ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৪১

🟢

কলেজে এসেই নির্ভীকের খোঁজে প্রভা আগে সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটায় গেল।কিন্তু সেখানে আজকেও নির্ভীক কে পেল না।তিনটে দিন হয়ে গেলো মানুষটার কোনো খোঁজ পায়নি।না কথা হয়েছে না দেখা হয়েছে।প্রভার চিন্তাগুলো আরো মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।সত্যিই নির্ভীক ঠিক আছে তো?আচ্ছা নির্ভীক আবার ফিরবে তো প্রভার কাছে?যদি না ফেরে?বাকি সবার মতন যদি নির্ভীকও হারিয়ে যায় প্রভার জীবন থেকে তাহলে কি হবে?না,প্রভা আর এসব ভাবতে পারছে না।নির্ভীক প্রভার জীবন থেকে হারিয়ে যাবে এই ভাবনাটা যেন একটা দুঃস্বপ্ন হয় কেননা এই কথাটা বাস্তবে মেনে নেওয়ার মতন শক্তি আর প্রভার মাঝে অবশিষ্ট নেই।সবাইকে হারিয়ে যখন সে নিঃস্ব তখন হুট করে আগমন ঘটেছিল নির্ভীকের।যে ধীরে ধীরে একটু একটু করে প্রভার মনে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে।প্রভা বেঞ্চ এর ওপর বসে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিলো।চা আসতে না আসতেই সেখানে উৎসবের আবির্ভাব ঘটল।তাড়াহুড়ো করে এসে প্রভার সম্মুখ বেঞ্চে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

"এই মাস্টান্নি,আপনি একা একা কলেজে চলে এসেছেন কেন?আপনি জানেন আপনার জন্য আমি এত সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম আপনাকে আনতে?গিয়ে দেখি আপনি নেই।"

প্রভা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

"আমি ভেবেছিলাম আপনি এত সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারবেন না সেজন্য আর সকালে কল দেওয়া হয় নি।নিজেই চলে এসেছি।কোন সমস্যা তো হয়নি।"

"যদি হতো?এমনিতেও জেল থেকে বের হওয়ার পর ইশরাকের দেখা মিলছে না।কে জানে কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে?ওর এতো ভালো মানুষি আমার সহ্য হয় না।বলদাটা যে আবার কি নতুন পরিকল্পনা করছে কে জানে?"

উৎসবের এতগুলো কথার প্রেক্ষিতে প্রভা শুধু ছোট করে জবাবে বলল,

"হুম।"

এর মাঝে চা এর দোকানের একটা ছোট্ট ছেলে কর্মচারী এসে প্রভার হাতে এক কাপ চা দিয়ে গেল।উৎসবকে দেখে ছেলেটা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"ভাই আপনে চা খাইবেন কি?"

উৎসব ছেলেটাকে হালকা ঝাড়ি মেরে বলল,

"তো কি বা/ল কামে বসে আছি এখানে?তুই জানিস না এখানে চা গিলতেই আসি?যা ভাগ ছ্যাড়া।"

"খাড়ান,খাড়ান আনতাছি।ভালো কইরা কইলেই হয়।এইসব বা/লছা/ল তো আমিও কই না।"

"তাহলে এখনি বা/লছা/ল টা কে বলল?আমি?"

"ওইটা তো আপনারে বুঝানের জন্য কইছি।তাছাড়া আমি কই না।"

উৎসব ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

"তুই যে কত সাধু সেটা আমার জানা আছে।শালা ভাগ এখান থেকে।যা চা নিয়ে আয় নাহলে কিন্তু লুঙ্গি ধরে টান দেবো।"

ছেলেটা আর সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না।নিজের সম্মান রক্ষার্থে দোকানের ভিতর চলে গেল।উৎসব আর ছেলেটার মাঝে এত কিছু কথা হয়ে গেল তবুও প্রভার কোন সাড়া শব্দ নেই।চুপচাপ নিজের মতন চা খেয়ে যাচ্ছে।প্রভার এই চুপচাপ থাকার কারণটা উৎসব ঠিক বুঝতে পারছে না।প্রভা তো এতোটা চুপচাপ কখনো থাকেনা।

"মাস্টান্নি,কথা বলছেন না কেন?আপনার কি মন খারাপ?"

"না এমনিতেই।"

"আরে আমায় বলুন না আপনার কি মন খারাপ?কেউ কিছু বলেছে কি?"

"না কিছু হয় নি।"

উৎসবের এবারে গতকাল রাতের কথা মনে পড়লো।তবে কি প্রভা কাল রাতের জন্য এখনো উৎসবের ওপর রেগে আছে?আর সেই কারণেই কি সকালে উৎসবের সাথে আসেনি আবার এখনো কথা বলছে না?কিন্তু ও তো বলেছিল যে ক্ষমা করে দিয়েছে।

উৎসব অনেক ভেবেও প্রভার কথা না বলার আর দ্বিতীয় কোনো কারণ খুঁজে পেল না।কিন্তু প্রভা কে তো রাগ করে থাকতে দেওয়া যায় না।ওর মন মেজাজ তো ফুরফুরে বানাতে হবে।আসার সময় রাস্তার ধারে অনেক গুলো ফুলের দোকান দেখেছিল উৎসব।হুট করে ইচ্ছে হয়েছিলো প্রভার জন্য ফুল কেনার।কিন্তু ফুলের দোকানে গিয়ে নানান রকমের ফুল দেখে উৎসবের মাথাটা ঘুরে উঠেছিল।উৎসবের পছন্দের কোনো ফুল নেই।তার কাছে ফুল বলতেই সুন্দর।প্রভার পছন্দের ফুল কি সেটাও তার জানা নেই।প্রেমিকা কে তো সবাই লাল গোলাপ উপহার দেয় কিন্তু প্রভা তো উৎসবের প্রেমিকা না।লাল গোলাপ দিলে যদি অন্য কিছু মনে করে সেই ভয়ে আর কিনতেও পারেনি।শেষে আর তার ফুল কেনাই হয় নি।রাস্তা দিয়ে আসার সময় একটা জবা ফুলের গাছ দেখতে পেয়েছিল।সেই গাছ থেকে একটা জবা ফুল নিয়ে এসেছে।একটাই আনতে পেরেছে বাকি গুলো তার নাগালের বাইরে ছিল।ফুল টা দেখার পর উৎসবের মাথায় একটাই কথা এসেছিল যদি প্রেমের রং লাল হয় তবে সে না হয় লাল গোলাপের বদলে লাল রঙের জবা ফুলই উপহার দিলো তার প্রিয়তমাকে।কিন্তু কথা হলো ফুলটা হাতে নিয়ে বাইক চালাতে অসুবিধা হচ্ছিলো তাই শার্টের পকেটে রেখে দিয়েছিলো।আসার পরে সেই ফুলটাতো প্রভাকে দেওয়ার কথা মনেই নেই।পকেট থেকে বের করে দেখলো ফুলটার নাজেহাল অবস্থা।মনে হচ্ছে ওর সাথে মারামারি করেছে।সে তো আর এখন সোজা হয়ে থাকতে পারছে না,একদিকে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে।কিন্তু উৎসবের কাছে আর কোন উপায় নেই তাই দিতেই হবে।ফুলটা প্রভার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তার সুরেলা কন্ঠে একটা কৌতুক পূর্ণ গান গাইলো প্রভাকে উদ্দেশ্য করে।

❝হায় কেমন আছো?

তুমি কি ভালো আছো?

কথা কও ক্যান,তুমি কি রাগ করেছো?❞

এটাকে কি আদৌ গান বলা চলে কিনা সেটা উৎসবের জানা নেই।কবিতা কিনা সেটাও জানে না।তবে এই মুহূর্তে প্রভাকে হাসানোর জন্য এই কয়েকটা লাইনের বড্ড দরকার ছিল।প্রভা শব্দ করে হেসে উঠলো।উৎসবের গান শুনে না হলেও ওর মুখ ভঙ্গিতে হেসে ফেলল।প্রভার সে হাসি দেখে উৎসবের একটাই কথা বলতে ইচ্ছে করলো,

❝পরান যায় জ্বলিয়া রে!❞

কিন্তু সে কথাটা আর মুখে বলা হলো না।এদিকে হাসতে হাসতে প্রভার অবস্থা খারাপ।

"এটা কি শোনালেন আপনি আমায়?কোথায় থেকে শিখেছেন এটা?নাকি আপনি বানিয়েছেন?"

উৎসব বিস্মমভরা কন্ঠে বলল,

"আরে না মাস্টান্নি এটা আমি বানাইনি।কে বানিয়েছে সেটাও জানি না।কিন্তু কথা হলো আপনি এর আগে এটা শোনেননি?"

"না,আমি এর আগে কখনো শুনিনি।আর এই ফুলটার এই অবস্থা কেন?"

প্রভা ফুলটা হাতে নিয়ে সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে প্রশ্নটা করল।উৎসব দুখী গলায় বলল,

"আর বলবেন না?গাছ থেকে তাজা ফুল ছিড়েছিলাম।কিন্তু আনতে আনতে এই অবস্থা হয়ে গেছে।তার আগে বলুন তো আপনার মন খারাপ কেন?কালকের কথার জন্য কি এখনো রাগ করে আছেন আমার উপর?"

"না,আপনার উপর কেন রাগ করে থাকতে যাব কেন?কালকেই তো আপনার সাথে এই নিয়ে কথা হয়ে গিয়েছিল।আসলে নির্ভীক এর জন্য চিন্তা হচ্ছে।তিনটে দিন হয়ে গেল ওনার কোন খোঁজ নেই।ঠিক আছেন তো উনি?"

প্রভার কথাটা শুনে উৎসবের মুখেও চিন্তার ভাঁজ পড়ল।এদিকে বেশ অনেকক্ষণ থেকে তাদের পাশে তিসান দাঁড়িয়ে দুজনকে পর্যবেক্ষণ করছে সেটা কেউই খেয়াল করে নি।অন্তত উৎসব যদি ওকে খেয়াল করতো তাহলে চারটে লাইন প্রভাকে উদ্দেশ্যে করে এই মুহূর্তে কখনোই বলতো না,না নিজের পকেট থেকে ফুলটা বের করে দিতো।কেননা সে তিসানের কাছে ধরা পড়তে চায় না।এদিকে তিসান পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না।এই প্রথম বোধহয় তিসান কোন কিছু ধরতে পেরেও ধরতে পারছে না।এখানে সবার জন্য সবাই ব্যাকুল,সবার জন্য সবার চিন্তা হয়,সবাই সবাইকে পছন্দ করে কিন্তু কে কাকে ভালোবাসে সেটা সে কোনমতেই ধরতে পারছে না।সে বুঝতে পারছে না যে কে কার পেছনে ছুটছে।তবে সে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে আপাতত উৎসব প্রভার পেছনে ছুটছে কিন্তু প্রভা আর নির্ভীকের অনুভূতি কখনো সেভাবে তার দেখা হয়নি।উৎসব ছেলেটা আবার বড্ড বোকা।নিজের অনুভূতি লুকোনোর ক্ষমতা আবার ওর মাঝে নেই। সেজন্যই তো তিসানের কাছে ধরা পড়ে গেছে।কিন্তু প্রভা আর নির্ভীক এ ক্ষেত্রে বড্ড চালাকি করছে।সেই জন্য তিসান ওদেরটা ধরতে পারছে না আর ঠিক সেই কারণেই মনের মাঝে এত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।ওদের দুজনের ভাবনার মাঝে তিসান এসে উৎসবের পাশে বসলো।কাঁধের উপর হাত রেখে বলল,

"কি ভায়া আজকাল আর তোমায় দেখাই যায় না?ভুলে গেলে নাকি আমাদের বড় লোকের বাচ্চা?"

"ধুর বা/ল রাখো তো তোমার বড়লোকের বাচ্চা।"

উৎসব আরো কিছু বলতে নেবে তার আগেই প্রভা চোখ রাঙিয়ে বলল,

"গতকাল রাতে কিন্তু আপনি আমায় কথা দিয়েছিলেন যে এসব ভাষা আর ব্যবহার করবেন না।"

উৎসব অপরাধী কন্ঠে বলল,

"ওহ্!সরি মাস্টান্নি,ভুল হয়ে গেছে।আসলে মা/রা খাওয়া প্রাণীর সাথে ঠিকঠাক ভাষায় কথা বললে ঠিক জমে না ব্যাপারটা।শুধুমাত্র এর সাথে একটু একটু বলবো,আচ্ছা?"

প্রভা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

"যেভাবে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন সেভাবেই কথা বলুন।শুধু আমার সামনে না বললেই হলো।ভাইয়া আমার একটা ক্লাস আছে,আমি আসছি কেমন?"

তিসান মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতেই প্রভা চলে গেল।

"আজকাল দেখছি প্রভার কথা বেশ শোনা হচ্ছে।বাহ্ ভায়া বাহ্!আমরা বললে তো শোনো না।"

"তুমি আর মাস্টান্নি কি এক নাকি?উনি মেয়ে আর তুমি ছেলে।"

"এই সামান্য পার্থক্যের জন্য মাস্টান্নি তোমার উপর এত বড় প্রভাব ফেলতে পারে না।না ব্যাপারটা আমার ঠিক লাগছে না।কেমন যেন একটা সন্দেহ সন্দেহ গন্ধ পাচ্ছি।কি বলো ভায়া?"

তিসানের কথা শুনে উৎসব একটু ঘাবড়ালো।তবে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,

"ধুর তুমি থামো তো।চা খাবে?স্পেশাল মালাই চা খাওয়াচ্ছি সাথে দুটো বিস্কুটও খাওয়াবো।তাও তুমি নিজের মুখটা বন্ধ রাখো।"

বিজ্ঞাপন

তিসান হো হো করে হেসে উঠে বলল,

"সেতো তুমি এমনিই রোজ খাওয়াও।অন্য কিছু দাও তো ভায়া,তাহলে মুখটা বন্ধ রাখবো।"

"কি দেবো?যা বলবে সেটাই দেবো তাও তুমি নিজের মুখটা বন্ধ রাখো।"

তিসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উৎসবের কাঁধে মাথাটা এলিয়ে নিয়ে বলল,

"একটু শান্তি এনে দিতে পারবে?একটু স্বস্তি,একটু আনন্দ,একটা চিন্তাবিহীন জীবন,পারিবারিক শান্তি,সবার অপমান থেকে মুক্তি,কটু কথা থেকে মুক্তি,পারবে এনে দিতে?"

উৎসব বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,

"ও ভাই ওই বা/লগুলো তো আমারই লাগবে।তুমি যদি পাও তাহলে আমায় একটু ভাগ দিও।অশান্তির গোডাউনের কাছে এসেছে শান্তি খুঁজতে।যতসব আজাইরা কথাবার্তা।"

"বেশ তবে এবার শান্তির বদলে অন্য কিছু চাই।একটা ভালোবাসার মানুষ খুঁজে এনে দিতে পারবে?আমার ভালোবাসা কে এনে দিতে পারবে?ওকে পেলেই আমার জীবনের সব শান্তি আপনা আপনি চলে আসবে।"

উৎসব এবার রাগান্বিত স্বরে বলল,

"মনডা চায় দুই চারটা চড় দিয়ে তোমার ভন্ডামি ছুটাই।নিজে ইচ্ছে করে মা/রা খেয়ে এসে এখন আমাকে বলছো ভালোবাসা এনে দিতে?এতো মহান হতে কে বলেছিল?সেদিন নির্ভয় তো বলেছিল যে ও প্রেয়নাকে কিছু জানাবে না।তুমি বিয়ে করে নিতে পারতে না? ওইখানে ভালো মানুষি দেখিয়ে এসে এইখানে আবার ভালোবাসা চাও।ভন্ডামি করতে আইছো?"

তিসান আনমনে হেসে বলল,

"নির্ভয়ের ভালোবাসাটা ভন্ডামি হলে ভালো হতো বলো?তাহলে আমি প্রিয়ু কে বলতে পারতাম যে নির্ভয় ভালো না,ওর সাথে ভালোবাসার নাটক করছে।তাহলে প্রিয়ু আর নির্ভয় কে ভালোবাসতো না,ঘৃণা করতো।তখন প্রিয়ুর মনের ঘরটা ফাঁকা থাকতো।আমি চেষ্টা করতাম সেখানে ঢুকে যাওয়ার।কিন্তু এই সবটাই তো আমার ভুল ধারনা।নির্ভয় তো প্রিয়ু কে সত্যিই ভালোবাসে।প্রিয়ুও ওকেই ভালোবাসে।তাহলে আমি এই গল্পের কোথায় বলোতো?"

"তো তোমায় কি কেউ বলেছে যে এই গল্পে তুমি আছো?নায়ক হিসেবে থাকার তো কোন সম্ভাবনাই নেই তবে হ্যাঁ যদি তুমি চাও ভিলেন হিসেবে যোগ দিতে পারো।কি বলো সিন রেডি করব?"

"না ভায়া থাক।সে আমার ভাবনায় আমার শান্তির কারণ।আর আমি কিনা তার অশান্তির কারণ হব?তাহলে ভালো আর বাসলাম কই?"

_____________

গত তিনদিন ধরে সৌমি খেয়াল করছে প্রভা সব সময় আনমনে থাকে।কোন কাজকর্মে মনোযোগ নেই।কিছু একটা করতে বললে তার উল্টোটা করে আসছে,জায়গার জিনিস জায়গায় রাখছেনা,রান্নাবান্নায় মনোযোগ নেই,পড়াশোনা তো দূরেই থাকলো।বই সামনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।পড়ুয়া মেয়েটার হঠাৎ এমন অধঃপতনের কারণ সৌমি ধরতে পারছে না।এই যে এখনো পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।অথচ সামনে মেয়েটার পরীক্ষা।অন্যান্য সময় হলে প্রভা কে এখন বইয়ের সামনে থেকে কেউ তুলতে পারত না অথচ এখন কিনা সেই মেয়েটা পড়তেই বসছে না।আজ এই সমস্যার কারণটা জানতেই হবে।সৌমি বিছানার উপর প্রভার পাশে গিয়ে বসে গম্ভীর গলায় ওকে প্রশ্ন করল,

"তোর সমস্যা কি রে?মন কোথায় থাকে তোর আজকাল?"

সৌমির প্রশ্নটা বোধহয় প্রভার কান অব্দি পৌঁছালো না।সৌমি এবার আরো অবাক হলো।মেয়েটার কি মানসিক সমস্যা হলো?হতেও পারে।আজকাল তো মাঝে মাঝে আনমনে থাকতে থাকতে হুটহাট হেসে ওঠে।মাঝে মাঝে আবার মুচকি হাসেও।কিন্তু মানসিক অসুস্থতা তো সৌমির আছে।তবে কি ওর সাথে থাকতে থাকতে প্রভারও হয়ে গেল?কিন্তু সৌমি যতদূর জানে এটা তো ছোঁয়াচে রোগ নয়।সৌমি জোরে জোরে প্রভা কে ঝাঁকালো।এবারে আর প্রভার সম্বিৎ না ফিরে যাবে কোথায়।ধড়ফড় করে উঠে বসে আতঙ্কিত কন্ঠে সৌমিকে বলল,

"কি হয়েছে?ঠিক আছিস তুই?"

"তোর যে অবস্থা দেখছি আমি মরলেও তো টের পাবি না।সমস্যা কিরে তোর খুলে বল তো আমায়?"

প্রভা হালকা তুতলিয়ে বলল,

"আমার আবার কি সমস্যা হবে?"

"আমারও তো সেই একই প্রশ্ন।মানসিক সমস্যা তো আমার আছে তোর তাহলে হল টা কি?সারাদিন মনটা থাকে কোথায়?আর আকাশে কি এমন আছে যে সারাদিন ও দিকে তাকিয়ে থাকিস?"

"জানিনা।আজকাল কেন জানি ভালো লাগেনা রে সৌমি।"

কথাটা বলার সময় প্রভার কন্ঠটা বেশ কাতর শোনালো।সৌমি পুনরায় ওকে প্রশ্ন করল,

"ভালো লাগে না কেন?কি হয়েছে?"

প্রভা কিছুটা চিন্তিত কণ্ঠে বলল,

"জানিস সৌমি,আজ তিনদিন হলো নির্ভীকের কোন খোঁজ জানি না।মানুষটা যে কোথায় গেল কিচ্ছু জানিনা?আদোও ঠিক আছে কিনা সেটাও বলতে পারছি না।চিন্তা হচ্ছে আমার ওনাকে নিয়ে।উনি আবার ফিরবে তো আমার কাছে?"

সব ঠিক ছিল কিন্তু প্রভার বলা শেষের কথাটাই সৌম্যির সন্দেহ।সন্দেহি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

"তোর কাছে ফিরবে মানে?তোদের মধ্যে কি চলছে বল তো আমায়?"

এদিকে নিজের কথায় নিজের ফেঁসে যাওয়ার জন্য প্রভা নিজের উপরে বেজায় বিরক্ত হলো।একটু তো ভেবে চিন্তে কথাটা বলা উচিত ছিল তাই না?এদিকে প্রভাকে চুপ করে থাকতে দেখে সৌমি তাড়া দিয়ে বলল,

"কি হলো বল?"

"আরে ওটা তো এমনি কথার কথা বললাম।বলতে চেয়েছিলাম যে আমার সাথে আবার দেখা হবে কিনা।"

"একদম কথা ঘোড়ানোর চেষ্টা করবি না প্রভা?তোকে আমি খুব ভালো করে চিনি তুই এমনি এমনি কথাটা বলার মেয়ে না।তোরা দুজন প্রেম করছিস তাই না?আমাকে বলতে তোর কি সমস্যা?"

সৌমিকে বলতে প্রভার সমস্যা নেই কিন্তু কথা হলো সৌমি কথাটা জেনে গেলে সব সময় কথায় কথায় এই একটা প্রসঙ্গ এনে খোঁচাবে।সেই জন্য আপাতত বলতে চাইছে না।আর তাছাড়া ওর আর নির্ভীকের মাঝে তো এখনো সবটা ঠিক ঠাক হয়নি।নির্ভীক তো এখনো ওকে নিজের মনের কথাটা বলেনি।যদিও প্রভা আকারে ইঙ্গিতে অনেক কিছুই বলে ফেলে কিন্তু নির্ভীক কখনো তেমনটা করে না।মানুষটা শুধু শুনেই যায় কিন্তু কিছু বলে না।সেখানে এখনই সৌমিকে কি বলবে যে একে অপরকে ভালোবাসে?কিন্তু আদৌও এই কথাটার সত্যতা কতটুকু সেটাতো প্রভার নিজেরই জানা নেই। ভালোবাসাটা এক পাক্ষিক এটা বলতেও প্রভার বেশ কষ্ট হবে।এদিকে সৌমি প্রভাকে এমন ভাবে ধরলো যে না বলে আর কোন উপায় নেই।অবশেষে হার মেনে প্রভা কে বলতেই হলো।

"হ্যাঁ আমি ওনাকে ভালোবাসি।কিন্তু উনি আমাকে ভালোবেসে কিনা সেটা জানিনা।"

প্রভার কথা শুনে সৌমি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,।

"কি বলছিস কি প্রভা!তার মানে নির্ভীক ভাইয়া আমার দুলাভাই?ওয়াও!জানিস আমি ভাবতেই পারছি না নির্ভীক ভাইয়া আমার দুলাভাই হবে।তোদের দুজনকে একসাথে দারুন মানাবে রে।এই তোরা কবে বিয়ে করবি রে?কখনো নিজের কারো বিয়েতে আনন্দ করতে পারিনি।আরে নিজের কেন কখনো কারো বিয়েতেই যাওয়া হয়নি।তোরা তাড়াতাড়ি বিয়েটা করনা।"

সৌমির কথাবার্তা শুনে প্রভা বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"পা/গল হলি?তোকে তো বললামই যে আমি ওনাকে ভালোবাসি উনি আমায় ভালোবাসে কিনা সেটা আমি জানি না।"

সৌমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

"আরে ভালো না বেসে যাবে কোথায়?ভালো না বাসলে জোর করে ভালোবাসাবো।তোর কখনো মনে হয়নি যে উনি তোকে ভালোবাসেন?"

"মাঝে মাঝে মনে হয়েছে আবার মাঝে মাঝে মনে হয় যে না ওনার আচরণ স্বাভাবিক।মানুষটা খুব রহস্যময়, জটিল।ওনাকে বুঝতে পারা খুব কঠিন বিষয়।কিন্তু জানিস আমি মাঝে মাঝে ওনাকে আমার মনের কথা জানানোর চেষ্টা করেছি।তখন উনি কোন রকমের কোন প্রতিক্রিয়া দেখাননি।যদি ওনার মনে কিছু না থেকে থাকতে তাহলে তো সরাসরি ইগনোর করতে পারতেন কিংবা আমায় না করে দিতে পারতেন কিন্তু তেমনটা কখনো করেননি।এর জন্য মাঝে মাঝে মনে হয় যে না ওনার মনে কিছু আছে আমার জন্য।"

"তাহলে তো হয়েই গেল।উনি তোকে ভালোবাসে।কিন্তু এসব হলো কি করে?মানে তুই কখন,কি করে,কেন ভালোবাসলি?"

প্রভা স্মিত হাসলো।মানুষটার কথা মনে হলেই লজ্জায় নেতিয়ে যায় প্রভা আজকাল।কি করে বোঝাবে সৌমিকে যে ওই মানুষটাকে ভালো না বেসে থাকতে পারেনি।ভালো লাগাটা প্রথম দিন থেকেই কাজ করে, পরে ভালোবেসে ফেলেছে।এদিকে প্রভা কে চুপ করে থাকতে দেখে সৌমি পুনরায় ওকে তাড়া দিয়ে প্রশ্ন করল,

"কিরে বল কি করে হলে এসব?"

প্রভা লজ্জা রাঙানো মুখটা ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে বলল,

❝সেকি বলা যায়.. কবে কোথায়,

ভালো লাগার শুরু বুকে দুরু দুরু,

তখন ভালবেসেছি!❞

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প