"আই এম রিয়েলি সরি কাশফিয়া।সেদিন রাগের মাথায় আমি একটু বেশি বলে ফেলেছি।"
এই প্রথম কাশফিয়াকে কাশফুল বলে না ডেকে ওর নাম ধরে ডাকলো উৎসব।ডাকটা শুনতেই কাশফিয়ার কেন যেন একটু অন্যরকম লাগলো।হয়তোবা একটু বিরক্ত বোধও করল।অথচ এতদিন কাশফুল বলে ডাকার জন্য কাশফিয়া রেগে যেতো।তবে উৎসবের ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটা কাশফিয়াকে বেশ অবাক করেছে।কাশফিয়ার ধারণা ছিল উৎসব কখনোই নিজের ভুল স্বীকার করবে না ক্ষমা চাওয়া তো অনেক পরের কথা।তবে কাশফিয়া নিজেই ভেবেছিল যে উৎসবের কাছে ক্ষমা চাইবে।উৎসব তাকে অনেক কমই কথা শুনিয়েছে।এতগুলো দিন তো কিছু বলেনি।কাশফিয়ার করা অপমান গুলো মুখ বুঝে চুপচাপ সহ্য করে গেছে।সে দিক দিয়ে বলতে গেলে উৎসব ওকে কমই অপমান করেছে।কাশফিয়া নিজেও অপরাধী কণ্ঠে বলল,
"আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে না পারলে আপনি আমায় ক্ষমা করে দেবেন।আসলে আমি শুধু বাইরে থেকে দেখে আপনাকে বিচার করেছি।কখনো আপনার এইসব আচরণের কারণ জানতে চাইনি।আমি অন্যায় করেছি।কিন্তু এখন আপনার প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে।"
উৎসব স্মিত হেসে বলল,
"সত্যি কি বদলেছে নাকি কেউ তোমায় জোর করে বদলাতে বলেছে?"
কথাটা বলে উৎসব কাশফিয়ার পিছনে দাঁড়ানো প্রভার দিকে তাকালো।প্রভা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো।উৎসব কাশফিয়ার দিকে তাকাতেই জবাব দিল,
"ম্যাম আমাকে আমার ভুলটা ধরতে সাহায্য করেছেন।"
"আর তুমি ওনার কথা মেনে নিলে?"
"উনি তো আর মিথ্যে বলেননি।মানলে সমস্যা কি?"
"সমস্যাটা হলো আমার মাঝে ভালো কিছু দেখার পর আমার প্রতি তোমার দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলায়নি।মাস্টান্নি তোমায় বলেছে আর তুমি ওনার কথা বিশ্বাস করে নিয়েছো।উনি যদি তোমায় মিথ্যা বলে থাকেন তো?"
কাশফিয়া ভরকালো।পিছন থেকে প্রভা মৃদু রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
"অযথা ওকে কনফিউজড করছেন কেন?কাশফিয়া ওনার কথায় কান দিও না।আমি তোমাকে যা বলেছি সবটা সত্যি ছিল।"
কাশফিয়া কিছু বলতে নেবে তার আগেই পুনরায় উৎসব বলে উঠলো,
"মাস্টান্নি তোমায় একটু একটু মিথ্যা বলেছে।আমি মানুষটা অতটাও ভালো না যতটা উনি তোমায় বোঝাতে চেয়েছেন।আমি নিজের মধ্যে থাকা খুঁতগুলো কখনোই লুকোতে চাইনি বরং আমি সবার প্রথমে সেগুলোই মানুষকে দেখাতে চেয়েছি।তুমি আমার উশৃংখল জীবন যাপন দেখেছো,আমার বাবা মায়ের সাথে সম্পর্কের একটা দূরত্ব দেখেছো এগুলোর কোনটাই মিথ্যা নয়।তবে হ্যাঁ আমি চরিত্রহীন নই কাশফিয়া।"
কাশফিয়া যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে গেল।উৎসবের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে কথা বলতে পারল না। অবনত মস্তিষ্কে নিম্ন স্বরে বলল,
"আমি আসলে ওভাবে বলতে চাইনি।"
"যেভাবেই বলতে চাও না কেন কিন্তু তোমার কথার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়েছিল যে তুমি ভাবো আমি চরিত্রহীন।আসলে আমি জানতাম তুমি আমার উপর বিরক্ত।অপছন্দ করো সেটাও জানতাম।কিন্তু কখনো ভাবি নি যে তুমি আমাকে ঠিক এতটা ঘৃণা করো।ভাবতে পারিনি যে আমার কাশফুল ডাকটা তোমার কাছে এতটা নোংরা শোনায়।বাট বিলিভ মি তোমার প্রতি আমার দৃষ্টি কখনো নোংরা ছিল না।তোমার প্রতি কেন কারো প্রতি আমার দৃষ্টি কখনো নোংরা ছিল না।আমি তো তোমার সাথে শুধু মজা করেছি।তুমি বয়সে আমার থেকে অনেকটা ছোট।তোমাকে বিয়ে করার কথা আমি কখনো ভাবি নি।শুধু ফুপিকে কষ্ট দিতে পারব না জন্য চুপচাপ ওনার কথা শুনে গিয়েছি।"
কাশফিয়া কখনোই চায়নি উৎসবকে বিয়ে করতে।উৎসবের সাথে বিয়ের কথা উঠলে কাশফিয়া তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতো।তবে কেন যেন আজ উৎসবের মুখ থেকে এই কথা গুলো শুনে কাশফিয়ার ছোট্ট হৃদয়টা ভীষণ আঘাত পেল।হয়তো এই কারণে যে এতদিন অব্দি কাশফিয়া ভাবছিল উৎসব ওকে নিজের বউ বানাতে চায়।কিন্তু এখন যখন জানতে পারলো যে উৎসবের কখনোই ওকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ না তখন হয়তো একটু অপমানিত বোধ করল।কিংবা এমনটাও হতে পারে যে ঘৃণার আড়ালে মনের মাঝে অন্য কোন অনুভূতি জন্মেছিল।আসল কারণটা বোধ হয় খোদ কাশফিয়া নিজেও ঠিক করে জানে না।তবে হ্যাঁ উৎসবের মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনে তার কষ্ট হলো।এমন কি বারবার উৎসব কাশফিয়া বলে ডাকাতে তার ভীষণ খারাপ লাগছে।কাশফুল ডাকটার গুরুত্ব যেন আজ খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে।
কাশফিয়ার এসব ভাবনার মাঝেই উৎসব প্রভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"ওকে পড়ানো শেষ করে আপনি আসুন মাস্টান্নি।আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।"
প্রভা মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতেই উৎসব চলে যেতে নিলে কাশফিয়া ওকে পিছন থেকে একবার ডেকে উঠলো।উৎসব পিছন ফিরে তাকাতেই কাশফিয়া ওড়নায় আঙ্গুল পেঁচাতে পেঁচাতে ইতস্তত কন্ঠে বলল,
"আপনি আমায় কাশফুল বলে ডাকতে পারেন আমার আর কোন অসুবিধা হবে না।"
উৎসব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
"জোর করে আমাকে দিয়ে কোন কিছু করানো সম্ভব না।তোমায় ওই নামে ডাকতাম নিজের ইচ্ছেতে।সেই ইচ্ছেটা এখন ম/রে গেছে।হাজার চাইলেও আমি আর তোমায় এই নামে কখনো ডাকতে পারবো না।"
"কিন্তু আমি তো ক্ষমা চাইলাম।"
"তোমায় তো ক্ষমা করে দিয়েছি।কিন্তু আমি নিজে নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি জন্য এই নামে তোমায় ডাকতে পারবো না।আসছি।"
"আমি আবারও বলছি আমার কোন অসুবিধা হবে না।"
"আর আমিও শেষবারের মতন বলছি জোর করে উৎসব মির্জা কে দিয়ে কোনো কিছু করানো সম্ভব না।"
___________
"ইশরাক কোথায়?"
"ঘরেই আছে।"
"বাড়ি থেকে বের হয়নি তো?"
"না।তবে ওর সাথে দেখা করতে কিছু লোক এসেছিল।"
স্ত্রীর কাছ থেকে সবটা শুনে জামিল খান সিঁড়ি দিয়ে উপরে ছেলের ঘরে গেলেন।দরজায় নক করলেন কিন্তু ভেতর থেকে ইশরাকের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না।দরজা খোলা ছিল ফলে তিনি সহজেই ভিতরে ঢুকে গেলেন।পুরো ঘর অন্ধকার।একেই তো রাত হয়ে গেছে তার মধ্যে ঘরের লাইটটা অবধি জ্বালায়নি।তিনি পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্ল্যাশ লাইট অন করে ঘরের লাইট জ্বালালেন।সারা রুমে চোখ বুলিয়েও তিনি ইশরাক কে কোথাও খুঁজে পেলেন না।বারান্দা থেকে টুকটাক কিছু আওয়াজ পেয়ে তিনি সোজা এবার বারান্দায় গেলেন।ইশরাক তখন হাতে একটা ম/দের বোতল নিয়ে মেঝেতে বসে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মনের সুখে ম/দ গিলছে।এই দৃশ্য দেখে জামিল খান একটুও বিচলিত হলেন না।কেননা এই দৃশ্য তার কাছে নতুন না।বেশিরভাগ সময় ইশরাক কে এই অবস্থাতেই তিনি দেখতে পান।তবে এখন তার জানা জরুরী যে কে ইশরাকের সাথে দেখা করতে এসেছিল।ইশরাকের হাত থেকে ম/দের বোতলটা কেড়ে নিলেন।মুহূর্তের মাঝে ইশরাকের শান্ত চেহারাটা হিংস্র হয়ে উঠলো।কার এত বড় সাহস যে তার হাত থেকে ম/দের বোতল কেড়ে নেয় এটাই সে ভাবছে।পিছন ফিরে তাকিয়ে কিছু বলতে নিয়ে নিজের বাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর কিছু বলার সাহস হলো না।জামিল খান গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
"কারা দেখা করতে এসেছিল তোমার সাথে?"
নিজের তাল সামলাতে না পেরে ইশরাক দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে পড়লো।অস্পষ্ট কন্ঠে বলল,
"আমার দলের ছেলেরা এসেছিল।"
"কি প্রয়োজনে?"
"যারা আমায় জেলে তুলেছিল তোমার কি মনে হয় তাদের উপরে আমি প্রতিশোধ নেব না?সবকটাকে কে/টে রাস্তায় ফেলে রাখবো।"
"তোমায় আমি আগেও বলেছি সামনে নির্বাচন এখন পরিস্থিতি ঠান্ডা রাখো।যা করার নির্বাচনের পর করব।"
"আরে রাখো তোমার নির্বাচন।আমি কোন শা/লাকে দেখে ভয় করি না।আমার যা করার আমি এক্ষুনি করব।সব পরিকল্পনা শেষ।কাল সকাল হবে এক একটাকে ধরবো আর জ/বাই করব।"
ইশরাক হয়তো আরো কিছু বলত কিন্তু তার আগেই জামিল খান ওর গাল বরাবর ঠা/স করে একটা চ/ড় লাগালো।ইশরাক বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
"আমায় মা/রলে কেন?"
"আমার পায়ে এখন জুতা থাকলে সেই জুতা দিয়ে তোমায় পে/টা/তা/ম।নির্বাচনের আগে এসব ঝামেলা করে কি চাইছো যেন আমি নির্বাচনটা হেরে যাই? তারপর কার ক্ষমতার জোরে এসব মাস্তানি করবে?তোমার এসব কীর্তিকলাপ যদি প্রকাশ পায় তাহলে একবার ভেবে দেখেছ কি অবস্থা হবে?"
ইশরাক দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
"তারমানে বলতে চাইছো এতদিন আমি লেজ গুটিয়ে বসে থাকব?"
"দরকার পড়লে তাই থাকবে।আমি খোঁজ নিয়েছি ওদের দলের বাকিদের ক্ষমতা না থাকলেও উৎসব নামক ছেলেটার কিন্তু বেশ ক্ষমতা আছে।ওর বাবা মার হাত অনেক দূর অব্দি যেতে পারে।তখন যদি আমি ক্ষমতায় না থাকি তাহলে কিন্তু তোমায় সাহায্য করতে পারবো না।আর মনে রেখো তোমার জন্য আমি এতদিন কষ্ট করে গড়ে তোলা নিজের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার শেষ করতে পারবো না।তাই বলছি চুপচাপ ঘরে বসে থাকো।আমার ছেলেকে জেলে তোলার বদলা আমিও নেব তবে সেটা সময় সুযোগ বুঝে।আর ততদিন তুমি এই ঘর থেকে বের হবে না।তোমার যা প্রয়োজন সব এই ঘরে চলে আসবে।আর তোমার ফোন কোথায়?তোমার ফোনও আমার কাছে থাকবে।আমি আর কাজের লোক ব্যতীত তোমার ঘরে কেউ প্রবেশ করবে না এমনকি তোমার মাও না।বুঝতে পেরেছ আমার কথা?"
অগত্যা কোন উপায় না পেয়ে ইশরাক কে সম্মতি জানাতে হলো।জামিল খান হাতের মদের বোতলটা ইশরাককে দিয়ে যাওয়ার সময় বিছানার উপর থেকে ফোনটা নিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে চলে গেলেন।ইশরাক আবারও মেঝেতে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লো।কি যেন একটা ভেবে শব্দ করে হেসে উঠলো।যাকে বলে পৈশাচিক হাসি।
"আমার হাত থেকে তোমার রেহাই নেই সুন্দরী।আর না রেহাই পাবে তোমার ওই প্রেমিক আর তোমার বন্ধুরা।"
_________________
"আপনি মন থেকে কাশফিয়াকে ক্ষমা করেন নি তাই না?"
প্রভার প্রশ্ন শুনে উৎসব হেসে বলল,
"আমি ক্ষমা না করলেও কিছু আটকে থাকবে না।আপনি আগে চা দিন।আর বাড়িতে যদি কিছু নাস্তা থাকে তাহলে সেটাও দিন।রাক্ষসের মতন ক্ষুধা লেগেছে আমার?"
প্রভা হাতের নাস্তার ট্রেটা উৎসবের সামনে রেখে সন্দেহী কন্ঠে প্রশ্ন করল,
"আপনি দুপুরে কিছু খাননি তাই না?"
"সকালেও খাইনি।"
"ডায়েট করছেন?"
"ওসব তো মেয়েরা করে বয়ফ্রেন্ডের সামনে সুন্দর দেখানোর জন্য।আমি কি মেয়ে নাকি?"
"কথা না ঘুরিয়ে বলুন খাননি কেন?"
"ঝামেলা করে এসেছি আব্বু আম্মুর সাথে।"
"কেন?"
উৎসব একটা হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,
"কয়েক মাস পর ঊষার বিয়ে হয়ে যাবে।মেয়েটার মন খারাপ।তো ভাবলাম সবাই মিলে একটু কোথাও থেকে ঘুরে আসলে ওর মনটা ভালো হবে।জানেন মাস্টান্নি অনেক বছর হলো আমরা সবাই একসাথে কোথাও ঘুরতে যাই না।"
"তারপর?"
"তারপর আর কি মিস্টার সাইফুল মির্জা আর মিসেস রুবাইদা মির্জাকে বললাম ঘুরতে যাওয়ার কথা।তারা আমাকে তাদের ব্যস্ত সিডিউলের কথা জানালো।আম্মু তার বিজনেস পার্টনার এর সাথে তিন দিনের সফরে সিঙ্গাপুর যাচ্ছে।আব্বু অবশ্য কোথাও যাচ্ছে না তবে দেশে থেকেও ওনার সময় নেই।আচ্ছা বেশ ভালো কথা ওনারা যখন ব্যস্ত ওনাদের বিরক্ত না করাই ভালো।তো আমি আম্মুকে বললাম যে তুমি যখন সিঙ্গাপুর যাচ্ছ তাহলে উষাকেও সাথে করে নিয়ে যাও ভালো লাগবে ঘুরে আসলে।"
"হ্যাঁ এটা ভালো করেছেন।"
"আরে দাঁড়ান পুরো কথাটা তো আমার শুনুন।আম্মু বলল ঊষাকে নাকি সাথে করে নিয়ে যাওয়া যাবে না।ওনাদের কাজের সমস্যা হবে।আমি যখন কি সমস্যা হবে জানতে চাইলাম তখন তিনি এত বড় বিজনেস ওয়েম্যান হয়ে আমায় কোন যুক্তি দিতে পারলেন না।তারপর আর কি ঝামেলা করে না খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি।"
"আপনি রাতের খাবার খেয়ে যাবেন এখান থেকে কেমন।"
"আপনি খাওয়াবেন আমায়?"
প্রভা মৃদু রাগী কণ্ঠে বলল,
"কেন খাওয়াতে পারি না আমি?"
"না তা পারেন।তবে আপনার ঝামেলা বাড়ানো কি ঠিক হবে?"
"আপনি সব সময় অতিরিক্ত বোঝেন।আপনাকে বলেছি না আপনি আমার খুব ভালো বন্ধু।এই কয়দিনে কিন্তু আপনার সাথে আমার বন্ধুত্বটা বেশ জমেছে।আপনাকে কিন্তু এখন আমি সব কথা বলতে পারি।"
উৎসবের খাওয়ার মাঝে বাঁধা পড়লো।চায়ের কাপ থেকে বিস্কিটটা উঠিয়ে প্রভার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"আমি আপনার বন্ধু তাই না?"
"হ্যাঁ।সন্দেহ আছে?"
"না সেটা বলিনি।আমি আপনার বন্ধু তাই না?"
"হ্যাঁ রে বাবা আপনি আমার বন্ধু।"
উৎসব কিছু একটা ভাবল।হাতের বিস্কিট আর খাওয়া হলো না।সেটা পাশে রেখে দিয়ে প্রভাকে বলল,
"আপনাকে একটা কথা বলার আছে।"
"হ্যাঁ বলুন।"
উৎসব বলতে নিয়েও থেমে গেল।কি যেন একটা ভেবে বলল,
"না থাক আপনাকে আগে বলবো না।আমার জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ কথা আগে আমি আমার ভাইকে বলি।আগে ওকে বলি তারপর আপনাকে বলব কেমন।"
প্রভা হালকা হেসে বলল,
"বেশ তাই করবেন।আমারও না আপনাকে কিছু একটা বলার ছিল।আপনি তো এখন আমার অনেক ভালো বন্ধু।আপনাকে আমি নিজের সব কথা বলতে পারি।মনে হচ্ছে এই কথাটা আপনাকে বলা জরুরী।"
"হ্যাঁ বলুন তাড়াতাড়ি বলুন।নিশ্চয়ই আমাকে বলা জরুরী।"
উৎসবের এত উৎসাহ দেখে প্রভা হেসে ফেলল।তবে বুঝতে পারছে না এই কথাটা উৎসবকে বলা ঠিক হবে কিনা।অনেকক্ষণ ভাবলো।ভাবার পর ঠিক করলো না এই কথাটা আগে উৎসবকে বলবেনা।যার জন্য অনুভূতিটা জন্মেছে তাকেই আগে এই কথাটা বলা উচিত।
"না থাক।আমিও বরং আগে আমার জীবনের একজন বিশেষ মানুষকে এই কথাটা বলব।তবে প্রমিস করছি তারপরে আপনাকে বলে দেব।"
উৎসব মন খারাপের ভঙ্গিতে বলল,
"এখন কি কোনমতেই বলা যায় না?"
"না।"
উৎসব আর জোর করল না।প্রভার কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল,
"বেশ তবে আপনি যা চাইছেন তাই হবে।আমাদের দুজনেরই দুটো কথা তোলা রইল দুজনকে বলার জন্য।ঠিক সময় মত দুজনে বলে দেব।"
_____________
আজকে রাতটা মোটেও পূর্ণিমার রাত না।বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার।কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গরমও পড়েছে।গাছের পাতাগুলো একটুও নড়ছে না।এই গরমের মাঝেও প্রভা রুমে ফ্যানের নিচে গিয়ে না বসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।প্রভা ঠিক করেছে নির্ভীকের সাথে এবার দেখা হলে ওকে নিজের মনের কথাটা জানিয়ে দেবে।কিন্তু আদৌ কি প্রভা জানাতে পারবে?নির্ভীকের সামনে গেলেই তো মুখ দিয়ে কথা বেরোতে চায় না,হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।নির্ভীকের চোখে চোখ পড়লে তো প্রভার হৃদয়টা থমকে যায়, হাসি দেখলে প্রভার গোটা দুনিয়া থেমে যায়।সেখানে মানুষটাকে নিজের মনের কথাগুলো বলবে কি করে?প্রভার মনে হচ্ছে এখন তার প্রেমের বার্তা নির্ভীকের কাছে পৌঁছানোর জন্য কোন বিশেষ বাহন দরকার ছিল।কেননা তার মতন ভীতু মেয়ের পক্ষে নির্ভীক কে নিজের মনের কথাটা হয়তো সরাসরি জানানো সম্ভব না।প্রভার ইচ্ছে করছে এখন নির্ভীকের ঠিকানায় একটা চিঠি লিখতে।কিন্তু সেই চিঠিতে লিখবে কি?কথাগুলো ভাবতেই প্রভা নিজেই লজ্জায় কুঁকড়ে গেল।কিছু একটা ভেবে ফোনটা হাতে নিয়ে নির্ভীকের নাম্বারে কল করল।ফোনটা এখনো বন্ধ দেখাচ্ছে।কে জানে মানুষটা কোথায় আছে কি করছে?আচ্ছা ওই মানুষটারও কি প্রভার কথা মনে পড়ছে?প্রভার ইচ্ছে করছে এক ছুটে নির্ভীকের কাছে চলে যেতে।কিন্তু ওই মানুষটা কোথায় আছে সেটা তো প্রভা জানে না।তার ঠিকানায় যে কোন চিঠি লিখবে তারও কোন উপায় নেই।অনেকদিন পর প্রভার আজ কিছু গাইতে ইচ্ছা করছে।ফোনের গ্যালারি খেতে নির্ভীকের একটা ছবি বের করল।অনেক কষ্টে লুকিয়ে নির্ভীকের এই ছবিটা তুলেছিলো।তবে কিভাবে যেন ক্যামেরায় নির্ভীকের হাস্যোজ্জ্বল মুখটাই বন্দি হয়ে যায়।যে হাসি দেখে প্রথম বারবার মুগ্ধ হয়।মুগ্ধ নয়নে সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে গান গাইলো,
❝ভালো আছি ভালো থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।
দিও তোমার মালাখানি
বাউলের এই মনটারে।
আমার ভিতর বাহিরে,
অন্তরে অন্তরে,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।❞
____________
অনেক চেষ্টা করেও নির্ভীক নেটওয়ার্কের দেখা পেল না।অনেক কষ্টে ফোনটা ঠিক করতে পারলেও এখন আবার নেটওয়ার্কের দেখা মিলছে না।ভীষণ বিরক্ত লাগছে এখন নির্ভীকের।না সামিয়ার কোন খোঁজ পাচ্ছে আর না প্রভা আর উৎসবকে নিজের কোন খোঁজ দিতে পারছে।ওরা আদৌও ঠিক আছে কিনা সেটাও তো বুঝতে পারছে না।বিরক্ত হয়ে সে ফোনটাই ছুঁড়ে মা/র/লো।কোন একজনের শূন্যতা নির্ভীক কে ভীষণ পো/ড়া/চ্ছে।তার মতন শান্ত মানুষটাকেও অস্থির করে তুলেছে।
"আমাদের মাঝে দূরত্ব আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা আরো গভীরভাবে আমায় উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে অনুপ্রভা।তবে আমি কথা দিচ্ছি এই দূরত্বই আমাদের মাঝে শেষ দূরত্ব হবে।এখান থেকে ফিরে গিয়ে আমি আপনাকে নিজের মনের কথা জানাবো।তারপরে আপনাকে সারা জীবনের জন্য নিজের করে নেব তাও খুব তাড়াতাড়ি।এরপর আর আমাদের মাঝে কোন দূরত্ব থাকবে না।"