গতকাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে।আজ সকালেও হয়েছে খানিকটা।তবে এখন আর বৃষ্টি পড়ছে না।আকাশ এখনো মেঘলা,হয়তো একটু পরেই বৃষ্টি নামবে।মাঠের ঘাস গুলো ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে।ফলে আজ আর বসতে পারলো না প্রভা।একা একা হাঁটছে আর মাথায় ঘুরছে হাজারো দুশ্চিন্তা।প্রায় তিন মাসের বাড়ি ভাড়া জমা হয়েছে।বাড়িতে বাজারও তেমন একটা নেই।এর মাঝে আবার সৌমির অসুস্থতাটাও আরো বেড়েছে। ওকে ডাক্তার দেখাতে হবে।অসুস্থতা বাড়ার কারণে সৌমিকে টিউশনে যেতে দেয়নি।মাস শেষে নিজের টিউশন থেকে পাওয়া টাকাটা দিয়ে কোনটা ছেড়ে কি করবে সেটাই ভেবে পাচ্ছেনা প্রভা।আজ নির্ভীকরাও কলেজে আসেনি।ওদের সাথে গল্প করলে তাও মনটা একটু হালকা হতো।এখন আর হাঁটতেও ইচ্ছে করছে না ঘাসের মাঝে।বিরক্ত হয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে এলো।রাস্তায় আজ প্রতিদিনের তুলনায় জ্যাম অনেকটাই কম, নেই বললেই চলে।এমন সুন্দর আবহাওয়ার মাঝে হয়তো অনেকেরই কাজে যেতে ইচ্ছে করেনি।কিন্তু প্রভার মত কিছু খেটে খাওয়া মানুষ,দিন মজুরদের ঘর থেকে না বেরিয়ে উপায় নেই।বাসে উঠতে ইচ্ছে করছে না আজ।শেষে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা শুরু করলো।হুট করে পিছন থেকে ওড়নায় একটু টান অনুভব করতেই থেমে গেল প্রভা।চট করে পিছন ফিরে তাকাতেই ইশরাকের ঠোঁটে বিদ্যমান হাসিটা দেখে প্রভার সর্বাঙ্গ ঘৃণায় রি রি করে উঠলো।
"মাঝ রাস্তায় আবার অসভ্যতামি শুরু করেছেন আপনি?ছাড়ুন বলছি আমার ওড়না।"
ইশরাক প্রভার ওড়নার এক পাশটা নিজের হাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে ওর দিকে এগিয়ে এসে সম্মোহনী কণ্ঠে বলল,
"মাইরি বলছি সুন্দরী,তোমাকে যা লাগছে না দেখতে আজ।আমার বুকের ভেতর একদম আ/গু/ন ধরিয়ে দিলে।লাল রঙে যে তোমায় এমন আ/গু/ন লাগবে সেটা আমি কখনো ভাবতে পারিনি।আমাদের বিয়ের পর কিন্তু তুমি রোজ লাল রঙের জামাই পড়বে।"
"ওড়নাটা ছাড়তে বলেছি।আমি কিন্তু চিৎকার করে লোক জড়ো করবো।"
"করবে?বেশ করো।আমিও একটু দেখি কার বুকে কতখানি জোর যে আমাকে থামাতে আসে।"
প্রভার কেন যেন আজ ভীষণ ভয় লাগছে।ইশরাকের চোখে মুখে আজ অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি হিংস্রতা দেখতে পাচ্ছে।আশেপাশে মানুষজন নেই বললেই চলে।দু একজন চুপচাপ এক নজর দেখে নিজেদের কাজে চলে গেল।প্রভার ঘাবড়ে যাওয়া মুখোবয়ব দেখেই ইশরাক বুঝলো যে ও ভয় পেয়েছে।শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
"তোমার মুখে ঠিক এই ভয়টাই আমি দেখতে চাই সুন্দরী।কিন্তু কাল যখন নির্ভীকের হাতে হাত রেখে ঘুরছিলে তখন তোমার একবারও আমার কথা মনে হয়নি তাই না?তখন তো তোমার এই ভয়টা করার দরকার ছিল।"
প্রভা বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে ইশরাকের দিকে তাকালো।ইশরাক কি করে জানলো এই কথাটা?তার মানে কি প্রভার ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখে?প্রভার দৃষ্টিতে থাকা সীমাহীন কৌতুহল দেখে ইশরাক ওর মনের প্রশ্ন আন্দাজ করতে পারলো।নিজ থেকেই বলল,
"কি ভাবছো আমি কি করে জানলাম?সব জানি।আরে ভালোবাসি তোমায়।তোমার সম্বন্ধে খোঁজখবর রাখবো না?আমার হবু বউ অন্য ছেলের সাথে ঢলাঢলি করে রাস্তায় হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াবে আর সেই খবর আমার কান অব্দি পৌঁছাবে না এটা তুমি ভাবলে কি করে?খুব সাহস বেড়েছে তোমার ওই কয়টা চুনাপুটির সাথে আলাপ হওয়ার পর তাই না?কি ভেবেছো তুমি ওরা তোমাকে বাঁচাতে পারবে?সময় হলে তো আমি নিজ হাতেই সবকটাকে শেষ করব।তাহলে ওরা তোমাকে কি বাঁচাবে।"
"যেতে দিন আমায়।যদি আপনি ভালো মানুষ হতেন তাহলে আপনার কথায় আমি রাজি হতাম।কিন্তু আপনার মত একজন দুশ্চরিত্র মানুষকে আমি কখনই বিয়ে করতে পারবোনা।আর ওদের কোন দোষ নেই।ওদের সাথে পরিচয় হওয়ার আগেও আমি আপনার সাথে যে ব্যবহারটা করতাম পরিচয় হওয়ার পরেও ঠিক সেই একই ব্যবহারটা করি।"
"কিন্তু তোমার নির্ভীকের হাতে হাত রেখে হাঁটা তো আমার পছন্দ হলো না সুন্দরী।আমার ছোঁয়া তোমার কাছে বিষ মনে হয় তাহলে ওর ছোঁয়া মধু মনে হয় কেন?ও কিভাবে ছোঁয় তোমাকে?তুমি বরং বলে দাও তোমাকে কিভাবে ছুঁলে আমার ছোঁয়াও তোমার কাছে ওর ছোঁয়ার মতন মধু লাগবে?"
প্রভা ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে ইশরাকের দিকে তাকিয়ে বলল,
"উনি যেভাবে আমার হাত স্পর্শ করেছিলেন সেভাবে স্পর্শ করার ক্ষমতা আপনার নেই।আপনি মানুষ কে সম্মান দিতে জানেন না।আপনাকে দেখলে আমার ঘৃনা হয়,বমি পায়।আর ওনাকে দেখলে সম্মান করতে ইচ্ছে করে।আপনি ওনার নখেরও যোগ্য না।হাজার দিন তপস্যা করলেও আপনি ওনার মতন কোন কিছুই করতে পারবেন না।"
রাগে ইশরাকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।প্রভার ওড়না ছেড়ে দু'বাহু চেপে ধরল।প্রভা ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো।ইশরাক দাঁতে দাঁত পিষে কর্কশ কণ্ঠে প্রভাকে বলল,
"ওর মতন করে আমি কখনো তোমাকে স্পর্শ করব না। তোমায় এমন ভাবে স্পর্শ করব যে সেখানে নিজের চিহ্ন আজীবনের জন্য রেখে দেব।তুমি ভয় করবে আমার স্পর্শ দেখে।আজ বরং তোমায় একটা নমুনা দেখিয়ে যাই কেমন।খোলা রাস্তায় সবার সামনে তোমার ঠোঁটে একটু আমার স্পর্শ দেওয়া যাক।বিশ্বাস করো তোমার সাথে এসব জোরজবরদস্তি করার আমার বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে ছিল না কিন্তু এসব না করায় তো তুমি আমাকে খুব হালকাভাবে নিয়ে নিয়েছো।তোমাকে বোঝাতে হবে যে ইশরাক খান আসলে কতটা ভয়ংকর হতে পারে তোমাকে পাওয়ার জন্য।"
প্রভা সাহায্যের জন্য আশে পাশে তাকালো কিন্তু কেউ নেই এখানে ওকে সাহায্য করার মতন।কি করবে বুঝতে পারছে না।রাগে দুঃখে কান্না পাচ্ছে।ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে।আর প্রভার এই অসহায়ত্ব দেখে ইশরাক ভীষণ মজা পাচ্ছে।প্রভা প্রাণপণে চেষ্টা করছে ইশরাকের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর।কিন্তু ওর বলিষ্ঠ দেহের শক্তির সাথে পেরে উঠছে না।ইশরাক প্রভার দিকে একটু ঝুঁকে আসতেই কেউ একজন সহসা এগিয়ে এসে কিছু একটা দিয়ে ইশরাকের মুখে আঘাত করল।নিজেকে সামলাতে না পেরে একটু দূরে ছিটকে গেল।আকস্মিক ঘটনায় উপস্থিত সবাই হতভাগ হয়ে গেল।আঘাতকারী ব্যক্তি কে দেখার উদ্দেশ্যে পাশে তাকাতেই প্রভা বকুলকে দেখে চমকে গেল।বকুল তখনও রাগে ফুঁসছে।হাতে থাকা বই ভরতি ব্যাগটা দিয়ে সজরে ইশরাকের মুখে আঘাত করেছে সে।কিন্তু এটা তো ঠিক করলো না বকুল।
প্রভা আর্তনাদ করে বলে উঠলো,
"এটা কি করলে বকুল?কেন মা/রলো ওকে?"
বকুল রাগী কন্ঠে বলল,
"ওর সাহস হলো কি করে তোমাকে এইভাবে ধরার?ও কি ভেবেছে তোমার কেউ নেই?আমরা সবাই আছি।বাকিরা সবাই আসছে।আমি ফোন করেছিলাম।এক্ষুনি ওকে মজা দেখাবে।"
ইশরাক নিজেকে সামলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।নাকে হাত দিতেই র/ক্তের উপস্থিতি টের পেল।হাতের উল্টো পিঠের সাহায্যে সেটুকু র/ক্ত মুছে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো।চোখ মুখে তার হাস্যোজ্জ্বল ভাব।ইশরাকের সেই হাসি মুখটা দেখে প্রভা বেশি ভয় পেল।নিজ থেকে ইশরাকের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলল,
"আমি ওর হয় ক্ষমা চাইছি।ওকে ক্ষমা করে দিন।ও ভুল করে ফেলেছে।"
"তুমি ওর কাছে ক্ষমা কেন চাইছো?আমি দেখতে চাই ও কি করতে পারে?ওর কত ক্ষমতা আমি দেখতে চাই।"
বকুলের কথায় প্রভা ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
"একদম চুপ।তুমি আর একটা কথাও বলবে না।কে বলেছিলে তোমায় এসব করতে?আমি বলেছিলাম তোমায় আমায় সাহায্য করতে?চলে যাও এখান থেকে।"
"তোমাকে একা ফেলে যাব না।"
ওদের কথার মাঝে ইশরাক বলে উঠলো,
"বাহ!তোমার যে এত সাহস সেটা তো আমি জানতাম না।বেশ ভালো লাগলো।আজ অব্দি তোমার বাকি বন্ধুরা যে সাহসটা কখনো দেখায়নি আজ তুমি সেই সাহসটা দেখালে।বেশ ভালো লাগলো আমার। অনেকদিন পর কারো হাতে একটু মা/র খেলাম।"
কথাটা বলে ইশরাক বকুলের দিকে এগিয়ে আসতে নিলে প্রভা ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।হাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
"আমি তো ক্ষমা চাইছি।বলছি তো ভুল করে ফেলেছে। ক্ষমা করে দিন ওকে।আপনার যা সমস্যা সব আমাকে নিয়ে তো।যা কষ্ট দেওয়ার সব আমাকে দিন।ও ভুল করেছে ওকে ছেড়ে দিন।যেতে দিন ওকে।"
"তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন?আমি কি একবারও বলেছি নাকি যে আমি ওর সাথে কিছু করব?আমি তো ওকে বাহবা দেওয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলাম।"
"চলে যান আপনি।"
"ঠিক বলেছ আজ আমি চলে যাব।বকুল আমার মুডটা একদম বদলে দিল।অনেক কিছু করার ইচ্ছে ছিল আজ কিন্তু কিছু করতে পারলাম না।আজ বেঁচে গেলে সুন্দরী।কিন্তু আর যেন কারো হাতে তোমার হাত আমি না দেখি।ভালোবাসি তোমায়।তোমার জন্য যদি অন্য কে মা/রতে পারি তবে আমার কথা না মানলে তোমাকেও মে/রে দিতে পারি।আর বকুল একদিন তোমার এই সাহসিকতার গল্প খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবো।এই যে তোমার চোখে এত তেজ দেখলাম এটা আমার খুব ভালো লাগলো।দেখা হবে,খুব শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে আশা করছি।"
কথাটা বলে ইশরাক নিজের দলবল নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।প্রভা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।কিন্তু ইশরাকের বলা শেষের কথাগুলো প্রভার একদম ভালো লাগলো না।কেন বললো যে বকুলের সাথে ওর খুব শীঘ্রই দেখা হবে?
"কেন তুমি ওকে মা/রলে বকুল?তুমি জানো না কতটা খারাপ ও?তোমাকে মা/রতে ওর একবারও হাত কাঁপবে না।ও মানুষ না।"
"তাই বলে বাকিদের মতো চুপচাপ শুধু দেখে যাব?আমি এটা করতে পারিনা।আমার হরি আমাকে মানুষ বানিয়েছেন।আমি পশু না যে নির্দয় হবো।আর তুমি ভয় পাচ্ছ কেন?খুব বেশি হলে তো আমায় মে/রে ফেলবে, মা/রুক।কিন্তু তারপরেও চোখের সামনে অন্যায়টা যদি আমি চুপচাপ দেখে যাই তাহলে আমার হরি আমায় ক্ষমা করবে না।"
প্রভা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।বকুল যাই বলুক না কেন আজকের এই কাজটা একদম উচিত হয়নি।ইশরাক একটা নির্দয় মানুষ।কি যে মাথার মধ্যে চলছে কি করতে চলেছে কে জানে।
___________
"গায়ে হাত তোলাটা তোমার উচিত হয়নি বকুল।ওকে আমি খুব ভালো করে চিনি।এই অপমান ও এত সহজে ভুলবেনা।"
বকুলের এখন একটু হলেও চিন্তা হচ্ছে।তিসানের কথাটা শুনে চিন্তাটা আরও বেড়ে গেল।কিন্তু চিন্তা করে তো আর লাভ নেই।
"আরে তোমরা এত টেনশন নিচ্ছ কেন বলতো?আমার হরি আছে তো সে সব দেখে নেবে।এখন এসব বাদ দাও।তোমাদের সবার জন্য একটা জিনিস এনেছি।"
কথাটা বলে বকুল ব্যাগ থেকে দুটো কাচের বয়াম বের করল।একটা প্রভার দিকে বাড়িয়ে দিল আরেকটার মুখটা খুলে সবাই কে খেতে বলল।
"এগুলো নারকেলের নাড়ু।এটা আমাদের প্রসাদের না।আলাদা করে বানানো।গ্রাম থেকে ফেরার সময় মা বানিয়ে দিয়েছিল।তোমাদের সবার জন্য আনবো আনবো করে আনাই হয়ে ওঠেনা।মনেই থাকে না আমার।"
অন্য সময় হলে সবাই আনন্দ করে নাড়ুগুলো নিমষের মাঝে শেষ করে দিত।এর আগেও বকুল ওদের জন্য নাড়ু এনেছিল।সবারই ভীষণ পছন্দ সেজন্যই আবার এনেছে।কিন্তু আজ কারো মাঝে নাড়ু দেখে একটুও আনন্দ লক্ষ্য করা গেল না।বরং সবার চোখে-মুখে এখনো দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট বিদ্যমান।পাশ থেকে প্রভা বলে উঠলো,
"আপনাদের কাছে সাহায্য চাইতে আসাই আমার উচিত হয়নি।আপনাদের জীবনে এমনি অশান্তির শেষ নেই তার মাঝে আমি নতুন করে আবার অশান্তি তৈরি করেছি।"
নির্ভীক মৃদু রাগী কন্ঠে বলে উঠলো,
"আপনাকে কি আমরা কেউ বলেছি আমাদের জীবনে আপনি অশান্তি তৈরি করেছেন?যা করতে চাইছিলাম তা তো করতে দিলেন না।এখন প্লিজ অযথা এসব আজেবাজে কথা বলবেন না।"
"আপনার ইচ্ছেমত কাজ করতে দিয়ে অশান্তি আরও বাড়াই।অযথা মা/রা/মা/রি করে কি হবে?ইশরাকের শক্তির সাথে কি পেরে উঠবো আমরা?পারবো না তো।"
"আপনার কি মনে হয় মৃ/ত্যুতে আমি ভয় করি?যেদিন আমার ডাক পড়বে সেদিন আমায় যেতে হবে তার আগে আমার কিছু করতে পারবে না কেউ।ওর যে নোংরা হাত আপনাকে স্পর্শ করেছে সে হাতটা যদি ভেঙে দিতে পারতাম তাহলে শান্তি পেতাম।আপনার দিকে নিক্ষেপ করা ওর নোংরা দৃষ্টি,যে চোখ দিয়ে আপনার দিকে তাকিয়েছে সেই চোখ দুটো উপরে ফেলতে পারলে আমি শান্তি পেতাম।"
"মাথা গরম করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষ তো আপনি না।তাহলে আজ এমন করছেন কেন?"
"জানিনা।একটু বসে থাকুন দশ মিনিট পর আসছি। একা একা বাড়ি ফিরবেন না।এতোটুকু কথা অন্তত শুনুন।"
কথাটা বলে নির্ভীক উঠে চলে গেল।বকুলেরও আর বসে থাকতে ভালো লাগছে না।দিনের শুরুটা আজকে তার বড্ড বিচ্ছিরি ভাবে হলো।ওদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে ধরলে তিসান বলে উঠলো,
"সাবধানে থেকো বকুল।কোন দরকার পড়লে সঙ্গে সঙ্গে কল দেবে আমাদেরকে।"
বকুল সম্মতি জানিয়ে চলে গেল।প্রভা তিসানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"উনি কোথায় গেলেন ভাইয়া?মাথা গরম করে আবার ইশরাকের কাছে চলে গেল না তো?"
"আরে না।তুমি মানা করেছ তো আর যাবে না।রাগটা কমাতে গেল আরকি।"
"আমার ভয় করছে ওনার মাথা গরম হওয়া দেখে।"
"জানো তো প্রভা নির্ভীকদের সবার সাথে আমার পরিচয় প্রায় পাঁচ বছর হচ্ছে।আমার সব থেকে বেশি নির্ভীক কে ভালো লাগে।উৎসব এখানে নেই তাই বেঁচে গেলাম।না হলে এই কথার জন্য আমায় চেপে ধরতো। আর আমার ওকে ভালো লাগার সবথেকে বড় কারণটা কি জানো?ওর ঠান্ডা মাথা।ওর শান্ত স্বভাবটা আমার খুব ভালো লাগে।খুব একটা কঠিন পরিস্থিতি যেখানে তুমি মাথা গরম না করে থাকতেই পারবে না তেমন পরিস্থিতিতেও খুব ঠাণ্ডা মাথায় সবটা সামাল দিতে পারে।আজ প্রথম এর ব্যতিক্রম হল।আজ প্রথম কোন বিষয় নিয়ে আমি ওকে এতটা রাগতে দেখলাম।"
"আমিও তো ওনাকে সবসময় শান্তই দেখেছি কিন্তু আজকে ওনার এই রাগটা দেখে তো আমারও ভয় করছে।।"
"হঠাৎ এই পরিবর্তনের কারণটা কি বলতো?তবে কি চৈত্রের শেষে শুষ্ক মরুভূমির মতো মনটাকে সিক্ত করতে বর্ষার এক ফোঁটা বৃষ্টির আবির্ভাব ঘটলো?"
তিসানের কথাটা প্রভা ঠিক বুঝলো না।প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,
"একটু বুঝিয়ে বললে সুবিধা হতো ভাইয়া।"
তিসান আলতো হেসে বলল,
"তোমার সাথে একটা ছোট্ট ঘটনা ভাগ করি আজ।তুমি জানো কিনা জানিনা তবে আমি কিন্তু আমার পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি।তোমরা যে কলেজে পড়ছো একসময় আমি ঠিক সেই কলেজে পড়তাম কিন্তু আজ আমার সেই কলেজে প্রবেশ করা নিষেধ। এই কলেজ থেকে আমার ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে।"
প্রভা সত্যি এসব কিছু জানত না।বিস্ময়ে ওর মুখ হা হয়ে গেল।
"কিন্তু কেন ভাইয়া?"
তিসান হাসলো।সত্যি মানুষ হাসির আড়ালে কষ্ট লুকিয়ে রাখতে পারে।তিসানের সেই হাসি টাই হয়তো তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
"জীবনটা বেশ ভালোই কাটছিলো।হুট করে পড়ে গেলাম রাজনীতির নেশায়।ভাবলাম এটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেব।বিপরীত পাশে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছিল ইশরাক।তারপর একদিন জানলাম একজনের রাজনীতি পছন্দ না।তাকে পাওয়ার জন্য রাজনীতি ছাড়তে হবে।বিশ্বাস করো এই নিয়ে দ্বিতীয় বার আর কিছু ভাবিনি।চার বছরের রাজনৈতিক জীবন শুধুমাত্র তার জন্য ছেড়ে দিয়েছি।"
"কে সে?"
তিসান আনমনে হেসে বলল,
"ছিল একজন।আমার সবকিছু ছাড়া চলতো কিন্তু তাকে ছাড়া চলতো না।"
"এখন নেই?"
"আছে।সে তার মতন আছে আমি আমার মতন।"
"ছেড়ে তো দিলেন রাজনীতি তারপরেও পেলেন না তাকে?"
"রাজনীতি ছাড়ার সাথে সাথে তাকেও ছেড়ে দিয়েছি।জানো তো নির্ভীকের স্বভাব আমার সাথে অনেকটাই মিলে যায়।একজন কে আমি নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি কিন্তু যদি আমি না চাই সে বুঝবেও না।অনুভূতি গুলো খুব একটা প্রকাশ করিনা আমি।ভেবেছিলাম রাজনীতি ছেড়ে দিলে হয়ত সবকিছু থেকে দুরে সরে আসতে পারবো।কিন্তু পারলাম না।কোনো ক্ষমতা নেই আমার হাতে।ইশরাক ধরে ফেলল আমার দূর্বলতা।"
"তারপর?"
"তারপর আর কি?তার ভালোর জন্য তাকে ছেড়ে দিলাম।ভালোবাসি তো তাকে।তার গায়ে কলঙ্ক ছেটাতে দেই কি করে?সে যে পবিত্র।তার সেই পবিত্রতা রক্ষা করতে না পারলে যে আমার ভালোবাসাও অপবিত্র হয়ে যেত।"
প্রভার মাথাটা যেন ঘুরে উঠলো।তিসানের মতন কাঠখোট্টা মানুষও কোনো একজনের কাছে ভীষণ দূর্বল।কিন্তু আসল ঘটনাটাই তো এখনো বুঝলো না।
"ভাইয়া আসল সমস্যাটাই তো বুঝলাম না।"
"সে কথা অন্য কোনোদিন বলবো।এতটুকু তোমায় বলার কারণ হলো সবারই একটা দূর্বল জায়গা থাকে।যারা কাঠখোট্টা স্বভাবের হয় দেখবে একটা সময় তারাও হাসি খুশি মানুষ ছিল।তারাও ভালোবাসতে জানে।বাইরে থেকে আমরা নিজেদের যতই শক্ত দেখাই না কেন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে আমরা আটকে যাই।পুরুষ মানুষ কিসে আটকায় জানো?"
"কিসে?"
তিসান প্রাণ খুলে একটু হেসে চোখ দুটো বন্ধ করে বলল,
"কোনো রমণীর গায়ের মিষ্টি সুঘ্রাণে।তার প্রিয়তমার লম্বা চুলে,তার বোকা বোকা কথায়,তার ঘন পাপড়ি ওয়ালা চোখে।পুরুষ মানুষ আটকায় শাড়ি পড়া তার প্রিয় নারীতে।পুরুষ মানুষ আটকায় তার প্রিয়তমার পায়ের নুপুরের ঝুনঝুন শব্দতে।নারীর ক্ষমতা বিশাল।সারাজীবন মাথা উঁচু করে চলা মানুষটা এদের ভালোবাসায় অন্যের পায়ে পড়তেও দ্বিধা করেনা।"
প্রভা মুগ্ধ নয়নে কথাগুলো শুনল।এই মানুষটা একটু অন্যরকম।তার প্রতিটা কথা যেন হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রতিটা লাইনের মাধ্যমে সে তার ভালোবাসা প্রকাশ করলো।ইশ কি গভীরভাবে না ভালোবেসে ছিল সেই মেয়েটাকে!সে হয়তো একজন ভাগ্যবতী নারী হতে পারত!কে জানে এমন ভালবাসা আর কখনো তার কপালে জুটবে কিনা।আনমনে প্রভাকে কিছু একটা ভাবতো দেখে তিসান বলে উঠলো,
"আমার এতগুলো কথার মানে বুঝতে পারলে?"
"বিশেষ কিছু বোঝাতে চেয়েছিলেন কি?"
"হ্যাঁ।থাক যখন বোঝোনি আলাদা করে বোঝাবো না।নির্ভীকের মাথাটা যে আজকাল কেন এত গরম হচ্ছে কে জানে?আগে এমন ছিল না।হঠাৎ এই পরিবর্তনের যে কি কারণ বুঝতে পারছি না।কে জানে হয়তো আমার মতনই কোন মেয়ে ঘটিত কারণ হতে পারে।হয়তো নির্ভীকও কোথাও আটকে গেছে।কারো চুলের খোপায়,কিংবা কাজল কালো আঁখিতে অথবা হয়তো কারো অসহায়ত্বে।"
প্রভা যেন এবারে কিছু একটা আন্দাজ করতে পারল।কিন্তু কিছু বলতে পারলনা,তার আগেই নির্ভীক চলে এলো।গম্ভীর কন্ঠে প্রভা কে বলল,
"চলুন বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।"
"বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে কেন?আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি?রোজ রোজ তো আপনি আর আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে পারবে না।আমাকে একাই চলাফেরা করতে হবে।"
"যখনকার বিষয় তখন দেখা যাবে।এখন নিয়ে যেতে চাইছি চুপচাপ চলুন।যথেষ্ট মাথা গরম আছে আমার।"
"হুট করে মাথা এত গরম হলো কেন সেটাই তো বুঝতে পারছি না।"
প্রভার কথার নির্ভীক কোনো উত্তর দিল না।তিসান হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
"এইতো কিছুদিন হলো বসন্ত গিয়ে গ্রীষ্মের আগমন ঘটল।পাঁচটা ঋতুকে পিছনে ফেলে এ দেখি আবার অসময়ে আসতে চাইছে।অথচ এ জানেও না অসময়ে আসতে গেলে ওকে গ্রীষ্মের রোদে পুড়তে হবে,বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজতে হবে,মাঝে একটু স্বস্তি পাবে কিন্তু তারপর আবার শীতের হিমেল হাওয়া থেকেও নিজেকে রক্ষা করতে হবে।"
তিসানের কথায় প্রভার মাথাটা আবারো ঘুরে উঠল।এদের কারো কথাই প্রভা ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনা।সবাই কেমন ঘুরিয়ে কথা বলে যেন।নির্ভীক কিছু বুঝলো কিনা তার ভাবভঙ্গিতে প্রকাশ পেল না।তিসানের থেকে বিদায় নিয়ে ওরা চলে গেল।তিসান আনমনে হাসলো।একা একা বসে থেকে আর কিই বা করবে।বসা থেকে উঠে নিজের গন্তব্যের দিকে হাঁটা ধরলো সাথে গুনগুনিয়ে গাইল,
❝এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,
প্রেম মেলে না,
শুধু সুখ চলে যায়।❞