"আমার কেন যেন মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছে করে ওনাকে মা/র/তে চাইছিল।"
প্রেয়নার এমন কথা শুনে সবাই চমকে উঠলো।ওদের পুরো দলের মধ্যে নির্ভয় হচ্ছে সবচেয়ে নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ যে কারো সাথে কোন ঝামেলা করতে পছন্দ করে না। সব সময় সব ধরনের ঝগড়া ঝামেলা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।তাহলে ওর সাথে কার এত শত্রুতা থাকতে পারে যে মা/র/তে চেয়েছিল?নির্ভীক সন্দেহী কণ্ঠে প্রেয়না কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"কেন মনে হলো এমনটা?"
প্রেয়না একটু ভেবে বলল,
"আমি তো রাস্তার এই পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি দেখেছি পুরো ব্যাপারটা।গাড়িটা খুব হাই স্পিডে আসছিল।গাড়িটা সোজাই চলে যাওয়ার কথা।রাস্তায় তখন তেমন একটা ভিড়ও ছিল না।কিন্তু নির্ভয়ের কাছাকাছি গাড়িটা আসতেই হুট করে সোজা না গিয়ে বাম দিকে চলে আসে এবং ধাক্কা মে/রে চলে যায়।মানে গাড়িটার তো বা দিকে আসার দরকার ছিল না।ওনার ভাগ্য ভালো ছিল বলে চেয়েও খুব একটা বেশি ক্ষতি করতে পারেনি।"
প্রেয়নার কথায় যুক্তি আছে।সত্যি এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না।সবাইকে ভাবনার মাঝে ডুবে থাকতে দেখে নির্ভয় বলে উঠলো,
"তোরা সবাই আসলেই অতিরিক্ত ভাবছিস।আরে হয়তো মাতাল ছিল।যে স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিল তাতে তাই মনে হবে।একটা মানুষকে ধাক্কা দিল তারপরও থামায়নি।সেম স্পিডে গাড়ি চালিয়ে চলে গেছে।"
উৎসব চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে।সে নিজের কোন মন্তব্য জানায়নি এখন অব্দি শুধু সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে যাচ্ছে।এ পর্যায়ে বলে উঠলো,
"মালটাকে যদি পেতাম গাড়ি সহ উড়িয়ে দিতাম।একবার ধরতে পারলে নিচ থেকে উপর পর্যন্ত আচ্ছা মত ঝালাই করতাম।এমন ধোলাই দিতাম গাড়ি চালানো কেন জীবনে আর গাড়িতে ওঠারই সাহস পেত না।"
উৎসবের কথায় সম্মতি জানিয়ে তিসান বলে উঠল,
"গা,হাত-পায়ে দু'চারটে পেরেকও পুঁতে দিতে পারো ভায়া।কিংবা ধরো গরম তেলের মাঝে ছেড়ে দিতে পারো।এগুলো হচ্ছে শাস্তি দেওয়ার ইউনিক আইডিয়া।"
ওদেরকে থামিয়ে দিয়ে নির্ভীক নির্ভয় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"ব্যাপারটা কে এতটা হালকা ভাবে নিস না নির্ভয়।একটু ভালো করে ভেবে দেখ তো যে কারো সাথে কি তোর এমন কোন শত্রুতা আছে।"
"না নির্ভীক।তোরা ছাড়া তো আর কারো সাথে আলাদাভাবে মিশিই না।"
যেখানে নির্ভয়ই বলছে যে ওর কারো সাথে কোন শত্রুতা নেই সেখানে আর কেউই কথা বাড়ালো না।নিস্তব্ধ কেবিনটায় প্রেয়নার ফোনের শব্দে সবার মনোযোগ ওর দিকেই গেল।কার সাথে কথা বললো সেটা কেউই বুঝতে পারলো না।ফোনটা রাখার পর কেউ কোনো প্রশ্ন করার আগেই প্রেয়না নিজ থেকেই বলে উঠলো,
"বাবা আর আঙ্কেল এসেছেন নির্ভয়।"
প্রেয়নার মুখ থেকে কথাটা তিসান কিংবা নির্ভয় কারোরই ঠিক পছন্দ হলো না।নির্ভয় জানে এই এক্সিডেন্ট এর জন্যও ওর বাবা কোনো না কোনো ভাবে ঠিক ওকেই দায়ী করবে।আর তিসান প্রবীর শিকদারের মুখোমুখি হতে চায় না।কেন যেন এই মানুষ গুলোকে তিসানের সহ্য হয় না।ভালো,সভ্য মুখোশ পড়া মানুষ গুলোকে তিসান পছন্দ করেনা।দেখলেই মাথায় আগুন ধরে যায় যেন।তাদের মাঝে প্রেয়নার বাড়ির সবাইও উপস্থিত আছে।কাউকে কিছু না বলে নিঃশব্দে চলে যেতে নিলে প্রেয়নাই ওকে বাঁধা দিল।
"কোথায় যাচ্ছো?বাবা আসছে দেখা করে যাও।"
তিসান শান্ত কন্ঠে বলল,
"উনি ওনার কাজে আসছেন।আমার দেখা করাটা জরুরী না।"
"জরুরী না মানছি কিন্তু দেখা করলে তো আর ক্ষতি নেই।অনেক দিন হলো তো দেখা হয় না তাই বলছিলাম দেখা করে যাও।"
তিসান হালকা হেসে বলল,
"তোমার বাবা আমার সাথে দেখা করতে চান না।ওনার কোনো ইচ্ছেই নেই আমার মতো একটা লুজারের সাথে কথা বলার।"
কথাটা বলো তিসান চলে যাওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়াতেই কেবিনের দরজা খুলে প্রবীর শিকদার আর নির্ভয়ের বাবা মিরাজুল সাহেব প্রবেশ করলো।মিরাজুল ছেলের দিকে এগিয়ে গেলেও প্রবীর শিকদার তিসান কে দেখে দরজার কাছেই থমকে গেলেন।এখানে তিসান কে তিনি দেখতে পাবেন সেটা কখনোই আশা করেননি।
"তুমি এখানে কি করছো?"
তিসানের উত্তর দিতে ইচ্ছে করছে না।কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও যখন তিসান কোনো উত্তর দিল না তখন প্রেয়না পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজে থেকেই বলে উঠলো,
"তিসান ভাই তো নির্ভয়ের বন্ধু বাবা।সেজন্য ওনাকে দেখতে এসেছে।"
প্রবীর শিকদার গম্ভীর গলায় বললেন,
"ও কি উত্তরটা দিতে পারতো না নাকি কথা বলতে ভুলে গেছে?"
প্রেয়না দমে গেল।কিন্তু তিসান এবারে উত্তর দিল।
"কথা বলার সক্ষমতা থাকা মানেই এই না যে সব সময় কথা বলতেই হবে।ইচ্ছে হয়নি তাই উত্তর দেইনি।"
তিসানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে উৎসব আর প্রভা ফিক করে হেসে ফেলল।অন্য সময় হলে নির্ভয়ও হাসতো।কিন্তু এখন তার হাসার মতন মন মেজাজ নেই।উৎসব আর প্রভাকে হেসে উঠতে দেখে নির্ভীক বিপাকে পড়লো।কেননা ওদের সাথে সাথে প্রবীর শিকদারের দৃষ্টি নির্ভীকের ওপরেও পড়েছে।এদিকে প্রেয়না পরিস্থিতিটা কিভাবে সামাল দেবে সেটা ভেবেই হাসফাস করছে।ও চাইছে সব স্বাভাবিক করতে কিন্তু বাকিরা সব তালগোল পাকিয়ে দিচ্ছে।তিসানের আর ইচ্ছে হলো না সেখানে থাকার।চলে যেতে নিলে প্রবীর শিকদার বলে উঠলো,
"কিছু কি করতে পেরেছো জীবনে নাকি এখনো বাবার অন্নই ধ্বংস করছো?গোছানো জীবনটাকে শেষ করে ফেললে নিজ হাতে তাই না?আমার ভাইয়ের সম্মান শেষ করে দিলে তুমি।"
প্রেয়না প্রবীর শিকদারের হাত টেনে ধরে ইশারায় ওনাকে এসব কথা বলতে নিষেধ করলো।ওনার সেই কথা গুলো শুনে তিসানের পা জোড়া থেমে গেল।উত্তর না দিয়ে পালিয়ে গেল না সে।দু কদম পিছিয়ে এসে গম্ভীর গলায় প্রবীর শিকদার কে বলল,
"কিছু করতে পারলেও আপনার বাড়িতে গিয়ে দু মুঠো ভাত চাইবো না,কিছু না করতে পারলেও চাইবো না।অন্ন ধ্বংস করলে আমার বাপেরই করছি,ওনার স্বার্থপর ভাইয়ের না।নিজের জীবন নিজে শেষ করেছি এতে কোনো আফসোস নেই আমার।আর ভাইয়ের প্রতি এতই দরদ তাহলে আজ এতগুলো বছর ধরে একটা বার খোঁজ নেওয়ারও সময় পান না কেন?"
তিসান খুব সুন্দর ভাবে গুছিয়ে সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দিল।সাথে পাল্টা নিজেও একটা প্রশ্ন করলো।এদিকে প্রেয়না পড়েছে মহা বিপাকে।সবকিছু ঠিক করতে চাইলো অথচ সব যেন হাতের বাইরে বেড়িয়ে যাচ্ছে।প্রবীর শিকদার গর্জে উঠে বললেন,
"আজ অব্দি ভদ্রতা শিখলে না।সম্পর্কে চাচা হই তোমার।সম্মান দিয়ে কথা বলতে শেখো।"
"সম্মান এত সস্তা জিনিস না যে সবাইকে দিয়ে দেব।আমি ভেবে চিন্তে লোক বুঝে সম্মান দেই।"
প্রবীর শিকদার আবারও গর্জে উঠে কিছু বলতে নেবেন তার পূর্বেই পিছন থেকে উৎসব ওনাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
"কাকু,কাকু!বলছিলাম যে একটু আস্তে কথা বলুন না প্লিজ!আমাদের রোগীর তো আপনার চেঁচামেচির আওয়াজে এবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।"
আজ কেন যেন প্রভার হাসিও মানুষজন কিছু মানতে চাইছে না,হুট করে বেরিয়ে আসছে।এই যেমন এবারেও উৎসবের কথাটা শুনে হেসে ফেলল।কিন্তু প্রভা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে যে এই মুহূর্তে হাসাটা একদম উচিত না কিন্তু কি করবে বেরিয়ে এলো তো আটকাতে পারেনি।নির্ভীক রাগ আর বিরক্তিকর দৃষ্টিতে উৎসবের দিকে তাকাতেই ও থেমে গেল।এদেরকে নিয়ে এখানে আর থাকা যাবে না।চুপচাপ উৎসব আর প্রভাকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।ওরা বেরিয়ে যেতে মিরাজুল সাহেব বিরক্তি কর কন্ঠে বলল,
"সব কটা বেয়াদব।এদের সাথে থেকে থেকেই ছেলেটা আরও বিগড়ে যাচ্ছে দিনদিন।"
ওনার কথার প্রতিবাদ জানিয়ে তিসান বলে উঠলো,
"আমাদের সাথে না থাকলে না এতদিন ছেলের ছবি ধরে বসে থাকতে হতো,ছেলেকে আর ধরতে পেতেন না সামনে থেকে।আল্লাহ আমাদের ওসিলায় আপনার ছেলেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।"
কথাটা বলে তিসান গটগট পায়ে হেঁটে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।প্রেয়না একটা হতাশার শ্বাস ফেললো।সে পারলো না ঠিক করতে,কিছু ঠিক করতে পারলো না।বরং সবকিছু আরো খারাপ হয়ে গেল।
_____________
পড়ার টেবিলে বসে আনমনে কি যেন ভাবছে ঊষা।সামনে বই মেলানো তবে তার মনোযোগ অন্য কোথাও।উৎসব দরজায় দু'বার টোকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো।ঊষা অবশ্য তখনও খেয়াল করেনি।আনমনে কিছু একটা ভাবতে দেখে উৎসব নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করল,
"কি ভাবছিস ঊষা?"
এবারে ঊষার ধ্যান ভাঙলো।ঠিকঠাক হয়ে বসে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলার চেষ্টা করল,
"আমি পড়ছিলাম ভাইয়া।"
উৎসব একটা চেয়ার টেনে ঊষার পাশে বসলো।শান্ত কন্ঠে বলল,
"মিথ্যে বলছিস আমাকে?"
ঊষা একটু থতমতো খেল।সে মিথ্যে বলতে বরাবরই ব্যর্থ হয়।চোখ মুখের অবস্থা দেখলেই উৎসব বুঝে যায় যে ও সত্যি বলছেন না মিথ্যে বলছে।হয়তো এবারও সেভাবেই ধরে ফেলল।কিন্তু তবুও ঊষা এবার আর ধরা দিল না।পরিস্থিতিটা সামাল দিতে বলে উঠলো,
"মিথ্যে বলতে যাব কেন?এই দেখো সামনে বই।আমি সত্যি পড়ছিলাম।"
যেহেতু ঊষা এড়িয়ে যেতে চাইছে তাই উৎসব আর এই নিয়ে কোন প্রশ্ন করল না।উৎসব অবশ্য জানে ঊষা কি নিয়ে এতটা গভীর ভাবনায় নিমগ্ন থাকতে পারে।সেই একই বিষয়টা নিয়ে তো উৎসবও এসেছে ঊষার সাথে কথা বলতে কিন্তু কেন যেন এখন অস্বস্তি হচ্ছে। কথাগুলো গলায় এসে আটকে যাচ্ছে।ঊষা যেন বুঝতে পারলো যে উৎসব ওকে কিছু বলতে চাইছে।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
"তুমি কি আমায় কিছু বলবে ভাইয়া?"
উৎসব দ্বিধান্বিত কন্ঠে বলল,
"আসলে তুই তো আমার থেকে অনেকটাই ছোট। তোকে কথাগুলো বলতে কেন যেন অস্বস্তি হচ্ছে।কিন্তু বলাটা খুব দরকার ঊষা।"
ঊষা নির্ভয় দিয়ে বলে উঠলো,
"আমায় বলতে অস্বস্তি হওয়ার কি আছে?যা ইচ্ছে বল আমি কিছু মনে করব না।"
উৎসবের অস্বস্তিটা যে অন্য জায়গায় হচ্ছে।নিজের আদরের ছোট বোনটাকে ওর ভালোবাসার মানুষটাকে ভুলে যাওয়ার কথা বলতে এসেছে।কেন যেন অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে।মনে হচ্ছে বন্ধুর কথা ভাবতে গিয়ে বোনটাকে কষ্ট দিয়ে ফেলছে,বড্ড কষ্ট দিয়ে ফেলছে। হয়তো স্বার্থপরের মতন আচরণ করছে উৎসব কিন্তু এ ছাড়া তো ওর কাছে আর কোন উপায় নেই।উৎসব যা করছে ঊষার ভালোর জন্যই করছে।
"নির্ভীক কে ভুলে যেতে পারবি না? "
উৎসবের মুখ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে চমকে উঠল ঊষা।জড়ানো কন্ঠে বলল,
"হঠাৎ এই প্রশ্ন করলে কেন?উনি বলেছেন?"
"না আমি তোকে বলছি।পারবি না ওকে ভুলে যেতে?"
"যদি আমি বলি পারবো না তাহলে কি এর কোন সমাধান তোমার কাছে আছে ভাইয়া?"
উৎসব নিরুত্তর রইল।ওর কাছে সমাধান নেই।কিন্তু ঊষাকে যে ভুলতেই হবে।
"জানতাম তোমার কাছে কোন উত্তর নেই।বেশ তোমার কথা মেনে নিলাম।কিন্তু আমি জানিনা কি করে ওনাকে ভুলে যাব।তুমি আমায় কোন রাস্তা বলে দাও।আমার মন থেকে কি করে ওনাকে বের করব তুমি আমায় সেই উপায় টা বলে দাও ভাইয়া।"
"ওর কথা ভাবা বন্ধ কর।"
"তাহলে ওনাকে আমার ভাবনায় আসতে নিষেধ করে দিও।আমি তো ওনাকে আসতে বলি না আমার ভাবনার মাঝে।উনি কেন চলে আসেন বারবার আমার ভাবনার মাঝে,আমার কল্পনাতে,আমার স্বপ্নগুলোতে?"
"ওকে ভালোবাসা ছেড়ে দে।তুই কখনোই পাবি না ওকে।"
"তুমি চাইলেই সব সম্ভব।তুমি শুধু ওনার কথাই ভাবলে ভাইয়া আমার কথা একটা বারও ভাবলে না।আমারও তো কষ্ট হয়,আমি তো ইচ্ছে করে ওনাকে ভালোবাসিনি।ভালোবেসে ফেলেছি এখন যে আর মনটাকে ফিরিয়ে আনতে পারছিনা।আমি কি করবো বলো?তুমি জানো উনি তোমার কথা ফেলবে না।একটা বার একটু ওনাকে অনুরোধ করবে ভাইয়া প্লিজ!আমার জন্য।"
উৎসবের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।দম আটকে আসছে যেন।মনে হচ্ছে কেও ওর গলাটা টিপে ধরেছে। অস্থিরতা কাজ করছে মনের ভিতর।
"এটা সম্ভব না ঊষা।জোর করে ভালোবাসা হয় না বোন।যেখানে আমি জানি ও তোকে ভালোবাসে না আমি কি করে স্বার্থপরের মতন গিয়ে ওকে বলবো যেন তোর হাতটা ধরে?ও যে আমায় খুব ভরসা করে।আমি,আমি আমার ভাইয়ের ভরসা কি করে ভাঙবো?"
"আর তোমার বোনের ভরসার কোন মূল্য নেই?আমি যে তোমাকে আমার নিজের থেকেও বেশি ভরসা করি, আব্বু আম্মুর থেকেও বেশি বিশ্বাস করি তার কোন মূল্য নেই তোমার কাছে?"
উৎসব চমকে তাকালো ঊষার দিকে।মেয়েটার চোখ দুটো ছলছল করছে।গাল বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়েও পড়েছে।এ কোন বিপদে পড়লে উৎসব। দুদিকের দুটো মানুষই যে ওর বড্ড প্রিয়।একজনকে খুশি করতে গেলে যে আর একজনকে কষ্ট দিতেই হবে।উৎসবের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে ঊষা চেয়ার থেকে নেমে উৎসবের পায়ের কাছে বসে পড়লো।কান্না জড়ানো কন্ঠে বলল,
"বিশ্বাস কর ভাইয়া আমি ওনাকে খুব পছন্দ করি।উনি আলাদা।ওনার সাথে সংসার করার আমার খুব ইচ্ছে। প্লিজ ভাইয়া একবার বোঝাও না ওনাকে।সারাটা জীবন তুমি আমাদের সবার উপরে ওনাকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছো,একটাবার একটু উনার উপরে আমাকে প্রাধান্য দেবে!প্লিজ আমি চির কৃতজ্ঞ থাকব তোমার কাছে!প্লিজ ভাইয়া!"
নিজের মা-বাবার প্রতি খুব একটা টান অনুভব না করলেও ছোট বোনটা উৎসবের খুব আদরের।খুব ভালোবাসে ওকে কিন্তু হয়তো সে ভালোবাসাটা নির্ভীক এর প্রতি ওর ভালোবাসার থেকে বেশি না সেজন্যই তো ছোট বোনটার চোখের জল উৎসবের মনটা গলাতে পারল না।উৎসব আর যাই করুক না কেন নির্ভীককে কখনো কষ্ট দিতে পারবে না,ভরসাও ভাঙতে পারবে না।ওই একটা মানুষের কাছে উৎসব সারাটা জীবন পরিষ্কার,বিশুদ্ধ থাকতে চায়।ঊষাকে চেয়ারে বসিয়ে শান্ত কণ্ঠে বুঝিয়ে বলল,
"যে তোর ভালোবাসার কথা শুনেও তোকে আজ ভালোবাসতে পারছে না সে তোকে কালও ভালোবাসতে পারবে না।আর যদিও বা ভালোবেসে ফেলে তাহলে সেটা হবে তোকে দয়া করা।আর এই জিনিসটা খুব কষ্ট দেয় ঊষা।যখন তুই বুঝবি ওই মানুষটার দয়া করে বাধ্য হয়ে তোকে ভালোবাসে তখন দেখবি তোর বুক ফেটে কান্না আসবে কিন্তু তুই কাঁদতে পারবি না।তোর তখন মনে হবে আমি কেন এ সম্পর্কে জড়ালাম কিন্তু ওই সম্পর্কটা থেকে বের হওয়ার কোন উপায় থাকবে না।নিজে যেচে এই কষ্টটা নিজের জীবনে আনিস না।"
"তুমি এবারেও ওনাকে প্রাধান্য দিলে।"
"ও তোকে ভালোবাসে না আমি কি করবো?আমি জানি আমি বললে ও হয়তো তোকে বিয়ে করে নেবে কিন্তু আমার ভাইটা যে সুখে থাকতে পারবে না।নিজেদের জীবন সঙ্গী সম্পর্কে আমাদের সবার মনের মাঝে একটা কল্পনা থাকে।হয়তো তোর কল্পনার সাথে নির্ভীক মিলে গেছে কিন্তু নির্ভীকের সেই কল্পনার সাথে তোর মিল হয়নি।যদি ভাগ্য সহায় না হয় তাহলে তুই আমি চেয়ে কি করব বল?নির্ভীক তোর জন্য না বোন।আর যদি ও তোর জন্য হয়ে থাকে তাহলে দেখিস আমাকে কিছু করতে হবে না।ও নিজ থেকে চলে আসবে।"
ঊষা এবারে শব্দ করে কেঁদে উঠলো।ওর শেষ ভরসাটাও আর রইল না।ওই মানুষটাকে আর পাওয়া হলো না।বাস্তবতা গুলো আসলেও খুব ভয়ানক হয়। সত্যি কথাগুলো ভীষণ গায়ে লাগে।এই যেমন আজ সত্যিটা ঊষার কাছে একদম পরিষ্কার কিন্তু তাও সে সেটা মানতে পারছে না।ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।ও চাইছে সত্যিটাকে বদলাতে আর মিথ্যেটাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে।উৎসব আর পারল না ঊষার কান্না সহ্য করতে।কিন্তু ও নির্ভীকের কষ্টও সহ্য করতে পারবেনা।চলে গেল সেখান থেকে।উৎসব বেরিয়ে যাওয়ার আগে একটা ছায়া দরজার কাছ থেকে সরে গেল।রুবাইদা আর সেখানে না দাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে কাউকে একটা কল করলেন।অপর পাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হতে আন্তরিক গলায় বললেন,
"হ্যালো মিসেস নীলিমা।আসলে আপনাদের নেক্সট মান্থ আসার কথা ছিল কিন্তু আমি বলছিলাম যে সেই ডেটটা যদি একটু এগিয়ে এনে নেক্সট উইক আপনারা আসতেন তাহলে ভালো হতো।আসলে আমি আর দেরি করতে চাইছিলাম না।"
অপর পাশ থেকে এত তাড়াহুড়োর কারণটা জিজ্ঞেস করতেই রুবাইদা বলে উঠলেন,
"আসলে আমি চাইছিলাম ঊষা আর নাবিলের মাঝে একটু কথাবার্তা হোক,আলাপ পরিচয় হোক।আফটার অল সারা জীবন যেহেতু কাটাতে হবে দুজন দুজনকে জানারও তো একটা ব্যাপার আছে তাই না?"
রুবাইদার কথায় যুক্তি খুঁজে পেয়ে নীলিমা রাজি হলেন।আশ্বস্ত করলেন যে পরের সপ্তাহে ওনারা আসছেন।ফোনটা রাখতেই রুবাইদা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।যাক ঠিক সময় তিনি কথাগুলো শুনে ফেলেছিলেন জন্য মেয়েটা আজ বিপথে গেল না তার।না হলে এত বড় একটা সম্বন্ধ ফেলে রেখে মেয়েটা নির্ভীকের মতো ছোটলোক,গরিব ছেলের পেছনে পা/গল হয়ে যেত।