বকুলের লা/শের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছে তার মা সৃজনী দেবী।তিনি একা না,বকুলের লা/শের চারপাশে তার সমস্ত আত্মীয়-স্বজনরাই কাঁদছে।সেই মানুষগুলোও কাঁদছে যারা বকুলকে ছোট করায় ব্যস্ত থাকতো সবসময়।তাদের পরিবারের সব থেকে ভোলা ভালা সহজ সরল খাঁটি মনের মানুষটা চলে গেল তাদেরকে না জানিয়ে।কিসের যে তার মনের মাঝে এত অভিমান জমে ছিল যে আ/ত্মহ/ত্যা/র মতন এমন একটা পাপ কাজে জড়ালো সেটা তারা কেউই বুঝতে পারছে না।বকুল তো নিজের মনের মাঝে এত অভিমান কিংবা রাগ পুষে রাখার ছেলে না।ও তো সবসময় হাসিখুশি ভাবে থাকতে ভালোবাসে।সেদিনই তো গ্রাম থেকে কত হাসি মনে ছেলেটা শহরে ফিরে গেল তবে এ কয়দিনের ব্যবধানে কি এমন হলো যে ছেলেটা এমন আ/ত্ম/হ/ত্যা/র মতন জঘন্য একটা সিদ্ধান্ত নিল?
ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে বকুলের ছয় জন বন্ধু।এই ছয় জন বন্ধুই ছিল বকুলের।আর কারো সাথে তার কোনরূপ বন্ধুত্ব ছিল না।কেউ তো তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতেই রাজি ছিল না।এই মানুষগুলো তাকে খুব সুন্দর করে আপন করে নিয়েছিলো অথচ তারাও বকুলের এত অভিমানের কারণ জানে না।খবরটা পাওয়ার পর থেকে প্রভা অঝরে কেঁদে যাচ্ছে।কান্নার সাথে সাথে প্রভার নিজের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে।নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।কেন যেন বারবার মনে একটা কথাই আসছে যে ওর উপর অভিমান করেই বকুল আ/ত্মহ/ত্যা করেছে।এছাড়া তো আর কারো কারণ দেখছে না।সবাই মিলে অনেক করে প্রভাকে বুঝিয়েছে যে এর জন্য প্রভা দায়ী নয় কিন্তু সে যেন মানতে নারাজ।
বকুলের লা/শটা শ্মশানে নিয়ে গেল।সৃজনী দেবী ছেলের শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।সব কাজ শেষে সন্ধ্যার দিকে নির্ভীকরা সবাই ওদের বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।এদিকে অতিরিক্ত কাঁদার ফলে প্রভার মাথা আজ আবারও প্রচন্ড যন্ত্রণা করছে।এই মাথা যন্ত্রণার কারণটা প্রভা সত্যি ঠাহর করতে পারেনা।এই যন্ত্রণা যেন মৃত্যু যন্ত্রণা কেও হার মানাতে পারে।ব্যথায় অস্থির হয়ে পড়ল প্রভা।কিন্তু এই মুহূর্তে তার কাছে কিছু করার নেই।সহ্য করতেই হবে।অন্তত বাড়ি ফেরা অব্দি।
__________
দুদিন প্রভা কলেজে এলো না।মানসিকভাবে সে একদম ভেঙে পড়েছে।সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পর গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে।সেই সাথে মাথা ব্যথা,মাথা ঘোরা আর বমি আছেই।আগে প্রভা এত অসুস্থ হতো না।কিন্তু ইদানিং তার শারীরিক পরিস্থিতি একটুতেই খারাপ হয়ে যায়।দুদিনের ধকল শেষে আজ প্রভা একটু সুস্থ বোধ করছে।ফলস্বরূপ কলেজে এলো।সামনে পরীক্ষা।অথচ এমন সময় তার মানসিক অবস্থা ভীষণ খারাপ।শুধু মানসিক নয় শারীরিক মানসিক দুটোই ভীষণ খারাপ।
চায়ের ছোট দোকানটায় বসে কলেজের গেট বেশ ভালোভাবেই দেখা যায়।প্রতিদিনকার মতো আজও সেখানে নির্ভীক,উৎসব,তিসান আর নির্ভয় বসে আছে।তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু বকুলের আ/ত্মহ/ত্যার কারণ।প্রভা বকুলের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার জন্য বকুল আ/ত্মহ/ত্যা করতে পারে এই কারণটা যেন সবাই পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না।বকুল ধর্মে বিশ্বাসী।আ/ত্মহ/ত্যার শাস্তি কি সেটা বকুল খুব ভালো করেই জানে।বকুলের মতন একজন ধর্মভীরু মানুষের পক্ষে আ/ত্মহ/ত্যা করাটা একটু অযৌক্তিক লাগছে ওদের সবার কাছে।কিন্তু অন্য কি কারণ থাকতে পারে সেটাও তো কেউ ধরতে পারছে না।ওর মেসের কেউই কিছু বলতে পারছে না।সবাই দেখেছে কয়েকদিন ধরে বকুলের মন খারাপ কিন্তু কারণটা তাদের কারোরই জানা নেই।ওদের আলোচনার মাঝেই উৎসব কলেজের গেটের সামনে প্রভা আর সৌমিকে দেখতে পেল।
"এ নির্ভীক দেখ মাস্টান্নি এসেছে।সাথে আবার পিপীলিকাও আছে।"
কথাটা শুনতেই নির্ভীক তড়িৎ গতিতে কলেজের গেটের দিকে তাকালো।নির্ভীক কে আর কষ্ট করে সেদিকে এগিয়ে যেতে হলো না তার আগেই উৎসব গলা ছেড়ে প্রভার উদ্দেশ্যে ডাক ছুঁড়লো,
"মাস্টান্নি!ও মাস্টান্নি!এদিকে আসুন।"
উৎসব এতই জোরে ডেকেছে যে আশেপাশের মানুষজনের সম্পূর্ণ মনোযোগ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওর উপর পড়ল।সবাই আসলে বোঝার চেষ্টা করছে যে কে এভাবে কাকে ডাকলো নাকি কোন ঝামেলা হলো।নির্ভীক মৃদু বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
"চেঁচাচ্ছিস কেন এভাবে?ওনাকে না ডেকে নিজেই এগিয়ে গেলে তো পারতি নাহলে ফোন করতি?"
"আরে ধুর।অত কষ্ট করতে যাবো কেন?আমার গলাই যথেষ্ট মাস্টান্নিকে ডাকার জন্য।ওই দেখ মাস্টান্নি শুনতে পেয়েছে আমার ডাক।এদিকেই আসছে পিপীলিকা কে নিয়ে।"
সত্যি উৎসবের ডাক প্রভা অব্দি পৌঁছেছে।সেই ডাক আর উপেক্ষা করতে না পেরে প্রভা ওদের দিকে আসছে।প্রভার মুখটা বেশ মলিন দেখাচ্ছে।ঠোঁটের কোথাও একটু হাসি লেগে নেই।চোখের নিচে কালি জমেছে।এমনিতেই তো মেয়েটা নিজের যত্ন নেয় না এখন যেন আরো বেশি অযত্ন করা শুরু করেছে।নির্ভীক মৃদু রাগী কন্ঠে বলল,
"আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখেছেন?মনে হচ্ছে কোন মানুষ না কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে।"
প্রভা মলিন হেসে বলল,
"প্রাণটা বেড়িয়ে গেলেই ভালো হয়।শারীরিক যন্ত্রণা তবুও সহ্য করা যায় কিন্তু এই মানসিক যন্ত্রণাগুলো আর সহ্য করা যায় না।"
পূর্বের থেকেও নির্ভীক দ্বিগুণ রাগী কন্ঠে বলল,
"যখন ম/রার ইচ্ছে তাহলে যান বকুল যা করেছে আপনিও সেটাই করুন।সমস্যার সমাধান বলতে তো আপনারা এই একটা জিনিসই বোঝেন জীবন থেকে পালানো তাই না?আপনারা এটা বুঝতেই চান না যে জীবনের সমস্যাগুলো জীবনে বেঁচে থেকে সমাধান করতে হবে।আমি বোঝাতে চাইও না।যারা বুঝতে চায় না তাদেরকে হাজার চেষ্টা করেও কখনো বোঝানো সম্ভব না।"
তিসান হাসলো নির্ভীক এর কথাগুলো শুনে।এতদিনে মনে হচ্ছে তিসানের ইচ্ছেটা পূরণ হবে।দুই বন্ধু একই পথের দু ধার দিয়ে হাঁটছে অথচ কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।দেখতে পেলেও এড়িয়ে যেতে চাইছে।নিজেদের মনকে বোঝাতে চাইছে যে না এটা আমার বন্ধু না এটা অন্যকেউ,অপরিচিত কেউ।অথচ যখন গন্তব্যে পৌঁছাবে তখন বুঝতে পারবে যে ওরা কাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
নির্ভীক কে অতিরিক্ত রেগে যেতে দেখে উৎসব ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল।নির্ভীক থামল তবে তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে যে এখনো প্রচন্ড রেগে আছে প্রভার উপর।উৎসব প্রভা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"এমন করলে কি করে চলবে মাস্টান্নি বলুন তো?আপনি যদি নিজের খেয়াল না রাখেন এই পিপীলিকার কি হবে একবার ভেবে দেখেছেন?আপনি ছাড়া তো পিপীলিকা অচল।তার মধ্যে ওর যা ভুলো মন কি করতে কি করে নেবে কে জানে।"
উৎসবের কথায় সম্মতি জানিয়ে তিসানও বলে উঠলো,
"ভায়া কিন্তু একদম ঠিক কথা বলেছে প্রভা।তোমার খেয়াল রাখার জন্য কিন্তু অনেক মানুষ আছে,তোমার চিন্তায় কাতর হওয়ার জন্য অনেক মানুষ আছে, তোমায় আগলে রাখার জন্য অনেক মানুষ আছে কিন্তু কোঁকড়া চুলের কেউ নেই।ও একা একা কি করে বাঁচবে বলোতো?"
সৌমি নির্জীব দৃষ্টিতে তিসানের দিকে তাকালো।খুব করে বলতে ইচ্ছে করলো তিসানকে,
"কেন আপনি রাখবেন।প্রভা না থাকলে আপনি আমার খেয়াল রাখবেন না?আপনি তো বললেন যে আমার নাকি কেউ নেই প্রভা ছাড়া তো আপনি কি তোমার নিজের হতে পারেন না?"
সৌমি খুব ভালো করেই জানে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না হবে।সত্যিই সৌমির প্রভা ছাড়া আর কেউ নেই পৃথিবীতে।
প্রভা শান্ত কন্ঠে নির্ভীক কে বলল,
"আপনি কিন্তু অযথা রাগ করছেন।আমি কি কখনো বলেছি যে আমি ম/রতে চাই?বিশ্বাস করুন আমি বাঁচতে চাই।আমার বেঁচে থাকার খুব ইচ্ছে।আমার হয়তো কোন পরিবার নেই,কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই কিন্তু আমি প্রকৃতিকে ভীষণ ভালোবাসি।এই সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে আমি যেতে চাই না।সত্যি বলছি আমি ম/রতে চাই না,আমি বাঁচতে চাই।আমি খুব সুন্দরভাবে আমার জীবনটা কাটাতে চাই।"
নির্ভীক দৃষ্টি তুলে প্রভার দিকে তাকালো।দুজনেই যেন দুজনকে কিছু বলতে চাইছে।কেউই বলতে পারল না।দুজনের তাকিয়ে থাকার মাঝে আকস্মিক ভাবে নির্ভীক প্রভার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে নিজের কাছে নিয়ে এলো।নির্ভীকের হঠাৎ এমন কাজে প্রভা বেশ চমকালো।সাথে সবার সামনে এভাবে ওকে কাছে নিয়ে আসায় কিছুটা থতমত খেল।ইতস্তত ভঙ্গিতে নির্ভীক কে কিছু বলতে যাবে তার আগেই নির্ভীক এর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।তবে সেই কণ্ঠস্বরটা প্রভাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেনি।
"এখানে এসেছিস কেন?"
নির্ভীকের দৃষ্টি প্রভার ঠিক পিছনের দিকটায়।প্রভা ঘাড় ঘুরে পেছনে তাকালো।দেখল ইশরাক অগ্নিদৃষ্টিতে নির্ভীকের দিকে তাকিয়ে আছে।চোখে তার কি অসম্ভব তেজ,অসম্ভব ক্রোধ।যেন সেই ক্রোধের আ/গুনে নির্ভীককে ধ্বংস করে দেয়ার তীব্র ইচ্ছে মনের মাঝে পোষণ করছে।এদিকে ইশরাক কে দেখে ভয়ে গুটিসুটি হয়ে দাঁড়ালো সৌমি।ওর পাশে প্রভা নেই।একটু আগে প্রভা যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছিল এখন ঠিক সেখানেই ইশরাক দাঁড়িয়ে আছে।ইশরাককে নিজের এতটা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সৌমি আরো বেশি ভয় পেল।চুপচাপ তিসানের পিছনে গুটিসুটি হয়ে দাঁড়ালো।তিসান একবার ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছনে তাকিয়ে সৌমিকে দেখল।ওকে আশ্বস্ত করে বলল,
"ভয় নেই।কিছু করবে না ও।এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।"
সৌমি হালকা হেসে বাধ্য মেয়ের মতন মাথা নাড়ালো। যেহেতু তিসান বলেছে তার মানে নিশ্চয় ওর ভয় নেই।
এদিকে ইশরাক কে এমন দৃষ্টিতে নির্ভীক এর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে উৎসবের বেশ রাগ হলো। ইশরাকের সাহস হয় কি করে ওর বন্ধুর দিকে এত রাগ নিয়ে তাকানো।ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
"ওই ব/ল/দা,এমন ভাব দেখাচ্ছিস যেন চোখ দিয়ে আমার ভাইকে গিলে খাবি?ভুলেও এটা ভাবিস না।তোর দাঁত আমি সব ভেঙে দেবো রে।"
ইশরাক উৎসবের কথায় কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না।সরাসরি নির্ভীক কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"সুন্দরীকে ছাড়।"
নির্ভীক স্থির সেভাবে দাঁড়িয়ে রইল।বলা যায় প্রভার হাতটা আগের তুলনায় আরেকটু শক্ত করে ধরল।ইশরাক পুনরায় দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
"ও আমার সুন্দরী।শুধু আমার।ওকে ছাড় বলছি।"
প্রভা নির্ভীকের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল।নির্ভীক সেটা বুঝতে পেরে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো প্রভার উপর।গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"চুপচাপ থাকুন।আপনার হাতটা আমি ধরেছি কোন কাপুরুষ নয়।"
"ঝামেলা বাড়বে।অযথা ঝামেলা করবেন না।"
"যা হওয়ার সেটা আমি বুঝে নেব।আপনি চুপ করে থাকুন।"
ইশরাক কে কোন পাত্তা না দিয়ে প্রভা আর নির্ভীক নিজেরাই নিজেদের মতন কথা বলে যাচ্ছে এই ব্যাপারটা ইশরাকের একদম পছন্দ হলো না।বজ্রকন্ঠে ফের বলে উঠল,
"ছাড়,ছাড়।শা/লা কু/ত্তার বাচ্চা ছাড় আমার সুন্দরী কে।"
ইশরাকের কথাটা বলতে দেরি হলেও পাশ থেকে উৎসবের ওর নাক বরাবর একটা ঘু/ষি মার/তে দেরি হলো না।অতর্কিত হামলায় ইশরাকসহ উপস্থিত বাকি সকলে চমকে উঠলো।উৎসব ক্রোধে হিশহিশ করতে করতে বলল,
"জা/নো/য়া/রে/র বাচ্চা তোর সাহস হয় কি করে আমার ভাই কে গালি দেওয়ার?তোর জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো শু/য়ো/রে/র বাচ্চা।"
নির্ভীক তড়িঘড়ি করে প্রভার হাতটা ছেড়ে দিয়ে উৎসবকে থামালো।না হলে এই ছেলে আবার মা/রতে পারে।ধমকের সুরে উৎসব কে বলল,
"গায়ে হাত তুলছিস কেন?কথার মাধ্যমেও সমস্যা সমাধান হয় উৎসব।"
"মানুষের সাথে কথা বলে সমস্যার সমাধান করা যায় কোন পশুর সাথে না বুঝলি নির্ভীক?"
এদিকে উৎসবের হাতে মা/র খেয়েও ইশরাকের মাঝে বিন্দুমাত্র কোন হেলদোল দেখা গেল না।এখন আর তার চোখমুখে পূর্বের সেই রাগী ভাবটাও বিদ্যমান নেই।ঠোঁটের কোনে লেপ্টে আছে তার এক রহস্যময় হাসি।যে হাসিটা দেখে সব সময় প্রভা ভয় পায়।
"তোর গায়ে তো বেশ জোর আছে দেখছি উৎসব।"
ইশরাক কথাটা বলতেই উপস্থিত সকলে আরেক দফা ভরকালো।তিসান যেন খারাপ কিছু আন্দাজ করতে পারল।উৎসব ইশরাকের দিকে তেড়ে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হলো কিন্তু নির্ভীক আটকালো।ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
"তেমন জোরে লাগাতে পারিনি।আয় না কাছে এবার ভালো করে দেখাচ্ছি আমার গায়ে কত জোর আছে।"
ইশরাক আবারো তার সেই রহস্যময় হাসিটা হাসলো।এবার আর বাকি কারো সাথে কথা বলল না,দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো প্রভার ওপর।হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
"তোমার সামনে আমায় মা/রল তাও তুমি কিছু বললে না সুন্দরী?আমায় আঘাত পেতে দেখে কি তোমার একটুও কষ্ট হলো না?"
প্রভা নিশ্চুপ রইল।পরিস্থিতি এমনিতেই হাতের বাইরে চলে গেছে এর মাঝে কোন কথাটা বলা ঠিক হবে আর কোনটা বলা ভুল হবে সেটা প্রভা বুঝতে পারছে না। তাই ভাবলো এই মুহূর্তে ওর চুপ করে থাকাটাই ঠিক হবে।ইশরাক পুনরায় বলল,
"বুঝতে পেরেছি আমার সুন্দরীর আমার উপর রাগ হয়েছে তাই তো?অবশ্য রাগ হওয়াটাও স্বাভাবিক।আমি থাকতে যে কেউ আমার সুন্দরী কে বিরক্ত করছে।কয়েকটা দিন হলো আমি একটু খেয়াল রাখতে পারছি না জন্য যে কেউ এসে আমার সুন্দরীকে ভালোবাসি বলে ফেলছে।তুমি চিন্তা করো না সুন্দরী এবার থেকে আমি সব সময় তোমার আশেপাশেই থাকবো।যারা বিরক্ত করেছে তাদের ব্যবস্থা তো করেই ফেলেছি সামনে যারা করবে তাদের ব্যবস্থাও করব।"
এবারে অনেকগুলো দৃষ্টি একসাথে ইশরাকের উপর নিবদ্ধ হলো।ইশরাকের কথার মাঝে কেমন যেন একটা রহস্যের গন্ধ পেল সবাই।যোগসূত্র খুঁজে পেল যেন বকুলের মৃত্যুর সাথে।প্রভা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
"কে আমায় ভালোবাসি বলেছে?"
"কেন তোমার বকুল ফুল তোমায় বলেছিল তো যে তোমায় ভালোবাসে।তুমি কি ভেবেছো আমি এসবের খবর পাবো না?ধুর!আমার মুখের সামনে থেকে কেউ আমার শিকার কেড়ে নিয়ে যাবে আর আমি সেটা টের পাব না ভাবলে কি করে তুমি?আর যেহেতু আমি টের পেয়েছি ব্যবস্থা তো আমায় নিতেই হত।কিন্তু একটা বিষয় খুব কষ্ট লাগলো।ছেলেটা আ/ত্মহ/ত্যা করলো।"
"না বকুল আ/ত্মহ/ত্যা করেনি।আপনি কিছু করেছেন ওর সাথে তাই না?"
ইশরাক শব্দ করে হেসে উঠলো।কি বিশ্রী তার সেই হাসির শব্দ।হাসার সময় তাকে দেখতেও জঘন্য লাগছে যেন।মনে হচ্ছে কোন দানব হাসছে।প্রভা পুনরায় এক প্রকার চেঁচিয়ে প্রশ্ন করল,
"কি হলো বলুন?আপনি কিছু করেছেন বকুলের সাথে তাই না?"
ইশরাকের হাসি থামল।প্রভার দিকে দু কদম এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,
"যদি করেও থাকি তুমিতো সেই সম্বন্ধে খোঁজ পাবেনা সুন্দরী।কেউ বুঝেছে যে ওর সাথে কি ঘটেছে?বোঝেনি তো।সবাই কি বলল বকুল আ/ত্মহ/ত্যা করেছে।হ্যাঁ বকুল তো আ/ত্মহ/ত্যাই করেছে।আমার সম্পত্তির দিকে হাত বাড়ানো মানে যে জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলাই।ও তো নিজ ইচ্ছেয় মৃত্যুকে বেছে নিয়েছে তবে কি এটাকে আ/ত্মহ/ত্যা বলে না?"
প্রভা ধপ করে বেঞ্চের উপর বসে পড়ল।যে নির্ভীক এতক্ষণ উৎসবকে আটকাচ্ছিল সে নিজে এবার ইশরাকের উপর হামলা চালালো।ইশরাকের শার্টের কলার ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে সপাটে গালে চ/ড় বসালো।দুহাতে কলার ধরে ঝাঁকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
"সত্যি করে বল কি করেছিস বকুলের সাথে?"
সবার মাথাই যেন খারাপ হয়ে গেছে।কিন্তু তিসানের মাথা খারাপ হলে চলবে না।এই পরিস্থিতি টা খুব ঠান্ডা মাথায় তাকে সামাল দিতে হবে।তিসান আগেই বলেছিল ইশরাকের শান্ত রুপটা ওর একদম ভালো লাগছে না।নিশ্চয়ই বড় কিছুর পরিকল্পনা করছে।আর আজকে তার ফলাফল চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে ওরা।এগিয়ে গিয়ে ইশরাকের থেকে নির্ভীক কে সরালো।রাগী কন্ঠে বলল,
"মাথা খারাপ হয়ে গেছে কি তোমার?নিজের রাগ কে নিয়ন্ত্রণ করো নির্ভীক।ইশরাক কে আর রাগিয়ো না।"
"ভাই তুমি শুনলে না ও কি বললো?বকুল আ/ত্ম/হ/ত্যা করেনি ওকে ওই শ/য়/তা/ন মে/রে ফেলেছে।"
"আমি বুঝতে পেরেছি নির্ভীক।কিন্তু আমরা নিরুপায়।এখন চুপ করো।"
তিসান আর নির্ভয় মিলে কোনো মতে আপাতত নির্ভীক আর উৎসব কে থামাতে সক্ষম হলো।উৎসবের ওদের দুজনের ওপরেই রাগ হচ্ছে এখন যে কেনো ইশরাক কে মা/রতে দিচ্ছে না।ওদের কে বোঝানো শেষে তিসান ইশরাক কে বলল,
"দয়া করে চলে যা ইশরাক।আমাদের জীবনে আর ঝামেলা তৈরি করিস না প্লিজ।"
তিসান আরো কিছু বলতে নেবে তার আগেই পরিচিত কন্ঠস্বর পেয়ে থেমে গেল।এই মূহুর্তে প্রেয়নাকে এই জায়গায় তিসান একদমই আশা করেনি আর না কখনো চেয়েছে যে প্রেয়না ইশরাকের সামনে আসুক।প্রেয়না এক দৃষ্টিতে ইশরাকের দিকে তাকিয়ে আছে।তিসান দ্রুত পায়ে প্রেয়নার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে আড়াল করে দাঁড়ালো।উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
"তুমি এখানে কেন এসেছো?কে আসতে বলেছে তোমায়?এক্ষুণি বাড়ি যাও।"
প্রেয়না আঙুলের ইশারায় ইশরাক কে দেখিয়ে প্রশ্ন করলো,
"উনি কে তিসান ভাই?তোমরা চেনো ওনাকে?"
"সেসব তোমায় জানতে হবে না।অনুরোধ করছি বাড়ি ফিরে যাও।"
"আমি ওনাকে চিনি তিসান ভাই।এক মিনিট।"
কথাটা বলে প্রেয়না তিসান কে পাশ কাটিয়ে ইশরাকের দিকে এগিয়ে এসে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
"সেদিন গাড়িতে আপনি ছিলেন রাইট?হ্যাঁ আমি সিওর আপনি ছিলেন।পা/গলের মতন কেন ড্রাইভ করছিলেন?গাড়ি চালাতে জানেন না যখন চালান কেন?ষ্টুপিড।"
না।আজ কাউকেই সামলাতে পারছে না তিসান।প্রেয়নার হাত ধরে টেনে নিজের দিকে নিয়ে এসে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
"চুপ করো।এত কথা বলতে তোমায় কে বলেছে?তুমি চেন না ওকে।"
প্রেয়না জোর গলায় বলল,
"না আমি চিনি ওনাকে।সেদিন যে গাড়িটা নির্ভয় কে ধাক্কা মে/রেছিলো আমি সেই ড্রাইভারের মুখটা একটু দেখতে পেয়েছিলাম।আর আমি নিশ্চিত যে উনিই সেই ড্রাইভার।"
আরেক দফা বিস্ফোরণ হল সেখানে।একের পর এক চমক আজ তারা পেয়েই যাচ্ছে।নির্ভয় এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।তিসান আর প্রেয়নার মাঝে তার কথা বলতে অস্বস্তি হয়।কিন্তু এবারে আর না বলে থাকতে পারলো না।সেদিন যে মে/রেছিল তো মে/রেছিল।যদি লোকটা ইশরাক হয়ে থাকে তাহলে তো আরো কিছু জানার দরকার নেই।প্রেয়না কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"বাদ দিন প্রেয়না।যা হওয়ার হয়ে গেছে।আপনার এখানে থাকার দরকার নেই,বাড়ি চলে যান।"
নির্ভয়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে তিসানও বলে উঠলো,
"একদম ঠিক বলেছো নির্ভয়।এই নিয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো।নির্ভয় তুমি প্রিয়ু কে নিয়ে বাড়ি চলে যাও।"
ওদের কথা শুনে প্রেয়নার ভীষণ রাগ হলো।রাগান্বিত স্বরে বলল,
"অদ্ভুত তো।তোমরা এমন করছো কেন সবাই?উনি একটা অপরাধ করেছেন সেটা বলতে পারবো না?সেদিন নির্ভয়ের কত বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারতো সেটা তোমরা জানো না?আর তাছাড়া......"
"এসব কথা বাদ দিন।আগে বলুন তো আপনি কেমন আছেন ভাবি?"
প্রেয়নার কথার মাঝেই ইশরাক কথাটা বলে উঠলো।ওর মুখ থেকে ভাবি সম্মোধনটা প্রেয়নাকে একটু অবাক করলো।প্রেয়না কে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইশরাক পুনরায় বলে উঠলো,
"ভাবি বলে কেন ডাকলাম সেটাই ভাবছেন তো?উত্তরটা জানতে চাইলে আমার বন্ধু তিসান কে জিজ্ঞেস করুন।আপনি আমাকে না চিনলেও আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পেরেছি।আমাদের কি আর এক দু দিনের আলাপ নাকি?কত বছরের পুরনো আলাপ।কি রে তিসান বল ভাবি কে কিছু?"
তিসান এতক্ষণ যে ভয়টা পাচ্ছিল সেটাই সত্যি হলো।প্রেয়না আসার পর থেকে তিসান কে একটাই ভয় তাড়া করে বেরাচ্ছিলো যে কখন না জানি আবার ইশরাক ওকে চিনে ফেলে আর এখন সেই ভয়টাই সত্যি হলো।তিসান ঘামছে।প্রেয়না প্রশ্নাত্মক চাহনি নিক্ষেপ করে বলল,
"উনি কি বলছেন তিসান ভাই?আমি তো ওনাকে আগে চিনতাম না।আর ভাবি ডাকার কারণ তুমি জানো মানে?"
তিসান কোনো উত্তর দিতে পারল না।তা দেখে ইশরাক শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
"আপনার প্রশ্নের উত্তর ও দিতে পারবে না।কি রে সবকটার মুখ আজ বন্ধ কেন?সবগুলোর হৃদয় নিয়ে টানাটানি শুরু করেছি জন্য?বলেছিলাম না তোদের সবকটা কে আমি শেষ করবো।মাত্র শুরু করলাম।এবার দেখ ধীরেধীরে তোদের সবকটার কি অবস্থা আমি করি।তোদের জন্য পুরনো কিছু প্রতিশোধও আবার নতুন করে নিতে হবে মনে হচ্ছে।আমার সুন্দরীর দিকে নজর দেয়া তো,তোর জান বের করে ছাড়বো আমি নির্ভীক।যে তোকে বাঁচাতে আসবে তারও একই অবস্থা করবো।"
ইশরাক এবার তিসানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"তোকে কলেজ ছাড়িয়েছি,সম্মান হারা করেছি,আমার পা চাটিয়েছি তারপরেও যদি তোর শিক্ষা না হয় তাহলে এবার সোজা তোর বুকে আঘাত করবো মনে রাখিস।"
কথাটা বলে ইশরাক সেখান থেকে চলে গেল।প্রেয়না নিজের একটা প্রশ্নের উত্তরও পেল না।নির্ভয় এগিয়ে এসে ওকে কিছু বোঝাতে চাইল কিন্তু প্রেয়না ওর কথা শুনলো না।সরাসরি তিসান কে জিজ্ঞেস করলো,
"উনি কে তিসান ভাই?তোমায় কলেজ ছাড়া করেছেন মানে কি?ওনার পা চাটিয়েছেন,সম্মান হারা করেছে মানেটা কি?চুপ করে আছো কেন উত্তর দাও?"
তিসান বাজখাঁই গলায় প্রেয়না কে ধমক দিল।চোখ দিয়ে তার অগ্নি বর্ষিত হচ্ছে সেই সাথে তুমুল হারে ঘামছে।ক্রোধান্বিত কন্ঠে বলল,
"একদম চুপ।আমার সব বিষয়ে তোমায় কৈফিয়ত দিতে হবে?কোন সাহসে আমার থেকে কৈফিয়ত চাচ্ছো তুমি?আর এখানে এসেছো কোন সাহসে?কিছু বলি না জন্য মাথা কিনে নিয়েছো তুমি?দেখি ফোন দাও তোমার?ফোন দাও।"
শেষের কথাটা তিসান এতই জোরে বলল যে প্রেয়না কেঁপে উঠলো।আজ অব্দি তিসান কেন কেউই প্রেয়নার সাথে এত উঁচু গলায় কথা বলেনি।প্রেয়নার দু চোখ পানিতে ভরে উঠলো।তিসান পুনরায় বলল,
"ফোন দাও।"
প্রেয়না চুপচাপ নিজের ফোনটা বের করে তিসানের হাতে দিল।তিসান সোজা প্রয়াসের নাম্বারে ডায়াল করলো।কলটা রিসিভ করতেই তিসান রাগী কন্ঠে বলল,
"নিজের বোন কে সামলাতে পারিস না?মুখে তো খুব বড়বড় কথা বলিস বোনের জন্য এই করব, ওই করবি সেই বোন কোথায় যায় সেই খোঁজ রাখিস?"
ফোন ধরেই তিসানের কন্ঠ পেয়ে প্রয়াস ভীষণ চমকালো।তার মধ্যে ওর কথা গুলোও বুঝতে পারছেনা।
"পরিষ্কার করে বল কি বলবি?প্রেয়নার ফোন তোর কাছে কেন?"
"কারণ তোর বোনও আমার কাছে।তুই বিদেশেই থাক আর এদিকে তোর বোন স্বাধীনতা পেয়ে তো আকাশে উড়ছে।যখন যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাচ্ছে,যার সাথে ইচ্ছে হচ্ছে তার সাথে ঘুরছে সেই খোঁজ আছে?তোর বোনের খেয়াল আমি রাখতে যাব কেন বল?দায়িত্ব তো একেবারের জন্য দিবি না আমায় তাহলে সাময়িকের জন্য কেন নেব আমি?দায়িত্ব যখন পালন করতে পারবি না,আমি দিতে বলেছিলাম আমায় তাও তো দিলি না, তাহলে বিদেশে বসে না থেকে দেশে এসে বোনের একটা ব্যবস্থা কর।তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দে।আমি আজ শেষবারের মতন ওকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি আর পারবো না।এরপর নিজেই খেয়াল রাখবি।"
কথাটা বলেই তিসান ফোনটা রেখে দিয়ে প্রেয়নার হাত ধরে সেখান থেকে ওকে নিয়ে গেল।কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না।ওদের পিছু পিছু নির্ভয়ও গেল।উৎসব এসব ঘটনার কিছুই জানে না।কেননা ইশরাক কে আর মারতে না দেওয়ায় রেগেমেগে চলে গেছে।বাকি রইলো নির্ভীক,প্রভা আর সৌমি।প্রভা উপস্থিত থেকেও এসব ঘটনা সম্পর্কে কিছুই যেন বোধগম্য হয়নি।আর সৌমি!সে তো তিসানের ভালোবাসা দেখে স্তব্ধ।মনে মনে ভাবছে প্রেয়না কতই না সৌভাগ্যবতী যে তিসানের ভালোবাসা পেয়েছে।একেক জন একেক দিকে চলে গেল।একেক জনের জীবনে একেক রকমের অশান্তি।কেমন যেন বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল বন্ধুমহলটা।যে যার মতন চলে গেল।সমস্যা গুলো কেমন যেন হুট করে বেশি জটিল হয়ে উঠলো।এর সমাধান কি আদৌও মিলবে?