সময় তখন দুপুর বারোটা। কলি নিজের ঘরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। দরজা জানলা সব বন্ধ। ঘরের লাইটও জ্বলায়নি, যার ফলে পুরো রুম জুরে ঘুটঘুটে অন্ধকার বিরাজমান। দরজা জানালা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কলির কানে আঁখির চিৎকার করে কান্নার শব্দ আসছে। কিন্তু কলি চাইছে না এই কান্নার শব্দটা শুনতে। কিন্তু যতই চেষ্টা করুক না কেন এই কান্নার শব্দ কলির কানে আসছেই।
পুরো পাড়ায় শোক নেমেছে। সবার মুখে একটাই কথা, কম বয়সী একটা ছেলে হঠাৎ করে কেমন বিদায় নিলো সবার মাঝে থেকে। ছেলেটা তো আর কারোরই অপরিচিত না। এই পাড়াতেই জন্ম, এখানেই বেড়ে ওঠা, জীবনের কতগুলো বছর কাটিয়েছে এই পাড়াতে।
অনেকের অপছন্দের তালিকায় ইমদাদের নাম থাকলেও, অনেকের পছন্দের তালিকাতেও ইমদাদের নামটা ছিল। তারা সবাই জানে ইমদাদ হয়তো একটু রগচটা, অল্পতেই রেগে যায়, তবে কখনো অন্যায় কিছু করেনা। অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দেয় না। আর সবাই এটাও খুব ভালো করেই জানে যে ইমদাদ অযথা কোনো কারণে রাগে না।
ইমদাদের লা’শ আরো অনেকক্ষণ আগেই আনা হয়েছে পাড়ায়, তবে কলি এখনো যায়নি সেখানে। মাইশা এসে ডেকে গেছে, সাইদ এসেও ডেকে গেছে, তবে কলি কোন জবাব দেয়নি। সবাই হয়তো ভেবেছে যে কলি বোধ হয় কাঁদছে ঘরে বসে, তবে তেমনটা না। কলি কাঁদছে না। বরং কলি সবার প্রতি খুব বিরক্ত হচ্ছে, বিশেষ করে আঁখির প্রতি ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে।
কলি বুঝতে পারছে না উনি কেন এভাবে কাঁদছে। কলি তো জানে ইমদাদ ফিরে আসবে। ইমদাদ কলিকে কথা দিয়েছে যে ও ফিরবে। এই তো কলি এখন ইমদাদের দেওয়া বিয়ের লাল শাড়ি বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে বসে আছে।
কলি এই কথাটা মানতে নারাজ যে ইমদাদ আর নেই। কলি তো জানে ইমদাদ কখনও ওকে কষ্ট দিতে পারেনা, কখনো কলির চোখের জলের কারণ হতে পারে না। কথার খেলাপ করার স্বভাব ইমদাদের কোন কালেই ছিল না। তাহলে কি করে কলি এই কথাটা বিশ্বাস করে নেবে যে, যেই মানুষটা কলিকে এত স্বপ্ন দেখালো, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিল, নতুন একটা জীবন উপহার দেওয়ার কথা দিয়েছিল সেই মানুষটা হঠাৎ করে কলিকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। এটা তো অবিশ্বাস্য।
কলির এসব ভাবনার মাঝে আবারো দরজা ধাক্কানোর শব্দ এলো ওর কানে। সেই সাথে ভেসে এলে সাঈদের কণ্ঠস্বর।
“কলি দরজা খোল। একটু পরে ইমদাদের জানাযা হবে, তারপর নিয়ে যাব ওকে। আর কখনো দেখতে পাবি না। তুই একবারও দেখবি না ইমদাদকে? কলি ঠিক আছিস তুই? অন্তত কথা বল।”
চমকে উঠল কলি। কি আজেবাজে কথা বলছে এসব সাঈদ। আর কখনো ইমদাদ কে দেখতে পাবে না কেন? ইমদাদ তো কলি কে কথা দিয়েছিল ওরা সারা জীবন একসঙ্গে থাকবে। তবে দেখতে পাবে না কেন? কোথায় চলে যাবে ইমদাদ? কোথায় নিয়ে যাবে ওরা ইমদাদ কে?
কলির এসব ভাবনার মাঝে ফের সাঈদের কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“কলি পরে কিন্তু আফসোস করবি। একটাবার দেখে যা ইমদাদ কে। ইমদাদ সারা জীবনের মতন চলে যাচ্ছে কলি। একবার ওর কবর হয়ে গেলে আর কখনো দেখতে পাবি না। তখন কিন্তু আফসোস করবি। শেষবারের মতন দেখা করে নে কলি। এই সুযোগ আর পাবি না।”
কলি মেঝে থেকে উঠে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। কলিকে দরজা খুলতে দেখে সাঈদ একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ওর সাথে মাইশাও আছে। মাইশা এগিয়ে এসে কলিকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“তুই ঠিক আছিস কলি? কথা বলছিলিস না কেন? দরজা বন্ধ করে রেখেছিলি কেন? চিন্তা হচ্ছিল তো আমাদের।”
কলি মাইশার কথায় গুরুত্ব দিলো না। হয়তো মাইশার কথা ওর কান অব্দি পৌঁছালো না। প্রশ্নাত্মক গলায় সাঈদ কে জিজ্ঞেস করল,
“আর কখনো দেখতে পাবো না কেন ইমদাদ ভাইকে? কোথায় নিয়ে যাবে তোমরা ইমদাদ ভাইকে?”
কলির অবুঝ প্রশ্নগুলো শুনে সাঈদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। অসহায় মুখ করে কলির দিকে তাকালো। কলিকে বোঝানোর সাধ্য নেই সাঈদের যে ইমদাদকে ওরা কোথায় নিয়ে যাবে।
মাইশা কলি কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে চিন্তিত গলায় বলল,
“কি আজেবাজে কথা বলছিস তুই কলি? তুই জানিস না ইমদাদ ভাইকে কোথায় নিয়ে যাবে ওরা? তুই কি ভুলে গেলি সবটা? ইমদাদ ভাই আর নেই কলি।”
আরেক দফা চমকে উঠল কলি। সেই সাথে গা শিউরে উঠলো। মাইশার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“ইমদাদ ভাই নেই? নেই মানে কি? কোথায় ইমদাদ ভাই? কালই দেখা করে এসেছি আমি ইমদাদ ভাইয়ের সাথে। সাঈদ ভাইয়া, তুমি ভুলে গেলে? তুমিই তো নিয়ে গিয়েছিলে আমায়। মাইশা, ইমদাদ ভাই ঢাকায় আছে। আমায় বলেছে খুব তাড়াতাড়ি ফিরবে। তারপর আমরা বিয়ে করবো। আমার চেহারার যত্ন নিতে বলেছে জানিস। বলেছে না হলে ছবিতে ইমদাদ ভাইয়ের পাশে আমায় মানাবে না।”
কলি কথাগুলো বলতেই মাইশা কলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল,
“পাগলামী বন্ধ কর কলি। আমি জানি সত্যিটা মেনে নেওয়া কঠিন, কিন্তু তোকে সত্যিটা মানতে হবে। ইমদাদ ভাই আর নেই, মা’রা গেছে ইমদাদ ভাই। তুই কাঁদছিস না কেন? তোর ইমদাদ ভাই, তোর ভালোবাসার মানুষটা আর নেই কলি। তোর কষ্ট হচ্ছে না? তোর চোখে জল নেই কেন? প্লিজ একটু কান্না কর, নাহলে তো অসুস্থ হয়ে যাবি।”
কলি নিরুত্তর রইল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে মাইশার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মাইশা আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে সাঈদ ওকে থামালো। নিজে শান্ত গলায় কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমাদের সাথে চল। দেখবি তুই ইমদাদ কে।”
কথাটা বলে সাঈদ কলির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে ধরলো, তবে খেয়াল করলো কলি নড়ছে না। সাঈদ পিছন ফিরে তাকাতেই কলি ভয়ার্ত গলায় বলল,
“আমি যাব না।”
“কেন যাবি না? বারবার তোকে বোঝাচ্ছি আর কখনো দেখতে পাবি না ইমদাদকে।”
কলি এবারে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“আমি যাব না সাঈদ ভাইয়া। তোমরা আমাকে যাকে দেখতে নিয়ে যাচ্ছো ওটা আমার ইমদাদ ভাই না। আমার ইমদাদ ভাই কি করে আমায় ছেড়ে চলে যেতে পারে বলো? কালকেই তো মানুষটাকে ঠিক দেখে এলাম। কালকেই তো মানুষটার সাথে কথা বলে এলাম। আজ সেই মানুষটা নেই এটা হতে পারে না। কেন আমাকে মিথ্যে বলছো? কষ্ট দিও না আমায়। ইমদাদ ভাই জানলে কিন্তু তোমাদেরকে খুব বকবে।”
সাঈদ বুঝলো কলি কে বুঝিয়ে কোন লাভ হবে না। কলি এখন স্বেচ্ছায় যাবেনা। কলি সত্যিটা জানে, তবে গ্রহণ করতে চাইছে না। বাধ্য হয়ে সাঈদ জোর করে টেনেই কলিকে নিয়ে গেল।
ইমদাদের বাড়ির সামনে অনেক বড় উঠোন। সেখানেই ইমদাদের লা’শটা রাখা হয়েছে। ঘরের সামনের বারান্দায় আঁখি বসে থেকে তখনো কাঁদছেন। অন্যদিকে ফরিদ সাহেব কপালে হাত ঠেকিয়ে বসে আছেন। এখনও ইমদাদের লা’শ কে ঘিরে অনেক ভীড়। কাফনে মোড়া ইমদাদকে দেখতে সবাই নিজেদের জরুরী কাজ, শত ব্যস্ততা ফেলে রেখে আসছে।
সাঈদ আর মাইশা মিলে জোর করে কলিকে নিয়ে এলো ইমদাদের লা’শের কাছে। কলি তখনও কাঁদছে। বারবার সাঈদ আর মাইশা কে অনুরোধ করছে যেন ওকে যেতে দেয়। দেখবেনা এই লা’শটাকে। এটা তো ইমদাদ না, তাহলে ও দেখবে না এই লোকটাকে। আবার মাঝে মাঝে হুমকিও দিচ্ছে, যদি ইমদাদ জানতে পারে যে ওরা এভাবে কলিকে কষ্ট দিয়েছে তাহলে ওদের কাউকে ছাড়বে না।
দূর থেকে কলিকে কাঁদতে দেখলেন আঁখি। কলিকে দেখে হঠাৎ করে উনি নিজে কেমন যেন শান্ত হয়ে গেলেন। বন্ধ হয়ে গেল ওনার কান্না। উঠে ধীর পায়ে কলির দিকে এগিয়ে এলেন। ইশারায় মাইশাকে ছাড়তে বললেন কলির হাত। মাইশা ছেড়ে দিলো।
কলি আঁখিকে দেখতেই একটু ভরসা পেল। মনে হলো এবার ওকে হয়তো আঁখি সাহায্য করবে। ক্রন্দনরত গলায় অভিযোগ করে আঁখি কে বলল,
“আন্টি দেখো না, এরা কি আজেবাজে কথা বলছে। বলছে আমার ইমদাদ ভাই নাকি আর নেই। তুমি তো জানো বলো ইমদাদ ভাই কথার খেলাপ করে না। দেখো না, বারবার এরা শুধু বলছে ইমদাদ ভাই আর নেই। কেউ আমার কষ্টটা বোঝার চেষ্টাই করছে না।”
আঁখি জড়িয়ে ধরলেন কলিকে। কিছুক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কলিকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কলি শান্ত হলো। কান্নার বেগটা একটু কমলো। কলির কান্নার বেগ কমতেই আঁখি কলি কে ছেড়ে দিল। ইমদাদের লা’শের সামনে নিয়ে গিয়ে কলিকে বসালো। নিজে দু হাতে আগলে ধরে আছেন কলিকে।
কাফনের সাদা কাপড়টা সরাতেই বেরিয়ে এলো ইমদাদের শুকনো মুখটা। কলি তৎক্ষণাৎ খিঁচে দুই চোখ বন্ধ করে নিলো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। নিজেই বিরবির করে বলল,
“আমি ভুল দেখছি। আমি ভুল দেখছি।”
আঁখির কানে গেল কলির সেই কথাগুলো। পুনরায় কলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,
“অপারেশনে নিয়ে যাওয়ার আগে শেষবার যখন আমার ছেলেটার সাথে কথা হয়েছিল, তখনো বারবার শুধু তোর কথাই বলছিল। বারবার বলছিল যদি ও আর ফিরে না আসে আমি যেন তোর খেয়াল রাখি। বারবার শুধু আমায় একটা কথাই বলেছে যদি ওর কিছু একটা হয়ে যায় আমি যেন তোর খেয়াল রাখি, তোকে যেন সামলাই। ও জানত রে মা তোকে সামলানো খুব কঠিন হয়ে যাবে।”
একটু থামলেন আঁখি। না চাইতেও কেঁদে উঠলেন। একটু বিরতি নিয়ে ফের কলিকে বললেন,
“ছেলেটাকে যখন শেষবার জড়িয়ে ধরেছিলাম তখন আমার কানের কাছে ও একটা কথাই বলেছিল, আমি যেন তোর খেয়াল রাখি। ওর অবর্তমানে যেন তোর জীবনটা আমি গুছিয়ে দিই। আমি জানি রে মা তোর খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি জানি তোর জন্য এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। তবে একটা কথা ভেবে তুই সারা জীবন শান্তি পাবি, শেষ নিশ্বাস অব্দি আমার ছেলেটা শুধু তোর কথাই ভেবে গেছে। শুধু ভেবে গেছে কি করে তোকে ভালো রাখবে। সেই ছেলেটার মুখ তুই একবার দেখবি না মা? তোর কোন অভিযোগ নেই ওর প্রতি? শেষবারের মতো না হয় অভিযোগগুলো করে নে।”
আঁখি কথাগুলো বলতেই কলি দুহাতে ওনার গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। সে কি গগনবিদারী কান্না। কি ভয়ানক আর্তনাদ করে কাঁদছে কলি। হৃদয়ে কি বিশাল পরিমাণ হাহাকার জমে আছে সেগুলো যেন ওর কান্নার মাঝে প্রকাশ পাচ্ছে।
“আমার সংসার হলো না আন্টি। ইমদাদ ভাই খুব খারাপ। কথা রাখেনি ইমদাদ ভাই। আমার ইমদাদ ভাই ফাঁকি দিয়েছে আমায়। আমায় বিয়ে করল না আন্টি আমার ইমদাদ ভাই। আমাকে বারবার শুধু মিথ্যে বলে গেছে যে একদিন আমাদেরও একটা ছোট্ট সংসার হবে। আমাকে বারবার মিথ্যে বলে গেছে যে ইমদাদ ভাই সারা জীবন আমায় ভালোবাসবে, আমার যত্ন করে। আমি কি করে থাকব আন্টি। আমি যে আমার কল্পনায় একটা সংসার সাজিয়ে নিয়েছিলাম ইমদাদ ভাইয়ের সাথে। আমার সেই কল্পনা যে আমায় বাঁচতে দেবে না।”
উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয়ে মোচড় দিয়ে উঠলো। কলির হৃদয় কাঁপানো কথাগুলো শুনে যাদের চোখ শুকনাে ছিল তাদের চোখও যেন ভিজে উঠলো। কত অভিযোগ কলির মনে, কত আফসোস কলির মনে জমা হয়ে আছে। তবে যাকে ঘিরে সেই আফসোস আর অভিযোগগুলো সেই নেই।
কি অদ্ভুত! কলি আজ কাঁদছে, অসহায়ের মতন কাঁদছে অথচ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য, কলির চোখের জল মুছে দেওয়ার জন্য, কলিকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ইমদাদ নেই ।