ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ১৬

🟢

"বাবা আসবো?"

ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে দরজার দিকে তাকালেন প্রবীর শিকদার।মেয়েকে দেখতে পেয়ে তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।

"আমার ঘরে আসতে তোমার অনুমতি নিতে হবে না মামনি।ভিতরে এসো।"

প্রেয়না গুটিগুটি পায়ে ভেতরে এসে বিছানার ওপর বসলো।কাচুমাচু করে বলল,

"তোমায় একটা কথা বলার ছিল বাবা।"

"বলো।"

মেয়ের আচরণ দেখে প্রবীর শিকদার বুঝলেন যে মেয়ে তাকে বলতে ভয় করছে।সহসা এগিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

"আমি কি তোমায় কখনো বকেছি?"

প্রেয়না দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো।

"তাহলে আমায় বলতে ভয় পাচ্ছো কেন?"

"জানিনা কিন্তু ভয় লাগছে।যদি তুমি রাগ করো।"

"করবো না।আমার মেয়ের উপর যে আমার ভরসা আছে।আমি জানি আমি রাগ করি এমন কোন কিছু আমার মেয়ে বলবে না।"

প্রেয়না একটু সাহস পেল।ধীর কণ্ঠে বলল,

"আসলে বাবা আজ না একটা জায়গায় যাব আমার কয়েকটা বন্ধুর সাথে দেখা করতে।তুমি যেতে দেবে?"

"কোথায় যাবে দেখা করতে?"

"জায়গার নাম তো জানিনা তবে মনে হয় কোন ক্যাফেতে যাব।যাই না বাবা প্লিজ!আমি তো কখনো জেদ করিনি বলো আজ প্রথম যেতে চাইছি।তুমি আর না করো না।দেখো আমার কোন বন্ধু নেই।সারাদিন বাড়িতে থাকতে আর পড়াশোনা করতে আমার ভালো লাগে না।প্লিজ বাবা আজকে পারমিশন দাও।"

প্রবীর শিকদার মনোযোগী ভঙ্গিতে বেশ কিছুক্ষণ কোন একটা বিষয় নিয়ে ভাবলেন।মেয়ের অনুরোধ তিনি কখনো ফেলতে চান না।মেয়ের কোন ইচ্ছেও তিনি অপূর্ণ রাখতে চান না।তার মেয়ে তার কাছে যত আবদার করে তার যেন তত ভালো লাগে।কিন্তু বাইরে কোথাও যাওয়ার অনুমতি একা একা তিনি কখনোই তার মেয়েকে দেননি।কিন্তু আজ কেন যেন মেয়ের অনুরোধ টা ফেলতে মন চাইলো না।সত্যিই তো একটা মানুষ আর কতই বাড়িতে থাকতে পারে।সবারই তো অন্তত হাতেগোনা কয়েকটা বন্ধু প্রয়োজন যাদের সাথে একটু মন খুলে গল্প করা যায়।

আলতো হেসে প্রেয়না কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"ঠিক আছে দিলাম অনুমতি।"

প্রেয়না বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"সত্যি বাবা?"

"দেখো মামনি তুমি বড় হয়েছো।কোন বিষয়ে আমি এখন তোমাকে আর জোর করতে পারি না।আমি শুধু তোমাকে আমার মতামত টা জানাতে পারি।আমি তোমাকে এখন পরামর্শ দিতে পারি,ভালো খারাপ পথটা দেখাতে পারি কিন্তু দিনশেষে কোন পথে যাবে সেই সিদ্ধান্তটা তোমাকেই নিতে হবে।কেননা সারা জীবন তোমার বাবা তোমার সাথে থাকবে না।আসলে দোষটা তোমার না দোষটা হয়তো আমারই।আমি সব সময় তোমায় নিয়ে বেশি চিন্তায় থেকেছি সেজন্য তোমাকে সবসময় নিজের চোখে চোখে রেখেছি।যেখানে গিয়েছো আমি নিজে নিয়ে গিয়েছি।এখন তোমাকেও একটু স্বাধীনতা দেওয়া দরকার হয়তো।"

প্রেয়না একটু ভয় পেলে।ভাবলো হয়তো ওর বাবা রাগ করেছে।

"আমি অতো স্বাধীনতা চাইনি বাবা।আসলে একটা দিনই একটু যেতে চাইছিলাম ভালো লাগছিল না বাড়িতে তাই।তুমি না চাইলে আমি সত্যি যাবো না।আর কখনো বলবোও না।বিশ্বাস করো একটুও মন খারাপ করবো না।"

প্রবীর শিকদার হাসলেন।মেয়েটা যে ওনার প্রাণ।সেই প্রাণের যেন কোন ক্ষতি না হয় সেই ভয়েই তো সব সময় আগলে আগলে রেখেছেন।হ্যাঁ প্রেয়নার জীবনে হয়তো স্বাধীনতা ছিল না কিন্তু ভালোবাসার কোন অভাব রাখেননি।ওর আনন্দের জন্য যখন যা প্রয়োজন হয়েছে তিনি এনে দিয়েছেন শুধু একা একা কোথাও যাওয়ার অনুমতি দেননি।

"আমি রাগ করিনি মামনি।আমি মন থেকে তোমায় কথাটা বলেছি।জীবন তো একটাই।একটু মন খুলে বাঁচা দরকার।আজ থেকে আমি তোমায় অনুমতি দিলাম। তুমি চাইলে বাইরে তোমার বন্ধু বান্ধবের সাথে দেখা করতে পারো।আমাকে আর জিজ্ঞেস করতে হবে না।"

একের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায় প্রেয়নার বিস্ময়ের মাত্রা ছাড়িয়া গেল।প্রবীর শিকদার যে আজকে যেতে দেবেন সেটাই তো কখনো ভাবেনি সেখানে সব সময়ের জন্য ওকে অনুমতি দিয়ে দিল।এটাও সম্ভব!আবার বলছেন জিজ্ঞাসাি করতে হবে না।সন্দেহী কন্ঠে প্রশ্ন করল,

"আমি সত্যি যখন ইচ্ছে আমার বন্ধুদের দেখা করতে পারব?"

"আমার মামনি কে আশা দেখিয়ে কি আমি আবার সেটা ভাঙবো?তাহলে তো আমার মামনি কষ্ট পাবে। তোমাকে তো আমি কষ্ট দিতে পারি না।সত্যি তোমায় অনুমতি দিলাম।"

প্রেয়না জড়িয়ে ধরলো নিজের বাবাকে।উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,

"থ্যাংকস বাবা।তুমি খুব ভালো।এইজন্য আমি তোমায় এত ভালোবাসি। "

"বুঝলাম।শুধু নিজের খেয়াল রাখবে।আর গাড়ি নিয়ে যাবে তো?"

"আমি গাড়ি করে যাব আর ওরা এমনি এমনি আসবে সেটা কেমন দেখায় না?একটা দিন ওদের সাথে একটু সিএনজিতে যাই না?"

"ঠিক আছে।তবে সাবধানে চলাফেরা করবে।"

"আচ্ছা ঠিক আছে।এখন আসছি দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।"

প্রেয়না চলে যেতে নিলে প্রবীর শিকদার ওকে পিছন থেকে ডাকলেন।প্রেয়না থামতেই উনি এগিয়ে গিয়ে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে প্রেয়নার হাতে দিয়ে বললেন,

"যত টাকা খরচ করার দরকার হয় নির্দ্বিধায় করবে।যদি আরো দরকার হয় তাহলে আমায় বলো।"

"না বাবা আর লাগবে না।আসছি।"

কথাটা বলে প্রেয়না সেখান থেকে চলে গেল।প্রবীর শিকদার মেয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে হাসলেন।তার মেয়েটা যে এত বড় হয়ে গেছে সেটা যেন তার বিশ্বাসই হয় না।আজ প্রথম মেয়েটাকে একটু স্বাধীনতা দিলেন। এতদিন মেয়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন।আজ বাঁধন টা একটু আলগা করে দিলেন।আর তার বিশ্বাস আছে তার মেয়ের উপর যে তার এই সিদ্ধান্তটা ভুল হবে না।

_________________

"আচ্ছা নির্ভয় আপনার বন্ধুদের সামনে নিয়ে গিয়ে আমাকে কি বলে পরিচয় দেবেন?"

প্রেয়নার প্রশ্ন শুনে নির্ভয় হালকা হেসে বলল,

"আপনার সাথে আমার সম্পর্কটা যা তাই বলে পরিচয় দেব।আমার বন্ধু।আর তো কোন সম্পর্ক নেই পরিচয় দেয়ার মতন তাই না?"

"যদি ওরা জিজ্ঞাসা করে আমাকে কেন নিয়ে এসেছেন তাহলে কি বলবেন?"

"ওদের সাথে আলাপ করাতে নিয়ে যাচ্ছি সেটাই বলবো।"

"আচ্ছা এটা অদ্ভুত লাগবে না শুনতে?মানে আপনি আমাকে আপনার বন্ধুদের সাথে আলাপ করাতে নিয়ে যাচ্ছেন যেন ওরা আমার বন্ধু হয়ে যায় একটু অদ্ভুত না?খাপ ছাড়া লাগছে কি ব্যাপারটা?"

প্রেয়নার কথায় নির্ভয় এবার শব্দ করে হেসে ফেলল।

"এত ভাবছেন কেন?আগে চলুন যাই তারপর না হয় কোনটা কি লাগছে সেটা ভাবা যাবে।"

প্রেয়না আর কিছু বলল না।বাকিটা পথ চুপচাপ ভাবতে ভাবতে গেল যে ওখানে গিয়ে কি করে সবার সাথে মিশবে।

ভাবতে ভাবতেই গাড়িটা গন্তব্যে পৌঁছালো।ছোট্ট চায়ের দোকানটায় তখন সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছে।ক্লাস শেষে এই জায়গাতে বসে সবাই আড্ডা না দিলে যেন দিনটা কাটতে চায় না।এখন তো ওদের সাথে নতুন করে প্রভা আর সৌমিও যোগ দিয়েছে।যদিও আজ সৌমি নেই। ওর শরীরটা খারাপ লাগছিল তাই আজ কলেজে আসেনি।সেই জন্য প্রভা তাড়াতাড়ি চলে যেতে চেয়েছিল কিন্তু উৎসব একপ্রকার জোর করে ওকে ধরে রেখেছে।প্রভা থাকাতে অবশ্য আরো একটা মানুষ খুশি হয়েছে।কিন্তু নির্ভীক জোর করতে পারেনি।মন চাইছিল যেন থেকে যায়।প্রভা অবশ্য সে আশায় বেশ অনেকবার ওর দিকে তাকিয়ে ছিল কিন্তু কোন লাভ হয়নি।মানুষটা এতটাই রস কষ হীন যে জীবনেও প্রভাকে আবদার করে থাকতে বলবে না।

নির্ভয় আর প্রেয়নার উপর চোখ পড়লো সবার প্রথমে উৎসবের।তিসান তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে সিগারেট খাচ্ছে।প্রভা অনেক আটকানোর চেষ্টা করেছিলো কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।ফলস্বরুপ ঘুরে বসেই সিগারেট খাচ্ছে। নির্ভীক আর প্রভা তখন দুজনে টুকটাক নিজেদের মতন কথাবার্তা বলছে।এরই মাঝে নির্ভয়ের সাথে একটা সুন্দরী মেয়েকে আসতে দেখে উৎসব একটু চেঁচিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আরে টুনির বাপ তো দেখি টুনির মা কে নিয়ে আসছে।এই নির্ভীক,তিসান ভাই দেখো নির্ভয় ওর বউকে সাথে করে নিয়ে আসছে।"

উৎসবের কথায় তিসান পাত্তা দিল না।কেননা এই ছেলের কথার কোন ভরসা নেই।যখন যা বলতে ইচ্ছে করে তাই বলে দেয়।হুট করে বউ নিয়ে আসা কি সম্ভব যে তিসান বিশ্বাস করে নেবে?আর যেখানে এতো ভালো বন্ধু ওরা সেখানে এক বন্ধুর বিয়ে হয়ে যাবে আর খোঁজ পাবেনা এটা হতেই পারে না।পুনরায় সিগারেট টানতে লাগলো।কিন্তু উৎসবের কথায় নির্ভীক আর প্রভার কথার মাঝে বাঁধা পড়ল।উৎসবের হাত অনুসরন করে সেদিকে তাকিয়ে সত্যি নির্ভয়ের সাথে একটা মেয়েকে দেখে নির্ভীক কিঞ্চিত চমকালো।প্রভা অবশ্য তেমন একটা অবাক হয়নি।প্রেমিকা থাকতেই পারে এটা তো আর অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার না।নির্ভীক প্রশ্নাত্মক গলায় উৎসবকে জিজ্ঞেস করলো,

"এটা কে হতে পারে উৎসব?"

"এইটাও বুঝিস না।এত বড় হয়েছিস কি বা/ল কামে?মাথা ভর্তি তো কালা কালা বা/ল ঠিকই আছে কিন্তু বুদ্ধির বা/ল আর নাই।"

প্রভা বিরক্তিকর কণ্ঠে উৎসবকে বলল,

"আপনি কি কখনো ভদ্র ভাষায় কথা বলতে পারেন না? সামনে দেখছেন একটা মেয়ে বসে আছে অন্তত নিজের ইম্প্রেশন টা ঠিক রাখার জন্য হলেও তো একটু ভালো করে কথা বলতে পারেন নাকি?"

"ও মাস্টান্নি,আপনি আমার বউ,শালী না প্রেমিকা যে আপনার সামনে আমার ইমপ্রেসন ঠিক রাখতে হবে?এমন ভাব করছেন যেন আমাদের দুজনের মাখোমাখো প্রেম চলছে আর আমার এসব বা/ল-চ্যা/ট শুনে আপনি আর আমায় বিয়ে করবেন না।"

"আমি তো করবোই না,আর আপনার এসব ভাষা শুনে না কোন মেয়েই আপনাকে বিয়ে করবে না।সারা জীবন সিঙ্গেলই থাকতে হবে।"

উৎসব হাতের সাহায্যে চুলগুলো পিছন দিকে ঠেলে দিয়ে একটু ভাব নিয়ে বলল,

"এই উৎসব মির্জার এক ডাকে না পুরো কলেজের মেয়েরা চলে আসবে।আসলে আপনি আমাকে নতুন চিনলেন তো আমার ফ্যান ফলোয়ার সম্বন্ধে ঠিক ধারণা নেই।"

প্রভা ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

"জানি তো আপনার ফ্যান ফলোয়ার সম্পর্কে।ধারণা আছে আমার।ওই তো ইনবক্স থেকে সোজা বাথটবে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে।এর থেকে বেশি আর কিছু সম্ভব না।"

প্রভার কথায় উৎসবের মুখটা এবার বন্ধ হল।সত্যি এর থেকে বেশি আর কিছু সম্ভব না।কিন্তু বেশিক্ষণ তো মুখটা বন্ধ রাখা যায় না।এভাবে যখন অপমান করলো একটা উত্তর তো দিতে হবে উৎসবকে।কিন্তু সেই সুযোগ আর পেল না।তার আগেই নির্ভয় আর প্রেয়না চলে এলো।

নির্ভীক সবার প্রথমে নির্ভয় কে প্রশ্ন করলো।

"ইনি কে?"

উৎসব নির্ভীক এর দিকে বিরক্তকর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

"তোর মাথায় কি আসলেই কোনো বা/ল নাই নির্ভীক। আরে একটা প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সাথে একটা প্রাপ্ত বয়স্ক সুন্দরী মেয়ে কেন আসবে?অবশ্যই তার প্রেমিকা হলে। আরে এটা আমাদের টুনির মা।"

কথাটা বলে উৎসব বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রেয়না কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আসসালামু আলাইকুম ভাবি।আমি হলাম আপনার দুই নাম্বার দেবর।পছন্দ হয়েছে তো?"

নির্ভয়ের এখন ইচ্ছে করছে আচ্ছা মতো উৎসবকে পে/টাতে।মানুষ দুই লাইন বেশি বোঝে আর এই ছেলে সব সময় চার লাইন বেশি বোঝে।আর শুধু বুঝেই ক্ষান্ত থাকে না আশেপাশের সবাইকেও তার সেটা বোঝাতেই হবে।এদিকে উৎসবের মুখ থেকে এমন কথা শুনে প্রেয়নার এতটাই অস্বস্তি হচ্ছে যে ওদের দিকে ঠিক করে চোখ তুলে তাকাতেও পারছে না।মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হওয়া তো পরের কথা।নির্ভয় ক্ষিপ্ত কন্ঠে উৎসবকে উদ্দেশ্য করে বললাম,

"মুখের লাগাম টান......"

বিজ্ঞাপন

"ধুর শা/লা থাম তো।টুনির মা কথা বলে না কেন?বোবা নাকি রে?তা ভাই বোবা হলে প্রেম করলি কি করে তোরা?ইয়ে মানে প্রেম করতে গেলে তো জা/ন,সো/না, বাবু এসব বলে ডাকতে হয়।সেসব বলল কি করে টুনির মা?"

নির্ভয় যেন ভাষা হারিয়ে ফেলল।এই ছেলেটা এমন কেন?একটা অচেনা অপরিচিত মানুষের সামনে এমন অসভ্যদের মতন কথা বলে দেয় কি করে নির্দ্বিধায়?কথাগুলো বলল উৎসব কিন্তু বাকিরা যেন লজ্জা পেল।তিসান অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেই হাত বাড়িয়ে উৎসবের পিঠের শার্ট ধরে ওকে টেনে বসালো।গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

"এত বেশি কথা বলো কেন তুমি?আদৌ প্রেমিকা কিনা সেটাই তো জানো না।আর যদি সত্যি প্রেমিকা হয়েও থাকে তোমার এই কথাগুলো শোনার পর আমার মনে হয় না ওর প্রেমটা টিকবে।একটু চুপচাপ বসে থাকো তো ভায়া।অতিরিক্ত কথা বলো তুমি।তোমার জ্বা/লায় সিগারেটটাও শান্তি মত টানতে পারছি না।"

উৎসব পুনরায় কিছু বলতে যাবে তার আগেই প্রভা রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠলো,

"একদম চুপ।আপনি আর একটা কথাও বলবেন না। অসভ্য লোক একটা।কোথায় কি বলা দরকার,কতটুকু বলা দরকার সেটুকু আপনি এখনো শেখেননি।”

প্রভার কথায় সম্মতি জানিয়ে নির্ভয় রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠলো,

"একদম ঠিক বলেছ প্রভা।এই বে/য়া/দব টার সবকিছুতে বাড়াবাড়ি।ওনাকে আমি তোদের সম্পর্কে কত ভালো ভালো কথা বলে নিয়ে এলাম আর তুই এক নিমিষের মাঝে আমার সব কথাকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিলি।উনি এখন কি ভাববেন তোদের ব্যাপারে?"

নির্ভয়ের কথায় উৎসবের যায় এলো বলে মনে হলো না।প্রেয়না ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,

"ইটস ওকে আমি কিছু মনে করিনি।"

তিসান চোখ বন্ধ করে মনের সুখে সিগারেট খাচ্ছে আর খুব গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছিল।হুট করে পরিচিত কন্ঠস্বর কানে যেতে চট করে চোখ খুলে তাকালো।নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করল,

"আমি কি ভুল শুনলাম?"

কিন্তু তিসানের তো ভুল হবেনা।এই কন্ঠস্বরটা চিনতে তো তিসান কখনোই ভুল করতে পারে না।কালক্ষেপণ না করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।ঠিক কতগুলো দিন পর এমন সামনাসামনি আবার এই মুখটা তিসান দেখতে পেল তার হিসেব নেই।খুব সম্ভবত প্রায় দু থেকে তিন বছর পর দেখলো।হৃদস্পন্দনের গতি কয়েক গুণ বেড়ে গেল।তিসান যে কিছু বলবে সেটাও পারছে না।মুখ দিয়ে তার কোন কথা বের হচ্ছে না।শুধু ইচ্ছে করছে এভাবে তাকিয়ে থাকতে আর তাকিয়ে থাকার মাঝে যেন কোন বাঁধা সৃষ্টি না হয়।তিসানের তাকিয়ে থাকার মাঝেই প্রেয়নার দৃষ্টি ওর উপর পড়লো।প্রেয়নাও ঠিক একইভাবে চমকে উঠলো।সাথে তার মুখে হাসিও ফুটে উঠলো।উচ্ছসিত কণ্ঠে তিসান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"তিসান ভাই তুমি এখানে?কেমন আছো?"

প্রেয়নার প্রশ্নে তিসানের খুব করে বলতে ইচ্ছে করলো,

"আমি ভালো নেই প্রিয়ু।আমি মুখে একটা হাসির মুখোশ পড়ে আছি।কিন্তু আমার ভেতরটা ধীরে ধীরে জ্ব/লে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।আমার বুকে খুব ব্যথা হয়।খালি খালি লাগে ভেতরটা।বিশ্বাস করো আমি একটুও ভালো নেই।"

কিন্তু সে কথাগুলো তিসান মুখে বলতে পারল না।নিজের মাঝে থাকা আবেগটাও প্রকাশ করল না।বাকিদের সাথে যেমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলে প্রেয়নার প্রশ্নের উত্তরটাও ঠিক তেমন স্বাভাবিকভাবেই দিল।

"তরতাজা একটা ভালো মানুষ সামনে বসে আছে আর তুমি জিজ্ঞেস করছ কেমন আছি?ভালোই আছি নিশ্চয়ই।খারাপ থাকলে কি আর এখানে বসে আড্ডা দিতাম?"

এদিকে বাকিরা ওদের দুজনের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।নির্ভয় প্রেয়না কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আপনি তিসান ভাই কে চেনেন?"

"হ্যাঁ চিনি তো।তিসান ভাই তো আমার বড় আব্বুর ছেলে।"

উৎসব এবার তিসানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"আরে ভাই তুমি তো দেখছি এই যুগের মীরজাফর আর আমি হলাম বেচারা সিরাজউদ্দৌলা।তোমার যে এত সুন্দর একটা বোন আছে সেটা আমাকে বলোনি কেন?আমি বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছি একটা সুন্দরী নারীর খোঁজে এদিকে আমার পাশের বাড়িতে যে একজন সুন্দরী রমণীর বাস সেটা তো আমি জানতামই না।যখন খোঁজ পেলাম দেখি সে অন্য কারো দখলে চলে গেছে।"

নির্ভীক বিরক্তিকর কণ্ঠে উৎসবকে বলল,

"তুই কি থামবি উৎসব।সব বিষয় নিয়ে মজা করতে নেই।"

নির্ভীক এর কথায় সায় জানিয়ে নির্ভয় বলে উঠল,

"ওকে ঠিক এটাই বোঝাতে চাই কিন্তু ও বোঝে না। যেখানে সেখানে যা তা বিষয় নিয়ে মজা করে।এমন মজা করে যে এটা ভাবেও না একবার অপর পাশের মানুষটার সেটা ভালো লাগবে না খারাপ লাগবে।ভাই তুই আমাকে নিয়ে মজা কর তো।যা ইচ্ছে তাই বল আমাকে নিয়ে কিন্তু ওনাকে তো চিনিস না ওনাকে রেহাই দে।"

তিসানের কানে ওদের বলা একটা কথাও পৌঁছল না।তিসানের মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমত প্রেয়না নির্ভয়ের সাথে এখানে একা একা এলো কি করে তাও গাড়ি ছাড়া?আর দ্বিতীয়ত ওরা দুজন কি সত্যি প্রেমিক-প্রেমিকা?না এটা তো হওয়া সম্ভব না। প্রেয়নার বাবা আর ভাই বেঁচে থাকতে তো ওকে প্রেম করতে দেবে না কখনো।মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে নির্ভয় কে বলল,

"তা নির্ভয়,উৎসব যা বলল সেটা ঠিক না ভুল?"

"ভাই তুমি উৎসবের কথা শুনছো?আরে আমরা দুজনে একই ফ্ল্যাটে থাকি।মানে ওনাদের ফ্লাটে আমরা থাকি আর কি।আমরা ভালো বন্ধু।আসলে ওনার কোন বন্ধু বান্ধব নেই তাই আমি বলেছিলাম যে তোমাদের সবার সাথে আলাপ করিয়ে দেব।সেজন্য ওনাকে আজ এনেছি এখানে।"

এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা সবাই বুঝলো।তিসানও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।যদিও তার এই নিঃশ্বাস ফেলার যৌক্তিক কোনো কারণ সে নিজেই খুঁজে পেল না।এরই মাঝে প্রেয়নার নজর গেল তিসানের হাতে থাকা আধ খাওয়া সিগারেট টার ওপর।মৃদু রাগী কন্ঠে বলল,

"তুমি আবার সিগারেট খাচ্ছো তিসান ভাই!তুমি না আমায় বলেছিলে যে,তুমি নাকি এই অভ্যাসটা ছেড়ে দিয়েছে।তাহলে এসব কি?"

তিসান চট করে হাতে থাকে সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দিল।অজুহাত দিয়ে বলল,

"আরে না না আমি খাই না,সত্যি বলছি খাইনা।"

"তাহলে কি আমি ভুল দেখলাম?"

তিসান এবারে আর বলার মতন কোন কিছু খুঁজে পেল না।পাশ থেকে উৎসব বলে উঠলো,

"তিসান ভাই মিথ্যে বলল আপনাকে।দিনে দুই তিন প্যাকেট মে/রে দেয়।যেদিন আবার হুট করে অতিরিক্ত বিরহ জাগে সেদিন তো পারলে সিগারেট খেয়ে খেয়ে বিলুপ্তই করে দেয়।"

তিসান বিরক্তিকর কণ্ঠে নির্ভীক কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"তোমার এই বন্ধুকে থামাও তো ভায়া।এ অতিরিক্ত কথা বলে।হয় এর মুখে কষ্টেপ লাগাও নাহলে তুমি কি ব্যবস্থা কিছু করো।কিন্তু এ যদি চুপ না করে তাহলে আজ কিন্তু আমার কাছে মা*র খাবে।"

"তার আগে তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।তুমি আর ভাইয়া আমায় এক সাথে কথা দিয়েছিলে যে দুজন আর সিগারেট খাবে না।ভাইয়া কিন্তু নিজের কথা রেখেছে তুমি কেন রাখলে না?"

তিসান অবাকের সুরে বলল,

"তাই নাকি তোমার ভাই কথা রেখেছে!ও যে কথা দিয়ে কথা রাখে সেটা তো জানতাম না।"

"রেখেছে তো কথা কিন্তু তুমি রাখোনি।অথচ আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার কথা রাখবে,ভাইয়া হয়তো রাখবে না।"

তিসান হালকা হেসে বলল,

"আমরা যা ভাবি যদি সবকিছু তেমন ভাবেই হতো তাহলে তো হয়েই যেত।ছেড়ে দিয়েছিলাম তো।কিন্তু একসময় গিয়ে জীবনে যখন একদম একা হয়ে গেলাম তখন কারো একটা সঙ্গ আমার খুব দরকার ছিল।তখন এই সিগারেটটাকে নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম।আজ অবশ্য অনেকেই আছে জীবনে কিন্তু যে আমার দুঃসময়ে আমার পাশে ছিল তাকে তো আর এখন ছেড়ে দিতে পারি না তাই না?"

উৎসব,নির্ভীক আর প্রভা তিন জনই ভ্রুঁ কুঁচকে সন্দেহী দৃষ্টিতে তিসানের দিকে তাকিয়ে আছে।তিসানের কথাবার্তা,চালচলন কেন যেন অন্যরকম লাগছে। বিশেষ করে প্রেয়নার বলাতে সিগারেটটা ফেলে দেওয়া তে ওরা আরো বেশি অবাক হয়েছে।যে যাই বোঝাক তিসান কখনো সিগারেট ছাড়ে না,কখনো কাউকে অজুহাতও দেয় না,আর না কারো মন রাখার জন্য মিথ্যে বলে।তাহলে আজ কেন এমনটা করল?এই প্রশ্নের উত্তরটা তিসানই দিতে পারবে।

এদিকে তিসানের সাথে কথাবার্তা শেষে প্রেয়না বাকি সবার সাথে আলাপ করল।বেশ অনেকক্ষণই গল্প করলো।

উৎসব সবার জন্য চায়ের অর্ডার দিল।চা চলে আসতেই সবার প্রথম নির্ভয় এক কাপ চা প্রেয়নার দিকে বাড়িয়ে দিল।সাথে একটা বিস্কুটও দিতে নিলে তিসান ওকে বাধা দিয়ে বলে উঠলো,

"ওই বিস্কুটটা ওকে দিও না ভায়া।ও তে বাদাম আছে।আর বাদামে ওর এলার্জি।শেষে দেখা গেল আমার চাচার সুস্থ সবল মেয়েকে এনে অসুস্থ করার দায়ে তোমার উপর আবার হত্যা চেষ্টার মামলা ঠুকে দিতে পারেন।সাবধান করলাম তোমাকে।"

তিসানের কথায় সবাই হেসে উঠলো।সবাই হাসলো ঠিকই তবে মনের মাঝে সন্দেহটা আরো তীব্র হয়ে উঠলো।

সবাই কথা বললেও তিসান চুপচাপ শুনছে।প্রেয়নাও বেশ তাড়াতাড়ি সবার সাথে মিশে গেছে।তিসান কেন যেন এখানে বসে থাকতে পারছে না,অস্বস্তি হচ্ছে।একটা কণ্ঠস্বর,একজনের গায়ের মেয়েলি মিষ্টি সুঘ্রাণ তিসানকে ভীষণ বিরক্ত করছে।অস্থির লাগছে তার।শেষে বাধ্য হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"থাকো সবাই,আমি আজ উঠি।"

কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তিসান চলে যেতে নিলে পিছন থেকে প্রেয়না ডেকে উঠলো।এই ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা তিসানের নেই।অগত্যা ওকে থামতে হল।প্রেয়না উঠে দাঁড়িয়ে তিসানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

"আমি তোমার সাথে যাব।"

তিসান ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,

"কোথায় যাবে?"

"তোমার সাথে তোমার বাড়িতে যাব।"

"কেন?"

"যাওয়া বারণ নাকি আমার?"

"সেটা বলিনি।তুমি যে আমার বাড়িতে যাবে সেটা তোমার বাড়িতে জানে?"

"জানাতে হবে না।বাবা আমাকে অনুমতি দিয়েছে আমি যেখানে ইচ্ছে যেতে পারি।"

তিসান ব্যাঙ্গত্নক গলায় বলল,

"সেটা শুধু বড়লোকদের বাড়ি যাওয়ার জন্য অনুমতি দিয়েছেন,গরিবের বাড়ি যাওয়ার জন্য না।নির্ভয়ের সাথে এসেছো ওর সাথে বাড়ি ফিরে যাও।আমার সাথে যাওয়ার দরকার নেই।"

"তুমি কি নিয়ে যেতে চাইছো না আমায়?এতগুলো বছর পর দেখা হলো।জানিনা আমার কি অপরাধ ছিল যে তুমি এতগুলো বছরে আমার সাথে একটাবারের জন্য যোগাযোগ করোনি।আমার নাম্বারটা অব্দি ব্লক করে রেখেছো।তোমার বাড়িতে গেলে দরজা বন্ধ করে বসে থেকেছে,আমার সাথে একবার দেখা অব্দি করোনি।আজও যে আমার সাথে খুব একটা কথা বলেছো সেটাও না।আমি সত্যি আজও জানিনা ভাইয়ার সাথে তোমার কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছে।কিন্তু সেটার জন্য তুমি আমার সাথে কথা কেন বন্ধ করেছো?"

তিসান শান্ত দৃষ্টিতে প্রেয়নার দিকে তাকালো।কত কথা জমা হয়ে আছে সেই দৃষ্টিতে।চোখ দুটো যেন হাজারো কথা বলতে চাইছে কিন্তু বলতে পারল না।বরাবরের ন্যায় স্বাভাবিকভাবে বলল,

"কারো কোন অপরাধ নেই।বাড়ি যাও।আমিতো ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আমায় ভুলেই গেছো।এতদিন পরেও যে আমায় মনে রেখেছো এর জন্যই ধন্যবাদ।আমার বাড়িতে গেলে তোমার বাড়ির কেউই সেটা পছন্দ করবে না।"

কথাটা বলে তিসান চলে গেল।প্রেয়না অসহায় দৃষ্টিতে ওর যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর পুনরায় নিজের জায়গায় এসে বসতেই পিছন থেকে তিসানের গলার আওয়াজ পেল।

"চলো।"

প্রেয়না চমকে পিছনে তাকালো।সন্দেহী গলায় জিজ্ঞেস করলো,

"সত্যি?"

"হুম সত্যি।বাসে যেতে হবে কিন্তু।সিএনজি তে যাওয়ার মতন ভাড়া নেই আমার কাছে।যেতে পারলে এসো।"

প্রেয়না উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,

"পারব।"

কথাটা বলে নির্ভয় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"নির্ভয় আমি তিসান ভাইয়ের সাথে যাই।আসলে অনেকদিন হলো কারো সাথে দেখা হয় না।আর হ্যাঁ তোমাদের সবাই কে এত সুন্দর মূহুর্ত আমায় উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।আমি আবার আসবো।"

সবার থেকে বিদায় নিয়ে নির্ভয় কে বলে প্রেয়না তিসানের সাথে চলে গেল।নির্ভয় মুখে হাসলেও কেমন যেন এক শূণ্যতা অনুভব করলো।নিজেকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলো যে তিসান প্রেয়নার ভাই আর কিছুই না।কিন্তু মন মানলো না।এতটুকুতেই কি ভীষণ কষ্ট হচ্ছে নির্ভয়ের।প্রেয়না কে যদি কোনো কারণে না পায় তাহলে কি করবে?

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প