আজ বিকেলে মাঠে আর কলি এলো না। বেশ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলো ইমদাদ কলির আসার জন্য, তবে কলি এলো না। বারবার চোখ দুটো আশেপাশে কলিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল, তবে খুঁজে পাচ্ছিলো না। খেলাতেও এর জন্য মন বসছিল না। ফলস্বরুপ পাঁচটা গোল খেল বিপক্ষ দলের কাছে। আর ইমদাদ একটা গোলও দিতে পারল না। প্রথম অর্ধেকেই পাঁচটা গোল খেলো ইমদাদের দল, তবে বাকি অর্ধেক সময় আর খেলার ধৈর্য হলো না ইমদাদের।
কে কি বলল না বলল সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল করার সময় নেই ইমদাদের। নিজেই নিজের মতন করে বাড়ির পথে হাঁটা দিল। ওর পিছন পিছন সাঈদও এলো। ইমদাদের ইচ্ছে করছে না এখন সাইদের সাথে কথা বলতে, তবে জানে সাঈদ কে কিছু বলেও লাভ হবে না। ও এখন পিছু ছাড়বে না।
সাঈদ নিজের মতন করেই মজা করে যাচ্ছে, ইমদাদ কে খোঁচা দিচ্ছে, মশকরাও করছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, ইচ্ছে করে রাগানোর জন্য অনেক কিছুই বলছে তবে ইমদাদের কোন কিছুতেই খেয়াল নেই।
মাঠে থেকে ইমদাদের বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও বাড়ি ফিরল না। সোজা গেল মাইশার বাড়ি। ইমদাদের উদ্দেশ্য কলির খোঁজ করা।
মাইশার বাড়ির কাছাকাছি যেতেই এতক্ষণে ইমদাদ মুখ খুলল। পাশে দাঁড়ানো সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় আদেশের সুরে বলল,
“দরজায় গিয়ে কলিং বেল বাজা।”
সাঈদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“তোর হাত কি ভেঙ্গে গেছে?”
ইমদাদ বিরক্তি মাখানো গলায় বলল,
“যা করতে বললাম চুপচাপ তাই কর। যদি দেখেছিস যে মাইশা বাদে অন্য কেউ দরজা খুলছে, তবে মাইশার ভাইয়ের খোঁজ করে সোজা ভিতরে ঢুকে যাবি। তারপর সুযোগ বুঝে মাইশাকে জিজ্ঞেস করবি যে কলি কোথায়।”
সাঈদ ইমদাদের কথা আপত্তি জানিয়ে বলল,
“আমি পারবো না। মজা করবি তুই, আর কষ্ট করবো আমি? তোর যদি এতই কলির খোঁজ জানার ইচ্ছে থেকে থাকে, তবে তুই যা।”
ইমদাদ বুঝলো এখন রাগারাগি করে, ভয় দেখিয়ে বা হুমকি দিয়ে কোন লাভ হবে না। বরং এখন সাঈদের সাথে ভালোভাবে কথা বলতে হবে। ইমদাদের কন্ঠটা একটু নরম হলো। বিনয়ের সাথে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কলিকে নিয়ে আমার বাড়িতে ঝামেলা হয়েছে। মেয়েটাকে আর আমার বাড়িতে আসতে দিচ্ছে না। আজ পুরো দিন মেয়েটার খোঁজ পাইনি। কোথায় গেছে, কি অবস্থা কিচ্ছু জানি না। একবার খোঁজ নিয়ে আয় না। আমি গেলে সবাই কথা বলার আরো সুযোগ পেয়ে যাবে। তোকে কেউ সন্দেহ করবে না।”
সাঈদ কপাল কুঁচকে বলল,
“কেন? আমাকে কি ছেলে মনে হয় না যে আমায় সন্দেহ করবে না?”
“কলি হয়তো কোন সমস্যায় আছে। আমি খোঁজ নিতে পারছি না ঠিক ঠাক ভাবে। মাইশাই একমাত্র উপায়।”
মুহূর্তের মাঝে সাঈদের মুখটা বন্ধ হয়ে গেল। পুরো মুখ মন্ডলে ফুটে উঠল চিন্তার ছাপ। আর আপত্তি করল না ইমদাদের কথায়।
ইমদাদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকলো। সাঈদ গিয়ে মাইশার বাড়ির দরজার কলিং বেল বাজালো। একটু পরে ভেতর থেকে মাইশাই এসে দরজা খুলে দিল। যাক, সাঈদের ভাগ্য ভালো। কষ্ট করে ভিতরে ঢুকতে হলো না।
দরজার সামনে সাঈদ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই মাইশা ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি এখানে কেন এসেছো?”
“কলি কোথায় রে?”
“তোমায় কেন বলবো?”
“ইমদাদ পাঠিয়েছে আমায় কলির খোঁজ নিতে।”
সাইদের বলা কথাটা বিশ্বাস হলো না মাইশার। সন্দেহী গলায় বলল,
“সত্যি ইমদাদ ভাই এসেছে? দেখি কোথায়, আমি দেখব। তোমায় বিশ্বাস করি না।”
সাঈদ অনেক কষ্টে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। মাইশা বাইরে উঁকি দিয়ে ইমদাদ কে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিশ্চিত হল।
“কলি তো ওর খালার বাড়িতে গিয়েছে। কিন্তু এতক্ষণে তো চলে আসার কথা। কেন আসেনি?”
“সেটাই যদি জানতাম, তবে কি আবার তোর কাছে আসতাম। দরজা লাগা।”
কথাটা বলে সাঈদ সেখান থেকে চলে এলো। মাইশার তুমুল রাগ উঠল সাঈদের উপর। ভাবলো আজ না হোক কোন একদিন এই অপমানের প্রতিশোধ ঠিকই নেবে।
সাঈদের থেকে খবরটা পাওয়ার পর ইমদাদ রাস্তার দিকে হাঁটা দিল। খুব বেশিক্ষণ হাঁটতে হলো না। মিনিট পাঁচেকের মতন হাঁটতেই কলিকে আসতে দেখলো। কলিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। মাথার উপর থেকে অনেক বড় একটা বোঝা নেমে গেল যেন।
কলির দেখা পেতেই সাঈদ তাড়াহুড়ো কন্ঠে ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি তবে এখন বাড়ি যাই ইমদাদ। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, বাবা ঠ্যা'ঙা'বে।”
ইমদাদ যে কিছু বলবে সেই কথাটুকু শোনার অপেক্ষাতেও সাঈদ রইল না, উল্টা পথে হাঁটা দিল।
ইমদাদের কাছাকাছি আসতেই ইমদাদ কে দেখে কলি থমকে গেল। কিছুক্ষণ হা করে ইমদাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। একবার ভাবলো হয়তো ভুল দেখছে। কিন্তু পর মুহূর্তেই যখন ইমদাদ ধমকে উঠল তখনই বুঝলো, না সত্যি দেখছে।
ইমদাদ ধমকের সুরে কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এই সন্ধ্যেবেলা একা একা যাতায়াত করিস কোন সাহসে? তোর বাপ, দাদি, চৌদ্দগুষ্টি কি ম’রে’ছে? নাতনির ক্ষতি হয়ে যাবে এই ভয়ে তোর দাদি তোকে পাড়ার মেলায় আমাদের সাথে ছাড়ে না, আর একা কোথায় ছেড়েছিল সন্ধ্যা অব্দি? কোথায় বুড়ি আজ?”
কলি চমকে উঠে আগে আশেপাশে দেখলো কেউ আছে কিনা। ভাগ্য ভালো কেউ নেই। দু একজন ছোট বাচ্চা আছে ওদের এসবে খেয়াল নেই।
কলি ভয়ার্ত গলায় বলল,
“আস্তে কথা বলো ইমদাদ ভাই। এখানকার সবাই পরিচিত আমাদের।”
ইমদাদ নির্ভয়ে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“তো কি হয়েছে? কে কি বা'ল ছিঁ'ড়'বে ইমদাদের, ছিঁড়ে দেখাক। খালার বাড়িতে কেন গিয়েছিলি? আবার গিয়েছিলে তো সেজেগুজে যাওয়ার কি আছে? পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল নাকি তোকে? বিয়ে করে এলি নাকি?”
কলি বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আমার খালাতো ভাইয়ের বিয়ে ছিল সেইজন্য গিয়েছিলাম। বিয়েতে গিয়েছি একটু সেজে যাব না?”
“এমনভাবে সেজেছিস মনে হচ্ছে তোরই বিয়ে। এমনিই তো তুই সুন্দর, আবার আলাদা করে সাজার কি আছে? তার মধ্যে আমিও ছিলাম না। না জানি কতজন হা করে তাকিয়ে ছিল। প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছিস নাকি?”
“বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছি। সামনের শুক্রবার আমার বিয়ে। তোমায় অগ্রিম দাওয়াত দিয়ে গেলাম। পরে আমার খালার বাড়ির ঠিকানা পাঠিয়ে দেবো, চলে এসো।”
ইমদাদ চোয়াল শক্ত করে কলির দিকে তাকালো। কলির একটু ভয় হলো ইমদাদের লাল টকটকে চোখ দুটো দেখে, তবে বুঝতে দিল না। ইমদাদ গম্ভীর গলায় বলল,
“তুই কি চাস আমার হাতে খু’ন হোক?”
কলি বুঝলোনা ইমদাদের কথা। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“মানে?”
“যদি কখনো তোর বিয়ে ঠিক হয়, তবে মনে রাখিস কলি দুটো খু’ন হবে। এক, যার সাথে তোর বিয়ে ঠিক হবে তাকে খু’ন করবো। আর দুই, তুই বিয়েতে রাজি হওয়ার জন্য তোকে খু’ন করবো। আমার ভালোবাসা এমনই। তুই আমার না হলে আর কারোর হবি না। তোকে নিয়ে আমি খুব বেশি হিংসুটে কলি। তোকে আমি এক মুহূর্তের জন্য কারো সাথে দেখতে পারবো না। তোর পরিচয় হবে অন্য কারো স্ত্রী সেটা আমি কোনদিন মানতে পারবো না।”
“এত নিষ্ঠুর ভালোবাসা তো আমি চাইনা।”
“তোর মন মত তো সব হবে না। আমার ভালোবাসা এমন নিষ্ঠুরই। তুই স্বেচ্ছায় গ্রহণ করলে করবি, আর স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে না চাইলে অনিচ্ছাতেই করতে হবে।”
ইমদাদ কথাটা বলে কলির হাতে থাকা বড় একটা ব্যাগের দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ উঁচিয়ে বলল,
“ব্যাগে কি আছে?”
কলি ঠোঁট টিপে নিজের হাসি সংবরণ করার চেষ্টা করে বলল,
“আমার হবু শ্বশুর বাড়ি থেকে আমার জন্য কিছু কেনাকাটা করে পাঠিয়েছে বিয়ের।”
ইমদাদ এক ঝটকায় কলির হাত থেকে ব্যাগটা কেড়ে নিল। দাঁত পিষে বলল,
“এত সাহস ভালো না কলি। আমার রাগ কিন্তু তুই এখনো দেখিসনি। বাধ্য করিস না আমায় রাগ দেখাতে।”
কলি আলতো একটু হেসে বলল,
“তুমি পারবে আমায় রাগ দেখাতে?”
ইমদাদের কি হলো কে জানে। মুহূর্তের মাঝে সব রাগ উধাও হয়ে গেল। মেয়েটা কি সুন্দর করে হাসছে, কি সরল কথাবার্তার ধরন। এই মেয়েটার উপর কি রেগে থাকা যায়? সত্যি যায় না।
“তুই খুব চালাক হয়ে গিয়েছিস কলি। আমার দুর্বলতায় খুব ভালোভাবে আঘাত করতে জানিস।”
কলি এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“তোমায় চিনতে না পারলে, ঠিকঠাক বুঝতে না পারলে সারাটা জীবন কাটাবো কি করে তোমার সাথে?”
এবারে ইমদাদও হেসে ফেলল। নিজেও পাল্টা হেসে বলল,
“কাটাবি তো সারাটা জীবন আমার সাথে? পারবি আমার মতন বদমেজাজি একটা মানুষের সাথে সারাটা জীবন কাটাতে?”
কলি আবারও আশেপাশে একবার তাকিয়ে দেখল কেউ আছে কিনা। তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারও হয়ে এসেছে অনেকটা। কলি এবার একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসলো। ইমদাদের হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটা শুরু করে বলল,
“বলেছিনা কাটাব। আমি যখন একবার কথা দিয়েছি যে তোমার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করবো, তার মানে করব ইমদাদ ভাই।”
ইমদাদ শুধু হাসলো, আর কিছু বলল না। যাওয়ার পথে একটা ছোট্ট দোকান পরলো। ইমদাদ দোকানে গিয়ে কয়েকটা চকলেট কিনে এনে কলির হাতে দিল। কলি ইমদাদের হাত থেকে ব্যাটটা নিতে চাইলো, তবে ইমদাদ দিলো না। ব্যাগটা খুব বেশি ভারি না, তবে তারপরও ইমদাদ দিল না। দুজনে গল্প করতে করতে বাড়ির পথে হাঁটা দিল।
________
সময় তখন সকাল দশটা পার হয়ে গিয়েছে, তবে এখনও ইমদাদ ঘুম থেকে ওঠেনি। আজ কলেজ যাওয়ার ইচ্ছা নেই, সেজন্যই এখনো ঘুমোচ্ছে। কোথায় কি হচ্ছে ইমদাদের সেই বিষয়ে কোন ধারনাই নেই।
ইমদাদের ঘুমের মাঝেই ঘরে হন্তদন্ত পায়ে ঢুকলো সাঈদ। ইমদাদের নাম ধরে চেঁচাতে চেঁচাতেই ঘরে এলো। ইমদাদ ধরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো। কিয়ৎক্ষণের জন্য ইমদাদের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল।
ইমদাদকে স্বাভাবিক হওয়ার সময়টুকু সাঈদ দিলো না। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“ইমদাদ কলি চলে যাচ্ছে, জানিস তুই?”
মুহূর্তের মাঝে ইমদাদের ঘুম ছুটে পালালো। নিজেও পাল্টা উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কলি চলে যাচ্ছে মানে? কোথায় চলে যাচ্ছে? আমি তো কিছু জানি না।”
“সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমোলে জানবি কি করে কোথায় কি হচ্ছে? ওর বাপ ওকে নিয়ে স্টেশনে চলে গেছে। তুই ঘুমো এখানে।”
ইমদাদ নিজে পাল্টা রাগান্বিতা গলায় বলল,
“তুই তো জেগে ছিলি, স্টেশনে যাওয়ার আগে আমায় খোঁজ দিতে পারিস নি।”
“আরে ওরা যখন স্টেশনের জন্য রওনা দিয়েছে তখন আমি জানতে পেরেছি। পরে মাইশার বাড়িতে আবার গিয়েছিলাম খোঁজ নিতে। আমিতো ভেবেছিলাম মাইশা যেহেতু জানে তুইও জানবি।”
“আমি তো কিছু জানি না। কালকেই তো কলির সাথে কত কথা হলো। ও তো আমায় কিছু বলেনি।”
“আরে ঘাপলা আছে এর ভেতরে। চল স্টেশনে যাই। কলির সাথে একবার দেখা হলেও হতে পারে। ওরা একটু আগে বেরিয়েছে। আমি বাইক নিয়ে এসেছি।”
ইমদাদ আর আগে পিছে কোন কিছু ভাবার প্রয়োজন মনে করলো না। ঘুম থেকে উঠে মুখটা অবধি ধুলো না, না জামা কাপড় বদলালো। অমনি সাঈদের সাথে বেরিয়ে গেল।
________
আজ ভাগ্য সহায় হলো বোধহয় ইমদাদের। রাস্তায় একটুও যানজট পরলো না। খুব তাড়াতাড়ি স্টেশনে পৌঁছাতে পারলো। সাঈদ বাইকটা থামাতেই ইমদাদ বাইক থেকে নেমে দৌড় দিলো।
আজ একই দিনে দ্বিতীয় বার ইমদাদের ভাগ্য প্রসন্ন হলো। কলির দেখা পেল। তবে কলির কাছে যাওয়ার আগে খুব ভালোভাবে আশেপাশটা দেখে নিলে যে কোথাও কলির বাবাকে দেখা যাচ্ছে কিনা। ইমদাদ নিজের কথা ভেবে ভয় করছে না, তবে ইমদাদের ভয় ওর জন্য কলি কে না আবার শাস্তি দেয়।
তবে আশেপাশে কলির বাবাকে কোথাও দেখতে পাওয়া গেল না। ইমদাদ আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না। ছুটে চলে গেল কলির সামনে। হুট করে ইমদাদ সামনে চলে আসায় কলি চমকালো। কিছুক্ষণ হা করে ইমদাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ইমদাদ হাঁপিয়ে যাওয়া গলায় বলল,
“আমায় না জানিয়ে কোথায় যাচ্ছিস তুই? গতকালই তো কথা বললাম একসাথে থাকার, আর আজই চলে যাচ্ছিস?”
কলি নিজেকে স্বাভাবিক করলো, নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করলো। নির্জীব গলায় বলল,
“আমি বোধ হয় আমার দেওয়া কথাটা রাখতে পারলাম না ইমদাদ ভাই।”
“কেন কি হয়েছে? আর হঠাৎ করে কোথায় যাচ্ছিস?”
“মামা বাড়ি যাচ্ছি। বাবা আর এখানে রাখবে না আমায়।”
ইমদাদ রাগান্বিত ভঙ্গিতে বলল,
“তোর বাপকে তো আজ আমি দেখে নেব। ওর সাহস খুব বেশি বেড়ে গেছে।”
“বাবার কোন দোষ নেই ইমদাদ ভাই। আমি তো কারো কোন উপকারে আসতে পারি না, বোঝা হব এটাই তো স্বাভাবিক। আমার পেছনে টাকা নষ্ট করা অযথা। আর তাছাড়া বাবার নতুন সংসার হয়েছে, কত দায়িত্ব বেড়েছে, কত খরচ বেড়েছে আমি যে বোঝা হবো এটাই তো স্বাভাবিক তাই না? আমি বাবার কোন দোষ দেখছি না এখানে।”
“আসল কারণটা বল। হঠাৎ করে তো আর এই সিদ্ধান্ত হয়নি।”
“হঠাৎ করেই হয়েছে। কাল আমাদের একসাথে বাড়ি ফিরতে দেখেছিল বাবার নতুন বউ। উনি বাবা কে বলেছেন যে খালার বাড়ি যাওয়ার নাম করে নাকি আমি তোমার সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম। অনেক আজেবাজে কথা বলেছে। খালা কে কল করে শুনেওছিল যে আমি সারাদিন ওখানে ছিলাম তাও বিশ্বাস করেনি।”
“গায়ে হাত তুলেছে তোর?”
কলি মলিন হেসে বলল,
“এটা তো রোজকার ব্যাপার।”
ইমদাদ আশেপাশে তাকিয়ে করিম সাহেব কে খোঁজার চেষ্টা করে বলল,
“কোথায় তোর বাপ? আজ এখানেই ওর একটা ব্যবস্থা করে যাবো আমি।”
কলি উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“তুমি এমন কিছুই করবে না। বাবা নেই, চলে গেছে। ট্রেন আসতে একটু দেরি হবে জন্য আমায় টিকিট কেটে দিয়ে চলে গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার সময় বাবার নেই।”
ইমদাম অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“এ কি আসলেও তোর বাপ কলি? এমন কেন এই লোকটা? এমন হয় বাবারা?”
কলি ফের মলিন হেসে বলল,
“সবাই ভালো থাকতে চায় ইমদাদ ভাই।”
“আর আমি তোকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। কোথাও যেতে হবে না তোকে, চল বিয়ে করবো। তোকে আমার কাছে রাখবো, আমার বাড়িতে রাখবো।”
কলি আবারো মলিন হেসে বলল,
“এটা হয় না। আমরা বিয়ে করতেই পারি আজকে, তবে এতে অশান্তি আরও বাড়বে। তোমার বাড়ির লোক মেনে নেবে না, হয়তো তুমি আমার জন্য তোমার বাড়ি ছাড়বে। শেষে আমার ওপরে নতুন করে একটা অপবাদ বাড়বে যে, আমি তোমাকে তোমার পরিবার থেকে আলাদা করেছি। এত দোষ নিয়ে বাঁচা যায় না ইমদাদ ভাই। অভিশাপও লাগবে আমাদের। আমরা ভালো থাকবো না।তার থেকে ভালো আমি এখন চলেই যাই।”
ইমদাদ অসহায় গলায় বলল,
“আর আমাদের স্বপ্ন? আমাদের ছোট্ট একটা সংসারের স্বপ্নের কি হবে কলি?”
“আমি কি একেবারে জন্য চলে যাচ্ছি নাকি। কয়েকটা বছর যেতে দাও। তুমি আগে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হও। আমাকে নিজের জীবনে একটু এগোতে দাও। আমায় আগে নিজেকে তোমার যোগ্য করে গড়ে তুলতে দাও ইমদাদ ভাই। এখনো যে আমাদের সংসারের সময় হয়নি। আমি চাই তোমার পাশে যখন সবাই আমায় দেখবে তখন যেন বলতে পারে যে আমি তোমার যোগ্য।”
“যাস না কলি।”
কলি আলতো হেসে বলল,
“আমি আসবো তো আবার। আমি একবার যখন তোমায় কথা দিয়েছি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো, তাহলে সারা জীবন অপেক্ষা করবো। তুমি চিন্তা করো না আমায় নিয়ে, আমি ভালো থাকবো। তোমার অনুপস্থিতিতে কেউ আমার জীবনে আসতে পারবে না। তবে আমার অনুপস্থিতিতে তুমি তোমার জীবনে আমার জায়গাটুকু যত্নে রেখে দিও। কাউকে যেন আবার দিয়ে দিও না।”
ইমদাদ পুনরায় অসহায় গলায় বলল,
“আমাকে ছেড়ে তুই সত্যিই চলে যাবি কলি? থেকে যাওয়ার কি কোন উপায় নেই? আমারও কি তোকে আটকানোর কোন অধিকার নেই?”
"তুমি ভুল মানুষকে আটকে রাখতে চাইছো ইমদাদ ভাই। না আমার নিজের ইচ্ছের মূল্য আছে, আর না তোমার অধিকার খাটানোর অধিকার আছে। যেতে আমাকে হবেই ইমদাদ ভাই। আমার কপালে যে এত ভালোবাসা সয় না।"
“দেখা হবে তো আমাদের আবার?”
“আমি চাই দেখা হোক। আমি চেষ্টা করবো যেন আমাদের আবার দেখা হয়। তবে ভয় একটাই ইমদাদ ভাই, আমি অযত্নে অভ্যস্ত। এত যত্ন, আদর কি আমার কপালে সইবে?”