দিনটা জুন মাসের দশ তারিখ। তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত। সবাই অপেক্ষায় আছে কবে একটু বৃষ্টি হবে আর এই ভ্যাপসা গরমের থেকে কিছু সময়ের জন্য হলেও মুক্তি পাবে। তবে সেই বৃষ্টির দেখা আর মিলছে না।
এই তীব্র গরমের দিনে বাসে এত ভীড়ের মাঝে যাতায়াত করাটা আরো বেশি কঠিন। কলির কাছে উপায় ছিল এই কঠিন রাস্তাটা বেছে না নিয়ে আরাম করে যাতায়াত করার। তবে কলি সেই পুরনো দিনের মতন বাসে করেই নিজের জন্মস্থানে পা রাখলো।
বাস থেকে নেমে একটা রিকশা দাঁড় করিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকানা বলে কলি রিকশায় উঠে বসলো। আজ দীর্ঘ দশ বছর পর আবার নিজের চেনা শহরে পা রাখলো কলি। পড়াশোনা শেষ করে কলি এখন ইউএনও পদে কর্মরত। এই দশ বছরে বদলেছে কলির স্বভাব, বদলেছে কলির আচরণ, ব্যবহার, কথাবার্তার ধরন, সেই সাথে বদলেছে কলির সাজসজ্জা।
রিকশা চলছে তার আপন গতিতে। কলি খুব মনোযোগ দিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে সবকিছু দেখছে। এই শহরটা অনেকটা বদলে গেছে। কত নতুন নতুন বিল্ডিং, দোকান, রেস্টুরেন্ট, শপিংমল তৈরি হয়েছে। পুরনো কিছু দোকানও চোখে পড়লো কলির। একসময় গিয়ে চোখে পড়লো পুরনো একটা ক্যাফে। ক্যাফের নামটা দেখে কলি চিনতে পারলো। এই ক্যাফেতেই তো শেষবার ইমদাদের সাথে একটু মন খুলে গল্প করেছিল। এই ক্যাফেতেই তো শেষবার কলি স্বপ্ন দেখেছিল একটা সংসারের, এই ক্যাফেতেই তো কলি শেষবার স্বপ্ন দেখেছিলো ইমদাদের বউ সাজার। আর আজ সেসব কেবল অতীত।
পুরনো কথাগুলো মনে করতেই কলির দুচোখ টলমল করে উঠলো। চোখের কালো চিকন ফ্রেমের চশমাটা খুলে শাড়ির আঁচলে চোখ দুটো মুছে নিল। তারপর চশমাটা মুছে নিয়ে আবার চোখে পড়লো।
দেখতে দেখতেই নির্দিষ্ট গন্তব্যে এসে পৌঁছালো কলি। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে সরু একটা গলির দিকে পা বাড়ালো। গলির ভেতরে প্রবেশ করার আগে চোখে পড়লো সেই ফুচকার দোকানটা। এখন আর এখানে ফুচকা বিক্রি হচ্ছে না। এখন সেটা কাপড়ের শোরুম হয়ে গিয়েছে। সেই ফুচকার দোকানদারও নেই। বদলে গেছে মানুষগুলো। কলি মলিন হেসে গলির দিকে পা বাড়ালো।
কলি যত এগোচ্ছে ততই কলির হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে একের পর এক সামনে আসছে নতুন মুখ। একটা সময় পাড়ায় এমন কোন মানুষ ছিল না যাকে কলি চিনতো না। আর এখন কাউকেই চিনতে পারছে না। পুরনো মানুষগুলো গেল কই? দশ বছরের ব্যবধানে মানুষগুলো হারিয়ে গেল!
পাড়ার মানুষগুলো অদ্ভুত দৃষ্টিতে কলিকে দেখছে, কেউ চিনতে পারছে না কলি কে। কলির জন্য যেমন তারা অপরিচিত ঠিক তেমনি তাদের কাছেও কলি অপরিচিত।
হাঁটতে হাঁটতে কলি এসে পৌঁছল নিজের বাড়ির সামনে। নিজের বাড়ি বললে অবশ্য ভুল হবে। যদি এটা কলির নিজের বাড়িই হতো, তবে কি আর কলি কে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হতো। এখানেই তো থাকতে পারতো, তবে পারেনি থাকতে কলি।
কলির মনে হলো ওর নিজের বাড়িতে যাওয়া উচিত হবে না। ওর নিজের বাবাই হয়তো ওকে দেখে খুশি হবে না। তার থেকে বরং ইমদাদের বাড়িতে আগে যাওয়া যাক। সেখানে গেলে অন্তত ইমদাদের মা ওকে দেখে খুশি হবে।
নিজের ভাবনা অনুযায়ী ঘুরে আবার ইমদাদের বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। এই বাড়িটা একটুও বদলায়নি, ঠিক আগের মতনই আছে।
দরজায় করাঘাত করতে গিয়ে কলির হাতটা কাঁপল। কিছু সময়ের জন্য থমকে রইলো। খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। কলি তো এখানে আসার আগে ঠিক করেই এসেছিল যে দুর্বল হবে না। নিজেকে শক্ত রাখবে ভেবেই তো এখানে আসার সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল। তাহলে এখন তো দুর্বল হলে চলবে না।
দরজায় করাঘাত করলো কলি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই দরজা খোলার আওয়াজ পেল। তবে অবাক করার বিষয় হলো দরজার খুলতেই আবারো একটা অপরিচিত মুখশ্রী ভেসে উঠল কলির সামনে। অল্প বয়সি একটা মেয়ে। পরনে সালোয়ার কামিজ। কলি চিনতে পারলো না মেয়েটাকে। একবার ভাবলো হয়তো ইমাদের বউ হবে। অনেকগুলো বছর তো কেটে গেছে, নিশ্চয়ই বিয়ে করেছে ইমাদ। তবে কলির জানামতে ইমাদের বউ হওয়ার কথা ছিল তো মাইশার। তবে এই মেয়েটা কে? তবে কি ওদের ভালোবাসাও পূর্ণতা পায়নি?
কলির এসব ভাবনার মাঝেই মেয়েটা নিজেই জিজ্ঞেস করল,
“কাউকে খুঁজছেন? চিনলাম না তো আপনাকে।”
কলির ধ্যান ভাঙল। মেয়েটার প্রশ্নের উত্তরে বলল,
“আঁখি আন্টিকে একটু ডেকে দেবেন! বলবেন কলি এসেছে।”
“আঁখি কে? এখানে তো এই নামে কেউ থাকে না। আপনি ভুল বাড়িতে এসেছেন।”
একটু চমকালো কলি। ভালো করে আবারো আশপাশটা দেখলো, সেই সাথে বাড়িটাও দেখলো। ভাবলো যেহেতু অনেক দিন পরে এসেছে ভুল হতেই পারে। কিন্তু কলি তো ভুল করছেনা। এই বাড়িটা চিনতে কলি ভুল করতে পারেনা।
“এটা তো আঁখি আন্টিরই বাড়ি। আপনি কে?”
“আপনি ভুল করছেন। আমার মনে হয় এই বাড়িটা আগে যাদের ছিল আপনি তাদের কথা বলছেন। তিন বছর হলো আমার শ্বশুর এই বাড়িটা কিনেছেন। আঁখি নামে কেউ থাকেনা এখানে।”
মেয়েটা কথাগুলো বলতেই ভেতর থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এলেন। ওদের কথোপকথন তিনি আগে থেকেই শুনেছেন। ফলস্বরূপ কাউকে আর নতুন করে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন পড়লো না। সরাসরি কলিকের উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আপনি যার নাম বলছেন সে আগে থাকতো এই বাড়িতে। আমার জানামতে উনি মা’রা গেছেন। উনি মা’রা যাওয়ার পর ওনার স্বামী বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছেন।”
কলি অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“আঁখি আন্টি মা’রা গেছেন?”
“আমি যতটুকু জানি ততটুকুই আপনাকে বললাম। বাড়ির মালিক মানে করিম সাহেব, উনি এখন কোথায় থাকেন সেটা জানিনা। তবে সামনেই ওনার মেজো ছেলে ভাড়া বাড়িতে থাকে। চাইলে সেখানে যেতে পারেন।”
কলির মাথাটা ঘুরে উঠলো। এটা কি খবর পেল কলি! আঁখি মা’রা গেছেন আর কলি জানতেও পারল না! কলির নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হলো। নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হলো কলির। আর কারো সাথে যোগাযোগ রাখুক বা না রাখুক আঁখির খোঁজটা নেওয়া উচিত ছিল কলির।
ইমাদের বাড়ির ঠিকানাটা বলে ওনারা দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। কলি ভাবলো একবার ওখানেই যাওয়া যাক। তাহলে এই কয় বছরে কলির অবর্তমানে কি হয়েছে সে সব জানা যাবে।
তবে সেখানে যাওয়ার আগে যে কলির আরো একটা কাজ বাকি আছে। ইমদাদের কবরটা কলি আজও দেখেনি। বলা যায় দেখার সাহস হয়ে ওঠেনি। তবে আজ যে কলিকে সেখানে যেতেই হবে। এতগুলো বছরের জমানো কথা আছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে ইমদাদকে বলার জন্য।
ইমদাদের বাড়ির পিছন দিকটায় ওদের জায়গা ছিল। সেই জায়গাটাকে পারিবারিক কবরস্থান বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন করিম সাহেব এবং সেখানেই ইমদাদকে দাফন করা হয়েছিল।
কলি সেই জায়গাটাতেই গেল। আজ প্রথম বারের জন্য কলি ইমদাদের কবর দেখলো। কবরের ফলকে “মরহুম ইমদাদ হোসাইন” লেখাটা পড়তেই কলির ভেতরটা কেমন অদ্ভুত ভাবে কেঁপে উঠলো। সেই কবরের পাশেই আরো একটা কবর, সেটা আঁখির।
কলির গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। নিজের ওপরে খুব বিরক্ত হলো কলি এতে। কলি তো নিজেকে অনুভূতিহীন বানাতে চেয়েছিল, তাহলে কাঁদলে তো হবে না।
নিজের ওপর জুলুম চালিয়ে কলি কান্না আটকালো। ইমদাদের কবর রেখে আঁখির কবরের কাছে যাওয়ার ইচ্ছে হলো না।
কলি ধুলো ময়লা কিচ্ছু মানলো না। বসে পড়লো ইমদাদের কবরের পাশে। কলি নিজেকে ভীষণ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,
“আমি ভালো আছি ইমদাদ ভাই। এখন আর কেউ আমায় মা'রতে পারে না। বড় হয়ে গেছে তোমার কলি। এখন আমি আর কাঁদি না। আমি নিজেকে একটুও কষ্ট দেই না। খুব ভালো আছি আমি।”
নিজের কথাগুলো শেষ করতেই কলি ডুকরে কেঁদে উঠলো। মূহুর্তের মাঝে শক্ত খোলসের মাঝে থেকে বেরিয়ে এলো কলির নরম সত্তা। কলি পারলো না নিজেকে সামলাতে। হাস্যোজ্জ্বল গলায় নেমে এলো বিষাদের সুর। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“মিথ্যে বললাম তোমায় ইমদাদ ভাই। আমি এখনো কাঁদি। তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে এমন কোন রাত আমার কাটেনি যেদিন আমি কাঁদিনি। প্রতিটা রাতে আমার বালিশ ভিজে যায়। আমি ভালো নেই ইমদাদ ভাই। আমি শুধু ভালো থাকার অভিনয় করি।”
কথাগুলো বলতেই কলি কান্নায় ভেঙে পড়লো। ঠিক কতটা সময় যে এভাবে কাঁদলো তার হিসেব কলির জানা নেই। বেশ অনেকটা সময় কাঁদার পর কলির নিজেকে একটু হালকা মনে হলো। নিজেই চেষ্টা করে নিজের কান্না থামালো। চোখের জল গুলো মুছে নিয়ে ফের বলা শুরু করলো,
“জানো ইমদাদ ভাই, তোমার কলি আজও ভীতুই আছে। সেজন্যই তো এতগুলো বছর কেটে গেছে অথচ আমি একটা বারের জন্য তোমার কবরটা দেখতে আসার সাহস করে উঠতে পারিনি, তবে আজ এসেছি। আজ তোমার চলে যাওয়ার গুনে গুনে দশটা বছর কেটে গেল। দশ বছর আগে ঠিক এই দিনটাতেই তুমি চলে গিয়েছিলে আমার থেকে অনেক দূরে। তুমি ভেঙে ছিলে তোমার কথা, তুমি ভেঙে ছিলে আমার স্বপ্নগুলো। তোমার কাছে নিশ্চয়ই সময়টা খুব কম মনে হচ্ছে তাই না? তোমার কাছে নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে এত তাড়াতাড়ি দশটা বছর কেটে গেল কি করে? লাগবেই তো। তুমি তো খুব শান্তিতে এখানে ঘুমিয়েছিলে, কিন্তু আমি জানি এই দশটা বছর কাটাতে ঠিক কতটা কষ্ট করতে হয়েছে আমায়। আচ্ছা ইমদাদ ভাই তুমি থেকে গেলে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো?”
কলির প্রশ্নের কোন উত্তর ভেসে এলো না। কলি তো জানে ওর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ইমদাদ নেই, তাও বোকার মতন কেন প্রশ্নটা করল কলি জানে না। নিজের বোকামির উপরে নিজেই হেসে উঠে বলল,
“তোমার কলি এখনো বোকাই রয়ে গেছে। আমি পড়াশোনা শেষ করেছি ইমদাদ ভাই। আমি এখন চাকরি করি, আমি ইউএনও হয়েছি। এখন তোমার কলি কে দেখে অনেকে ভয় পায়।”
কলি একটু থামলো। নিজের ব্যাগ থেকে একটা লাল শাড়ি বের করলো। এটা সেই শাড়ি যে শাড়িটা ইমদাদ দিয়েছিল কলিকে ওদের বিয়েতে পরার জন্য। কলি শাড়িটায় হাত বুলিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো।
“এই শাড়িটা পরার সৌভাগ্য আমার হলো না গো ইমদাদ ভাই। কোনদিন বউ সাজতে পারলাম না আমি। আমার একটা সংসারও হলো না। আমি জানি তুমি যতই আমায় নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিতে বলো না কেন, যদি আমি আমার পাশে অন্য কাউকে গ্রহণ করতাম তুমি খুব কষ্ট পেতে। আমি পারতামও না অন্য কাউকে গ্রহণ করতে। আমি আজও শুধু তোমারই আছি, আর সারাজীবন থাকবো। তোমাকে আমি বলেছিলাম আমি তোমাকে যতটা বোঝাতে পারিনি তার থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসি। তবে তুমি আমায় বোধহয় এতটা ভালোবাসতে না। ভালোবাসলে তো চলে যেতে পারতেনা এভাবে বলো।”
কথাগুলো বলে কলি আবারও কাঁদলো, তবে এবারে নিঃশব্দে কাঁদলো। এবারে আর কলির কান্নার কোন শব্দ হলো না। আবার কিছুটা সময় কাঁদার পর কলি ফের বলল,
“জানো ইমদাদ ভাই, আমি যেই বাড়িতে ভাড়া থাকি সেই বাড়িতে আরেকটা মেয়ে থাকে। ও পড়াশোনা করছে। ও যাকে ভালোবাসে সেও পড়াশোনা করছে। ওরাও না নিজেদের একটা সংসারের জন্য খুব কষ্ট করে। ওদের এক হওয়ার পথেও আমাদের মতনই অনেক বাধা। ওদের পরিবার মেনে নিচ্ছিল না ছেলেটা বেকার বলে, তবে আমি ওদের আলাদা হতে দেইনি। আমি ওই ছেলেটার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। ওদের বিয়েও দিয়েছি, থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। আমি চাইনি ইমদাদ ভাই আমাদের মতন আর কোন ভালোবাসা হেরে যাক। আমি চাইনি আরো কোন ইমদাদ অকালে হারিয়ে যাক। আমি চাইনি আরো কোন কলির সংসারের স্বপ্ন ভাঙুক।”
কথাগুলো বলতেই কলি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করে বলল,
“কেননা আমি জানি কল্পনায় গড়া সংসার যখন ভেঙে যায় তার কষ্ট ঠিক কতটা হয়। ইমদাদরা তো হারিয়ে যায়, কলিদের ফাঁকি দিয়ে চলে যায়, তবে বেঁচে থাকার যন্ত্রণাটা কলিরাই বোঝে। কলিদের সংগ্রাম দেখার জন্য ইমদাদরা থাকে না। কলিদের কষ্ট কেউ বোঝেনা। ইমদাদরা ম'রেও বেঁচে যায়, আর কলিরা বেঁচে থেকেও ম'রে যায়।”
কলি আরো কিছুটা সময় সেখানেই কাটালো। তবে এবারে কলির মনে হলো ওর চলে যাওয়া দরকার। আর কিছু সময় এখানে থাকলে হয়ত পুরনো নরম কলি আবার ফিরে আসবে।
লাল শাড়িটা ব্যাগে তুলে উঠে দাঁড়ালো। যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েও আবার থেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে আবারো তাকালো ইমদাদের কবরের দিকে। দু চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগলো। কলি ফুপিয়ে উঠে বলল,
“আমাদের সম্পর্কের কোনো নাম হলো না ইমদাদ ভাই। সবাই বলে তুমি কেউ না আমার, অথচ আমার সবটা জুড়ে শুধু তুমিই। আমার এই অধিকারও নেই যে মৃত্যুর পরে তোমার কবরের পাশে একটু নিজের জন্য জায়গা চাইবো। তুমি খুব স্বার্থপর ইমদাদ ভাই। আমায় সব দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেলে।”
_________
“মাইশা, দেখোতো কে এলো।”
ইমাদের কথাটা শুনে মাইশা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আমি এখানে গরুর জন্য ঘাস কাটছি না যে নিজে গল্প করছো আর আমায় দরজা খুলতে পাঠাচ্ছো। যাও, দরজা খোলো।”
মাইশার ধমক শুনে ইমাদ কেঁপে উঠলো। ওর পাশে বসা সাঈদ বলে উঠলো,
“তুই থাক। আমি খুলছি দরজা।”
কথাটা বলে সাঈদ নিজেই উঠে গেল দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই দেখলো একজন মধ্যবস্ক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। সাঈদ কে দেখতেই কলি একটু হাসলো। সাঈদ হা করে বেশ অনেকক্ষণ কলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, তবে চিনতে পারলো না। কলির পড়নে সাদা আর কালো রং এর মিশেলে তৈরি একটা সুতি শাড়ি। লম্বা চুলগুলো খোঁপা করা, চোখে চশমা। আগের তুলনায় অনেকটাই শুকিয়ে গেছে, তবে বেড়েছে চেহারার উজ্জ্বলতা। আগের তুলনায় আরো বেশি সুন্দর হয়েছে কলি। চেহারায় হালকা হলেও একটু পরিবর্তন এসেছে।
“আমি কলি সাঈদ ভাইয়া। চিনতে পারলে না আমায়?”
সাইদের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো,
“তুই কলি!”
কলি আলতো হেসে বলল,
“হ্যাঁ, আমি কলি। ভালো আছো তুমি?”
সাঈদ কলির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জোরে জোরে ইমাদ আর মাইশার নাম ধরে ডাকলো। ওরা ছুটে এলো দরজার কাছে। ইমাদ কলি কে চিনতে না পারলেও মাইশা চিনতে পারলো। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে দু হাতে কলিকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“তুই খুব খারাপ কলি। এভাবে কেউ হারিয়ে যায়!”
কলি দুহাতে মাইশা কে জড়িয়ে ধরে বলল,
“এভাবে না বলে হুট করেই তো সবাই হারিয়ে যায় মাইশা। এভাবেই তো সবাই আমাদের হুট করে একা করে দিয়ে যায়।”
__________
কলি খবর পেল আঁখি মারা যাওয়ার কয়েক মাস যেতে না যেতেই করিম সাহেব দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তারপর বাড়িটাও বিক্রি করে দেন। এখন দ্বিতীয় স্ত্রী কে নিয়ে নিয়ে আলাদা থাকেন। ইমাদ আর মাইশা বিয়ে করেছে আজ ছয় বছর হতে চলল। একটা ছেলেও আছে ওদের। ইকবাল ওর ভাইয়ের কাছেই থাকে আবার বাবার সাথেও থাকে। পড়াশোনা করছে। সাঈদও বিয়ে করেছে পাঁচ বছর হতে চলল। সবাই বেশ ভালোই আছে নিজেদের জীবনে। কারো জীবনই কারোর জন্য থেমে নেই।
বিকেল পর্যন্ত ওদের সাথেই থাকলো কলি। এবারে কলির যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। যাওয়ার আগে কলির মনে হলো সাঈদের সাথে একটু কথা বলা দরকার। কলি মাইশা আর ইমাদ কে আসতে দিল না ওর সাথে। ফোন নাম্বার দিয়েছে, সেই সাথে কথাও দিয়েছে যোগাযোগ করবে। সাঈদ আসতে চায়নি, আবার নিষেধও করেনি।
একদম গলির শুরুর প্রান্তে এলো দুজনে। তবে সাঈদ একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না।
“পুরনো কথা ভুলে যাও সাঈদ ভাইয়া।”
চমকে উঠলো সাঈদ। থতমত খেয়ে বলল,
“হ্যাঁ, কি বললি?”
“বললাম পুরনো কথা ভুলে যাও। আমি জানি তুমি আমার ভালোর জন্যই বিয়ের সম্বন্ধটা পাঠিয়েছিলে। কিন্তু তুমি তো জানো বলো, ইমদাদ ভাই ব্যতীত আর কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব না।”
সাঈদ মাথা নামিয়ে নিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
“আমায় ক্ষমা করে দেস কলি। আমি কাজটা ঠিক করিনি। তবে এটা ঠিক আমি তোর কথা ভেবেই কাজটা করেছিলাম। ইমদাদও বলেছিল আমায়।”
কলি শুধু হাসলে। আর এই নিয়ে কথা বাড়াতে চাইলো না।
“এখন আর ফুটবল খেলো না?”
সাঈদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“না। ওই খেলার মাঠটা বিষাক্ত লাগে। ইমদাদ ছাড়া খেলে আনন্দ নেই।”
গল্প করতে করতেই গলির মোড়ে এসে গেল ওরা। এবারে বাকি রাস্তাটা কলি কে একাই হাঁটতে হবে। সাঈদের থেকে বিদায় নিয়ে কলি বাকি রাস্তা হাঁটা আরম্ভ করলো।
আকাশটা অনেক আগেই মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। হঠাৎ করেই গাছপালা গুলো কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠলো। দমকা হাওয়া এসে বারবার কলির গায়ে লাগলো। রাস্তার ধুলোবালি গুলে উড়তে শুরু করলো। সেই দমকা হাওয়া, রাস্তার ধুলোবালি সবই ছুঁয়ে যাচ্ছে কলিকে। সেই সাথে কলিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে একরাশ হাহাকার আর হতাশা।
নয় বছর আগে যেমন কলির এই জায়গাটা ছেড়ে যাওয়ার সময় কষ্ট হচ্ছিল আজও তেমনটাই হচ্ছে। কোনো মানুষ কে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট না, কষ্ট হচ্ছে একটা মৃত মানুষের কবর ফেলে রেখে যাওয়ার। সেই সকল বিষাক্ত অনুভূতি গুলো কলি নিজের মাঝে জড়িয়ে নিতে চাইলো। সেগুলো কলি কে যতই কষ্ট দেক না কেন, তাও সেগুলোই কলির প্রিয়।
একটা লম্বা শ্বাস টেনে কলি নিজেই মনে মনে আওড়ালো,
“এই ধুলোমাখা গলিতে তোমার আমার প্রতিটা মূহুর্ত লুকিয়ে আছে ইমদাদ ভাই। কিছু ফেলে রেখে গেলাম, কিছু নিজের সাথে করে নিয়ে গেলাম। তোমার ভালোবাসা, তোমার স্মৃতি, তোমার দেওয়া বিয়ের শাড়ি আজও আমার কাছে আছে আর সারাজীবন থাকবে। তবে আফসোস আমার একটাই, আমাদের সম্পর্কের কোনো নাম হলো না।”
নোট: গল্পটা সম্পূর্ণ বাস্তব না হলেও আংশিক বাস্তব ঘটনা থেকে নেওয়া। সত্যি ইমদাদ বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল ঠিক বিয়ের আগে। সত্যিই ইমদাদ কলির জন্য বিয়ের শাড়ি কিনে এনেছিল। গল্পে ইমদাদের যেভাবে মৃত্যু দেখিয়েছি সেভাবেই বাইক এক্সিডেন্টে মা'রা গিয়েছিল ইমদাদ। আঁখির হঠাৎ মৃত্যু, করিম সাহেবের দ্বিতীয় বিয়ে এসবও সত্যি। আমি বাস্তবের ইমদাদ-কলির ভালেবাসার গল্প জানিনা, কিভাবে ওদের দেখা হয় সেসবও জানি না। সেজন্য সেগুলে বানিয়ে লিখেছি। কলি সম্পর্কেও আমার কোনো ধারনা ছিল না, সেজন্য কলির ঘটনাও গল্পের প্রয়োজনে আমি বানিয়েছি। বাস্তবের ঘটনাটা অনেক পুরনো। আমি শুনেছিলাম দু-তিন বছর আগে এবং যতটুকু তথ্য পেয়েছিলাম তখনও কলি বিয়ে করেনি। আমি জানি না এখন কলি নিজের জীবনে এগিয়েছে কিনা, তবে গল্পে আমি কলি কে অন্য কারোর হতে দেইনি। গল্পের ইমদাদ-কলির ভালোবাসার সাথে আমি বাস্তবের ইমদাদ-কলির(ছদ্মনাম) ভালোবাসার তুলনা করবো না। বাস্তবের ইমদাদ-কলির ভালোবাসা হয়ত আরো সুন্দর, আরো গভীর ছিল। গল্পে আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয়েছে আমি দেখিয়েছি।
আপনাদের অভিযোগ গল্পে কেন মিল করিয়ে দিলাম না। তাহলে বলবো আমার উদ্দেশ্যই ছিল ইমদাদ-কলির অপূর্ণতার গল্পটা আপনাদের কাছে তুলে ধরার। চাইলে তো সবই হতো কিন্তু আমি চাইনি। কাউকে ভালোবেসে সারাজীবন অপেক্ষা করা যায় সেটাই দেখাতে চেয়েছি। কলির ভালোবাসার তীব্রতা দেখানোই ছিল আমার উদ্দেশ্য। এরপরেও আপনাদের যা অভিযোগ আছে আমি মেনে নিলাম। আপনাদের এখন গল্পটা পড়তে যতটা কষ্ট হচ্ছে, আমার এই গল্পটা শোনার পরে ঠিক ততটাই কষ্ট হয়েছিল। আমি এই অপূর্ণতার গল্পটাই লিখতে চেয়েছিলাম।
বাস্তবে সাঈদের উপস্থিতি ছিল কিনা আমি জানিনা। মাইশার মতন একজন বন্ধু কলির ছিল কিনা আমি জানিনা। তবে আমার এই গল্পটা শোনা ইমদাদের এক আত্নীয়ের থেকে। সে যতটুকু জানে ততটুকুই বলেছিলো।
সবশেষে এটাই বলবো, অভিযোগ করবেন না। ইমদাদ-কলির ভবিতব্যই এটা। এভাবেই ওদের ভালোবাসা কে বেঁচে থাকতে দিন।