ভ্রমর কইও গিয়া

পর্ব - ৩৭

🟢

বারান্দার দরজার সাথে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ঊষা।তার সম্মুখে বিছানার উপর বসে আছে এক সুঠাম দেহি পুরুষ।পরনে তার ফর্মাল পোশাক।দেখে মনে হচ্ছে অফিস থেকে সোজা এই বাড়িতে চলে এসেছে।হাতের বড় ডায়ালের ঘড়িটার দিকে সমানে চোখ বোলাচ্ছে।চোখে তার চিকন ফ্রেমের চশমা।চশমার পিছনে থাকা তিক্ষ্ম ধারালো দৃষ্টিটা ঊষার চোখ তুলে তাকানোর ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।কেন যেন ঊষার খুব ভয় করছে এই মানুষটাকে দেখে।মুখের আবভাব ভীষণ গম্ভীর।প্রায় দশ মিনিট হলো এই ঘরে এসেছে আলাদা করে কথা বলার জন্য অথচ এখন অব্দি কেউ একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি।অবশেষে আর অপেক্ষা করতে না পারে নাবিল নিজ থেকেই বলে উঠল,

"বয়স তো খুবই কম এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাইছো কেন?"

এতক্ষণে ঊষা চোখ তুলে নাবিলের দিকে তাকালো।দৃষ্টি তার শান্ত।বরাবরের মতো তার কন্ঠও শান্ত।

"আমি তো বিয়ে করতে চাই না এখন।বাড়ি থেকে জোর করে দেওয়া হচ্ছে।"

নাবিল ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

"তুমি বিয়ে করতে চাও না তাহলে বিয়েটা আটকাতে পারছ না?তোমার নিজের কোন মতামত নেই?"

"আমার মতামতের গুরুত্ব কেউ দিচ্ছে না।"

"বিয়ে না করতে চাওয়ার কারণ?"

"কিছু না।"

ঊষার কিছু না উত্তরেই নাবিল যেন বেশ অনেক কিছু বুঝে ফেলল।কম বয়সি একটা মেয়ে যেহেতু বিয়ে করতে চাইছে না তার পেছনে দুটো কারণ থাকতে পারে।এক,সে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত পড়াশোনা করতে চায়,নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়।নয় তো অসময়ে কাউকে মন দিয়ে বসেছে।যদি ক্যারিয়ারের চিন্তায় বিয়েতে অমত থাকতো তাহলে এতক্ষণে হাত পা ধরে কান্নাকাটি শুরু করতো।কিন্তু যেহেতু কারণ কিছু না বলছে তার মানে কারণটা বলতে দ্বিধা হচ্ছে।আর এতেই যেন নাবিল নিজের উত্তরটা পেয়ে গেল।

"ভালোবাসো কাউকে তাই না?"

ঊষা বিস্ফোরিত নয়নে নাবিলের দিকে তাকালো।মৃদু কম্পিত কন্ঠে বলল,

"আপনাকে কে বলল?"

"কেউ বলেনি।"

"তাহলে আপনি বুঝলেন কি করে?"

"বয়সে তোমার থেকে বেশ অনেকটাই বড় আমি।সে হিসেবে জ্ঞান বুদ্ধিও তোমার থেকে অনেকটাই বেশি।বুঝে ফেলেছি।তা সে ছেলেটা কে?কি করে?"

"সেসব আপনি জেনে কি করবেন?আপনি তো এখানে আর আমি কাকে ভালোবাসি তার পরিচয় জানতে আসেননি।পরিচয় জানার পর কি বিয়েটা ভেঙে দেবেন?দেবেন না তো।তাহলে অযথা এসব প্রশ্ন করে আমাকে আরো দুর্বল করছেন কেন?"

"ভাঙতেও পারি।দেখো তোমার কাছ থেকে তার পরিচয়টা শোনার পর যদি আমার মনে হয় যে তার উপর তোমার দায়িত্বটা দেওয়া ঠিক হবে তাহলে আমি এই জায়গাটা ছেড়ে দিতেও পারি।কিন্তু যদি আমার মনে হয় যে তুমি ভুল পথে পা বাড়িয়েছো তাহলে তেমন কিছুই করবো না।এখন সবটাই নির্ভর করছে তুমি কাকে ভালোবেসেছো তার উপর।"

ঊষা আলতো হেসে বলল,

"আমি যাকে ভালোবেসেছি তার কোন খুঁত ধরার ক্ষমতা আপনার কেন কারোর নেই।সে নিখুঁত,নির্ভেজাল।তার কোন তুলনা নেই,তার সমকক্ষ কেউ নেই।তার কাছে সমস্ত পুরুষ হেরে যাবে।এই পৃথিবীর সব কিছু ভুল হতে পারে কিন্তু উনি ভুল হতে পারেন না।"

"এত বিশ্বাস!তারও কি তোমার উপর এতটা বিশ্বাস আছে?"

এ পর্যায়ে ঊষার মুখ থেকে হাসি উড়ে গেল।মলিন কণ্ঠে বলল,

"সে যদি আমায় ভালোবাসতো তাহলে কি আর আজ আমি আপনার সামনে থাকতাম?"

"তাকে জানিয়েছিলে না জানাওনি?"

"জানিয়েছিলাম।জানেন তো প্রথম প্রথম যখন তাকে আমি নিজের মনের কথাটা জানিয়েছিলাম তখন সে আমায় না করার কোন কারণ দেখাতে পারেনি।শুধু একটাই কথা বলতো আমায় উনি সেই নজরে দেখেননি।কিন্তু কিছুদিন আগে যখন আমি নিঃস্ব হাতে ওনার কাছে ওনাকে ভিক্ষে চাইলাম তখন উনি আমাকে কারণটা জানালেন।আমি যেমন ওনাকে ভালোবাসি উনিও তেমনি নিজের সবটা দিয়ে অন্য কাউকে ভালোবাসে।ওনার কল্পনার সাথে নাকি আমার একটুও মিল নেই।উনি যেমন কাউকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে চান তার ধারের কাছেও আমি নেই।"

কথাটা বলতে ঊষার গাল বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।নাবিলের একটু খারাপ লাগলো মেয়েটার জন্য।মেয়েটা দেখতে ভারী মিষ্টি।আচার ব্যবহারও দারুন। এমন একটা মিষ্টি মেয়েকে কেউ না ভালোবেসে থাকতে পারে?তাও আবার ঊষা নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল তাকে।

"ভুলে যাওয়ার চেষ্টা কর তবে ওনাকে।দেখো যেহেতু উনি তোমায় ভালোবাসেন না তুমি জোর করে ওনার জীবনে গেলেও ভালো থাকতে পারবে না কখনো।এখন ছোট আছো।ভালোলাগা আর ভালোবাসা দুটোই এক মনে হবে।এসব ফ্যান্টাসি মনের মাঝে কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক।"

"ফ্যান্টাসি কাকে বলছেন?ভালোবাসা ফ্যান্টাসি হয় না।হ্যাঁ মানছি আমার বয়স কম তাই বলে কি আমি ভালোবাসতে পারিনা?বয়সের সাথে ভালোবাসতে পারার কি সম্পর্ক এটা বলুন তো আমায়?আমি ওনাকে ভালোবাসি এটাই সবথেকে বড় সত্য,এর আগে আমার বয়সটাকে কেন এত বড় করে দেখছেন?মানে আপনার মতে যখন আমি প্রাপ্তবয়স্ক হব তখনই শুধুমাত্র আমি কাউকে ভালোবাসতে পারবো?তার আগে কারো প্রতি আমার ভালোবাসা মানে ফ্যান্টাসি?"

হুট করে ঊষা রেগে যাওয়াতে নাবিল একটু ভরকালো। না মেয়েটাকে যতটা শান্ত ভেবেছিল ততটাও শান্ত না। প্রয়োজনে মাঝে মাঝে অ/গ্নি স্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্ব/লে উঠতেও পারে।এমনকি সে আ/গুনে নাবিলের হৃদয়টাও পো/ড়াতে পারে।

"তোমার তেজ দেখে হলেও তার তোমার প্রেমে পড়া উচিত ছিল।যাক ভালোই হয়েছে সে তোমার প্রেমে পড়েনি।"

কথাটা বলে নাবিল বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে ঊষা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"এত কিছু শোনার পরেও বিয়েটা করবেন আপনি?"

নাবিল থামলো।ঠোঁট জুড়ে তার লেপ্টে আছে এক ধরনের রহস্যময় হাসি।পিছন ফিরে তাকিয়ে ঊষার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে পাল্টা ওকে প্রশ্ন করে বলল,

"বিয়েটা ভাঙার মতন কোন কারণ কি তুমি আমায় দিতে পেরেছো?"

"আমি তো অন্য একজনকে ভালোবাসি।আপনাকে আদৌ কখনো ভালোবাসতে পারব কিনা আমি জানিনা।"

"পারবে।যে তোমায় ভালোবাসেনি তাকে যখন ভালোবাসতে পেরেছো তাহলে যে তোমাকে ভালোবাসবে তাকেও অবশ্যই ভালোবাসতে পারবে তুমি।আর বিয়ের আগে এমন দু-একটা প্রেম ভালোবাসা সবার জীবনেই থাকে।আমারো একজনের সাথে সম্পর্ক ছিল,টেকেনি।এটা খুবই স্বাভাবিক।"

"এই বিয়েটা না করলে হয় না?"

ঊষা খুব কাতর কণ্ঠে নাবিলকে কথাটা বলল।সে তার এই কথার দ্বারা একটা নীরব মিনতি জানালো নাবিলের প্রতি।নাবিল স্মিত হেসে বলল,

"দেখো এমনটা তো নয় যে আমি এই বিয়েটা ভেঙে দিলে তুমি যাকে ভালোবেসো সে তোমায় বিয়ে করবে।আমি না হলেও ভবিষ্যতে কারো না কারো সাথে তোমার বাবা-মা তোমার বিয়ে অবশ্যই দেবে।তাহলে যখন অন্য একজনকে বিয়ে করতেই হবে সেক্ষেত্রে আমি মানুষটা হলে খারাপ হয় না।আমার সাথে তুমি ভালো থাকবে এটা আমি গ্যারান্টি দিতে পারি কিন্তু অন্যদের সাথে ভালো নাও থাকতে পারো।অন্তত আমার সাথে যতটা ভালো থাকবে ততটা বাকিদের সাথে থাকতে পারবে না।তাই বলছি,রাজি হয়ে যাও। বিয়ে যখন করতেই হবে তবে পাত্র হিসেবে আমি মন্দ না।আসছি।"

নাবিল চলে গেল।ঊষার ওর উপর রাগ হলো না। যেখানে নিজের বাবা-মাই ওর মনের কথা বুঝতে চাইছে না সেখানে বাইরের একটা মানুষের থেকে ও কিইবা আশা করবে?শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।নাবিল কেন যেন পুনরায় ফিরে এলো।তবে এবারে আর রুমের ভিতরে প্রবেশ করলো না।দরজায় দাঁড়িয়ে একবার ঊষা কে নাম ধরে ডাকলো।পুনরায় নাবিলের কণ্ঠস্বর পেতে চমকে সেদিকে তাকালো।নাবিল মুগ্ধ করার মতন হেসে বলল,

"তোমার শান্ত রুপটার থেকেও তোমার রাগী রুপটা বেশি সুন্দর।আশা করছি বিয়ের পরে আমার উপর মাঝেমাঝে রাগ দেখাবে।"

______________

আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন।যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।তাতে অবশ্য প্রভার যায় আসে না।বৃষ্টি এলে কি এমন হবে?হয়তো ভিজে যাবে,তার পরে হয়তো ঠান্ডা লেগে জ্বর আসবে,অসুস্থ হয়ে পড়বে,কষ্ট হবে।হোক না।এই মানসিক যন্ত্রণার থেকে সেগুলো নিশ্চয়ই কমই হবে।এই জায়গাটা প্রভার ভীষণ প্রিয়।নির্ভীক এর সাথে আগেও কয়েকবার আসা হয়েছে এই জায়গাটায়।শান্ত নদীটার দিকে তাকালে হৃদয়ে অদ্ভুত রকমের শীতলতা বয়ে যায়।মনটাও যেন শান্ত হয়ে যায়।তার মাঝে আজকের আবহাওয়াটা আরো সুন্দর।মেঘলা আকাশ,শান্ত নদী আর প্রকৃতির ঠান্ডা বাতাস প্রভার মনটা একটু হলেও যেন ভালো হয়ে উঠল এই সবকিছুতে।একটু পর যখন নির্ভীক আসবে তখন হয়তো পুরোটাই ভালো হয়ে যাবে।প্রভার অজান্তেই একটা মানুষ ওর মানসিক শান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।যাকে দেখলে আপনা আপনি প্রভার মুখে হাসি ফুটে ওঠে,যাকে দেখলে শান্তি অনুভূত হয়,যার সাথে কথা বললে মনের যন্ত্রণা কমে,যার হাতে হাত রাখলে একাকীত্ব দূর হয়,যার পাশে বসে থাকলে মস্তিষ্কের সকল দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়,যার কাঁধে মাথা রাখলে মনে হয় প্রভার কাছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ ধরা দিয়েছে।প্রভা একটু আগেই এসেছে।বাড়িতে কেমন যেন দম বন্ধ লাগছিল।নির্ভীক যে সময়টায় আসার কথা ছিল তাও অতিক্রম করে গেছে কিন্তু এখনো আসছে না।প্রভা ফোন দিয়েছিল ওকে কিন্তু ফোনটা বন্ধ দেখাচ্ছে।বসে থাকতে থাকতে প্রভা বিরক্ত হলো।উঠে দাঁড়িয়ে একাকী হাঁটতে লাগলো।আশেপাশে তেমন কোন মানুষের উপস্থিতির লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।হঠাৎ দু একজনের দেখা পাওয়া যায়।জায়গাটা অত্যন্ত নিরিবিলি আর শান্ত সেজন্যই বোধহয় এই জায়গাতে এলে প্রভা মানসিক শান্তি পায়।হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই প্রভার মনে হলো যে কেউ একজন ওর পিছনে হাঁটছে।এবং খুব শীঘ্রই সে মানুষটা প্রভার পাশে হাঁটা শুরু করলো।পাশে তাকিয়ে উপস্থিত মানুষটাকে দেখে চমকে দুহাত পিছিয়ে গেল প্রভা।এই নিরিবিলি জায়গায় এই মানুষটাকে দেখে প্রভার ভীষণ ভয় করছে।আশেপাশে কেউ নেই।নির্ভীক এখনো আসেনি। না জানি আবার কোন উদ্দেশ্যে এসেছে।ভয়ার্ত গলায় প্রশ্ন করল,

"আপনি এখানে কেন এসেছেন?"

ইশরাক কুটিল হেসে বলল,

"তোমার ভালোবাসা আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে সুন্দরী।তুমি তো একা তাই তোমায় একটু সঙ্গ দিতে চলে এলাম।তুমি মনে হয় কারো অপেক্ষা করছিলে?নিশ্চয়ই আমার অপেক্ষা করছিলে তাই না?"

"আজ অব্দি কোনদিনও আমি আপনার অপেক্ষা করেছি যে আজ করব?মিথ্যে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন।আমায় একটু শান্তিতে থাকতে দিন না।বিশ্বাস করুন আমার জীবনে কোন শান্তি নেই।ছোটবেলা থেকে পরিবার পাইনি,মা-বাবা পাইনি,কোন আত্মীয়-স্বজনের ভালোবাসা পাইনি,নিজের একটা বাড়ি পাইনি।একদিন বসে আরাম করে কাটাতে পারিনা এই ভয়ে যে পরের বেলায় কি খাবো?আমি খুব ক্লান্ত।আপনার সাথে এই লড়াইটা লড়ার মতন আমার মাঝে আর শক্তি নেই।আপনার পায়ে পড়ছি ছেড়ে দিন আমার পিছু।"

বিজ্ঞাপন

"আমি জানি তো সুন্দরী যে তোমার জীবনে কোন শান্তি নেই সেই জন্যই তো তোমায় বিয়ে করতে চাইছি। বিশ্বাস করো একবার আমায় বিয়ে করলে তোমার জীবনে আর কোন অশান্তি থাকবে না।আরে আমার অনেক টাকা পয়সা আছে,তোমায় রানী করে রাখবো।"

"চাইনা আমার আপনার টাকা পয়সা।আমি আপনার বাড়িতে রানী হয়ে থাকতে চাই না।দরকার পড়লে আমি গাছ তলায় থাকব তবুও যে আমার মানসিক শান্তির কারণ আমি তার সাথে থাকতে চাই।আপনি শুধুমাত্র আমার মানসিক অশান্তির কারণ।আপনি আমার জীবনের একটা বাড়তি ঝামেলা।আমার দৃষ্টি দেখেও বোঝেন না যে সেখানে আপনার জন্য শুধুমাত্র ঘৃণা বিদ্যমান?এতটা নির্লজ্জ কেন আপনি?"

ইশরাক শব্দ করে হেসে উঠলো।উন্মাদের মতন হাসছে সে।চোখ দুটো রাগের তোপে ধীরে ধীরে লাল বর্ণ ধারণ করলো।মুখ থেকে হাসি হারিয়ে গেল।চোয়াল জোড়া তার শক্ত হয়ে এলো।প্রভার দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"বিশ্বাস করো সুন্দরী ইচ্ছে করছে তোমায় ধাক্কা দিয়ে নদীর পানির মাঝে ফেলে চিরদিনের মত তোমার খেল খতম করে দেই।কেউ তোমার লা/শ খুঁজেও পাবে না। আর খুঁজে পেলেও বা আমার কি করবে?কিন্তু আমি পারব না এটা করতে।তোমায় ভালোবাসি তো।যদি আমার হাতে তোমার মৃ/ত্যু লেখা থেকেই থাকে তবে সেটা ইশরাক খানের বউ হওয়ার পর।তার আগে তুমি ম/রছো না।"

"আপনি কি পা/গল?মানসিক সমস্যা আছে আপনার তাই না?আপনি কি ভাবছেন আপনি জোর করবেন আর আমি রাজি হয়ে যাব?কবুল কিন্তু আমাকেই বলতে হবে।আর আপনাকে আগেও বলেছি দরকার পড়লে আমি নিজের জীবন নিজে শেষ করব তবুও আপনাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবোনা।"

হুট করে ইশরাক শক্ত হাতে প্রভার চোয়াল চেপে ধরল।প্রভা ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠলো।এতটাই জোরে চেপে ধরেছে যেন মনে হচ্ছে ইশরাকের নখগুলো প্রভার গালের মধ্যে গেঁথে যাবে।প্রভা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে কিন্তু ইশরাকের শক্তির সাথে পেরে ওঠা ওর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।ইশরাক দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"তুই কবুল বলবি না তো তোর জিভ টেনে আমি ছিঁড়ে ফেলবো।তুই কি ম/রবি?তুই যদি আমার না হয়েছিস তাহলে আমি তোকে কে/টে টুক/রো টুক/রো করে এই নদীতে ভাসিয়ে দেব আর বাকি অর্ধেক আমার কু/ত্তাকে খাওয়াবো।আর যার সাথে গাছ তলায় থাকার স্বপ্ন দেখছিস না তুই,আগে তো ওকে দেখে নেব।বকুলের পরিনীতি দেখেছিস না কি হয়েছে?ওকে তো খুব ঠান্ডা মাথায় মে/রেছি।কিন্তু তোর এই প্রেমিক কে রাস্তায় ফেলে মা/রবো।কুড়াল দিয়ে ওকে কো/পাতে কো/পাতে শেষ করবো।আর তারপর যদি তোকে না পেয়েছি তবে দুটোকে একসাথে ক/বর দেব।ক/বরে গিয়ে পিড়ীত করিস।"

নিজের কথা শেষ করে প্রভাকে এক প্রকার ছুঁড়ে মা/রলো।প্রভা কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে মাটির উপর উপুড় হয়ে পড়ল।ইশরাক হন হন করে হেঁটে সেখান থেকে চলে গেল।গাল দুটো ব্যাথায় টনটন করছে প্রভার।দু চোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।প্রভার রাগ হলো নিজের ভাগ্যের উপর,রাগ হলে সে জন্মদাতা পিতা মাতার উপর।কেন ওকে জন্ম দিতে গিয়েছিল ওরা?যদি আজ প্রভা জন্মই না নিত তাহলে তো এতগুলো মানুষের জীবনে এত অশান্তি হতো না।না ও নিজে এত কষ্ট পেতো।সেই মানুষগুলো তো জন্ম দিয়েই হারিয়ে গেছে আর প্রভাকে সেই জন্মের পর থেকে আজ অব্দি এতগুলো বছর ধরে একা লড়াই করে যেতে হচ্ছে।এতটা স্বার্থপর মানুষগুলো?একটা বারও প্রভার কথা ভাবলো না?

প্রভা খুব করে দুটো মানুষ আর নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করল।এই প্রতিদিনকার এত কষ্ট,ঝামেলা, মানসিক অশান্তি,দুশ্চিন্তা,ওর জন্য অন্যদের জীবনে তৈরি হওয়া অশান্তি এসব আর ভালো লাগছে না।যে মেয়েটা খুব করে বাঁচতে চায় সে আজ মৃ/ত্যুকে ডাকছে।মনে হচ্ছে সব কিছুর সমাধান তার মৃত্যু।

______________

জানালার সাথে লাগোয়া কাউচের উপর বসে গিটারটা নাড়াচাড়া করছে উৎসব।আজ আবার অনেক দিন পর গিটারটা হাতে নিল।নিজের মন মেজাজ নিয়ে বড় বিভ্রান্তিতে আছে আজ উৎসব।বুঝতে পারছে না যে তার মনটা ভালো না খারাপ।মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে কারো অনুপস্থিতি উৎসবকে খুব করে পী/ড়া দিচ্ছে।কখনো আবার নিজে নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে না উৎসব ঠিক আছে।একটু আগে গান গাইতে মন চাইছিল এখন আবার একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না গান গাওয়ার।এ কেমন দোটানার মাঝে যে উৎসব পড়েছে বুঝতে পারছে না।

উৎসবের এসব ভাবনার মাঝেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো।স্ক্রিনে মাস্টান্নি নামটা দেখতেই উৎসবের চক্ষু চরক গাছ।আদৌ কি এটা সম্ভব?প্রভা কিনা নিজ থেকে উৎসব কে কল করেছে এই দিনটাও উৎসবকে দেখতে হলো?ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে অপর পাশে থাকা প্রভাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"মাস্টান্নি সত্যিই আপনি আমায় কল করেছেন নাকি ভুল করে আমার কাছে কল চলে এসেছে বলুন তো?আপনি সজ্ঞানে থাকলে তো আমার কথা মনে পড়ার কথা না।"

প্রভা মৃদু ইতস্তত কন্ঠে বলল,

"সত্যি বলতে ভাইয়া আপনার কাছে একটা দরকারে ফোন করেছি।"

উৎসব হাসলো।তার সেই হাসি ছিল তাচ্ছিল্যের।সেই হাসিটা প্রভা দেখতে পেল না।উৎসবের সেই হাসির মাঝে যে ঠিক কতটা কষ্ট ছিল,কতটা বুকের হাহাকার বেরিয়ে এলো সেটা যদি প্রভা একবার বুঝতো তাহলে এরপর থেকে অন্তত সপ্তাহে একবার ফোন করে উৎসবের খোঁজ নিত।কিন্তু আফসোস প্রভা দেখলেও না আর না উৎসবের খোঁজ নেওয়ার কোন তাড়া থাকবে।

"তাইতো বলি এমনি এমনি কি আর আমার কথা মাস্টান্নির মনে পড়বে।আমি তো আর এত গুরুত্বপূর্ণ কেউ না।বলুন মাস্টান্নি।আপনার জন্য এই বান্দা সবসময় হাজির।"

"আসলে দুপুরের পর থেকে নির্ভীক কে ফোনে পাচ্ছি না।একটা দরকারে ওনার সাথে দেখা করার কথা ছিল। আমি গিয়ে অপেক্ষা করে চলে এসেছি কিন্তু উনি আসেননি।ফোনটাও বন্ধ দেখাচ্ছে।আপনি কি জানেন উনি কোথায়?আসলে কোন বিপদে পড়লেন কিনা চিন্তা হচ্ছিল সেজন্য আপনাকে আর কল না করে থাকতে পারলাম না।"

"হ্যাঁ।আমিও ওর ফোন অনেকক্ষণ ধরে বন্ধ পেয়ে চিন্তায় থাকতে না পেরে ওর বাড়ি গিয়েছিলাম।ওকে বাড়িতে অবশ্য পাইনি।ওর বাবা বলল যে কিনা কি সমস্যা হয়েছে ওদের বাড়িতে।আমাকে তো আর কারণটা বললো না।তাই আমি আপনাকে নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছিনা কি সমস্যা হয়েছে।"

"ওহ্।ওনার কোন খবর পেলে আমাকে জানাবেন কেমন?আর যদি ওনার সাথে কথা হয় তাহলে আমাকে একবার কল করতে বলবেন।আর আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত ভাইয়া।ভালো থাকবেন।রাখছি।"

"শুধু এতোটুকু জানার জন্য ফোন করেছিলেন?একটা বার আমার খোঁজটা অন্তত নিতে পারতেন মাস্টান্নি।ভালো লাগতো।"

প্রভা জিভে কা/মর বসালো।নির্ভীকের চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিল যে একবার ওর এই কথাটা মাথায় আসেনি যে সৌজন্যতার খাতিরে হলেও উৎসবকে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত যে ও কেমন আছে।অপরাধী কণ্ঠে বললো,

"দুঃখিত ভাইয়া।আসলে ওনার চিন্তায় মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে।বলুন কেমন আছেন আপনি?"

উৎসব আবারো তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

"থাক বাদ দিন।একটা ছোট্ট প্রশ্ন করতে পারি আপনাকে?"

"হ্যাঁ বলুন।"

"আমার উপর আপনার এত অনীহা কেন?"

কি নিদারুন আফসোস আর কাতরতা প্রকাশ পেল উৎসবের সেই কন্ঠে।প্রভার থেকে একটু গুরুত্ব পাওয়ার জন্য যেন হৃদয়টা ছটফট করছে।নিস্তেজ প্রাণটা সতেজ হতে চাইছে প্রভার একটু গুরুত্ব দিয়ে।কিন্তু প্রভার কি এসবের খোঁজ আছে?এই যে উৎসবের মন খারাপ ওর কন্ঠ শুনে কি প্রভা একটুও আন্দাজ করতে পারল?না পারেনি।যদি উৎসবের জায়গায় মানুষটা নির্ভীক হতো তাহলে শুরুতেই কন্ঠ শুনেই আন্দাজ করে ফেলত যে নির্ভীক ভালো নেই।

উৎসবের এমন প্রশ্নে প্রভা একটু চমকালো।

"অনীহা কেন বলছেন ভাইয়া?হ্যাঁ এটা ঠিক প্রথম প্রথম আপনাকে আমার তেমন একটা ভালো লাগতো না।কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি।আপনি মানুষটা কেমন,আপনাকে খুব গভীরভাবে জানতে শিখেছি আমি।আপনার সাথে কম কথা বলার কারণ আমি এখনো অতটা মন খুলে আপনার সাথে কথা বলতে পারি না।এটা আপনার প্রতি অনীহা না ভাইয়া এটা আমার ব্যর্থতা যে আমি নিজেকে এখনো আপনার মতন একজন প্রাণোচ্ছল মানুষের সাথে কথা বলাতে মানিয়ে নিতে পারিনি।"

"আপনার ব্যর্থতা কেন বলছেন?আমি মানুষটাই এমন যাকে কেউ সহজে আপন করে নিতে পারে না।আপনাকে কিন্তু আমি দোষ দিচ্ছি না।জানেন তো আমি যেমন আমাকে তেমনভাবে যদি কেউ আপন করে নিতে পারে তাহলে সেটা একমাত্র নির্ভীক।বাকি সবাই আমায় পরিবর্তন করে আপন করতে চায়।আমি যেমন তেমনভাবে আমায় কেউ ভালোবাসতে পারে না আর না আমি কারো জন্য নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করি।সেজন্যই বোধ হয় দিনশেষে কারা আমাকে ভালোবাসে সেই তালিকায় আমি শুধু এক নির্ভীকের নামটাই দেখতে পাই।"

উৎসবের কথাগুলো শুনে প্রভার কেন যেন খুব খারাপ লাগছে।সাথে নিজের ওপরে রাগ হচ্ছে।মানুষটা খুব একা।নিজের পুরো পরিবার থাকার পরেও নিজের বলতে যেন উৎসবের কেউ নেই।চারিদিক থেকে সব সময় একাকীত্ব ওকে যেন গ্রাস করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে।

"আমি আপনাকে বদলাতে বলেছিলাম মনে আছে আপনার?আপনার কিছু স্বভাব আমি আপনাকে বদলাতে বলেছিলাম।একবার একটু ভেবে দেখুন তো সেই স্বভাবগুলো কি ভালো ছিল না খারাপ ছিল?"

উৎসবের একটুও সময় নষ্ট করে ভাবতে হলো না। তৎক্ষণাৎ জবাবে বলল,

"যেহেতু আপনি বদলাতে বলেছেন তার মানে নিশ্চয়ই খারাপই ছিল।"

"হ্যাঁ।আপনি মানুষটা খুব ভালো উৎসব ভাইয়া।আমি শুধু আপনাকে একটু নিজেকে সংশোধন করতে বলেছিলাম।এই সংশোধনটা করে কি আপনার জীবনের কোন ক্ষতি হয়েছে?হয়নি বরং আপনি আরো চমৎকার মানুষ হিসেবে নিজেকে আমার সামনে দাঁড় করিয়েছেন।তাই বলছি কখনো যদি নিজের কিছু পরিবর্তন করতে হয় তাহলে সব সময় সেটা খারাপ চোখে দেখবেন না।অনেকে আপনার ভালোর কথা ভেবে আপনার কিছু খারাপ গুণ ছাড়তে বলে।"

প্রভার কথায় দ্বারা উৎসব যেন নতুন কিছু আবিষ্কার করল।সত্যিই তো উৎসব তো নিজের খারাপ গুণগুলোই ছেড়েছে।নির্ভীকও সবসময় ওকে এই কথাগুলোই বলতো কিন্তু তেমন একটা জোর করেনি সেজন্য উৎসবের আর ছাড়া হয়ে ওঠেনি।ওই যে উৎসব যেমন নির্ভীক ওকে তেমনভাবে গ্রহণ করেছে।প্রভা উৎসবকে বদলে ফেলল।বাহ!যা আজ পর্যন্ত কেউ করতে পারেনি সেটা উৎসবের মাস্টান্নি করে দেখিয়েছে।আর ঠিক এখানেই বাকি সবার সাথে প্রভার পার্থক্য।

আরো কিছুক্ষণ কথা বলা শেষে ফোনটা রেখে দিল।এইতো আবার গান গাওয়ার ইচ্ছে ফিরে এসেছে।মনটা সতেজ হয়ে উঠলো।বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।এই পরিবেশটায় উৎসব এক কাপ কফি ভীষণ মিস করলো।কিন্তু এখন না নিজে বানাতে ইচ্ছে করছে না কাউকে বানিয়ে দিতে বলতে ইচ্ছে করছে।অগত্যা কফি খাওয়ার ইচ্ছাটাকে বিসর্জন দিল।হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে কিছু ভাবলো।কল্পনাগুলো সত্যিই ভীষণ সুন্দর হয়।উৎসবের কল্পনাগুলোও খুব সুন্দর।সেখানে উৎসব সবটা নিজের মতন করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে।সেই কল্পনার সবটুকু সাজিয়েছে নিজের প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে।এখানে কোন বাধা নেই।এখানে কোন অপ্রাপ্তি নেই,কোন হারানোর ভয় নেই।ইশ!জীবনটাও যদি এমন কল্পনার মতন হত!কথাটা ভাবতে উৎসব হেসে উঠলো।না জানি যাকে নিয়ে উৎসব নিজের কল্পনায় ঘর বেঁধেছে তার কল্পনায় কে ঘুরছে?

গিটারটা নিয়ে তাতে সুর তুলে গান ধরলো।

❝এটা গল্প কার,দেখো পড়ছে কে

ঘুমে রূপকথার দেশে ঘুরছে কে

কিছু আবদারের জানি নেই মানে

তোর সঙ্গে আজ আমাকে নে

এগিয়ে দে,এগিয়ে দে

দু' এক পা এগিয়ে দে

হাঁটতে চাই কয়েক পা তোর সাথে❞

সবার একটাই ইচ্ছে তার প্রিয় মানুষের হাতে হাত রেখে, পায়ে পা মিলিয়ে একসাথে চলার।কে জানে কার সেই ইচ্ছে পূরণ হবে আর কার ইচ্ছে গুলো আজীবন কল্পনা হয়েই রয়ে যাবে?

বিজ্ঞাপন
ভ্রমর কইও গিয়া গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক সম্পর্কভিত্তিক গল্প