ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৩১

🟢

আজ প্রায় এক সপ্তাহ হতে চললো প্রভা বাড়ি থেকে বের হয়নি।প্রতি দিনই নির্ভীক বাড়িতেই ওর সাথে দেখা করতে এসেছে।বাকিরা অবশ্য প্রতিদিন আসতে পারেনি তবে এক সপ্তাহের মাঝে কমপক্ষে পাঁচদিনই দেখা করে গেছে।প্রভা যেন বাড়িতে বসে বসে বিরক্ত না হয়ে যায় সেজন্য তারা সামান্য কিছু সময়ের জন্য হলেও প্রভাকে একটু হাসাতে এসেছিল।এখন প্রভা পুরোপুরি সুস্থ।তাই আজ সবাই কে ওদের বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছে।অনাথ আশ্রম থেকে রোমানা বেগমের ও আজ প্রভাকে দেখতে আসার কথা আছে।এই কদিন নির্ভীক সহ বাকিরা সবাই যেভাবে ওদের পাশে থেকেছে সেটা সত্যি কল্পনাতীত।প্রভাদের বিপদে ওদের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ আছে সেটা সত্যি প্রভাদের জানা ছিল না।অবশ্য এর আগে এত মানুষ ছিল না।এইতো কটা দিন হলো এদেরকে পেয়েছে।সবার দুপুরে আসার কথা থাকলেও নির্ভীক সকাল সকালই চলে এসেছিলো।এতগুলো মানুষকে দাওয়াত দিয়েছে খাবার দাবারের আয়োজনও তো বেশ অনেকই করতে হবে।দুটো মেয়ে একা একা বাজার করবে কি করে?তার মধ্যে প্রভাও অসুস্থ,সৌমিরও একটা অসুস্থতা আছে। সেজন্যই নির্ভীক সকাল সকাল চলে এসেছে।দুপুরের দিকে একে একে বাকি সবাই এলো।প্রভা উৎসবের সাথে ঊষাকেও আনতে বলেছিল।প্রেয়নাকেও আলাদাভাবে আসতে বলেছিল।উৎসব আসার সময় নির্ভয় কে নিয়ে এসেছে।তিসান আলাদা ভাবে একাই এসেছে।প্রভা বকুলের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু ওই ঘটনার পর থেকে বকুলের কোন খোঁজ পাচ্ছে না।ফোনটা বন্ধ,কলেজেও একদিনও আসেনি।কত ভালো একটা সম্পর্ক আজ শেষ হতে চলেছে।প্রভার খুব খারাপ লাগে।মাঝে মাঝে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।ভাবে যে বকুলকে অপমান করেনি তো সেদিন?কিন্তু ওর মনে তো বকুলের জন্য কোন জায়গা নেই।যাকে ভালোবাসতে পারবে না তাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে তো কোন লাভ নেই।সবার শেষে প্রেয়না এলো।প্রভা আর সৌমির আজ ভীষণ আনন্দ হচ্ছে।ওদের বাড়িতে কখনও কোন মেহমান আসে না।কখনো কাউকে দাওয়াত দিতে পারেনি আর না তারা কখনো দাওয়াত পায়।সেখানে আজ তাদের বাড়িতে কত মানুষ!সবাই খুব কাছের।সবাই ওদের ভালো বন্ধু,শুভাকাঙ্ক্ষী।সবাই আসার পর থেকে নির্ভীকের দেখা পাচ্ছে না।সকাল থেকে প্রভাদের সাথে থাকলেও ওরা আসার একটু আগেই নির্ভীক বেরিয়েছে কি যেন একটা দরকারি কাজে,এখনো ফেরেনি।এদিকে উৎসব খুব করে প্রভার সাথে কথা বলার জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু সময় করে উঠতে পারছে না।প্রভা তো রান্নাঘরে রান্না করতে ব্যস্ত।সেখানে অবশ্য বাকি মেয়েরা আছে কিন্তু ওদের মাঝে উৎসব ঢুকতে পারছে না।নির্ভয় তো বিছানায় চুপচাপ বসে আছে।বেশি নড়াচাড়া করলে তার পা বড্ড ব্যথা করে।এরই মাঝে উৎসব বেশ কয়েকবার রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে আবার ঘুরে এসেছে। তিসান খুব মনোযোগ দিয়ে উৎসবকে পর্যবেক্ষণ করছে।তার আবার আশেপাশের সবকিছুর উপর গভীর লক্ষ রাখতে ভীষণ ভালো লাগে।এক পর্যায়ে উৎসব বিরক্ত হয়ে তিসানের পাশে এসে বসলো। বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,

"এই মাস্টান্নি আর কাজ পায়নি।একদিনে এত মানুষকে দাওয়াত দিতে কে বলেছিল?আরে ভাই শুধু আমরা কজন আসতাম তাতে কি হতো না?"

তিসান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

"তোমার এত ফা/ট/ছে কেন ভায়া?ব্যাকুলতা একটু কমাও।"

"তুমি আগে নিজের দিকে তাকাও তো।প্রিয়ু কে দেখে তো মুখটা ফাটা বেলুনের মতন চুপসে গেছে।মনের মধ্যে তো পপকর্ণ ফুটছে আর আমায় বলছো ব্যাকুলতা কমাতে।"

"প্রিয়ুর জন্য আমার মনে পপকর্ণ ফোটাটা স্বাভাবিক কিন্তু তোমার ফুটছে কেন?ব্যাপারটা কি বলোতো?মা/রা খেলে নাকি?"

উৎসব নিজেই নিজের জিভে একটা কা/মড় বসালো।ভুল মানুষের সামনে সে ভুল কথাটা বলে ফেলেছে।এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বলল,

"আরে ধুর!আমি কি আমার কথা বলেছি নাকি?আমি তো তোমার কথার সাথে মিলিয়ে কথাটা বলতে চাইলাম আর কি।মানে তোমার মনে যে পপকর্ণ ফুটছে সেটাই বোঝাতে চাইছিলাম।"

উৎসবের বলা কথাটা তিসানের একদমই বিশ্বাস হলো না।তাচ্ছিল্যপূর্ণ হেসে বলল,

"বানিয়ে উত্তর দেয়ার আগে অভ্যাস করো ভায়া তারপর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করো।তোমার চোখ পড়তে শিখে গেছি আমি।কার থেকে লুকাতে চাইছো যে তোমার মিথ্যাটাকে ধরে ফেলতে জানে তার কাছে? বৃথা চেষ্টা করো না।"

উৎসব আরো কিছু বলতে নেবে তার আগেই সেখানে প্রেয়না এলো।তিসানের নাম ধরে ডাকতেই দুজনের নজরই প্রেয়নার উপর পড়লো।উৎসব ঠোঁট টিপে হেসে তিসানের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

"আমার চিন্তা বাদ দিয়ে এখন নিজের চিন্তা কর।ভেতর থেকে তোমার হৃদয়টা ধুকপুক করতে করতে লাফ দিয়ে বেরিয়ে না এলে হয়।"

তিসান মৃদু হেসে ধীর কন্ঠে উৎসব কে বলল,

"এত দূর্বল না আমার হৃদয়।লাফাতে লাফাতে আবার একাই শান্ত হয়ে যায়।আমাকে আলাদা করে কষ্ট করে ওকে শান্ত করাতে হয় না আজকাল।"

উৎসব মুখ বাঁকালো।এই ছেলেটার সাথে উৎসব কখনো কথায় পেড়ে ওঠে না।তিসান যেন পণ করেছে মনে মনে উৎসবকে কখনোই জিততে দেবে না।

"আমার ফোন ধরোনা কেনো তুমি?"

প্রেয়নার প্রশ্নে দুজনের মনোযোগ আবার ওর দিকে গেল।নির্ভয় অবশ্য সব শুনছে কিন্তু সে কোন মন্তব্য জানাতে চাইছে না।তিসান স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

"খেয়াল করা হয়নি।"

"কোন সময় খেয়াল করো না তাই বলে?আচ্ছা মানলাম যখন ফোন দেই তখন নাহয় খেয়াল করোনি,কিন্তু পরবর্তীতে তো দেখে একটা কল করতে পারো।"

"তুমি জানো না আমি বেকার।আমার ফোনে ব্যালেন্স থাকে না কল ব্যাক করব কি করে?"

"মিসড কল দিতে পারো,নাহলে রিকোয়েস্ট কলও দিতে পারো।এত অজুহাত কেন দিচ্ছ?আমি জানি তুমি ইচ্ছে করে আমার কল ধরো না তাই না?"

প্রেয়নার কথায় সম্মতি জানিয়ে উৎসব বলে উঠলো,

"একদম ঠিক ধরেছেন।এই মা/রা খাওয়া প্রাণী ইচ্ছে করে আপনার ফোন ধরে না।জানে তো যে আবার মা/রা খাবে সেই ভয়েতে ধরে না।"

তিসান চোখ বড় বড় করে উৎসবের দিকে তাকাতেই ও থেমে গেল।কিন্তু উৎসবের বলা কথাটার আসল অর্থ প্রেয়না উদঘাটন করতে পারল না।ফলস্বরূপ প্রশ্ন করল,

"কি হবে আমার সাথে কথা বললে?"

উৎসব উত্তরটা দিতে নেবে তার আগে তিসান ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

"কিছু হবে না।ওর কথায় কান দিও না।তাহমিনা কেমন আছে?"

"ভালো আছে।ভাইয়ার উপরে এত রাগ দেখালে কেন সেদিন?যখন একজনের মাথা ঠান্ডা হয় তখন আর একজনের মাথা গরম হয়ে যায় তোমাদের।এমন করতে থাকলে সম্পর্কটা ঠিক হবে কি করে আবার বলোতো?"

তিসান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

"তোমার কি মনে হয় আমি ঠিক করতে চাই এই সম্পর্কটা?"

"আমি চাই।"

"সব সময় চাইলেই সব সম্ভব হয় না।যে কোনো সম্পর্কের মাঝে যখন একটা ব্যবধান চলে আসে না তখন আর সে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয় না। তোমার ভাই আগে আমার সাথে বন্ধুত্ব কেন করেছিল বলোতো?কারণ তখন আমি ওর সমপর্যায়ে ছিলাম। কিন্তু এখন ও আমার থেকে অনেক উচ্চ পর্যায়ে আছে। আর আমি ওর থেকে কয়েক গুণ নিচে আছি।এখন আমার সাথে সম্পর্ক রাখলে তো তোমার ভাইয়ের সম্মানহানি হবে।তুমি অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করছো।করোনা।"

প্রেয়না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।ওদের কথাবার্তার মাঝেই সেখানে প্রভা এলো।

"আমাকে ফেলে একা একা সবাই গল্প করছো?"

প্রভার কথার প্রেক্ষিতে উৎসব বলে উঠলো,

"আরে না মাস্টান্নি গল্প করছিনা।এই দুটো ঝগড়া করছে।"

"কেন?ঝগড়া কেন করছে?"

"কেন যে ঝগড়া করছে সেটাই আমি বুঝতে পারছি না। যাকে নিয়ে ঝগড়া করছে সে তো আরামসে বিদেশে এসির নিচে বসে আছে।অযথা এই দুটো মিলে আমার মাথাটা খারাপ করছে।"

প্রভা হালকা হেসে একটা টুল টেনে নিয়ে বসলো।বিছানায় নির্ভয় চুপচাপ বসে আছে।নির্ভয়ের নীরবতা প্রভার পছন্দ হলো না।

"নির্ভয় ভাইয়া এতো চুপচাপ কেন?"

"এমনি।"

"আরে এমনি বললে হলো নাকি?আপনি তো এত চুপচাপ থাকার মানুষ না।সৌমির সাথে আজ ঝগড়াও হলো না।আপনার ব্যাপারটা কি বলুন তো?"

তিসান আলতো হেসে বলল,

"ভায়া আমার মহা বিপদের মাঝে আছে প্রভা।মনের মাঝে লুকিয়ে রাখা ভয় গুলো কথা বলার শক্তি কেড়ে নিয়েছে।"

"কিসের ভয়?"

"ও তুমি বুঝবে না।মনে মনে এটা চাও যেন তোমার মনে কখনো এমন ভয় না জমে।"

______________

বিজ্ঞাপন

আকাশটা আজ বেশ মেঘলা।সকালের দিকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হয়েছে।এখন পরিবেশটা থ মেরে আছে। যেকোনো সময় প্রকৃতিতে তাণ্ডব চালাতে পারে।প্রভা আর সৌমি প্রেয়না আর ঊষাকে নিয়ে ছাদে এসেছে।রান্নাবান্না ওদের শেষ।এখন অপেক্ষা করছে শুধু নির্ভীকের আসার জন্য।নির্ভীক এলেই সবাই খাওয়া দাওয়া করবে।উৎসব আসতে চেয়েছিল উপরে কিন্তু তিসান ওকে আসতে দেয়নি।এজন্য উৎসব তিসানের উপর বেজায় খেপেছে।নিজে যাবে না ভালো কথা তাই বলে উৎসবকে কেন যেতে দিলো না।এই সুযোগে তো একটু প্রভার সাথে কথা বলা গেলেও যেতে পারতো।তিসানের জন্য এই সুবর্ণ সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেল উৎসবের।ছাদে দাঁড়িয়ে বিল্ডিং এর নিচে বেশ ভালোভাবে দেখা যায়।দূর থেকে নির্ভীক কে হেঁটে আসতে দেখলো ঊষা।এটাই একমাত্র সুযোগ নির্ভীকের সাথে একা কথা বলার।এই সুযোগটার জন্যই তো ঊষার এখানে আশা।আজও যদি নির্ভীকের সাথে কথা বলতে না পারে তাহলে যে সব শেষ হয়ে যাবে।একটা শেষ চেষ্টা করতেই হবে আজ।দৌড়ে নিচে চলে যেতে দিলে প্রভা ওকে পিছন থেকে ডাকলো।

"কোথায় যাচ্ছ ঊষা?"

ঊষা হালকা তুঁতলিয়ে বলল,

"একটু ওয়াশ রুমে যাবো ম্যাম।আপনারা এখানেই থাকুন আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।"

প্রভা সায় জানাতেই ঊষা একপ্রকার ছুটে নিচে গেল।প্রভা আসতে দেখেছে নির্ভীক কে।ঊষার এই নিচে ছুটে যাওয়ার কারণটাও হয়তো সে আন্দাজ করতে পারলো।ঊষাকে আর সেজন্যই আটকালো না।নিজেও আর নিচে গেল না।একটু কথা বলুক আলাদা করে। যদি ওরা একে অপরের জন্য কোন কিছু অনুভব করে থাকে তাহলে তো প্রভার করার কিছু নেই।ওদেরকে আটকানোর কোন প্রশ্নই আসে না।এই বোঝাপড়াটা বরং ওরা নিজেরাই নিজেদের মতন করে করুক।

_________________

মেইন দরজায় নক করার আগেই ঊষা এসে দরজাটা খুলে দিল।ঊষাকে দেখে নির্ভীক একটু চমকালো সাথে অপ্রস্তুত হয়েও পড়ল।কেন যেন ঊষার সামনে দাঁড়াতে তার আজকাল বেশ অস্বস্তি হয়।এদিকে ঊষা হাঁপাচ্ছে। হাঁপানো কন্ঠে নির্ভীক কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"সেই কখন থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।"

"কেন কিছু বলবে?"

"হ্যাঁ আপনার সাথে খুব দরকারী কথা আছে।প্লিজ আমাকে দশটা মিনিট সময় দেবেন?"

"আচ্ছা ঠিক আছে বলব।কিন্তু ভিতরে গিয়ে কথা বলি।এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলব?"

"না ভিতরে গেলে হবে না।সবার সামনে আমি বলতে পারব না এই কথাটা।আপনাকে কখন একা পাবো সেই সুযোগটাই তো খুঁজছিলাম।প্লিজ দশটা মিনিট সময় দিন।"

"আচ্ছা ঠিক আছে বল।"

ঊষা বাইরে থেকে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে দরজার এক পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।কথাটা বলতে তারও অস্বস্তি হচ্ছে।বরাবরই ঊষা চাপা স্বভাবের মেয়ে।কারো সাথে খুব সহজে মিশতে পারে না।নিজের মনের কথাগুলোও স্বাভাবিকভাবে বলে দিতে পারেনা।সেখানে একটা মেয়ে হয়ে নিজের মনের কথা একটা ছেলেকে বলা যে কতটা কঠিন একটা বিষয় সেটা এই মুহূর্তে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছে।তার উপর যেখানে সেই ছেলেটা একবার প্রত্যাখ্যান করেছে ঊষাকে।ওড়নায় আঙ্গুল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,

"বাড়ি থেকে আমার বিয়ে ঠিক করছে।"

নির্ভীক হেসে বলল,

"এটা তো ভালো কথা।উৎসব তো আমায় বলেনি এ বিষয়ে কিছু।"

"আমি করবো না এই বিয়ে।আমি পারবো না করতে এই বিয়েটা। "

নির্ভীক স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

"মত নাই থাকতে পার,এটা তো স্বাভাবিক।তোমার বাবা মাকে জানাও।না হলে উৎসব আছে তো ওকে বলো।ও কখনোই তোমার মতের বিরুদ্ধে তোমার বিয়েটা হতে দেবে না।"

ঊষা আহত হল।নির্ভীক কি সত্যি বুঝতে পারছে না যে ঊষা কেন এই বিয়েটা করতে চাইছে না নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করছে?ব্যথাতুর গলায় বলল,

"আমি কেন এই বিয়েটা করতে চাইছি না সেটা আপনি জানেন না?বুঝতে পারছেন না আপনি?"

নির্ভীক ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

"দেখো ঊষা তোমাকে আগেও বলেছি যে আমার মনে তোমায় নিয়ে কোন অনুভূতি নেই।আর তাছাড়া আমার কোন ভবিষ্যতের ঠিক ঠিকানা নেই,আমার কোন নির্দিষ্ট বাসস্থান নেই।আমার সাথে নিজের জীবনটা জড়িয়ে অযথা সেটা ঝামেলায় ভরে তুলোনা।তোমার সামনে কত সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ আছে বলোতো।তোমার বাবা মা যেখানে তোমার বিয়ে ঠিক করছে সেখানে তোমার উজ্জ্বল একটা ভবিষ্যত আছে যেটা তুমি আমার সাথে কখনোই পাবে না।"

"আমি তো এত কিছু চাই না।ছোটবেলা থেকে সবকিছু পেয়ে এসেছি।শুধু একটা জিনিস পাইনি সেটা ভালোবাসা।সেটা আপনার থেকে পেতে চাই।টাকা দিয়ে তো ভালোবাসাটা পাওয়া যায় না।আর আমার তো শুধু এটাই চাই।তাহলে আপনি আমাকে ভবিষ্যতের কোন নিশ্চয়তার কথা বলছেন?"

"তুমি অনেক ছোট ঊষা।বাস্তবতা সম্পর্কে তোমার জ্ঞান অনেক কম।তোমার জীবনে ভালোবাসা নেই এইজন্য হয়তো তোমার জীবনটা অর্ধেক মূল্যহীন লাগছে।কিন্তু বাকি অর্ধেকের যে মূল্যটা আছে তোমার জীবনের সেটা তোমার কাছে টাকা আছে জন্যই।কিন্তু দেখো আমার কাছে টাকাও নেই ভালোবাসাও নেই সেজন্য আমার জীবনটা পুরোটাই আমার কাছে মূল্যহীন লাগে।আর যার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই মানুষটা তো তোমাকে ভালোবাসবে তাই না?তাহলে এতো চিন্তা করছো কেন।"

"আর যদি ভালো না বাসে?"

"ভালো তো আমিও তোমাকে কখনো বাসতে পারবো না"

"দয়া করতে পারবেন না?"

"দয়া করে কি ভালোবাসা যায়?না আমি তোমাকে কখনো ভালোবাসতে পারব,না কখনো দয়া করতে পারবো।"

ঊষার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।দুই হাতে সেটা মুছে নিল।ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

"এই অবহেলার কারণটা কি জানতে পারি?আমার কি এমন কমতি আছে বলতে পারেন যার জন্য বারবার আমাকে এভাবে প্রত্যাখ্যান করেন?একটুও জায়গা দিতে পারলেন না নিজের জীবনে?আমি কি দেখতে অসুন্দর?আমার চালচলন কি ভালো না?নাকি আমি আপনার মনের মতন হয়ে উঠতে পারিনি?কোনটা বলুন তো?একবার কারণটা বলুন আমি সেটা বদলানোর চেষ্টা করবো।আমি আপনার জন্য আপনার মনের মতন হয়ে উঠবো দেখবেন।"

"তোমার কোন খামতি আমার না এর কারণ না।তুমি আমার জন্য কেন নিজেকে ছোট করে দেখছো?আমি কখনো তোমাকে ভালোবাসতে পারিনি,পারবোনা এর সমাধান কি করে দেবে?আমি জানিনা কেন কিন্তু আমি পারিনি কখনো তোমায় ভালোবাসতে।"

"তাহলে আমি কেন আপনাকে ভালোবেসে ফেললাম বলুন তো?আর আপনি কেন আমায় ভালোবাসতে পারলেন না?"

"বেশ তোমায় তবে আজ একটা কারণ বলি তোমাকে ভালো না বাসতে পারার।প্রথমবার যখন আমি তোমায় না করেছিলাম তখন আমার কাছে এমন কোন কারণ ছিল না।তখন আমার একটা কথাই মনে হতো যে আমি তোমায় ভালোবাসতে পারিনি কিন্তু কেন পারেনি সেটা আমি জানতাম না।কিন্তু আজ আমি জানি যে আমি কেন তোমায় ভালোবাসতে পারিনি।"

ঊষা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

"কেন?"

"আমি ভালোবাসি।একজনকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।এ জীবনে তাকেই ভালোবাসতে পেরেছি আর মনে হয় না কখনো কাউকে ভালোবাসতে পারব। ভালো তো একজনকে বেশে ফেলেছি তাহলে তোমাকে আবার কি করে জায়গা দেই?বিশ্বাস করো তোমাকে কষ্ট দিতে আমি চাইনা।কিন্তু আমার কাছে তো কিছু করার নেই।তুমি যেমন আমাকে ভালোবাসো আমিও তেমনি যে অন্য কাউকে ভালোবাসি।"

ঊষার কেন যেন বুক ফেটে কান্না আসছে।দম বন্ধ হয়ে আসছে।এখন নিজেরই নিজের ওপর রাগ হচ্ছে।কেন নির্ভীকের থেকে কারণটা জানতে চাইলো?এই সত্যটা অজানা থাকলে বোধহয় ভালো হতো।অন্তত এতটা কষ্ট হতো না।এই তবে নির্ভীকের না এর কারণ।নির্ভীকের মনে অন্য কেউ রাজত্ব চালায় তবে ঊষার মনে কেন নির্ভীকের রাজত্ব চলে?এমনটা তো না হলেও পারতো।

"কে সে জানতে পারি?"

"আপাতত না হয় তা অজানাই থাক।এখনো যে আমি তাকে নিজের মনের কথাটা বলে উঠতে পারিনি।আমায় ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো ঊষা।তুমি যেটা চাইছো সেটা সম্ভব না।আমি পারবো না তোমায় ভালোবাসতে।ওই একটা মানুষকে ভালোবেসে আমি থমকে গেছি।তাকে ছাড়া আর কাউকে আমার মনে ধরেওনি আর না কখনো ধরবে।"

"সে কেমন আমায় একটু বলবেন?আমি নাহয় তার মতন হওয়ার চেষ্টা করবো!"

নির্ভীক স্মিত হেসে বলল,

"কেউ কারো মতন হতে পারেনা ঊষা।সবাই নিজের মতন করে সেরা।"

"তবুও বলুন না সে কেমন?সেই ভাগ্যবতীর সম্মন্ধে খুব জানতে ইচ্ছে করছে।"

নির্ভীক আনমনে হালকা হেসে বলল,

"সে ভীষণ অদ্ভুত!আমার শান্তি সে।সদ্য ফোঁটা ফুলের মতন,তার মনটা খুবই কোমল।বৃষ্টির শব্দে যেমন মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়,ঠিক তেমনি তার গলায় স্বর শুনলে আমার মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়।আকাশের বিশাল চাঁদের মতন সে স্নিগ্ধ,সুন্দর।তার চুলের গন্ধ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুগন্ধিকেও হার মানাতে পারে।তার দৃষ্টিতে কখনো থাকে নির্মলতা,কখনো বা থাকে সূর্যের মতন তেজ।আর তার হাসি?এটা বর্ণনা করা সম্ভব না।সেই হাসি শুনলে যে আমি ঘোরের মাঝে চলে যাই।তাই কখনো কোনো কিছুর সাথে মেলানোর সুযোগ পাইনি।আমি যেমন চাই সে তেমনই।কখনো কোমল তো কখনো কঠোর।তাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।সে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব না।"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প