ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৩৩

🟢

কলেজ শেষে গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় পাশ দিয়ে পরিচিত কাউকে যেতে দেখে প্রভার পদযুগল থেমে গেল।পিছন ফিরে তাকাতেই নিশ্চিত হলো যে এটা বকুলই।প্রভা বকুলের নাম ধরে ডাকলো।সেই ডাক বকুলের কান অব্দি পৌঁছালো কিনা সেটা প্রভা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না।বকুলকে থামতে না দেখে নিজে ছুটে গেল ওর দিকে।

"এই বকুল দাঁড়াও।কখন থেকে ডাকছি তোমায়?"

প্রভা বকুলের সামনে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়াতেই বকুল থেমে গেল।প্রভার দিকে সে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।না প্রভার প্রশ্নের কোন উত্তর দিল।ওকে চুপ করে থাকতে দেখে প্রভা পুনরায় বলে উঠলো,

"কথা বলছো না কেন বকুল?"

"আমার একটু কাজ আছে।"

"কাজ আছে ভালো কথা তাই বলে কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ যে দুটো মিনিট আমার সাথে কথা বলা যাবে না?আর ফোনটা বন্ধ কেন তোমার?"

"ফোন নষ্ট হয়ে গেছে।"

"তোমার হাতে যে আমি ফোন দেখতে পাচ্ছি?"

বকুল চটজলদি হাতে থাকা ফোনটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে ধীর গলায় বলল,

"হ্যাঁ আজকে ঠিক করলাম।আচ্ছা আমি এখন আসছি কেমন?"

বকুল চলে যেতে নিলে প্রভা পুনরায় ওর পথ আটকে দাঁড়ালো।ভ্রুঁ জোড়া কুঁচকে প্রশ্ন করল,

"আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছো তুমি?"

বকুল কোন উত্তর দিল না।প্রভা নিজেই আবার বলল। তবে এবারে তার কন্ঠটা ভীষণ শান্ত শোনালো।

"ভালোবাসা না থাকলেও আমাদের মাঝে যে সুন্দর বন্ধুত্বটা ছিল সেটা কি থাকতে পারে না বকুল?এত সুন্দর একটা সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলবে?আচ্ছা মানলাম আমার সাথে না হয় সম্পর্ক রাখতে পারবে না তুমি তাই বলে নির্ভীক,উৎসব ভাইয়া,তিসান ভাইয়া এদের সাথে কেন সম্পর্ক রাখছো না?ওদের ফোনটা তো তুলতে পারো।"

বকুল অপরাধী গলায় বলল,

"আমি সবার কাছে অপরাধী।তোমাদের বিশ্বাস ভেঙেছি আমি।নিজের দুর্বলতার কথাগুলো ভুলে গিয়ে মনে কাল্পনিক ধারণার জন্ম দিয়েছি যেটা আমি একদম ঠিক করিনি।আমি চাইলেও আর কখনো তোমাদের সাথে আগের মতন মিশতে পারবো না।আমায় আমার মতন ছেড়ে দাও।তোমরা সুখে থাকো সেটাই চাই।আমি আসি।"

বকুল আর সেখানে দাঁড়ালো না।কলেজের ভিতরে আর না গিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল প্রভা।সম্পর্ক গুলো এত তাড়াতাড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে কেন?বাধন গুলো এত তাড়াতাড়ি ফিকে হয়ে যায় কেন?হাতেগোনা কয়েকজন মানুষের সাথেই তো কোন দেনা পাওনা ছাড়া সম্পর্ক থাকে।তবে সময় আর পরিস্থিতি কেন সেই সম্পর্ক গুলোই আগে ভেঙে দিতে উঠে পড়ে লাগে?

____________

আজ আর ভার্সিটিতে যাওয়া হয়নি প্রেয়নার।রুমে বসে সে পড়ছে।এমন সময় সেখানে প্রবীর শিকদার প্রবেশ করলেন।এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখতেই প্রেয়না ঘাড় ঘুড়িয়ে সেদিকে তাকালো।বাবাকে দেখতে পেয়ে তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।

"কিছু বলবে বাবা?"

"আজ ভার্সিটিতে যাওনি যে?শরীর খারাপ করছে কি মামণি?"

"না বাবা শরীর ঠিক আছে।আসলে সামনে এক্সাম তো তাই ভাবলাম কয়েকটা দিন একটু বাড়িতে থেকে ভালো করে পড়াশোনা করি।"

"ও আচ্ছা।"

"তুমি কি বলতে এসেছিলে সেটা বলো।"

"ও হ্যাঁ।চারদিন পর তো আমার মামণির জন্মদিন।তা এইবার আমার মামণি আমার থেকে কি উপহার চায়?"

"তোমার যেটা পছন্দ তুমি সেটাই দিও।এমনিতেও আমি জানি আমার বাবা আমার জন্য বেস্টটাই আনবে।"

"সেটা তো আমি জানি যে আমি যা দেব সেটাই নেবে আমার মামণি।কিন্তু তারপরও আলাদা করে আমার মামণির কি আমার থেকে নির্দিষ্ট করে কিছু চাওয়ার আছে?"

প্রেয়না একটু ভেবে বলল,

"না বাবা এমন কিছু নেই।না চাইতেই তো তুমি আমায় সব দিয়ে দিয়েছো।তোমার যেটা ইচ্ছা করবে তুমি আমায় সেটাই দিও।"

প্রবীর শিকদার মেয়ের কপালে স্নেহ ভরে একটা চুমু খেয়ে আদুরে গলায় বললেন,

"বেশ আমি তবে আমার মামণিকে নিজের ইচ্ছেমত একটা উপহার দেব।কি উপহার দেব সেটা কিন্তু এখনই বলবো না।তোমার জন্মদিনের দিন একেবারে চমকে দেব।"

বিজ্ঞাপন

প্রেয়নার সাথে কথা বলা শেষে প্রবীর শিকদার চলে যেতে দিলে প্রেয়না ওনাকে একবার ডাকলো পিছন থেকে।তিনি আর গেলেন না।পুনরার প্রেয়নার দিকে এগিয়ে এলেন।প্রেয়না চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মৃদু ইতস্তত গলায় বলল,

"বাবা আমার মনে পড়েছে আমার তোমার থেকে কি চাই।এখন চাইলে কি আর দেবে না?"

প্রবীর সিকদার হেসে ওঠে বললেন,

"কেন দেব না?তুমি বলো তুমি কি চাও সেটাই দেব।"

"আমায় কিন্তু কথা দিতে হবে যে আমি যেটা চাইবো সেটা তোমায় দিতেই হবে।পরে কিন্তু না করলে চলবে না।"

"আজ অব্দি এমন কখনো হয়েছে যে তুমি আমার থেকে কিছু চেয়েছো আর আমি তোমাকে সেটা দিইনি?"

প্রেয়না দুদিকে মাথা দাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো।

"তাহলে আজ কেন ভাবছো যে আমি দেবো না?যদি কখনো দরকার পড়ে আমার মামণির জন্য আমি আমার এই জীবনটাও দিয়ে দিতে পারি।এই জীবনের থেকে তো আর বড় কিছু চাইতে পারবে না তুমি তাহলে ভয় কিসের?"

"আমার জন্মদিনের দিন বড় আব্বুদের সবাইকে এই বাড়িতে তুমি ডাকবে।ওই দিনটা আমি সবার সাথে কাটাতে চাই।আমার ছোটবেলায় যেমন আমার জন্মদিনটা খুব সাধারণভাবে আমরা সবাই মিলে পালন করতাম এবারও ঠিক তেমন করেই পালন করতে চাই। অত বড় করে আয়োজন আমি চাই না বাবা।সেখানে বাইরের কোন মানুষও থাকবে না শুধু আমাদের পরিবার থাকবে।তুমি নিজে গিয়ে বড় আব্বুদের কে এই বাড়িতে আসতে বলবে সেদিন।পারবে আমায় এই উপহারটা দিতে?"

প্রবীর শিকদারের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।মুখ মন্ডলে কাঠিন্যতা ফুটে উঠলো।কিন্তু তবুও তার কণ্ঠস্বরে শান্ত ভাবটা বজায় আছে।কেননা তিনি তার মেয়ের সাথে কখনোই উঁচু স্বরে কিংবা কঠিন গলায় কথা বলেন না।

"আমি বললেই চলে আসবে?সম্পর্কটা তো আগের মতন নেই।"

"সেটাতো আমাদের জন্যই নেই।আমরা রাখিনি জন্য সম্পর্কটা আগের মতন নেই।সেজন্যই আমাদেরকেই আবার চেষ্টা করে সম্পর্কটাকে আগের মতন বানাতে হবে।প্লিজ বাবা আমার এই অনুরোধটা রাখো।আমি খুব মিস করি ওদের সবাইকে।বড় আব্বু,বড় আম্মুরা সবাই আমাদেরকে খুব মিস করে।কত সুন্দর একটা পরিবার ছিল আমাদের।আর এখন তো বছরেও আমরা কারো খোঁজ নেইনা।"

"এখন আগ বাড়িয়ে সম্পর্কটা ঠিক করতে চাইলে যদি ওরা অপমান করে?তিসান কে তো খুব ভালো করেই চেনো।ওর কথাবার্তার কোন লাইন নেই।"

"কই আমার সাথে তো কখনো তিসান ভাই এমন ব্যবহার করেন না।ভাবির সাথেও করেনি কখনো, আম্মুর সাথেও করেনি কখনো।তুমি আর ভাইয়াও কেন শুধু শুধু তিসান ভাইয়ের দুর্বলতা গুলো বারবার তুলে ধর বাবা?ভাগ্যে যেটা ছিল সেটাই হয়েছে।তোমার কি মনে হয় তিসান ভাইয়ের এজন্য কষ্ট হয় না?বরং আমাদের থেকে হাজারগুন বেশি কষ্ট তিসান ভাইয়ের হয়।তাহলে কেন আমরা বারবার অযথা ওকে কষ্ট দেই?"

প্রবীর শিকদার মেয়ের প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না। ওনাকে চুপ থাকতে দেখে প্রেয়না পুনরায় বলল,

"আমি তোমার থেকে এই উপহারটাই চাই।আমি আমার পুরো পরিবারটাকে চাই তোমার থেকে।বিশ্বাস করো আব্বু তুমি যদি আমাকে না দিতে পারো আমি তোমার কাছে কোন অভিযোগ করবো না।কিন্তু আজকের পর থেকে আমি আর তোমার কাছে কোন আবদারও করবো না।এতোটুকুই।"

"আজ বিকেলে তবে যাই ওদের বাড়িতে?"

প্রথম দফায় প্রবীর শিকদারের বলা কথাটা প্রেয়নার ঠিক বিশ্বাস হলো না।নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করল,

"বড় আব্বুদের বাড়িতে যাব?"

"হ্যাঁ।চারদিন পরে যেহেতু তোমার জন্মদিন একটু আগেভাগেই তো দাওয়াত দিতে হয়।তবে চলো আজ বিকেলে যাই ও বাড়ি।"

প্রেয়নার খুশি আর দেখে কে।প্রথম দফায় এই উপহারের কথা মনে ছিল না সেজন্যই তো বোকার মতন কিছু চায়নি।কিন্তু যখনই মনে হল যে এটা একটা ভালো সুযোগ দুই পরিবারকে এক করার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ে নিল।ঠিক সঙ্গে সঙ্গে তার উপহারটা পেয়েও গেল তার বাবার কাছ থেকে।উচ্ছ্বসিত কন্ঠে প্রবীর শিকদার কে জড়িয়ে ধরে বলল,

"থ্যাঙ্কস বাবা।আমি জানতাম তুমি আমায় উপহারটা দেবেই।"

"আমার মামণি চেয়েছে দিতে তো হতোই এই উপহারটা।"

"এইজন্যই বলি তুমি ওয়ার্ল্ডের বেস্ট বাবা।এখন শুধু ও বাড়িতে গিয়ে সব ভালো ভাবে মিটে গেলেই হয়।আরেকটা কথা বাবা আমি আরো কয়েকজনকে আমার জন্মদিনে আসতে বলবো।আমার কাছে ওরাও আমার আরেকটা পরিবার।"

মেয়ের কথা শুনে প্রবীর শিকদার ভ্রুঁ কোঁচকালেন।প্রেয়না কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

"কারা?"

"আমার বন্ধুরা।সেদিন ভাবিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল তারা সবাই।আরেকজন আছে আমাদের গাড়িতে করে তাকে পৌঁছে দিলাম না প্রভা।"

"ও আচ্ছা ওই মেয়েটা।হ্যাঁ ওকে ডেকো।মেয়েটাকে দেখলে মায়া লাগে।এত অল্প বয়সে নিজের সব দায়িত্ব নিজে পালন করে।খুব স্ট্রং মেয়ে।"

"হ্যাঁ বাবা খুব স্ট্রং।তোমায় বলেছি না ওর বাবা-মা কেউ নেই জানো।অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে ছোটবেলা থেকে।ওর সাথে আরেকজন ফ্রেন্ড আছে সৌমি,ওরা দুজনে খুব ভালো।ওদের অনেক সাহস দুটো মেয়ে একা একা নিজেদের সব খরচ চালায়,একা একা সারাদিন বাইরে কাজ করে,রাত করে বাড়ি ফেরে।ওরা আমায় খুব মোটিভেট করে।"

"বাহ চমৎকার।বেশ তবে ওদের সবাইকেই ডেকো। যেহেতু তোমার জন্মদিন তুমি যা চাইবে তাই হবে।"

"আচ্ছা।মনে থাকে যেন আজ বিকেলে কিন্তু বড় আব্বুদের বাড়ি যাবো।যে করেই হোক ওদেরকে রাজি করাতে হবে।"

প্রবীর শিলদার হালকা হেসে সম্মতি জানিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।প্রেয়না একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।মনে হচ্ছে একটু একটু করে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে। একদিন সে সফল হবেই।সে আবার এই দুটো পরিবারকে এক করতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প