ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ২৮

🟢

চোখ মেলে তাকাতেই আশেপাশে অনেকগুলো পরিচিত মুখ দেখতে পেল প্রভা।সবাই কি করে এলো?নির্ভীক,উৎসব,তিসান তিনজনেই এসেছে।নির্ভয়ও আসতো কিন্তু সে তো নিজেই অসুস্থ।পা নিয়ে ঠিকঠাক হাঁটতেও পারে না।প্রভা কে চোখ খুলতে দেখেই সবার মুখমন্ডলে একটা শান্তির ছাপ ফুটে উঠলো।সবাইকে দেখতে পেয়ে প্রভাও যেন একটু শান্তি পেল।এতগুলো আপন মানুষ আছে প্রভার?এত মানুষ প্রভার চিন্তায় এখানে ছুটে এসেছে ওকে দেখতে?নির্ভীক একটু ঝুঁকে গিয়ে ধীর কন্ঠে প্রভাকে জিজ্ঞেস করল,

"এখন শরীর ভালো লাগছে?আগের থেকে ভালো?"

প্রভা দূর্বল কন্ঠে জবাবে বলল,

"ঠিক আছি।"

"কিছু খাবেন?"

প্রভা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো।নির্ভীক আরো কিছু জিজ্ঞেস করলো।নির্ভীকেরও এমন ধীর কন্ঠস্বর শুনে উৎসব প্রচন্ড বিরক্ত হলো।প্রভা নাহয় অসুস্থ কিন্তু নির্ভীক তো আর অসুস্থ না।বিরক্তি মাখানো কন্ঠে নির্ভীক কে বলল,

"এ ভাই তুই এত আস্তে কথা বলছিস কেন?মনে হচ্ছে আমরা চুরি করতে এসেছি তুই জোরে কথা বললে ধরা পড়ে যাবো।আরে অসুস্থ মানুষের সাথে যদি তুই রোগীর মতন করেই কথা বলিস তাহলে উনি নিজেকে সুস্থ করে তুলবেন কি করে?একটু চাঙ্গা ভাবে কথা বল যেন উনিও চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারেন।"

উৎসবের কথা শুনে নির্ভীক বলল,

"আমি তো জানি না কিভাবে চাঙ্গা করে কথা বলে অন্যকে চাঙ্গা করে তুলতে হয়।তুই বরং বল।"

"ধ্যাত!তোকে দ্বারা আর কিছু হয় না দেখি সর।মাস্টান্নি ও মাস্টান্নি।তা শরীর স্বাস্থ্যের খবর ভালো তো?ফার্স্ট ক্লাস,সেকেন্ড ক্লাস না থার্ড ক্লাস বর্তমানে কোন ক্লাসে আছেন বলুন?"

উৎসবের প্রশ্ন শুনে প্রভা হেসে ফেলল।শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে ফলস্বরুপ তার হাসতেও কষ্ট হচ্ছে।কিন্তু উৎসবের এমন কথায় না হেসে পারল না।প্রভাকে হেসে উঠতে দেখে উৎসব হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,

"দেখেছিস এক প্রশ্নেই মাস্টান্নি চাঙ্গা হয়ে গেছে। এভাবে রোগীদের সাথে কথা বলতে হয় না হলে তুই যেমন ভাবে কথা বলছিলি মনে হচ্ছিলো যে মাস্টান্নির শরীরে পৃথিবীর সব রোগ একসাথে বাসা বেধেছে।"

তিসান তীর্যক দৃষ্টিতে উৎসবের দিকে তাকিয়ে আছে।সচরাচর তিসানের ধারনা কিংবা সন্দেহ কোনটাই ভুল হয় না।উৎসব তিসানের সেই দৃষ্টি খেয়াল করল।তিসানের সেই দৃষ্টিতে উৎসব বেশ ভয় পায়।কেমন যেন ভেতরের সবকিছু গুলিয়ে ফেলে।চুপচাপ দু কদম পিছিয়ে এসে তিসানের বরাবর দাঁড়ালো।সৌমি আর নির্ভীক প্রভার সাথে আপাতত টুকটাক কিছু কথাবার্তা বলছে।

"এই মা/রা খাওয়া প্রাণী এত কি দেখছো আমার দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ?পছন্দ-টছন্দ হয়ে গেল নাকি আবার? এসব ভেবে লাভ নেই কিন্তু।আমার সম্পূর্ণ ইন্টারেস্ট শুধুমাত্র মেয়েদের উপর,ছেলেদের উপর কোন ইন্টারেস্ট নেই বুঝতে পেরেছো?"

তিসানের দৃষ্টি কোণমতেই উৎসবের ওপর থেকে সরছে না।উৎসব এখন কোনমতে শুধু কথাগুলো এড়িয়ে যেতে চাইছে।অন্য প্রসঙ্গ তুলতে চাইছে।তিসান ভ্রুঁ জোড়া কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

"ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তুমি নিজেকে বিজয়ী ভেবে হাসছো?যে যুদ্ধে নামতে চাইছো সেখানে প্রতিপক্ষ কিন্তু তোমার হৃদয়ে বাস করে।আবার সেই হৃদয়েই হৃদয় হরনীকে আনার জন্য যুদ্ধে নামতে চাইছো।এখনো কি বুঝতে পারছ না যে তুমি হেরে বসে আছো?তবে কোন বিজয়ের স্বপ্নে তোমার মুখে এই হাসি?"

এই সূক্ষ্ম কথাগুলোর অর্থ সুক্ষ্ম ভাবে উৎসব বুঝতে সক্ষম হলো না।ফলস্বরূপ তিসানকে প্রশ্ন করল,

"কিসের ধ্বংসের কথা বলছো তুমি আর কিসের যুদ্ধ? কে হৃদয়ে থাকে আবার কোন হৃদয় হরণীর কথা বলছো তুমি?"

তিসান বক্র হেসে বলল,

"উত্তর জেনেও প্রশ্ন করছো।তুমি অবুঝ নও তারপরও অবুঝ সাজছো।এইখানে লুকিয়ে লাভ হবে না ভায়া।আমি তো ভাঙা হৃদয় নিয়ে বাঁচি তাই কার হৃদয় ভাঙতে পারে সে খবরও রাখি।শুধু একটা ছোট্ট টোকা লাগার অপেক্ষা।তাহলে নতুন করে একসাথে বেশ কয়েকটা হৃদয় ভাঙবে।"

____________

দুদিন হলো প্রভা কলেজে আসে না।হাসপাতাল থেকে সেদিনই বাড়ি ফিরে গিয়েছিল।শরীরটা দুর্বল থাকায় আর কলেজে আসেনি।এই কদিন অবশ্য সৌমি বাড়িতে থাকতে পারেনি।দুটো প্রাইভেট পড়ায় সেটা নিয়মিত পড়াতে হয়েছে,কলেজেও আসতে হয়েছে।এছাড়া ওদের দুজনের ছোট্ট একটা ব্যবসা আছে।কয়েকদিন টাকার জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল।কিন্তু আবার এক সপ্তাহ হলো চালু করেছে।সে সবেরই কিছু কেনাকাটা করতে,পার্সেল ডেলিভারি দিতে সৌমিকে বের হতে হয়।কলেজে এসে আজ ভাবলো একবার নির্ভীকদের সাথে দেখা করবে।সেদিন কত উপকার করলো,নিয়মিত প্রভার খোঁজখবর নেয়,কিছু প্রয়োজন কিনা সেসব জিজ্ঞেস করে।দুদিনই বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছে।এই দুদিনে সবার সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে সৌমির।

সবার আগে উৎসব দেখতে পেল সৌমিকে।হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে সৌমি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

"ওহে পিপীলিকা হঠাৎ তোমার আগমন?"

"কলেজে এসেছিলাম তাই ভাবলাম আপনাদের সবার সাথে দেখা করে যাই।কেমন আছেন আপনারা?"

সবাই সৌমির প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পাল্টা ওকে প্রশ্ন করল।সৌমি উত্তর দিতেই নির্ভীক পুনরায় প্রশ্ন করল,

"অনুপ্রভা এখন কেমন আছেন?ওষুধ নিয়মিত খাওয়াচ্ছেন তো?"

"হ্যাঁ খাওয়াচ্ছি তো।ওর একটা ওষুধ শেষ হয়ে গেছে।মূলত ঔষধ কেনার জন্য আজকে আমার বাইরে বের হওয়া।"

"ও আচ্ছা তা কিনেছেন ওষুধ?"

"না কিনিনি।হুট করে নামটা ভুলে গেলাম।প্রভার থেকে শুনতে হবে।"

সৌমির কথা শুনে উৎসব ফিক করে হেসে ওঠে বলল,

"দেখো পিপীলিকা আবার মানুষ বাঁচানোর ওষুধ কিনতে গিয়ে ইঁদুর মা/রা ওষুধ কিনে নিয়ে যেও না।"

সৌমি একটু ভাবুক হয়ে বলল,

"আমার নাম মনেই ছিল যেই আপনারা জিজ্ঞেস করলেন অমনি ভুলে গেলাম।"

নির্ভীক বলে উঠলো,

"এখনি ফোন করে জিজ্ঞাসা করুন কোন ওষুধ কিনতে হবে।পাশে একটা ফার্মেসি আছে ওখান থেকে কিনে এনে দিচ্ছি।নাহলে আপনি আবার ভুলে যেতে পারেন।"

নির্ভীক এর কথা শুনে সৌমি প্রভাকে কল করে ওষুধের নামটা শুনলো।ফোনটা রেখে নির্ভীক নামটা জিজ্ঞেস করতেই সৌমি বলতে নিয়ে থেমে গেল।কি যেন নাম বলল প্রভা সৌমি এতোটুকু সময়ের মাঝে আবার ভুলে গেছে। পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না।অসহায় মুখ করে বলল,

"আমি না আবার ভুলে গেছি।মানে শুনতে শুনতেই ভুলে গেলাম।এত তাড়াতাড়ি তো আমি ভুলি না।"

সৌমির কথা শুনে উৎসব কপাল চাপড়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

"বনি তোমার তো বিয়ে হলে তুমি বাসর ঘরে গিয়ে তোমার সোয়ামি কে দেখে বলবা যে এইটা কে?মানে তোমার সোয়ামির বিরুদ্ধে সোজা কিডনাপিং এর কেস দিয়ে দিতে পারো তুমি এতটাই ভয়ানক।"

"না আমি মানুষ ভুলি না।ওনাকে ভুলবো না"

"ও তার মানে জাতে মাতাল তালে ঠিক।সব ভুললেও সোয়ামিকে ভোলা যাবে না তাইতো?"

নির্ভীক বিরক্তিকর কণ্ঠে উৎসবকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

"দুটো মিনিটের জন্য তোর মুখটা বন্ধ রাখ।আমি শুনছি ফোন করে।"

নির্ভীক প্রভাকে ফোন করতে নিলে পাশ থেকে তিসান ওষুধের নামটা বলে উঠলো।তিসান নামটা বলার সাথে সাথে সৌমি মনে পড়ার ভঙ্গিতে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,

"হ্যাঁ হ্যাঁ এই নামটাই বলেছিল,এবার মনে পড়েছে।কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?"

"যখন কথা বলছিলে শোনা যাচ্ছিল,তখনই শুনেছি।যাইহোক যাও এখনি ওষুধ টা কিনে নিয়ে এসো।না হলে সত্যিই উৎসবের কথা মতন শেষে ওষুধের নামটা ভুলে গিয়ে ইদুর মা/রা ওষুধ নিয়ে বাড়ি চলে যাবে।"

নির্ভীক উঠে দাঁড়িয়ে সৌমিকে বলল,

"আপনি দাঁড়ান আমি নিয়ে আসছি।"

নির্ভীক ওষুধ এনে সৌমির হাতে ধরিয়ে দিলে সৌমি ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিতে ধরলে নির্ভীক মানা করলো।

"টাকা কেন নেবেন না?আপনি টাকা না নিলে আমি ওষুধও নেব না।"

সৌমির কথার প্রেক্ষিতে নির্ভীক বলে উঠলো,

"আরে অনুপ্রভার টাকা দিয়ে ওর ওষুধ কিনে দিচ্ছি।আসলে ওনার থেকে আমার কিছু টাকা ধার নেওয়া ছিল ফেরত দেওয়া হয়েছিল না।আমার হাতে এখন টাকা আছে তাই ভাবলাম দিয়ে দেই।"

সৌমি সন্দেহী কন্ঠে বলল,

"সত্যি বলছেন তো?আমার কাছে কিন্তু টাকা আছে।"

"আরে মিথ্যে বলতে যাব কেন আপনাকে?আমি নিজে এত বড়লোক নাকি যে আপনাদের টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারবো?সত্যি বলছি ওনার থেকে ধার নিয়েছিলাম। "

নির্ভীকের কথা শুনে সৌমি ভাবলো সত্যি তো নির্ভীকদের হাতের অবস্থাই তো অতটা ভালো না।ও আর কি করে সাহায্য করবে।

"আপনার হাতের অবস্থা যখন ভালো না তাহলে এখন টাকাটা দিতে হবে না।আমি আজ টাকা পেয়েছি,এটা দিয়ে ওষুধ কিনে নিয়ে যাচ্ছি আপনি বরং এই টাকাটা দিয়ে কিছুদিন চালান।পরে দিয়ে দেবেন।"

সৌমির কথা শুনে নির্ভীক হালকা হেসে বলল,

"সমস্যা হবে না আপনি নিয়ে যান।"

সৌমি আর কিছু বলল না।ওষুধটা নিয়ে চলে যেতে ধরলে তিসান পিছন থেকে নাম ধরে ডেকে উঠলো।

"বাড়ির ঠিকানা মনে আছে?যেতে পারবে নাকি রেখে আসতে হবে?"

সৌমি মাথা নাড়িয়ে বলল,

"হ্যাঁ হয়ত যেতে পারবো।আমি চলে যাবো।"

তিসান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

"হয়ত আবার কি?ঠিক করে বলো যেতে পারবে নাকি পারবে না?মাঝ রাস্তায় হারিয়ে গেলে এবার আর খোঁজ নাও পেতে পারি।"

"আমি কি করে বলবো যে ভুলে যাবো কিনা?এখনো তো মনে আছে ঠিকানা।পরে ভুলে যেতেই পারি।"

"বুঝেছি।চলো তোমাকে রেখে আসি।সাথে লম্বা চুল কে দেখেও আসবো।ভায়ারা তোমরা কেউ যাবে?"

নির্ভীক-উৎসব কেউই এখন যেতে চাইলো না।নির্ভীকের কাজ আছে আর উৎসব তিসানের সাথে প্রভাকে দেখতে কোনো মতেই যাবে না।তিসানই সৌমি কে নিয়ে একাই গেল।মেইন রোডে এসে রাস্তা পার হওয়ার সময় তিসান বলল,

"রাস্তা পার হতে পারো?"

সৌমি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালো।

"কিছুই তো পারো না দেখছি,একা একা বের হয়েছো কোন সাহসে?রোজ রোজ কি আমি বাড়ি পৌঁছে দেব নাকি?"

সৌমি কিছু বলল না।তিসান গম্ভীর কন্ঠে বলল,

"আমার পিছন পিছন এসো।"

"এভাবে রাস্তা পার হওয়া যায় না।প্রভা হাত ধরে রাস্তা পার করায় আমাকে।"

তিসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সৌমির হাত ধরে রাস্তা পার করলো।সৌমির অন্য কোনো দিকে খেয়াল নেই।মুগ্ধ নয়নে তিসান কে দেখছে।বিশ্বাস আছে এই মানুষটার ওপর যে ওকে ঠিকঠাক ভাবে বাড়িতে পৌঁছে দেবে।মনে মনে বলল,

"আমি তো রাস্তা পার হতে পারি।বাড়ির ঠিকানাও আমার নোটপ্যাডে লেখা আছে।তবুও আপনার সাথে আসবো জন্য মিথ্যে বললাম।আর এই যে বললেন না রোজ রোজ বাড়ি পৌঁছে দেবেন না।কেন?দিলে কি হবে?এই দায়িত্বটা নিলে কি খুব ক্ষতি হবে?"

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প