রাস্তা দিয়ে হাঁটছে উৎসব আর প্রভা।প্রভা গাড়িতে উঠতে চায়নি।রাস্তাটা বেশ অন্ধকার।বোধহয় লোডশেডিং চলছে,তার মাঝে চাঁদের আলোও তেমন একটা নেই।দুটো মানব পাশাপাশি হাঁটছে এটা বোঝা গেলেও একে অপরের মুখ পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে না।কাশফিয়া দের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে উৎসব একটা কথাও বলেনি।প্রভাও ওকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি তবে ভাবনা চিন্তা করে এসেছে যে উৎসবকে কিছু একটা বলবে।যখন বুঝতে পারলো যে উৎসব আজকে আর মুখ খুলবে না তখন প্রভা নিজ থেকেই বলে উঠলো,
"কাশফিয়ার কথায় বেশি কষ্ট পেয়েছেন?"
"না।আমাকে দেখে আপনার মনে হয় যে আমার কষ্ট হতে পারে?"
"মানুষ যখন কষ্ট হবে এটাই স্বাভাবিক।আমি শুধু জানতে চাইছিলাম যে কষ্টটা বেশি হচ্ছে না কম।"
"হচ্ছে না।"
"ও ছোট,না বুঝে কথাগুলো বলে ফেলেছে ওর কথা মনে রাখবেন না।"
উৎসব তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
"বাহ্ মাস্টান্নি,আপনিও ওর হয়ে কথা বলছেন?ও জেনেশুনে অন্যায় করার পরেও শুধু ছোট জন্য ক্ষমা পেয়ে যাবে?আর আমি না জেনে শুনে যে অন্যায়গুলো করেছি আবার কিছু কিছু অন্যায় যেগুলো করিও নি সেগুলোর ক্ষমা তো আমি পাই না।আমার বেলায় এই উল্টো নিয়ম কেন?"
"আমি কি একবারও বলেছি যে কাশফিয়ার কোন দোষ নেই?আমি শুধু আপনাকে বলেছি ও ছোট মানুষ ভুল করে ফেলেছে ক্ষমা করে দিতে।"
"কেন ক্ষমা করবো?আমি কি ভালো মানুষ যে আমি ক্ষমা করবো?ভালো মানুষেরা ক্ষমা করে।আমি তো এক নাম্বারের একটা হারামি।আমি কেন ক্ষমা করতে যাব?"
"ক্ষমা করলে শান্তিটা আপনি পাবেন।যতক্ষণ না ক্ষমা করবেন ততক্ষণ ঐ কথাগুলোই মাথায় ঘুরতে থাকবে।একবার ক্ষমা করে দিয়ে দেখুন মনটা হালকা হবে।"
"ধুর মাস্টান্নি,রাখুন তো আপনার এসব নীতি বাক্য।আপনি কি ভাবেন আপনার এসব নীতিবাক্য দিয়ে পৃথিবী চলে?আপনার এসব নীতিবাক্য নিজের কাছেই রাখুন।সবাই যদি আপনার নীতি বাক্য গুলোর মর্মার্থ বুঝতো না তাহলে আজ আপনি একা থাকতেন না। আমি একটু মা বাবার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতাম না।বা/লের নীতিবাক্য?"
"একটা চ/ড় লাগাবো।এসব কোন ধরনের মুখের ভাষা?একটা মেয়ের সাথে অন্তত কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা জানেন না আপনি?আপনার ভাগ্য ভালো যে আরও কয়েকটা বছর আগে আপনার সাথে আমার দেখা হয়নি,না হলে আপনার এই কথাগুলোর জন্য রোজ একটা করে চড় খেতেন আমার হাতে।বেয়াদব কোথাকার।এই আপনি বাড়ি যান তো।আমাকে রেখে আসতে হবে না।আমার ধারে কাছেও যদি আপনাকে দেখেছি না খবর আছে তাহলে।আপনার কোন বন্ধু আপনাকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে আসে আমি সেটাই দেখবো।"
কথাগুলো বলে প্রভা হনহন করে হেঁটে সামনে এগিয়ে গেল।এদিকে হুট করে প্রভার রেগে যাওয়াতে উৎসব দমে গেল।প্রভা এক্ষুনি কি বলে গেল?ওকে চ/ড় লাগাবে?এটাও সম্ভব?আজ অব্দি যে কথা উৎসব মির্জাকে কারও বলার সাহস হয়নি,আজ এই মেয়ে কিনা সরাসরি তাকে সেই হুমকি দিয়ে গেল এভাবে?আবার বলে কিনা রোজ রোজ একটা করে চড় দিত। কিন্তু কথা সেটা নয়।কথা হলো এই রাতের বেলা যে প্রভা একা একা হাঁটা দিল তার কি হবে?হুট করে যদি কোথায় থেকে ইশরাক এসে তুলে নিয়ে যায় তাহলে উৎসব প্রভাকে খুঁজে পাবে কোথায়?তার থেকেও বড় কথা আজ প্রভা যে রাগটা ওর উপর দেখালো তাতে মনে হয় না ভবিষ্যতে আর কোনদিন প্রভা ওর সাথে কথা বলবে বলে।কিন্তু আজকাল তো উৎসব মাস্টান্নির সাথে কথা না বলে থাকতে পারে না।উৎসব আগে পিছে কোন কিছু না ভেবেই মাস্টান্নি বলে জোরে একটা ডাক দিয়ে দৌড় লাগালো।প্রভার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই প্রভা পুনরায় তাকে শাসিয়ে বলল,
"নিষেধ করেছি না আমার সামনে আসতে?একদম আমার পিছু নেবেন না।চিৎকার করে লোক জড়ো করে বলবো যে আপনি আমায় কিডন্যাপ করার চেষ্টা করছেন।"
"মাস্টান্নি রাগ করছেন কেন?আচ্ছা ভুল হয়ে গেছে ক্ষমা চাইছি আর কখনো হবে না এমন।"
"কোন দরকার নেই।আপনার যা মন চায় আপনি তাই করুন।আমি তো আপনাকে আমার কথা শুনতে বলিনি।"
"আহা!আবার রাগ করে কেন?বললাম তো ভুল হয়ে গেছে আর এসব কথা বলবো না।আচ্ছা নিন কাশফিয়াকেও ক্ষমা করে দিলাম।এবার তো রাগটা কমান।"
প্রভা আর কিছু বলল না।চুপচাপ হাঁটা দিল।ওর পাশে উৎসব হাঁটছে।কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের উপর সে নীরবতা ভেঙে উৎসব বলল,
"জানেন মাস্টান্নি,নির্ভীক ছাড়া আমার আর কেউ নেই।দেখুন আজ দুটো দিন হলো ওর কোন খোঁজ নেই,আর আমার মনে হচ্ছে আমার পুরো পৃথিবীটা ফাঁকা।আমি কখন কোথায় যাচ্ছি,কি খাচ্ছি না খাচ্ছি,শরীর কেমন আছে,আর কেউ এসবের খোঁজ খবর নিচ্ছে না।"
"কেন ঊষা আছে তো?"
"নিজের ভাইয়ের উপর অভিমান এতো বড় যে ও আর আমার সাথে কথা বলে না।জানেন মাঝে মাঝে নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগে।আমি বড় ভাই হয়ে আমার বোনকে ওর সুখটা এনে দিতে পারলাম না।কি করে দেবো বলুন বিপরীত পাশের মানুষটাও যে আমার ভাই।"
প্রভা মৃদু হেসে বলল,
"জানেন উৎসব ভাইয়া,আপনি একজন খুব ভালো মানুষ।শুধু কিছু ছোট ছোট জিনিস আপনার শোধরানো দরকার।"
"আমাকে শোধরানোর মতন কেউ কখনো ছিল না।সেজন্যই তো এখন আর আমি নিজেকে শোধরাতে চাইও না।আমি যেমন তেমনভাবে যে আমাকে ভালোবাসলো তো বাসলে,আর যে ভালোবাসলো না তাকে আমার জীবনে দরকার নেই।"
"আপনার মা বাবার থেকে দূরত্বটা কি আগে থেকেই?"
"হ্যাঁ।আমার মা কখনো নিজের স্বামী,সন্তান,সংসারকে ভালোবাসেনি।সে সারা জীবন নিজের ব্যবসা,নিজের ক্যারিয়ার এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে।এমনকি আমার বাবার ব্যবসাতেও জয়েন করেননি।সে নিজের আলাদা একটা ব্যবসা তৈরি করেছে।বাবা তাও টুকটাক একটু খোঁজখবর রাখতো কিন্তু দিনদিন মায়ের সাথে ঝগড়া-ঝামেলা করতে করতে আর আমাদের ওপর খেয়াল রাখা হয়ে ওঠেনি।আর এখন কেউ খেয়াল রাখে না।"
"আর আন্টির এমন খাম খেয়ালিপনার কারণ জানেন?"
"জানি আবার জানি না।আমার বাবার সাথে আমার মার সম্পর্ক খুব একটা ভালো না।আমার নানা ভাই নাকি ওদের বিয়েটা দিয়েছিলেন।আমি না বুঝি না এত বছর সংসার কি করে টিকে গেল?ডিভোর্স কেন নিলেন না ওনারা?আর আমি যতদূর জানি আমার মায়ের ব্যবসায় যিনি পার্টনার আছে তার সাথে মায়ের বহু বছর হলো ওই কিছুতো একটা সম্পর্ক আছে।এদিকে আমার বাবাও থেমে থাকে নি।আমি শুধু একটা বিষয় বুঝি না যখন দুজন দুজনকে ভালোইবাসেনা,আমাদের প্রতিও কোন খেয়াল নেই,তাহলে ডিভোর্স কেন নিল না?"
"থাক বাদ দিন এসব কথা।কেউ না থাকলেও আপনি একটা খুব ভালো বন্ধু পেয়েছেন।জীবনে যে সব কিছু ছাড়লেও আপনাকে কখনো ছাড়বে না।"
"একদম ঠিক বলেছেন মাস্টান্নি।কিন্তু আমার ভাইটা যে কোথায় চলে গেল?ও তো জানে যে আমি একটা দিনও ওকে ছাড়া থাকতে পারি না।সেখানে দুটো দিন চলে গেল।জানেন আমি সারাদিন কি কি করলাম এগুলো ওকে না বললে আমার হয় না।কত কথা বলার আছে ওকে,ওর থেকে কত বকা শোনার আছে।মনে হচ্ছে কতদিন হলো ওর সাথে আড্ডা দেই না।আমার ভাইটা কবে আসবে মাস্টান্নি?"
প্রভা কিভাবে উৎসবকে বোঝাবে যে ঐ মানুষটাকে ছাড়া প্রভারও পৃথিবীটা এখন শূন্য লাগে।প্রভা নিজেও তো নির্ভীকের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।কিন্তু সেই মানুষটার যে কোনো খোঁজই মিলছে না। কোথায় আছে,কি করছে,কেউ কিচ্ছু জানে না।আদৌ মানুষটা ঠিক আছে কিনা সে খবরটাও তাদের কাছে নেই।প্রভা খেয়াল করলো উৎসব দু হাতে নিজের চোখ মুচছে।বিষ্ময়ভরা কন্ঠে প্রশ্ন করল,
"আপনি কাঁদছেন?"
"কি করব?আমার শুধু আমার ভাইয়ের জন্যই কান্না আসে।ওকে ছাড়া আর ভালো লাগছে না।নিজের মনের কথাগুলো বলার মতন আমার ভাই ছাড়া আর কোন ভালো বন্ধু নেই। নির্ভয়,তিসান ভাই আছে কিন্তু ওরা তো আর নির্ভীক না।"
প্রভা আজ আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারলো যে নির্ভীককে ছাড়া উৎসব ঠিক কতটা অচল।উৎসব নির্ভীকের ওপর পুরোটা নির্ভরশীল।প্রতিবারই প্রভা এদের বন্ধুত্ব দেখে অবাক হয়ে যায়।মাঝে মাঝে মনে হয় এদের বন্ধুত্বের কাছে প্রভা আর সৌমির বন্ধুত্বও হার মেনে যাবে।বন্ধুত্ব যে এমন হয় সেটা প্রভার জানাই ছিল না।নতুন করে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা শিখছে এই দুটো মানুষের থেকে।
"আচ্ছা বেশ আমায় বলুন ওনাকে কি কি বলতেন।সেগুলো সব আমায় বলুন তাও মনটা হালকা করুন।"
উৎসব কিছুটা সময় নিষ্কলক দৃষ্টিতে প্রভার দিকে তাকিয়ে রইল।হয়তো ভাবছে প্রভাকে কি বলতে পারবে মনের কথাগুলো।নির্ভীককে যেমন নির্দ্বিধায় সবকিছু বলতে পরতো প্রভাকে কি সেভাবে পারবে?প্রভা কি নির্ভীকের মত ওমন মনোযোগী শ্রোতা হতে পারবে?উৎসবকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রভা পুনরায় বলল,
"ভাইয়া এত ভাবতে হবে না।আপনার বন্ধু যেমন আমার দায়িত্ব আপনাকে দিয়ে গেছে তেমনি আপনার দায়িত্বও আমি নিলাম।এই যে আপনি আমাকে রোজ বাড়ি পৌঁছে দেন এর বিনিময়ে আমি আপনার মনের কথাগুলো নাহয় শুনলাম।বলুন কি বলতে চান?"
উৎসব পকেটে দুহাত গুঁজে আনমনে হাসলো।মুখে সে হাসি বজাশ রেখেই বলল,
"আজকে আর কিছু বলার নেই।তবে হ্যাঁ কাশফিয়ার ব্যবহার অনেক কষ্ট পেয়েছি।আমি নোংরা না মাস্টান্নি।আমি হয়তো রাগের মাথায় অতিরিক্ত বলে ফেলেছি কিন্তু আমি নোংরা না।"
"হ্যাঁ রাগের মাথায় একটু অতিরিক্ত বলে ফেলেছেন।পারলে একবার ক্ষমা চেয়ে নেবেন।আপনি যদি আগে গিয়ে ক্ষমা চান তাহলে দেখবেন কাশফিয়া আরও বেশি অনুতপ্ত হবে নিজের অপরাধের জন্য।ওর মনে আপনাকে নিয়ে ধারনাটা পাল্টে যেতে পারে।"
প্রভার কথায় উৎসব আর দ্বিমত পোষণ করলো না।এদিকে গল্প করতে করতে কখন যে তারা প্রভার বাড়ির রাস্তায় চলে এসেছে সেটা কারো খেয়ালই হয়নি।উৎসবের থেকে বিদায় নিয়ে প্রভা চলে যেতে ধরলে উৎসব প্রভাকে পিছন থেকে একবার মাস্টান্নি বলে ডাকলো।প্রভা ফিরে তাকিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেলো কিছু বলবে কিনা।উৎসব অপরাধী কণ্ঠে বলল,
"ফুপির বাড়িতে কাশফিয়াকে ধমক দেওয়ার জন্য আপনিও ভয় পেয়েছিলেন তার জন্য দুঃখিত।আসলে আমি যদি আগে জানতাম যে আপনি ভয় পাবেন তাহলে ধমকটা দিতাম না।আর তখনও হাঁটার সময় আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি তার জন্যও দুঃখিত।কিন্তু কথা দিচ্ছি আর কখনো এমন হবে না।আপনি আমার ওপর রাগ করে থাকবেন না কেমন?"
"যে নিজের ভুলটা বুঝতে পারার পর সেটা স্বীকার করে নেয়,তারপরও যদি তার উপর কেউ রেগে থাকে তাহলে সেটা তার সাথে অন্যায় করা হয়।আপনি যে নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছেন এটাই অনেক।আমি একটুও রাগ করে নেই আপনার উপর।আর আজ থেকে আমরা বেস্ট ফ্রেন্ড।আর আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এর উপর রাগ করে থাকতেই পারি না।"
আরে টুকটাক দুএকটা কথা বলে উৎসবের থেকে বিদায় নিয়ে প্রভা চলে গেল।উৎসবও নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।এই রাস্তায় মনে হচ্ছে না এখন আর কোন গাড়ি পাবে বলে তাই সে মেইন রোডের দিকে গেল।পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালালো।মুহূর্তের মাঝে সিগারেটটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল।মস্তিষ্কের মাঝে কি সব আজেবাজে কথা যে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার মানে উৎসব নিজেও বুঝতে পারছে না।উৎসব নিজেই নিজেকে গালি দিল।সারাদিন মাথার ভিতর যতসব আজেবাজে চিন্তাভাবনা ঘোরে।এবার সে হাঁটতে হাঁটতে নিজের সুরেলা কন্ঠে গান ধরল,
❝আমি বা কে,আমার মনটা বা কে,
আজও পারলাম না আমার মনরে চিনিতে,
পাগল মন রে!
মন কেন এতো কথা বলে?
ও পাগল মন,মন রে!
মন কেন এত কথা বলে?❞