“বাবা তোমায় আমার একটা সাহায্য করতে হবে।পারবে কি করতে?”
ইমদাদের কথা শুনে ফরিদ সাহেব একটু চিন্তার মাঝে পড়লেন। তার ছেলে তো কখনো তাকে এভাবে বলে না কোন সাহায্যের কথা। তবে কি ব্যাপারটা খুবই গুরুতর কিছু যে ওনার সাহায্য ছাড়া হবেই না?
হাতে থাকা পত্রিকাটা পাশের ছোট্ট টেবিলটার উপরে রেখে দিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কি সাহায্য?”
ইমদাদ আলতো হেসে বেশ স্বাভাবিক গলায় ফরিদ সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কলির বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে হবে আমার জন্য। তোমার কাজ শুধু এতটুকুই। আর কিছু করতে হবে না।”
ফরিদ সাহেবের পাশেই সোফায় বসে আছেন আঁখি। উনিও জানতেন না যে ইমদাদ হঠাৎ করে এই কথাটা বলবে। যদি জানতেন তবে অনেক আগেই ইমদাদকে তিনি থামিয়ে দিতেন। কথাটা বলতেই দিতেন না। কেননা এই কথাটা শোনার পর ফরিদ সাহেবের প্রতিক্রিয়া ঠিক কি হতে পারে সেটা আঁখির খুব ভালো করেই জানা আছে। ইমদাদেরও তো অজানা থাকার কথা না। তবে ছেলেটার ভয় নেই শরীরে।
আঁখি ভয়ে ভয়ে একবার তাকালেন পাশে স্বামীর দিকে, যিনি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন ইমদাদের দিকে। এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। ইমদাদ কে বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে যেন কিছু হয়নি। খুব স্বাভাবিক কথা বলেছে সে।
ফরিদ সাহেব অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“কি বললে তুমি? আবার বলো?”
ইমদাদ এবারেও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“বললাম কলির বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে হবে। আমি ছুটি পেয়েছি। এই ছুটিতেই বিয়ে করে যেতে চাই।”
এবারে ফরিদ সাহেব নিজের প্রতিক্রিয়া দেখালেন। রাগে গর্জে উঠে বললেন,
“একটা থা'প্প'ড় মে’রে তোমার নির্লজ্জতা ছুটিয়ে দেবো বেয়াদব ছেলে। কার সামনে দাঁড়িয়ে কি কথা বলছো সে বিষয়ে খেয়াল আছে?”
“ভালো কাজের কথাই বলেছি, অন্যায় কিছু বলিনিতো যে লজ্জা করবে। আর বাপের সামনে দাঁড়িয়েই তো বিয়ের কথা বলতে হবে। যদি নিজে গিয়ে একা একা বিয়ে করে আনতাম তাহলে ভালো হতো?”
ফরিদ সাহেব এবার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তোমার ছেলের ব্যবহারের ধরন দেখেছো? বাপের সাথে কি করে কথা বলতে হয় সেটাও শেখাতে পারোনি। ও ভাবলো কি করে আমি ওই মেয়েকে আমার বাড়ির বউ করে আনব? ওর বাপের চরিত্রের ঠিক নেই, মায়ের স্বভাবের ঠিক নেই। ওর বংশের কথা তো বাদই দিলাম। ওর বাপের চরিত্র কি পাবে না ওই মেয়ে?”
ফরিদ সাহেব কথাটা বলতেই ইমদাদ রাগী গলায় বলল,
“কথা তো হচ্ছে আমার আর তোমার মাঝে, কলি কিংবা ওর বংশকে টানার দরকার নেই। আমি কলির বংশকে বিয়ে করছি না, আর না কলির বংশ বিয়ের পর তোমার বাড়িতে এসে থাকবে। বিয়ের পর আমি কলি কে আমার সাথেই রাখবো।”
ফরিদ সাহেব তাচ্ছিল্য গলায় বললেন,
“সেই ক্ষমতা আছে নাকি? নিজেই তো চলো বাপের টাকায়। আমি এখনই বললে চাকরিটাও যাবে।”
ইমদাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“কেন? তোমার ভাই খবর দেয়নি যে আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এসেছি। আমি তোমার ছেলে বাবা, আমার শিরায় শিরায় বুদ্ধি। তুমি ভাবলে কি করে আমি সবকিছু ঠিকঠাক না করে বিয়ের কথাটা তোমায় বলতে এসেছি? এমনি কি এই কয় মাস অপেক্ষা করলাম। এমনি এমনি কি তোমার কথা শুনে ঢাকায় গেলাম চাকরি করতে। আমায় পা'গ'ল ভেবেছো তুমি?”
“আমার সাথে ষড়যন্ত্র করছো? আমি না চাইলে এই বিয়ে কিন্তু হবে না।”
“ভুল বললে। তুমি চাইলেও বিয়ে হবে, না চাইলেও এই বিয়ে হবে। তুমি কি ভেবেছো তুমি মানবে না জন্য আমি কলিকে ছেড়ে দেবো? কখনোই না। তোমরা আমার পরিবার, তোমাদেরকে জানানো আমার কর্তব্য ছিল সেজন্য জানালাম। এখন তোমরা যদি না মানো তবে ঠিক আছে, আমার কিছু করার নেই এখানে। কিন্তু বিয়ে থামবে না।”
আঁখি বুঝলেন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। ছেলেকে এখনই না থামালে ব্যাপারটা আরো বেশি বিগড়ে যাবে। তাড়াহুড়ো করে সোফা থেকে উঠে এসে ছেলেকে ধমক দিয়ে বললেন,
“চুপ কর ইমদাদ। বাবার মুখে মুখে তর্ক করছিস কেন? যা ঘরে যা। এই আলোচনার আপাতত এখানেই সমাপ্তি কর।”
আঁখি কথাটা বলতেই পিছন থেকে ফরিদ সাহেব বলে উঠলেন,
“আপাতত না চূড়ান্তভাবেই এই আলোচনার সমাপ্তি এখানেই হলো। ওই মেয়ে আমার বাড়িতে আসবেনা বউ হয়ে।”
আঁখি ছেলেকে ঘরে পাঠাতে চাইলেন, তবে ইমদাদ আগেই ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো না। ফরিদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বেশ শান্ত গলায় বললেন,
“তোমার সাথে আমার বিয়ের আলোচনার এখানেই চূড়ান্ত সমাপ্তি হলো। বুঝতে পেরেছি এবার যা করার আমার নিজেকেই করতে হবে। যখন বিয়ে করে বউ বাড়িতে আনব তখন বুঝবে অনুমতি না দিয়ে কি ভুল করেছো। মান সম্মান নিয়ে এমনি টানাটানি পড়ে যাবে।”
________
দুপুরের দিকে ইমদাদ গেল কলির বাড়িতে। আজ আর ইমদাদ ভয় করল না। লুকিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও মনে করলো না। মনে হলো যার ইচ্ছে দেখুক, বরং ইমদাদ যেন সবাইকে জানাতে চাইলো। বাড়ির উঠোন থেকে জোরে জোরে কলির নাম ধরে ডাকলো।
কলি তখন নিজের ঘরে বসে পড়ছে। সামনেই পরীক্ষা, আর কিছু দিনই বাকি আছে। এর মাঝেই ইমদাদের ডাক কানে আসতেই চমকালো। প্রথম ধাপে ভাবলো বোধ হয় ভুল শুনছে। ইমদাদের তো এখানে আসার কথা না। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন ইমদাদের গলার আওয়াজ বাড়তে থাকলো এবং ডাকটা বন্ধ হলো না তখন কলি বুঝলো ও মোটেই ভুল শুনছে না।
কলি উঠোনে আসার আগেই সেখানে এলেন রোজিনা। রোজিনা কে দেখতেই ইমদাদের মেজাজটা বিগড়ে গেল। তবে যেহেতু এখনো রোজিনা কিছু বলেনি তাই ইমদাদের মনে হলো ওরও অযথা চেঁচামেচি করাটা ঠিক হবে না।
রোজিনা ইমদাদকে দেখে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“তুমি এখানে কি করছো? কলিকে ডাকছো কেন?”
“আপনি কি কলি?”
ইমদাদের এমন প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেল রোজিনা। মৃদু বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল,
“আমি কলি হতে যাবো কেনো? চেনো না তুমি আমায়?”
“তাহলে আপনি যেহেতু কলি নন, কলিকে কেন ডাকছি সেটা আপনাকে বলব কেন? কলিকে ডেকে দিন।”
ইমদাদ কথাটা বলতেই ভেতর থেকে কলি দৌড়ে বাইরে এলো। রোজিনাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়ে গলাটা শুকিয়ে গেল। কম্পিত গলায় কলি ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইমদাদ ভাই, তুমি এখানে কেন এসেছো?”
“তোকে দেখতে এসেছি। কেমন আছিস তুই? মুখটা এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন? খাসনি সকাল থেকে কিছু?”
ইমদাদ কলিকে উত্তর দেওয়ার সময়টুকু দিলো না। তার আগেই রোজিনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“খেতে দেননি ওকে সকাল থেকে কিছু? আপনাকে তো দেখতে বেশ মোটা তাজাই লাগছে, তবে কলি এত শুকিয়ে গেছে কেন? ওর অংশটুকুও গিলে নিচ্ছেন নাকি? এত গিলবেন না। যত মোটা হবেন, শরীরে তত বেশি রোগ বাসা বাঁধবে। শেষে আপনি অকালে ম'রবেন আর আপনার স্বামী আবার বিয়ে করে আনবে। তাই বলছি কম করে গিলুন।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইমদাদের কথাটা শুনে কলি ফিক করে হেসে ফেলল। রোজিনা চোখ গরম করে ওর দিকে তাকাতেই আবার থেমে গেল। রোজিনা এবারে ইমদাদের দিকে অ'গ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। তোমার সাহস হয় কি করে আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকে অপমান করার?”
ইমদাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আপনার মতন মহিলা কে অপমান করার জন্য কার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছি সেটা দেখার প্রয়োজন পড়ে না। সাহস লাগে, যেটা ইমদাদের আছে।”
ইমদাদ আর রোজিনাকে পাত্তা দিল না। কলির দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা নতুন অ্যান্ড্রয়েড ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এটা রাখ। আমার নাম্বার সেভ করা আছে। আর শোন ফোনটা লুকিয়ে রাখার কোন প্রয়োজন নেই। যদি তোর বাপ কিংবা অন্য কেউ জিজ্ঞেস করে ফোনটা কোথা থেকে পেলি, গর্ব করে বলবি যে আমি দিয়েছি। ভাঙলে ভাঙবে, আমি আবার কিনে দেবো, কিন্তু লুকোবি না। আমরা চোর নই যে চুরি করে কথা বলতে হবে।”
কলি আড় চোখে একবার রোজিনার দিকে তাকাতেই দেখলো উনি অ'গ্নিদৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে আছে। কলি ভয়ে ভয়ে ইমদাদের হাত থেকে ফোনটা নিল। কেননা এখন যদি কলি বেশি কথা বলে তবে ইমদাদ রেগে যাবে।
কলি ফোনটা হাতে নিতেই রোজিনা খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“এই ছোটলোকের বাচ্চা, তোর বাপ কি তোকে কিছু দেয় না যে ওর থেকে হাত পেতে নিস? চরিত্রহীন মেয়ে কোথাকার। বাড়িতে প্রেমিক ডেকে আনিস। তোর বাপকে আজ বাড়িতে আসতে দে। তোর চুলের মুঠি ধরে যদি আমি তোকে ঘর ছাড়া না করেছি তাহলে আমার নামও রোজিনা না।”
রোজিনার কথাগুলো শুনে যে কলির খারাপ লাগা উচিত সেসব ওর মাথায় এলো না। আগে তাকালো ইমদাদের দিকে। কলি বুঝতে পারছে ইমদাদ কে এখন সামলানো মুশকিল হয়ে পড়বে।
কলি ইমদাদের দিকে তাকাতেই দেখলো ইমদাদ র'ক্তচক্ষু নিয়ে রোজিনার দিকে তাকিয়ে আছে। কলি ব্যস্ত গলায় ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইমদাদ ভাই, তুমি এখন যাও এখান থেকে। আমি পরে দেখা করবো তোমার সাথে।”
রোজিনা ফের খেঁকিয়ে উঠে কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বাড়িতে আমার সামনে কাজ হচ্ছে না, এরপরে কি ঝোপের আড়ালে নিয়ে যাবি ওকে। নষ্টামি করা কি কিছু বাকি রেখেছিস?”
রোজিনা কথাটা বলতে ইমদাদ কলির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রোজিনার থেকেও দ্বিগুন চেঁচিয়ে বলল,
“কি বললেন আপনি আরেকবার বলুন? কলিকে কি বললেন আপনি? কার চরিত্রের ওপর আঙুল তুললেন? সাহস থাকে তো আরেকবার বলুন? কি হলো চুপ করে আছেন কেন, বলুন? আরে বলুন না।”
ইমদাদ শেষের বাক্যটা এতই জোরে বলল যে কলি আর রোজিনা দুজনেই কেঁপে উঠলো। কলি তো অল্পতেই ভয় পেয়ে যায়, তবে রোজিনা কে ভয় পাওয়ানো অত সহজ না। তবে সেও ভয় পেলা। তোতলানো গলায় বলল,
“বাড়িতে এসে গুন্ডামি করবে না একদম। কলির বাবা কে ডাকবো কিন্তু।”
“আরে শুধু কলির বাপ কেন, আপনার বাপকেও ডাকুন। কার বাপকে ডাকার ডাকুন। আজ তো আমার বাপও আমায় থামাতে পারবে না। একদম গলা টিপে ধরে আছাড় মা’র’বো। এক ঝটকাতে ভিতরের জিনিস বাইরে বেরিয়ে আসবে। আর কলির বাপ, ওকে সামনে পেলে আমি গাছের ডালে ঝুলিয়ে পে’টা’বো। শালা মেরুদণ্ডহীন ভেড়া কোথাকার।”
ইমদাদের পিছনে দাঁড়ানো কলি মিনমিনে গলায় বলল,
“ইমদাদ ভাই থামো।”
ইমদাদ এবার কলিকে ধমক দিয়ে বলল,
“তুই চুপ কর। তোকে এবার একটা থা’প্প’র লাগাবো। বাপের প্রতি দরদ উতলে পড়ছে নাকি। তোর বাপ আর সৎ মা যা শুরু করেছে এরা কিন্তু যে কোনদিন আমার হাতে মা’র খাবেই কলি। দুটোকে সাবধান করে দিস। যদি এদেরকে মে'রে আমায় জেলেও যেতে হয় তবুও আমি রাজি আছি।”
ইমদাদ কথাটা বলতেই রোজিনা এবারে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। আশেপাশে যার যার বাড়ি আছে, যাকে যাকে চেনে সবার নাম ধরে চেঁচিয়ে সাহায্যের জন্য ডাকলো কান্নাকাটি করে। কলি ভরকালো, সেই সাথে ভীষণ ভয়ও পেল। তবে বিচলিত হতে দেখা গেল না ইমদাদকে। বরং বেশ ঠান্ডা গলায় রোজিনা কে উদ্দেশ্য করে হুমকি দিয়ে বলল,
“এখনই যদি তোর এই নাটক না থামিয়েছিস, কেউ এখান অব্দি আসার আগেই কিন্তু তোর গলা টিপে মে’রে রেখে যাবো। থাম।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেন যেন রোজিনা থেমে গেল। বোধ হয় সত্যি ভয় পেল। কেননা এখানে আসার পর থেকে পাড়ায় ইমদাদের নামে যা সব সুখ্যাতি শুনেছে, গলা টিপে ধরবে এটা অস্বাভাবিক কিছু না। আর এখানে আছে কেবল কলি। কলি আটকাতেও পারে, নাও আটকাতে পারে। যদি প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে যায় তাহলে হয়তো আরো মা’র’তে সাহায্য করবে। আর যদি কলি একবার ইমদাদকে বলে রোজিনাকে মা’রা’র কথা তাহলে তো ইমদাদকে আর কেউ আটকাতে পারবেনা। সেই ভয়ে থেমে গেল রোজিনা।
ইমদাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে কলিকে বলল,
“দেখেছিস, যদি একটু শক্ত হতে পারতি তবে এই মহিলার ক্ষমতা ছিল না তোকে কিছু বলার। তোর বাপের বাড়ি, এ তো উড়ে এসে জুড়ে বসা এক পাবলিক। বেশি কথা বললে একটা লাথি মে’রে বাড়ি থেকে বের করে দিবি।”
কলি মলিন হেসে বলল,
“আমার বাবাই তো ঠিক নেই। যাই হোক তুমি এখন যাও।”
“ঠিক আছে। তার আগে শেষ একবারে একে টাইট দেই।”
কথাটা বলে ইমদাদ রোজিনা কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,
“কলির গায়ে হাত দেবেন না। আপনার স্বামীর মাথাতেও ঢুকিয়ে দেবেন যেন কলির গায়ে হাত না দেয়। খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ওকে নিয়ে যাব আমি এখান থেকে। ভুলেও যদি আমার অনুপস্থিতিতে ওর গায়ে হাত উঠেছে আপনাদের অবস্থা কিন্তু খারাপ করব। কলির চোখ দেখে আমি বুঝে যাব ও এখানে ভালো আছে নাকি খারাপ আছে। তাই বলছি আমাকে খারাপ হতে বাধ্য করবেন না।”
_________
সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। বাইরে অনেকটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। ঘরের জানালা এখনো লাগানো হয়নি ইমদাদের। লাইটাও বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। একটু পর আঁখি এলেন ঘরে। আগে লাইটটা জ্বানালেন। ঘরে আলোর উপস্থিতি বুঝতে পেরে ইমদাদ চোখ মেলে তাকালো। আঁখি কে দেখে আবারও চোখটা বন্ধ করে নিল।
আঁখি গিয়ে আগে ইমদাদের ঘরের জানালাটা বন্ধ করলেম। ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলেন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। উনি জানেন ঘুমোয়নি ইমদাদ।
ধীরপায়ে গিয়ে ছেলের পাশে বসলেন। ইমদাদ তখনো বুঝতে পারেনি যে আঁখি ওর পাশে এসে বসেছে। আঁখি আলতো করে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ইমদাদ চোখ খুলে পাশে আঁখি কে বসে থাকতে দেখে উঠে বসে বলল,
“কি হয়েছে আম্মু? কিছু বলবে তুমি?”
“তোর বাবার সাথে কথা হয়েছে আমার। কলির সাথে বিয়েটা কোনমতেই মানবে না।”
ইমদাদ ভাবেনি যে আঁখি এখন এই কথাগুলো তুলবে। মনটা ভালোই ছিল তবে হঠাৎ করে এই কথাটা শুনে আবারো মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবে সেটা আঁখিকে বুঝতে দিল না। বরং মৃদু গম্ভীর গলায় বলল,
“ঠিক আছে। কলিকে বিয়ে করে আমি ঢাকায় চলে যাব।”
আঁখি শুধু ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইমদাদ খুব তাড়াতাড়ি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। ইমদাদের হঠাৎ করে ভয় হচ্ছে। মনে হচ্ছে আঁখি ওকে এমন কিছু বলবে যে কথাটা ইমদাদ না ফেলতে পারবে, না রাখতে পারবে। খুব তাড়াতাড়ি একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,
“আম্মু পরে কথা বলি তোমার সাথে। এখন ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমোবো।”
ছেলের অজুহাতের কারণটা আঁখি নিজেও বুঝলেন। উনি নিজেও এই কথাটা বলতে চাইছেন না, তবে বলতে বাধ্য হলেন। ইতোমধ্যে ওনার চোখ দুটো ভিজে উঠেছে। নিজের চোখের জল আর আটকাতে পারলেন না। মৃদু ক্রন্দনরত গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তুই আমার বড় ছেলে। কত স্বপ্ন আমার তোকে নিয়ে, তোর বিয়ে নিয়ে, তোর বউ নিয়ে। তোর বাবার অমতে বিয়ে করলে এই বাড়িতে আর তোকে পাও রাখতে দেবে না। তোর সাথে কোন সম্পর্কও রাখতে দেবে না। তোকে ছাড়া থাকবো কি করে আমি বাবা্ এখন কয়েক মাস পরে আসিস, তবুও নিয়মিত ফোনে তো কথা হয়। আমি তো আশায় থাকি যে আমার ছেলেটা ফিরবে বাড়ি। কিন্তু তখন যে সেটাও হবে না।”
মায়ের চোখের জল দেখে ইমদাদ ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তাড়াহুড়ো করে আঁখি চোখের জল টুকু মুছে দিয়ে বলল,
“কে বলেছে আমি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখব না? নিশ্চয়ই রাখবো। আর তোমাকেও আমি আমার সাথে নিয়ে যাব। তুমি আমার সাথে থাকবে। এখানে তোমায় থাকতে হবে না।”
আঁখি এবারে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বললেন,
“তোর কি আর এখন সেই সামর্থ্য হয়েছে। আর আমি যদি তোর সাথে চলে যাই আমার আর দুটো ছেলের কি হবে? ইকবাল তো আমায় ছাড়া থাকতে পারবে না, ইমাদের পড়াশোনার কি হবে?”
“ওদেরকেও নিয়ে যাব আমি।”
“এতজনের খরচ চালাবি কি করে তুই? আমি মা হয়ে কি করে তোর ঘাড়ে এতগুলো বোঝা চাপিয়ে দেই?”
ইমদাদ অসহায়ের গলায় বলল,
“তাহলে আমি কি করি আম্মু? ওদিকে কলির অশান্তি বেড়েই চলেছে। ওর সৎ মা তো আমার সামনেই ওকে যা ইচ্ছে তাই বলে, তাহলে ভাবো তো আমাদের সবার আড়ালে না জানি ওর সাথে কি ব্যবহারটাই করে। মেয়েটাকে খেতে অব্দি দেয় না।”
“আমি তোকে বলছি না যে তুই কলিকে বিয়ে করিস না। আমিও চাই যে তুই কলির দায়িত্ব নে, মেয়েটা খুব অসহায়। কিন্তু তোর বাবার অমতে বিয়ে করলে যে তোর সাথে আমার যোগাযোগটা বন্ধ হয়ে যাবে বাবা। তোর বাবা যদি দেখে ওনার অমতে গিয়ে আমি তোর সাথে যোগাযোগ রাখছি তবে আমাকেও উনি বাড়ি থেকে বের করে দেবে।”
“যদি বের করে দেয় আমি তোমাকে নিয়ে চলে যাব।”
ইমদাদ কথাটা বলতেই ওদের কানে ভেসে এলো ইকবালের কণ্ঠস্বর,
“আম্মু, কোথায় যাবে তুমি? ভাইয়া, কোথায় নিয়ে যাবে তুমি আম্মুকে?”
ইকবালকে ঘরে আসতে দেখেই তাড়াহুড়ো করে আঁখি নিজের কান্না থামালেন। মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন,
“কোথাও না বাবা। তুমি এখানে এসেছ কেন? যাও পড়তে বসো।”
“না, আগে বলো তুমি কাঁদছো কেন? আমায় মেজো ভাইয়া বলেছে বড় ভাইয়াও নাকি চলে যাবে। তুমি বলছো তুমিও চলে যাবে, তাহলে আমি কার কাছে থাকবো? আমি বাবার কাছে একা থাকবো না। বাবা শুধু বকা দেয়।”
আঁখি ছেলেকে দুহাতে আগলে নিয়ে ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“দেখেছিস, এদেরকে ছেড়ে আমি কি করে যাব? আবার তোকে ছেড়েও আমি কি করে থাকবো?”
ইমদদা একবার তাকালো ইকবালের মুখের দিকে। ইকবালের দিকে তাকাতেই আবার মনে পড়ে গেল ইমাদের কথা। আঁখি তো আছেই। এই মানুষগুলোকে ছেড়ে ইমদাদই একবারের জন্য চলে যাবে কি করে? কার ভরসায় রেখে যাবে এদেরকে? যদি ইমদাদের রাগ ফরিদ সাহেব এদের সবার উপরে বের করে তখন? আঁখিকে তো অবশ্যই অনেক কথা শুনতে হবে, গায়ে হাতও তুলতে পারে।
সবশেষে অনেক কিছু ভাবনা-চিন্তা করে ইমদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ঠিক আছে আম্মু, তোমায় কথা দিলাম বাবার অমতে বিয়ে করব না। আবার কলিকেও ছাড়বো না। বাবাকে রাজি করিয়ে তারপরেই বিয়েটা করবো।”