ধুলো মাখা গলিতে

পর্ব - ১২

🟢

অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে মাঝে একটা বছর কেটে গেল। বাকি সবার কাছে এই একটা বছর স্বাভাবিক ভাবে কাটলেও কাটেনি ইমদাদের কাছে। দিন দিন যেন ইমদাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।

এক বছর আগে তো কলির সাথে বিয়ের কথাবার্তা সব ঠিক করেই রেখেছিল। সেদিন করিম সাহেব যখন বলেছিল ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত জানাবে তখন ইমদাদ নিশ্চিত ছিল এই বিষয়ে, যে যতই ভাবুক না কেন উনি বিয়েতে রাজি হবেনই। রাজি হয়েও ছিলেন, তবে আবার কিছুদিন হলো বেঁকে বসেছেন।

উনি নাকি আর ইমদাদের সাথে মেয়ের বিয়ে দেবেন না। কলির বিয়ের সম্বন্ধ অনেক বড় বড় পরিবার থেকে আসছে। মেয়ে তার অসম্ভব সুন্দরী। সে হিসেবে যৌতুকও দিতে হবে না। বরং নিকটাত্মীয়ের মাঝে এমন প্রস্তাব পেয়েছেন যে মেয়েকে তাদের বাড়িতে বিয়ে দিলে বিনিময়ে তিনি কিছু সুযোগ সুবিধা পাবেন। ছেলে থাকে বিদেশে। ভবিষ্যতে ওনাকেও সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

কথাটা যদি এতটুকু পর্যন্ত থেমে থাকতো তাও নাহয় ইমদাদ সামাল দিতে পারতো। হয়তো করিম সাহেবের অনুমতির প্রয়োজন পড়তো না কলিকে বিয়ে করার জন্য। তবে করিম সাহেব এই কথাটা ইমদাদকে না বলে সরাসরি গিয়ে বলেছিলেন ফরিদ সাহেবকে।

ফরিদ সাহেবের ধারণা মতে কলিকে যে ওনার ছেলে বিয়ে করছে এতে কলির চৌদ্দগুষ্টির কপাল ভালো। সেখানে কলির বাবার সাহস হয় কি করে নিজ থেকে এসে এই বিয়েতে আপত্তি জানানোর এবং ওনার ছেলে কে কলির অযোগ্য বলার। ব্যাপারটা ওনার আত্মসম্মানে লেগেছে। সেই থেকে আবার উনিও বেঁকে বসেছেন এই বিয়েতে।

বাড়িতে আঁখির উপর অত্যাচার বেড়েছে। ফরিদ সাহেব ছেলের সাথে আর পেরে না উঠে শেষমেশ নিজের স্ত্রীকেই হুমকি দিয়েছেন, যদি ইমদাদ কলিকে বিয়ে করে, তবে সেই দিন সেই মুহূর্তে উনি নিজের স্ত্রীকেও বাড়ি থেকে বের করে দেবেন।

কলি এখন শুধু অপেক্ষায় আছে কবে ইমদাদ এসে ওকে নিয়ে যাবে। কলির বাবার আপত্তিতে কলির কিছু যায় আসে না। শুধু একবার ইমদাদ ওর দিকে হাত বাড়ালে কলি সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাতটাও বাড়িয়ে দেবে, তবে ইমদাদই আর আসছে না।

কলি জানে ইমদাদ নিজেও সমস্যার মাঝে আছে, তবে কলির মন যে মানতে চায় না। পাড়া-প্রতিবেশী সবাই জেনে গিয়েছিল ইমদাদ কলির বিয়ের কথা। এখন অনেকেই কলিকে ভয় দেখায় মাঝে মাঝে, যে ইমদাদ ওকে আর বিয়ে করবে না। এভাবে অপমান করার পরেও ইমদাদের বাবা কোনমতেই আর ছেলে কে এখানে বিয়ে করাবেন না।

কলির মনের মাঝে একটা ভয় ঢুকে গেছে। যদিও কলি ইমদাদের ব্যবহারে কোন পরিবর্তন পায়নি। আগে যেভাবে কথা বলতো, যতটা সময় দিত এখনো ঠিক ততটা সময়ই দেয়। কলির সাথে কখনো রাগারাগি করে না, কখনো খারাপ ভাবে কথাও বলে না কিংবা এড়িয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করে না। তারপরও কলির ভয় করে। মনে হয় যদি এভাবে অপেক্ষা করতে করতেই সারাটা জীবন কেটে যায় কিন্তু তবু ইমদাদকে না পাওয়া হয় তাহলে! শুধু ভাবে জীবনটা যদি আক্ষেপ নিয়ে কেটে যায়!

এখন স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী কলি। ইমদাদ যে কলেজে পড়াশোনা করে সেই কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাইরে কোথাও পড়তে যাওয়ার সুযোগ হয়নি কলির। পড়াশোনাতেও আজকাল তেমন একটা মন বসে না। যদিও ইমদাদের কড়া আদেশ রেজাল্ট ভালো করতে হবে। এই সবকিছুর প্রভাব যেন কোন মতেই কলির পড়াশোনায় না পরে। কলি ইমদাদের আদেশ মেনে চলার চেষ্টা করে, তবে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

কলেজে যাতায়াত নিয়মিতই হয় কলির। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ক্লাস শেষে কলেজ থেকে বেরোতেই গেটের কাছে ইমদাদ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠল কলি।

কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো ইমদাদের দিকে। একবার ভাবলো ভুল দেখছে কি? আবার পর মুহূর্তে মনে হলো ভুল কেন দেখতে যাবে। এমনটা তো সব সময় হয় না।

কলির এসব ভাবনার মাঝে ইমদাদ নিজ থেকে এগিয়ে এলো কলির দিকে। মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“ভুল দেখছিস না, আমি সত্যি দেখা করতে এসেছি তোর সাথে।”

কলির মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না। ইমদাদ বুঝলো এখন কলি হয়তো আর কিছু বলতেও পারবেনা। তাই সেখানে আর দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করলো না। একটা রিকশা দাঁড় করিয়ে কলি কে নিয়ে রিক্সায় উঠে পড়লো। কলি একবার জিজ্ঞাসাও করল না কোথায় যাচ্ছে, কেনই বা যাচ্ছে।

রিক্সা এসে থামলো একটা ক্যাফের সামনে। রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে কলি কে নিয়ে ক্যাফের ভেতরে গিয়ে বসলো ইমদাদ। কলি এখনো একটা কথাও বলেনি। ইমদাদ আরেকটু সময় দিলো কলি কে। আর এই পুরো সময়টুকু নিজে শুধু কলির দিকে তাকিয়ে থাকলো।

অনেকগুলো দিন পর আজ ইমদাদ আবার কলিকে দেখলো। ইমদাদের মনে হলো কলির সৌন্দর্য বোধহয় একটু কমে গেছে। রাত জেগে চিন্তা করতে করতে চোখের নিচে কালি জমেছে, গায়ের রংটা ফ্যাকাস হয়ে গেছে। ইমদাদ আরেকটা বিষয় খেয়াল করলো, কলি লম্বা চুলগুলো কেটে ছোট করেছে। ব্যাপারটা ইমদাদের একটুও পছন্দ হলো না, তবে আপাতত এই নিয়ে কোন কথাও তুলতে ইচ্ছে করলো না।

বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও যখন কলি কিছুই বলল না তখন ইমদাদের মনে হলো এবার ওর কিছু একটা বলা দরকার।

“এতদিন পর আমাদের দেখা হলো, তোর কিছু বলার নেই আমায়?”

"বাবা আমার বিয়ের সম্বন্ধ দেখছে অন্যজায়গায় ইমদাদ ভাই।"

দীর্ঘদিন পর ইমদাদ দেখা পেয়েছে কলির। ভেবেছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথম সাক্ষাৎটা বেশ মনোরম ভাবে কাটাবে। তবে ভাগ্য সহায় হলো না ইমদাদের। কলির বলা উক্ত বাক্যটা শুনে চমকালো, একটু অবাক হলো, সেই সাথে আবার কপালে চিন্তার রেখাও ফুটে উঠলো। তবে কলির সাথে আজ পুরোনো ইমদাদের মতন করে কথা বলতে ইচ্ছে করলো, যে বরাবরই এসব বিষয়ে গা ছাড়া স্বভাবের।

বিস্ময়ের সুরে কলি কে জিজ্ঞেস করলো,

"তুই এত বড় হয়ে গিয়েছিস কলি, যে তোর বিয়ের সম্বন্ধ দেখা শুরু করে দিয়েছে তোর বাপ, তাও আবার আমার অনুমতি ব্যতীত ?"

"বিশের কোঠায় পা দিয়েছি। বিয়ের জন্য আরো কত বড় হতে বলছো? আর কত অপেক্ষা করবো আমি?"

কলির কন্ঠে প্রকাশ পেল কিঞ্চিৎ রাগ, আর বেশ অনেকখানি অভিমান। ইমদাদ আবার গা ছাড়া স্বভাবের মানুষ। তবে কলির কথা যে ইমদাদের ওপর প্রভাব ফেলল সেটা ইমদাদের কুঞ্চিত ভ্রুঁ জোড়া দেখেই বোঝা গেল। তবে খুব শীঘ্রই নিজের অভিব্যক্তি করে তুলল গা ছাড়া স্বভাবের। হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,

"তুই তো আমার সম্পদ কলি, তবে তোর বাপ তোকে অন্যের নামে দলিল করে দিতে চায় কোন সাহসে? ইমদাদ পাড়ায় থাকে না জন্য কি তোর বাপ ভেবেছে ইমদাদের ক্ষমতা কমে গেছে নাকি?"

কলি প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,

"শুধুই সম্পদ, আর কিছু না?"

"আর কি হতে চাস?"

কলি কাতর গলায় বলল,

"আমি একটা নির্দিষ্ট পরিচয় চাই তোমার থেকে ইমদাদ ভাই, যেই পরিচয় হবে সম্পদের থেকেও দামি, যে পরিচয়ের জন্য অনেকগুলো দিন থেকে আমি ছটফট করছি। আর অপেক্ষা করা যায় না।”

ইমদাদ ভ্রুঁ উঁচিয়ে বলল,

"সেই পরিচয়ও তো তোকে দিয়েছি আমি। কেন জানিস না তুই?"

কলি অবুঝের মতন দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

"না তো। কে আমি?"

ইমদাদ হাসলো। কলির চোখের নিচে তৈরি হওয়া আঘাতের কালচে দাগটায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

❝তুমি আমার এমনই একজন,

যারে এক জনমে ভালোবেসে,

ভরবে না এ মন!❞

কথাটা বলে হো হো করে হেসে উঠলো ইমদাদ। কলির খুব অপছন্দ হলো এমন সময় ইমদাদের মশকরা। মৃদু রাগী গলায় বলল,

“যদি তোমার আমায় বিয়ে করার ইচ্ছে না থাকে তবে সেটা সরাসরি আমায় বলে দাও ইমদাদ ভাই। তবে দয়া করে আমার সাথে মজা করো না। আমি হয়তো কখনো আমার অনুভূতি ঠিকঠাক ভাবে প্রকাশ করার সুযোগ পায়নি, তাই বলে আমার অনুভূতিকে ছোট করো না। আমি শুধু তোমায় এতোটুকু বলতে পারি, আমি তোমায় যতটুকু বোঝাতে পারিনি তার থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসি তোমায়।”

ইমদাদের হাসি থেমে গেল। বুঝলো আর মজা করা ঠিক হবে না। ইমদাদের মুখটা এবার গম্ভীর হয়ে উঠলো। গুরুতর ভঙ্গিতে কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোর বাপের অমতে বিয়ে করতে পারবি তো আমায়? আমার হাত ধরে বেরিয়ে আসার পর কখনো তোর আফসোস হবে না তো নিজের সিদ্ধান্তের উপরে? একবার যদি তোকে আমি ওই বাড়ি থেকে বের করে আনি, আর কিন্তু ওদের সাথে যোগাযোগ রাখতে দেব না। হুট করে আবার কান্নাকাটি জুড়ে দিবি না তো?”

কলি কোন সময় ব্যয় না করে বলল,

“কখনো এমন করব না। আমার অস্থিরতা কি তোমায় বোঝাতে পারছে না ইমদাদ ভাই আমি এখন শুধু তোমায় চাই? আমার সমস্ত ব্যাকুলতা শুধুমাত্র তোমাকে পাওয়ার জন্য।”

ইমদাদ আলতো হাসলো। ইমদাদ নিজের সাথে করে কয়েকটা ব্যাগ এনেছে। এতক্ষণ কলি সেসব খেয়াল করেনি। খেয়াল করলো তখন যখন ইমদাদ ব্যাগগুলো নিচ থেকে তুলে টেবিলের উপরে রেখে কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এগুলো তোর জন্য।”

কলির একবারও জানার আগ্রহ হলো না ব্যাগের ভেতর কি আছে। বরং বিরক্তিকর গলাতে বলল,

“আমার এসব উপহার চাই না ইমদাদ ভাই। আমার শুধু তোমাকে দরকার।”

“বোকা মেয়ে একবার খুলে তো দেখ কি আছে। আমি নিজে পছন্দ করে সবকিছু কিনেছি। তোর বিয়ের শাড়ি, চুড়ি, সাজগোজের জিনিস, মাথায় দেওয়ার ওড়না সবকিছু আমি নিজে পছন্দ করে কিনে এনেছি। কি ভেবেছিস তোকে এভাবেই বিয়ে করব? না রে পা'গলী, তোকে সুন্দর করে সাজিয়ে বিয়ে করবো। তোকে যেন ফুটন্ত কলির মতন লাগে দেখতে তেমন ভাবে সাজিয়ে বিয়ে করবো।”

মুহূর্তের মাঝে কলির চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো। ব্যাগগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এগুলো আমার বিয়ের জন্য কিনেছো তুমি?”

ইমদাদ মাথা নাড়িয়ে বললো,

“হ্যাঁ। এর মাঝে একটা লাল শাড়ি আছে। তুই এটা পরলে তোকে দেখতে একদম পুতুলের মতন লাগবে। আমার শেরওয়ানিও আছে। আপাতত তোর কাছেই রেখে দে সব। সামনের সপ্তাহে তিন দিনের ছুটি পাবো। আর সেই ছুটিতে এসে বিয়ে করবো। কে মানলো কে মানলো না সে সব দেখার সময় আর নেই। যথেষ্ট ধৈর্য ধরেছি, আর পারবো না। অনেক ভেবেছি অন্যের কথা এবার শুধু ভাববো আমাদের দুজনের কথা।”

কলি পুনরায় অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“সত্যি আমাদের বিয়ে হবে ইমদাদ ভাই? সত্যি আমি তোমার জন্য বউ সাজবো?”

“হ্যাঁ। তুই শুধু আমার জন্য বউ সাজবি। আমাদের বিয়ে হবে কলি। তোকে কথা দিয়েছিলাম না আমাদের বিয়ে হবে? আমি রাখবো সে কথা। আর কয়েকটা দিনের অপেক্ষা, তারপরে তোর পরিচয় হবে তুই ইমদাদের বউ।”

___________

আজ রাতের বাসে ইমদাদ আবার ঢাকায় ফিরে যাবে। বিয়ের সিদ্ধান্তটা কেবলমাত্র আঁখিকে জানিয়েছে, ফরিদ সাহেবকে এখনো জানানো হয়নি। আঁখি নিজেই ইমদাদ কে বিয়েটা করে নেওয়ার কথা বলেছে। সেই সাথে এটাও বলেছে ওর বাবা শুধু ভয়ই দেখাবে, ওনার সাথে কিচ্ছু করবে না।

ইমদাদ তাই ঠিক করেছে বিয়ে করার আগে জানাবে না ফরিদ সাহেব কে। জানালেই ঝামেলা করবে। ইমদাদ দেখতে চায় বিয়ে করে যখন বউ সমেত বাড়ি ফিরবে তখন ফরিদ সাহেব কি করে। মানলে ভালো, আর না মানলে তখনই কলিকে নিয়ে চলে যাবে। না এত ঝামেলা করবে, না ধৈর্য ধরে বসে থাকবে।

অনেকদিন পর ছেলে বাড়িতে আসায় আঁখি ছেলের পছন্দমত সব রান্না করলেন। তার দৃষ্টিতে তার ছেলে শুকিয়ে গেছে, খাওয়া-দাওয়া কিছুই ঠিকঠাক করে না। তাই আজকে তিনি ছেলেকে পাশে বসিয়ে একদম যত্ন করে খাওয়াবেন।

সন্ধ্যের দিকে ইমদাদ ফরিদ সাহেবের বাইক নিয়ে বাইরে বেরোলো। বাসের টিকিট কাটতে যাবে, সেই সাথে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা করবে। সবার একটাই অভিযোগ ইমদাদের প্রতি, ইমদাদ শুধু কলিকে সময় দেয়। বন্ধুদেরকে ভুলেই গিয়েছে। তাই আজ যতটুকু সময় পাবে একটু বন্ধুদের সাথে কাটাবে।

পাড়ার মোড়ে গিয়ে দেখা হলো ইমদাদের মাইশার সাথে। মাইশাকে দেখতেই ইমদাদ বাইকটা দাঁড় করালো। ইমদাদকে দেখে মাইশা চমকে উঠল। জানতো না ইমদাদ এসেছে। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“আরে ইমদাদ ভাই, তুমি কখন এসেছ? আমি তো জানতাম না।”

ইমদাদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কেন ইমাদ কিছু বলেনি তোকে? আমি তো ভেবেছিলাম ওর থেকে খবর পেয়ে যাবি, সেজন্য আর আমি জানাইনি।”

বিজ্ঞাপন

ইমদাদের মুখ থেকে ইমাদের নামটা শুনতেই মাইশার মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। একটু ভয়ও পেল। তোঁতলানো গলায় বলল,

“না তো। ইমাদের সাথে তো আমার কথা হয়না। ও কি করে আমায় খবর দেবে।”

কথাটা বলে মাইশা অযথা কোন কারণ ছাড়া বোকার মতন হাসলো। মাইশার হাসিটা দেখে ইমদাদের নিজেরই হাসি পেল। মাইশার মাথায় হালকা করে একটা গাট্টা মে'রে বলল,

“রতনের বউকে দেখতে গিয়েছিলি?”

কথাটা বলে ইমদাদ ঠোঁট টিপে হাসলো। মুহূর্তের মাঝে মাইশার মুখ থেকে হাসি উড়ে গেল। রাগান্বিত গলায় বলল,

“ওই শ'য়'তা'নের নামও মুখে নেবে না। শা'লা ভ'ন্ড কোথাকার। আমার সাথে প্রেমের নাটক করে বউ নিয়ে এসেছে বাড়িতে। শা'লা একটা বা'ট'পা'র।”

“যা হয় ভালোর জন্যই হয়। বেঁচে গিয়েছিস ওর হাত থেকে। যাইহোক, কলির সাথে কথা হয়েছিল আজ?”

“না তো। দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি আজ।”

“তারমানে কিছুই জানিস না। সময় করে একবার আমার বাড়িতে যাস। আমি তো থাকবো না, মায়ের কাছে তোর কিছু জিনিসপত্র রাখা আছে। ওগুলো নিয়ে আসিস। আর সামনের সপ্তাহের শুক্রবার তোর দাওয়াত। দুপুরে আমি বাইরে খাওয়াবো।”

মাইশা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কিসের জন্য দাওয়াত? আর কি এনেছো আমার জন্য?”

“তোর সখীর বিয়ে। তুইতো মুখ ফুটে আবদার করেছিলি যেন আমার আর কলির বিয়েতে তোকে আমি একটা শাড়ি কিনে দেই। আমি শুধু শাড়ি না, আরো বেশ কিছু সাজার জিনিসপত্র এনেছি। কলির জন্যও এনেছি। তোদের দুজনের শুধু শাড়িটা আলাদা। বাকি সাজার জিনিস সব একই কিনেছি যেন তুই অভিযোগ করতে না পারিস যে আমার বউকে ভালো জিনিস দিয়েছি আর তোকে খারাপ জিনিস দিয়েছি। পরে তোর বিয়ের সময় তোকেও একটা লাল শাড়ি উপহার দেব।”

বিস্ময়ে মাইশার মুখ হাঁ হয়ে গেল। খুশি হবে না অবাক হবে বুঝতে পারছে না। অতিরিক্ত আনন্দে চেঁচামেচি করবে নাকি কেঁদেই ফেলবে খুশিতে সেটাও বুঝতে পারছে না। এত বড় একটা খবর অথচ কলি ওকে দিল না। এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলো কলি মাইশার সাথে।

মাইশা কে চুপ করে থাকতে দেখে ইমদাদ বলে উঠলো,

“শুনতে পাসনি কি বললাম? আমার আর কলির বিয়ের দাওয়াত দিলাম।”

এবারে আর মাইশা নিজের আনন্দ ধরে রাখতে পারল না। অতি আনন্দে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। হঠাৎ করে ওকে এভাবে আনন্দে চেঁচামেচি করতে দেখে ইমদাদ ভড়কালো। কিছুক্ষণ শান্ত গলাতে থামতে বলল তবে মাইশা থামলো না। শেষমেষ বাধ্য হয়ে ইমদাদ বেশ জোরে একটা ধমক দিলো মাইশাকে। সঙ্গে সঙ্গে মাইশা থেমে গেল। ইমদাদ রাগান্বিত গলায় বলল,

“পা'গলের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন? আর কেউ যেন না জানে এই কথাটা। যদি কেউ জেনেছে তোর খবর আছে মাইশা।”

মাইশা উচ্ছ্বশিত গলায় বলল,

“কাউকে বলবো না ইমদাদ ভাই। তোমরা আগে বিয়ে করো, বাচ্চাকাচ্চা হোক তারপর দরকার পড়লে সবাইকে জানাবো। একটা কথা শোনো, বিয়ের পর কিন্তু কলিকে নিয়ে তুমি ঢাকায় যাবে না। কলি এখানেই থাকবে। আমি আর কলি একসাথে থাকবো। বিয়ের পর তো আমরা দুজনে এক বাড়িতেই থাকবো তাই না? কলিকে তুমি নিয়ে গেলে আমি একা হয়ে যাব।”

মাইশার কথাটা শুনে ইমদাদ কপাল কুঁচকে মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল,

“বিয়ের পর দুজনে এক বাড়িতে থাকবি কি করে? তুই আমার বাড়িতে কি করে আসবি?”

“আরে ইমাদ আছে না। আমি তো ওকেই…....”

নিজের কথার মাঝ পথে থামিয়ে মাইশা জিভে কামড় বসালো। নিজের প্রতি ভীষণ রাগ হলো। একটা গা'ধা ও। নিজেই ঠিক করে যে বলবে না, লুকিয়ে রাখবে আবার নিজেই মুখ ফসকে বলে ফেলে। এখন ইমদাদ যদি রেগে যায়।

মাইশার এসব চিন্তার মাঝে ইমদাদের গম্ভীর কণ্ঠস্বর এলো ওর কানে,

“আমার ভাই তোকে পছন্দ করে। তুইও পছন্দ করিস আমার ভাইকে। আগে কি করেছিস না করেছিস সেসব আমার দেখার বিষয় না। তবে এখন যেন আমার ভাই ব্যতীত আর কোন ছেলের সাথে কথাও বলতে না দেখি। আমি একই কথাটা আমার ভাইকেও বলে দিয়েছে। ভাবিস না ইমদাদ পাড়ায় থাকে না জন্য কারো খোঁজ রাখে না। তুই কোথায় কি করছিস এসব কিন্তু আমার কানে ঠিক পৌঁছে যাবে।”

মাইশা আতঙ্কিত গলায় বলল,

“তুমি কি করে জানলে এসব? তোমায় কে বলল আমার আর ইমাদের কথা?”

“আমার ভাই বলেছে। কেননা ও খুব ভালো করে জানে পরে যদি আমি অন্য কোথাও থেকে জানতে পারি ও আচ্ছা মতো ক্যা'লা'নি খাবে আমার হাতে। তাছাড়া বাবা তো সোজাভাবে কোনদিনও বিয়েতে রাজি হবে না, আমারই সাহায্য লাগবে। এই ইমদাদ ছাড়া কারোর কিছুই হবে না।”

_________

রাত আটটা পার হয়ে গেছে তবুও ইমদাদ বাড়ি ফিরল না। আঁখি রান্নাবান্না শেষ করে ছেলের অপেক্ষায় বসে আছেন। এতক্ষণেও ইমদাদ বাড়ি না ফেরায় শেষে কলই করলেন। প্রথমবারে ফোনটা রিসিভ করল না ইমদাদ। আঁখি একটু সময় নিয়ে আবারও কল করলেন। এবারে রিসিভ করলো ইমদাদ ফোন। আঁখি চিন্তিত গলায় ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“কোথায় তুই? আমি ভাত নিয়ে বসে আছি। কখন আসবি? শেষে বাসের জন্য দেরি হয়ে যাবে ।”

“আমি আসছি মা। আর আধাঘণ্টা সময় লাগবে। বন্ধুদের সাথে এক জায়গায় যাচ্ছি চা খেতে। চা খাওয়া হয়ে গেলে বাড়ি ফিরব। বেশি সময় লাগবে না।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি আয়।”

কথাটা বলে আঁখি ফোনটা রেখে দিলেন। একটু বিরক্তও হলেন ছেলের প্রতি। এতগুলো দিন বাদে বাড়ি ফিরল, যেটুকু সময় বন্ধুদেরকে দিচ্ছে সেটুকু সময় কি বাড়িতে মাকে দেওয়া যেত না।

ছেলের উপরে অভিমান করে আঁখি বসে রইলেন। ভাবলেন ছেলে বাড়ি ফিরলে সবটুকু অভিমান প্রকাশ করবেন। আধাঘন্টা পার হয়ে গেল তবুও ইমদাদ বাড়ি ফিরল না। অপেক্ষা করতে করতে সময় গিয়ে ঠেকলো রাত দশটায়, তবুও ইমদাদ বাড়ি ফিরল না।

আঁখির চিন্তা বাড়লো এবারে। অপেক্ষা করতে না পেরে ইমদাদের নাম্বারে কল করলেন, তবে নাম্বারটা বন্ধ দেখালো।

কোন এক অজানা আতঙ্কে আঁখি ভয়ে গুটিয়ে গেলেন। পর পর বেশ কয়েকবার ইমদাদের নাম্বার ডায়াল করলেন, তবে নাম্বারটা বন্ধ দেখালো। আঁখি তাড়াহুড়ো করে গেলেন ইমাদের ঘরে। ইমাদতে উদ্দেশ্য করে ব্যস্ত গলায় বললেন,

“একটু সাঈদের নাম্বারে কল লাগাতো বাবা। তোর ভাইয়ার নাম্বারটা বন্ধ দেখাচ্ছে। ছেলেটার সেই কখন বাড়ি ফেরার কথা, এখনো আসেনি।”

আঁখির কথার প্রেক্ষিতে পাশের ঘর থেকে ফরিদ সাহেবের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“তোমার ছেলের তোমার জন্য সময় নেই। দেখো গিয়ে ওই মেয়ের সাথে দেখা করতে গেছে।”

আঁখি বিরক্ত হলেন স্বামীর এমন কথায়। তবে গুরুত্ব দিলেন না স্বামীর কথায়। ইমাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তুই কল দে সাঈদের নাম্বারে।”

ইমাদ ফোনটা হাতে নিয়ে সাঈদের নাম্বারটা পেল না খুঁজে। কাচুমাচু করে বলল,

“আমার কাছে তো নেই মা সাঈদ ভাইয়ার নাম্বার।”

আঁখি এবারে রাগান্বিত গলায় বলল,

“কি করিস সারাদিন ফোন নিয়ে? পাড়ার ছেলের নাম্বার রাখিস না ফোনে। কোথা থেকে পাবি নিয়ে আয় যা।”

আখিঁ হঠাৎ করে অস্থির হয়ে পড়লেন। কেমন যেন হাঁসফাঁস করতে লাগলেন। ইমাদ তাড়াহুড়ো করে ওনাকে বিছানায় বসিয়ে আশ্বস্ত করে বলল,

“তুমি শান্ত হও। আমি ব্যবস্থা করছি সাঈদ ভাইয়ার নাম্বার।”

ইমাদ ভাবলো মাইশার কাছে থাকতে পারে সাঈদের নাম্বারটা। ওর থেকে নেওয়া যাক। যেই না মাইশাকে কল করতে যাবে অমনি আঁখির ফোনটা বেজে উঠলো। আঁখি ভাবলেন নিশ্চয়ই ইমদাদ কল করেছে।

ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নাম্বার ভেসে উঠেছে। আঁখি ভাবলেন হয়তো ইমদাদের ফোনে চার্জ শেষ হয়ে গেছে সেজন্য অন্য কারো নাম্বার থেকে কল করেছে।

আঁখি ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে সাঈদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সাঈদের কণ্ঠস্বরটা পেতেই আঁখি যেন একটু স্বস্তি অনুভব করলেন। তারপরও তার চিন্তা সম্পূর্ণ গেল না। চিন্তিত কন্ঠে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“সাঈদ, আমার ইমদাদ কইরে বাবা? ওর ফোনটা বন্ধ কেন? কখন থেকে কল করে যাচ্ছি। অনেকক্ষণ আগে ওর বাড়ি ফেরার কথা ছিল, এখনো আসেনি। তুই তো ওর সাথেই ছিলি। দে তো একবার ওকে ফোনটা।”

সাঈদের কন্ঠটা কাঁপছে। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। অনেক কষ্টে কথা বলার শক্তি সঞ্চয় করে বলল,

“চাচি, ইমাদ কিংবা চাচা আছে কাছে? একটু ওদেরকে ফোনটা দেবেন, কথা আছে আমার।”

“তুই তার আগে আমার ইমদাদ কে ফোনটা দে। আমি আগে ওর সাথে কথা বলবো।”

“আপনি আগে ইমাদকে ফোন দিন কিংবা চাচা থাকলে ওনাকে দিন। আমি পরে কথা বলাচ্ছি আপনার সাথে ইমদাদের।”

আঁখি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না সাঈদের কথায়। বরং রাগান্বিত গলায় বললেন,

“আমার ছেলের সাথে আমি কখন কথা বলবো সেটা ঠিক করার তুই কে? আমার ইমদাদকে ফোন দিতে বলেছি, ওকে ফোন দে। আমি কথা বলব। ওর সাহস খুব বেড়ে গিয়েছে। আমার কাছে বকা খায় না অনেকদিন হলো।”

আঁখির অস্থিরতা দেখে ইমাদ ওনার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল। তবে আঁখি আগেই কথা বলতে দিলোনা। জোর করে স্পিকার চালু করলো। ইমাদ ফোনের অপর পাশে থাকা সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাইয়া আমি ইমাদ। কি হয়েছে আমায় বলোতো? ভাইয়া কোথায়?”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাঈদ কেঁদে উঠলো। নিজের কান্না কে কোনমতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। ক্রন্দনরত গলায় ইমাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমরা বাড়ি ফিরছিলাম ইমাদ। তবে ইমদাদের দেরি হয়ে যাচ্ছিল জন্য ও একটু আগে বেরিয়ে যায়। জানিনা কি থেকে কি হয়ে গেল। ওর এক্সিডেন্ট হয়েছে। আমরা হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি ওকে। তোরা তাড়াতাড়ি আয়। অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে। বাঁচবে কিনা জানিনা।”

ইমাদের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। আঁখি ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়লেন। খেয়াল করলেন ওনার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ইমাদ গলা উঁচিয়ে ফরিদ সাহেব কে ডাকলেন। হঠাৎ করে এভাবে ইমাদকে চেঁচামেচি করতে দেখে ফরিদ সাহেব দৌড়ে সেখানে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,

“কি হয়েছে? চেঁচাচ্ছ কেন এভাবে?”

ইমাদ এক হাতে আঁখিকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“ভাইয়ার এক্সিডেন্ট হয়েছে বাবা। সাঈদ ভাইয়া বলল অবস্থা খুব একটা ভালো না।”

ইমাদ কথাটা বলতেই আঁখি চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। মুহূর্তের মাঝে তিনি জ্ঞান হারালেন। ফরিদ সাহেব যে এগিয়ে এসে স্ত্রীকে ধরবেন সেই খেয়ালও তার রইল না। তিনি নিজেই দরজার কাছে মেঝের উপরে ধপ করে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।

ইমাদ পড়লো মহা বিপদে। কোন দিকে যাবে কিছুই বুঝতে পারছে না। এত কঠিন মুহূর্তে কখনো ইমাদ পড়েনি। হুট করে মনে হলো যদি এখন ওর জায়গায় ইমদাদ থাকতো তবে সবটা সামলে নিতে পারত।

বিজ্ঞাপন
ধুলো মাখা গলিতে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক বাংলা উপন্যাস