ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৩২

🟢

নির্ভীক নামটা না বললেও ঊষা হয়ত নামটা আন্দাজ করতে পেরেছে।কিন্তু ওর আলাদা করে প্রভার উপর কোন রাগ নেই।কাউকে দোষারোপ করতে ঊষা পছন্দ করেনা।ভাগ্যে যা আছে তাই হবে ওর সাথে এটাই ঊষা সবসময় বিশ্বাস করে।এই প্রথম নির্ভীকের বেলায় একটু জোর করে নিজের ভাগ্যটাকে বদলানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু সেটা হলো না।তার মানে এটা নয় যে ঊষা এর জন্য অন্য কাউকে দায়ী করবে।সারা জীবন নির্ভীক কে ভালোবাসবে।আজ শেষবারের মতো নিজের ভালোবাসাটা প্রকাশ করলো।এরপর আর কোনদিন করবে না।আজই সে নির্ভীকের চূড়ান্ত উত্তর পেয়ে গেছে।এতদিন ওর কাছে কোন কারণ ছিল না সেজন্য ঊষাও বারবার চেষ্টা করছিল নির্ভীকের উত্তরটা বদলানোর।কিন্তু এখন তো নির্ভীকের কাছে একটা কারণ আছে।যেখানে অন্য কাউকে ভালোবাসে সেখানে ঊষা ওর ভালোবাসা কখনোই পাবে না।তাই ঊষাও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।হাত পা ছেড়ে কান্নাকাটি করার স্বভাব তার নেই।নিজের দুঃখ কষ্ট গুলোকে সে নিজের মাঝে লুকিয়ে রাখতে জানে। ফলস্বরূপ এখনও কারো পক্ষে আন্দাজ করা সম্ভব নয়, ওর মনের মধ্যে ঠিক কতটা ঝড় বয়ে চলেছে।নির্ভীক একটু হলেও আন্দাজ করতে পারছে,প্রভাও হয়তো পারছে কিন্তু কেউই কিছু বলছে না।প্রভার প্রশ্ন করাটা অযৌক্তিক দেখাবে সেজন্য চুপচাপ আছে।

প্রভা আর সৌমি নিচে নেমে এলেও প্রেয়না নিচে নামেনি এখনো।এদিকে সবাই খাবার টেবিলে বসে পড়েছে।সৌমি ওকে ডাকতে যেতে চাইলে প্রভা ওকে বাঁধা দিয়ে তিসান কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

"তিসান ভাইয়া আপনি একটু প্রিয়ু আপু কে ডেকে আনবেন প্লিজ!"

প্রভার কথায় তিসান ভ্রুঁ কোঁচকালো।মেয়েটার উদ্দেশ্য ঠিক ভালো লাগছে না।তিসানের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে প্রভা পুনরায় বলল,

"যাবেন না ভাইয়া?"

তিসান গম্ভীর গলায় বলল,

"হুম যাচ্ছি।"

প্রভা মনে মনে হাসলো।প্রভা তো জানে না যে ও যেটা চাইছে সেটা আদৌ সম্ভব কিনা অথবা সেটা ঠিক হবে কিনা তবুও একটা চেষ্টা করতে চায়।জীবনে তিসানের মতন একটা ভালোবাসার মানুষ পাওয়া খুব কঠিন,যে নিজের ভালোবাসার মানুষের সম্মান রক্ষার্থে নিজের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে দুবার ভাবে না।প্রেয়নার কাছে তো তিসানের ভালোবাসাটা সম্পূর্ণ অজানা তাহলে ও নিজের মতামত জানাবে কি করে?প্রভা খুব করে চায় যেন তিসানের জীবনে প্রেয়নার আগমন ঘটে। যেন তিসানের এত এত ত্যাগ বিফলে না যায়।নির্ভয়ও যেন আজ কিছু কিছু আন্দাজ করতে পারছে।তখন উৎসব আর তিসানের কথাবার্তার কিছু কিছু তার কানে গিয়েছিল।নির্ভয় সঠিক কিছু জানে না তবে আন্দাজ করছে।যে করেই হোক কারো থেকে এ বিষয়ে নিশ্চয়তা নেবে সেটাই ভাবছে।নির্ভীক যদি এ বিষয়ে কিছু জেনে থাকে কাউকে কখনোই কিছু বলবে না সেটা নির্ভয় খুব ভালো করেই জানে।কেননা এই কথাটা বললে সম্পর্কের মাঝে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে সেটা নির্ভীক কখনোই চায় না।বাকি রইল উৎসব।উৎসব কে একটু জোর করলে বলে দিতে পারে।যদি এর খারাপ দিকগুলোর সাথে সাথে ভালো দিকগুলোও নির্ভয় উল্লেখ করে তাহলে উৎসব বলে দিতে পারে।হ্যাঁ নির্ভয়ের শেষ ভরসা এখন উৎসবই।

তিসানের ঠিক পাশের চেয়ারটাতেই বসেছিল উৎসব।প্রভা কিছু একটা ভেবে উৎসবকে উদ্দেশ্য করে,

"আপনি আপনার বন্ধুর পাশের চেয়ারটায় এসে বসুন তো।"

উৎসব ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

"কেন এখানে বসলে কি খেতে দেবেন না নাকি মাস্টান্নি?"

"আরে না না ভাইয়া ব্যাপারটা এমন না।আসলে আপনার বন্ধু একা একা বসে খাবে।আপনি যদি ওনার পাশে বসে ওনাকে সঙ্গ দেন খেতে তাহলে ওনার সুবিধা হবে তাই বলছিলাম আরকি।আর যে গরম পড়েছে আজকে এখানে বসে ফ্যানের বাতাসটাও ঠিকঠাক ভাবে পাবেন।তাই বলছি এখানে আসুন।"

"এটা কিন্তু ঠিক না মাস্টান্নি।যা করতে চাইছেন সেটা কিন্তু সম্ভব না।"

"আমি কি করতে চাইছি সেটা আপনি কি করে বুঝলেন?"

"বুঝেছি বুঝেছি।কিন্তু শুনুন যেটা আপনি চাইছেন সেটা সম্ভব না।আপনার মতন আমিও কয়েকদিন চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু থেমে গেছি।কারণ বুঝেছি এটা হবে না।"

প্রভা বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,

"আপনার দ্বারা এসব সম্ভব না।আপনি চুপচাপ এই পাশে এসে বসুন তো।"

"সে না হয় বসছি।আপনার জন্য এখন আমার কপালে দুঃখ আছে।"

উৎসব উঠে গিয়ে নির্ভীকের পাশের চেয়ারে বসলো।আর দুটো মাত্র চেয়ারই ফাঁকা আছে।একটা তিসানের আরেকটা প্রেয়নার।ছাদ থেকে নেমে এসে নিজের পাশের চেয়ারটা ফাঁকা দেখতেই তিসানের ভ্রুঁ দ্বয়ের মাঝে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো।সামনে তাকাতেই দেখল উৎসব ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছে।মৃদু গম্ভীর গলায় তিসান বলল,

"তুমি ওখানে গেলে কি করে ভায়া?"

"আমি এখানে আসতে চাইনি ভাই আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে জোর করে।আমি এখানে না বসলে নাকি নির্ভীকের পেটের ভাত হজম হবে না এই মাস্টান্নি বলল সেই জন্য আমাকে এখানে আসতে হলো।"

তিসান প্রভার দিকে তাকাতেই প্রভা হালকা হেসে বলল,

"আরে ভাইয়া ওনার কথায় কান দেবেন না তো।নিজে নিজে উঠে এসে এখন আমার উপর দোষ চাপাচ্ছে।জানেনই তো মাথায় সমস্যা আছে।আপনি বসুন।প্রিয়ু আপু তুমি ভাইয়ার পাশে বসো।"

উৎসব নিজের হয়ে কিছু বলবে তার আগেই প্রভা ওর ঘাড়ের কাছে বেশ জোরে একটা চি/মটি কা/টলো।জোরে আর্তনাদ করে উঠলো উৎসব।প্রভা আফসোসের কন্ঠে বলল,

"এজন্য সব সময় বলি খাওয়ার সময় বেশি কথা বলতে নেই এখন জিভে কামড়টা খেলেন তো।আপনি এখন আর কথা না বলে চুপচাপ ভালো ছেলের মতন খাবারটা শেষ করে ফেলুন তো।"

প্রভার কথা শুনে নির্ভীক ঠোঁট টিপে হাসলো।এদিকে চিমটি দেওয়া জায়গাটায় উৎসবের জ্বলছে।মনে হচ্ছে প্রভা মাংসটাই তুলে নিয়েছে।বিড়বিড় করে বলল,

"মাস্টান্নি কে ভালো ভেবেছিলাম আমি।এ তো দেখি সাংঘাতিক।কাকড়ার থেকেও বেশি জোরে আমায় চিমটি মে/রে/ছে।অন্য কেউ হলে না এই চি/মটির বদলে কা/মড় বসিয়ে দিতাম।শুধু মাস্টান্নি জন্য কিছু বললাম না।"

______________

খাওয়া-দাওয়া শেষে আরো বেশ কিছুক্ষণ সবাই আড্ডা দিল।দুপুরের পর থেকে ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল।দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরেই ঊষা বাড়ি চলে গিয়েছিল। অজুহাত হিসেবে নিজের মাথা ব্যথা আর শরীর খারাপ দাঁড় করিয়েছে।কেউই আর বাধা দেয়নি।উৎসবরা যে গাড়িতে করে এসেছিল সেই গাড়িতেই আবার ফেরত চলে গেছে।বিকেলের দিকে সবার জন্য চা আর নাস্তা তৈরি করলো প্রভা।এবারে অবশ্য ওকে প্রেয়নাও টুকটাক সাহায্য করেছে।রান্নাবান্নায় প্রেয়না তেমন একটা পারদর্শী না।রান্নাঘরে ঢোকাই হয় না বলতে গেলে।প্রয়োজন পড়েনি কখনো।তবে রাত জেগে পড়ার জন্য নিজেই চা কফি বানানো শিখেছে।একজন শিখিয়েছে।এতোটুকুই তার জানা।প্রভা ভাজাপোড়া নাস্তা তৈরি করল আর প্রেয়না চা বানালো।

নাস্তা বানানো শেষে সবাই একসাথে সেগুলো খেলো।তিসান চায়ের কাপে চুমুক দিতেই প্রভা বলে উঠলো,

"চা টা কেমন হয়েছে ভাইয়া?"

"এক কথায় দারুন।"

"চা টা কিন্তু প্রিয়ু আপু বানিয়েছে।সেজন্য এত সুন্দর হয়েছে।"

ভাজাপোড়া খাওয়া শেষে সবেমাত্র উৎসব পানিটা মুখে দিয়েছিল।প্রভার এই কথাটা শুনে পানিটা গিলতে নিয়ে উৎসবের কাশি উঠে গেল।ভালোমতোই বিষম খেলো। একদম চোখ নাক দিয়ে পানি বেরিয়ে গেল।

"ধুর মাস্টান্নি আমি আপনাকে ভালো ভেবেছিলাম। আপনি তো দেখি আচ্ছা জিনিস!"

তিসান বক্র হেসে উৎসবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"মাস্টান্নির কোন দোষ নেই ভায়া,দোষটা তোমার ভাবনার মাঝে।তুমি সহজ বিষয়কে জটিল করে ভাবতে পারো কিন্তু জটিল বিষয়কে সহজ করে ভাবতে পারো না।এত বেশি ভাবলে চলে নাকি?"

উৎসব রাগী কন্ঠে বলল,

"তুমি কম ভাবো জন্যই তো মা/রা খেয়ে বসে আছো।আমার মতন বেশি ভাবলে আর মা/রাটা খেতে হতো না।"

"চিন্তা করো না বেশি ভাবনার ফলে তুমিও খুব শীঘ্রই মা/রাটা খাবে।"

নির্ভীক বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,

"তোমরা দুজনে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা করতেই পারো না।আজেবাজে প্রসঙ্গ বাদ দাও তো।অনুপ্রভা আপনাকেও বলছি বাদ দিন।যাই হোক চা টা কিন্তু সত্যি দারুন হয়েছে।"

প্রেয়না বলে উঠলো,

"আরে আমার থেকেও চার গুণ বেশি দারুণ চা তিসান ভাই বানায়।তোমরা মনে হয় জানো না তাই না?"

প্রভা আর উৎসব দুজনে একসাথে বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো,

"তাই নাকি?আমরা তো জানতাম না।"

ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে নির্ভীক একটা হতাশার শ্বাস ফেললো।নির্ভীক আগে ভাবতো উৎসব একাই বাচ্চামো করে এখন তো মনে হচ্ছে প্রভা নিজেও একটা বাচ্চা।নির্ভয় খুব স্বাভাবিক।আজ সে নিজে মন্তব্য করার থেকে অন্যদের মন্তব্য জানতে বেশি আগ্রহী। ঠিক একই রকম ভাবে তিসানও স্বাভাবিক ভাবে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে।প্রেয়না পুনরায় বলে উঠলো,

"হ্যাঁ দারুন চা বানায়।আগে যখন আমার ভাইয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল তখন মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে যেত।রাতের বেলা কোন ম্যাচ থাকলে দুজনে দেখতো।আমি বেশি রাত জাগতে পারতাম না।যতক্ষণ পারতাম পড়তাম ততক্ষণ।ভাইয়া মাঝে মাঝে আমায় চা করে দিতে বলত।এই একটা জিনিস আমি পারি।আর এটাও তিসান ভাইই শিখিয়েছে।"

"আরে বাহ মা/রা খাওয়া প্রাণী,তোমার এত গুণ তা তো জানতাম না।"

"আরে তিসান ভাইয়ের আরো অনেক গুন আছে।ছোটবেলা থেকে তো পড়াশোনাতেও ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট।সবসময় ক্লাসে এক রোল হত আর আমার ভাইয়ার হতো দুই।এই নিয়ে আমার ভাইয়ার খুব মন খারাপ হতো যে ওর কেন এক রোল হয় না।তিসান ভাই তখন কি করতো জানো?ইচ্ছে করে পরীক্ষা খারাপ দিত যেন আমার ভাইয়ার রোল এক হয়।এমন করতে গিয়ে তিসান ভাইয়ের রোল পাঁচ এর ওপারে চলে গেল।সব সময় পরোপকার করতে গিয়ে নিজের ক্ষতি করে।"

তিসান হালকা হেসে বলল,

"অযথা এসব কথা কেন তুলছো?কি লাভ এসব বলে?"

"লাভ ক্ষতি চিন্তা করে কি সবসময় সবকিছু করতে হয় নাকি?আমি তো এমনি ওদেরকে বলছিলাম।তারপরে জানো তিসান ভাই কিন্তু দারুন মা/রা/মা/রি করে।আমি যে স্কুলে পড়তাম ওখানকার কলেজে তিসান ভাই আর আমার ভাইয়া পড়তো।একবার কয়েকটা ছেলের সাথে আমার ঝামেলা হয়েছিল।ওরা দুজন মিলে সেই ছেলে গুলোকে যা মে/রে/ছি/ল না কি আর বলবো।"

প্রভা আর উৎসব এখানে সব থেকে মনোযোগী শ্রোতা।ওদের এত মনোযোগ দেখেই প্রেয়না যেন ঘটনাটা বলতে আগ্রহ পাচ্ছে।প্রেয়নাকে থামতে দেখে প্রভা তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,

"তারপর?"

"তারপর তিসান ভাই দারুন গান গায়।একসময় তো গিটার বাজাতো।জানো আমার ভাইয়ার থেকে বেশি ভালো স্টুডেন্ট ছিল।কিন্তু মাঝে যে কি হয়ে গেল। পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগী হয়ে গেল।কোন ভার্সিটিতে চান্স হয়নি জন্য বাড়ির সবার থেকে কত কথা শুনতে হলো।তারপর এখানে অনার্সে ভর্তি হলো ঠিকই কিন্তু রাজনীতিতে জড়িয়ে সব শেষ করলো। পড়াশোনাটা শেষ করতে পারলো না।কেন যে রাজনীতিতে জড়াতে গিয়েছিল কে জানে?যদি এসবে না জড়াতো তাহলে আমি জানি আমার ভাইয়ার থেকেও আজ একটা ভালো পজিশনে থাকতে পারতো।"

"কে বলল রাজনীতিতে জড়িয়ে এসব হয়েছে?"

উৎসবের প্রশ্ন শুনে তিসান চমকে উঠল।গম্ভীর কন্ঠে উৎসব কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"রাজনীতিকে জড়িয়েই তো হয়েছে তুমি জানো না?চুপ থাকো এই বিষয়গুলো নিয়ে আর কোন কথা হোক আমি চাইনা।প্রিয়ু তুমিও থামো।যা হয়ে গেছে তো গেছে।আমার জীবনের পরিণতি এটাই ছিল ব্যাস কথা শেষ।"

শেষ বললেই তো আর কথা শেষ হয় না।ঠিক যেমন উৎসবের প্রশ্নটা প্রেয়নার মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"রাজনীতির জন্য হয়নি তো কিসের জন্য হয়েছে?তিসান ভাই তো বাড়িতে আমাদের সবাইকে বলেছে যে রাজনৈতিক শত্রুতার জেরে কোন ঝামেলার কারণে ছাত্রত্ত্ব বাতিল হয়েছে নাকি।আমরা কি ভুল জানি?"

কাউকে কোন উত্তর দেয়ার সুযোগ না দিয়ে তিসান নিজেই বলে উঠলো,

"ভুল কেন জানতে যাবে?আমি তো নিজেই তোমাদেরকে বলেছি এই কথাটা তাহলে ভুল হতে যাবে কেন?যা বলেছি সবটা ঠিক।রাজনৈতিক শত্রুতার কারণেই একটা ঝামেলায় জড়িয়ে আমার ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে।এর বাইরে আর কোন কথা নেই।"

তিসান আর কাউকে কিছু বলার সুযোগই দিল না।প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে অন্য কথা বলল।কিন্তু দুটো মানুষের মনে সন্দেহ থেকে গেল।প্রেয়না নাহয় জানে না যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কোন শত্রুতার কারণে তিসান এই ঝামেলায় জড়ায়নি কিন্তু নির্ভয় তো জানে।নির্ভয় তো জানে যে তিসানের এই ছাত্রত্ত্ব বাতিলের ঘটনার সাথে কোন মেয়ে জড়িত,তিসানের ভালোবাসা জড়িত।মনে মনে ভাবলো,

"তবে কি আমি যেটা ভাবছি সেটাই ঠিক?"

______________

বিজ্ঞাপন

বাকিরা সবাই চলে গেলেও নির্ভীক থেকে গেছে।প্রভার কথাতেই থাকতে হয়েছে।বৃষ্টির কারণে রোমানা বেগমের আসতে বেশ দেরি হচ্ছে।তিনি যখন প্রভার থেকে শুনেছিলেন যে বাকি সবাইকে দাওয়াত করেছেন তখন তিনি প্রভাকে বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন যেন নির্ভীক আগে না যায়।উনি নির্ভীকের সাথে নাকি দেখা করতে চান।সেজন্যই নির্ভীক কে থাকতে হয়েছে।সময় তখন সন্ধ্যা ছয়টা।কিন্তু তখনও তার দেখা নেই।বৃষ্টিটা থেমেছে।কিন্তু আকাশটা এখনো মেঘলা।কালো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশটা।পরিবেশটাও বেশ ঠান্ডা।সারাদিন পরিশ্রমের পর সৌমি একটু ঘুমিয়েছে।এই সুযোগে প্রভা নির্ভীক কে নিয়ে ছাদে এলো।প্রভার মনটা উসখুস করছে এটা জানার জন্য যে তখন ঊষার সাথে নির্ভীকের ঠিক কি কথা হয়েছে।নির্ভীক হ্যাঁ বলে দিয়েছে কি?কিন্তু সরাসরি প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতেও পারছে না।মুখ খুলে প্রশ্নটা করতে নিয়েও আবার থেমে গেছে।বেশ কয়েকবার এমন হলো।নির্ভীক আড় চোখে কয়েকবার প্রভাকে দেখল।বুঝতে পারছে যে প্রভা ওকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করার জন্য উশখুশ করছে কিন্তু করতে পারছে না।

"ভুল হোক বা ঠিক যেহেতু মনে প্রশ্ন এসেছে তাহলে করে ফেলুন।"

নির্ভীকের এমন কথায় প্রভা চমকালো।বিস্মিত কন্ঠে বলল,

"কি করে বুঝলেন যে আমি কিছু প্রশ্ন করতে চাইছি?"

"আপনার চোখ মুখের অস্থিরতার কারণটা একটু আধটু বুঝতে পারি।আগে আমি কারো চোখের ভাষা পড়তে পারতাম না তবে আজকাল একটু আধটু পড়তে শিখেছি।"

"তা এই উন্নতির কারণটা কি জানতে পারি?"

"কারো সঙ্গ।কেউ চায় আমি যেন তার চোখের ভাষা বুঝতে পারি সেজন্য একটু শেখার চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটুকু সফল হতে পেরেছি।তবে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা আমি করেছি।"

প্রভা কিঞ্চিৎ হেসে বলল,

"চেষ্টাটাই অনেক বড়।অনেকে তো এই চেষ্টাটাও করে না।আপনি তবুও করেছেন।"

"এখন চটপট বলে ফেলুন কি বলতে চাইছিলেন।"

"ঊষা দুপুরে তাড়াহুড়ো করে চলে গেল কেন?"

নির্ভীক হালকা হেসে বলল,

"এর উত্তরটা আপনি জানেন।"

"আমি কি করে জানব?আপনি আমায় বলেছেন নাকি কিছু?আমি আগে জিজ্ঞেস না করলে তো কিছুই বলেন না বুঝবো কি করে আমি?"

প্রভার কথার মাঝে নির্ভীক একটু অভিমানের ছোঁয়া পেল।মেয়েটা তবে আজকাল চাইছে যেন নির্ভীক নিজের সুখ দুঃখ সব কথা আগে ভাগে ওকে বলে ফেলে।আলাদা করে যেন ওকে জিজ্ঞেস করতে না হয়।

"আমার সবকিছুতে ভাগ বসাতে চাইছেন?"

"আপনার আপত্তি আছে?আপত্তি থাকলে বলুন বসাবো না।জোর করে কিংবা কেড়ে নেওয়ার স্বভাব আমার নেই।"

"মেয়ে মানুষ কথায় কথায় এমন রাগ দেখায় কেন বলুন তো?আপনাদের মন মস্তিষ্কে যে কখন কি চলে সেটা বোঝা সত্যিই বড় কষ্টকর।"

"কে বলেছে আপনাকে কষ্টকর?বোঝার চেষ্টা করুন তাহলে না বুঝবেন।আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে মনের কথা বুঝবেন কি করে?"

"যে হৃদয়ে থাকে তার হৃদয়ের কথা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেও হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।আপনার মনে এখন কি ঘুরছে আমি কিন্তু সেটা এই আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকোও বলে দিতে পারব?"

"বলুন শুনি?"

"ঊষাকে বলা আমার উত্তরটা কি ছিল এটাই জানতে চাইছেন তো?"

প্রভা এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,

"এসব কেন ভাবতে যাবো?আমি তো জানি না যে ঊষার সাথে আপনার কথা হয়েছে।"

"এত উপরে ছাদে দাঁড়িয়ে কি নিচে দুটো মানুষের মাঝে কি কথা হচ্ছে সেটা শোনা সম্ভব?সম্ভব না তো।মিথ্যে আশা নিয়ে তখন ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন আমায়।"

প্রভা বড় বড় চোখ করে নির্ভীকের দিকে তাকালো। তার মানে দুপুরে তখন যে প্রভা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল নির্ভীক ওকে দেখতে পেয়েছিল।কিন্তু প্রভা স্বীকার করতে চাইলো না।অস্বীকার করে বলল,

"কোথায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম?আমি তো এমনি তখন ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলাম।"

"গুছিয়ে মিথ্যেটাও বলতে শেখেননি।কি পারেন আপনি বলুন তো?শুধুমাত্র হা করে তাকিয়ে থাকতে পারা ছাড়া আর কিছু পারেন না।"

প্রভা এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো।বুঝলো যে নির্ভীকের কাছে আর মিথ্যে বলে কোন লাভ নেই।কেননা আসলেই প্রভা ঠিকঠাক কোন অজুহাত দিতে পারে না। বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,

"এত আজেবাজে কথা না বলে সরাসরি এটা বলে দিলেই তো পারতেন যে কি বলেছে ঊষাকে?"

"কেন আপনি জানেন না?"

"আপনার মনের কথা আমি জানবো কি করে?অদ্ভূত তো!"

নির্ভীক এবার প্রভার দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি বড্ড শীতল। সেই দৃষ্টির মাঝে লুকিয়ে থাকা কথাগুলো প্রভা ঠিক ধরতে পারলো না।উল্টো নিজের মনের সাজানো কথাগুলো গুলিয়ে ফেলল।

"তবে শিখে নিন।মন পড়তে না পারলে চলবে না।একজনকে মন দিয়ে আরেকজনকে কথা দেব এমনটা হয় নাকি?"

"কাকে মন দিয়েছেন আপনি?"

"ও মা এটাও জানেন না।আমার ভবিষ্যৎ স্ত্রীকে নিজের মন দিয়েছি।সে ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানো আমার জন্য বারণ।"

"সেই স্ত্রী টা কে সেটাই জানতে চাইছি।"

"বিয়ে তো করিনি এখনো তাহলে জানবেন কি করে?"

"তাহলে যে বললেন আপনার স্ত্রী ছাড়া অন্য কারো দিকে চোখ তুলে তাকানো বারণ?"

"সে তো আমার ভবিষ্যতের স্ত্রীর কথা বলেছি।এখন আমাদের ভবিষ্যৎ তো আমরা দেখতে পারি না তাই না?"

নির্ভীক এর আচরণ আজ ভীষণ অদ্ভুত লাগছে প্রভার কাছে।আজ যেন সে রসিকতার মানসিকতায় আছে। গুরুতর আলোচনার মাঝেও মজা করে কথা বলছে।প্রভা পাল্টা কোন প্রশ্ন করল না।বেশ কিছুটা সময় দুজনে আকাশের দিকে নিরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নিজেদের মনে থাকা হাজারো প্রশ্নগুলোর কি তবে তারা এই নীরবতার মাঝে খুঁজছে উত্তরটা?হয়তো হ্যাঁ। আবার হয়তো না।

"আপনার কোন আত্মীয় নেই যে আপনাকে একটু ভালোবাসে?"

"হ্যাঁ আছে তো।আমার মামা,মামী আছে।তারা আদর করে আমায়।অন্তত ওদের সেই ভালোবাসার মাঝে কোন কিছু পাওয়ার লোভ নেই।"

"আপনার মায়ের কোলে কখনো মাথা রেখে আপনি ঘুমিয়েছেন?আপনার মা আপনাকে খাইয়ে দিয়েছেন? তারপর আপনার বাবার সাথে কখনো ঘুরতে বেরিয়েছেন?"

"সব করেছি এক সময়।আপনাকে বলেছিলাম না একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমার জীবনে কোন কিছুর অভাব ছিল না।সব পেয়েছি।"

"আমি না এসব কখনো পাইনি।মা-বাবার গায়ের গন্ধ কেমন হয় না সেটা জানি না।মা খাবার খাইয়ে দিলে নাকি সেই খাবারটার স্বাদও বেড়ে যায় আমি সেই স্বাদ কেমন সেটাও জানিনা।বাবার হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে কেমন লাগে আমি সেটাও জানি না।আমি না কখনো এমন কোন কোল পাইনি যেখানে মাথা রেখে একটু শান্তিতে চোখটা বন্ধ করে ঘুমোতে পারি।আমি কখনোই এমন একটা কাঁধ পাইনি যেখানে আমি ক্লান্ত হলে নিশ্চিন্তে আমার মাথাটা একটু এলিয়ে দিতে পারি।"

"পাশে তো বেশ শক্তপোক্ত একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।সামান্য এই মাথার ভারে সে নুইয়ে পড়বে না।চাইলে নিজের ক্লান্তি ভাবটা একটু কমাতে পারেন।"

নির্ভীক এর কথার মানেটা বুঝতে পেরে প্রভা হালকা হাসলো।নির্ভীকের তুলনায় উচ্চতায় সে বেশ অনেকটাই খাটো।ফলস্বরূপ নির্ভীকের কাঁধে মাথা রাখতেও তার খুব একটা কষ্ট হলো না।নির্ভীকের হাতটা পেঁচিয়ে ধরে ওর কাঁধে মাথা রাখলো।সত্যিই আজ প্রথম প্রভার একটু শান্তি অনুভূত হল।এই অনুভূতিটা এর আগে ওর কক্ষনো হয়নি।কখনো এমন একটা ভরসা যোগ্য কাঁধও পায়নি।কোন পুরুষের এতটা কাছাকাছিও প্রভা কক্ষনো যায়নি।এই প্রথম কোন পুরুষকে ভরসা করে তার হাতটা শক্ত করে ধরেছে।এই একটা মানুষের উপর এতটা ভরসা প্রভার কি করে এলো সেটা সে জানে না। শুধু মনে হয় গোটা দুনিয়া ওকে ছেড়ে চলে গেলেও এই মানুষটা যাবে না।এই পৃথিবীর সবাইকে অবিশ্বাস করা গেলেও এই একটা মানুষকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।এই একটা মানুষকে ভালোবাসতে প্রভা কখনো ক্লান্ত হবে না।যতই ভালোবাসে তবুও কম মনে হয়।

"আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো ঊষাকে হ্যাঁ করে দেবেন।"

নির্ভীক শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

"কেন মনে হয়েছিল?"

"ঊষা তো দেখতে অনেক সুন্দর,অনেক স্মার্ট।অনেক বড়লোকের মেয়ে।ওর একটা সুন্দর পরিবার আছে।"

"পৃথিবীর সব নারীই সুন্দর।কিন্তু জানেন তো পুরুষের চোখে সেই সুন্দর নারীদের মধ্যে থেকেও একজন শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী থাকে।তার ব্যক্তিগত চাঁদ।চাঁদ একটাই হয় কিন্তু তারা হয় অসংখ্য।সেজন্যই তো চাঁদের মূল্য বেশি। এখন চাঁদ যদি তারাদের সাথে নিজের তুলনা করে তাহলে তো চলবে না তাই না?তারারা তারাদের মত সুন্দর চাঁদ চাঁদের মতন সুন্দর।পার্থক্য শুধু এতোটুকুই একজনের চোখে সেই তারা গুলোর সৌন্দর্য ছাপিয়ে কেবলই চাঁদের সৌন্দর্যটাই পরিলক্ষিত হয়।"

"উৎসব ভাইয়ার ব্যাপারটা নিয়েও একটু চিন্তায় ছিলাম।যতই হোক ওনার বোন হয়।"

"আর আমি ওর ভাই।আমাকে ও কষ্ট দেবে না কখনো নিশ্চিন্তে থাকুন।"

আরো টুকটাক বিষয়ে অনেক কথা হলো আজ নির্ভীক প্রভার মাঝে।প্রতিদিনের তুলনায় নির্ভীক কে আজ বেশ হাস্যজ্জ্বল দেখালে।ও কখনো এতটা হাসে না।সব সময় কেমন যেন একটা গম্ভীর চোখ মুখে থাকে।প্রথম দেখায় যে কেউ ওর সাথে কথা বলতে ভয় করবে।কিন্তু আজ গম্ভীরতার আড়াল থেকে বেরিয়ে প্রভার সামনে প্রকাশ পেল হাস্যজ্জ্বল নির্ভীর চৌধুরীর চেহারা।হাসলে যাকে অপূর্ব সুন্দর লাগে।এই মানুষের হাসিকেই তো আলাদা করে ভালোবাসা যায়।এই হাসিটা দেখেই প্রভা কয়েক বছর অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারবে।

"আজ যেমন হাসছেন সবসময় এমন সুন্দর করে হাসতে পারেন না?"

"আজ তো আমার কাছে হাসার কারণ আছে কিন্তু অন্য দিনগুলোতে তো থাকে না।"

"একটা ছোট্ট কারণ হলেও থাকে কিন্তু আপনি হাসতে চান না।গোমরামুখো কোথাকার।এমন সুন্দর করে সব সময় হাসবেন।হাসলে আপনাকে বেশ লাগে দেখতে।আপনাকেই প্রথম দেখলাম যে হাসতে পছন্দ করে না।"

নির্ভীক পুনরায় শব্দ করে হেসে উঠলো।এবার বেশ অনেকটা সময় নিয়ে সে বিরতিহীন ভাবে হাসলো।প্রভা একটু অবাক হলো।হঠাৎ নির্ভীকের এই হাসিটা যেন মিথ্যে লাগল।যেন নির্ভীক কিছু আড়াল করতে চাইছে। এতটা সময় ধরে নির্ভীক যখন হাসছিল তখন মনে হয়নি যে সেই হাসির মাঝে কোন মিথ্যে আছে কিন্তু এই হাসির মাঝে লুকানো কিছু বেদনা যেন প্রভা টের পেল। যেন নিজেকে নিজে তাচ্ছিল্য করে হাসছে।হাসতে কে না চায়?সবাই হাসতে চায় কিন্তু সবার কাছে তো হাসার মতন যথেষ্ট কারণ থাকে না।এদিকে নির্ভীকের হাসি থামার নামই নিচ্ছেনা।প্রভা সন্দেহী কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

"আপনি সত্যি মন থেকে হাসছেন না জোর করে হাসছেন বলুন তো?আপনি তো কখনো এতটা হাসেন না।আপনার মতন গম্ভীর মানুষের মুখে যে এতটা হাসিও বেমানান লাগছে আমার।"

নির্ভীক হাসি থামিয়ে নিজেকে ধাঁতস্থ করে সুরেলা কন্ঠে কয়েক লাইন গান গাইলো,

❝তুমি দেখছো তাকে,ভাবছো যাকে

সে আসল মানুষ নয়!

সে বেঁচে আছে শহরের এক কোণে,

সে মৃত মানুষের চিৎকার শোনে,

প্রতিদিন।❞

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প