"মাস্টান্নি,আপনার মজনুর কি ব্যবস্থা করা যায় বলুন তো?ইচ্ছে তো করছে সব কিছু খুলে রাস্তার মাঝে দাঁড় করিয়ে গাছের ডাল দিয়ে পে/টাই।"
প্রভা নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তি কর কণ্ঠে বলল,
"প্রতিটা কথার মাঝে আপনার অশ্লীলতা থাকবেই তাই না?"
"আরে এখানে অশ্লীলতার কি দেখলেন?জামা কাপড়ের উপর মা/রলে তো বেশি লাগবে না সেজন্য সবকিছু খুলে মা/রতে চাইলাম।"
"কিছু করতে হবে না আপনাকে।কাল সারাদিন আপনার বন্ধুকে ঠান্ডা করেছি।শেষে রাগ করে কথাই বলা বন্ধ করে দিয়েছে।কাল থেকে ফোন দিচ্ছি ফোন অবধি ধরছে না,আজকে কলেজেও আসেনি।এখন আবার আপনি শুরু হয়ে গেলেন।"
"আরে চিন্তা করবেন না আমার ভাই ঠিক আছে।সকালে গিয়েছিলাম তো দেখা করতে।"
প্রভা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
"আপনার সাথে তার মানে কথা হয়েছে ওনার?"
"কথা হয়েছে মানে একদম দেখা সাক্ষাৎ সব হয়েছে।"
প্রভার এবারে নির্ভীকের উপর একটু রাগ হলো।উৎসবের সাথে ওর দেখা হয়েছে কথাও বলেছে অথচ ওর সাথে একবার দেখা করলো না।প্রভা তো নির্ভীকের ভালোর জন্যই ইশরাকের সাথে কোন ঝামেলা করতে দেয়নি।যদি নির্ভীকের কোন ক্ষতি করে দেয় সেই ভয়েই তো ওকে যথাসম্ভব ইশরাকের থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে।আর এই ছেলে ওর উপরেই রাগ দেখাচ্ছে।প্রভার মনে এবার অভিমান জমলো।উপস্থিত উৎসব আর তিসান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"আসছি আমি।"
কথাটা বলে প্রভা চলে যেতে নিলে পিছন থেকে উৎসব ওকে ডেকে উঠলো।
"আরে মাস্টান্নি দাঁড়ান।"
অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রভাকে থামতে হলো।ওকে আর পিছন ঘুরে তাকাতে হলো না।তার আগেই উৎসব ওর সামনে এসে দাঁড়ালো।মুখে তার বিস্তর হাসি বিরাজমান।
"আপনি তো এখন আমার বাড়িতেই যাবেন।চলুন একসাথে যাই।"
উৎসবের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে প্রভা কাটকাট গলায় বলল,
"কোন প্রয়োজন নেই।আপনি আপনার মতন যান,আমি আমার মতন চলে যাব।"
"আরে মাস্টান্নি,গন্তব্য যখন দুজনের এক তাহলে একই পথে যেতে সমস্যা কি?"
"এক পথে যেতে আমার কোন সমস্যা নেই।এমনিতেও এক পথ দিয়েই যেতে হবে আমাদের দুজনকে।কিন্তু সঙ্গী হিসেবে আপনাকে বেছে নিতে পারছি না।"
"কিন্তু কেন?আমার অপরাধ কি?"
"আপনার অপরাধ কিছুই না।সমস্যাটা হলো আমি যেতে পারব না আপনার সাথে।"
"আরে মাস্টান্নি,চলুন না।এই গরমের মধ্যে বাসে করে যেতে কষ্ট হবে আপনার।আমার বাইকে উড়িয়ে নিয়ে যাব।"
"আর ঠিক এই কারণেই আপনার সাথে যাব না আমি।আপনাকে আমি একটুও বিশ্বাস করি না।সুস্থ সবল আমাকে নিয়ে গিয়ে শেষে দেখা গেল হাত-পা ভেঙে বাড়ি পৌঁছে দিলেন।তার থেকে ভালো আমি হেঁটে হেঁটে আপনার বাড়িতে যাব তবুও আপনার সাথে যাব না।"
কথাটা বলে প্রভা চলে যেতে নিলে উৎসব পুনরায় ওর পথ আটকে দাঁড়ালো।
"আচ্ছা ঠিক আছে আসতে চালাবো বাইক।একদম সাইকেলের গতিতে চালাবো।আপনি বুঝতেই পারবেন না যে আপনি বাইকে উঠেছেন না সাইকেলে উঠেছেন।"
"এই সাইকেলের গতিতে আপনার বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে কাল সকাল হয়ে যাবে আর আপনার মা খুব সুন্দর করে আমাকে আপনাদের বাড়ি থেকে বের করে দেবে।"
"তাহলে মাঝারি স্পিডে চালাবো।এবার তো রাজি হয়ে যান।"
"দেখুন আপনি হাই স্পিড,মাঝারি স্পিড বা স্লো স্পিড যে স্পিডে চালান না কেন আমি আপনার সাথে যাব না।আগে আপনাকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি তারপরে আপনার সাথে যাব।আজ আসছি।"
কথাটা বলে প্রভা সেখান থেকে চলে গেল।উৎসব আর ওকে বাঁধা দিলোনা।আজকাল তেমন একটা উৎসব মির্জার মন খারাপ হয় না।কিন্তু আজ কেন যেন প্রভার কথাগুলো শুনে একটু খারাপ লাগলো।কি এমন কারণ যে প্রভা এখনো ওকে বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি? উৎসব কি এতটাই খারাপ?ও কি বিশ্বাসের যোগ্য না?মুখ ভার করে এসে বেঞ্চে বসলো।
"রাজি হলো না?"
উৎসব দুঃখী মুখ করে বলল,
"না,মাস্টান্নি তেজ দেখিয়ে চলে গেল।আর বলে গেল আমাকে নাকি এখনো ঠিকঠাকভাবে বিশ্বাস করে উঠতে পারে নি।আচ্ছা ভাই তুমি বল আমি কি মানুষটা এতটাই খারাপ যে আমাকে বিশ্বাস করা যায় না?"
তিসান হালকা হেসে বলল,
"তুমি মানুষটা যতই ভালো হও না কেন ভায়া তাও সবাই তোমায় বিশ্বাস করতে পারবে না।তুমি জানো তোমাকে বিশ্বাস করলে সে ঠকবে না কিন্তু সে তো আর জানে না।এই দুনিয়ার হাজারো মানুষের ভিড়ে কে ভালো কে খারাপ সেটা তো বুঝে ওঠা এতটা সহজ কথা না তাই না?"
"তা ঠিক বলেছো।কিন্তু....."
"কিন্তু কি?"
উৎসব একবার ভাবলো বলবে পরক্ষণেই আবার ভাবল বলবে না।তিসানকে বিশ্বাস নেই।ছোট্ট কথাটাকে কেন্দ্র করে অনেক বড় একটা ঘটনা বানিয়ে ফেলবে।
"না কিছু না।"
"প্রভার কথায় খারাপ লেগেছে তাই তো?"
তিসানের কথা শুনে উৎসব চমকে উঠে প্রশ্ন করল,
"তুমি কি করে বুঝলে?"
তিসান শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
"তুমি তো নিজেই আমার নাম দিয়েছো মা/রা খাওয়া প্রাণী।মা/রা খেয়ে খেয়েই তো সবটা বুঝতে শিখেছি। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তোমার সময়ও হয়ে এসেছে।"
"মানে?"
"বুকের বা পাশে কি ব্যথা করে আজকাল?আনমনে কারো কথা ভেবে কি মুচকি হাসো?হুট করে কানে কারো হাসির ঝংকার বেজে ওঠে কি?এসব কি হয় আজকাল?"
উৎসব একটু ভেবে বলল,
"বুকের ব্যথা আমার কোন কালেই ছিল না ভাই।আর কারো কথা ভেবে মুচকি হাসবো কেন আমি সারাদিন হাসতেই থাকি।আর কানে বেশিরভাগ সময় হেডফোন লাগিয়ে গান শুনি।এবার বল কি বুঝলে তুমি?"
"না তাহলে মনে হয় মা/রা খাওয়ার সময় এখনো তোমার হয়নি।ভায়া এসব লক্ষণ যদি কখনো দেখা দেয় তবে আমায় কিন্তু আগে এসে বলো।তোমার বন্ধুকে আগেই বলো না।"
"আমার সব কথা আমি আগে নির্ভীককে বলি।আগে আমার ভাইকে বলব তারপর তুমি শুনতে পাবে।"
"বেশ যেমন তোমার ইচ্ছে।আসলেই যে মানুষ নিজের ভালো বোঝে না সেটা তোমায় দেখে আমি ভালো করে বুঝতে পেলাম।তা তোমার বন্ধুর মনের খবর রাখো আজকাল?"
"মনের খবর কি করে রাখে ভাই তা আমার জানা নেই।খালাম্মারা কোন ঝামেলা করেছিল কিনা সেটা জিজ্ঞেস করেছিলাম।বলেছে ওই ঘটনার পর থেকে ওরা সবাই একটু ঠান্ডাই আছে।"
"তোমার মাস্টান্নি তো চলে গেল তুমি বাড়ি ফিরবে না?"
"ভালো কথা মনে করেছো।থাকো ভাই আমি আসি। বাড়ি গিয়ে মাস্টান্নিকে একটু জ্বা/লাবো।"
তিসানের থেকে বিদায় নিয়ে উৎসব চলে গেল।উৎসব চলে যেতেই সেখানে নির্ভয় এলো।বাদ বাকি কাউকে দেখতে না পেয়ে তিসান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"বাকিরা কেউ আসেনি আর ভাই?"
নির্ভয় কে দেখে তিসানের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।হাত বাড়িয়ে ওর পাশে বসতে ইশারা করল।
"আসর তো জমে উঠেছিল ভায়া কিন্তু ধীরে ধীরে খালি হয়ে গেল।তুমি আসতে বড্ড দেরি করে ফেলেছ।"
নির্ভয় একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
"যাক বাবা ভালোই হয়েছে।আমিও আজকে খুব বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না।"
"তোমার আবার এত কিসের তাড়া?"
"আজ প্রেয়নার সাথে এক জায়গায় যাওয়ার কথা আছে।উনি অপেক্ষা করছেন আমার জন্য।সময় মতো না যেতে পারলে রাগ করতে পারেন।"
তিসানের বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। একটু আগে উৎসবকে যে ব্যথাটা হওয়ার কথা বলছিল এখন নিজের বুকের বাঁ পাশটায় যেন সেই ব্যথাটা অনুভব করতে পারল।ব্যথার কিঞ্চিৎ বহিঃপ্রকাশও তার মুখে প্রতিফলিত হলো না।হালকা হেসে বলল,
"তবে যাও।মেয়ে মানুষকে বেশি অপেক্ষা করাতে নেই।"
"হুম।আচ্ছা ভাই আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?"
"আগে আপনি থেকে তুমিতে এসো ছেলে।তারপর প্রশ্ন করার অধিকার দেব।"
"আচ্ছা ঠিক আছে।তোমায় একটা প্রশ্ন করতে পারি?"
"দুটো করার অনুমতি দিলাম।"
প্রশ্নটা করতে নির্ভয়ের নিজেরই কেমন জানি ইতস্তত বোধ হচ্ছে।ভাবছে তিসান যদি আবার উল্টোপাল্টা কিছু ভেবে নেয়?যদি মন খারাপ করে তখন?নির্ভয় কে ভাবনার মাঝে ডুবে থাকতে দেখে তিসান হালকা করে ওর কাঁধে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"বলবে না?এত ভাবতে নেই বলে ফেলো।বেশি ভাবতে গেলে এক সময় দেখবে বলার জন্য আর সময় পেলে না।"
"প্রেয়না তোমারর বোন তাইতো?"
"হ্যাঁ।আমার চাচার মেয়ে।"
"ওহ্ আচ্ছা।ওর সাথে তোমার খুব ভালো সম্পর্ক তাই না?"
তিসান আন্দাজ করেছিল যে নির্ভয় এই সংক্রান্ত কিছু বলবে ওকে।আসলে যে নির্ভয় কি বোঝাতে চাইছে সেটা তিসান বুঝলো।সেদিন নির্ভয়ের মুখের অবস্থা দেখেছিল তিসান যখন প্রেয়না ওর থেকে বেশি তিসানকে গুরুত্ব দিচ্ছিলো।নির্ভয়ের মুখমন্ডলে স্পষ্ট প্রতিয়মান চিন্তার চাপ তিসানের চোখ এড়াতে পারেনি।সেই চিন্তা সাধারণ কোনো চিন্তা ছিল না। ছিল প্রিয়তমাকে হারিয়ে ফেলার চিন্তা।
"এক সময় বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল।এখন যদিও আমাদের মাঝে সম্পর্কটা ঠিকঠাক নেই।আসলে চাচাদের সাথে আর সম্পর্ক তেমন একটা ভালো নেই।অনেক বছর হলো ওদের সাথে যোগাযোগ খুব কম।সেদিন যে কতদিন পর দুজন দুজনকে দেখেছি তার হিসাব নেই।"
নির্ভয় যেন একটু শান্তি পেল।যাক ভাই বোনের বাইরে কোন সম্পর্ক নেই।নির্ভয় জানে তিসান মিথ্যে বলবে না। সেইজন্য ওর কথায় নিশ্চিত হলো।আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা বলে তিসানের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।রোজ এই জায়গাটায় সবার শেষে তিসানই থেকে যায়। যে যার মতন হয় নিজের কাজে যায়,নয় তো নিজের বাড়িতে,নয় তো একটু সুখের সন্ধানে চলে যায়।কিন্তু তিসান এখানেই থেকে যায়।না তার কাজ আছে,না বাড়িতে গিয়ে শান্তি মেলে,না তার সুখের কোন জায়গা আছে যে তার সন্ধানে যাবে।তার সবকিছু থমকে গেছে একটা জায়গায়।তিসান স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে,নিজের ছোট ছোট কল্পনা গুলোকে বাস্তবে রূপদান করার শখ টাকে ভুলে গেছে।তার গোটা জীবনটাই ভুলে ভরা। শোধরাবার কোন উপায় সে পায়নি।
এক প্রেমিক পুরুষ অন্য প্রেমিক পুরুষের হৃদয়ের খোঁজ ঠিকই পেয়ে যায়।তার আবভাব দেখেই বোঝা যায় যে তার মনে দিন রাত বিশেষ কেউ একজন উঁকি দেয়।তিসানেরও বুঝতে বাকি রইলো না যে নির্ভয়ের মনে প্রেয়না কে নিয়ে সদ্য কিছু অনুভূতির জন্ম হয়েছে যা ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে।তিসান হাসলো।কি এক অদ্ভুত জীবন?একজন মানুষকে দুটো মানুষ ভালোবাসে।একজন নিজ ইচ্ছেয় হেরে গেছে আরেকজন হার জিতের কথা ভুলে গিয়ে স্বপ্ন দেখছে।তিসান আনমনে হেসে বিড়বিড় করে বলল,
❝দুর হতে আমি তারে সাধিব,
গোপনে বিরহ ডোরে বাঁধিব!❞
______________
বেশ অনেকক্ষণ ধরে প্রভা খেয়াল করছে ঊষা ওকে কিছু একটা বলার জন্য উশখুশ করছে।আজ পড়াতেও মনোযোগ নেই।এতবার করে একটা জিনিস বোঝাচ্ছে তাও ভুল করছ অথচ সে একদমই খারাপ ছাত্রী না। কোন একটা বিষয় সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনবার বুঝিয়ে দিলে খুব ভালোভাবে সে সেটা আয়ত্ত করতে পারে।প্রভা নিজ থেকেই বইটা বন্ধ করলো।ঊষার হাতের নিচে খাতাটা নিয়ে এক পাশে রেখে দিল।ঊষা একটু ঘাবড়ে গেল।অপরাধী কন্ঠে বলল,
"সরি ম্যাম।এইবার ভুল করব না।"
"তুমি কি কিছু বলতে চাইছো আমায় ঊষা?যদি মনের মধ্যে কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে নির্দ্বিধায় সেটা করে ফেলো।নিজের মনের শান্তির জন্য হলেও করে ফেলো।"
সত্যিই ঊষা প্রভাকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চায় কিন্তু দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে আর জিজ্ঞেস করে উঠতে পারছে না।ভাবছে প্রভাকে কথাটা বলা ঠিক হবে কিনা। যতই হোক প্রভা তো ওর শিক্ষক।আর শিক্ষককে এই ধরনের প্রশ্ন করা কিংবা কোন কিছু বলা এই সম্বন্ধে দুটোই দৃষ্টি কটু।ঊষাকে চুপ করে থাকতে দেখে প্রভা শান্ত কণ্ঠে পুনরায় বলল,
"তুমি আমার ছোট বোনের মত ঊষা।আমি আজ অব্দি যত ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়েছি তার মধ্যে তুমি আমার বেস্ট স্টুডেন্ট।তুমি মানুষ হিসেবেও খুব চমৎকার।আমি তোমাকে মন থেকে খুব ভালোবাসি।আমার খুব কাছের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী ভাবি তোমায়।বুঝতে পারছি আমি তোমার শিক্ষক জন্য তুমি একটু সংকোচ করছো।তো বেশ কিছুক্ষণের জন্য না হয় এটা ভুলে যাও যে আমি তোমাকে পড়াতে আসি।মনে করো আমি তোমার খুব ভালো বন্ধু কিংবা তোমার বড় বোন।"
ঊষা যেন একটু সাহস পেল।কিন্তু ভয় এখনো পরিপূর্ণভাবে তার কাটেনি।কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,
"নির্ভীক ভাইয়া আপনার কে হয় ম্যাম?"
নির্ভীক এর নামটা শুনতে প্রভা একটু চমকালো।ঊষা যে নির্ভীক কে নিয়ে কিছু প্রশ্ন করতে পারে সেটা সে ভাবেনি।
"আমার বন্ধু হয় কেন?"
"এমনি জিজ্ঞেস করেছিলাম।আরেকটা প্রশ্ন করি?"
"হুম করো?"
ঊষা একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
"আপনাদের মাঝে কি কোন সম্পর্ক আছে ম্যাম?আ'ম রিয়েলি সরি প্রশ্নটা করার জন্য।আমি জানি এটা বেয়াদবি করলাম কিন্তু প্লিজ ম্যাম কিছু মনে করবেন না।"
প্রভা সত্যিই ঊষার মুখ থেকে ই প্রশ্নটা শুনে ভীষণ অবাক হয়েছে।কেন সে এই ধরনের প্রশ্ন করছে সেটা ওর মাথায় আসছে না।
"না আমাদের মাঝে অন্য কোন সম্পর্ক নেই কিন্তু কেন বলতো?হঠাৎ তুমি এই নিয়ে প্রশ্ন করছো কেন?"
ঊষা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
"আসলে সেদিন কাশফিয়াদের বাড়িতে ওনার সাথে আপনাকে দেখে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।ভেবেছিলাম হয়তো আপনারা দুজন দুজনকে পছন্দ করেন।"
"যদি আমাদের মাঝে সম্পর্ক থাকতো তাহলে কি হতো?"
ঊষার মুখটা চুপসে গেল।যদিও নির্ভীক সোজাসুজি ওকে নিষেধ করে দিয়েছে কিন্তু তার পরেও ঊষার মনের মাঝে আজও একটা সুপ্ত আশা রয়েছে।কোন একদিন ও নির্ভীককে খুব করে বোঝাবে।ওর মনে লুকিয়ে রাখা সমস্ত অনুভূতি বলবে।এই একটা আশাতেই তো আছে।উৎসবের থেকেও সাহায্য চাইবে।সেদিন হয়তো নির্ভীক ওর ভালোবাসাটা বুঝে ওকে গ্রহণ করবে।কিন্তু যদি নির্ভীক আর প্রভা মাঝে সম্পর্ক থাকতো তাহলে তো এমন কিছুই হবে না।
"তুমি ওনাকে পছন্দ করো ঊষা?"
প্রভার এমন প্রশ্নে উষা কেঁপে উঠল।বাড়িতে রুবাইদা, সাইফুল মির্জা দুজনেই উপস্থিত।ভুলক্রমেও যদি কারো কানে কথাটা যায় তাহলে একটা তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবে।
"আস্তে বলুন ম্যাম প্লিজ!আব্বু আম্মু শুনে ফেললে ভয়ংকর সমস্যা হয়ে যাবে।"
ঊষার কথা মত প্রভা ধীর কন্ঠে বলল,
"তুমি নির্ভীক কে পছন্দ করো ঊষা?"
"আমি করলেই বা কি উনি করেন না।"
"তুমি বলেছো ওনাকে নিজের মনের কথা?"
"হ্যাঁ বলেছিলাম তো।"
"কি বলেছেন উনি?"
প্রভার ভীষণ কৌতুহল উত্তরটা জানার জন্য।ঊষা উদাস কণ্ঠে বলল,
"না করে দিয়েছেন।আমাকে নাকি উনি কখনো সেই নজরে দেখেনি।একটুও পছন্দ করেন না ওই হিসেবে।"
ঊষার উত্তরটা শুনে প্রভা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।কিন্তু ঊষার পরবর্তী কথাটা শুনে প্রভার স্বস্তি মুহূর্তের মাঝে গায়েব হয়ে গেল।
"কিন্তু জানেন ম্যাম আমার কেন যেন মনে হয় ওনাকে পাওয়াটা সম্ভব।ভাইয়া আর ওনার সম্পর্কটা খুব ভালো।অনেক ছোট থেকে ওরা দুজন বন্ধু।দুজন দুজনের কথা খুব শুনে।যদি আমি ভাইয়াকে রাজি করাতে পারি তাহলে ভাইয়া ওনাকে ঠিক রাজি করিয়ে নেবে।কারণ আমি জানি উনি ভাইয়ার কোন কথা ফেলে না।আর আমি যদি ভাইয়াকে একটু কেঁদে কেটে হাত পা ধরে অনুরোধ করি তাহলে আমার বিশ্বাস ভাইয়া আমার কথা ফেলবে না।"
প্রভার মনটা খারাপ হয়ে গেল।ভেতরে ভেতরে একটা ভয় জমল।ওর মনেও তো ওই মানুষটাকে নিয়ে একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছে।একটু একটু করে পুরো হৃদয়টাকে গ্রাস করে ফেলছে সে অনুভূতি।আচ্ছা নির্ভীক কি সত্যিই উৎসবের কথা মেনে নিয়ে ঊষাকে নিজের জীবনে জায়গা দেবে?তাহলে প্রভার প্রতি ওর কোন অনুভূতি নেই?নির্ভীক এর জীবনে প্রভার একটুও গুরুত্ব নেই?ভালোবাসাটা কি তবে কেবল প্রভার পক্ষ থেকেই?
প্রভাকে আপন মনে কিছু একটা ভাবতে দেখে ঊষা ডেকে উঠলো।
"কিছু ভাবছেন ম্যাম?"
"না কিছু না।তুমি খুব ভালোবাসো ওনাকে তাই না?"
"হ্যাঁ খুব ভালোবাসি।ওনার আগে কিংবা পরে কখনো আমার আর কোন ছেলে কে ভালো লাগেনি।উনি মানুষটা না ভীষণ অদ্ভুত।হুট করে যে কি করে ভালো লেগে গেল নিজেও বুঝতে পারিনি।"
প্রভা হাসলো।সত্যি ওই মানুষটা ভীষণ অদ্ভুত।সবাইকে নিজের মায়ায় জড়িয়ে নেয় ঠিক যেমন ভাবে এই অল্প দিনের মাঝে প্রভাকে নিজের মায়ায় জড়িয়ে নিয়েছে।কিন্তু নিজের মায়ায় জড়িয়ে আবার একা ফেলে রেখে চলে যাবে না তো?উৎসবের কথায় ঊষাকে নিজের জীবনে যদি জায়গা দেয় তাহলে?তাহলে প্রভার ভালোবাসাটা যে অসমাপ্ত থেকে যাবে!