ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৩৯

🟢

দুদিন হলো নির্ভীকের কোন খোঁজ খবরই নেই।সেই যে গিয়েছিল তারপর থেকে আর কারো সাথে কোন যোগাযোগ হয়নি।নির্ভীকের খোঁজ পাওয়ার জন্য নিজের সাধ্য অনুযায়ী প্রভা চেষ্টা করেছে।এমনকি উৎসবকে নির্ভীকের বাড়ি অব্দি পাঠিয়েছিল কিন্তু কোন লাভ হয়নি।বাড়িতে শুধু নির্ভীকের সৎ মা ছিল তবে তিনি উৎসবকে কোন কিছুই বলেনি বরং মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।তবে উৎসব চিন্তায় নেই।নির্ভীক যেহেতু বলে গেছে যে যোগাযোগ হয় তো করতে পারবে না তার মানে নিশ্চয়ই ঝামেলা আছে।আর যেহেতু নির্ভীক উৎসবকে কথা দিয়ে গেছে যে ও খুব তাড়াতাড়ি আসবে তার মানে আসবেই।উৎসবের অগাধ বিশ্বাস নিজের ভাইয়ের ওপর।নির্ভীক যখন উৎসবকে কথা দিয়েছে তার মানে কথা রাখবেই।উৎসব তার কথা রেখেছে পুরোদমে।এই দুটো দিন এক মুহূর্তের জন্য প্রভাকে একলা ছাড়েনি।বরং প্রভার নিজেরই একটু অস্বস্তি হচ্ছিল একটা মানুষ নিজের কাজকর্ম ছেড়ে সারাদিন ওর পেছনে পড়ে থাকছে দেখে।ব্যাপারটা কেমন যেন একটা লাগছে প্রভার কাছে।উৎসবকে মানাও করেছিল কিন্তু শোনেনি।তার একটাই কথা নির্ভীক যখন ওকে দায়িত্ব দিয়ে গেছে তাহলে প্রাণপণে সে সেই দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করার চেষ্টা করবে।

প্রভা এসেছে কাশফিয়াকে পড়াতে।ওর সাথে সাথে অবশ্য উৎসবও এসেছে আর অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে অনেক দিন হলো ফুপির বাড়ি বেড়ানো হয় না সেজন্য ফুপি কে দেখতে এসেছে।এই যুক্তির প্রেক্ষিতে প্রভার আর কিছু বলার থাকে না,যেখানে বাড়িটা উৎসবের ফুপির সেখানে ও কিভাবে আটকাতে পারে।উৎসব সমানে কাশফিয়ার ঘরে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে।এদিকে উৎসবের উপস্থিতি কাশফিয়ার একটুও পছন্দ হচ্ছে না।কেন যেন কাশফিয়া উৎসবকে দুচোখে সহ্য করতে পারেনা।দেখলেই সারা গায়ে যেন আ/গুন জ্ব/লে যায়।এই ঘৃণার কারণ কাশফিয়ার জানা নেই।ভীষণ অবজ্ঞা করে সে উৎসবকে।আসলে কাশফিয়া শুধু উৎসবের বাহ্যিক দিকটা দেখে ওকে বিচার করেছে কিন্তু কখনো উৎসবকে ভিতর থেকে জানার চেষ্টা করেনি।কাশফিয়া শুধু লক্ষ্য করেছে উৎসবের নিজের বাবা-মায়ের সাথে রুক্ষ আচরণ কিন্তু সে রুক্ষ আচরণের কারণটা সে কখনো অনুসন্ধান করতে চায়নি।সে উৎসবের বেপরোয়া,ছন্নছাড়া জীবন দেখেছে কিন্তু উৎসব কেন বেপরোয়া হলো সেটা কখনো জানতে চায়নি।না কাশফিয়া উৎসবকে বুঝতে পেরেছে না কখনো বুঝতে চেয়েছে। ফলস্বরুপ উৎসব কাশফিয়ার কাছে বড্ড অসহ্যকর একটা মানুষ।কাশফিয়াকে কিছু পড়া বুঝিয়ে দিয়ে প্রভা কাউকে একটা কল করতে বারান্দায় গেল।উৎসব রুমে এসে দেখল প্রভা কোথাও নেই।আতঙ্কিত কণ্ঠে কাশফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"কাশফুল,মাস্টান্নি কোথাও চলে গেল নাকি?"

আর উৎসব এর কাশফুল ডাক!উৎসব মানুষটাকে কাশফিয়ার কাছে যেমন নোংরা মনে হয় ঠিক তেমনি তার মুখ থেকে এই ডাকটা শুনতেও ভীষণ নোংরা লাগে।উৎসবকে কাশফিয়া বরাবরই খারাপ ছেলে হিসেবে চেনে।মনে হয় হয়তো ওর দিকেও খারাপ দৃষ্টিতে তাকায়।ঝাঁঝালো গলায় বলল,

"আপনাকে নিষেধ করেছি না আমি আমায় কাশফুল বলে ডাকতে?কথা মাথায় যায় না আপনার?খবরদার আপনার নোংরা মুখে আমাকে এসব উদ্ভট নামে ডাকবেন না।আমি আপনাকে সেই অধিকার দেইনি যে আপনি আমাকে অন্য কোন নামে ডাকবেন।ডাকার হলে কাশফিয়া বলে ডাকবেন নয়তো ডাকার দরকার নেই।বুঝতে পেরেছেন?"

কাশফিয়া এর আগেও বরাবরই এমন স্বরে উৎসবের সাথে কথা বলে এসেছে কিন্তু আজকে কাশফিয়ার মুখ থেকে নোংরা শব্দটা কেন যেন উৎসবের ভীষণ আত্মসম্মানে লাগলো।দু ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"তুমি কোন ভিত্তিতে আমায় নোংরা বললে?"

কাশফিয়া কাট কাট গলায় জবাবে বলল,

"আপনি নোংরা তাই আপনাকে নোংরা বললাম।যার কোন কাজ নেই,সারাদিন শুধু টই টই করে ঘুরে বেড়ানো,মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করা,বাবা-মায়ের সাথে অভদ্র আচরণ করা।তাকে নোংরা বলবো না তো কি বলবো?"

উৎসব খুব কষ্টে নিজের রাগ সংবরণ করে বলল,

"ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট।আমার জীবন আমি যেভাবে ইচ্ছে আমি সেভাবেই কাটাবো।তুমি কিছু জানো না আমার সম্বন্ধে তাই আন্দাজে আমার উপর কোন অপবাদ দেবে না।"

"যা সত্যি তাই বলেছি।আপনি কি অস্বীকার করতে পারবেন যে আপনি নিজের বাবা-মায়ের সাথে অমানুষের মতন আচরণ করেন?আপনি কি অস্বীকার করতে পারবেন যে আপনি আমায় নোংরা দৃষ্টিতে দেখেন?"

এদিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে এমন চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে প্রভা তাড়াহুড়ো করে রুমের ভেতরে এলো।কাশফিয়া আর উৎসবকে ঝগড়া করতে দেখে প্রভা তব্দা খেলো।দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"কি হয়েছে তোমরা এমন ঝগড়া করছো কেন?"

উৎসব তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বলল,

"আমি নাকি নোংরা মাস্টান্নি,সেটাই কাশফুল আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।আমার দৃষ্টি নাকি নোংরা।ও আমায় সে সবই বলছে।"

কাশফিয়া কথাগুলো বলেছে শুনে প্রভা ভীষণ অবাক হলো।মেয়েটা তো বরাবরই ভদ্র,শান্ত শিষ্ট তবে উৎসবকে এসব বলার কারণ কি?

"এসব কেমন কথা কাশফিয়া?তুমি তোমার ভাইকে চেনো না?নিজের বড় ভাই সম্বন্ধে এসব কথা বলতে নেই।"

"কে আমার বড় ভাই ম্যাম?আমি ওনাকে মানি না আমার ভাই হিসেবে।ভাই হওয়ার যোগ্যতা সবার থাকে না।"

কাশফিয়ার কথার প্রেক্ষিতে উৎসব বলল,

"উৎসব মির্জার বোন হওয়ার যোগ্যতাও সবার থাকে না।অনেক কথা বলে ফেলেছো আজ।আর এমন কিছু বলো না যাতে আমি ফুপিকে জানাতে বাধ্য হই।"

"পারেন তো ঐ একটা জিনিসই।নিজের মা-বাবাকে তো ভালোবাসতে পারেনি,জানি না কি করে আমার মায়ের মাথাটা খেলেন।নিজের মেয়ে রেখে সারাদিন আপনার নাম জপে।আমার মায়ের মাথাটা খেয়ে তো আমাকে বিয়ে করার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন।কিন্তু ভুলেও ভাববেন না যে আমি আপনাকে বিয়ে করবো।আপনাকে বিয়ে করার থেকে রাস্তার কোন চরিত্রবান ভিখিরিকে বিয়ে করবো।তাও আপনাকে বিয়ে করব না।"

"জাস্ট শাট আপ ইডিয়েট।এতদিন একটু মশকরা করেছি জন্য উৎসব মির্জাকে খুব হালকা ভাবে নিয়ে নিয়েছো মনে হচ্ছে।একটু কাশফুল বলে ডাকি জন্য,বউ বউ করি জন্য কি ভেবেছো তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা উতলে পড়ছে?তোমাকে বউ বানানোর জন্য কি আমি এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছি নাকি?তোমাকে না পেলে আমার কোনো বা/লও হবে না?"

উৎসব বেশ জোরেশোরে ধমক দিয়েই কাশফিয়াকে কথাগুলো বলল।ধমকের তোপে প্রভা আর কাশফিয়া দুজনেই কেঁপে উঠল।প্রভা বুঝতে পারছে না কাকে সামলাবে।ওদের দুজনের মধ্যে কথা বলতে একটু ইতস্ততও হচ্ছে।এদিকে উৎসবের ধমকে কাশফিয়া একটু ভয় পেলও দমলো না।নতুন উদ্যমে বলল,

"যদি এমনটা নাই হয়ে থাকে তাহলে সারাদিন এত বউ বানানোর জন্য লাফান কেন?"

কাশফিয়ার কথা শুনে উৎসব শব্দ করে হেসে উঠলো।এই হাসিটা ছিল কাশফিয়াকে বিদ্রুপ করে।হাসতে হাসতে হুট করে আবার তার চোখ মুখে কাঠিন ভাব ফুটিয়ে তুললো।রাগের কারণে তার চোখ দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।গম্ভীর কণ্ঠে পুনরায় কাশফিয়াকে বলল,

"লিসেন কাশফিয়া,তোমার যোগ্যতা নেই যে তুমি উৎসব মির্জার স্ত্রী হতে পারো।আমার ফুপি অসুস্থ।আমার মা-বাবার অবর্তমানে আমার ফুপি আমায় বড় করে তুলেছে।সেই ফুপির কোন আবদার আমি আজ অব্দি ফেলিনি কিন্তু এই প্রথম তাকে আমি কোন একটা বিষয়ে সরাসরি না করে দিয়েছিলাম।কিন্তু তবুও সে বারবার একই আবদার করতো জন্য আমি আর তাকে কষ্ট দিতে পারিনি বলে কিছু বলতাম না।কিন্তু তার মানে এই নয় তোমার মতন একটা বেয়াদব মেয়েকে আমি বিয়ে করবো।জাস্ট লুক অ্যাট ইওরসেলফ,কি মনে করো নিজেকে তুমি?কোনো বিশ্বসুন্দরী,না কোন রাজার মেয়ে?তোমার মাঝে কি এমন বিশেষ গুন আছে যে তোমার ভালোবাসায় আমি পিছলে পড়বো?আর কি সেই তখন থেকে সমানে একই কথা বলে যাচ্ছো যে আমি আমার বাবা মাকে সম্মান দেইনা?এই মেয়ে তুমি আমার বাবা-মায়ের সম্বন্ধে কিছু জানো?তোমার বাপ মরার আগে তোমাকে যথেষ্ট ভালোবাসা দিয়েছিল,তোমার মা বেঁচে আছে,তোমার মাও তোমাকে ভালোবাসে।সেই জন্য তোমার মনে হয় যে পৃথিবীর সবার বাবা মাই তার সন্তানকে ভালোবাসে।কিন্তু এমনটা না।আমার বাবা-মার মত কিছু স্বার্থপর বাবা-মাও পৃথিবীতে আছে যারা সন্তানদেরকে ভালোবাসে না।"

বিজ্ঞাপন

প্রভা বুঝলো ব্যাপারটা গুরুতর আকার ধারণ করছে।তাই উৎসবকে থামানোর উদ্দেশ্যে বলল,

"আচ্ছা ভাইয়া থামুন ছোট মানুষ বুঝতে পারেনি।"

"না মাস্টান্নি,ছোট মানুষ ভেবে এতদিন ওর অপরাধ গুলো ক্ষমা করে এসেছি।আজ ও প্রথম এই কথাগুলো বলছে না।এর আগেও এই কথাগুলো আমায় বলেছে কিন্তু আজকে ও নিজের লিমিট ক্রস করে গেছে।ওর সাহস হয় কি করে আমার চরিত্রের উপর আঙুল তোলার?আর এই মেয়ে,কান খুলে একটা কথা শুনে রাখো যদি আমি তোমায় বিয়ে করতাম সেটা তোমার চৌদ্দগুষ্টি কেন চব্বিশ গুষ্টির কপাল ভালো ছিল।একবার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখো উৎসব মির্জার স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা তোমার আদৌ আছে কিনা,তারপর আমার সামনে এই কথাগুলো বলতে এসো।যদি আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই সেক্ষেত্রে চাঁদ হয়ে বামন কে ছোঁয়ার কথা আসবে আর যদি তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও তাহলে বামন হয়ে চাঁদকে ছোঁয়ার কথা আসবে।জাস্ট লুক অ্যাট ইওরসেলফ,ইউ হ্যাভ নাথিং অ্যাকসেপ্ট ইউর স্টুপিডিটি।বুঝতে পেরেছো?"

প্রভা পুনরায় উৎসবকে থামতে বলল কিন্তু তারপরেও উৎসব থামলো না।সে যেন আজ পণ করেছে নিজের অপমানের যোগ্য জবাব সে দেবেই।কাশফিয়াকে চুপ করে থাকতে দেখে ওর দিকে দু কদম এগিয়ে গিয়ে বলল,

"এখন মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হচ্ছে না কেন?নিজের ভুলটা চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছি জন্য?তুমি শুধুমাত্র আমার ফুপির মেয়ে জন্য এত দিন যাবৎ ভালো ব্যবহার করে এসেছি।আমাকে যে নোংরা বলছিলে,নিজে তো একটা চূড়ান্ত বেয়াদব আর অসভ্য হয়েছো সেটা জানো?কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেই জ্ঞানই তো তোমার হয়নি।তোমার এই ব্যবহার দেখলে যে কেউ এক লাইনে তোমার বর্ণনা দেবে যে তুমি একটা বেয়াদব মেয়ে।আমি না হয় বড়দের সম্মান দিতে পারি না তুমি মনে হয় খুব দিতে পারো?এই যে বারবার তুমি আমায় অপমান করছো না বিলিভ মি তোমার এই যোগ্যতাটুকুও নেই যে তুমি উৎসব মির্জা কে যাজ করতে পারো।আর বাকি রইল বিয়ের কথা।যদি তোমায় আগে বিয়ে করতাম তাহলে দয়া করে করতাম কিন্তু এখন আর তোমার উপর সেই দয়াটাও করবো না।উৎসব মির্জার পাশে আর যাকেই মানাক না কেন তোমার মতন একটা স্টুপিড,ইডিয়েট,ম্যানারলেস মেয়েকে মানায় না।যার না আছে কোন রূপ,না আছে কোন গুণ,না তার মাঝে আছে কোন ভদ্রতা,না আছে কোন সভ্যতা।যে আজ থেকে আমার দৃষ্টিতে মানুষ হিসেবেই গণ্য হবে না।"

কথাগুলো বলে উৎসব রুম থেকে বেরিয়ে গেল।এতক্ষণ অনেক বকর বকর করলেও এবার আর কাশফিয়া মুখ খুলতে পারছে না।কেউ যখন নিজের কমতি গুলো চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেয় তখন যে ঠিক কেমন অনুভূতি হয় সেটা কাশফিয়া এখন ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছে।এতদিন যাবৎ সে সব সময় উৎসবকে ছোট করেছে,ওকে বেয়াদব বলেছে,ওর কমতি গুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে অথচ আজ উৎসব খুব ভালোভাবে ওকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল উৎসব মির্জার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা ওর নেই।মেঝের দিকে দৃষ্টিপাত করে কাশফিয়া নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।প্রভা এগিয়ে এসে কাশফিয়ার কাঁধে হাত রাখল।কাশফিয়ার জন্য খারাপ লাগছে ওর কিন্তু কাশফিয়া যেটা করেছে সেটাও তো ঠিক করেনি।এদিকে উৎসবও রাগের মাথায় একটু অতিরিক্তই হয়তো বলে ফেলেছে।এত দিনের জমানো রাগ একদিনে বের করতে গিয়ে একটু বেশিই বলে ফেলেছে হয়তো।

"উৎসব ভাইয়া বয়সে তোমার থেকে বড়।তার সম্বন্ধে না জেনে এই কথাগুলো তোমার বলা উচিত হয়নি কাশফিয়া।"

কাশফিন নাক টানতে টানতে বলল,

"আপনি জানেন না ম্যাম উনি খুব অসভ্য।মামা মামির সাথে খুব খারাপ আচরণ করেন উনি।"

"দেখো আমি জানি বাবা-মা যেমনই হোক তাদের সাথে খারাপ আচরণ করাটা উচিত না।কিন্তু দিন শেষে তো আমরা মানুষ।আমাদেরও একটা সহ্যের সীমা আছে।তোমার মামা মামি উৎসব ভাইয়ার সাথে কেমন আচরণ করে তুমি তো সে সবকিছু জানো না।"

"জানি।ছোটবেলা থেকে মামা-মামি দুজনে ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকতো সেজন্য ওনাকে সময় দিতে পারেনি কিন্তু আমার মা তো সময় দিয়েছে।আমার অংশের সময়টুকুও ওনাকে দিয়েছে।"

"তোমায় তোমার মা-বাবার বদলে যদি তোমার ফুপি সময় দিতো তাহলে তোমার চলতো?চাকরি অনেকেই করে,ব্যবসা অনেকেই করে কিন্তু তার মানে তো এটা নয় যে তারা নিজেদের সন্তানদেরকে দেওয়ার মতন একটু সময় পাবে না তাই না?তুমি তো আমার সাথে গল্প করতে তোমার বাবা বেঁচে থাকাকালীন সময় কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে তুমি সারাদিন কি কি করেছো তাকে এসব গল্প বলতে,শুক্রবারে ঘুরতে যেতে তার সাথে, তোমার বাবা তোমায় খাইয়ে দিতো,স্কুলে রেখে আসতো।উৎসব ভাইয়ারও তো এসব ইচ্ছে করত তাই না?কিন্তু উনি তো সেসব পাননি।"

কাশফিয়া এবার একটু দমলো।প্রভা ওর মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

"তুমি অনেক ছোট।ওনার জীবনের কষ্ট বোঝার মতন বয়সও হয়তো তোমার এখনো ঠিকঠাক হয়নি।তুমি বাবা-মার থেকে ভালোবাসা পেয়েছো সেজন্য বাবা-মার ভালোবাসা না পেলে ঠিক কেমন অনুভূতি হয় সেটা তুমি বুঝবে না।উৎসব ভাইয়ার কথা বাদ দাও তুমি একবার আমার দিকে তাকিয়ে দেখো।আমার মা আমার জন্মের সময় মা/রা গেছে আর আমি জানি আমার বাবা ইচ্ছাকৃতভাবে আমায় হাসপাতালে ফেলে রেখে গেছেন।এসব জানার পরেও কি আমি আমার বাবাকে ভালোবাসতে পারব?আমার মায়ের প্রতি আমার একটাই অভিযোগ কেন আমাকে জন্ম দিতে গেল?আর আমার বাবার প্রতি আমার অভিযোগের শেষ নেই।তিনি চাইলেই আমায় একটা স্বাভাবিক জীবন দিতে পারতেন কিন্তু দেননি।"

কাশফিয়া ছলছল দৃষ্টিতে প্রভার দিকে তাকিয়ে বলল,

"কিন্তু মামা মামি তো আর ওনাকে একা ফেলে রেখে চলে যান নি।"

"কখনো কিন্তু সঙ্গও দেননি।তোমার বাবা-মার সাথে মন খুলে কথা বলতে ইচ্ছে করছে কিন্তু তুমি যখন তাদের কাছে গেলে তখন দেখলে তারা ব্যস্ত।তাদের কাছে তোমার জন্য কোন সময় নেই।তোমার একটু তোমার মায়ের হাতে রান্না খেতে ইচ্ছে করলো কিন্তু তোমার মায়ের হাতে সেটারও সময় নেই।স্কুলের মিটিংয়ে তোমার বাবা-মাকে ডাকা হলো কিন্তু সেখানেও তাদের যাওয়ার জন্য সময় নেই।তুমি তোমার আশপাশে দেখছো সব ছেলেমেয়ে তাদের বাবা-মার সাথে এসেছে কিন্তু শুধুমাত্র তোমার বাবা-মায়েরই সময় নেই তখন তোমার কেমন লাগবে?খাবার খেতে বসার সময় তোমার বাবা মা নেই তোমার পাশে।এক বেলা একটু আদর করে তারা তোমায় খাইয়ে দেয়নি।একজন সন্তানের পক্ষে এসব কিছু সহ্য করা খুব কঠিন কাশফিয়া।"

"আচ্ছা এসব নাহয় ঠিক আছে।কিন্তু এই যে উনি সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ান এসব কি ভালো স্বভাব?আমি দেখেছি উনি অনেক মেয়ের সাথে কথাও বলেন।"

"দেখো ঘুরে বেড়ানো এটা কোন অন্যায় না।তুমি যখন তোমার নিজের বাড়িতে নিজের শান্তি খুঁজে পাবে না তখন তুমি বাইরে নিজের শান্তি খোঁজার চেষ্টা করবে।আর উনি নিজের বন্ধুদের সাথে সেই শান্তিটুকু পান।এই শান্তিটুকু অনুভব করারও কি তার অধিকার নেই?"

"সেটা বলিনি তো আমি।"

"তাহলে বলব তুমি নিজেও জানো না তুমি কি বলতে চাইছো।ওই যে বললাম ওনার জীবনে ভালোবাসার খুব অভাব।একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর আমাদের সবারই বিপরীত লিঙ্গের একজন মানুষের থেকে ভালোবাসা পাওয়ার আগ্রহ বাড়ে।উনি একজন জীবনসঙ্গী খুঁজছিলেন যে ওনাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসবে,যার সাথে উনি নিজস্ব দুঃখ সব কিছু ভাগ করে নিতে পারবেন।হ্যাঁ ওনার হয়তো খোঁজার পদ্ধতিটা ভুল ছিল।তার কারণ ওনাকে ভুল ঠিক শেখানোর মতন কেউ ছিল না।কোন রাস্তাটা ওনার জন্য ভুল আর কোন রাস্তাটা ওনার জন্য ঠিক এইটা ওনাকে দেখানোর মতন কেউ ছিল না।যে দায়িত্বটা বাবা মাকে পালন করতে হতো ওনার বাবা-মা সেই দায়িত্ব পালন করেনি।তাহলে ওনার দোষ দিচ্ছ কেন তুমি?"

কাশফিয়া মাথা নিচু করে ফেলল।উৎসব যেমন কাশফিয়াকে নিজের কমতিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল ঠিক তেমনি প্রভাও যেন আজকে কাশফিয়ার ভুলগুলো ওকে চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিচ্ছে।প্রভা পুনরায় বলল,

"এই যে তুমি ওনার নামে এত অভিযোগ করো কখনো ওনাকে শোধরানোর চেষ্টা করেছিলে?তুমি যখন বুঝতে পারছো যে এই জিনিসটা ভুল তাহলে কখনো কি ওনাকে গিয়ে একটু শান্ত কন্ঠে বুঝিয়ে বলেছিলে যে এই জিনিসটা করবেন না,এটা ভুল।বলোনি।সেজন্য উনি নিজেকে শোধরাতেও পারেননি।জানো তো আমি একদিন ওনাকে বুঝিয়ে বলেছিলাম।উনি তারপর থেকে নিজের এই ভুলটা শুধরে নিয়েছেন।আমি তো ওনার নিজের কেউ না তারপরও আমি শুধু একটা বার ওনাকে ওনার ভুলটা ধরিয়ে দিয়েছিলাম আর উনি নিজেকে শুধরে নিয়েছেন।তাহলে একবার ভেবে দেখো তো ওনার আপন মানুষগুলো যদি ওনাকে শোধরানোর চেষ্টা করেন তাহলে কি উনি শুধরে যেতেন না?"

কাশফিয়া এবার শব্দ করে কেঁদে উঠলো।সত্যি তো ও কখনোই চেষ্টা করেনি।ওর মা সব সময় চেষ্টা করেছে উৎসবকে ঠিক পথে আনার জন্য।সেজন্য উৎসবও তাকে ভীষণ ভালোবাসে।আর সেই জন্য তার চোখে উৎসব এতটা ভালো।উনি নিজ হাতে মানুষ করেছেন উৎসব কে,উনি জানেন ছেলেটার মধ্যে কি কি ভালো গুন আছে।কাশফিয়া অপরাধী কন্ঠে প্রভাকে বলল,

"আই এম সরি ম্যাম।আসলে আমার সামনে সবসময় ওনার খারাপ দিকগুলো এসেছে।আমি সেগুলো দেখে ওনাকে বিচার করেছি।আমি ভাবতেও পারিনি যে এমন কোনো ব্যাপারও আছে।"

প্রভা স্মিত হেসে বলল,

"উনি না মানুষটা খুব ভালো কাশফিয়া।ওনার ভেতরটা যন্ত্রণায় ভরা।উনি মানুষটা সব সময় হাসি খুশি থাকতে চান কিন্তু ওনার জীবনে হাসির কারণগুলো খুব অল্প।ওনার মনটা খুব পরিষ্কার।উনি যাকে ভালোবাসে তার জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিতে পারে।বলতে পারো ওনার থেকে আমি নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের সঙ্গা শিখেছি।যে নিজের বোনের আগে নিজের বন্ধুকে প্রাধান্য দেয়।ওনার থেকে ভালো মানুষ এই পৃথিবীতে আর আছে কিনা আমি জানিনা তবে ওনার মতন মানুষ এই পৃথিবীতে আর নেই।ওনাকে আজ খুব কষ্ট দিয়ে ফেললে তুমি।নিজের অজান্তে ওনার দূর্বল জায়গায় আঘাত করলে।মানুষটার জীবনে এমনিতেই কোন সুখ নেই।আরো দুঃখ বাড়িয়ে দেওয়া উচিত হলো না কাশফিয়া।"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প