেবে নেয়।তিসান শান্ত কন্ঠে বলল,
"সমস্যা কি তোর?ওকে দুর্বল পেয়েছিস জন্য ভয় দেখাচ্ছিস তাই না?কারো শান্তি তুই সহ্য করতে পারিস না?"
"আমার কোন সমস্যা নেই ওর সাথে কিন্তু ও যেচে সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করছে।আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছি সুন্দরী কোথায়?বলে দিলেই তো ঝামেলা শেষ হয়ে যেত।"
প্রভার কথাটা শুনেই উৎসব বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে ইশরাককে বলল,
"মাস্টান্নির খোঁজ করছিস কেন?ওনাকে দিয়ে তোর কি কাজ?"
ইশরাক চোখ ছোট ছোট করে উৎসবের দিকে তাকালো।কিছু একটা যেন উপলব্ধি করতে চাইলো।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
"আমার সুন্দরীর খোঁজ আমি করছি তাতে তোর এত ফা/টছে কেন?"
"শা/লা চা/মা/র কানের নিচে টেনে লাগাবো এক চ*ড়।তোর সুন্দরী কীভাবে হয় রে?নিজের চেহারা তো ব/ল/দা মার্কা আবার বৌ চায় সুন্দরী।আরে আগে দেখ বিয়ে করার জন্য মেয়ে খুঁজে পাস কি না।"
ইশরাকের রাগ হলেও সে তা মুখে প্রকাশ করল না।ক্রুর হেসে বলল,
"বুকে আ/গু/ন লাগলো নাকি রে তোর?সুন্দরীর নাম শুনতেই এভাবে জ্ব/লে উঠলি কেন?"
উৎসব একটু থতমত খেল।নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
"বুকে লেগেছে কিনা জানিনা তবে মাথায় লেগেছে।তোর চেহারা দেখলেই আমার মাথায় আ/গু/ন লেগে যায়।"
ব্যাপরটা এবার ধীরে ধীরে বাড়াবাড়ির দিকে চলে যাচ্ছে।বরাবরই ওদের মাঝে ঝামেলা লাগলে সেটা থামানোর চেষ্টা করে একমাত্র নির্ভয়।আ/গুনে পানি ঢালার কাজটা সে একাই করে।আজ তার মাঝে নির্ভীক ও নেই। যদি ঝামেলা লাগে খুব খারাপ কিছু একটা হতে পারে।নির্ভয় উৎসবকে থামিয়ে ইশরাক কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"প্লিজ অযথা ঝামেলা না করে চলে যান এখান থেকে।বারবার কেনো আগবাড়িয়ে আমাদের সাথে লাগতে আসেন?"
"এই পুরো দলের মধ্যে একমাত্র তোমাকে আমার বুদ্ধিমান লাগে।আমি সব সময় খেয়াল করেছি যে তুমি আমার সাথে ঝামেলি এড়িয়ে চলতে চাও।অবশ্য বকুল কেও এমন ভাবতাম।কিন্তু বকুল সেদিন অনেক সাহস দেখিয়ে ফেলেছে।তোমাদের সাথে ঝামেলা করার আমার কোন ইচ্ছা নেই।আজ বরং আসি।তোমাদের সবার সাথে খুব শীঘ্রই আমার একটা লম্বা সাক্ষাৎ হবে।ভয় করবে তোমরা আমায়,ভীষণ ভয় করবে।ইশরাক খান নামটা শুনলেই না তোমাদের অন্তর আত্মা কেঁপে উঠবে।আর সেই দিনটার জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।"
________________
"খালা!"
ডাকটা কানে যেতেই পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালেন রোমানা বেগম।ঝাপসা চোখে তার পাশে বসা একটা নারী অবয়ব দেখতে পেলেন।ধীরে ধীরে প্রভার মুখশ্রীটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠলো।মুখে ফুটে উঠলো তার হাসি।কাঁপা কাঁপা হাতটা প্রভার দিকে বাড়িয়ে দিলেন আদর করার জন্য।প্রভা সেই হাতটা ধরে সযত্নে নিজের গালে ছোয়াল।
"কেমন আছো তুমি?তুমি আমায় দেখতে চেয়েছিলে না আমি এসেছি।"
রোমানা ধীর কন্ঠে বলল,
"আমি মনে হয় আর বেশি দিন বাঁচবো না মা।"
এই কথাটা শুনে প্রভার বুকটা কেঁপে উঠল।আপন বলতে তো কেউ নেই ওর এই পৃথিবীতে কিন্তু তাও ওকে ভালোবাসার তো একটা মানুষ ছিল।কপোট রাগ দেখিয়ে বলল,
"একদম আজেবাজে কথা বলবে না।আমি এখানে এসেছি তোমাকে সুস্থ করে তোলার জন্য।আর কে বলেছে তুমি বেশিদিন বাঁচবে না হু?আমার আয়ু দরকার পড়লে তোমায় দিয়ে দেবো আমি।তারপরও তোমার কিছু হতে দেব না।"
"এমনটা বলতে নেই।তোর জীবনটা তো কেবল শুরু।কত কিছু দেখা বাকি আছে,তোর কত আনন্দ উপভোগ করা বাকি আছে।আমি তো সব দেখে নিয়েছি। কতগুলো বছর পার করে দিলাম এই জীবনের।তোর আয়ু নিয়ে আর স্বার্থপর দুনিয়ায় থাকতে চাই না মা।"
"আমার জন্য হলেও তোমায় থাকতে হবে।আরে তুমি তো সুস্থ আছো শুধু একটু জ্বরটা বেশি এসে গেছে আর শরীরটা দুর্বল জন্য আবোল তাবোল বকছো।আমি তোমার জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে এসেছি নিজ হাতে।তোমার খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দেবো দেখবে তুমি একদম সুস্থ হয়ে যাবে।"
রোমানা বেগমের চোখ পড়লো প্রভার পাশে দাঁড়ানো একটা সুঠামদেহি ছেলের উপর।বেশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি নির্ভীক কে।প্রথম দেখাতে যে কেউ অনায়াসে তাকে সুদর্শন একজন যুবক বলে আখ্যা দেবে।গায়ের রং ধবধবে ফর্সা আর শ্যামলার মাঝামাঝি কিছু একটা।পড়নে তার জিন্সের প্যান্ট আর হালকা আকাশি রঙের একটা শার্ট।শার্ট টা ইন করা না।গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি,ঘন ভ্রুঁ,ধূসর মণির দুটো চোখ।খুব সাধারণ সাজ পোশাক দেখতেও বড্ড সাধারন কিন্তু সুদর্শন।নির্ভীককে ইশারায় দেখিয়ে রুমানা প্রভাকে প্রশ্ন করে বলল,
"এটা কে?"
"আমার বন্ধু খালা।তোমায় বলেছিলাম না একজনের কথা।ইনি তিনি,নির্ভীক।খুব ভালো।আসলে একা আসতে ভালো লাগছিলো না,তাই ভাবলাম ওনাকে নিয়েই আসি।জানো আমার আরো অনেকগুলো নতুন বন্ধু হয়েছে।একদিন ওদের সবাইকে নিয়ে এখানে আসবো।"
রোমানা হাসলেন।এই তবে সেই ছেলে যার উপর তার মেয়েটা নিজের মন খুইয়ে বসেছে।রোমানা কে খাবারটা খাইয়ে দিয়ে প্রভা গেল হাত ধুঁতে।আর একটা কারণও অবশ্য আছে।বাকি সবার সাথে দেখা করতেও গেল।এই কথাটা অবশ্য রোমানাই ওকে বলে দিয়েছে।প্রভা সেখান থেকে চলে যেতেই রোমানা ইশারায় নির্ভীক কে ডাকল।নির্ভীক একটু অপ্রস্ত হয়ে পড়ল।বরাবর সে কম মিশুকে।খুব তাড়াতাড়ি সবার সাথে মিশে যেতে পারে না।আবার এমনও হয় মাঝে মাঝে যে দু একজনের সাথে খুব সহজে মিশে যেতে পারে।পাশের চেয়ারে এসে বসতেই রোমানা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
"কেমন আছো?"
নির্ভীক হাসিমুখে উত্তরে বলল,
"আলহামদুলিল্লাহ।আপনার শরীর এখন ভালো লাগছে তো?"
"হ্যাঁ বাবা ভালো লাগছে।তোমার পরিবারে কে কে আছে?"
রোমানার কথা বলতে একটু কষ্টই হচ্ছে কিন্তু তারপরেও তিনি নির্ভীক কে প্রশ্নগুলো করলেন।এই প্রশ্নে নির্ভীক একটু থমকালো।পরিবার তো নির্ভীকেরও আছে কিন্তু সেটা শুধুই সমাজকে দেখানোর জন্য।সত্যি বলতে তো ওর কোন পরিবার নেই।
"মা নেই।বাবা,সৎ মা আর সৎ ভাই বোন আছে।ওরা পরিবার হলেও পরিবার বলা চলে না।আমাকে নিজের পরিবার হিসেবে ওরা গণ্য করতে চায় না।"
"আমার প্রভারও কোন পরিবার নেই জানো তো?"
"জ্বী ওর কাছে শুনেছি।কিন্তু আপনাকে আর সৌমিকে ও নিজের পরিবার বলে।খুব ভালোবাসে আপনাদের দুজনকে।"
"আরেকজনকেও ভীষণ ভালোবাসে।সে না হয় তুমি পরে ওর থেকে জেনে নিও।জানো তো বাবা মেয়েটা আমার খুব ভালো কিন্তু খুব দুঃখী।ওর মা নেই কিন্তু বাবা আছে।হয়তো এখনো বেঁচে আছে।হয়তো আবার বিয়ে করেছে।নিজের বউ সন্তানদের নিয়ে সুখের সংসার করছে কিন্তু ওনার জীবনে শুধু ওই মেয়েটারই জায়গা হয়নি।জন্ম দিতে পেরেছেন কিন্তু ভরণপোষণ আর ভালোবাসা দেওয়ার দায়িত্ব নিতে পারেননি।"
"না থেকেই হয় তো ওর জন্য ভালো হয়েছে।কেননা থাকার পরেও যদি তার থেকে অযত্ন অবহেলা পেত আরো বেশি কষ্ট পেতো ঠিক যেমন আমি পাই।"
রোমানা হালকা হাসলেন।নির্ভীক হাসলো।দুজনের কারো হাসির অর্থ খুশির বহিঃপ্রকাশ না।এ ছিল নিতান্ত একটা দীর্ঘশ্বাসের ভিন্নরূপ।
"আমার প্রভাকে একটু দেখে রেখো।তোমায় খুব বিশ্বাস করে ও।আমায় বলেছে তোমার কথা।মেয়েটা কারো সাথে মিশতে চাইতো না,কথা বলতে চাইতো না।মানুষ দেখলে ভয় পেত।সেজন্য তেমন কোন বন্ধুও হয়নি কখনো,এখানেও হয়নি।সৌমি আসার আগে সবসময় আমার পিছু পিছু ঘুরতো।সৌমি আসার পর থেকে ওর সাথে যা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।জানিনা তোমার উপর কি করে এতটা ভরসা তৈরি হলো।শুধু তোমায় বলবো ওর এই ভরসাটা রেখো।"
নির্ভীক মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলল,
"রাখবো,চিন্তা করবেন না।আমি আছি ওর জন্য।সুখ দুঃখে সব সময় ওর পাশে আমি থাকবো।"
রোমানা হাত বাড়িয়ে নির্ভীক কে আদর করলেন।আল্লাহর দরবারে কিছু প্রার্থনা করলেন।কে জানে তার সেই প্রার্থনা গুলো কবুল হবে কিনা।