"মা কিছু টাকা হবে?"
তিসানের প্রশ্নে মিনা বেগম কাঁথার উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তিসানের দিকে তাকালেন।তিসান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।কথাটা বলতে তার ভীষণ লজ্জা করল।এত বড় একটা ছেলে মায়ের কাছে হাত পেতে টাকা চাইতে হচ্ছে যেখানে তিসানের উচিত ছিল নিজে ওর মাকে কিছু টাকা দেওয়ার।মিনা বেগম বুঝলেন ছেলের লজ্জার কারণ।
"আমার কাছে তো বেশি টাকা হবে না।তোর বাবার কাছ থেকে নিয়ে যা।"
"তোমার কাছে কত হবে?"
"আমার কাছে দুইশো টাকার মতন হবে।"
"আচ্ছা ঠিক আছে ওটা দিয়েই হবে।তুমি ওই দুইশো টাকাই দাও।"
তিসানকে টাকাটা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মিনা বেগম বিছানা থেকে উঠতেই তোফায়েল শিকদারের কন্ঠ পেলেন তিনি।তিসানকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বললেন,
"মায়ের কাছ থেকে টাকা চাইতে লজ্জা লাগে না বাবার কাছ থেকে চাইতে লজ্জা লাগে কেন?"
তিসান স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
"মার থেকে টাকা চাইলে কথা শুনতে হয় না,খোটাও দেয় না আমায়।কিন্তু তোমার থেকে টাকা চাইলে তুমি টাকাটা দাও ঠিকই কিন্তু তার আগে কিছু এমন বি/ষা/ক্ত কথা শোনাও যেগুলো শোনার পরে টাকাটা নেওয়ার আর ইচ্ছে থাকে না।সেজন্য মায়ের কাছ থেকে টাকা চাইতে লজ্জা না করলেও তোমার কাছ থেকে টাকা চাইতে আমার লজ্জা করে।"
"এত যখন লজ্জা তাহলে নিজে কিছু করতে পারো না?"
"চাকরির সুযোগ গাছে ধরে না যে গাছ থেকে পেড়ে নেব।"
"তুমি যে বললে একটা জায়গায় নাকি ইন্টারভিউ এর জন্য ডাক এসেছিল।সেটার কি হলো?"
"টাকা কামানোর জন্য আগে টাকা ঢালতে হবে।ঘুষখোর গুলোকে বোঝাতে পারলাম না যে যদি আমার এতগুলো টাকা দেওয়ার সামর্থ্য থেকেই থাকতো তাহলে আমি আর ওখানে অন্যের হুকুম অনুযায়ী চলার জন্য চাকরি করতে যেতাম না।"
তোফায়েল শিকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।মিনা বেগম টাকাটা তিসানের হাতে দিতেই তিসান সেটা নিয়ে চলে যেতে ধরলে তোফায়েল শিকদার জিজ্ঞেস করলেন,
"কিসের জন্য টাকা প্রয়োজন?"
"হাত খরচের জন্য।একটা বন্ধু এক্সিডেন্ট করেছে ওকে দেখতে যাব।সেখানে কিছু নিয়ে যাওয়ার জন্য চাইলাম।"
"দুইশো টাকা দিয়ে কি নিয়ে যাবে?"
"যা নিয়ে যাওয়া যায় তাই নিয়ে যাব।"
তিনি পকেট থেকে দুইশো টাকার একটা নোট বের করে তিসানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
"ধরো এই টাকাটা রাখো।অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাচ্ছো একটু ফল-মূল কিছু নিয়ে যেও।"
তিসান হাল্কা হেসে বলল,
"তুমি আমায় চিন্তায় ফেলে দাও কেন বলতো?আজকাল আমি তোমায় বুঝতে পারিনা।"
তোফায়েল শিকদার মলিন হেসে বললেন,
"আজ সাতাশ বছরের জীবনে গত দু'বছর হলো তোমাকে কথা শোনানো শুরু করেছি।তার আগে পঁচিশ টা বছর কিন্তু তোমাকে আমিই খাইয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছি।কখনো কি তোমাকে বলেছি যে নিজের খরচ নিজে চালাও?তখন আমি নিজে উপার্জন করতাম,আমার গায়ে শক্তি ছিল।আমি জানতাম আমি আমার পরিবারের খরচ চালাতে পারবো।এখন আমার চাকরি নেই,গায়ে বল শক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে।আজ আছি তো কাল নাও থাকতে পারি।কিন্তু এখন তোমায় বুঝতে হবে যে তোমার বাবা সারা জীবন থাকবে না।"
"থাকলে কি খুব ক্ষতি হতো?মানলাম থাকবে না, যতদিন আছো ততদিন কি একটু ভালোভাবে অনুভব করাতে পারো না যে তুমি আছো?"
তোফায়েল শিকদার আর কিছু বললেন না।কি করে ছেলেকে তিনি বোঝাবেন যে ছেলের চিন্তাতে ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করেন।যদি দুই ভাইয়ের মাঝে সম্পর্ক ভালো হতো তাহলে তার এতো চিন্তা ছিল না।যদি তিসানের জায়গায় আজ তার বড় ছেলে আর তার বড় ছেলের জায়গায় তিসান থাকত তাহলেও তার এতো চিন্তা ছিল না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"এই জীবনে কি এমন অপরাধ করেছি যার শাস্তি আল্লাহ আমার সন্তানকে এভাবে দিচ্ছে?কখনো তো কারো কোন ক্ষতি করিনি।তাহলে আজ আমার আল্লাহ আমার দু চোখ থেকে শান্তির ঘুম কেন কেড়ে নিলেন?"
"সত্যি কখনো কারো কোনো ক্ষতি করোনি তুমি আব্বু?একটু ভালো করে মনে করে দেখো তো একবার জীবনে কি কোন অপরাধ করোনি?"
তোফায়েল শিকদার চমকে উঠলেন।তার ছেলে কোন অপরাধের কথা বোঝাতে চাইলো তাকে?মিনা বেগম হালকা ধমকের সুরে তিসানকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
"এত বেশি কথা বলিস কেন?টাকা দিয়ে দিয়েছি তো কোথায় যাচ্ছিলি যা।"
তিসান তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
"একটা পাপকে সমাজের থেকে আড়াল করার জন্য মাটি চাপা দিয়ে হয়তো রেখেছো কিন্তু যার দেখার সে ঠিকই দেখে নিয়েছে।সব অপরাধীরই তার শাস্তি প্রাপ্য।যে অপরাধ করেছে তার শাস্তি তো পেতেই হবে।"
তোফায়েল শিকদার মাথা তুলে তাকাতে পারলেন না ছেলের দিকে।তিসান সেখানে আর দাঁড়ালো না চলে গেল।মিনা বেগম এগিয়ে এসে স্বামীর কাঁধে হাত রাখলেন।
"আমি সত্যি অনেক বড় পাপ করেছি তাই না মিনা?"
"জানিনা।আমার আদর্শ তুমি।তুমি কোন ভুল করতে পারো এটা আমি কল্পনাও করতে পারিনে।কিন্তু কেন যেন......."
"কি?"
"এই একটা কথা আমারও মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে।তখন মনে হয় যে জীবনে তুমি খুব বড় একটা অন্যায় করে ফেলেছো।আর এই পাপের শাস্তি হয়তো আমার ছেলেটার জীবন ধ্বংস করে দিল।"
তোফায়েল শিকদারের অন্তর আত্না যেন কেঁপে উঠলো।তিনি নিজেও জানেন যে তিনি খুব বড় একটা পাপ করে ফেলেছেন।শুধু মানতে চান না।প্রতিটা মুহূর্তে সেই স্মৃতিগুলো এড়িয়ে যেতে চান।কিন্তু পারেন না এড়িয়ে যেতে।কোন না কোনমতে সেগুলো ঠিক মনে পড়ে যায়।সে পাপটাই যেন তার পিছু ছাড়ছে না।এই পাপের থেকে মুক্তি পেতে চান কিন্তু কোন রাস্তা মেলে না।সেই পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার সময় যে শেষ হয়েছে বহু বছর আগে কারো জীবনের বিনিময়ে।