দরজা খুলে বেশ কিছু অপরিচিত মুখ দেখে চমকালো নাবিলা।তার মধ্যে আবার সবাই ছেলে।মৃদু ভীত কন্ঠে প্রশ্ন করল,
"ঠিক চিনলাম না আপনাদেরকে।কে আপনারা?"
নির্ভীক নাবিলার প্রশ্নের উত্তর দেবে তার আগেই ভেতর থেকে মিরাজুল সাহেবের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
"কে এসেছে?"
নাবিলা গলা উচিয়ে উত্তরে বলল,
"চিনতে পারছিনা আব্বু।"
উৎসব বলে উঠলো,
"আরে আমরা তোমার ভাইয়ের বন্ধু।ওর ঠ্যাং ভেঙেছে না তাই দেখতে এসেছি।ভিতর থেকে তোমার আব্বাজান মানে আমার কাকুকে ডাকো উনি আমাদেরকে চেনেন।"
নাবিলা কে আর নিজ থেকে ডাকতে হলো না।ওদেরকে দেখে মিরাজুল সাহেব মুখ বাকালেন।গম্ভীর গলায় বললেন,
"তোমরা আবার এখানে কি করতে এসেছো?"
উৎসব হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
"আমি জানি কাকু আপনি কি ভাবছেন কিন্তু আপনি যেটা ভাবছেন আমরা সেটা করতে আসিনি।"
"আমি কি ভাবছি সেটা তুমি কি করে বুঝলে?"
"ওই যে আপনাকে কাকু বলে ডাকলাম না সব কাকুরই একই রকম ধারণা থাকে।মানে আমি বলতে চাইছি যে আমরা এখানে আপনার খাদ্য সামগ্রী ধ্বংস করতে আসিনি।শুধুমাত্র নির্ভয় কে দেখেই চলে যাব।ওর ঠ্যাং এর অবস্থা কেমন সেটা জানার দরকার ছিল।আসলে ওকে ছাড়া আড্ডা জমছে না।"
"এক ঠ্যাং ভেঙে তো পাঠিয়েছো এবার কি আরেক ঠ্যাং ভাঙার পরিকল্পনা করছো নাকি?"
উৎসবকে নির্ভীক কোন কথা বলার সুযোগ দিল না আর।নিজেই শান্ত কণ্ঠে মিরাজুল সাহেব কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"আমরা শুধুমাত্র নির্ভয় কে দেখতে এসেছি আঙ্কেল। দেখা হয়ে গেলেই চলে যাব।ভিতরে আসতে পারি কি?"
"মানা করলে কি ফেরত চলে যাবে?"
নির্ভীক নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
"দেখা যখন করতে এসেছি,না দেখে যাব না।হয় আমরা ভেতরে যাব না হলে ও বাহিরে আসবে।"
মিরাজুল সাহেবের সাথে নির্ভীকের এত ভদ্র ভাবে কথা বলা উৎসবের একদম সহ্য হচ্ছে না।পাশে দাঁড়ানো তিসানকে খোঁচা মে/রে বলল,
"সেই থেকে তো শুধু আমি একাই বলে যাচ্ছি তুমি একটু কিছু বলতে পারছো না?"
"মুড নেই।দেখা করতে এসেছি,যুদ্ধ করতে না।তুমি আমার মতো নিজের মুখটা বন্ধ রাখো।নির্ভীক কথা বলছে তো।"
ওদের কথার মাঝে নির্ভয় ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এলো।নির্ভীকদের কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"দাঁড়িয়ে আছিস কেন বাইরে?দাঁড়িয়ে থাকার জন্য কি এসেছিস?"
উৎসব মৃদু রাগী কন্ঠে নির্ভয় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"শা/লা তোর ঠ্যাং ঠিক আছে কিনা সেটা দেখতে এসে আমার ঠ্যাং ব্যাথা ধরে গেল।এদিকে কাকু এখনো কনফিউশনের মধ্যে আছে যে আমাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দেবে কি দেবে না।"
নির্ভয় স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
"এখানে কনফিউশন এর কি আছে?ভিতরে আয়।তোরা আসছিস না জন্য কষ্ট করে আমাকে আবার উঠে আসতে হলো।"
মিরাজুল সাহেব আর ওদেরকে কিছু বললেন না। চুপচাপ জুতা পরে চলে গেলেন।নির্ভয় বাকিদেরকে নিয়ে নিজের ঘরে গেল।
কিছুক্ষণ পর নাবিলা সবার জন্য চা আর নাস্তা নিয়ে নির্ভয়ের ঘরে গেল।বিছানার উপর রেখে নির্ভয় কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"ভাইয়া আমি আসছি কেমন?তাড়াতাড়ি চলে আসব।আর আপনারা সবাই দুপুরে খেয়ে যাবেন।"
উৎসব বসা থেকে উঠে নাবিলার দিকে এগিয়ে এসে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল,
"আপনি রান্না করবেন আমাদের জন্য?তাহলে খেয়ে যেতেই হবে।"
উৎসবের এমন আচরণে নাবিলার বেশ অস্বস্তি হলো।বাধ্য হয়ে মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলল।উৎসব পুনরায় বলল,
"আপনি যখন রান্না করবেন খেতে তো ইচ্ছে করছে কিন্তু কাকু এসে যদি কিছু বলে?না মানে খাবার হজম না হলে খুব সমস্যা।"
নির্ভয় গম্ভীর কণ্ঠে উৎসব কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"আমার বোনের থেকে দূরে থাক উৎসব।একদম ওর সাথে উল্টাপাল্টা কথা বলবি না।"
"আরে উল্টোপাল্টা কথা কই বললাম।কিন্তু ভাই আমি তো ভেবেছিলাম তোর বোন মনে হয় অনেক ছোট তাই এতদিন কিছু বলিনি।কিন্তু তোর বোন যে এত সুন্দর সেটা তো আমায় আগে বলিস নি।"
নির্ভীক চোখ গরম করে উৎসবের দিকে তাকালো কিন্তু তাতেও কোন লাভ হলো না।নাবিলার প্রচন্ড অস্বস্তি হচ্ছে।আসছি বলে চলে যেতে নিলে উৎসব ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
"হাই আমি উৎসব মির্জা।জানি আমার নাম আপনি আগে শোনেন নি কেননা এই ব্যাটা কোনদিনও আমার পরিচয় যে আপনাকে দেবে না সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি।যাইহোক আগে চিনতেন না এখন তো চিনে গেলেন।আমরা দুজন কি ভালো বন্ধু হতে পারি?"
নাবিলা ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
"জ্বী না ভাইয়া।আসলে আমি ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করি না।আমার বড় ভাই হিসেবেই ঠিক আছেন।"
উৎসবের মুখটা কালো হয়ে এলো।অসহায় মুখ করে বলল,
"ভাইয়া না ডাকলে কি হয় না?"
উৎসব আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওর মনে পরে গেল প্রভার বলা কিছু কথা।ও তো প্রভা কে কথা দিয়েছিল যে এসব আর করবে না।নিজেই নিজের গালে দুটো চড় মে/রে বলল,
"ছিঃ।তুই আবার এসব করছিস উৎসব?তুই তো সাধু হয়ে গিয়েছিলি।"
নাবিলা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"একদম ঠিক বলেছেন আমি আপনার বড় ভাই হিসেবেই ঠিক আছি।আর আপনি হলেন আমার ছোট বনি।"
উৎসব আর কিছু বলার সুযোগ পেল না।তার আগে নির্ভয় বাজ খাই কন্ঠে ওকে ধমক দিয়ে থামালো সাথে নাবিলা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"তুই কলেজে যাচ্ছিলি না চুপচাপ কলেজে যা।ও ডাকলেও সাড়া দিবি না।থামতে হবে না তোকে।আর শোন নাবিলা যদি ভুলেও কোনদিন তোর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে একদম কথা বলবি না। আমি তোকে নিষেধ করে দিলাম।সঙ্গে সঙ্গে আমাকে এসে বলে দিবি।আমি ওর খবর করব।"
নাবিলা সত্যি সেখানে দাঁড়ালো না বেরিয়ে গেল।
এদিকে নির্ভয় আর উৎসবের মাঝে বেশ ভালো মতনই একটা ঝগড়া লেগে গেছে।নির্ভীক চুপচাপ দেখছে।কিন্তু সব থেকে বেশি শান্ত দেখাচ্ছে তিসানকে।একটা চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে সে।আসার পর থেকেই খুব একটা কথা বলছে না।তিসানের এই নিশ্চুপতার কারণটা ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না।বেশ কিছুক্ষণ ঝগড়া চালানোর পর নির্ভীক উৎসব আর নির্ভয় কে থামিয়ে দিল।উৎসবের চোখ পড়ল এবার তিসানের উপর।ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
"কিগো মা/রা খাওয়া প্রাণী তুমি এমন ম/রার মতন পড়ে আছো কেন?"
তিসান মৃদু হেসে বলল,
"এমনি।তোমাদের কথাবার্তা শুনছি আর কি।"
নির্ভয় অপরাধী কন্ঠে বলল,
"আমার বাবার কথায় মনে হয় তোমার খারাপ লেগেছে তাই না ভাই?আমি বাবার হয়ে ক্ষমা চাইছি।আসলে আমার বাবা একটু রাগী স্বভাবের তো।বন্ধু-বান্ধবদের সাথে অত মেলামেশা পছন্দ করেন না।"
"আরে না না তেমন কোন ব্যাপার না।সব বাবা মায়েরই একই সমস্যা ছেলে মেয়েদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘোরাঘুরি তেমন একটা পছন্দ করেনা।আমি সেসব নিয়ে কিছু মনে করিনি।"
কিছু একটা ভেবে উৎসব বলল,
"আমি বুঝেছি আসল সমস্যা কি হয়েছে?এই বাড়িতে আসার পর থেকে ঠিকঠাক অক্সিজেন পাচ্ছে না তিসান ভাই।"
"কিন্তু কেন?এই বাড়িটা তো আরো তোমার নিজের লোকদেরই।চেনা জায়গায় অসুবিধা কম হওয়ার কথা।"
নির্ভয় এর কথা শুনে তিসান তাচ্ছিল্যপূর্ণ কণ্ঠে বলল,
"নিজের লোকদের ভায়া,আমার না।এই পৃথিবীতে নিজের বলতে দু ধরনের সম্পদ কে বোঝায়।এক তোমার নিজের অর্জন করা দ্বিতীয় তোমার বাবার।এছাড়া আর কারো সম্পদ কে তুমি নিজের বলতে পারো না।"
বেশ কিছুক্ষণ সবাই মিলে আড্ডা দিল।কলিংবেলের আওয়াজে আড্ডার মাঝে বাধা ঘটলো।কেউ একজন লাগাতার বিরতিহীন ভাবে কলিংবেল বাজিয়েই যাচ্ছে সাথে দরজায় করাঘাতও করছে।নির্ভয় বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,
"এই সময়ে আবার কোন পা/গল এলো?কেউ তো আসেনা আমাদের বাড়িতে।"
"দাঁড়া আমি দেখছি।"
কথাটা বলে নির্ভীক দরজা খুলতে গেল।দরজা খুলেই প্রেয়নার আতংকিত মুখশ্রী দেখতে পেল।নির্ভীকের পিছু পিছু নির্ভয়ও এসেছে।নির্ভীক কে এখানে দেখতে চেয়ে প্রেয়ন একটু চমকালো।তবে নিজের বিস্ময় ভাব এখন প্রকাশ করার মতন সময় তার হাতে নেই।ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
"নির্ভয় নেই?"
নির্ভয়ের ঘরে বসা উৎসব আর তিসানের কানে প্রেয়নার কন্ঠটা গেল।তিসান চমকে উঠলো প্রেয়নার কন্ঠ পেয়ে।এই সাক্ষাৎ এর ভয়েই তো তিসান আসতে চাইছিল না।কিন্তু উৎসব আর নির্ভীক জোর করে আনলো।উৎসব একবার উঁকি দিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল যে কন্ঠটা প্রেয়নার কিনা।নিশ্চিত হতেই তিসান কে বলল,
"ওই মা/রা খাওয়া প্রাণী তোমার প্রিয়ু এসেছে।যাও লাইন মা/রার চেষ্টা করো।"
তিসান স্মিত হেসে বলল,
"লাইন মা/রতে হয় টাইমপাস করার জন্য।ভালোবাসায় কোনো লাইন মা/রার জায়গা নেই।"
উৎসব বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,
"তোমার নীতিবাক্য পরে শুনবো।এখন চলো দেখা করে আসি।"
তিসান যেতে না চাইলেও উৎসব জোর করেই ওর হাত ধরে টেনে ওকে নিয়ে গেল।এদিকে নিজের নাম শুনতেই নির্ভয় দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রেয়নাকে উদ্দেশ্য করে চিন্তিত কন্ঠে বলল,
"কি হয়েছে?ঠিক আছেন আপনি?"
"ভাবি খুব অসুস্থ।বাবা,মা কেউ ফোন ধরছে না।বাড়িতে গাড়িও নেই।কিভাবে কি করবো বুঝতে পারছিনা।আপনি একটু আঙ্কেল কে ফোন করে বাবাকে আসতে বলুন প্লিজ।আমি কি করবো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।"
"আমি কল করছি আব্বু কে।আপনি চিন্তা করবেন না।"
নির্ভয় ফোন আনতে রুমে গেল।ততক্ষণে উৎসবরাও সেখানে এলো।প্রেয়না ওদের কে খেয়াল করেনি।নির্ভীক কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"তিসান ভাই আসেনি?"
"হ্যাঁ এসেছে তো।"
তিসান এসেছে কথাটা শুনতেই প্রেয়না যেন শান্তি পেল।প্রেয়নার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ দেখতে পেয়ে সাথে ওর আতংকিত কণ্ঠস্বর শুনে তিসান আর আড়ালে থাকতে পারলো না।
"তাহমিনার কি হয়েছে?"
তিসানের কন্ঠ শুনে প্রেয়না ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।এই অল্প পরিচিত মানুষ গুলোর মাঝে ভীষণ কাছের একজন কে দেখতে পেয়ে নিজের ভেতরে থাকা সব ভয়,দুঃশ্চিন্তা যেন বেরিয়ে এলো।ক্রন্দনরত কন্ঠে বলল,
"ভাবি খুব অসুস্থ।পেট ব্যাথা করছে।কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।"
পাশ থেকে উৎসব বলে উঠলো,
"পেট ব্যাথার জন্য এত প্যানিক করছেন কেন?এটা তেমন কিছু না।"
উৎসবের কথায় সায় জানিয়ে তিসানও বলে উঠলো,
"হ্যাঁ।পেট ব্যাথার জন্য এত কাঁদছো কেন?"
"আরে ভাবি প্রেগনেন্ট।হুট করে পেট ব্যাথা হলে সমস্যা।এমনিতেই ডাক্তার বলেছিল ভাবির কিছু সমস্যা আছে।তিসান ভাই তুমি ভাবিকে নিয়ে হাসপাতালে চলো।বাবারা আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।"
প্রেয়নার এতটা ভয়ের কারণ এবারে সবাই বুঝতে পারলো।তাহমিনা যে অন্তঃসত্ত্বা সেটা তিসান নিজেও জানতো না।নির্ভীক তিসান কে বলল,
"ভাই তুমি ওনাকে নিয়ে এসো।উৎসবের গাড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে যাই।দেরি হলে সমস্যা হতে পারে।"
উৎসবও তাড়া দিয়ে বলল,
"ভাই দাঁড়িয়ে আছো কেন যাও।আমি গাড়ি বের করছি।"
তিসান আর সময় ব্যয় না করে প্রেয়নার সাথে ওদের ফ্ল্যাটে গেল।তাহমিনা তখন পেট ব্যাথায় বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে।অসহ্য রকমের যন্ত্রণা হচ্ছে।তার আর্তনাদের শব্দ শুনে যে কারোরই হৃদয় কেঁপে উঠবে।তিসান এগিয়ে গিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
"চিন্তা করো না তাহমিনা।তোমায় হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি সব ঠিক হয়ে যাবে।একটু ধৈর্য ধরো।"
তিসান তাহমিনা কে দুহাতে কোলে নিয়ে পাঁচতলা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো।আসার সময় প্রেয়না আবার নির্ভয়ের ফ্ল্যাটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল যে প্রবীর শিকদার কে কল করেছে কিনা।নির্ভয় জানালো যে বলে দিয়েছে।নির্ভয়ের থেকে বিদায় নিয়ে তাড়াহুড়ো করে প্রেয়না নিচে নামলো।নির্ভয় যেতে পারলো না।কাছাকাছি যে হাসপাতাল ছিল সেখানেই নিয়ে গিয়ে তাহমিনাকে ভর্তি করানো হলো।
চেক আপের পর ডাক্তার এসে জানালেন যে চিন্তার কিছু নেই।প্রেগনেন্সির সময় এমন ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক।প্রেয়না কারণটা জিজ্ঞেস করতেই ডাক্তার জানালেন যে,
"এটাকে রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন বলে।গর্ভাশয় বড় হচ্ছে,তাই পাশের লিগামেন্টে চাপ পড়ছে জন্য এমন ব্যাথা হয়েছে।চিন্তার কিছু নেই।”
সবাই একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লেন।এদিকে গাড়িতে ওঠার পর থেকে সমানে একের পর এক প্রেয়নার ফোনে প্রয়াসের কল আসছে।কিছু সময়ের ব্যবধানে আবারও আসলো।ফোনটা রিসিভ করে জানালো যে চিন্তার কোন কারণ নেই।তাহমিনার খবর শোনার পর যখন প্রয়াস জিজ্ঞেস করলো যে হাসপাতালে কি করে নিয়ে এলো প্রেয়না?প্রেয়না যখন জানালো যে তিসান সহ ওর বাকি বন্ধুরা সাহায্য করেছে তখন একটু অবাকই হলো।তিসান সাহায্য করেছে এই বিষয়টা বেশ ভাবালো প্রয়াসকে।প্রেয়নাকে বলল তিসানকে ফোনটা দিতে ওর সাথে কথা বলবে।প্রেয়না তিসানের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল যে প্রয়াস ওর সাথে কথা বলতে চায়।তিসান কোন প্রশ্ন করলো না।ফোনটা হাতে নিয়ে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে প্রয়াস কৃতজ্ঞতা পূর্ণ কণ্ঠে বল,
"থ্যাঙ্কস।আমি সত্যি ভাবিনি যে তুই আমায় সাহায্য করবি।যদি কখনো সুযোগ হয় তোর এই ঋণশোধ করার তাহলে আমি নিশ্চয়ই করব।"
"ঋণ শোধ করবি?তা বেশ বিদেশ থেকে এসে দশ-পনেরো কোটি টাকা দেস আমাকে।তোরা বড়লোক মানুষ,তোদের কাছে ঋণ বলতেই তো শুধু টাকা দেওয়া নেওয়া তাইনা?সাহায্য করেছি তার জন্য টাকা দিবি,ভালোবাসলে তার জন্য টাকা দিবি,বন্ধুত্বের জন্য টাকা দিবি,ভালো মন্দ সবকিছুর জন্য শুধু তোরা টাকাই দিতে পারিস।তুই কি ভাবিস সবাই তোর মতন স্বার্থপর?টাকা ছাড়া আর কিছু বোঝে না?তুই আমার ঋণশোধ করবি সে আশায় আমি তোর সাহায্য করেছি?"
প্রয়াস ভরকালো।ও তো স্বাভাবিকভাবে এই কথাটা বলেছিল।
"এত রিয়াক্ট করছিস কেন?আমি স্বাভাবিক ভাবে কথাটা বলেছি।"
"কেন রিয়েক্ট করার অধিকার নেই?তোর টাকা আছে জন্য শুধু তুই একাই রিয়েক্ট করতে পারিস আমার নেই জন্য আমি করতে পারিনা?বউ প্রেগন্যান্ট তুই বিদেশ কি করিস?তোর বউ বাচ্চার প্রতি কোন দায়িত্ব নেই? বাচ্চা জন্ম দেয়ার দায়িত্ব একা তোর বউয়ের?এত টাকার নেশা কেন?তোর বাপের কি কম পড়েছে?"
তিসানের এই অগ্নি মূর্তি দেখে উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে গেল।ওর রাগের কারণটা ঠিক বুঝতে পারছে না। অপরদিকে প্রয়াসও বুঝতে পারছে না তিসানের হঠাৎ এত রেগে যাওয়ার কারণ।
"অযথা রাগ দেখাচ্ছিস কেন আমার উপরে?"
"রাগ দেখাচ্ছিনা।রাগ দেখানোর অধিকার আমার নেই।ছিল একসময়।সম্পর্কটা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে বলতো?আমি তোর সাহায্য করছি তার বদলে তুই আমায় বলছিস যে ঋণ পরিশোধ করবি।তুই আমায় ধন্যবাদ দিচ্ছিস।তুই এতটা বদলে গেলি কি করে বলতো?টাকা সব বদলে দিল।তুই আশা করিস নি যে আমি তোর সাহায্য করতে পারি।কেন রে আমাদের মাঝে কি হয়েছে?মা/রা/মা/রি,কা/টা/কা/টি কিছু হয়েছে আমাদের মাঝে?তাহলে কেন আশা করতে পারবি না?"
"সেই সম্পর্ক নেই আমাদের মাঝে যে আমি তোর থেকে আশা করতে পারি।"
"শেষ করলি কেন?আমি বলেছিলাম?কি হল বল আমি করতে বলেছিলাম শেষ?তোর পাখা গজিয়ে ছিল তাই তুই উড়তে চেয়েছিলি সেজন্য আমাকে ভুলে গিয়ে সব শেষ করে দিলি।মানুষ থেকে জা/নো/য়া/র হয়ে গেলি।ভুলেও আর কোনদিন আমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইবি না।কোনদিন আর আমার সাথে কথা বলতে চাইবি না।আমি মানুষদের সাথে কথা বলি,জা/নো/য়া/র/দের সাথে না।"
কথাটা বলে তিসান কান থেকে ফোনটা নামিয়ে প্রেয়নার হাতে ফোনটা দিয়ে গটগট পায়ে হেটে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।সবাই হা করে তিসানের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল।এই বন্ধুত্বটা শেষ হওয়াতে তিসানের মনের মাঝে ঠিক কতটা কষ্ট লুকিয়ে রেখেছিল সেটার সামান্যতম বহিঃপ্রকাশ যেন আজ ঘটলো।এই সম্পর্কে ধন্যবাদ শব্দটা তিসান সহ্য করতে পারল না।তিসান সাহায্য করতে পারে প্রয়াসের এই দ্বিধাদ্বন্দ্বটা সহ্য করতে পারল না।সবশেষে বন্ধুত্বের সমাপ্তিটাই যেন তিসান মেনে নিতে পারে না।