ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৩৮

🟢

বেঞ্চের উপর বসে মনের সুখে সিগারেট টানছে উৎসব।তার সাথে তাল মিলিয়ে তিসানও সিগারেট টানছে।ওদের মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে এর থেকে সুখের কাজ এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।তাদের সমস্ত সুখ যেন কেউ সিগারেটের মধ্যে এনে রেখে দিয়েছে।নির্ভীক ও অবশ্য ওদের দলে যোগ দিয়েছিল।কিন্তু সে একটা সিগারেট এই থেমে গেছে।এদিকে তিসান আর উৎসব দুজনেই একটা সিগারেট শেষ করে দ্বিতীয়টায় আগুন ধরিয়েছে।ওদের মাঝে একমাত্র ব্যক্তি যার সিগারেটের উপর কোন নেশা নেই সে হচ্ছে নির্ভয়।বরং বরাবরই ওদেরকে এত সিগারেট খেতে দেখে আচ্ছা মত গালি দেয়।এর ক্ষতিকর দিক সম্বন্ধে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু কেউ গায়েই মাখে না।রাগারাগি করার পর যখন নির্ভয় শান্ত ভাবে বোঝানো শুরু করে তখন প্রতি বারই নির্ভীক হালকা করে হেসে বলে,

"এত দুঃখ,এত মানুষের কটু কথা শুনেও যখন এতদিন বেঁচে আছি,তাহলে সামন্য এই সিগারেটে আর মরবো না রে ভাই।"

একটা কথাতে নির্ভয় থেমে যায়।আর কিছু বলার মতন খুঁজে পায়না।তাদের প্রত্যেকটা কথায় যে একটা করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।কিছুক্ষণ পরে সেখানে আগমন ঘটলো মাঝবয়সী একজন ছেলের।কালো প্যান্ট,সাদা শার্ট ইন করা,চুলগুলো খুব সুন্দরভাবে পরিপাটি করে আঁচড়ানো।সাথে হাতে কতগুলো ফাইল।ছেলেটাকে দেখতে খুব ভদ্র লাগছে।বাইকটা একপাশে পার্ক করে গুটি গুটি পায়ে ছেলেটি এগিয়ে আসে উৎসবকে একবার ডাকলো,

"স্যার!"

ডাকটা কানে যেতেই উৎসব বুঝতে পারলো যে কে ডাকছে ওকে।ঘাড় ঘুরিয়ে একবার মাসুমকে দেখে নিল।কন্ঠে একটু গাম্ভীর্য এনপ বললো,

"কি চাই?"

"আসলে স্যার কিছু ফাইলে সাইন করার ছিল।কিন্তু আপনি তো এলেন না অফিসে।সেজন্য আমাকে বাধ্য হয়ে এখানে আসতে হলো।আর আপনি যেটা আনতে বলেছিলেন সেটাও এনেছি।"

মাসুমের কথাটা শুনে উৎসবের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।ছেলেটা আজ একটা কাজের কাজ করেছে।মাসুমের হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো,

"মাসুম রে এই জীবনে প্রথম তুই একটা ঠিকঠাক কাজ করলি।বিশ্বাস কর তোকে এখন আমার আদর করতে ইচ্ছে করছে।বল করব আদর?"

"না স্যার লাগবে না থাক।আপনি একটু প্লিজ তাড়াতাড়ি সাইন টা করে দিন,আমার অফিসে কাজ আছে।"

"আরে রাখ তো তোর সাইন।এইসব বা*লছা*লের কাজের পিছনে পড়ে থাকলে জীবনে আর কিছু উপভোগ করতে পারবি না।এই মাসুম,আমাদের সবাইকে এক কাপ করে চা খাওয়াবি সাথে চাচার দোকানের একটা করে স্পেশাল টোস্ট বিস্কুট।"

উৎসবের মতিগতি মাসুম ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।এই ছেলের যে কখন কি ভুত ধরে কে জানে।যেখানে নিজেই কোটি কোটি টাকার মালিক সেখানে কিনা মাসুম কে বলছে যেন ওদেরকে এক কাপ চা খাওয়ায়?উৎসব সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ হতেই পারে না।এ নির্ঘাত পা*গল।মাসুম কে চুপ করে থাকতে দেখে উৎসব কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,

"কিরে মাসুম খাওয়াবি না?দেখ নারে মাসুম আমার পকেট পুরোই ফাঁকা।একটা টাকাও নেই।তুই এখন আমার থেকে বেশি বড়লোক।মাসুম খাওয়া না রে।দাঁড়া তোকে আমার মানিব্যাগ দেখাচ্ছি।"

কথাটা বলে উৎসব প্যান্টের পকেট থেকে নিজের মানিব্যাগটা বের করে মাসুমকে দেখালো।সেই সাথে বাকিদের কেও দেখিয়ে বললো,

"এই দেখ না আমার মানিব্যাগে একটা টাকাও নেই।ওই মারা খাওয়া প্রাণী,দেখেছো তোমার বড় লোকের বাচ্চা ফকিন্নির বাচ্চা হয়ে গেছে।"

তিসান শব্দ করে হেসে উঠে বললো,

"না ভায়া না।তুমি বড়লোকের বাচ্চা ছিলে আর বড় লোকের বাচ্চাই আছো।সেজন্যই তো পকেটে ছোটখাট দু একটা নোট না থেকে আছে ক্রেডিট কার্ড।"

"আরে তুমি ওই বা*লের কথা বাদ দাও তো।মাঝে মাঝে তো ইচ্ছে করে ওকে উড়িয়ে দেই।বা*লের মেশিনে গিয়ে কি সব টেপার পর তারপর টাকা দেয়।আরে ভাই,আমার টাকা আমি তুলবো তাতে ওকে এত কৈফিয়ত দিতে হবে কেন?শালা পুরাই হা*রামি।"

অনেকক্ষণ উৎসবের আজেবাজে কথা সহ্য করার পর নির্ভীক বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"খেয়েছিস তো সিগারেট তাহলে মাতালদের মতন কথা বলছিস কেন ইডিয়েট?মদ খেয়েছিস যে মাতলামো করছিস?"

উৎসব দাঁত বের করে এসে বলল,

"বুঝতে পারছি না ভাই কেন যেন সিগারেটে মদের ফিলিং আসছে।মনে হচ্ছে মাতলামি করতে করতে গিয়ে কাউকে একটা জড়িয়ে ধরে বলি আই লাভ ইউ।"

"মাতলামো করে গিয়ে বলতে হবে না।এমনিতেই তো তোর গার্লফ্রেন্ডের সংখ্যা কম না।একজনকে গিয়ে বল তাহলেই হয়ে যাবে।"

"আরে ধুর।এই বয়সে কি আর একজন গার্লফ্রেন্ড মানায় ভাই?আরে এখন একটা পার্মানেন্ট বউ চাই,আমার বউ।যাকে যখন তখন জড়িয়ে ধরে একটু চুমু খেতে পারব,আই লাভ ইউ বলতে পারবো।"

নির্ভীক আর কথা বাড়ালো না এই ছেলের সাথে।আস্ত একটা বাঁদর ছেলে।তিসান বক্র হেসে বলল,

"দেখো ভায়া,বউটা যেন নিজের হয়।অন্যের বউকে আবার ছিনিয়ে এনে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করো না,ঠোঁটে কিন্তু এলার্জি হবে।"

উৎসব তিসানের উপর বিরক্তিকর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

"এই মারা খাওয়া প্রাণীর যতসব বা*ল মার্কা কথা।ওই বাল অন্যের বউকে আমি চুমু খেতে যাব কেন?আমার কি রুচিতে দুর্ভিক্ষ হয়েছে?এমন ভাব করছে যেন আমি জীবনে বউ পাবো না?"

তিসান ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো,

"এটাও নির্ভর করছে কাকে বউ বানাতে চাইছো তার ওপর।যাই বলো আর তাই বলো,সবার কপালে কিন্তু বউয়ের সুখ সয় না।আবার অনেকে বউ পেলেও বউয়ের ভালোবাসা পায় না।আবার অনেকে পেয়ে গেলে সেটা টেকে না।কি একটা অবস্থা বলতো?প্রকৃত সুখী হতে কেউ পারে না।"

ওদের কথাবার্তা থামার নামই নেই।এদিকে মাসুম প্রচন্ড তাড়াহুড়োর মধ্যে আছে।যদি ঠিক সময় মতো অফিসে পৌঁছতে না পারে তাহলে ওদিকে আবার সাইফুল মির্জা ঝাড়ি মা/রবে।অনুরোধের স্বর উৎসব কে বলল,

"স্যার প্লিজ তাড়াতাড়ি একটু সাইন দিয়ে দিন না।আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে কিন্তু।"

"আচ্ছা ঠিক আছে কিন্তু তার আগে তোকে আমায় চা খাওয়াতে হবে আর সাথে টোস্ট বিস্কুট না হলে আমি সাইন করব না।এখন তুই ভাব চা-বিস্কুটের পেছনে কয়েকটা টাকা বাঁচাতে গিয়ে কি নিজের হাতের দামি চাকরিটা হারাবি?"

"আরে ভাই আপনি কয় কাপ চা খাবেন খান তো।আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি তাও আপনি তাড়াতাড়ি সাইন করে দিন।"

চায়ের অর্ডার দিয়ে উৎসব মাসুমের হাত থেকে ফাইল নিয়ে একে একে ঝটপট সাইন করে দিল।সাইন করা শেষে মাসুম তাড়াহুড়ো করে চায়ের বিল টা দিয়ে চলে যেতে নিলে উৎসব পিছন থেকে ওকে ডেকে ধমক দিয়ে বললো,

"তোর কাজ শেষ আর তুই দৌড় লাগাইছিস,তাহলে আমার জিনিসটা কোন বা/ল দিবে?"

মাসুম তাড়াহুড়ো করে পেনড্রাইভটা উৎসবের হাতে দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।পেনড্রাইভটা হাতে পেতে উৎসব হালকা হাসলো।নির্ভীক এর দিকে তাকিয়ে বলল,

"ভাই ডান।এবার বল/দাকে মজা দেখাবো।"

"এখনো কাজ বাকি আছে।বকুলের বাবা মা কি কেস করেছে?"

"হ্যাঁ।এখন শুধু সিসিটিভি ফুটেজ গুলো আঙ্কেলের হাতে তুলে দিলেই হবে।তারপরে দেখা যাক কি হয়।"

উৎসব আর নির্ভীক ভাবলেশহীন থাকলেও নির্ভয় আর তিসানের মুখে চিন্তার চাপ দেখা গেল।ইশরাকের সাথে লাগতে নির্ভয় বরাবরই অপছন্দ করে।কিন্তু এক্ষেত্রে না লেগে উপায় নেই।বকুলকে তো ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে হবে ওদের।তিসানেরও একই মতামত।তবে কেন যেন প্রচুর চিন্তা হচ্ছে।চিন্তিত কন্ঠে বলল,

"আমরা ঠিক করছি তো?আদৌ কি আমরা ইশরাকের কিছু করতে পারবো?নাকি অযথা শুধু নিজেদের উপর বিপদ ডেকে আনছি?"

তিসানের কথা শুনে উৎসব আর নির্ভীক এর মুখেও চিন্তার ভাঁজ পড়ল।উৎসব তবুও গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,

"আরে ভাই চিন্তা করো না যা হবে দেখে নেব।আগে তো বকুলের ব্যাপারটা দেখি।"

উৎসবের কথায় সম্মতি জানিয়ে নির্ভীক বলল,

"হ্যাঁ ভাই আগে বকুলের ব্যাপারটা দেখি।আর এমনিতেও ইশরাক কখনোই আমাদের পিছু ছাড়বে না।শুধুমাত্র আমাদের ক্ষতি করার জন্য একটা মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় আছে।এই ঘটনার পরে তো তার সাথে আরো একটা কারণ বাড়বে।এর থেকে তো আর বেশি কিছু হবে না।দেখা যাক ও কি করতে পারে?"

বিজ্ঞাপন

তিসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।কেন যেন তিসানের মনে হচ্ছে যে ওরা নিজেদের ওপর নিজেরাই বিপদ ডেকে আনছে।

_____________

কলেজের গেটের সমানে পায়চারি করছে নির্ভীক।প্রভার জন্য অপেক্ষা করছে।প্রভা ক্লাস শেষে বেরোলো ওর সাথে একটা জরুরী কথা বলে নির্ভীক চলে যাবে।বেশ অনেকক্ষণের অপেক্ষার পর অবশেষে প্রভার দেখা মিললো।গেটের কাছে নির্ভীককে পায়চারি করতে দেখে প্রভা ভ্রুঁ কোঁচকালো।নির্ভীকের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।প্রভা এগিয়ে এসে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"কি হয়েছে?এভাবে পায়চারি করছেন কেন?"

প্রভার কণ্ঠ পেতেই নির্ভীক তড়িৎ বেগে সেদিকে তাকালো।অস্থির কন্ঠে বলল,

"দরকারি কথা আছে আপনার সাথে।চলুন।"

"কোথায় যাব?"

"আমাদের আড্ডাখানায়।"

প্রভা আর কোন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ নির্ভীকের পেছন পেছন ছোট্ট চায়ের দোকানটাই এলো।সেখানে আগে থেকে উৎসব উপস্থিত ছিল।বাকি আর কেউ নেই।প্রভা বুঝতে পারছে যে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে কিন্তু কি সমস্যা হয়েছে সেটা আন্দাজ করতে পারছে না।অবশেষ আর কৌতুহল দমাতে না পেরে নির্ভীক কে প্রশ্ন করেই বসলো,

"প্লিজ বলবেন কি সমস্যা হয়েছে?আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি যে খারাপ কিছু হয়েছে।"

"ইশরাক জামিন পেয়ে গেছে।"

"কি?এত তাড়াতাড়ি কি করে জামিন পেয়ে গেল?প্রমাণ তো জমা দেওয়া হয়েছে,তাহলে?"

বেঞ্চের উপর বসা উৎসব রাগান্বিত স্বরে বলল,

"শালা আমার বাপের বন্ধু বেইমানি করেছে।হা/রামি কোনো বা/ল ছিঁড়তে পারবে না সেটা আমাকে আগে বললেই পারতো।অযথা,আমি ওর উপর ভরসা করে বসেই থাকতাম না।"

প্রভা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

"মানে?কি করেছেন উনি?"

"আর বলবেন না মাস্টান্নি,এসপি হয়ে ওই সাধারণ রাজনীতিবিদের নাম শুনে ওর কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেছে।কি এক ভয় দেখিয়েছে অমনি ও আমায় ফোন করে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে যে ও যদি বেশি মাথা মা/রে তাহলে নাকি ওর বউ ম/রবে,ওর বাচ্চা ম/রবে,নিজে ম/রবে,ওর ১৪ গুষ্টি ম/রবে।যখন ও আমায় একথা বলছে আমি ডিরেক্ট একটা কথাই বলেছি,চ্যা/টের কথা বলতে নিছেন?আগে হুশ ছিলো না আপনার?মন তো চাইছিল যে আমি নিজে গিয়ে ওকে মে/রে দিয়ে আসি।"

প্রভা ভয়ার্ত গলায় বলল,

"ইশরাক বলেছিল যে আমরা ওকে একদিনও জেলের ভেতর রাখতে পারব না সেটাই হলো।আমাদের হাতে কি আর কোন উপায় নেই?"

"না মাস্টান্নি নেই।থাকলে কি আর আমরা এখানে বসে থাকতাম।আমার বাপ মা যদি আমায় একটু সাহায্য করতো তাহলে অনেক কিছু হতে পারতো কিন্তু ওদের তো সময় নেই।না ওরা এসব ঝামেলার মাঝে নিজেদেরকে জড়াবে।আমার হাতে একটাই বা/ল ছিল,ওই আংকেল।কিন্তু সেও এভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।এখন যে কি করবে কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা।"

ওদের কথাবার্তার মাঝে নির্ভীক ওদেরকে থামিয়ে দিয়ে তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল,

"এসব আলোচনা তোরা পরে করিস আগে আমি যেটা বলি সেটা শোন।দেখুন অনুপ্রভা,ইশরাক জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ক্ষ্যাপা ষাঁড় হয়ে আছে।ও এখন উন্মাদের মতন আচরণ করবে।যদিও আপনাকে কোন আঘাত করার সম্ভবনা নেই।কিন্তু তারপরও আপনাকে সাবধান থাকতে হবে।আমায় কয়েক দিনের জন্য একটা জায়গায় যেতে হবে।আমি হয়তো যোগাযোগ রাখতে পারব না আপনাদের সাথে তেমন।আপনার টিউশন থেকে ফেরার পথে আপনাকে আর বাড়িতেও পৌঁছে দিতে পারবো না।আর এখন আপনার একা একা চলাফেরা করা খুবই বিপদজনক।সেজন্য বলছি এই কয়দিন প্লিজ অন্তত রাতে উৎসব আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে।"

উৎসব আগে থেকেই জানে এই কথাটা।ফলে সে আর আলাদা করে অবাক হলো না বরং মনে মনে বেশ খুশি হলো।এই প্রথম ইশরাককে ধন্যবাদ দিতে মন চাইলো।ওর জন্যই তো উৎসব মাস্টান্নির সাথে একটু সময় কা/টাতে পারবে।কিন্তু প্রভা হালকা আপত্তি করে বলল,

"আপনি এতো চিন্তা করছেন কেন?উনি কিছু করবেন না।উৎসব ভাইয়ার কি কোন কাজ নেই নাকি যে সারাদিন আমার পিছনে ঘুরবে?এটা হয়?"

"উৎসবের কোন সমস্যা নেই।আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা করুন অনুপ্রভা।ইশরাক হয়ত আপনাকে আঘাত করবে না ঠিকই কিন্তু আপনাকে তুলে কিন্তু ঠিকই নিয়ে যেতে পারে।আপনার সম্মানে কিন্তু ঠিকই আঘাত করতে পারে,যেটা করতে ওর একটুও বাঁধবে না।এমনও হতে পারে আমাদের রাগ আপনার উপর দেখালো।তাই অনুরোধ করছি যে কয়টা দিন আমি আপনার সাথে থাকতে পারবো না সেই কয়টা দিন উৎসবের সাথে থাকুন।আমি তো বলিনি সারাদিন থাকার কথা।আমি শুধু রাতের সময় টুকুর কথা বলেছি।রাতে একা একা চলাফেরা করা এমনি মেয়েদের জন্য বিপদজনক।তার মাঝে আপনার পিছনে ইশরাক নামক একটা শয়তান লেগে আছে।এই ভয়ে ই আমি প্রতিদিন রাতে টিউশন থেকে ফেরার পথে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিতাম।এখন শুধু কয়েকটা দিনের জন্য সেই কাজটা উৎসব করবে আর কিছু না।"

"এভাবে কি করে হয় বলুন তো?আপনারা কতদিন আমায় পাহারা দেবেন?"

"যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন দেবো।আমি উৎসবকে যতটা বিশ্বাস করি আর কাউকে ততটা বিশ্বাস করতে পারি না সেজন্য ওর হাতে আপনার দায়িত্বটা দিয়ে গেলাম।যেকোনো সমস্যা হলে উৎসবকে বলবেন।অতিরিক্ত প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বেরোনোর দরকার নেই।কিছু দরকার পড়লে উৎসবকে বলবেন।আমার কথাটা একটু শুনুন।যদি আমার খুব দরকার না হতো তাহলে আমি এই মুহূর্তে আপনাকে একা ছেড়ে যেতাম না।বন্ধু হিসেবে আমার এই কথাটা রাখুন প্লিজ অনুপ্রভা।"

প্রভা আর না করতে পারলো না।কথাটা অবশ্য নির্ভীক ভুল বলেনি।সত্যিই ইশরাক যেকোনো সময় যেকোনো নোংরা কাজ করতে পারে।ওর তো বিবেক-বুদ্ধি এবং মনুষ্যত্ব বোধ নেই যা ওকে খারাপ কাজগুলো করা থেকে আটকাবে।নির্ভীক থাকলে প্রভার কোন চিন্তা ছিল না।কিন্তু যেহেতু নির্ভীক থাকছে না তাই প্রভার চিন্তাটা একটু বাড়লো।উৎসবকে ভরসা করা যায় এখন কিন্তু অবশ্যই সেটা নির্ভীকের মতন না।কেননা দুটো মানুষের সাথে সম্পর্কই তো আলাদা।আপাতত প্রভার মনে আর একটা প্রশ্নের জন্ম নিল,কি এমন দরকারি কাজ পড়লো যে হঠাৎ করে নির্ভীক বলছে কয়েকদিনের জন্য যোগাযোগ রাখতে পারবেনা।

"সবই ঠিক আছে কিন্তু আপনি কোথায় যাবেন?কি কাজ আছে আপনার?"

"আর বলবেন না সেদিন যে আপনার সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু যেতে পারলাম না যে কারণে এবার তার থেকেও খারাপ কিছু হয়েছে।"

"কি হয়েছে আপনার বোনের?আবার খুঁজে পাচ্ছেন না নাকি?"

"পালিয়ে গেছে বাড়ি থেকে।যতটুকু খবর পেয়েছি তাতে যে ছেলেটার সাথে পালিয়েছে তার চরিত্র ভালো না।ওর একটা বন্ধুর থেকে খবর পেলাম ছেলেটার গ্রামের বাড়িতে নাকি গিয়েছে।এখনো ছেলের বাবা মা তো কোনমতেই কিছু স্বীকার করছে না।কোন মতে শুধু জেলার নামটা জানতে পেরেছি।এখন একটা জেলা তো ছোট না যে গিয়ে খুঁজে বের করব।কি থেকে কি করব কিছু বুঝতে পারছি না।তার মধ্যে ছেলেটার পরিবার প্রভাবশালী।প্রথমে তো পুলিশ কেস ই নিতে চাইছিল না পরে একটু ভয় দেখানোতে কেস নিল ঠিকই কিন্তু ঠিকঠাকভাবে তদন্ত করছে না।সে জন্য আমাদের নিজেদের মতন করে চেষ্টা চালাতে হচ্ছে।"

উৎসব বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"আরে ভাই ও গেছে সংসার করতে তোরা এত নাক গলাচ্ছিস কেন এর মাঝে?সংসারের স্বাদ মিটে গেলে এমনি ফিরে আসবে।আর তাছাড়া তোর সৎ মায়ের তো নিজের ছেলে মেয়েকে নিয়ে খুব গর্ব ছিল।একটু সে গর্বটা কমতে দে না ভাই তোকে আবার খুঁজতে যেতে হবে কেন?"

"চুপ কর উৎসব।আমিও যদি ওদের মতনই আচরণ করি তাহলে পার্থক্যটা থাকলো কোথায়?ওর বয়স কম,বাস্তবতা সম্পর্কে এখনো জ্ঞান হয়নি।ওর ফোনটাও সুইচড অফ।এটা আমার দায়িত্ব।"

"বাস্তবতা সম্বন্ধে জ্ঞান হয়নি কিন্তু বিয়ের জন্য তো ঠিকই চুলকাচ্ছিল।শোন ভাই সাথে একটা চুলকানির মলম নিয়ে যাস।ওই তোর বোন কি যেন নাম?ও হ্যাঁ সামিয়া,ওকে পাওয়ার পর আগে চুলকানির মলমটা লাগিয়ে দিস তাহলে ওর বিয়ে করার ইচ্ছে ম/রবে।তবে যাই বলিস আর তাই বলিস আমি হলে কিন্তু ওকে কখনো খুঁজতে যেতাম না।কারণ আমি জানি কয়েকদিন পরে নিজ থেকে আবার বাড়ি ফিরে আসবে।"

"জানি আসবে কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।বাই এনি চান্স যদি ওর কোন ক্ষতি করে দেয়?বড় লোকের বিগড়ে যাওয়া ছেলের সাথে পালিয়েছে।আল্লাহ মালুম ওর কি কি বদ অভ্যাস আছে।"

উৎসব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"তোকে বুঝিয়ে যে কোন লাভ হবে না এটা আমারই বোঝা উচিত ছিল।যা ভাই যা তুই সমাজ সেবা করতে যা।যারা তোকে পায়ের নিচে পিষে ফেলতে চায় তাদেরকেই মুকুট বানিয়ে মাথায় বসিয়ে রাখ।"

নির্ভীক আর কথা বাড়ালো না।এমনিতে অনেক দেরি হয়ে গেছে।আর সময় নষ্ট করা যাবে না।নির্ভীক প্রভা আর উৎসব এর থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।যাওয়ার আগে আরো হাজারবার করে প্রভাকে বলে গেল যেন একা একা ঘোরাঘুরি না করে,কোন সমস্যা হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে উৎসব কে ফোন করে।মানুষটার দায়িত্ববোধ দেখে প্রভা মুগ্ধ হলো আরো একবার।এতক্ষণে সব হাসি-ঠাট্টা ভুলে উৎসব এবার স্বাভাবিকভাবে প্রভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"দেখুন মাস্টান্নি,আমি জানি আমি নির্ভীক না।নির্ভীকের সাথে আপনার সম্পর্কটা বেশি দিনের।ওর সাথে আপনার সম্পর্কটা ভালো,ওকে যতটা ভরসা করতে পারেন আমাকে যে ততটা ভরসা করতে পারবেন না সেটাও আমি খুব ভালো করেই জানি।কিন্তু তাই বলে প্লিজ কোন সমস্যা হলে আমায় বলতে দ্বিধা করবেন না।শুধু এতোটুকু মাথায় রাখবেন নির্ভীক যখন আমাকে দায়িত্বটা দিয়ে গেছে তার মানে নিশ্চয়ই আমি সেটা পালন করার যোগ্য।"

"জ্বী ভাইয়া জানি।চিন্তা করবেন না আমি জানাবো আপনাকে।আর আপনাকে এত ভাবতে হবে না।আমি বুঝতে পারছি অযথা উনি আপনার উপর একটা চাপ দিয়ে গেলেন।"

উৎসব স্মিত হেসে বলল,

"কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করতেও ভালো লাগে।দায়িত্ব আর চাপ কখনো এক হয় না।আমি এটা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছি।ভরসা রাখবেন আমার উপর মাস্টান্নি।এমনি সময় হয়তো আমি মানুষটা ছন্নছাড়া,বেপরোয়া হতে পারি কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনে কখনো গাফিলতি করি না।আপনার দায়িত্ব আমাকে আমার ভাই দিয়ে গেছে।আমি জান দিয়ে দেব তবুও এই দায়িত্ব আমি পালন করব।"

প্রভা হাসলো।কি দারুন বন্ধুত্ব দুটো মানুষের মাঝে।একে অপরের প্রতি কি অগাধ বিশ্বাস আর ভরসা।দুজনে দুজনের প্রতি ভীষণভাবে নির্ভরশীলও।নিজেদের সমস্যাগুলো দুজনে মিলে সমাধান করে।সত্যি এমন বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প