"ভাই জানিস এই মাষ্টান্নি নাকি আমায় একটুও বিশ্বাস করে না।আমি কি এতই খারাপ তুই বল?"
উৎসব অভিযোগের কন্ঠে নির্ভীক কে কথাটা বলল।ওর কথা শুনে পাশে বসা প্রভা বলে উঠলো,
"আমার কথাটা কে কি আপনি খুব সিরিয়াস ভাবে নিয়ে নিয়েছেন?"
উৎসব মন খারাপের ভঙ্গিতে বলল,
"হ্যাঁ মাস্টান্নি আমার খুব খারাপ লেগেছে।"
"আসলে আপনি কষ্ট পান সেভাবে আমি বলতে চাইনি কথাটা।আপনার খারাপ লেগেছে সেজন্য দুঃখিত।আসলে তখন অন্য এক জায়গার রাগ আপনার উপর দেখিয়ে ফেলেছি।কিন্তু এটাও ঠিক যে আমি সত্যিই আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি না।"
উৎসব কিছু বলার আগে নির্ভীক প্রভাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
"কেন বিশ্বাস করতে পারেন না ওকে?"
"অনেক কারণ আছে।"
উৎসব কৌতূহলী কণ্ঠে বলল,
"কি কি কারণ আছে মাস্টান্নি বলুন তো শুনি।"
"দেখুন আমি সত্যি কথা বলছি।আপনার খারাপ লাগলেও আমার কিছু করার নেই।প্রথমত আপনার কথাবার্তার ধরন।আমি বুঝি আপনি মানুষটা হয়তো ভালো কিন্তু আপনার কথাবার্তা একটুও ভালো লাগে না আমার।হ্যাঁ আপনি হয়তো মজা করেন কিন্তু সব সময় মজা ভালো লাগে না।আর মজার মাঝে অশ্লীল ভাষাগুলোও ভালো লাগেনা।"
"আচ্ছা ঠিক আছে আজ থেকে এসব কথা বলব না।আর কি কারণ বলুন?"
"ফ্লাটিং,মেয়েদের সাথে আজেবাজে কথা বলা।আমি জানি আপনি ইশরাকের মতন না।কিন্তু তবুও ওকে অপছন্দের একটা কারণ মেয়েদের সাথে ওর অবাধ মেলামেশা।ভালোবাসা নিয়ে আপনি একদম সিরিয়াস না।একটা মেয়ের সাথে কথা বলা,রিলেশনে যাওয়া আপনার কাছে খুবই সাধারণ ব্যাপার।মেয়েদের সাথে ফ্লার্টিং করা,মেসেজে কথা বলা জানিনা কি কি বলেন এগুলা একদম ভালো লাগে না আমার।এসব কারণে আপনার সম্বন্ধে আমার মনে একটা বিরূপ ধারণা জন্মেছে যার কারণে ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারি না।"
"আরে ওসব তো আমি মজা করে করি।আপনি বলুন আপনার সাথে কখনো করেছি আমি এসবকিছু?"
"না করেননি তা ঠিক আছে।কিন্তু তারপরও আপনার সাথে একা থাকতে আমার অস্বস্তি হয়।"
প্রভার কথাগুলো উৎসবের কাছে অযৌক্তিক লাগলো না।যেসব মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করে তাদের কাছে এই ব্যাপার গুলো খুবই সাধারণ।কিন্তু প্রভা সেই মেয়েগুলোর থেকে অনেক আলাদা।ওর কাছে এই ব্যাপার গুলো খারাপ লাগাই স্বাভাবিক।
"এসব ছেড়ে দিলে তো আপনি আমায় বিশ্বাস করতে পারবেন?"
"আগে ছাড়ুন তারপর দেখা যাবে।"
"কি ভাবছেন ছাড়তে পারবো না?"
"এতদিনের অভ্যাস।যতটা সহজ ভাবছেন ততটা সহজ হবে না একবারে ছাড়া।"
উৎসব ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
"উৎসব মির্জা কে আপনি এখনো ঠিকভাবে চিনে উঠতে পারেননি মাস্টান্নি।আমি যখন একবার ভেবেছি ছাড়বো তার মানে ছাড়বোই।এখন থেকে যদি আমার সামনে সিনেমার নায়িকারাও চলে আসে তারপরেও এই উৎসব ওদের দিকে আর তাকাবে না।আজ থেকে সব মেয়েরা আমার বনি।"
উৎসবের শেষের কথাটা শুনে প্রভা হেসে উঠলো।যাক আপাতত এই সমস্যার সমাধান হলো।চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নির্ভীক উৎসব উদ্দেশ্য করে বলল,
"ঊষা কি তোকে আমার ব্যাপারে আর কিছু বলেছিল উৎসব?"
নির্ভীকের কথাটা যেন উৎসব ঠিক বুঝলো না এমন ভঙ্গিতে বললো,
"কি বলবে?"
উৎসবের এমন প্রশ্ন শুনে প্রভা ভাবলো যে উৎসব হয়তো এ বিষয়ে কিছু জানেনা এখনও।কিন্তু নির্ভীক তা ভাবলো না।ভ্রুঁ জোড়া কুঁচকে বলল,
"তুই জানিস আমি কিসের কথা বলছি।"
উৎসব মনে করার ভঙ্গিতে হালকা হেসে বলল,
"ও হ্যাঁ এবার মনে পড়েছে।না কিছু বলেনি।"
"কিছু ভেবেছিস এই বিষয়ে?"
উৎসব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
"এখানে ভাবার কি আছে?দুজনে রাজি থাকলে ভাবতাম।কিন্তু যেহেতু একজন রাজি নেই সেহেতু এই নিয়ে ভাবার কোন প্রশ্নই আসে না।"
"যদি ঊষা তোকে আমার সাথে কথা বলতে বলে তাহলে?তুই জানিস তোর অনুরোধ আমি ফেলতে পারবো না।সাথে এটাও জানিস ঊষাকে আমি নিজের বোনের নজরে দেখি।"
"তুইও খুব ভালো করে এটা জানিস নির্ভীক যে আমি তোকে ভাই ডাকি।এই আবদার আমি তোর কাছে কখনোই করবো না।আমি জানি কখনো না কখনো ঊষা আমাকে এই কথাটা ঠিকই বলবে।সেই সময়টার জন্য আমি নিজেকে প্রস্তুত করেও রেখেছি।ছোট তো আবেগটা বেশি।চিন্তা করিস না আমি ওকে বোঝাবো।তোর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্যায় আবদারটা আমি করবো না।"
"আমার উপর তোর অনেক অভিযোগ তাইনা উৎসব?"
"না।ভালো না বাসতে পারলে কি করবি?মনের বিরুদ্ধে গিয়ে হয়তো সব করা যায় কিন্তু কাউকে ভালোবাসা যায় না।আমি জানি তোকে বললে তুই হয়তো ঊষার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাবি।হয়তো তোরা বিয়ে করবি, সংসার করবি কিন্তু তুই মন থেকে কখনো ওকে ভালোবাসতে পারবিনা।ঊষা ছোট।ও ভাবছে এতেই সুখ।কিন্তু এক সময় তোর থেকে সত্যিকারের ভালোবাসা না পাওয়াই ওর জীবন কে বি*ষাক্ত করে তুলবে।"
প্রভা শুধু চুপচাপ বসে ওদের দুজনের কথা শুনছে।নির্ভীকের এত আত্মবিশ্বাসের কারণটা এবার ওর কাছে স্পষ্ট হলো।উৎসব নিজের বোনকে কষ্ট দেবে কিন্তু তবুও নির্ভীক কে কষ্ট দেবে না।প্রভা এবারে অন্তত নিশ্চিত হলো যে উৎসব অন্তত কখনো নির্ভীক কে জোর করবে না।কিন্তু ঊষার জন্য খারাপ লাগছে।মেয়েটা খুব ভালো।যদি নির্ভীক ওকে ভালোবাসতো তাহলে প্রভা নিঃশব্দে ওদের দুজনের মাঝ থেকে চলে যেত।কোন সম্পর্কে সে তৃতীয় ব্যক্তি হতে চায় না।কিন্তু এখানে তো ওদের মাঝে কোন সম্পর্কই নেই।সে দিক থেকে ধরলে প্রভা আর নির্ভীকের মাঝেও কোন সম্পর্ক নেই।কিন্তু তাও নির্ভীকের কয়েকটা আচরণ দেখে মনে হয় যে ও প্রভাকে পছন্দ করে।"
ওদের কথাবার্তার মাঝে সেখানে তিসান এলো।তিসান কে দেখতে পেয়ে প্রভা আর নির্ভীক অবাক হলেও উৎসব একটুও অবাক হল না।কেননা আসার সময় ওই তিসানকে আসতে বলেছে।
"কি খবর দেবদাস?"
উৎসবের এমন প্রশ্নে তিসান কিঞ্চিৎ হেসে বলল,
"নতুন নাম দিয়ে দিলে ভায়া?"
"হ্যাঁ আজ থেকে তুমি দেবদাস।তোমার প্রিয়ুর দেবদাস।"
উৎসবের মুখ থেকে এমন কথা শুনে ভরকালো তিসান।আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে অগোছালো কন্ঠে বলল,
"এসব আবার কোন ধরনের সম্বোধন বড় লোকের বাচ্চা?আমি প্রিয়ুর দেবদাস হতে যাব কেন?সে তো তোমার বন্ধু কিছুদিনের মাঝে ওর দেবদাস হয়ে যাবে।"
তিসানের এই কথাটা শুনে তিনজনে একযোগে বলে উঠলো,
"কোন বন্ধু?"
কথাটা বলে তিনজন তিনজনের দিকে তাকালো।ওদের কৌতুহল দেখে তিসান হেসে উঠে বলল,
"জানার দেখছি খুব আগ্রহ!কিন্তু কষ্ট পেলাম এটা ভেবে যে তোমরা কোন বন্ধু সেটা আন্দাজ করতে পারলে না।এই যে বড় লোকের বাচ্চা তোমার টুনির বাপ সেই বন্ধু।"
"এ্যা।টুনির বাপ তোমার প্রিয়ুর দেবদাস?এ ভাই মাথা ঘুরায়ো না প্লিজ।আসল দেবদাসটা কে সেটা একটু ভালো করে বলতো।"
"আরে ভায়া আমাদের নির্ভয় প্রিয়ুর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।কিন্তু বেচারা বুঝতেও পারছে না যে জীবন ওকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে যে ও চেয়েও সাঁতরে কুল খুঁজে পাবে না।যে প্রেমের পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে সেই পানিতে না ওকে ডুবে ম/রতে হয়।"
তিসানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে নির্ভীক চিন্তিত কন্ঠে বলল,
"এমনটা কেন বলছো ভাই?"
"প্রিয়ুর পরিবার সম্বন্ধে তোমাদের কোন আন্দাজ নেই।তার থেকেও বড় কথা ওর বাপ ভাইয়ের যত্নের কোন সীমা নেই।ভার্সিটিতে পড়া একটা মেয়েকে ওরা কোলের বাচ্চার মতন যত্ন নেয়,আদর করে।এত সহজ না ওকে পাওয়া।ওকে পাওয়া যদি এত সহজে হতো........."
"তাহলে আপনি পেয়ে যেতেন তাইতো?"
প্রভার কথায় চমকে উঠল তিসান।বুঝতে পারছেনা সবাই কি করে এই ব্যাপারটা ধরে ফেলল।সেই এক বিষয় নিয়ে ঘুরে ফিরে প্রশ্ন করছে সবাই।
"তোমাদের সবার কি হয়েছে বলোতো?প্রিয়ুর সাথে আমাকে জড়াতে উঠে পড়ে লেগেছো কেন তোমরা?"
নির্ভীক আলতো হেসে বলল,
"যে আগে থেকেই জড়িয়ে আছে তাকে আমরা নতুন করে কি জড়াবো?তোমার কি মনে হয় শুধু তুমি একাই বাকি সবার গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখো?চোখ কিন্তু আমাদেরও আছে।কার চোখে কাকে হারানোর হাহাকার আছে সেটা ঠিকই বুঝতে পারি আমরা।সেদিন তোমার অস্থিরতা,নিজের ত্রুটিগুলো আড়াল করার চেষ্টা,ওনার কথা ফেলতে না পারা আমাদের অনেক কিছুই বলে দিয়েছে ভাই।"
"বুঝলে তো মা/রা খাওয়া প্রাণী আমরা সব ধরে ফেলেছি।আচ্ছা এখন সত্যি করে একটা কথা বলোতো ওই কি তোমার মা/রা খাওয়ার কারণ?"
তিসান মৃদু রাগ দেখিয়ে বলল,
"তোমরা অযথা নিজেদের মনের মতন করে গল্প বানাচ্ছো।এমন কোন ঘটনাই নেই।আরে কতদিন পর ওর সাথে দেখা হল জানো?কোন যোগাযোগই ছিল না আর তোমরা উল্টাপাল্টা কাহিনী বানিয়ে নিচ্ছো।"
"যোগাযোগ ছিল না নাকি আপনি ইচ্ছে করে রাখেননি ভাইয়া?সেদিন আমাকে যার কথা বললেন প্রেয়না আপু কি সেই মেয়েটা?ওনার জন্যই কি আপনি রাজনীতি ছেড়েছেন?তারপরে বাধ্য হয়ে কোন এক সময় ওনাকেও ছাড়তে হয়েছিল?প্লিজ ভাইয়া বলুন না, আমরা আমরাই তো।আমরা কাউকে বলবো না প্রমিস করছি।"
তিসানের সবকিছু কেমন তালগোল তাকিয়ে যাচ্ছে।এরা বুঝলো কি করে ওর মনের কথা?কেউ যেন কোন কিছু টের না পায় সেজন্য তো সবসময় স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করেছে।তবে কি ও ব্যর্থ হল?প্রেয়না কে দেখার পর কি নিজের অনুভূতিগুলোকে ঠিকঠাকভাবে লুকিয়ে রাখতে পারেনি?
তিসানের নীরবতার মাঝে নির্ভীক বলে উঠল,
"কথাটা কি এতটাই গোপন যে আমাদেরকেও বলা যায় না?সারা দুনিয়া থেকে দুঃখ পেয়ে আমরা নিজেদের মাঝে সেগুলো ভাগ বাটোয়ারা করে একটু সুখে থাকার চেষ্টা করি।এত গোপনীয়তা তো কখনো ছিল না আমাদের মাঝে।তবে আজ তোমার সংকোচের কারণ কি?ব্যর্থতা কি আমাদের যে তুমি বলতে পারছ না?"
"না নির্ভীক।কি বলছো এসব?তোমরা আমার বন্ধু।যে কথাগুলো নিজের মা-বাবাকে বলতে পারিনা সেগুলো তোমাদেরকে বলি।নিজেদেরকে দোষারোপ করো না। ব্যর্থতা আমার,আমি অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করতে চাই না।"
তিসানের কথায় উৎসব ওকে হালকা ঝাড়ি দিয়ে বলে উঠল,
"রাখো তো তোমার প্রকাশ করতে চাও না।তুমি খুব ভালো করেই জানো যে তুমি না বললে এরা সবাই তোমাকে ছেড়ে দিলেও আমি ছাড়বো না।তাড়াতাড়ি শুরু করো তো।"
তিসান বুঝলো এদের থেকে ছাড়া পাওয়ার কোন উপায় নেই।না বললেও কষ্ট পাবে।বলতে আবার তিসানের কষ্ট হবে।নিজের কষ্টের ওপর বাকিদের কষ্টকে প্রাধান্য দিল।
"কি শুনতে চাও বলো?"
সর্বপ্রথম প্রভা প্রশ্ন করলো।
"প্রেয়না আপুকে আপনি ভালোবাসেন তাই না?আমাকে সেদিন যার কথা বলেছিলেন উনি সেই নারী তাইতো?"
তিসান একটা হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,
"হ্যাঁ।"
"নিজের মনের কথা কখনো ওনাকে বলেননি?"
"সময় আর পরিস্থিতি কোনটাই আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি।"
"এখনো ভালোবাসো ভাই?"
প্রশ্নটা নির্ভীক করল।নির্ভীকের সেই প্রশ্ন শুনে তিসান আলতো হাসল।অনুধাবন করতে পারলো যে দূরত্বটা কতটা বেড়ে গেছে যে ওকে অন্যরা প্রশ্ন করছে আজও ভালোবাসে কিনা।সবটাই কেবল অতীত।এই ভালোবাসার না বর্তমান আছে না কোন ভবিষ্যৎ শুধু আছে ধুলো জমানো অতীত।
"তাকে তো এক দু দিনের জন্য ভালোবাসিনি ভায়া।সারা জীবনের জন্য তাকে ভালোবেসে ছিলাম।সে আমার জীবনের অতীত,বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সবটা।আর আমি তার জীবনের কেবল এক সাধারণ চরিত্র।"
পাশ থেকে উৎসব প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
"ইশরাকের সাথে ঝামেলার ব্যাপারটা কি এই বিষয়টার সাথে কোনভাবে জড়িত?এটাই কি তোমার কোন দুর্বলতা?এছাড়া তো আর কিছু চোখে পড়ছে না আমার।"
তিসান একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
"হ্যাঁ এটাই আমার দুর্বলতা।কখনো কোন পিছুটান ছিল না,কোন দুর্বলতা ছিল না।ওই মেয়েটা তিসান শিকদারের পিছুটান হয়ে দাঁড়িয়েছিল।সব থেকে বড় দুর্বলতা ছিল ওই মেয়েটা।তাকে ভালোবেসে আমার ধ্বংস হয়েছে।আর আমি সেই ধ্বংসকেই ভালোবাসি।তাকে ভালোবেসে যদি আমায় জীবনটাও বিলিয়ে দিতে হয় তবু আমি হাসি মুখে বলব যে আমি তারপরেও তাকেই ভালোবাসি।"
উৎসব নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
"ম/রার ভালোবাসা রে!এইজন্যে আমি এসব প্রেম ভালোবাসার মাঝে যাইনা।"
"তোমার কি মনে হয় আমি যেতে চেয়েছিলাম?সেই মেয়েটা আমায় তাকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছে।ছোটবেলায় যখন আমরা একই বাড়িতে থাকতাম সারাদিন আমার পিছু পিছু ঘুরত।তিসান ভাই,তিসান ভাই বলে সারা বাড়ি মাথায় তুলে রাখতো।মেয়েটা বড্ড সরল।কোন জটিলতা,প্যাঁচ নেই ওর মনের মাঝে।ওর পুরো গুষ্টি অহংকারে ভরা অথচ ওই মেয়েটার মনে কোনো ভেদাভেদ নেই।"
"ইশরাকের সাথে ঝামেলা হয়েছিল কি নিয়ে সেটা আগে বল?"
"এক এক করে বলি?"
"আচ্ছা বেশ বলো।"
"প্রিয়ুর একটা ভাই আছে প্রয়াস।আমরা দুজনে সমবয়সি।ছোটবেলা থেকে ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল।সে কি ভালোবাসা!সেদিন গুলো ভোলার মতন না।তোমার আর নির্ভীকের বন্ধুত্ব যেমন আমাদের বন্ধুত্বটা ঠিক তেমনি ছিল।না তোমাদের সাথে তুলনা দিয়ে হয়তো ভুল করলাম।তোমরা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসো একে অপরকে আর ও ছিল স্বার্থপর বেঈমান।"
উৎসব গর্বের সাথে বলল,
"তাতো অবশ্যই।আমার ভাইয়ের মতন আর কেউ হবে না।"
তিসান আলতো হেসে বলল,
"আফসোস আমি একটা নির্ভীক পেলাম না।আগে ওদের থেকে আমাদের আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো ছিল।আমার চাচা ওর স্কুলের বেতন দিতে পারতো না, বই খাতা কিনে দিতে পারতো না,আমার বাবা দিতা।অথচ ওই শা/লা বেই/মান বড়লোক হওয়ার পর আমাকে ভুলে গেল।শা/লা এমন ভাব করতো আমি ওর চাকর হওয়ারও যোগ্য না।"
কথার মাঝে একটু বিরতি নিয়ে তিসান পুনরায় বলা শুরু করলো,
"পড়ালেখায় আগে থেকেই ভালো ছিলাম।ঢাকার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পেয়েছিলাম।আমি পরীক্ষায় দিতে চাইনি ঢাকার বাইরে কোন পাবলিকে কিন্তু বাবা-মায়ের জোরাজুরিতে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম।চান্স পাওয়ার খবরটা কাউকে জানাইনি।"
প্রভা আৎকে উঠে বলল,
"কেন ভাইয়া?একটা সিট পাওয়ার জন্য সবাই কান্নাকাটি করে আর আপনি চান্স পেয়েও ভর্তি হননি!"
তিসান আলতো হেসে আনমনে বলল,
"তাকে একদিন না দেখেও থাকতে পারতাম না।তাকে ছেড়ে এতটা দূরে আমি কখনোই যেতে চাইনি।ভয় হতো যদি আমি চলে যাওয়ার পর ওর জীবনে অন্য কেউ চলে আসে।যদি আমাকে আমার প্রিয়ু ভুলে যায়।খুব ভালোবাসি ওকে।খুব ভালোবাসি।আমার কথাগুলো শুনে তোমাদের হাসি পাচ্ছে তাই না?"
নির্ভীক হালকা রাগী কন্ঠে বলল,
"তুমি কি আমাদের কৌতুক শোনাচ্ছো যে হাসি পাবে?তোমার চোখ দুটো তো টলমল করছে।আর আমরা সেখানে পাগ/লের মতন হাসবো।"
তিসান অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শার্টের হাতায় নিজের চোখ দুটো মুছে নিল।বরাবরের ন্যায় মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
"আজ তোমাদের আমার দুর্বলতা টা দেখিয়ে দিলাম।যাক গে তারপর ভর্তি হলাম এই কলেজে।বাড়িতে কথা শুনতে হতো ভালো কলেজে চান্স না পাওয়ার জন্য কিন্তু সেসব মুখ বুজে সহ্য করে নিতাম।দিনশেষে ওর মুখের একটা মিষ্টি হাসি দেখে সব ভুলে যেতাম।প্রয়াস কে আমি সব বলতাম।একদিন হুট করে ওকে প্রিয়ুর কথাটাও বলে দিলাম।ওর দিক থেকে তখন একটু দূরত্ব তৈরি হলেও বন্ধুত্বটা ভালোই চলছিল।"
"শা/লা বেই/মান নিশ্চয়ই বেই/মানি করেছে তাই না?"
উৎসবের কথার প্রেক্ষিতে তিসান এবার শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
"না তখনও বেই/মানি করেনি।বরং ও আমাকে খুব ভালো একটা সংবাদ দিয়েছিল।"
প্রভা কৌতুহলী কন্ঠে বলল,
"কি সংবাদ?"
"আমার বাবা নাকি অনেক আগেই চাচাকে বলে রেখেছিল আমার সাথে প্রিয়ুর বিয়ে দেওয়ার কথা।চাচাও প্রথমে রাজি ছিল।কিন্তু ততদিনে অবশ্য ওনার সেই ইচ্ছাটা বেশ অনেকটাই ম/রে গেছে।কিন্তু কেন জানি প্রয়াস একটু একটু চাইছিল আমার হাতে ওর বোনকে তুলে দিতে।কিন্তু ও আমায় শর্ত দিয়েছিল যে আমাকে আগে ভালো একটা কিছু করতে হবে।নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।আমি যদি ভালো কোন চাকরি পাই তাহলে ও নিজে দায়িত্ব নিয়ে প্রিয়ুর সাথে আমার বিয়েটা দেবে।"
"বাহ্ বেশ ভালো বলেছিলেন তো।শুনে তো মনে হচ্ছে উনি মানুষটা এতটাও খারাপ ছিলেন না।"
"ছিল না তো খারাপ।কিন্তু ওর দেওয়া কথাটা কথা হয়েই থেকে গেল।তারপর রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লাম।কেউ অবশ্য জানতো না এই বিষয়ে।একদিন প্রয়াস জেনে গেল।একে একে বাড়ির সবাই জানতে পারলো।প্রচুর বকা খেলাম।সে একদিন গুটি গুটি পায়ে আমার ঘরে এসে বলল যে আমি এসব রাজনীতি কেন করি?সবাই বকা দিচ্ছে এর জন্য।ওর নাকি রাজনীতি একটুও পছন্দ না।আমায় ছেড়ে দিতে বলল।"
উৎসব বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
"তারমানে ওনার কথায় তুমি রাজনীতি ছেড়েছিলে?"
"হুম।জানিনা কি হলো আমার।ওর এক কথায় ছেড়ে দিলাম।প্রয়াসও বলেছিলো রাজনীতিবিদের হাতে ওর বোন কে তুলে দেবেনা।ছেড়ে দিলাম রাজনীতি।একটুও কষ্ট হয়নি।কেননা তখনও আমার প্রিয়ু কে পাওয়ার আশা ছিল।কিন্তু ভুল করেছিলাম।হুট করে এভাবে ছেড়ে দেওয়া উচিৎ হয়নি।ইশরাকের সাথে তুমুল ঝামেলা চলছিলো।প্রচুর ক্ষোভ জমে ছিল আমার ওপর ওর।ও বরাবরই ঠান্ডা মাথায় খেলে।আমার বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।"
নির্ভীক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"তোমার মতন বিচক্ষণ মানুষ কি করে এত বড় ভুলটা করলো ভাই?"
"প্রেম ভালোবাসায় বিচক্ষণতা দিয়ে কাজ হয় না ভায়া।ভালোবাসা তোমায় অসহায় বানিয়ে ছাড়ে।একদিন আমার বাড়ির সামনে প্রিয়ুর সাথে ইশরাক আমায় দেখে ফেলে।বৃষ্টি হচ্ছিল তো তাই ওকে বাড়িতে নিয়ে যাই।জানিনা ও কিভাবে কি বুঝেছিল।পরেরদিন যখন আমি কলেজে আসি প্রিয়ুর সাথে আমাকে জড়িয়ে এমন কিছু জঘন্য কথা বলে যেগুলো আমার সহ্য হয়নি।ও চালাকি করেছিল আর আমি বোকামি।"
উৎসব অসহায় কন্ঠে বলল,
"তারপর পে/টালে ওকে তাই তো?"
"হুম।নিজের ভালোবাসার মানুষটা সম্পর্কে কোনো পুরুষই সেসব কথা সহ্য করতে পারবে না।ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে ক্যাম্পাসের ভিতরেই ওকে আচ্ছা মতো পি/টিয়ে/ছিলাম।আর ও চুপচাপ আমার হাতে মা/র খেয়েছিল।একবারও আমায় পাল্টা মা/রার চেষ্টা করেনি আর না ওর দলের ছেলেরা আমায় আটকাতে এসেছিল।"
প্রভা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
"কি এমন বলেছিল আপনাকে ভাইয়া যে আপনি এতটা রেগে গেলেন?"
"বলেছিল ওর কাছে নাকি প্রিয়ুর ছবি আছে।সব খোঁজখবর নিয়েছে।এখন ছবির সাথে কি করতে পারে সেটা নিশ্চয়ই আমায় আলাদা করে তোমাদের বোঝাতে হবে না?ওই মেয়েটার তো তখনো এত জটিলতা সম্পর্কে ঠিকঠাক জ্ঞানই হয়নি।সমাজে ওর বাবার অনেক নাম ডাক।ওর বাবা বিশ্বাস করলেও ওর ভাই ওকে বিশ্বাস করতো কি না এই নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ ব্যাপারটার সাথে আমিও জড়িত ছিলাম।আমাকে জড়িয়েই ইশরাক হুমকি দিয়েছিল।"
প্রভা ঘৃণা ভরা কন্ঠে বলল,
"আসলেও যে উনি একটা অমানুষ সেটা আজ স্পষ্ট প্রমাণ পেলাম।"
"হুম।আর আমি জানতাম আমার ওপরে রাগ থেকে ইশরাক সব করতে পারে।যাকে ভালোবাসি তাকে বদনাম হতে দেই কি করে?ও প্রিয়ু কে প্রাণে মারার হুমকি দিয়েছিল।বলেছিল ওকে তুলে আনতেও ওর বাঁধবে না।ইশরাকের হাতে তখন ক্ষমতা ছিল।সেদিন ওকে মা/রার পর কতৃপক্ষ আমায় ডাকে।কিন্তু তার আগে ইশরাক আমায় ডেকেছিল।"
"আপনি গিয়েছিলেন?"
"না গিয়ে কোনো উপায় ছিল না।সেই প্রথম ইশরাক কে আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলাম।এবং ইশরাক ওই প্রথম নিজের দেওয়া কথাটা রেখেছিল।"
উৎসবের আর ধৈর্য কুলচ্ছে না।তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল,
"ভাই তাড়াতাড়ি বলোতো।টান টান উত্তেজনার মূহুর্ত এটা।"
"ও জানতো আমার ছাত্রত্ত্ব বাতিল করা হতে পারে।আমি যদি নিজের পক্ষে কিছু না বলি ব্যাপারটা আরো সহজ হবে।সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে নিয়ে নেই।বলি যে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে ইশরাক কে মেরেছিলাম।ইশরাক কথা দিয়েছিলো যে আমি স্বীকার করে নিলে ও প্রিয়ুর কোনো ক্ষতি করবে না।মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।"
"এটা কেন করলেন ভাইয়া?ওনার পরিবার কে তো বলতে পারতেন।ওনার সিকিউরিটির ব্যবস্থা করতে পারতো।"
তিসান হালকা হেসে বলল,
"রাজনৈতিক শক্তির সাথে পেরে উঠা অতই সহজ?কতদিন ওরা চোখে চোখে রাখতো?ওর কথা যদি না শুনতাম ওর রাগ আরো বেড়ে যেত।ওদের করা একটা ছোট্ট ভুল প্রিয়ুর জীবনটা শেষ করে দিতে পারতো।ওর কিছু হয়ে গেলে আমি কি করে বাঁচতাম?"
"কিসের বাঁচা মা/রার কথা হচ্ছে এখানে?"
হুট করে প্রেয়নার কন্ঠ পেয়ে সবাই চমকে উঠলো।নির্ভয় আর প্রেয়নাকে দেখে সবাই ভীষণ অবাক হলো।তিসান বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
"তুমি এই সময়ে এখানে কি করছো?"
"কেন তুমি খুশি হওনি আমি আসাতে?"
"এই অসময়ে এসেছো তাই জিজ্ঞেস করলাম।"
পাশ থেকে নির্ভয় বলে উঠলো,
"আমরা তো বাড়ি ফিরছিলাম তখন উৎসব ফোন করে এখানে আসতে বললো।উনি আমার সাথেই ছিলেন তাই আসতে চাইলেন।"
নির্ভীক,প্রভা আর তিসান তিনজনেই বিরক্তিকর দৃষ্টিতে উৎসবের দিকে তাকালো।যদি ওরা শুনে ফেল তো কোন কথা তাহলে কি হতো?তার থেকেও বড় কথা ওরা আসার জন্য পুরো ঘটনাটাও শুনতে পেল না।
উৎসবের ওপর থেকে মনোযোগ সরিয়ে তিসান উঠে দাঁড়ালো।সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"আমি বরং আসি।একটা দরকারি কাজ আছে।"
"আর একটু থেকে যাও।আমি তো এখনই এলাম একটুও কথা হলো না তোমার সাথে।"
প্রেয়নার কথার প্রেক্ষিতে উৎসব বলে উঠলো,
"যেতে দিন ওনাকে।বেশি কথা বলা শরীর স্বাস্থ্যের জন্য ঠিক না।"
"কম কথা বলাও শরীরের জন্য ঠিক না।তিসান ভাই থেকে যাওনা।তুমি থাকলে ভালো লাগবে।"
"জোর করো না প্লিজ।তোমার অনুরোধ ফেলতে আমার কষ্ট হয়।অন্য কোনো সময় কথা বলবো।আজ থাকতে পারবো না।"
প্রেয়নাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিসান চলে গেল।এতগুলো কথা বাকিদের কে বলার পর কেন যেন ওদের সাথে চোখ মেলাতে পারছেনা।সবার উপস্থিতি তে প্রেয়নার সাথে কথা বলতেও অস্বস্তি হবে।সব থেকে বড় কথা নির্ভয়ের সাথে প্রেয়নাকে দেখতে পারবে না।কেন যেন খুব কষ্ট হয়।হাঁটতে হাঁটতে তিসান সিগারেট ধরালো।মন তার দুঃখে ভরপুর অথচ মুখে হাসি।অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে বুকে তাও সে হাসছে।সিগারেটটা শেষ হতেই অবশিষ্ট অংশটুকু ফেলে দিল।পকেটে হাত গুঁজে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে বলল,
"তুমি ভালো থেকো অন্য কারো বাহুডোরে!আমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাব না হয় ঘোর আধারে!তুমি ভালোবেসো তাকে যে তোমায় ভীষণ ভালোবাসে।যত্নে তার ভালোবাসা লুকিয়ে রেখো তোমার হৃদয়ের মাঝে।আমি না হয় দূর থেকে তোমায় দেখে যাব,তোমার জন্য যত্নে বকুল ফুলের মালা গাঁথবো।দিনভর রোদের তাপে পুড়ে যাওয়া সেই শুকনো বকুল ফুলের মালাটাকে জলে ভাসিয়ে দেবো কোন এক সাঝেঁ।তুমি জানবে না,তুমি ফিরবে না।শুধু আমি জানবো আমি তোমায় ভালোবাসি।সারা পৃথিবী ঘুরে এসেও শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।"