ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৩৫

🟢

সেদিনকার মতন সূর্যের বিদায় ঘটেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে।ধরণীতে তখন রাজত্ব চাঁদের তার সাথে অসংখ্য তারার।সেই চাঁদের আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হতেই মারাত্মক একটা সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি হল।সেই নদীর ধারে ঘাসের উপর গোল হয়ে বসে আছে কয়েকজন মানুষ।চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট ভাবে তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে।তবে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মানুষগুলোর অবয়ব।কারো মুখে গম্ভীর ভাব,তো কারো মুখে আবার ক্লান্তি।কারো চোখ মুখে আবার এক রাশ প্রশ্ন,কেউ বা আবার সেই প্রশ্নের উত্তর শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে বসে আছে,আর কেউ সেই উত্তর দেওয়ার ভয়ে চুপচাপ বসে আছে।সবকিছু মিলিয়ে একটা গুমোট পরিবেশে সৃষ্টি হয়েছে।অথচ এই মানুষগুলো একসাথে থাকলে হাসি আড্ডায় পরিবেশটা মাতিয়ে রাখে।তবে আজ কি হলো তাদের?

"তুমি উত্তর না দিলেই কি সত্যিটা চাপা থাকবে ভাই?"

নীরবতা ভেঙে নির্ভয় তিসানকে প্রশ্নটা করল।বাকিরা সবাই নীরব দর্শক।

"জানলে তোমারই কষ্ট হবে।অযথা নিজের কষ্ট বাড়াতে চাইছো কেন?যা যেমন চলছে সেভাবেই চলতে দাও। সব সত্যি জানতে নেই।"

"তুমি ভালোবাসো প্রেয়না কে।"

অপ্রত্যাশিতভাবে কথাটা বলতে নির্ভয়ের খুব কষ্ট হলো।বুঝতে পারছে না ওর তিসানের জন্য খারাপ লাগছে না নিজের জন্য খারাপ লাগছে।তবে হ্যাঁ বুকের ভিতর প্রচন্ড কষ্ট আর বিষাক্ত যন্ত্রণা অনুভূত হচ্ছে।

তিসান বরাবরের ন্যয় স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

"চিন্তা করো না প্রিয়ু আমায় ভালোবাসে না।পাগ/লামি তো শুধু আমি একাই করে গেছি।এই পাগ/লামির মাঝে প্রিয়ু কখনোই সামিল ছিল না।"

কথাগুলো বলার সময় তিসান অনুভব করতে পারল যন্ত্রণা কাকে বলে।তিসান কে বুকে পাথর চাপা দিয়ে কথাটা বলতে হচ্ছে যে ও যাকে ভালোবাসে সেই মানুষটা তিসান কে ভালোবাসে না।

ওদের আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বাকি সবাই সব কিছু বুঝলেও একমাত্র বুঝতে পারছেনা সৌমি।ঘটনা হালকা হালকা বোধগম্য হচ্ছে আর বাকিটা মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।এসবের মানে কি তবে তিসান অন্য কাউকে ভালোবাসে?ওদের কথা শুনে তো তাই মনে হচ্ছে।সেজন্য তিসান মেয়েদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে?সৌমি ভয় পেয়ে ওর হাতটা ধরলেও হাত ছাড়িয়ে নেয়,ওর দিকে তাকিয়ে কথাও বলে না কখনো।সব সময় তিসানের দৃষ্টি থাকে স্বাভাবিক।কিন্তু সৌমি যে নিজের মনের মাঝে অনুভূতি তৈরি করেছে তিসানের জন্য তার কি হবে?এই অনুভূতিগুলো তো এখন আর ভোলা সম্ভব না।

এদিকে বাকি সবার এত শান্ত ভাবে কথাবার্তা উৎসবের একদমই পছন্দ হচ্ছে না।আর সব থেকে বড় কথা হলো নির্ভয় তো পুরো ব্যাপারটা জানে তাহলে আবার তিসানের থেকে শুনতে হবে কেন?সরাসরি যা বলতে চায় সেটা বলে দিলেই তো হয়ে যায়।বিরক্তিকর কন্ঠে নির্ভয় কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"ওই টুনির বাপ,তুই এমন ভং ধরছিস যেন তুই কিছুই জানিস না।আমার থেকে তো শুনেছিস সব তাহলে আবার ওই মা/রা খাওয়া প্রাণীর থেকে শুনতে হবে কেন?"

উৎসবের কথা শুনে তিসান চমকে ওর দিকে তাকালো।তিসানের সাথে সাথে আরো দুই জোড়া দৃষ্টি ওর উপর নিক্ষেপিত হলো।সেই দৃষ্টির মালিক হলো প্রভা আর নির্ভীক।তিসান বিস্ময় ভরা কন্ঠে উৎসব কে প্রশ্ন করল,

"তুমি নির্ভয় কে সবটা বলে দিয়েছো?"

"আরে না বলে কোন উপায় ছিল না।ব্যাটা এমন ভাবে জোর করা শুরু করেছিল যে কি বলবো।"

"তাই বলে তুমি বলে দিলে?তোমার পেটের ভিতরে কি একটা কথাও থাকে না উৎসব?"

"পেটের ভেতর কথা জমে রেখে কি করব?আর আমি বলেছি তারও কারণ আছে।কেননা আমার মনে হয় যে তোমার প্রিয়ুর মনেও তোমার জন্য একটু একটু ইয়ে আছে।তোমরা দুজনেই যেহেতু এই ব্যাপারটার সাথে জড়িয়ে পড়েছো তাই আমার মনে হয় তোমাদের দুজনের সবটা জানা উচিত।"

তিসান বেজায় বিরক্ত হলো উৎসবের প্রতি।এইজন্যে উৎসব কে কিছু বলতে চায় না।ছেলেটার পেটের মধ্যে একটা কিছু থাকে না।বিরক্তি ভরা কন্ঠে অভিযোগ করে নির্ভীক কে বলল,

"এই যে ভায়া,তুমি একটু তোমার এই বন্ধুটাকে মানুষ বানিয়ো।এ যে কিভাবে আমার শরীরটা জ্বা/লায় আমি বোঝাতে পারবো না তোমায়।"

নির্ভীক আজ উৎসবের সাথে একমত।তার মতেও পুরো ব্যাপারটা দুজনে জেনে ভালো হয়েছে।উৎসব কে সমর্থন করে বলল,

"উৎসব ঠিকই করেছে ভাই।আমারও মনে হয় তোমাদের দুজনের সবটা জানা উচিত।"

তিসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।যেখানে অনুভূতিটাই এক পাক্ষিক সেখানে জানিয়ে লাভটা কি হবে?এরা সবাই ভাবছে যে প্রেয়নারও হয়তো তিসানের উপর অনেক অনুভূতি আছে।কিন্তু এরা বোকা।যদি প্রেয়নার বিন্দু পরিমাণ কোন অনুভূতি তিসানের উপর থাকতো তাহলে কি তিসানের জীবনে এত দুঃখ থাকত? এতদিনে ছুটে চলে যেত প্রেয়নার কাছে।কোনো বাধা মানতো না।সেই কবে নিজের ঘরে নিয়ে আসতো।কিন্তু এরা কেউ বুঝতেই পারছে না যে এসব কিছু ওদের ভ্রম।তিসান নিজেই নিজেকে তাচ্ছিল্য করে বলল,

"তোমরা ভীষণ বোকা।প্রিয়ু আমাকে ভালোবাসতে পারে এমন কোনো বিশেষ গুণ আমার মাঝে নেই।আমার থেকে ভালো ওকে তোমরা কেউ চেননা।"

কথাটা বলে তিসান নির্ভয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

"প্রিয়ু তোমাকে ভালোবাসে ভায়া।তুমি কি বোঝো না যে ওর মনে তোমার রাজত্ব চলে,ওর ভাবনায় তোমায় রাজত্ব চলে?তুমি কি বোঝো না ওর চোখ দুটো তোমায় দেখার জন্য পাগল হয়ে থাকে,ওর কান দুটো তোমার গলার স্বর শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে?এসবের মাঝে আমার উপস্থিতি কোথাও নেই।আমি কেবল ওর জীবনের একটা সাধারন অধ্যায়।যে অধ্যায়ের গুরুত্বও হয়তো আছে ওর জীবনে তবে তা কখনোই তোমাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি আর না পারবে।"

"আমি আর উনি খুব ভালো বন্ধু ভাই।আমাদের বন্ধুত্বটাই না হয় সারা জীবন থাকুক।ওনাকে রাণী হিসেবে নাহয় তুমিই নিজের মনের আসনে বসাও।"

নির্ভয়ের কথা শুনে তিসান হাসলো।নির্ভয় তবে বন্ধুত্বের জন্য ভালোবাসা বিসর্জন দিতে চাইছে।না মানতে হবে ছেলেটার মন অনেক বড়।সাথে বেশ সাহসও আছে।না হলে কি নিজের ভালোবাসা কে নিজ মুখে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলতে পারে।হাস্যজ্জ্বল মুখে তিসান নির্ভয় কে বলল,

"ভালোবাসলে তাকে ছেড়ে দিতে নেই ভায়া।অন্যের হাতে তুলে দিতে নেই।ভালোবাসায় এত মহৎ হতে নেই।ভালো যখন তুমি বাসো তাহলে তাকে সব দিয়ে আগলে রাখো।আমি কিন্তু এতটা মহৎ হতাম না।আমিও আগলে রাখতাম যদি সেও আমায় ভালোবাসতো।কিন্তু তুমি রাখতে পারবে কারণ সে তোমায় ভালোবাসে।তাই বলছি অকারণে নিজেকে মহান প্রমাণ করতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য আফসোস ডেকে এনো না।"

নির্ভয় হাসলো।রাতের অন্ধকারের মাঝে তিসান তার সেই হাসি দেখতে পেল কিনা সেটা নির্ভয়ের জানা নেই।তবে হিসাব মতো চাঁদের হালকা আলোতে সেই হাসিটা তিসানের চোখে পড়ার কথা।যদি দেখতে পেয়ে থাকে তাহলে বুঝতে পারবে যে নির্ভয়ের কথাটা বলতে ঠিক কথাটা কষ্ট হয়েছে।না দেখে থাকলে হয়তো আন্দাজ করতে পারবেনা।নির্ভয় স্মিত হেসে বলল,

"তুমি ওনাকে পাওয়ার জন্য জীবনে যে যে ত্যাগ করেছ তোমার জায়গায় হয়তো আমি থাকলে তা করতে পারতাম না।তোমার মতন করে ওনাকে হয়তো আমি ভালোবাসতে পারব না,হয়তো সুখেও রাখতে পারব না। তুমি ওনার সুখের জন্য সব করতে পারো ভাই।হয়তো দেখা গেল আমি কোন একটা জায়গায় গিয়ে ব্যর্থ হলাম।আমি শুধু চাই উনি যেখানেই থাক ভালো থাক।তোমার মতন ভালো হয়ত ওনাকে কেউ রাখতে পারবে না।"

"আর আমার প্রিয়ু যে তোমার মতন আমায় ভালোবাসতে পারবে না।দেখেছো ওকে আমার বলে সম্বোধন করে ফেললাম।তুমি কিছু মনে করো না ভায়া। পুরনো অভ্যাস।একা একাই ওকে নিজের বলতাম,সেই জন্য এখনো ছাড়তে পারিনি।"

"বললাম তো আমি সারা জীবন ওনার সাথে খুব ভালো একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখবো।এমনিতেও তোমায় পেলে আমার গুরুত্ব ওনার কাছে কমে যায়।"

তিসান এবার শব্দ করে হেসে উঠলো।তার হাসি দেখে মনে হচ্ছে কেউ খুব ভালো একটা কৌতুক শুনিয়েছে তাকে।কিন্তু আদৌ কি তিসান মন থেকে হাসছে না জোর করে হাসছে।কিংবা হয়তো নির্ভয়ের কথাটাই তার কাছে অত্যন্ত হাস্যকর শোনাল।হাসতে হাসতে বলল,

"অভিমান হয়েছে প্রেমিকার উপর?সব সময় আমরা যা দেখি তা সত্যি হয় না।প্রিয়ু জানে আমি এই আছি তো পর মূহুর্তে ওর সাথে নাও থাকতে পারি।সেজন্য কয়েক মুহূর্ত আমায় একটু বেশি গুরুত্ব দেয়।কিন্তু ও জানে তুমি সবসময় ওর সাথে থাকবে।সেজন্য তোমায় প্রতিটা মুহূর্তেই গুরুত্ব দেয়।একটা বিশেষ মুহূর্ত বেছে নেয় না।আমি কেবলমাত্র ওকে একটু হাসাতে পারি কিন্তু তুমি ওর মানসিক শান্তি।আমি ওর খুশির একটা কারণ মাত্র কিন্তু ওর গোটা আনন্দটাই তোমায় জুড়ে।আমাকে এত দাম দিও না।"

বাকিরা সবাই মনোযোগ দিয়ে ওদের কথাবার্তা শুনছে কিন্তু উৎসবের ধৈর্য কুলাচ্ছে না।এদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে যে এরা প্রেয়নাকে ভাগাভাগি করতে বসেছে।এমন ভাব করছে যেন ওরা যার কাছে যেতে বলবে প্রেয়না তার কাছেই চলে যাবে।

"তোমরা দুইজন নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি না করে ওনাকে জিজ্ঞেস করেছো যে উনি আসলে কাকে ভালোবাসে?হায়রে ভাই অন্যের জীবন নিয়ে ভাগাভাগি শুরু করে দিয়েছে।"

তিসান বলল,

"তুমি কিন্তু ভীষণ অধৈর্যশীল উৎসব।ধৈর্য এত কম হলে সংসার করবে কি করে বলতো?আমাদের কয়েকটা কথাই শুনতে পারছো না সংসারে বউ যখন সারাদিন চেঁচামেচি করবে তখন কি করবে?"

উৎসব নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

"দেখো যদি আমার ইচ্ছেতে বিয়ে করি তাহলে যত কথাই বলুক সব শুনবো।আর যদি পছন্দটা আমার বাপ-মায়ের হয় তাহলে বেশি চিল্লাইলে বাপের বাড়ি রেখে আসবো।"

"আছে নাকি কোন পছন্দ?"

"সে যদি থেকেও থাকে তোমায় আমি বলছি না।তোমায় আমি একটুও বিশ্বাস করি না।"

"বিশ্বাস করলেও বলতে হবে না তোমাকে।এমনিতেই তোমার আবভাব দেখে সব বোঝা যায়।চলো সবাই বাড়ি ফিরে যাই।"

উৎসব প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"তাহলে শেষমেষ প্রিয়ু কার ভাগে পড়লো?"

তিসান আনমনে হেসে বলল,

"যার ভাগে চিরকাল ছিল।বাড়ি যাও নির্ভয়।আমি জানি প্রিয়ু তোমার অপেক্ষায় আছে।তুমিতো ওকে কোনো উপহার দাও নি ও অধীর আগ্রহে তোমার উপহারের জন্য অপেক্ষায় আছে।"

নির্ভয় ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"তুমি কি করে জানলে যে আমার উপহারের জন্য অপেক্ষায় আছেন উনি?"

"সব কথা কি আর বলতে হয়?ওর চোখ মুখের অস্থিরতা দেখে আমি আন্দাজ করে ফেলেছি।যখন সবার থেকে অনেক দামী দামী উপহার পাচ্ছিলো তখন ওর দৃষ্টিটা বারবার তোমার দিকে যাচ্ছিলো।ও চাইছিলো তুমি ওকে কিছু একটা উপহার দাও।জানো তো তোমার আর আমার মাঝে পার্থক্য এখানেই। আমার সাথে ওর সম্পর্কটা নিছক সৌজন্যমূলক,শিষ্টাচার ভিত্তিক।তাতে ব্যক্তিগত কিছু নেই,তাতে কোনো আবেগ নেই।সম্পর্কটা এমন হলেও চলে না হলেও চলে।সেজন্যই তো আমি উপহারটা দিলেও চলতো না দিলেও চলতো।কিন্তু তোমার থেকে উপহারটা ওর চাই।তোমার সাথে ওর সম্পর্কটা হৃদয়ের।পার্থক্য তো আছে ভায়া।"

______________

ঘড়িতে সময়টা তখন রাত এগারোটার কাছাকাছি।সবে মাত্র নির্ভয় বাড়ি ফিরলো।নিজের ঘরে গিয়ে বিছানার ওপর প্রেয়না কে বসে থাকতে দেখে চমকে উঠলো।বিস্ময় ভরা কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

"আপনি এখানে কি করছেন এত রাতে?"

নির্ভয়ের কণ্ঠ পেতেই প্রেয়না দরজার দিকে তাকালো।ওকে দেখতে পেয়ে মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।

"কেন আসতে পারি না আমি?"

"না তেমনটা না।কিন্তু এত রাতে এখানে?আসলে সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে আমার।"

"নাবিলাও ছিল আমার সাথে।ওর একটা ফোন আশায় এখনই গেল।"

"ও আচ্ছা।আপনার কি কোন দরকার ছিল?নাবিলার সাথে কথা বলতে এসেছিলেন?আচ্ছা ঠিক আছে আপনি থাকুন।আমি নাবিলার ঘরে যাচ্ছি।"

কথাটা বলে নির্ভয় সেখান থেকে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে প্রেয়না গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,

"দাঁড়ান।"

নির্ভয়ের পদযুগল থেমে গেল।পিছন ফিরে তাকাতেই প্রেয়না গম্ভীর মুখে বিছানা থেকে উঠে ওর দিকে এগিয়ে এলো।গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

বিজ্ঞাপন

"আমার উপহার কোথায়?"

হঠাৎ এমন প্রশ্নে নির্ভয় থতমত খেল।

"কিসের উপহার?"

"কেন বুঝতে পারছেন না আপনি কিসের উপহার?আজ আমার জন্মদিন সেটা ভুলে গেছেন?কোন উপহার দেননি,একবার উইশও করেননি।সমস্যা কি আপনার?"

নির্ভয় ইতস্তত ভঙ্গীতে বলল,

"সরি আসলে মনে ছিল না?"

"মনে থাকবে না কেন?আমার বিষয়গুলো আপনার কেন মনে থাকবে না?থাকতেই হবে মনে।"

প্রেয়নার এমন অধিকার খাটানোতে নির্ভয় বেশ অবাক হলো।সাথে তিসানের বলা কথাগুলো মনে পড়ল। প্রেয়না সত্যি ওর থেকে উপহারের জন্য অপেক্ষা করছিল তবে।তাহলে কি তিসানের কথাই ঠিক?প্রেয়না সত্যিই ওকে ভালোবাসে?

নির্ভয় কে চুপ করে থাকতে দেখে প্রেয়না মৃদু ধমকের সুরে বলে উঠলো,

"কথা বলছেন না কেন?তাড়াতাড়ি আমার উপহার দিন।"

নির্ভয় বক্র হেসে বলল,

"হঠাৎ করে আজ এত অধিকার দেখাচ্ছেন যে?"

"মন চাইলো তাই।"

"আগে তো অধিকার খাটাননি কখনো?"

"আগে প্রয়োজন পড়েনি আজ প্রয়োজন পড়লো তাই খাটাচ্ছি।"

"আমি যদি বলি যে কোন উপহার আনিনি আপনার জন্য তাহলে?"

প্রেয়নার মুখটা চুপসে গেল।মনটা তার ভারী খারাপ হয়ে গেল।ভেবেছিলে নির্ভয় বিশেষ কিছু উপহার দেবে ওকে।কিন্তু এখন তো নির্ভয় বলছে যে কোন উপহারই আনেনি।তবে কি প্রেয়না এতটাই মূল্যহীন ওর কাছে?

"সত্যি আনেননি?"

প্রেয়নার উদাস কণ্ঠে বলা কথাটা শুনে নির্ভয়ের একটু হাসি পেল।মেয়েটা আজ কেমন যেন অন্যরকম আচরণ করছে।নিজের হাসিটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে বলল,

"না সত্যি আনিনি।"

নির্ভয় ভেবেছিল প্রেয়না হয়তো মন খারাপ করে চলে যাবে কিন্তু না তার ভাবনার বিপরীত আচরণ প্রকাশ করলে প্রেয়না। রাগী কন্ঠে বলল,

"আমার জন্মদিন এখনো পার হয়ে যায়নি।হাতে এখনো এক ঘন্টার মতন সময় আছে।এক্ষুনি যান গিয়ে কিছু একটা নিয়ে আসুন আমার জন্য।"

"এত রাতে আপনার জন্য উপহার আনতে আমি কেন আবার কষ্ট করে যেতে যাব বলুন তো?"

"আমি বলেছি তাই যাবেন।হয় আপনি উপহার আনতে যাবেন নয়তো আমি আমার ফ্ল্যাটে চলে যাব।আর কোনদিন আসবো না এখানে।"

"দুঃখিত।আমি এখন যেতে পারবো না।"

নির্ভয়ের কথায় প্রেয়না আহত হল।চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।নির্ভয় কে আর কিছু বলল না।চুপচাপ সেখান থেকে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে নির্ভয় হাত টেনে ধরল।প্রেয়না অভিমানী কন্ঠে বলল,

"ছাড়ুন।যখন আমার আবদার করার অধিকার নেই তখন আপনার হাত ধরারও অধিকার নেই।"

নির্ভয় হাসলো।দু কদম পিছিয়ে গিয়ে প্রেয়নার মুখোমুখি দাঁড়ালো।

"ফর্সা নাকটা কি রাগের কারণে লাল হয়ে উঠেছে নাকি কান্নার তোপে?"

"আপনার জানার দরকার নেই।"

নির্ভয় পকেট থেকে একটা ছোট কাগজের প্যাকেট বের করল।সেটা প্রেয়নার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

"ফুটপাতের উপর থেকে কিনেছি।দাম মাত্র ১২০ টাকা।তবে হ্যাঁ এটা আমার নিজের টাকা দিয়ে কেনা।আপনি জানেন খুব বেশি দামী উপহার আপনাকে দেয়ার সামর্থ্য আমার নেই।কিছুদিন পর হয়তো এটার রং খারাপ যেতে পারে।আগেই বলেছি দাম খুব বেশি না।"

প্রেয়না প্যাকেটের ভিতরে একটা গলার চেইন পেল। সাথে একটা সুন্দর লাল পাথরের হার্ট শেপ লকেট ঝুলোনো।দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে।মুহূর্তের মাঝে প্রেয়নার অভিমান উবে গেল।মুখে ফুটে উঠলো তার হাসি।সেই হাসি দেখে নির্ভয় শান্তি পেল।

"পছন্দ হয়েছে?"

"না হওয়ার তো কিছু নেই।"

"যাক।খুশি হলাম।এটা যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দেবেন।কখনো যদি আমি হারিয়ে যাই তবে এটুকু আমার স্মৃতি হয়ে আপনার কাছে থেকে যাবে।"

প্রেয়না ভ্রুঁ কুঁচকে নির্ভয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

"হারিয়ে যাবেন কেন?"

"বলা তো যায় না।হয়তো কখনো কোন কারণে হারিয়ে গেলাম।"

"হারানোর হলে আমাকে নিয়েই হারাবেন কেমন।দুজনে একসাথে হারাবো।সফরটা দারুণ হবে।"

_______________

বেশ সকাল সকাল ঘুমের মধ্যে প্রভার ফোনটা বেজে উঠল।ঘুমের ঘোরে ফোন বাজায় প্রভা বেশ বিরক্ত হলো।বালিশের আশেপাশে হাতরে ফোনটা হাতে নিয়ে কোনমতে রিসিভ করে কানে ধরল।কে ফোন করেছে সেটাও দেখল না।অপর পাশ থেকে নির্ভীকের কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই প্রভা কিঞ্চিত অবাক হলো।

"ঘুমোচ্ছিলেন না উঠেছেন?"

প্রভা ঘুমঘুম কন্ঠে জবাব দিল,

"না ঘুমিয়ে ছিলাম কিন্তু কেন বলুন তো?আপনি হঠাৎ এত সকালে ফোন করেছেন যে?"

নির্ভীক একটু সময় নিয়ে বলল,

"প্লিজ প্যানিক করবেন না।মাথা ঠান্ডা রেখে আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা করুন।আর অবশ্যই নিজেকে দোষী ভাববেন না।সম্ভব হলে আমি গিয়ে আপনাকে নিয়ে আসতাম কিন্তু পারছি না যেতে।আমি আপনার ফোনে একটা ঠিকানা পাঠাচ্ছি সেখানে একবার একটু আসুন এক্ষুনি।"

প্রভার দুচোখ থেকে ঘুম উড়ে গেল।নির্ভীকের কথার মাঝে কেমন যেন একটা রহস্য রহস্য গন্ধ পাচ্ছে।শোয়া থেকে উঠে বসে গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

"কি হয়েছে বলুন তো?কোথায় যাবো আমি?"

"আগে আসুন তারপরে সবটা বলছি।"

"না আপনি আগে বলুন তারপর আমি যাব।কি হয়েছে?সব ঠিক আছে?"

"বললাম তো আপনি আগে আসুন তারপর সবটা বলছি।"

প্রভা বুঝলো যে নির্ভীক ওকে কিছু একটা বলতে চাইছে না।নির্ভীক বলতে না চাইলেও প্রভার কানে কিছু কথা ভেসে এলো।কেউ একজন হয়তো নির্ভীক কে উদ্দেশ্য করেই বলছে,

"ভাই ওর পরিবারের লোকজনকে তো খবর দিতে হবে। লা/শ তো বেশিক্ষণ রাখা যাবে না।"

লা/শ শব্দটা শুনতেই প্রভা আৎকে উঠলো।আতঙ্কগ্রস্থ কন্ঠে বলল,

"কার লা/শের কথা বললেন উনি নির্ভীক?কি হয়েছে?প্লিজ বলুন।"

নির্ভীক তবুও বলতে চাইলে না প্রভাকে।এদিকে প্রভা না শুনে কোনমতেই ছাড়বে না।না বললে ও যাবেই না। নির্ভীক বাধ্য হলো বলতে।কেননা প্রভার এখন এখানে আসাটা ভীষণ জরুরী।আর এমনিতেও এলে তো সব সত্যিটা জানতে পারবে।ফোনে শুনলে প্রভা প্যানিক করতে পারে জন্য নির্ভীক বলতে চাইছিলো না।কিন্তু এখন বুঝতে পারছে না বলে কোন উপায় নেই।কিন্তু তবুও মুখ দিয়ে শব্দগুলো উচ্চারণ করার সাহস হচ্ছে না তার। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে প্রভা পুনরায় তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,

"বলুন নির্ভীক।"

নির্ভীক লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে সাহস সঞ্চয় করে বলল,

"বকুলের মেস থেকে ওর ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত লা/শ পাওয়া গেছে।সু/ই/সা/ই/ড করেছে বকুল।"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প